.header-button .inner > span { font-size: 18px !important; } .header-button .inner i.fa { font-size: 40px !important; } .comment-form-message { background-color: #f4f4f4 !important; font-size: 14px !important; }

$type=ticker$count=12$cols=4$cate=0$sn=0$show=post

সালমান রুশদির মিডনাইটস চিলড্রেন (পর্ব ৯) • বাংলা অনুবাদ: দীপ মন্ডল

সালমান রুশদির মিডনাইটস চিলড্রেন (পর্ব ১) • বাংলা অনুবাদ: দীপ মন্ডল
পুস্তক ১ • অধ্যায় ৪ • পর্ব ১

গালিচার তলায়

UNDER THE CARPET

ব্যাস, আশাবাদের সেই মহামারির ওখানেই একেবারে ইতি ঘটল। সকালবেলা একজন ঝাড়ুদারনি ফ্রি ইসলাম কনভেনশনের অফিসে ঢুকে দেখল, হামিংবার্ড মেঝেতে পড়ে আছেন, একেবারে নিশ্চুপ, আর তাঁর চারপাশ ঘিরে রয়েছে অজস্র থাবার ছাপ আর তাঁর খুনিদের ফালাফালা হয়ে যাওয়া শরীরের টুকরো। সে তো ভয়ে আর্তনাদ করেই উঠল; কিন্তু পরে, কর্তাব্যক্তিরা এসে সব দেখেটেখে চলে যাওয়ার পর, তাকেই ঘরটা সাফ করার হুকুম দেওয়া হলো। রাশি রাশি কুকুরের লোম ঝাঁট দিয়ে, অগুনতি এঁটুলি পোকা পিটিয়ে মেরে আর কার্পেটের ভেতর থেকে চুরমার-হয়ে-যাওয়া একটা কাচের চোখের টুকরো খুঁটে বের করার পর, সে ইউনিভার্সিটির কাজের তদারকিতে থাকা কন্ট্রোলারকে গিয়ে রীতিমতো নালিশ ঠুকল যে, এমন কাণ্ডকারখানা যদি রোজ রোজ ঘটতেই থাকে, তবে তার মাইনেটা অন্তত একটুখানি বাড়ানো উচিত। সে-ই বোধহয় ছিল ওই আশাবাদের পোকার কামড়-খাওয়া শেষ শিকার, আর তার বেলায় এই ব্যামোটা খুব বেশিদিন টিকলও না, কারণ কন্ট্রোলার লোকটা ছিল বড্ড কড়া ধাতের, আর সে তাকে সটান কাজ থেকে বিদেয় করে দিল।
     ওই গুপ্তঘাতকদের আর কখনোই শনাক্ত করা যায়নি, আর যারা টাকা দিয়ে তাদের ভাড়া করেছিল, তাদের নামও কোনোদিন প্রকাশ্যে আসেনি। ব্রিগেডিয়ার ডডসনের এ.ডি.সি. মেজর জুলফিকার আমার দাদুকে ক্যাম্পাসে ডেকে পাঠালেন, তাঁরই দোস্তের ডেথ সার্টিফিকেট লিখে দেওয়ার জন্য। মেজর জুলফিকার কথা দিলেন যে, বাকি থাকা দু-একটা খুচরো কাজের হিসেব মেটাতে তিনি পরে ডাক্তার আজিজের সঙ্গে দেখা করে নেবেন; আমার দাদু স্রেফ একবার নাক ঝেড়ে সেখান থেকে বেরিয়ে এলেন।
     ওদিকে ময়দানে তখন চুপসে-যাওয়া আশার মতো শামিয়ানাগুলো একে একে খুলে ফেলা হচ্ছে; কনভোকেশনের ওই আসর আর কোনোদিনই বসবে না। কুচ নহীনের রানি একেবারে শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন। সারাজীবন ধরে নিজের রোগব্যাধিগুলোকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার পর, এবার তিনি সেগুলোকে নিজের শরীরের দখল নেওয়ার সুযোগ ছেড়ে দিলেন, আর বছরের পর বছর ধরে ওই বিছানায় নিশ্চল হয়ে শুয়ে শুয়ে দেখতে লাগলেন, কীভাবে তাঁর নিজের গায়ের রং একটু একটু করে বিছানার চাদরের মতো সাদা হয়ে যাচ্ছে। আর এদিকে, কর্নওয়ালিস রোডের সেই পুরোনো বাড়িটায় দিনগুলো তখন হবু-মা আর সম্ভাব্য-বাবাদের নানা কাণ্ডকারখানায় একেবারে ভরপুর হয়ে উঠেছে। বুঝলে পদ্মা: এবার তুমি সবটা জানতে পারবে।
