সেই শব্দহীন থমথমে ভ্যাপসা দিনগুলোতে বাড়ির বড়ো মেয়ে, শান্তশিষ্ট গম্ভীর মনের জগতেও বেশ উথালপাতাল চলছিল; আর রেভারেন্ড মাদার, যিনি কিনা ভাঁড়ারঘর আর হেঁশেলের ঘেরাটোপে নিজেকে আটকে রেখে ঠোঁটে একেবারে কুলুপ এঁটেছিলেন, তাঁর পক্ষে—ওই কসম খাওয়ার ঠেলায়—রেক্সিন আর লেদারক্লথের ব্যবসা-করা যে ছোকরা তাঁর মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে আসত, তাকে যে তাঁর একটুও দু-চক্ষে সহ্য হতো না, সে-কথাটা মুখ ফুটে বলার কোনো জো ছিল না। (আদম আজিজ অবশ্য বরাবরই তাঁর মেয়েদের পুরুষ বন্ধু পাতানোতে কোনো আপত্তি করেননি।) আহমেদ সিনাই—নামটা শুনেই ‘আহা!’ বলে সবকিছু যেন ঠিকঠাক চিনে ফেলার বিজয় উল্লাসে পদ্মা চেঁচিয়ে ওঠে—এর ঙ্গে আলিয়ার আলাপ হয়েছিল ইউনিভার্সিটিতেই, আর বইপাগল, বুদ্ধিমতী যে-মেয়ের মুখের ওপর আমার দাদুর নাকটা একেবারে গুরুভার এক জ্ঞানীর চেহারা নিয়ে বসেছিল, তার পক্ষে ওই ছোকরাকে বেশ বুদ্ধিমান বলেই মনে হতো; কিন্তু নাসিম আজিজের মনটা কেমন খচখচ করত, কারণ মাত্র কুড়ি বছর বয়সেই ছেলেটার একবার ডিভোর্স হয়ে গেছে। (‘মানুষমাত্রেই তো এক-আধটা ভুল করে,’ আদম তাঁকে বলেছিলেন, আর তাতে প্রায় একটা লঙ্কাকাণ্ড বেঁধে যাওয়ার জোগাড়, কারণ তাঁর এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল যে কথাটার মধ্যে বুঝি বড্ড বেশি ব্যক্তিগত কোনো খোঁচা লুকিয়ে আছে। কিন্তু এরপর আদম আবার জুড়ে দিয়েছিলেন, ‘ওর ওই ডিভোর্সের ব্যাপারটা বছর দুয়েকের জন্য একটু থিতিয়ে যেতে দাও; তারপর আমরা এ-বাড়িতে প্রথমবার বিয়ের সানাই বাজাব, বাগানে পেল্লায় এক শামিয়ানা খাটানো হবে, আর তার সঙ্গে নাচগান, মিষ্টিমুখ আর এলাহি সব ব্যাপারস্যাপার হবে।’ সবকিছুর পরেও, এই কথাটা নাসিমের মনে বেশ ধরেছিল।) আর এখন, নিস্তব্ধতার ওই পাঁচিল-ঘেরা বাগানে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে, আহমেদ সিনাই আর আলিয়া একে অপরের সঙ্গে কোনো কথা বলা ছাড়াই দিব্যি ভাবের আদানপ্রদান চালিয়ে যাচ্ছিল; তবে সবাই এটা ভাবছিল যে লোকটা এবার হয়তো বিয়ের প্রস্তাবটা দিয়েই ফেলবে, কিন্তু বাড়ির ওই নৈঃশব্দ্যটা যেন তাকেও আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছিল, আর তাই আসল কথাটা তার আর মুখ ফুটে বলাই হয়ে ওঠেনি। ঠিক এই সময়টাতেই আলিয়ার চেহারায় একটা থমথমে ভারী ভাব এসে পড়ল, গালের কাছে ঝুলে-পড়া এমন একটা নৈরাশ্যবাদী ছাপ, যা কিনা এরপর আর কখনোই তার চেহারা থেকে পুরোপুরি মুছে যায়নি। (‘এই যে শোনো,’ পদ্মা আমাকে রীতিমতো ধমক লাগায়, ‘নিজের সম্মাননীয়া মাতাজিকে নিয়ে এমনভাবে কথা বলাটা কিন্তু মোটেই ঠিক নয়।’)
