ছোটোগল্পটি জাপানি কথাসাহিত্যিক মিয়েকো কাওয়াকামির 'The Door Between Us' (নিউ ইয়র্কার, অনুবাদ: স্যাম বেট) ইংরেজি অনুবাদ থেকে বাংলায় ভাবানুবাদ করা হয়েছে। –অনুবাদক
আমার ফ্ল্যাটটা একটা পুরনো কাঠের তৈরি একতলা বিল্ডিং-এ অবস্থিত। দুটো পাশাপাশি ফ্লাট। কত বছর আগে বিল্ডিং-টি তৈরি হয়েছে জানা নেই! ভাঙাচোরা পরিত্যাক্ত দুটি বিল্ডিং-এর মাঝখানে আমাদের বিল্ডিংটি স্যান্ডউইচের মতো আটকে আছে। আমার ফ্লাটে রয়েছে একটা শোবার ঘর ও একটা ছোট্ট রান্নাঘর। রান্নাঘরে রয়েছে শুধু একটা সিঙ্গল-বার্নার স্টোভ, আর একটা লিক হওয়া শাওয়ার। কোনো স্টোর রুম নেই। ফ্লাটের পেছনের দিকে কাপড় শুকানোর জায়গাটা প্রায় পুরোটাই এসি দখল করে রেখেছে। আর উত্তরের দিকে তাকালে মনে হয়– পরিত্যক্ত বাড়ির দেয়াল আমার দিকে এগিয়ে আসছে।
আমি যখন এই বিল্ডিং-এ উঠি তখন পাশের ফ্লাটে একজন মহিলা থাকতেন। তার দরজার প্লেটটা ফাঁকা। রিয়েল এস্টেট কোনো অজানা কারণে তাতে কোনো নাম সেঁটে দেয়নি। মহিলার সাথে আমি কখনো কথা বলিনি।
তিনি মোটা ছিলেন। লম্বা এলোমেলো চুল তার মাথাজুড়ে। সবসময় একই জামাকাপড় পরতেন। তাকে দেখেই বুঝতাম— তিনি জীবনটা ঠিকঠাক সামলাতে পারছেন না। এমনকি তিনি তার নিজের ও ফ্লাটের পরিচ্ছন্নতাও রক্ষা করতে পারতেন না। বাইরের কেউ তার সাথে দেখা করতেও আসতো না। প্রত্যেকবার তাকে দেখলে আমার মনে হতো– তিনি হয় জীবন নিয়ে উদাসীন, নতুবা হাল ছেড়ে দিয়েছেন।
মহিলাটির একটা বদ অভ্যাস ছিল। দরজা লক করে বেরোনোর সময় তিনি নবটা বারবার টানতে থাকতেন– যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না যে লক ঠিকঠাক হয়েছে। টানাটানির শব্দ ছিল জোরালো প্রকৃতির। প্রথমবার যেদিন আমি টানাটানির শব্দ শুনি, ভেবেছিলাম– কেউ হয়তো তার কাছে ঋণ আদায় করতে এসে তার দরজা জোরে জোরে ঝাঁকাচ্ছে।
কিন্তু আমি আমার দরজা খুলে দেখি শুধু তিনিই তার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন।
প্রত্যেকবার বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় তিনি দরজাটা নিয়ে টানাটানি করতেন। তিনি এত জোরে টানাটানি করতেন, দেখে মনে হতো– তিনি কব্জা থেকে দরজাটা খুলে ফেলবেন। টানাটানিতে তার আর আমার ফ্লাটের দরজার মাঝের দেয়ালে চিড় ধরে যায়। তবে বিষয়টি নিয়ে আমি বিরক্ত হতাম না। আমি তার অনুভূতি বুঝতে পারতাম। ছোটবেলায় আমিও অনেকবার সবান দিয়ে হাত কচলাতে কচলাতে সাবানটা আমার হাতের মধ্যে গায়েব করে দিতাম।
মহিলাকে নিয়ে আমার আগ্রহের সীমা নেই। মাঝে মাঝে আমি দেয়ালে কান লাগিয়ে ওপাশে কী হচ্ছে শোনার চেষ্টা করতাম।
ব্যাকগ্রাউন্ডের ঝাপসা টিভির আওয়াজ ব্যতীত অন্য কোনো শব্দ শুনতে পেতাম না। রিয়েল এস্টেট অফিস থেকে শুনেছি, আমাদের ঘর দুটো একে অপরের আয়না-প্রতিবিম্ব। পাতলা দেয়াল দিয়ে আলাদা করা। আমার মনে হতো আমরা সবসময় একই কাজ করছি। যেমন আমি যখন বাসন মাজতাম, তখন ভাবতাম হয়তো তিনিও আমার দিকে মুখ করে বাসন মাজছেন। আর যখন জীবনটা মুচড়ে পড়তো, তখন প্রায়ই মনে পড়ত— আমার সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী একজন নাম না জানা মহিলা ব্যতীত কেউ নয়।
আমি পার্ট-টাইম একটা চাকরি করতাম। চাকরি থেকে বাড়ি ফেরার পথে মৃত ধূসর রাস্তার দিকে তাকালে আমার চোখ আমাদের দুটো জরাজীর্ণ দরজার দিকে চলে যেত। সূর্যাস্তের আগুনে লাল হয়ে থাকতো দরজা দুটো। আর আমি ভাবতাম আমি এবং মহিলা দুজনই যমজ, দুজনেই বুড়ো আর একা। আবার ভাবতাম একটা দরজাতে যদি আগুন ধরে পুড়ে যায়, তখন অন্যটা কীভাবে বাঁচবে? এই অনুভূতিগুলো কাউকে বলতে মন চাইতো, কিন্তু পারতাম না।
কল্পনা করতাম– আমি মহিলাটির দরজায় টোকা দিচ্ছি। কিন্তু ভয় হতো। তিনি দরজা খুললে আমি ঠিকমতো আমার মনের ভাবনাগুলো তার কাছে প্রকাশ করতে পারব তো! আমি তাকে বলতে চাইতাম আমার জীবন কখনো আমার মনের মতো হয়নি। কিছুই ঠিকঠাক করতে পারিনি জীবনে। যে মানুষটা আমার সবকিছু ছিল তাকে বাঁচাতে পারিনি। এরকম নানা কথা আমার মনের মধ্যে উপচে পড়তো। আর মনে হতো, যদি তাকে জানাতে পারতাম!
এক বসন্তে আমার জীবনে একটা ঘটনা ঘটে গেল। আমি পার্ট-টাইম চাকরিটা ছেড়ে দিলাম হুট করেই। বাড়ি ফিরলাম মাথা ভর্তি চিন্তা নিয়ে। বয়স হয়েছে। পরের চাকরি কোথায় পাব? কিংবা মরার আগে যত টাকা দরকার তা কোথায় পাবো?
বাসায় ফেরার সময় দেখি– মহিলাটি তার দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
তিনি নব নিয়ে টানাটানি করছিলেন না। তার অর্থ হচ্ছে, তিনি সম্ভবত সবে বাড়ি ফিরেছেন। চার বছর ধরে আমি এখানে থাকছি, কিন্তু এটাই ছিল দেয়াল ছাড়া আমাদের সবচেয়ে কাছাকাছি আসা। তার গা থেকে একটা উটকো গন্ধ এলো। বুঝতে পারলাম তিনি অনেকদিন স্নান করেননি। উদ্বিগ্ন হয়ে আমি মাথা নেড়ে ‘হ্যালো’ বললাম। তিনিও তাই বললেন।
দু'সেকেন্ডের মতো আমাদের চোখাচোখি হলো। দেখলাম তার চোখের চারপাশ কালো আর ভেজা। বিভ্রান্ত হয়ে ভাবলাম, কখন বৃষ্টি শুরু হলো? আকাশের দিকে তাকালাম। বৃষ্টি পড়ছে না। বোধ ফিরে এলে বুঝতে পারি, বৃষ্টি হচ্ছে না, তিনি কাঁদছেন, তাই তার চোখে জল। তার তৈলাক্ত চুল তার কপালের উপর কুঁচকে আছে। তার ঝুলে পড়া গালে যে উদ্বেগের স্পষ্ট আভাস। মুখের মধ্যে কথা এলো, কিন্তু বলতে পারলাম না। যতই খারাপ লাগুক, আমাকে যেতে হলো; যেন কেউ আমাকে ঠেলে সরিয়ে দিচ্ছে। চাবি নিয়ে হাতড়াতে হাতড়াতে দরজা খুলে ভিতরে ঢুকলাম। কয়েক সেকেন্ড পিপহোল দিয়ে মহিলাকে দেখার চেষ্টা করলাম। কিন্তু স্পষ্ট বুঝতে পারলাম না তিনি বাইরে আছেন নাকি ভিতরে ঢুকে পড়েছেন।
সেদিন আর আমি শান্ত থাকতে পারলাম না। রাত যত এগোলো, আমি বারবার দেয়ালে কান পাততে থাকলাম। কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো শব্দই ভেসে আসলো না এপাশে। পানি খেলাম, ফুটন বিছানায় শুয়ে পড়লাম, টিভির রিমোটের সুইচ অন-অফ করে মন ভোলানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। অস্বস্তি বাড়তে শুরু করে, আরও জোরালো হয়। আবার কান লাগাই দেয়ালে, কিন্তু কোনো শব্দই ভেসে আসে না।
আমি চিন্তা করতে থাকি– কেন আমি তার সঙ্গে কিছু বলতে পারলাম না?
মহিলাটি তো কাঁদছিলেন!
অন্তত আমি আমার শপিং ব্যাগের ভেতর থেকে একটা পর্ক বান তাকে দিতে পারতাম। একটা অলক্ষুণে উদ্ভট চিন্তা আমার মাথার মধ্যে ঘুরপাক করতে শুরু করে, সেটা হলো– আমি হয়তো তার দেখা শেষ মানুষ!
একথা ভাবতেই আমার মায়ের কথা মনে পড়ে যায়। শেষবার যখন আমি আমার মাকে দেখেছিলাম, আমার আঙুল গলায় চলে গিয়েছিল। ভেবেছিলাম আমি নিজের গলা নিজে টিপে দিই। কিন্তু এভাবে মানুষকে ভোলা যায় না। সময় লাগে। তুমি যদি কাউকে ভুলতে চাও তার স্মৃতিগুলো অদৃশ্য হতে অনেক সময় লাগে। আস্তে আস্তে সেগুলো ছোট হয়ে, আর তোমার অন্য স্মৃতিগুলো বড় হতে থাকে। একসময় আগের স্মৃতিগুলো নতুন বড় স্মৃতি দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়ে যায়।
আমি দেয়াল থেকে কান সরিয়ে হাত মুষ্টিবদ্ধ করলাম। আমার পালস দ্রুত চলাচল করতে শুরু করে। তারপর আমি গভীর শ্বাস নিয়ে শান্ত হওয়ার চেষ্টা করি। আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে নোংরা দেওয়ালের উপর– তার মলিন দরজাটা।
আমি দরজায় টোকা দিলাম। ঠিক মাঝখানে। ধীরে ধীরে, দু'বার। ঠক! ঠক! একটু থেমে আবার। দু'বার। এবার একটু জোরে। তবু কোনো উত্তর নেই। আগের মতোই।
তাই আমি ফুটন বিছানাটা টেনে দেয়ালের কাছে নিয়ে এলাম আর সারা রাত টোকা দিতে লাগলাম। কী করছি আমি নিজেও বুঝতে পারছিলাম না।
নিজেকে বললাম– বোকা! এতক্ষণে হয়তো তিনি কোথাও চলে গেছেন, আর ফিরবেন না। আর যদি থাকেনও, হয়তো তিনি আমার টোকা শুনতে পাচ্ছেন না। কিন্তু আমি টোকা দিয়ে যেতে লাগলাম—ঠক! ঠক! একটু থেমে আবার। কতক্ষণ পর জানি না। আমি ঘুমিয়ে পড়ি আর অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখতে থাকি। বিচিত্র প্যাটার্ন আর আকারের স্বপ্ন! আর মাঝে মাঝে আমি টোকা দিয়ে যেতে থাকি।
সম্ভবত আমি দেয়ালকে দরজা ভেবে টোকা দিতে দিতেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ি। সকালের আলোয় আমার ঘুম ভাঙে। হাত-পা ছড়িয়ে আবার টোকা দিতে শুরু করি। যেন স্বপ্ন থেকে পুনরায় শুরু করছি। কিন্তু এক মুহূর্ত পর, একটা শব্দ শুনতে পেলাম।
ঠক!
একটা টোকা। শুধু একটা। ওপাশ থেকে। আমি সোজা হয়ে বসি। আমার চোখ পিটপিট করে ওঠে। আমি দেয়ালে কান লাগাই।
আমি নিশ্চিতভাবে টোকার শব্দ শুনেছি। কিন্তু এটা দ্বারা তিনি কি বুঝালেন তা আমি নিশ্চিত নই। হয়তো টোকা দ্বারা তিনি বলছেন, 'তোমার টোকা খুব বিরক্তিকর শোনাচ্ছে'। অথবা বলছেন, 'আমি বুঝতে পারছি তুমি কী বলতে চাইছো’। অথবা, 'আপনাকে ধন্যবাদ'। অথবা, 'দয়া করে থামো'। নাকি অন্য কিছু বুঝাচ্ছেন তিনি! যাই হোক না কেন, আমি নিশ্চিত তিনি নিজে একটা টোকা দিয়ে আমার টোকার উত্তর দিয়েছেন।
ফুসফুসের সব বাতাস ছাড়লাম, চাদর টেনে মাথা ঢেকে দিলাম। সকাল হয়েছে। আমাকে উঠতে হবে। বাইরে যেতে হবে। তখন মনে পড়লো– আমার তো চাকরি নেই! উঠে আর কিই বা হবে!
চাকরি নেই ভেবে– খুব একটা ভয় পেলাম না। বালিশে মুখ গুঁজে আরেকবার চোখ বন্ধ করলাম।
| ছবিতে : মিয়েকো কাওয়াকামি |
লেখক পরিচিতি: মিয়েকো কাওয়াকামি (Mieko Kawakami) একজন সমকালীন জাপানি লেখক ও কবি। তিনি ১৯৭৬ সালে জাপানের ওসাকায় জন্মগ্রহণ করেন। লেখালেখির আগে তিনি গায়ক হিসেবেও কাজ করেছেন, যা তাঁর ভাষা ও ছন্দবোধে প্রভাব ফেলেছে।
কাওয়াকামির লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো নারীর অভিজ্ঞতা, শরীর, একাকিত্ব, শ্রেণি-বৈষম্য ও আধুনিক শহুরে জীবনের মানসিক সংকটকে গভীরভাবে ও সংবেদনশীল ভাষায় তুলে ধরা। তাঁর গদ্য কখনো সরল, কখনো তীব্র ও প্রশ্নমুখর।
তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে Breasts and Eggs, Heaven, All the Lovers in the Night বিশেষভাবে আলোচিত। হারুকি মুরাকামি তাঁর লেখার প্রশংসা করেছেন এবং তাঁদের মধ্যে সাহিত্যিক সংলাপও হয়েছে।
মিয়েকো কাওয়াকামি বর্তমানে জাপানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী সাহিত্যিক কণ্ঠ হিসেবে বিবেচিত।
আমাদের মাঝ-দরজা
▮ মিয়েকো কাওয়াকামি
▮ অনুবাদ: মোস্তাফিজ ফরায়েজী
▮ মিয়েকো কাওয়াকামি
▮ অনুবাদ: মোস্তাফিজ ফরায়েজী




মন্তব্য