     নিজের নাকটাকে কাজে লাগিয়ে (কারণ, যে-ক্ষমতার জোরে এই তো সেদিনও সে রীতিমতো ইতিহাস গড়ে তুলেছিল, তা আজ খোয়া গেলেও তার বদলে সে ক্ষতিপূরণ হিসেবে অন্য বেশ কিছু গুণাবলি জুটিয়ে নিয়েছে)—নাকটাকে ভেতরের দিকে ঘুরিয়ে আমি শুঁকে শুঁকে পরখ করছিলাম, ভারতের সেই গুনগুন-করা আশার প্রদীপের মৃত্যুর পর আমার দাদুর বাড়ির সে-সময়ের হাওয়াটা ঠিক কেমন ছিল; আর এতগুলো বছরের গণ্ডি পেরিয়ে আমার কাছে ভেসে আসছিল এক অদ্ভুত, জগাখিচুড়ি গোছের গন্ধ, ভারী অস্বস্তিতে ভরা, লুকিয়ে-রাখা নানা জিনিসের গন্ধের সঙ্গে সেখানে এসে মিশেছিল সদ্য-কুঁড়ি-ধরা একটা প্রেমের সুবাস, আর তার পাশাপাশি আমার দিদিমার অদম্য কৌতূহল আর মনের জোরের এক ঝাঁজালো গন্ধ… ঠিক যে-সময়টায় মুসলিম লিগ তাদের শত্রুর পতনে রীতিমতো ফুর্তিতে মেতে উঠেছে, তা অবশ্য বেশ চুপিচুপিই, সে-সময় আমার দাদুকে দেখা যেত (আমার নাকই তাঁকে ঠিক খুঁজে বের করেছে) রোজ সকালে নিজের সেই ‘থান্ডারবক্স’-এর (তিনি ওটাকে ওই নামেই ডাকতেন) ওপর বসে থাকতে, আর তাঁর দু-চোখ তখন জলে থইথই করছে। তবে এ-জল কিন্তু কোনো শোকের অশ্রু নয়; আদম আজিজ স্রেফ ভারতীয় হয়ে-ওঠার মাশুল গুনছিলেন, আর কোষ্ঠকাঠিন্যের চোটে তাঁর তখন একেবারে ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা। ভারী করুণ আর গোমড়া মুখে তিনি টয়লেটের দেওয়ালে ঝুলতে-থাকা সেই এনিমা-যন্ত্রটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতেন।
     আমি খামোকা আমার দাদুর এমন একান্ত ব্যক্তিগত পরিসরে অনধিকার প্রবেশ করতে গেলাম কেন? মিঞা আবদুল্লার মৃত্যুর পর কীভাবে আদম নিজেকে পুরোপুরি কাজের মধ্যে ডুবিয়ে দিয়েছিলেন, ইউনিভার্সিটির চিকিৎসকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি কীভাবে তিনি রেললাইনের ধারের ওই বস্তির রুগিদের সেবার ভার নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন—যে-সব হাতুড়ে ডাক্তার ওদের শরীরে গোলমরিচ-গোলা জল ইঞ্জেকশন হিসেবে ঢুকিয়ে দিত আর ভাবত ভাজা মাকড়সা খাওয়ালেই বুঝি অন্ধত্ব সেরে যায়, তাদের হাত থেকে ওই মানুষগুলোকে কীভাবে তিনি বাঁচিয়েছিলেন—সে-সব কথা না-বলে আমি কেন এই কাজ করতে গেলাম? আমি তো দিব্যি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বলতে পারতাম আমার দাদু আর তাঁর মেজো মেয়ে মুমতাজের মধ্যে একটু একটু করে গড়ে-ওঠা সেই নিবিড় ভালোবাসার