আরও একটা কথা: আলিয়া তার মায়ের ওই মোটা হয়ে যাওয়ার ধাতটা পেয়েছিল। আর তাই বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে রীতিমতো বেলুনের মতো ফুলতে শুরু করেছিল।
আর মুমতাজ, যে কিনা মায়ের পেট থেকে একেবারে মধ্যরাতের মতো মিশমিশে কালো রং নিয়ে ভূমিষ্ঠ হয়েছিল? মমতাজ কোনোদিনই খুব একটা তুখোড় বুদ্ধিমতী ছিল না; কিংবা এমেরাল্ডের মতো অমন সুন্দরীও ছিল না; কিন্তু সে ছিল ভারী ভালো, কর্তব্যপরায়ণ, আর বড্ড একলা এক মেয়ে। অন্য বোনেদের চেয়ে সে তার বাবার সঙ্গেই বেশি সময় কাটাত, বাবার নাকের ডগায় ওই সারাক্ষণ লেগে-থাকা সুড়সুড়ানির চোটে ইদানীং তাঁর মেজাজটা যে আরও সাঙ্ঘাতিক খিটখিটে হয়ে উঠেছিল, সেই বদমেজাজের হাত থেকে সে তাঁকে আগলে রাখত; আর নাদির খানের যাবতীয় দেখভালের দায়িত্বটাও সে নিজের কাঁধেই তুলে নিয়েছিল। রোজ রোজ খাবারের ট্রে আর ঝাঁটা হাতে সে নেমে যেত তাঁর ওই পাতালঘরে, এমনকী তাঁর ওই নিজস্ব থান্ডারবক্স বা শৌচপাত্রটাও সে নিজেই সাফ করত, যাতে মেথর বা ঝাড়ুদারও ঘুণাক্ষরে টের না পায় যে ওখানে কেউ একজন লুকিয়ে আছে। সে যখন নিচে নামত, নাদির তখন নিজের চোখ নামিয়ে রাখতেন; আর ওই বোবা বাড়িটার বুকে, তাদের দুজনের মধ্যে একটা শব্দও খরচ হতো না।
পিকদানিতে-পিক-ফেলা লোকগুলো নাসিম আজিজকে নিয়ে ঠিক কী বলত? ‘মেয়েদের মনের মতিগতি টের পাওয়ার জন্য সে নাকি তাদের স্বপ্নেও আড়ি পাতে।’ হ্যাঁ, এ ছাড়া আর কোনো ব্যাখ্যাই হয় না, আমাদের এই দেশে এর চেয়েও ঢের বেশি আজগুবি কাণ্ডকারখানা হরহামেশাই ঘটে থাকে, যে-কোনো খবরের কাগজ তুলে নিলেই তো এই গাঁ বা ওই গাঁয়ের নানারকম ভেলকি বা মোজেজার টুকরো খবর রোজই চোখে পড়ে—আর এভাবেই রেভারেন্ড মাদার তাঁর মেয়েদের স্বপ্নগুলো নিজের ঘুমেই দেখতে শুরু করলেন। (পদ্মা অবশ্য কথাটা শুনে একচুলও অবাক না হয়ে দিব্যি মেনে নেয়; কিন্তু অন্য কেউ যে-কথাটা একেবারে লাড্ডুর মতো অনায়াসেই গিলে ফেলবে, পদ্মা হয়তো সেটাকে সটান ফুৎকারে উড়িয়ে দিতে পারে। শ্রোতা বা পাঠক মাত্রেই তার নিজস্ব বিশ্বাস বা খামখেয়ালিপনার একটা ব্যাপার তো থাকবেই।) তো যা বলছিলাম: রাতের বেলা নিজের বিছানায় ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে রেভারেন্ড মাদার এমেরাল্ডের স্বপ্নে ঢুকে পড়লেন, আর সেখানে গিয়ে তিনি পেলেন আরও একটা স্বপ্নের খোঁজ—মেজর জুলফিকারের এক একান্ত নিজস্ব গোপন স্বপ্ন, নিজের একটা পেল্লায় আধুনিক বাড়ির খোয়াব—যেখানে তাঁর বিছানার ঠিক পাশেই একটা স্নানঘর থাকবে। মেজরের উচ্চাকাঙ্ক্ষার দৌড় ছিল ওই পর্যন্তই; আর ঠিক