কথা; গায়ের ওই চাপা রঙের জন্যই মুমতাজ তার মায়ের স্নেহ থেকে বরাবর বঞ্চিত ছিল, কিন্তু তার স্বভাবের নম্রতা, যত্ন আর পেলবতার গুণেই সে তার বাবার বড্ড আদরের হয়ে উঠেছিল, বাবার ভেতরের সেই যন্ত্রণাক্লিষ্ট সত্তাটা যেন ঠিক তারই মতো এমন এক নিঃশর্ত মমতার পরশ পেতেই হাহাকার করত। কিংবা যখন কিনা আমি তাঁর নাকের ডগায় তখন-সর্বক্ষণের-সঙ্গী-হয়ে-ওঠা সেই কুটকুটানিটার কথা বর্ণনা করতে পারতাম, তা না করে আমি কেন শুধু শুধু ওই মলমূত্রের ঘাঁটাঘাঁটিতেই মশগুল হয়ে রইলাম? কারণটা হলো, ওই ডেথ সার্টিফিকেটে সই করে আসার পরের দিন দুপুরবেলায় আদম আজিজ তো ঠিক এখানেই বসে ছিলেন, যখন আচমকাই একটা গলা—ভারী নরম, ভীতু, কুণ্ঠিত, কোনো এক ছন্দহীন কবির গলা—ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো পেল্লায় ওই ময়লা-কাপড় রাখার কাঠের বাক্সটার একেবারে ভেতর থেকে তাঁর সঙ্গে কথা বলে উঠেছিল, আর তাতে তিনি এমন সাঙ্ঘাতিক এক জবরদস্ত চমক খেয়েছিলেন যে তাতে তাঁর পেটটা একেবারে আলগা হয়ে গেছিল, ফলে ওই এনিমা-যন্ত্রটাকে খামোকা আর পেড়ে আনার দরকারই পড়ল না। রিকশাওয়ালা ছোকরা রাশিদ মেথরদের যাতায়াতের রাস্তা দিয়ে নাদির খানকে সেই থান্ডারবক্স-ওয়ালা ঘরে ঢুকিয়ে দিয়েছিল, আর তিনি সোজা গিয়ে ওই ময়লা কাপড়ের বাক্সটায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। অবাক বিস্ময়ে আমার দাদুর মলদ্বার যখন শিথিল হয়ে এল, ঠিক তখনই তাঁর কানে ভেসে এল আশ্রয় ভিক্ষার একটা কাতর আর্জি, — সেই আর্তি চাপা পড়ে যাচ্ছিল সব ময়লা চাদর, নোংরা অন্তর্বাস, পুরোনো জামাকাপড় আর খোদ বক্তার লজ্জায় জড়সড় অবস্থায়। আর ঠিক এভাবেই আদম আজিজ, নাদির খানকে লুকিয়ে রাখার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেললেন।
     এবার একটা ঝগড়ার গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে, কারণ রেভারেন্ড মাদার নাসিম তাঁর তিন মেয়েকে নিয়ে বেশ চিন্তায় পড়েছেন। একুশ বছর বয়সী আলিয়া, বছর উনিশের কালো-বরণ কন্যা মুমতাজ; আর সুন্দরী চঞ্চলা এমেরাল্ড, বয়স পনেরোর গণ্ডি না পেরোলেও যার চোখের চাউনিতে ছিল তার দিদিদের চেয়েও ঢের বেশি বয়সের একটা ছাপ। শহরের ভেতর, পিকদানিতে-পিক-ফেলা লোকজন আর রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে সিনেমা-পোস্টারের ঠেলাগাড়ি টানা লোক কি কলেজের ছাত্র—সবার কাছেই ওই তিন বোন ‘তিন বাত্তি’ বা তিনটে উজ্জ্বল আলো বলে পরিচিত ছিল... আর রেভারেন্ড মাদার কী করেই-বা এমন এক অচেনা-অজানা পুরুষমানুষকে আলিয়ার ওই গাম্ভীর্য, মুমতাজের সেই কালো-মানিক ত্বক কিংবা এমেরাল্ডের অমন চোখের চাউনির সঙ্গে এক ছাদের তলায় থাকতে দেবেন? ... ‘আপনার মাথাটাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি! ওই মৃত্যুর ঘটনাটা তোমার মগজে ভালোই ধাক্কা দিয়েছে দেখছি।’ কিন্তু আজিজ একেবারে নাছোড়বান্দা: ‘ও এখানেই থাকবে।’ মাটির তলার সেই ঘরগুলোতে... ভারতবর্ষে বাড়িঘর বানানোর ক্ষেত্রে গুপ্তস্থানের ব্যাপারটা বরাবরই খুব জরুরি একটা দিক বলে মানা হতো, আর তাই আজিজের বাড়িতেও মাটির তলায় বেশ বড়োসড়ো একটা ব্যবস্থা ছিল, যেখানে পৌঁছোনোর রাস্তাটা ছিল স্রেফ মেঝের ওপরের চোরাদরজা দিয়ে, যেগুলো আবার কার্পেট আর মাদুর দিয়ে ঢাকা থাকত... নাদির খান ওপর থেকে আসা ঝগড়ার ওই চাপা আওয়াজটা শুনতে পাচ্ছিলেন, আর নিজের কপালের কথা ভেবে সিঁটিয়ে যাচ্ছিলেন। ইয়া খোদা (ওই ঘর্মাক্ত-হাতের কবির ভাবনাগুলো আমি শুঁকে শুঁকে টের পাচ্ছিলাম), দুনিয়াটা একেবারে পাগল হয়ে গেছে... এ-দেশে আমরা কি আদৌ মানুষ? নাকি সব জানোয়ার? আর আমাকে যদি এখান থেকে যেতেই হয়, তাহলে ছুরিগুলো কখন আমার খোঁজে ধেয়ে আসবে? ... আর তাঁর মনের ভেতর দিয়ে তখন ভেসে যাচ্ছিল সেই ময়ূরের পালকের হাতপাখা ও কাচের মধ্যে দিয়ে দেখা সেই একফালি নতুন চাঁদের টুকরো, যেটা কিনা পালটে গিয়ে রক্তে-মাখামাখি একটা কোপ-মারা ছুরির ফলা হয়ে উঠেছে… ওপরে রেভারেন্ড মাদার তখনও বলে চলেছেন, ‘বাড়িটা জোয়ান-জোয়ান সব আইবুড়ো মেয়েতে ভরা, কী-যেন-বলে; এইভাবেই আপনি আপনার মেয়েদের ইজ্জত-আব্রু রক্ষা করছেন?’ আর ঠিক তখনই ছড়িয়ে পড়ল মেজাজ বিগড়ে যাওয়ার একটা ঝাঁজালো গন্ধ; আদম আজিজের সেই সাঙ্ঘাতিক বিধ্বংসী রাগটা যেন আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল, আর নাদির খান যে মাটির তলায় থাকবে, কার্পেটের তলায় লুকিয়ে থাকবে, যেখান থেকে মেয়েদের সম্মান নষ্ট করার সুযোগ তার প্রায় থাকবেই না—সে-কথাটা একবার বুঝিয়ে বলার বদলে; ওই ক্রিয়াপদ-বর্জিত কবির শালীনতাবোধের যে কতখানি বহর, যা কিনা এতটা উন্নত যে ঘুমের ঘোরে লজ্জায় লাল না-হয়ে সে বেচারি কোনো অশালীন কাজের কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারবে না—সে-কথায় জোর দেওয়ার বদলে; যুক্তির এই সোজাপথগুলো দিয়ে না-হেঁটে, আমার দাদু একেবারে সপাটে হুংকার দিয়ে উঠলেন, ‘চুপ করো বলছি! লোকটার এখন আমাদের আশ্রয়ের বড়ো দরকার; সে এখানেই থাকবে।’ আর এ-কথার পরেই একটা অনড়, কঠিন সংকল্পের ভারী মেঘ আমার দিদিমার ওপর চেপে বসল, তিনি বলে উঠলেন, ‘খুব ভালো। আপনি আমাকে, কী-যেন-বলে, চুপ করে থাকতে বলছেন। তাহলে আজ থেকে, কী-যেন-বলে, আমার মুখ দিয়ে আর একটা টুঁ-শব্দও বেরোবে না।’ আর আজিজ গোঙানোর মতো করে বলে উঠলেন, ‘ওহ, জাহান্নামে যাক, তোমার যত্তসব আজাইরা কসমের হাত থেকে এবার অন্তত আমাদের অন্তত রেহাই দাও!’