এভাবেই রেভারেন্ড মাদার শুধু যে এই বিষয়টা টের পেলেন যে তাঁর মেয়ে চুপিচুপি এমন সব জায়গায় তার ওই জুলফির সঙ্গে দেখা করছে যেখানে দিব্যি কথাবার্তা বলা যায়, তা-ই নয়, তিনি এটাও বুঝলেন যে এমেরাল্ডের উচ্চাকাঙ্ক্ষা তার ওই মানুষটার চেয়েও ঢের বেশি। আর (হবেই না বা কেন?) আদম আজিজের স্বপ্নে ঢুকে তিনি দেখলেন তাঁর স্বামী পেটের মাঝখানে প্রায় এক-মুঠি সাইজের একটা গর্ত নিয়ে কাশ্মীরের এক পাহাড়ে ভারী বিষণ্ণ মুখে হেঁটে চলেছেন, আর তা থেকেই তিনি দিব্যি আঁচ করে ফেললেন যে তাঁর প্রতি লোকটার ভালোবাসা একটু একটু করে উবে যাচ্ছে, এমনকী তিনি তাঁর মৃত্যুটাও যেন আগেভাগেই দেখতে পেলেন; যার ফলে অনেকগুলো বছর পর, সেই খবরটা যখন তাঁর কানে এসে পৌঁছোল, তখন তিনি শুধু এটুকু বলেছিলেন, ‘ওহ, এ-তো আমার জানাই ছিল গো।’
... রেভারেন্ড মাদার মনে মনে ভাবলেন, আমাদের এমেরাল্ড ওর মেজরের কাছে পাতালঘরের ওই মেহমানটির কথাটা ফাঁস করে দিতে আর খুব বেশি দেরি নেই; আর তখন আমি আবার আগের মতো কথা বলতে পারব। কিন্তু তারপর, এক রাতে, তিনি তাঁর মেয়ে মুমতাজের স্বপ্নে ঢুকে পড়লেন, ওই কালকুটে মেয়েটা, যার গায়ের রংটা একেবারে দক্ষিণি জেলে-বউদের মতো হওয়ার কারণে তিনি যাকে কোনোদিনই মন থেকে ভালোবাসতে পারেননি, আর তখনই তিনি বিলক্ষণ বুঝলেন যে ঝামেলাটা এখানেই চুকবে না; কারণ মুমতাজ আজিজও—কার্পেটের তলায় ঘাপটি-মেরে-থাকা তার ওই গুণমুগ্ধটির মতোই—তলে তলে প্রেমে পড়তে শুরু করেছে।
প্রমাণ তো আর কিছু ছিল না। অন্যের স্বপ্নে ঢুকে পড়া—তা একে আপনি মায়ের মনই বলুন, কিংবা মেয়েদের সহজাত প্রবৃত্তি, যে-নামেই ডাকুন না কেন—এসব কথা তো আর আদালতে ধোপে টেকে না, আর রেভারেন্ড মাদার বিলক্ষণ জানতেন যে নিজের বাবার ছাদের তলায় বসে খোদ মেয়ে ফস্টিনস্টি বা কেলেঙ্কারি করছে, এমন একটা অপবাদ দেওয়াটা রীতিমতো সাঙ্ঘাতিক একটা ব্যাপার। এর পাশাপাশি, রেভারেন্ড মাদারের ভেতরটা তখন একেবারে ইস্পাতের মতো কঠিন হয়ে উঠেছে; আর তাই তিনি মনস্থির করলেন যে তিনি কিচ্ছুটি করবেন না, নিজের নীরবতাটা একেবারে আগের মতোই বজায় রাখবেন, আর আদম আজিজ নিজের চোখেই দেখতে পাক তার ওইসব আধুনিক ধ্যানধারণা কীভাবে তাঁর নিজের ছেলেমেয়েদের একেবারে উচ্ছন্নে ঠেলে দিচ্ছে—সারাটা জীবন তো শুধু তাকেই বলে এসেছে যে, তার ওইসব মান্ধাতার আমলের ভালোমানুষি আচার-বিচার নিয়ে সে যেন মুখটি বুজে থাকে। এবার সে নিজেই সবটা হাড়ে হাড়ে টের পাক না। ‘বড্ড তেতো স্বভাবের মেয়েমানুষ তো,’ পদ্মা বলে ওঠে; আর আমিও তাতে সায় দিই।
‘তা…’ পদ্মা যেন জেরা করার ভঙ্গিতে জানতে চায়। ‘কথাটা কি সত্যি?’
‘হ্যাঁ: এক অর্থে: সত্যিই’।
‘ওখানে ওইসব ফস্টিনস্টি চলছিল? ওই পাতালঘরে? সঙ্গে কোনো পাহারাদার-টাহারাদার ছাড়াই?’
পরিস্থিতির কথাও তো একটু ভাবতে হবে—দোষ খণ্ডন করার মতো এমন পরিস্থিতি বোধহয় আর হয় না। দিনের ঝকঝকে আলোয় যে-কাজগুলোকে একেবারে বেমানান বা ঘোরতর অন্যায় বলে মনে হয়, মাটির তলার ওই অন্ধকারে সেগুলোকেই কেমন যেন স্বাভাবিক আর মেনে-নেওয়ার মতো বলে মনে হতে থাকে।
‘ওই মোটকা কবিটা শেষমেশ ওই বেচারি কালকুটে মেয়েটার সঙ্গে ওই কাজটা করল? সত্যি সত্যিই করল?’
সে ওই পাতালঘরে বেশ অনেক দিনই কাটিয়ে ফেলেছিল—এতটাই দীর্ঘ সময় যে, সে দিব্যি উড়ন্ত আরশোলাদের সঙ্গে বকবক করতে শুরু করেছিল, আর সারাক্ষণ এই ভয়ে সিঁটিয়ে থাকত যে একদিন না একদিন কেউ ঠিক তাকে ওখান থেকে বিদেয় হতে বলবে; আর স্বপ্নে দেখত সেইসব একফালি চাঁদের মতো বাঁকানো ছুরি আর হুক্কাহুয়া করা কুকুরদের..., আর কেবলই মনে মনে আক্ষেপ করত যে, ইশ্ হামিংবার্ড যদি আজ বেঁচে থাকতেন আর বলে দিতেন যে এখন ঠিক কী করা উচিত; আর সে এ-কথাটাও হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিল যে মাটির তলার ওই অন্ধকারে বসে আর যা-ই হোক, অন্তত কবিতা লেখা যায় না। আর ঠিক তখনই ওই মেয়েটি রোজ খাবার হাতে নিয়ে আসে, তোমার ওই নোংরা শৌচপাত্র সাফ করতেও যার এতটুকু আপত্তি নেই, আর তুমি লজ্জায় চোখ নামিয়ে রাখলেও তোমার ঠিক চোখে পড়ে যায় এমন একটা গোড়ালি যা এক অদ্ভুত লাবণ্যে উজ্জ্বল হয়ে আছে, পাতালঘরের ওই নিকষ কালো রাতের মতোই কালো একটা গোড়ালি...
‘আমি তো ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারিনি যে লোকটার দৌড় এতদূর।’ পদ্মার গলায় রীতিমতো তারিফ করার একটা সুর শোনা যায়। ‘মোটা, ধেড়ে, অপদার্থ একটা লোক!’
আর শেষমেশ সেই বাড়িটায়, যেখানে সবারই, এমনকী অচেনা শত্রুদের হাত থেকে বাঁচতে পাতালঘরে লুকিয়ে-থাকা ওই ফেরারি আসামিরও জিভ শুকিয়ে গিয়ে তালুতে আটকে যায়, যেখানে বাড়ির ছেলেদের অবধি বেশ্যাদের নিয়ে ঠাট্টাতামাশা করতে আর নিজেদের পুরুষাঙ্গের মাপজোক মেলাতে রিকশাওয়ালা ছোকরার সঙ্গে ওই ভুট্টাখেতে গিয়ে লুকিয়ে জড়ো হতে হয় আর চুপিচুপি ফিসফিস করে সিনেমা-পরিচালক হওয়ার স্বপ্নের কথা বলতে হয় (হানিফের স্বপ্ন, যা তার ওই স্বপ্নে-আড়ি-পাতা মাকে রীতিমতো আঁতকে তোলে, কারণ তাঁর ধারণা সিনেমা লাইনটা আসলে ওই বেশ্যাবৃত্তিরই আরেকটা রূপ), যেখানে ইতিহাসের এক আচমকা অনুপ্রবেশের জেরে জীবনটা একেবারে এক কিম্ভূতকিমাকার রূপ নিয়েছে, সেই পাতালঘরের আবছায়া অন্ধকারে শেষমেশ সে আর নিজেকে সামলাতে পারে না, তার চোখদুটো আপনা থেকেই ওপরের দিকে উঠে যায়, ওই নরম চটি আর ঢলঢলে পাজামা বেয়ে, ঢিলেঢালা কুর্তা আর শালীনতার আবরণ ওই দোপাট্টা বা ওড়না পেরিয়ে সোজা ওপরে, যতক্ষণ না চোখে চোখ মেলে, আর তারপর…
‘আর তারপর? আরে বাবা বলোই না, তারপর কী হলো?’
ভারী লাজুক মুখে, মেয়েটি তার দিকে তাকিয়ে একটু হাসে।
‘কী?’
আর তার পর থেকেই, ওই পাতালঘরে একটু একটু করে হাসির আনাগোনা শুরু হলো, আর নতুন একটা কিছুর সূচনা হলো।
‘ওহ, তো কী হয়েছে? তুমি বলছ ওইটুকুই সব?’
সব বলতে ওইটুকুই: ঠিক সেই দিনটার আগে অবধি যেদিন নাদির খান আমার দাদুর সঙ্গে দেখা করতে চাইলেন—নিস্তব্ধতার ওই ঘন কুয়াশায় তাঁর কথাগুলো প্রায় শোনাই যাচ্ছিল না—আর তাঁর মেয়ের পাণিপ্রার্থনা করলেন।
‘বেচারি মেয়ে,’ পদ্মা নিজের মতো করে উপসংহার টানে, ‘কাশ্মীরি মেয়েরা তো এমনিতেই পাহাড়ের বরফের মতো ফরসা হয়, কিন্তু সে কিনা হলো একেবারে কালো। তা যা-ই হোক, ওই গায়ের রঙের জন্যই হয়তো তার ভালো ঘরে বিয়ে হওয়াটা আটকে যেত; আর ওই নাদিরও তো কিছু বোকা লোক নয়। এখন তো ওদের বাধ্য হয়েই তাকে ওই বাড়িতে থাকতে দিতে হবে, খেতে দিতে হবে, আর মাথার ওপর ছাদও দিতে হবে, আর তার বদলে তাকে শুধু মাটির তলায় একটা ধেড়ে কেঁচোর মতো ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকতে হবে। হুমম, লোকটা হয়তো খুব একটা বোকা নয়।’
আমার দাদু নাদির খানকে অনেক করে বোঝানোর চেষ্টা করলেন যে তাঁর আর কোনো বিপদ নেই; খুনিরা তো মরেই গেছে, আর তাদের আসল নিশানা তো ছিলেন ওই মিঞা আবদুল্লা; কিন্তু নাদির খান তখনও হাওয়ায়-শিস-দিয়ে-ওঠা সেই ছুরিগুলোর দুঃস্বপ্ন দেখতেন, আর কাকুতিমিনতি করে বলতেন, ‘এখনও সময় হয়নি, ডাক্তারসাহেব; দোহাই আপনার, আমাকে আর ক-টা দিন সময় দিন।’ আর তাই ১৯৪৩ সালের গ্রীষ্মের শেষের দিকের এক রাতে—সে-বছরও বর্ষা একেবারে ফাঁকি দিয়েছিল—আমার দাদু তাঁর ছেলেমেয়েদের ডেকে ড্রয়িংরুমে জড়ো করলেন, ঠিক যেখানে তাদের ছবিগুলো টাঙানো ছিল। যে-বাড়িতে এমনিতে কথাবার্তা প্রায় শোনাই যেত না, সেখানে তাঁর গলার আওয়াজটা কেমন যেন বড্ড দূরের আর গা-ছমছমে ঠেকল। ছেলেমেয়েরা ঘরে ঢুকে দেখল যে তাদের মা সেখানে নেই, নিজের ওই নিস্তব্ধতার জাল বুনে তিনি নিজের ঘরেই নিজেকে বন্দি করে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন; কিন্তু সেখানে একজন উকিল আর একজন মৌলবি হাজির ছিলেন (আজিজের ঘোরতর আপত্তি থাকলেও, তিনি মুমতাজের ইচ্ছেতেই শেষমেশ রাজি হয়েছিলেন), এই দুজনকে জোগাড় করে পাঠিয়েছিলেন অসুস্থ রানি কুচ নহীন, আর এঁরা দুজনেই ছিলেন যাকে বলে ‘একেবারে মুখে কুলুপ-আঁটা মানুষ’। তাদের বোন মুমতাজ একেবারে কনের সাজে সেখানে বসে ছিল, আর তার পাশেই রেডিওগ্রামের সামনের একটা চেয়ারে বসে ছিল পাতলা-নেতিয়ে-পড়া-চুলওয়ালা, মোটাসোটা ও লজ্জায়-জড়সড় নাদির খান। আর এভাবেই ওই বাড়ির প্রথম বিয়েটা এমন একটা বিয়ে হলো যেখানে না-খাটানো হলো কোনো শামিয়ানা, না-এল কোনো গায়কের দল, না-হলো কোনো মিষ্টিমুখের আয়োজন, আর মেহমানও ছিল একেবারে হাতেগোনা ক-জন। বিয়ের সব নিয়মকানুন চুকে যাওয়ার পর নাদির খান যখন তাঁর কনের মুখের ঘোমটা তুললেন—যে-দৃশ্যটা আজিজকে আচমকা ভারী একটা ধাক্কা দিল, এক মুহূর্তের জন্য তাঁকে যেন আবার আগের মতো জোয়ান বানিয়ে দিল, আর তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে গেল কাশ্মীরের সেই পুরোনো দিনগুলোয়, যখন তিনি একটা বেদির ওপর বসে থাকতেন আর লোকেরা এসে তাঁর কোলে টাকা গুঁজে দিত—আমার দাদু তখন বাড়ির সবাইকে দিয়ে কসম খাওয়ালেন যে তারা যেন ঘুণাক্ষরেও কারও কাছে পাতালঘরে লুকিয়ে-থাকা তাদের এই নতুন ভগ্নীপতির কথাটা ফাঁস না-করে। এমেরাল্ড, ভারী অনিচ্ছার সঙ্গে, সবার শেষে গিয়ে নিজের কথা দিল।
এরপর আদম আজিজ তাঁর ছেলেদের কাজে লাগিয়ে ড্রয়িংরুমের মেঝের সেই চোরাদরজা দিয়ে নিচে হরেক কিসিমের আসবাবপত্র নামিয়ে আনলেন: বাহারি পর্দা, নরম কুশন, আলো আর পেল্লায় একটা আরামদায়ক বিছানা। সবশেষে নাদির আর মুমতাজ পা রাখল মাটির তলার সেই পাতালঘরগুলোতে; চোরাদরজাটা বন্ধ করে দেওয়া হলো, কার্পেটটা টেনে আগের মতো বিছিয়ে দেওয়া হলো জায়গাটার ওপর। আর নাদির খান, একজন পুরুষমানুষের পক্ষে যতখানি নরম আদরে নিজের স্ত্রীকে ভালোবাসা সম্ভব ঠিক ততখানি উজাড় করে ভালোবেসেই, তাকে নিজের সেই পাতালরাজ্যে বরণ করে নিলেন।
মুমতাজ আজিজ এখন রীতিমতো এক দো-রঙা জীবন কাটাতে শুরু করল। দিনের বেলা সে নেহাতই এক আইবুড়ো মেয়ে, বাবা-মায়ের সঙ্গে রীতিমতো শালীনতা বজায় রেখে থাকে, ইউনিভার্সিটিতে কোনোরকমে দায়সারা পড়াশোনা করে, আর নিজের অন্তরে অধ্যবসায়, আভিজাত্য আর সহ্যশক্তির সেই গুণগুলোর চর্চা করে চলে যা কিনা তার সারাজীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠবে, এমনকী সেই সময়টা অবধি যখন তার অতীতের কথা-বলা সেই ময়লা-কাপড়ের বাক্সগুলো তার ওপর চড়াও হয়েছিল আর তারপর তাকে একেবারে চালের আটার রুটির মতো চ্যাপ্টা করে পিষে দিয়েছিল; কিন্তু রাতের বেলা, ওই চোরাদরজা গলে নিচে নেমে, সে গিয়ে পা রাখত আলো-আঁধারি মাখানো এক নিভৃত বাসরঘরে, তার সেই গোপন স্বামী আদর করে যার নাম দিয়েছিল তাজমহল, কারণ তাজ বিবি নামেই লোকে ডাকত সেই আগের জমানার মুমতাজকে—সেই মুমতাজ মহল, বাদশা শাহজাহানের বেগম, যে শাহজাহান নামের মানে আবার ‘দুনিয়ার বাদশা’। সে যখন মারা গেল, বাদশা তার জন্য ওই সমাধি বানিয়েছিলেন, যা কিনা এখন সব পোস্টকার্ড আর চকোলেটের বাক্সের ওপর অমর হয়ে আছে, আর যার বাইরের বারান্দাগুলোয় পেচ্ছাপের গন্ধ ভুরভুর করে, যার দেওয়ালগুলোয় সব হিজিবিজি আঁকিবুঁকি, আর যেখানে তিনটে ভাষায় ‘চুপ করুন’ লেখা থাকলেও গাইডরা সব দর্শকদের শোনানোর জন্য চেঁচিয়ে প্রতিধ্বনি পরীক্ষা করে। শাহজাহান আর তাঁর মমতাজের মতোই, নাদির আর তাঁর ওই কালো মেয়েটি পাশাপাশি শুয়ে থাকত, ল্যাপিস লাজুলি পাথরের মিনে-করা কাজ ছিল তাদের সাথি—কারণ শয্যাশায়ী, মৃত্যুপথযাত্রী কুচ নহীনের রানি তাদের বিয়ের উপহার হিসেবে পাঠিয়েছিলেন এক অপূর্ব কারুকাজ-করা, ল্যাপিস-মিনে-করা, দামি পাথর-বসানো রুপোর পিকদানি। আলোর নরম আভায় ঘেরা তাদের সেই আরামদায়ক নিভৃতবাসে, স্বামী আর স্ত্রী মিলে বুড়ো মানুষদের সেই খেলাটায় মেতে থাকত।
মুমতাজ নাদিরের জন্য পান সাজত বটে, কিন্তু নিজে মুখে দিত না, স্বাদটা তার ঠিক পছন্দ ছিল না। সে পিচ করে ফেলত লেবুর শরবতের ধারা। নাদিরের পিকের রং লাল, আর মুমতাজেরটা ফিকে সবুজ। সেটাই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে খুশির সময়। আর পরে, সেই দীর্ঘ নিস্তব্ধতার পর্ব চুকে যাওয়ার পর সে বলেছিল , ‘আমাদেরও শেষমেশ ছেলেপুলে হতো গো; শুধু সেই সময়টায় ব্যাপারটা ঠিক মানানসই ছিল না, এই যা।’ মুমতাজ আজিজ সারাজীবন বাচ্চাদের বড় ভালোবাসত।
ওদিকে, রেভারেন্ড মাদার মাসের পর মাস ধরে এক নিস্তব্ধতার জাঁতাকলে আটকে পড়ে বড্ড ঢিমেতালে দিন গুজরান করছিলেন। সেই নীরবতা এতটাই চরম আকার নিয়েছিল যে চাকরবাকররাও পর্যন্ত স্রেফ ইশারা-ইঙ্গিতে কাজের নির্দেশ পেত। আর একবার তো রাঁধুনি দাউদ তাঁর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে তাঁর সেই তন্দ্রাচ্ছন্ন অথচ মরিয়া ইশারাগুলোর মাথামুণ্ডু বোঝার চেষ্টা করছিল, আর তার জেরেই ফুটন্ত ঝোলের কড়াইটার দিকে তার একেবারেই নজর ছিল না; কড়াইটা উলটে সোজা তার পায়ের ওপর পড়ল, আর পা-টাকে একেবারে পাঁচ-আঙুলওয়ালা একটা ডিমভাজার মতো ছ্যাঁকা দিয়ে দিল। সে চিৎকার করার জন্য হাঁ করেছিল ঠিকই, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বেরোল না। এর পর থেকেই তার বদ্ধমূল ধারণা হয়ে গেল যে এই বুড়ির নির্ঘাত কোনো ডাইনিবিদ্যা জানা আছে, আর সেই ভয়ে সে কাজ ছেড়ে পালানোর কথা ভাবতেও শিউরে উঠত। মৃত্যুর দিন পর্যন্ত সে ওখানেই টিকে রইল, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে উঠোনে ঘুরে বেড়াত আর ওই রাজহাঁসগুলোর তাড়া খেত।
দিনকাল মোটেই ভালো যাচ্ছিল না। খরার দাপটে শুরু হলো রেশনিং। একে তো সপ্তাহে কটা দিন ভাত নেই, কটা দিন মাংস বন্ধ—তার ওপর ওই লুকিয়ে রাখা বাড়তি মানুষটাকে খাওয়ানো এক মস্ত হ্যাপা। রেভারেন্ড মাদারকে বাধ্য হয়ে হাত ঢোকাতে হলো ভাঁড়ার ঘরের জমানো রসদে। আগুনের আঁচে সস যেমন গাঢ় হয়, ঠিক তেমনই তাঁর মনের ভেতর জমতে থাকা রাগটাও ক্রমশ ঘন হয়ে উঠছিল। মুখের আঁচিলগুলো থেকে কেমন যেন বড় বড় লোম গজাতে শুরু করল। মুমতাজ বেশ চিন্তিত হয়েই দেখল, তার মা যেন মাসের পর মাস ফুলেফেঁপে উঠছেন। ওই না-বলা কথাগুলোই তাঁর ভেতরে জমে জমে তাঁকে যেন ভেতর থেকে ফুলিয়ে দিচ্ছিল… মুমতাজের কেমন যেন মনে হতো, ওর মায়ের গায়ের চামড়াটা বুঝি এক সাঙ্ঘাতিক বিপদের আভাস দিয়ে ক্রমশ বেশি রকমের টানটান হয়ে উঠছে।
অন্যদিকে ডাক্তার আজিজ বাড়ির ওই দমবন্ধ-করা নৈঃশব্দ্য থেকে দূরে, সারাটা দিন বাড়ির বাইরে বাইরেই কাটাতেন; তাই মুমতাজ, যে কিনা তার রাতগুলো কাটাত মাটির তলার সেই পাতালঘরে, সে-সব দিনে তার বড্ড আদরের বাবার দেখা প্রায় সে পেতই না বলা চলে। আর এমেরাল্ডও নিজের কথা রেখেছিল, তাদের ওই পারিবারিক গোপন রহস্যের বিন্দুবিসর্গও সে মেজরকে জানায়নি; কিন্তু উলটো দিকে, মেজরের সঙ্গে তার সম্পর্কের কথাও সে বাড়ির কাউকে ঘুণাক্ষরেও টের পেতে দেয়নি, এবং তার মতে সেটাই ন্যায্য ছিল। ওদিকে ওই ভুট্টাখেতের ভেতর মুস্তাফা, হানিফ আর রিকশাওয়ালা ছোকরা রাশিদকেও ওই সময়কার এক ম্যাড়ম্যাড়ে উদাসীনতা গ্রাস করে নিয়েছিল। আর এভাবেই কর্নওয়ালিস রোডের ওই বাড়িটা কালস্রোতে ভাসতে ভাসতে শেষমেশ ১৯৪৫ সালের ৯ই আগস্ট এসে ঠেকল, আর তারপর সমস্ত কিছু কেমন যেন পালটে গেল।
পূর্ববর্তী পর্ব পড়ুন এখানে: [মধ্যরাতের সন্তানেরা]
মধ্যরাতের সন্তানেরা
সালমান রুশদি
▋অনুবাদ: দীপ মন্ডল
সালমান রুশদি
▋অনুবাদ: দীপ মন্ডল




মন্তব্য