     কিন্তু রেভারেন্ড মাদারের মুখে তখন একেবারে কুলুপ, আর চারধারে নেমে এল এক নিরেট নিস্তব্ধতা। পচা হাঁসের ডিমের মতো সেই নৈঃশব্দ্যের গন্ধ আমার নাক ভরিয়ে দিল; অন্য সব কিছুকে ছাপিয়ে তা যেন গোটা দুনিয়াটারই দখল নিয়ে নিল... নাদির খান যখন তাঁর সেই আধো-অন্ধকার পাতালে ঘাপটি মেরে বসে রইলেন, ওদিকে বাড়ির গিন্নিও তখন ওই শব্দহীনতার এক কান-ফাটানো দেওয়ালের পেছনে নিজেকে লুকিয়ে ফেললেন। প্রথমটায় আমার দাদু দেওয়ালটার গায়ে একটু-আধটু ফাটল খোঁজার চেষ্টা করেছিলেন; কিন্তু কোথাও কিছু পেলেন না। শেষমেশ তিনি হাল ছেড়ে দিলেন, আর দিদিমার কথার মধ্যে দিয়ে তাঁর মনের একটুখানি ঝলক পাওয়ার আশায় দিন গুনতে লাগলেন, ঠিক যেমনটা একসময় ফুটো-করা চাদরের মধ্যে দিয়ে দেখা তাঁর শরীরের সামান্য একটুখানি অংশ পাওয়ার জন্য তিনি পাগলপারা হয়ে থাকতেন; আর সেই নিস্তব্ধতা গোটা বাড়িটাকে এমনভাবে ভরিয়ে তুলল এক দেওয়াল থেকে অন্য দেওয়ালে, মেঝে থেকে ছাদ অবধি, যে, মাছিগুলোও যেন ভনভন করা ছেড়ে দিল, আর মশাগুলোও কামড়ানোর আগে তাদের ওই গুনগুনানিটা একেবারে বন্ধ করে দিল; উঠোনের রাজহাঁসগুলোর হিসহিস শব্দও যেন সেই নৈঃশব্দ্যের চোটে থমকে গেল। বাড়ির বাচ্চারা প্রথমটায় ফিসফিস করে কথা বলত, আর তারপর একেবারে চুপ মেরে গেল: আর ঠিক সেই সময়েই ভুট্টাখেতের ভেতর, রিকশাওয়ালা ছোকরা রাশিদ তার সেই বোবা ‘ঘৃণামাখানো চিৎকার’ ছুড়ে দিল, আর আপন মায়ের চুল স্পর্শ করে যে মৌনব্রতের কসম সে খেয়েছিল তা দিব্যি পালন করে চলল।
     নৈঃশব্দ্যের এই পাঁকজলার মধ্যে একদিন সন্ধ্যায় এমন এক বেঁটেখাটো লোকের আবির্ভাব হলো, যাঁর মাথাটা ছিল তাঁর মাথার টুপির মতোই চ্যাপ্টা; আর পা দুটো ছিল বাতাসে দোলা খাগড়ার মতো ধনুকের আকারে বাঁকা; নাকখানা এমন যে তা ওপর-পানে বাঁকানো চিবুকটাকে প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছে; আর সে কারণে তাঁর গলার স্বর ছিল ভারী সরু ও তীক্ষ্ণ—তেমনটা হওয়াই তো স্বাভাবিক, তাঁর ওই শ্বাস নেওয়ার যন্ত্র আর চোয়ালের মাঝখানের ওইটুকু সরু ফাঁক গলে স্বর বেরোতে হলে তো আওয়াজটাকে অমন হতেই হবে... সে এমনই এক মানুষ যাঁর ক্ষীণ দৃষ্টিশক্তির কারণে তাঁকে জীবনের পথে পা ফেলতে হতো বড্ড মেপে মেপে, একবারে এক-পা এক-পা করে মেপে, আর এর জেরেই তিনি যেমন খুঁতখুঁতে তেমনই একঘেয়ে নীরস বলে বেশ নামডাক কামিয়েছিলেন, আর এই কারণেই তিনি তাঁর ওপরওয়ালাদের কাছে ভারী আদরের পাত্র হয়ে উঠেছিলেন, কারণ তাঁকে দিয়ে তাঁরা কোনো বিশেষ ঝুটঝামেলা ছাড়াই পদমর্যাদা রক্ষা করে নিজেদের কাজটা দিব্যি হাসিল করে নিতে পারতেন; এমন এক মানুষ যাঁর ইস্ত্রি-করা মাড়-দেওয়া উর্দি থেকে ব্লাঙ্কো আর সততার গন্ধ ভুরভুর করত, আর যাঁর ওই পুতুলনাচের আসর থেকে উঠে-আসা কোনো চরিত্রের মতো চেহারা হওয়া সত্ত্বেও, তাঁর চারপাশে একটা অব্যর্থ সাফল্যের সুবাস লেগেই থাকত: মেজর জুলফিকার—যাঁকে দেখলেই মনে হয় ভবিষ্যৎটা বেশ তোফা, কথা মতো কিছু অসমাপ্ত কাজের হিসেব মেটাতে এসে হাজির হলেন।
     আবদুল্লার খুন, আর নাদির খানের অমন সন্দেহজনকভাবে গায়েব হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা তাঁর মাথায় বেশ ঘুরপাক খাচ্ছিল, আর যেহেতু আদম আজিজ যে ওই আশাবাদের পোকার কামড় খেয়েছিলেন সে-কথা তাঁর জানা ছিল, তাই তিনি বাড়ির ওই নিস্তব্ধতাটাকে শোকের নীরবতা বলে ভুল করলেন, আর খুব বেশিক্ষণ সেখানে টিকলেন না। (মাটির তলার ঘরে, নাদির তখন আরশোলাদের সঙ্গে গুটিসুটি মেরে পড়ে আছেন।) ড্রয়িংরুমে পাঁচ ছেলেমেয়ের সঙ্গে চুপচাপ বসে থাকতে থাকতে, নিজের টুপি আর ছড়িটা টেলিফাঙ্কেন রেডিওগ্রামের ওপর পাশে নামিয়ে রেখে, আর দেওয়াল থেকে চেয়ে থাকা আজিজ পরিবারের ছোটোদের প্রমাণ সাইজের ছবিগুলোর দিকে তাকাতে তাকাতে, মেজর জুলফিকার একেবারে প্রেমে পড়ে গেলেন। তিনি চোখে একটু কম দেখতে পারেন ঠিকই, কিন্তু একেবারে অন্ধ তো আর নন, আর ওই ‘তিন বাত্তি’র সবচেয়ে উজ্জ্বল আলো, ছোটো এমেরাল্ডের বয়সের তুলনায় অসম্ভব পরিণত একটা চাউনির মধ্যে তিনি স্পষ্ট দেখতে পেলেন যে মেয়েটি তাঁর ভবিষ্যতের ব্যাপারটা ঠিক আঁচ করতে পেরেছে, আর ওই ভবিষ্যতের খাতিরেই মেয়েটি তাঁর এই কিম্ভূতকিমাকার চেহারাটাকে দিব্যি মাপ করে দিয়েছে; আর সেদিন বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার আগেই তিনি মনে মনে ঠিক করে ফেললেন যে একটা মানানসই সময় পেরোলেই তিনি ওকে বিয়ে করবেন। (‘ও?’ পদ্মা একটু আন্দাজ করার চেষ্টা করে। ‘ওই বেহায়া মেয়েটা তোমার মা নাকি?’ কিন্তু এই নিস্তব্ধতার মধ্যে দিয়ে তো আরও কত হবু-মা, আরও কত ভবিষ্যৎ-বাবারা আনাগোনা করছে।)
পূর্ববর্তী পর্ব পড়ুন এখানে: [মধ্যরাতের সন্তানেরা]

মধ্যরাতের সন্তানেরা
সালমান রুশদি
অনুবাদ: দীপ মন্ডল




মন্তব্য

অনুবাদ আত্মজীবনী আর্ট-গ্যালারী আলোকচিত্র ই-বুক ইচক দুয়েন্দে ইশতেহার উৎপলকুমার বসু উপন্যাস ঋত্বিক-ঘটক কবিতা কবিতায় কুড়িগ্রাম কর্মকাণ্ড কার্ল মার্ক্স গল্প গিন্সবার্গ চার্লস বুকাওস্কি ছড়া জার্নাল জীবনী দশকথা দিনলিপি পাণ্ডুলিপি পুনঃপ্রকাশ পোয়েটিক ফিকশন প্রতিবাদ প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা প্রবন্ধ প্রিন্ট সংখ্যা বই বর্ষা সংখ্যা বসন্ত বিক্রয়বিভাগ বিবিধ বিবৃতি বিশেষ বুলেটিন বৈশাখ ভাষা-সিরিজ ভিডিও মাসুমুল আলম মুক্তগদ্য মে দিবস যুগপূর্তি রিভিউ লকডাউন শম্ভু রক্ষিত শাহেদ শাফায়েত শিশুতোষ সন্দীপ দত্ত সম্পাদকীয় সাক্ষাৎকার সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ সৈয়দ সাখাওয়াৎ স্মৃতিকথা হেমন্ত
নাম

অনুবাদ,66,আত্মজীবনী,27,আর্ট-গ্যালারী,2,আলোকচিত্র,1,ই-বুক,7,ইচক দুয়েন্দে,23,ইশতেহার,2,উৎপলকুমার বসু,26,উপন্যাস,10,ঋত্বিক-ঘটক,5,কবিতা,349,কবিতায় কুড়িগ্রাম,7,কর্মকাণ্ড,18,কার্ল মার্ক্স,1,গল্প,86,গিন্সবার্গ,2,চার্লস বুকাওস্কি,40,ছড়া,1,জার্নাল,8,জীবনী,7,দশকথা,25,দিনলিপি,1,পাণ্ডুলিপি,11,পুনঃপ্রকাশ,24,পোয়েটিক ফিকশন,1,প্রতিবাদ,1,প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা,4,প্রবন্ধ,194,প্রিন্ট সংখ্যা,5,বই,4,বর্ষা সংখ্যা,1,বসন্ত,15,বিক্রয়বিভাগ,21,বিবিধ,3,বিবৃতি,1,বিশেষ,26,বুলেটিন,4,বৈশাখ,1,ভাষা-সিরিজ,5,ভিডিও,1,মাসুমুল আলম,35,মুক্তগদ্য,45,মে দিবস,1,যুগপূর্তি,6,রিভিউ,5,লকডাউন,2,শম্ভু রক্ষিত,2,শাহেদ শাফায়েত,25,শিশুতোষ,1,সন্দীপ দত্ত,14,সম্পাদকীয়,20,সাক্ষাৎকার,26,সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ,18,সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ,55,সৈয়দ সাখাওয়াৎ,33,স্মৃতিকথা,15,হেমন্ত,1,
ltr
item
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন: সালমান রুশদির মিডনাইটস চিলড্রেন (পর্ব ৯) • বাংলা অনুবাদ: দীপ মন্ডল
সালমান রুশদির মিডনাইটস চিলড্রেন (পর্ব ৯) • বাংলা অনুবাদ: দীপ মন্ডল
মধ্যরাতের সন্তানেরা • সালমান রুশদির বুকারজয়ী উপন্যাস মিডনাইটস চিলড্রেন-এর বাংলা অনুবাদ করেছেন দীপ মন্ডল৷
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEgeRgp7MV3MVjqdWQPggKmrClfDaNWkTe904uIJl0sgQrdxlrfbiRislYW-ZvIBYZwiH1DRyUuKu7h9sjp1t6n5ZK7LCabxeNkcRaAu3lEsXyiE3ArUMz-1EWiStFZ4cm_O5bNsMWBk9mwLwPtNZ6aW8c0AgehsYz0lXOZ-0CG68AgShSTQkWU-wGvxrHs/s1600/%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%A1%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%9F%E0%A6%B8%20%E0%A6%9A%E0%A6%BF%E0%A6%B2%E0%A6%A1%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%A8%20%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A8%20%E0%A6%B0%E0%A7%81%E0%A6%B6%E0%A6%A6%E0%A6%BF%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%81%20%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%9F%E0%A6%B2%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%97.png
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEgeRgp7MV3MVjqdWQPggKmrClfDaNWkTe904uIJl0sgQrdxlrfbiRislYW-ZvIBYZwiH1DRyUuKu7h9sjp1t6n5ZK7LCabxeNkcRaAu3lEsXyiE3ArUMz-1EWiStFZ4cm_O5bNsMWBk9mwLwPtNZ6aW8c0AgehsYz0lXOZ-0CG68AgShSTQkWU-wGvxrHs/s72-c/%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%A1%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%9F%E0%A6%B8%20%E0%A6%9A%E0%A6%BF%E0%A6%B2%E0%A6%A1%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%A8%20%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A8%20%E0%A6%B0%E0%A7%81%E0%A6%B6%E0%A6%A6%E0%A6%BF%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%81%20%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%9F%E0%A6%B2%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%97.png
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন
https://www.bindumag.com/2026/08/midnights-children-9.html
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/2026/08/midnights-children-9.html
true
121332834233322352
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts আরো Readmore উত্তর Cancel reply মুছুন By নী PAGES POSTS আরো এই লেখাগুলিও পড়ুন... বিষয় ARCHIVE SEARCH সব লেখা কোন রচনায় খুঁজে পাওয়া গেল না নীড় Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share to a social network STEP 2: Click the link on your social network Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy