.header-button .inner > span { font-size: 18px !important; } .header-button .inner i.fa { font-size: 40px !important; } .comment-form-message { background-color: #f4f4f4 !important; font-size: 14px !important; }

$type=ticker$count=12$cols=4$cate=0$sn=0$show=post

সালমান রুশদির মিডনাইটস চিলড্রেন (পর্ব ৭) • বাংলা অনুবাদ: দীপ মন্ডল

 সালমান রুশদির মিডনাইটস চিলড্রেন (পর্ব ১) • বাংলা অনুবাদ: দীপ মন্ডল
পুস্তক ১ • অধ্যায় ৩ • পর্ব ১

পিকদানিতে আঘাত কর

Hit-the-Spitton

বিশ্বাস করুন, আমি ভেঙে পড়ছি, ভেতরে ভেতরে সত্যিই ভেঙে পড়ছি।
     না, আমি কোনো রূপক বা উপমার আড়াল নিয়ে কথাগুলো বলছি না; এমনকি আমার এইসব কথাবার্তাকে আপনাদের সহানুভূতি আদায়ের জন্য কোনো অতি-নাটকীয়, হেঁয়ালিভরা, নোংরা ভণিতা পাঁয়তারা ভেবে নেবেন না। সহজ কথায় বলতে গেলে, একটা পুরোনো জগের মতো আমার সারা গায়ে ফাটল ধরতে শুরু করেছে—আমার এই বেচারা, একলা, ছিরিছাঁদহীন শরীরটা; ইতিহাসের বিস্তর ঝাপটায় যা ঘা খেয়েছে, ওপর আর নিচ—দু-দিক থেকেই যার বিস্তর ক্ষরণ হয়েছে, দরজার পাল্লায় চাপা পড়ে যা জখম হয়েছে, আর পিকদানির ঘায়ে যার মাথা ফেটেছে, এখন যেন তার সেলাইয়ের জোড়গুলো আলগা হয়ে খসে পড়তে শুরু করেছে। এককথায়, আমি আক্ষরিক অর্থেই খান খান হয়ে যাচ্ছি; আপাতত ব্যাপারটা একটু ধীরগতিতে চললেও, এর তেজ যে ক্রমশ বাড়ছে তার স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। আমি শুধু চাই আপনারাও এ-কথাটা মেনে নিন (ঠিক যেমনটা আমি নিজে মেনে নিয়েছি) যে, শেষমেশ আমি গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে (প্রায়) তেষট্টি কোটি নামগোত্রহীন, আর খুব স্বাভাবিকভাবেই, বিস্মৃতিতে-তলিয়ে-যাওয়া ধূলিকণায় মিশে যাব। আর ঠিক এই কারণেই, আমি সব ভুলে যাওয়ার আগে, কাগজের বুকে আমার এই কথাগুলো উজাড় করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। (আমরা হলাম গিয়ে সবকিছু বেমালুম ভুলে-মেরে-দেওয়া এক জাত।)
     মাঝে মাঝে সাঙ্ঘাতিক একটা আতঙ্ক এসে গ্রাস করে বটে, তবে সেটা আবার কেটেও যায়। সমুদ্রের তলার কোনো বুদবুদ-কাটা জানোয়ারের মতো বুকের ভেতরের ত্রাসটা যেন একটুখানি হাঁফ ছাড়ার জন্য ওপরে উঠে আসে, ওপরের দিকটায় বেশ কিছুক্ষণ টগবগ করে ফোটে, কিন্তু শেষমেশ ঠিকই সেই পানির অতলেই আবার তলিয়ে যায়। এখন আমার শান্ত থাকাটা বড্ড জরুরি। আমি সুপারি চিবোই আর সস্তার একখানা পেতলের বাটির দিকে তাক করে পিক ফেলি, যেন সেই পিকদানিতে-পিক-ফেলার পুরোনো খেলাটায় মেতে উঠেছি: নাদির খানের খেলা, যা সে আগ্রার বুড়োদের কাছ থেকে শিখেছিল... আর আজকাল তো বাজারে ‘রকেট পান’ কিনতেও পাওয়া যায়, যার ভেতর পানের ওই মাড়ি-লাল-করা মশলার সঙ্গেই স্রেফ একটা পাতার ভাঁজে লুকোনো থাকে কোকেনের আরাম। কিন্তু ওটা করলে যে বাপু একরকমের লক-ঠকানো ব্যাপার হয়ে যায়।
     ...আমার এই লেখার পাতাগুলো থেকে চাটনির এক চেনা গন্ধ যেন ভুরভুর করে উঠে আসছে। তাই আর কোনো ভণিতা না করেই বলি: আমি, সালিম সিনাই, ইতিহাসের সবচেয়ে সংবেদনশীল আর জাদুকরী ঘ্রাণযন্ত্রের অধিকারী এক মানুষ, নিজের এই শেষ বয়সটা পুরোদস্তুর আচার আর চাটনি তৈরির কাজেই সঁপে দিয়েছি। কিন্তু এ-কথা শুনেই এখন, ‘একজন রাঁধুনি?’ বলে আপনারা আতঙ্কে একেবারে আঁতকে উঠবেন, ‘নেহাতই একজন খানসামা? তা কী করে হয়?’ আর আমি এ-কথা মানছি যে, একইসঙ্গে রান্নাবান্না আর ভাষার ওপর এমন অসামান্য দখল সত্যিই বড়ো একটা দেখা যায় না; কিন্তু আমার মধ্যে সেটার দিব্যি একটা মেলবন্ধন ঘটেছে। আপনারা অবাক হচ্ছেন বটে; কিন্তু ভেবে দেখুন, আমি তো আর ওই মাসে দু-শো টাকা মাইনের পাতি কোনো রাঁধুনি-ঠাকুর নই, আমি নিজেই নিজের মালিক, আর আমি কাজ করি আমার নিজস্ব নিয়ন-দেবীর গেরুয়া আর সবুজ রঙের মিটমিটে আলোর ঠিক নিচেই। তাছাড়া আমার এই চাটনি আর কাসুন্দিগুলোও, বলতে গেলে, আমার এই রাতের বেলার লেখালেখির সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে বাঁধা—দিনের বেলাটা কাটে ওই আচারের বয়ামের ভিড়ে, আর রাতটা কাটে এই কাগজের পাতাগুলোর মাঝে, আর এভাবেই বাঁচিয়ে রাখার এক বিরাট কর্মকাণ্ডে আমি আমার সময়টা পার করে দিই। ঠিক ওই ফলের মতোই, স্মৃতিগুলোকেও তো সময়ের করাল গ্রাস থেকে সযত্নে বাঁচিয়ে রাখা হচ্ছে।
     কিন্তু এই তো পদ্মা আমার কনুইয়ের কাছে দাঁড়িয়ে, আমাকে জোর করে আবার ওই সোজা ছকের গল্পের দুনিয়ায়—‘তারপর-কী-হলো’-র জগতে টেনে নামানোর ধান্দায় আছে: ‘এমনি করে চললে তো,’ পদ্মা ঘ্যানঘ্যান করে ওঠে, ‘নিজের জন্মের কথাটা বলে ওঠার আগেই তোমার বয়স দু-শো বছর পেরিয়ে যাবে।’ সে বেশ একটা উদাসীন ভাব দেখাচ্ছে, আমার দিকে বেশ তাচ্ছিল্যের সঙ্গেই কোমরটা একটু বাঁকিয়ে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু আমাকে বোকা বানানো অত সহজ নয়। আমি এখন বেশ বুঝতে পারছি যে, মুখে হাজার আপত্তি করলেও, সে আসলে গল্পটায় একেবারে মজে গেছে। এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহই নেই: আমার গল্প ওকে একেবারে গিলে ফেলছে, আর তাই আচমকাই সে আমাকে বাড়ি যাওয়ার জন্য, বারবার স্নান করার জন্য, ভিনিগারের দাগ-লাগা জামাকাপড় ছাড়ার জন্য, এমনকী মশলাপাতির গন্ধে সব সময় ম ম করতে-থাকা এই আধো-অন্ধকার আচারের কারখানাটা এক মুহূর্তের জন্যও ছেড়ে যাওয়ার জন্য ঘ্যানঘ্যান করাটা একেবারে বন্ধ করে দিয়েছে... এখন আমার এই গোবর-দেবী স্রেফ এই অফিসের এক কোণে একটা খাটিয়া পেতে নিয়েছে আর দুটো কালচে-পড়া গ্যাস-ওভেনে আমার জন্য রান্নাবান্না করে, আর কেবল অ্যাঙ্গেলপয়েজ-এর আলোয় আমার এই লেখালেখির মাঝখানে বাগড়া দিয়ে বলে ওঠে, ‘তুমি বরং এবার একটু হাত চালাও, নইলে নিজের জন্মের কথা লেখার আগেই তুমি পটল তুলবে।’ একজন সফল গল্পকারের সেই স্বভাবসিদ্ধ অহংকারটাকে কোনোমতে গিলে ফেলে, আমি ওকে একটু জ্ঞান দেওয়ার চেষ্টা করি। ‘জিনিসপত্র—এমনকী মানুষজনেরও—একে অপরের মধ্যে চুঁইয়ে ঢোকার একটা প্রবণতা আছে,’ আমি বুঝিয়ে বলি, ‘ঠিক যেমন রান্নার সময় নানা মশলার স্বাদ একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়। এই যেমন ধরো, ইলসা লুবিনের আত্মহত্যার ব্যাপারটা চুঁইয়ে চুঁইয়ে বুড়ো আদমের ভেতর ঢুকে গিয়ে একেবারে ডোবার মতো জমে বসে ছিল, যতক্ষণ না তিনি খোদ ঈশ্বরের দেখা পেলেন। ঠিক তেমনিভাবে,’ আমি বেশ জোর দিয়ে বলি, ‘অতীতটাও চুঁইয়ে চুঁইয়ে আমার ভেতর এসে পড়েছে... তাই আমরা তো আর সেটাকে বেমালুম এড়িয়ে যেতে পারি না…’ কাঁধ ঝাঁকিয়ে সে আমার কথায় বাধা দেয়, আর তাতে ওর বুকের কাছটায় বেশ একটা মনোরম ঢেউ খেলে যায়। ‘এখনও যদি তুমি তোমার বাবা-মায়ের প্রথম দেখা হওয়ার ঘটনা অবধিই পৌঁছোতে না পারো…’ সে চেঁচিয়ে ওঠে, ‘তাহলে, নিজের জীবনের গল্প বলার তোমার এই ধরণটা কিন্তু আমার কাছে পাগলামো ছাড়া আর কিছুই মনে হচ্ছে না।’ 
     …আর এটা তো একেবারে সত্যি যে, পদ্মাও এখন একটু একটু করে আমার ভেতর চুঁইয়ে ঢুকছে। আমার এই ফাটল-ধরা শরীরটা থেকে যখন হুড়মুড় করে ইতিহাস নির্গত হচ্ছে, ঠিক তখনই আমার এই পদ্ম—তার সেই আটপৌরে ঘোর-বাস্তববোধ, তার স্ববিরোধী সব কুসংস্কার, আর অদ্ভুত-সব রূপকথার প্রতি তার সেই অবাক-করা টান নিয়ে বড্ড নিঃশব্দে আমার ভেতর চুঁইয়ে পড়ছে—তাই এবার যে আমি মিঞা আবদুল্লার মৃত্যুর গল্পটা শোনাতে চলেছি, সেটা বোধহয় এই মুহুর্তে বলাটাই একেবারে জুতসই ব্যাপার হবে। সেই হতভাগ্য হামিংবার্ড: আমাদের সময়ের এক জীবন্ত কিংবদন্তী।
     ...আর পদ্মা… মেয়েটা সত্যি বড্ড উদার, কারণ আমার এই শেষ দিনগুলোতেও ও আমার পাশেই পড়ে আছে, যদিও আমি ওর জন্য ছাই বিশেষ কিছুই করে উঠতে পারি না। ঠিকই ধরেছেন—আর নাদির খানের গল্পটা ফাঁদার আগে এ-কথাটা কবুল করে নেওয়া বেশ উচিত হবে যে—আমি আসলে পুরুষত্ব হারিয়েছি। পদ্মার ওই হরেক কিসিমের গুণপনা আর সেবাপরিচর্যা সত্ত্বেও, আমি ওর ভেতর চুঁইয়ে ঢুকতে পারি না; এমনকী ও যখন ওর বাঁ পা-খানা আমার ডান পায়ের ওপর তুলে দেয়, ডান পা দিয়ে আমার কোমরটা পেঁচিয়ে ধরে, আমার দিকে মুখটা উঁচু করে আদুরে গলায় বকম-বকম শব্দ করে, তখনও না; এমনকী ও যখন আমার কানে কানে ফিসফিস করে বলে, ‘লেখালেখির পাঠ তো চুকলো, এবার দেখি তোমার ওই অন্য পেনসিলটা দিয়ে কিছু কাজ করানো যায় কি না!’; ওর হাজারো চেষ্টা সত্ত্বেও, আমি ওর পিকদানিতে ঠিকঠাক নিশানা করে উঠতে পারি না। 
   যাক্‌ গে, অনেক গোপন কথা কবুল করা হলো। ‘এরপর-কী-হলো’ গোছের গল্প শোনার জন্য পদ্মার ওই নাছোড়বান্দা জবরদস্তির কাছে মাথা নুইয়ে, আর আমার হাতে যে সময় বড্ড মাপা সে-কথা মাথায় রেখে, আমি সেই মারকিউরোক্রোম থেকে একলাফে সোজা ১৯৪২ সালে গিয়ে নামছি। (আমিও আসলে আমার বাবা-মাকে এক জায়গায় মোলাকাত করিয়ে দিতে বেশ উসখুস করছি।)
     মনে হয়, সে-বছরের গ্রীষ্মের শেষদিকে আমার দাদু, ডাক্তার আদম আজিজ, সাঙ্ঘাতিক এক ধরনের আশাবাদের ব্যামোয় আক্রান্ত হয়েছিলেন। আগ্রার রাস্তায় সাইকেল চালিয়ে ঘোরার সময় তিনি বেশ তীক্ষ্ণ স্বরে শিস দিতেন; শিসটা বেসুরো হলেও, তার মধ্যে বড্ড একটা আনন্দের ছোঁয়া থাকত। এ-ব্যাপারে তিনি মোটেই একা ছিলেন না, কারণ, কর্তৃপক্ষ এই ব্যামোটাকে সমূলে উপড়ে ফেলার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও, সে-বছর সারা ভারতবর্ষ জুড়েই এই ছোঁয়াচে রোগটা হুড়মুড় করে ছড়িয়ে পড়ছিল, আর এটাকে বাগে আনার আগে বেশ কড়াকড়ি কিছু ব্যবস্থাও নিতে হয়েছিল। কর্নওয়ালিস রোডের মোড়ে পানের দোকানের বুড়োগুলো পান চিবোতে চিবোতে এর মধ্যে কোনো একটা ফন্দিফিকিরের গন্ধ পাচ্ছিল। ‘আমার যত দিন বাঁচার কথা, আমি তার চেয়েও দ্বিগুণ দিন বেঁচে আছি,’ সবচেয়ে বয়স্ক বুড়োটা বলল, তার গলাটা একটা পুরোনো রেডিওর মতো খড়খড় করছিল, কারণ তার স্বরনালির চারপাশে যেন কতগুলো দশকের বয়স একে অপরের সঙ্গে সমানে ঘষা খেয়ে যাচ্ছিল, ‘আর এমন একটা খারাপ সময়ে একসঙ্গে এত মানুষকে আমি কখনও এত ফুর্তিতে থাকতে দেখিনি। এ নিশ্চয়ই শয়তানের কারসাজি।’ সত্যি বলতে কী, ব্যারামটা ছিল বটে জাঁদরেল এক ভাইরাস—স্রেফ আবহাওয়াটার জন্যই এ-ধরনের জীবাণুর বংশবৃদ্ধি থমকে যাওয়া উচিত ছিল, কারণ ততদিনে এটা বেশ পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে এবার আর বৃষ্টি-বাদলার কোনো আশা নেই। মাটি ফেটে চৌচির হচ্ছিল। রাস্তার ধারের অংশগুলো ধুলোয় খেয়ে নিচ্ছিল, আর কোনো কোনো দিন পিচ-ঢালা রাস্তার মোড়ের মাঝখানেই পেল্লায় সব হাঁ-করা ফাটল দেখা দিচ্ছিল। পানের দোকানের ওই পান-খেকো বুড়োগুলো তখন অলুক্ষুণে সব লক্ষণ নিয়ে ফিসফাস শুরু করে দিয়েছিল; নিজেদের সেই পিকদানিতে-পিক-ফেলার খেলা দিয়ে মনটাকে শান্ত করার চেষ্টা করতে করতে, তারা এমন সব নাম-না-জানা অগুনতি ঈশ্বর-জানেন-কী-সব আপদের আঁচ করছিল, যেগুলো কিনা ওই ফাটল-ধরা মাটি থেকে যেকোনো দিন বেরিয়ে আসতে পারে। শোনা যায়, এক ভরদুপুরের কাঠফাটা রোদে সাইকেল-সাড়াইয়ের দোকানের এক শিখের মাথার পাগড়ি নাকি সটান মাথা থেকে ছিটকে পড়েছিল, কারণ কোনো কারণ ছাড়াই আচমকা তার মাথার চুলগুলো খাড়া হয়ে উঠেছিল। আর, আরও নেহাতই পাতি কথায় বলতে গেলে, পানির আকাল এমন একটা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল যে, দুধওয়ালারা দুধে ভেজাল মেশানোর জন্য একটু পরিষ্কার পানি অবধি আর খুঁজে পাচ্ছিল না… আর অনেক দূরে, তখন আবার একটা বিশ্বযুদ্ধ পুরোদমে চলছিল। আগ্রায় তখন গরমের পারদ সমানে চড়ছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমার দাদু অবলীলায় শিস দিয়ে যেতেন। চারপাশের এই হালহকিকতের মধ্যে পানের দোকানের বুড়োগুলোর কাছে তাঁর ওই শিস দেওয়ার ব্যাপারটা বড্ড বেমানান আর দৃষ্টিকটু ঠেকছিল।
     (আর আমিও, ঠিক তাদের মতোই, পিক ফেলি আর ওইসব ফাটল-টাটলের ঊর্ধ্বে উঠে যাই।)
     সাইকেলের ক্যারিয়ারে চামড়ার এটাচিটা আটকে নিয়ে, সাইকেলে সওয়ার হয়ে আমার দাদু দিব্যি শিস দিতে দিতে চলেছেন। নাকের সেই অস্বস্তিকর সুড়সুড়ি আছে বটে, তবু তাঁর ঠোঁটদুটো হয়ে আছে গোল। বুকের ওপর সেই যে কালশিটেটা দাগটা, গত তেইশটা বছর ধরে যেটা কিছুতেই মিলিয়ে যেতে চায়নি, কিন্তু তারপরেও তাঁর ফুরফুরে মেজাজে এতটুকুও ভাটা পড়েনি। ঠোঁটের ফাঁক গলে বাতাস বেরিয়ে এলেই তা কেমন যেন নিটোল সুরে পালটে যেত। তিনি শিস দিয়ে একটা পুরোনো জার্মান সুর ভাঁজছিলেন: টানেনবাউম। 
      এই যে আশাবাদের মহামারি, এর মূলে ছিলেন স্রেফ একজন মানুষ—যাঁর আসল নাম: মিঞা আবদুল্লা, তবে এই নামটা কেবল খবরের কাগজের লোকেরাই ব্যবহার করত। বাকি সবার কাছে তিনি ছিলেন স্রেফ হামিংবার্ড—এমন এক প্রাণী, যার অস্তিত্ব না থাকলে তাকে ঘোরতর মিথ্যে বা অসম্ভব বলেই মনে হত। খবরের কাগজের লোকেরা লিখত: ‘জাদুকর থেকে ভেলকিবাজ বনে যাওয়া মিঞা আবদুল্লা দিল্লির সেই বিখ্যাত জাদুকরদের বস্তি থেকে উঠে এসে এখন হিন্দুস্তানের দশ কোটি মুসলমানের শেষ ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছেন।’ এই হামিংবার্ড ছিলেন ফ্রি ইসলাম কনভোকেশনের প্রতিষ্ঠাতা, সভাপতি, রূপকার আর মূল চালিকাশক্তি। সেই ১৯৪২ সালে, আগ্রার ময়দানে বিশাল সব শামিয়ানা আর মঞ্চ খাটানো হচ্ছিল, কারণ সেখানেই কনভোকেশনের দ্বিতীয় বার্ষিক সভা বসার কথা ছিল। আমার বায়ান্ন বছর বয়সী দাদু, বয়সের ভারে আর অন্যান্য ঝক্কি ঝামেলা সামাল দিতে দিতে যাঁর মাথার চুল ততদিনে একেবারে সাদা হয়ে গিয়েছে, সেই ময়দান পেরোনোর সময় শিস দিতে শুরু করেছিলেন। এখন তিনি তাঁর সাইকেলে চড়ে রাস্তার মোড়গুলোয় বেশ একটা হেলেদুলে, ফুরফুরে মেজাজে বাঁক নিচ্ছিলেন, আর গোবরের ডেলা আর বাচ্চাদের ভিড় বাঁচিয়ে দিব্যি এঁকেবেঁকে নিজের রাস্তা করে নিচ্ছিলেন... আর, অন্য কোনো এক সময়ে আর অন্য কোনো এক জায়গায় বসে, তিনি তাঁর বন্ধু কুচ নহীনের রানিকে বলেছিলেন: ‘শুরুর দিকে আমি ছিলাম আদ্যোপান্ত একজন কাশ্মীরি, আর মুসলমান হিসেবেও তেমন গোঁড়া ছিলাম না। তারপর বুকের ওই কালশিটেটা আমাকে একেবারে একজন আস্ত ভারতীয় বানিয়ে ছাড়ল। আমি এখনও মুসলমান হিসেবে তেমন কিছু কট্টর নই, কিন্তু আবদুল্লার জন্য আমার পুরো সমর্থন আছে। সে তো আসলে আমার লড়াইটাই লড়ছে।’
     তাঁর চোখদুটো তখনও কাশ্মীরের আকাশের মতোই গাঢ় নীল... তিনি বাড়ি পৌঁছোলেন, আর তাঁর চোখেমুখে এক অদ্ভুত তৃপ্তির ঝিলিক লেগে থাকলেও, শিস দেওয়াটা একেবারে থেমে গেল; কারণ একগাদা বদমেজাজি হাঁসে-ভরা সেই উঠোনে তাঁর জন্য তখন রীতিমতো রুষ্ট মুখে অপেক্ষা করছিলেন আমার দিদিমা, নাসিম আজিজ, যাঁকে একটু একটু করে টুকরো টুকরোভাবে ভালোবাসার মস্ত ভুলটা তিনি এককালে করেছিলেন, আর যিনি কিনা এখন পুরোপুরিভাবে এক হয়ে এমন এক দজ্জাল আর রাশভারী চেহারায় পালটে গেছেন—যা তিনি সারাজীবনই বজায় রাখবেন, আর যাঁকে সবাই চিরকাল রেভারেন্ড মাদার নামের এক অদ্ভুত উপাধিতেই চিনে এসেছে।
     বয়সের আগেই তিনি কেমন যেন এক পেল্লায় স্থূলকায় বুড়িতে পরিণত হয়েছিলেন, আর তাঁর মুখে ডাইনির বাঁটের মতো দুটো মস্ত বড়ো তিল গজিয়েছিল; তিনি বাস করতেন একেবারে নিজেরই গড়া এক অদৃশ্য দুর্গের ভেতর, যেটা কিনা আদপে সাবেকিয়ানা আর নিয়মের নিগড়ে বাঁধা এক নিরেট লোহার গড়। সে-বছরেরই প্রথম দিকে আদম আজিজ বসার ঘরের দেওয়ালে টাঙানোর জন্য তাঁর পরিবারের সবার এক্কেবারে প্রমাণ-সাইজের বাঁধানো ছবি তৈরি করার বায়না দিয়েছিলেন; তিন মেয়ে আর দুই ছেলে বাধ্য ছেলেমেয়ের মতোই ছবির জন্য পোজ দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু রেভারেন্ড মাদারের পালা আসতেই তিনি একেবারে বেঁকে বসলেন। কিন্তু শেষমেশ ফোটোগ্রাফার যখন তাঁকে একটু বেখেয়ালে পেয়ে লেন্সবন্দি করার ধান্দা করেছিল, তিনি লোকটার ক্যামেরাটা খপ করে ধরলেন আর সেটা দিয়েই সটান তার মাথার ওপর এক বাড়ি কষিয়ে ক্যামেরা ভেঙে দু’খান করে দিলেন। ভাগ্যিস লোকটা সে-যাত্রায় প্রাণে বেঁচে গিয়েছিল; কিন্তু তারপর থেকে এই তামাম দুনিয়ার কোথাও আমার দিদিমার কোনো ছবি নেই। তিনি কোনোমতে কারও অমন ছোট্ট কালো বাক্সে বন্দি হওয়ার পাত্রী ছিলেন না। একে তো ওই পরদাহীন, খোলা মুখের বেশরম নিয়ে তাঁকে বেঁচে থাকতে হচ্ছে, এটাই তাঁর কাছে যথেষ্ট!—তার ওপর সেই ব্যাপারটা ক্যামেরায় ধরে রাখতে হবে! কোনো প্রশ্নই ওঠে না।
     হয়তো ওই মুখ খোলা রাখার বাধ্যবাধকতার সঙ্গে বিছানায় শুয়ে আজিজের ওই একটু নড়াচড়া করার নিত্যদিনের ঘ্যানঘ্যানানি—এই দুটো ব্যাপার মিলেই তাঁকে একেবারে প্রতিরোধের প্রাচীর তুলতে বাধ্য করেছিল; আর সংসারের ভেতর তিনি এমন সব নিয়মকানুনের জাঁতাকল ফেঁদে বসেছিলেন, যা আদপে আত্মরক্ষার এমন এক অভেদ্য বর্ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে, বিস্তর কাঠখড় পুড়িয়েও কিছু করতে না পেরে আজিজ শেষমেশ তাঁর ওই দুর্গের নানা ঘাঁটি আর সেই সব ঘেরাটোপে হামলা চালানোর হাল একরকম ছেড়েই দিয়েছিলেন। তাঁকে একটা পেল্লায়, আত্মতুষ্ট মাকড়সার মতো নিজের গড়ে তোলা সেই খাসতালুকে একচ্ছত্র রাজত্ব করতে ছেড়ে দিয়েছিলেন। (এমনটাও হতে পারে যে, ওটা আদপে আত্মরক্ষার কোনো ব্যবস্থাই ছিল না, বরং নিজেরই হাত থেকে নিজেকে বাঁচানোর একটা মরিয়া উপায়মাত্র।)
     তিনি তাঁর ওই দুর্গে যে-সমস্ত জিনিসের প্রবেশ একেবারেই কড়া হাতে নিষিদ্ধ করেছিলেন, তার মধ্যে ছিল সকল প্রকার রাজনৈতিক ব্যাপারস্যাপার। ডাক্তার আজিজের যখনই ওসব নিয়ে দু-চার কথা বলার ইচ্ছে হতো, তিনি তখন তাঁর বন্ধু রানির কাছে গিয়ে হাজির হতেন, ওদিকে রেভারেন্ড মাদার গাল ফুলিয়ে বসে থাকতেন; তবে সে-রাগ তেমন একটা জুতসই ছিল না, কারণ তিনি বেশ ভালো করেই জানতেন যে, আজিজের ওই রানির কাছে যাওয়ার ব্যাপারটা আদপে তাঁরই একটা বিরাট জয়।
     তাঁর রাজত্বের দুই প্রাণকেন্দ্র ছিল তাঁর রান্নাঘর আর ভাঁড়ারঘর। আমি প্রথমটায় কোনোদিন ঢুকিনি ঠিকই, তবে ভাঁড়ারঘরের তালা-বন্ধ তারের-জালি-লাগানো দরজার ফাঁক দিয়ে ভেতরের সেই রহস্যময় দুনিয়াটার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকার কথা আমার বেশ মনে পড়ে; এমন এক দুনিয়া, যেখানে মাছি বসা আটকাতে পরিষ্কার কাপড়ে-ঢাকা তারের ঝুড়ি ঝুলত, সারিসারি টিনের কৌটো—যেগুলো গুড় আর হরেক রকম মিষ্টিতে ঠাসা রয়েছে বলে আমি বেশ জানতাম, তকতকে চৌকোনা লেবেল-আঁটা তালা-দেওয়া সব বাক্সপ্যাঁটরা, বাদাম, শালগম আর শস্যের বস্তা, ছিল রাজহাঁসের ডিম আর কাঠের ঝাড়ু। ভাঁড়ারঘর আর রান্নাঘর ছিল তাঁর একচ্ছত্র শাসনের মুলুক; আর সেগুলোকে তিনি একেবারে বাঘিনির মতো আগলে রাখতেন। তাঁর পেটে যখন তাঁর শেষ সন্তান, মানে আমার মাসি এমেরাল্ড, তখন তাঁর স্বামী তাঁকে রাঁধুনির তদারকি করার হ্যাপা থেকে একটু রেহাই দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তিনি কোনো জবাব দেননি; কিন্তু পরের দিন, আজিজ যখন রান্নাঘরের দিকে এগোচ্ছেন, তখন তিনি হাতে একটা ইয়াব্বড় ধাতব হাঁড়ি নিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে এসে সটান দরজার মুখে পথ আগলে দাঁড়ালেন। একে তো তিনি ছিলেন দারুণ মোটা, তার ওপর আবার পোয়াতি, তাই দরজার মুখে আর গলার মতো বিশেষ জায়গাই বাকি রইল না।
     আদম আজিজ ভ্রু কোঁচকালেন। ‘এসব কী গিন্নি?’ যার জবাবে আমার দিদিমা বলেছিলেন, ‘এই যে, কী-যেন-বলে, এই হাঁড়িটা বড্ড ভারী; আর যদি কোনোদিন আপনাকে এদিকটায় দেখি, কী-যেন-বলে, আপনার মাথাটা এর ভেতর গুঁজে দিয়ে, তার সঙ্গে একটু দই মাখিয়ে, কী-যেন-বলে, একেবারে কোরমা বানিয়ে ছাড়ব।’ আমি ছাই জানি না আমার দিদিমা ঠিক কোত্থেকে ওই ‘কী-যেন-বলে’ কথাটাকে তাঁর একেবারে ধ্রুবপদের মতো ধরে ফেলেছিলেন। কিন্তু বছর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এই কথাটা তাঁর কথার ফাঁকে ফাঁকে আরও বেশি করে জাঁকিয়ে বসতে লাগল। আমার তো মনে হয় এটা আসলে তাঁর মনের গহীনের এক গোপন আর্তি... একটা মরমী প্রশ্ন। আমাদের রেভারেন্ড মাদার আসলে একটা ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন যে—বাইরে থেকে তাঁকে যতই দাপুটে আর রাশভারী মনে হোক না কেন, এই অনন্ত মহাবিশ্বে তিনি আসলে বড়ো একা আর দিশেহারা। বুঝলেন না তো, আসলে কোন জিনিসটাকে ঠিক কী নামে ডাকতে হয়, তা তিনি কোনোদিনই বুঝে উঠতে পারেননি।
     ...আর খাবার টেবিলেও একেবারে দোর্দণ্ডপ্রতাপে তাঁরই একচ্ছত্র রাজত্ব চলত। টেবিলে না সাজানো হত কোনো থালাবাসন, না রাখা হত কোনো খাবারদাবার। তাঁর ডান হাতের কাছে একটা নিচু সাইড-টেবিলের ওপর তরিতরকারি আর বাসনকোসন একেবারে ফৌজের মতো সাজানো থাকত, এবং তিনি নিজে হাতে যা বেড়ে দিতেন, আজিজ আর ছেলেপুলেদের স্রেফ সেটাই খেতে হত। তাঁর তৈরি এই প্রথার দাপট যে ঠিক কতটা সাঙ্ঘাতিক ছিল, তা এই একটা ব্যাপার থেকেই মালুম হয় যে, স্বামীর যখন কোষ্ঠকাঠিন্যে একেবারে নাজেহাল দশা, তখনও তিনি কোনোদিন তাঁকে নিজের মর্জিমাফিক খাবার বেছে নেওয়ার সুযোগটুকু অবধি দেননি, আর কারও কোনো অনুরোধ বা উপদেশ কানে তোলার তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না। একটা নিরেট দুর্গ তো আর কখনো নিজের জায়গা থেকে নড়ে না। তার আশ্রয়ে থাকা লোকজনের পেটের গতিক যতই গোলমেলে হয়ে পড়ুক না কেন।
     নাদির খানের সেই দীর্ঘ গুপ্তবাসের দিনগুলোতে, কর্নওয়ালিস রোডের ওই বাড়িতে যখন এমেরাল্ডের প্রেমে-পড়া তরুণ জুলফিকারের আনাগোনা ছিল, আর তার সঙ্গে আসত রেক্সিন ও লেদারক্লথের এক রমরমা ব্যবসায়ী, নাম আহমেদ সিনাই, যে কিনা আমার মাসি আলিয়ার মনে এমন সাঙ্ঘাতিক চোট দিয়েছিল যে আলিয়া মাসি পাক্কা পঁচিশটা বছর সেই ক্ষোভ বুকে পুষে রেখে শেষমেশ আমার মায়ের ওপর দিয়ে তার নিষ্ঠুর প্রতিশোধ নিয়েছিল—এই পুরোটা সময় জুড়েই সংসারের ওপর রেভারেন্ড মাদারের সেই নিরেট লোহার মতো শক্ত মুঠি এতটুকুও আলগা হয়নি; আর নাদিরের ওই আগমন যে এক নিশ্ছিদ্র নীরবতা ডেকে এনেছিল, তারও বেশ আগে থেকেই আদম আজিজ স্ত্রীর সেই মুঠিটা ভাঙার বিস্তর চেষ্টা করেছিলেন, আর তার জেরে রীতিমতো নিজের বউয়ের সঙ্গেই তাঁকে যুদ্ধে নামতে হয়েছিল। (আর এ-সবকিছু থেকেই এই ব্যাপারটা বেশ মালুম হয় যে, তাঁর ওই আশাবাদের ব্যামোয় ভোগাটা আসলে কতটা তাজ্জব একটা ব্যাপার ছিল।)
     … ১৯৩২ সালে, অর্থাৎ তার ঠিক দশ বছর আগে, তিনি নিজের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার পুরো দায়িত্বটা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। রেভারেন্ড মাদার তাতে বেশ দমে গিয়েছিলেন ঠিকই; কিন্তু ওটা তো আবার একটা সংসারে বাবারই সাবেকি দায়িত্ব, তাই তাঁর আর আপত্তি করার কোনো জো ছিল না। আলিয়ার বয়স তখন এগারো; মেজ মেয়ে মুমতাজের বয়স নয় ছুঁই-ছুঁই। দুই ছেলে, হানিফ আর মুস্তাফার বয়স তখন আট আর ছয়, আর ছোট্ট এমেরাল্ড তো তখনও পাঁচেই পা দেয়নি। রেভারেন্ড মাদার তখন নিজের মনের এইসব ভয়ডর আর খটকার কথাগুলো বাড়ির রাঁধুনি দাউদের কাছে উজাড় করে বলতে শুরু করলেন। ‘উনি যে ওদের মগজে ওই কী-সব বিদেশি ভাষা, কী-যেন-বলে, আর তার সঙ্গে আরও যত সব ছাইপাশ ঢোকাচ্ছেন কে জানে।’ দাউদ হাঁড়িতে হাতা নাড়ছিল আর রেভারেন্ড মাদার চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘তোমার কি এটা দেখে অবাক লাগে না, কী-যেন-বলে, যে ওইটুকু একরত্তি মেয়ে নিজেকে এমেরাল্ড বলে ডাকে? একেবারে ইংরেজিতে, কী-যেন-বলে? ওই লোকটা আমার ছেলেমেয়েগুলোকে স্রেফ গোল্লায় পাঠাবে। ওটায় জিরে একটু কম দাও, কী-যেন-বলে, অন্য লোকের চরকায় তেল না দিয়ে তোমার বরং নিজের রান্নাবান্নায় আরেকটু মন দেওয়া উচিত।’
     পড়াশোনার ব্যাপারে তিনি কেবল একটাই শর্ত চাপিয়েছিলেন: ধর্মশিক্ষা। আজিজ যেখানে সবসময়েই একটা দোটানায় ভুগতেন, তাঁর ব্যাপারটা কিন্তু মোটেও সে-রকম ছিল না; তিনি বরাবরই ছিলেন সাঙ্ঘাতিক ধর্মপ্রাণ। ‘আপনার নাহয় ওই হামিংবার্ড আছে,’ তিনি তাঁকে শুনিয়ে শুনিয়ে বললেন, ‘কিন্তু আমার কাছে, কী-যেন-বলে, খোদ খোদার ডাক আছে। ওই মিনসেটার ভনভনানির চেয়ে, কী-যেন-বলে, সেটা ঢের ভালো আওয়াজ।’ এটা ছিল তাঁর মুখ থেকে ফস করে বেরিয়ে-আসা বড্ড বিরল একটা রাজনৈতিক মন্তব্য... আর তারপর একদিন সেই সময়টাও এসে হাজির হলো, যেদিন আজিজ ওই ধর্মশিক্ষার মাস্টারকে একরকম ঘাড়ধাক্কা দিয়েই বাড়ি থেকে বের করে দিলেন। বুড়ো আঙুল আর তর্জনীর শক্ত সাঁড়াশি গিয়ে চেপে ধরল খোদ মৌলবি সাহেবের কান। নাসিম আজিজ নিজের চোখেই দেখলেন, তাঁর স্বামী ওই উস্কোখুস্কো দাড়িওয়ালা হতভাগা লোকটাকে কেমন হিড়হিড় করে টেনে বাগানের পাঁচিলের দরজার দিকে নিয়ে যাচ্ছেন; দেখে তিনি একেবারে আঁতকে উঠলেন; তারপর যেই না তাঁর স্বামীর পা-খানা সটান গিয়ে ওই ঈশ্বর-অনুরাগী মানুষটার পিছনের মাংসল অংশে গিয়ে পড়ল, অমনি তিনি একটা আর্তনাদ করে উঠলেন। আর তারপর একেবারে যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত ঘটিয়ে, রেভারেন্ড মাদার সটান রণমূর্তিতে যুদ্ধে নেমে পড়লেন।
     ‘বেহায়া লোক কোথাকার!’ তিনি স্বামীকে শাপমন্যি করে উঠলেন, আর বললেন, ‘একেবারে, কী-যেন-বলে, একটা বেশরম আদমি! কোনো মান-সম্মান নেই!’ পিছনের বারান্দার নিরাপদ দূরত্ব থেকে ছেলেমেয়েরা সব হাঁ করে এইসব তামাশা দেখছিল। আজিজ বললেন, ‘তুমি ছাই জানো। ওই লোকটা তোমার ছেলেমেয়েদের কী শেখাচ্ছিল জানো?’ আর রেভারেন্ড মাদারও একটার জবাবে আরেকটা প্রশ্নবাণ ছুঁড়ে দিলেন: ‘আপনি! আপনি আমাদের মাথায়, কী-যেন-বলে, সর্বনাশ ডেকে আনার জন্য আর কী কী করতে বাকি রাখবেন শুনি?’ —কিন্তু এবার আজিজ বলে উঠলেন, ‘তোমার কি মনে হয় ওটা নাস্তালিক হরফ ছিল? অ্যাঁ?’ —এতে তাঁর স্ত্রী আরও তেতে উঠলেন: ‘আপনি কি শুয়োরের মাংস খাওয়া শুরু করবেন নাকি? কী-যেন-বলে? আপনি কি তবে কোরানের ওপর থুতু ফেলবেন?’ অন্যদিকে, গলার স্বর চড়িয়ে ডাক্তার পালটা জবাব দিলেন, ‘নাকি ভাবছ “আল-বাকারার” কয়েকটা সুরা শেখাচ্ছিল? তাই তো?’... সেসবে এতটুকু কান না দিয়ে রেভারেন্ড মাদার একেবারে তাঁর চূড়ান্ত মোক্ষম কথায় এসে পৌঁছোলেন: ‘আপনি কি কোনো জার্মানের সঙ্গে আপনার মেয়েদের শাদির ব্যবস্থা করবেন নাকি!?’ এই বলে হাঁপাতে হাঁপাতে দম নেওয়ার জন্য তিনি একটু থামলেন, আর ঠিক সেই সুযোগে দাদু আসল কথাটা খোলসা করলেন, ‘সে ওদের ঘেন্না করতে শেখাচ্ছিল, বিবি। সে ওদের শেখাচ্ছিল কী করে হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, শিখ আরও কাদের কাদের যেন, কীভাবে ঘেন্না করতে হয়। আরও কতসব নিরামিষাশীদের ঘেন্না করতে বলছিল। তুমি কি চাও তোমার ছেলেমেয়েরা এমন বিদ্বেষে-ভরা মানুষ হোক, হ্যাঁ?’
     ‘আপনি কি চান তারা সব ধর্মহীন নাস্তিক হয়ে উঠুক?’ রেভারেন্ড মাদার যেন চোখের সামনে দিব্যি দেখতে পাচ্ছিলেন, রাতের অন্ধকারে আর্চঅ্যাঞ্জেল গ্যাব্রিয়েলের দলবল আকাশ থেকে নেমে এসে তাঁর ওই বিধর্মী ছানাপোনাগুলোকে সোজা দোজখে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। দোজখ নিয়ে তাঁর মাথায় বেশ স্পষ্ট একটা ছবি গাঁথা ছিল। সেটা ঠিক জুন মাসের রাজপুতানার মতোই কাঠফাটা গরম একটা জায়গা, আর সেখানে সবাইকে ধরে ধরে সাত-সাতটা বিদেশি ভাষা শেখানো হয়… ‘আমি কসম খেয়ে বলছি, কী-যেন-বলে,’ আমার দিদিমা বললেন, ‘আমি শপথ করে বলছি, আমার রান্নাঘর থেকে একদানা খানাও আপনার মুখে জুটবে না! না, একটা চাপাটিও না, যতক্ষণ না আপনি মৌলবি সাহেবকে ফিরিয়ে আনছেন আর তাঁর ওই, কী-যেন-বলে, পায়ে সিজদা করছেন!’
     সেদিন থেকে না-খেয়ে থাকার যে যুদ্ধটা শুরু হলো, তা একসময় প্রায় একটা মরণ-বাঁচন লড়াইয়ের জায়গায় গিয়ে ঠেকল। নিজের কথার একচুলও নড়চড় না করে, রেভারেন্ড মাদার খাওয়ার সময় তাঁর স্বামীকে একটা খালি থালা অবধি এগিয়ে দিলেন না। ডাক্তার আজিজও সঙ্গে সঙ্গে পালটা চাল চাললেন; তিনি ঠিক করলেন, নিজের ঘর তো দূর, বাড়ির বাইরে থাকলেও নিজে থেকে একদানা কিছু কিনে খাবেন না। দিনের পর দিন ওই পাঁচ ছেলেমেয়ে চোখের সামনে তাদের বাবাকে একটু একটু করে শুকিয়ে যেন উবে যেতে দেখল, আর অন্যদিকে তাদের মা একেবারে গোমড়া মুখে খাবারের বাটিগুলোর পাহারাদারি চালিয়ে গেলেন। ‘তুমি কি একেবারে ভ্যানিশ হয়ে যাবে নাকি?’ এমেরাল্ড বেশ আগ্রহ নিয়েই জিজ্ঞেস করল। সেইসঙ্গে একটু যেন দুশ্চিন্তা মাখানো গলায় বলল: ‘তবে হ্যাঁ, কী করে আবার ফিরে আসতে হয়, সেটা যদি না জানো, তাহলে ওসব আর করতে যেয়ো না।’ আজিজের মুখে ছোটো ছোটো গর্ত দেখা দিল; এমনকী তাঁর নাকটাও যেন আগের চেয়ে আরও সরু দেখাতে লাগল। তাঁর শরীরটা যেন একটা লণ্ডভণ্ড যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে, আর প্রতিদিন সেটার কোনো না কোনো অংশ যেন বোমার ঘায়ে ছিটকে উড়ে যাচ্ছে। তিনি তাঁর বড়ো মেয়ে আলিয়াকে,—সে-ই ছিল সবচেয়ে সমঝদার—বললেন: ‘যেকোনো লড়াইয়ে, বুঝলি, দুই পক্ষের সেপাই-লস্করদের চেয়ে লড়াইয়ের ময়দানটারই বেশি বারোটা বাজে। এটাই তো স্বাভাবিক।’ রোগী দেখার চক্করে বেরোনোর সময় তিনি আজকাল রিকশা ধরতে শুরু করলেন। রিকশাওয়ালা হামদর্দ তাঁকে নিয়ে বেশ চিন্তায় পড়ে গেল।
     কুচ নেহি-র রানি রেভারেন্ড মাদারকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে রাজি করানোর জন্য দূত পাঠালেন। ‘সারা হিন্দুস্থানে কি এমনিতেই অনাহারে-মারা-পড়া মানুষের কোনো অভাব আছে?’ দূতেরা নাসিমকে জিজ্ঞেস করল, আর তার জবাবে তিনি সাক্ষাৎ কালনাগিনীর মতো এমন এক হিমশীতল চাউনি হানলেন, যার কথা কিনা ইতিমধ্যেই লোকের মুখে মুখে ফিরতে শুরু করেছিল। কোলের ওপর হাতদুটো জড়ো করা, আর কিপটের মতো বড্ড কষিয়ে মাথার চারপাশে একটা মসলিনের ওড়না প্যাঁচানো—সেই অবস্থায় তিনি তাঁর পলকহীন চোখে আগন্তুকদের যেন একেবারে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিলেন, আর স্রেফ চোখের দৃষ্টিতেই তাদের রীতিমতো স্থাণু করে দিলেন। তাদের গলার স্বর যেন পাথরের মতো ভারী হয়ে গলায় আটকে গেল; বুকের রক্ত হিম হয়ে এল। অচেনা-অজানা সব পুরুষমানুষের সঙ্গে একটা ঘরে একা বসেও আমার দিদা একেবারে বিজয়িনী বীরাঙ্গনার মতো বসে রইলেন, আর তাঁকে চারপাশে ঘিরে রইল কেবল একরাশ অবনত চোখ। ‘অভাব নেই, কী-যেন-বলে?’ তিনি বেশ একটা জয়ের উল্লাসে বলে উঠলেন। ‘তা, হয়তো নেই। আবার, হয়তো আছেও।’
     কিন্তু আসল সত্যিটা হলো, নাসিম আজিজ ভেতরে ভেতরে বড্ড ঘাবড়ে গিয়েছিলেন; কারণ, একদিকে, আজিজ যদি না খেয়ে শুকিয়ে শুকিয়ে মরেই যায়,  তাহলে এটা হয়তো প্রমাণ হয়ে যাবে যে সোয়ামির ওইসব হাবিজাবি ভাবনার চেয়ে তার নিজের দুনিয়াদারির বুঝটাই খাঁটি। কিন্তু তাই বলে স্রেফ একটা জেদ, কিংবা ‘নীতি’-র কারণে খামোকা বিধবা হওয়ার কোনো শখ তাঁর ছিল না। অথচ এই গ্যাঁড়াকল থেকে বেরিয়ে আসার এমন কোনো রাস্তাও তিনি ঠাহর করে উঠতে পারছিলেন না, যাতে করে তাঁকে পিছু হটতে না হয় বা তাঁর ‘মুখ’টা না পোড়ে। সে যাই হোক; তিনি বেপর্দা হয়ে সবার সামনে খোলা-মুখেই না-হয় থাকতে শিখেছেন এখন, কিন্তু তাই বলে সেই ‘মুখ’টাকেও এবার খোয়াতে হবে! এতে মোটেই রাজি ছিলেন না।
     ‘একটু অসুখ বাঁধিয়ে বসলেই তো পারো?’—আলিয়া, সেই বিচক্ষণ মেয়েটা, শেষমেশ একটা রফা বার করল। রেভারেন্ড মাদারও বেশ হিসেব কষেই রণে ভঙ্গ দিয়ে একটু পিছু হঠলেন, দারুণ একটা ব্যথার কথা ঘোষণা করলেন, একেবারে মরে যাওয়ার মতো একটা ব্যথা, কী-যেন-বলে, আর তারপর সোজা গিয়ে বিছানায় পড়লেন। তাঁর এই অনুপস্থিতির সুবাদে আলিয়া বাবার দিকে সন্ধির হাতখানা এগিয়ে দিল—এক বাটি চিকেন স্যুপের মাধ্যমে। দু-দিন বাদে, রেভারেন্ড মাদার আবার বিছানা ছেড়ে উঠলেন (তবে জীবনে এই প্রথমবার তিনি তাঁর স্বামীকে দিয়ে গা-হাত টিপিয়ে নিজের চিকিৎসা করানোর ব্যাপারে একেবারে রাজি হলেন না), তারপর আগের মতোই নিজের সমস্ত ক্ষমতা কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নিলেন, আর মেয়ের ওই সিদ্ধান্তে যেন একরকম সায় দিয়েই একটু কাঁধ ঝাঁকিয়ে, আজিজের দিকে তাঁর খাবারটা এমনভাবে এগিয়ে দিলেন, যেন এটা নেহাতই রোজকার একটা তুচ্ছ ব্যাপার।
     সে তো দশ বছর আগের কথা; কিন্তু তবু, এই ১৯৪২ সালেও, পানের দোকানের বুড়োগুলো শিস-দিতে-দিতে যাওয়া ডাক্তারবাবুকে দেখলে খিকখিক করে হাসতে হাসতে সেই পুরোনো দিনের কথায় মেতে ওঠে,—যখন তাঁর বউ তাঁকে প্রায় ভোজবাজির মতো গায়েবই করে দেওয়ার জোগাড় করেছিল প্রায়, অথচ বেচারা ডাক্তার জানতেনও না কী করে ফিরে আসতে হয়। সন্ধে গড়িয়ে রাত নামলে তারা একে অপরকে কনুইয়ের গুঁতো মেরে বলে ওঠে, ‘তোর মনে আছে সেবার…’ আর একজন বলে ওঠে ‘দড়িতে-মেলে-দেওয়া কঙ্কালের মতো কেমন শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছিল! নিজের ওই সাইকেলটা পর্যন্ত চালাতে পারত না—’ অন্যজন কথা কেড়ে নিয়ে বলে—‘বলছি কী দাদা, ওই মেয়েছেলেটা যে সাঙ্ঘাতিক সব কাণ্ড ঘটাতে পারত, সে আর কী বলব! এমনও শুনেছি যে, মেয়েরা কীসব ফন্দিফিকির আঁটছে সেটা স্রেফ টের পাওয়ার জন্য সে নাকি তাদের স্বপ্নগুলো অবধি নিজে দেখতে পেত!’ কিন্তু অন্ধকারটা একটু জাঁকিয়ে বসলে পর এই কনুইয়ের গুঁতোগুঁতি থেমে আসে, কারণ তখন শুরু হয় তাদের আসল খেলা। নিঃশব্দে, একটা অদ্ভুত ছন্দে তাদের চোয়ালগুলো নড়তে থাকে; তারপর আচমকা ঠোঁটদুটো গোল হয়ে আসে, কিন্তু তা থেকে যা বের হয়, তা কোনো শব্দভেদী ফুৎকার নয়। শিস নয়, বরং ওই জরাজীর্ণ ঠোঁটের ফাঁক গলে পানের পিকের লম্বা একটা লাল রঙের ফোয়ারা বেরিয়ে এসে একেবারে নিখুঁত নিশানায় ধেয়ে যায় পুরোনো একটা পিতলের পিকদানির দিকে। উরুতে চাপড় মেরে, আত্মপ্রশংসার সুরে চারিদিক থেকে তখন তারিফ ওঠে—‘ওয়া, ওয়া ওস্তাদ!’ আর, ‘একেবারে মোক্ষম নিশানা!’...ওই বুড়োদের চারপাশ ঘিরে শহরটা তখন সন্ধেবেলাকার আলগা এলোমেলো সব আমোদপ্রমোদে ডুবে যেতে থাকে। ছেলেপুলেরা চাকতি আর কাবাডি খেলে, কেউ-বা মিঞা আবদুল্লার পোস্টারের মুখে গোঁফদাঁড়ি এঁকে দেয়। আর এবার বুড়োগুলো রাস্তার ওপর পিকদানিটাকে তাদের বসার জায়গা থেকে আরও, আরও খানিকটা দূরে সরিয়ে রাখে, আর আরও দূর থেকে লম্বা পিকের ফোয়ারা ছোঁড়ে সেটার দিকে। তবু সেই তরল-বাণ একেবারে ঠিক জায়গায় গিয়ে বেঁধে। ‘ওহ্‌, তোফা ইয়ার!’ রাস্তার বিচ্ছু ছোকরাগুলো ওই লাল পিকের ফোয়ারার মাঝখান দিয়ে এদিক-ওদিক গা-বাঁচিয়ে সাঁ করে ছুটে যাওয়ার একটা খেলা বানিয়ে নেয়, পিকদানিতে-পিক-ফেলার ওই ভারী সিরিয়াস শিল্পকর্মের ওপর তারা চাপিয়ে দেয় সাহস দেখানোর এই খেলাটাকে… কিন্তু এই তো একটা আর্মির স্টাফ কার, হুড়মুড়িয়ে ছোকরাগুলোকে ছত্রভঙ্গ করতে করতে এগিয়ে আসছে... এই যে, শহরের মিলিটারি কম্যান্ডার, ব্রিগেডিয়ার ডডসন, গরমে একেবারে হাঁসফাঁস করছেন... আর এই যে তাঁর এ.ডি.সি., মেজর জুলফিকার, তাঁর দিকে একটা তোয়ালে এগিয়ে দিচ্ছেন। ডডসন নিজের মুখ মোছেন; ছোকরাগুলো সব ছিটকে পালাল; আর গাড়িটা সটান ধাক্কা মেরে পিকদানিটাকে উলটে দেয়। কালচে লাল থকথকে পিক, ঠিক যেন জমাট রক্ত, রাস্তার ধুলোয় জমে গিয়ে যেন একটা লাল হাতের চেহারা নিল, আর সেই হাতটাই যেন ওই গাড়িতে করে চলে-যাওয়া ব্রিটিশ রাজের শেষ বেলার দাপটের দিকে অভিযোগের তর্জনী তুলে ধরে।

পূর্ববর্তী পর্ব পড়ুন এখানে: [মধ্যরাতের সন্তানেরা]

মধ্যরাতের সন্তানেরা
সালমান রুশদি
অনুবাদ: দীপ মন্ডল


মন্তব্য

অনুবাদ আত্মজীবনী আর্ট-গ্যালারী আলোকচিত্র ই-বুক ইচক দুয়েন্দে ইশতেহার উৎপলকুমার বসু উপন্যাস ঋত্বিক-ঘটক কবিতা কবিতায় কুড়িগ্রাম কর্মকাণ্ড কার্ল মার্ক্স গল্প গিন্সবার্গ চার্লস বুকাওস্কি ছড়া জার্নাল জীবনী দশকথা দিনলিপি পাণ্ডুলিপি পুনঃপ্রকাশ পোয়েটিক ফিকশন প্রতিবাদ প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা প্রবন্ধ প্রিন্ট সংখ্যা বই বর্ষা সংখ্যা বসন্ত বিক্রয়বিভাগ বিবিধ বিবৃতি বিশেষ বুলেটিন বৈশাখ ভাষা-সিরিজ ভিডিও মাসুমুল আলম মুক্তগদ্য মে দিবস যুগপূর্তি রিভিউ লকডাউন শম্ভু রক্ষিত শাহেদ শাফায়েত শিশুতোষ সন্দীপ দত্ত সম্পাদকীয় সাক্ষাৎকার সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ সৈয়দ সাখাওয়াৎ স্মৃতিকথা হেমন্ত
নাম

অনুবাদ,64,আত্মজীবনী,27,আর্ট-গ্যালারী,2,আলোকচিত্র,1,ই-বুক,7,ইচক দুয়েন্দে,23,ইশতেহার,2,উৎপলকুমার বসু,26,উপন্যাস,8,ঋত্বিক-ঘটক,5,কবিতা,348,কবিতায় কুড়িগ্রাম,7,কর্মকাণ্ড,17,কার্ল মার্ক্স,1,গল্প,86,গিন্সবার্গ,2,চার্লস বুকাওস্কি,40,ছড়া,1,জার্নাল,7,জীবনী,7,দশকথা,25,দিনলিপি,1,পাণ্ডুলিপি,11,পুনঃপ্রকাশ,24,পোয়েটিক ফিকশন,1,প্রতিবাদ,1,প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা,4,প্রবন্ধ,194,প্রিন্ট সংখ্যা,5,বই,4,বর্ষা সংখ্যা,1,বসন্ত,15,বিক্রয়বিভাগ,21,বিবিধ,3,বিবৃতি,1,বিশেষ,26,বুলেটিন,4,বৈশাখ,1,ভাষা-সিরিজ,5,ভিডিও,1,মাসুমুল আলম,35,মুক্তগদ্য,45,মে দিবস,1,যুগপূর্তি,6,রিভিউ,5,লকডাউন,2,শম্ভু রক্ষিত,2,শাহেদ শাফায়েত,25,শিশুতোষ,1,সন্দীপ দত্ত,14,সম্পাদকীয়,20,সাক্ষাৎকার,26,সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ,18,সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ,55,সৈয়দ সাখাওয়াৎ,33,স্মৃতিকথা,15,হেমন্ত,1,
ltr
item
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন: সালমান রুশদির মিডনাইটস চিলড্রেন (পর্ব ৭) • বাংলা অনুবাদ: দীপ মন্ডল
সালমান রুশদির মিডনাইটস চিলড্রেন (পর্ব ৭) • বাংলা অনুবাদ: দীপ মন্ডল
মধ্যরাতের সন্তানেরা • সালমান রুশদির বুকারজয়ী উপন্যাস মিডনাইটস চিলড্রেন-এর বাংলা অনুবাদ করেছেন দীপ মন্ডল৷
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEgeRgp7MV3MVjqdWQPggKmrClfDaNWkTe904uIJl0sgQrdxlrfbiRislYW-ZvIBYZwiH1DRyUuKu7h9sjp1t6n5ZK7LCabxeNkcRaAu3lEsXyiE3ArUMz-1EWiStFZ4cm_O5bNsMWBk9mwLwPtNZ6aW8c0AgehsYz0lXOZ-0CG68AgShSTQkWU-wGvxrHs/s1600/%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%A1%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%9F%E0%A6%B8%20%E0%A6%9A%E0%A6%BF%E0%A6%B2%E0%A6%A1%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%A8%20%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A8%20%E0%A6%B0%E0%A7%81%E0%A6%B6%E0%A6%A6%E0%A6%BF%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%81%20%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%9F%E0%A6%B2%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%97.png
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEgeRgp7MV3MVjqdWQPggKmrClfDaNWkTe904uIJl0sgQrdxlrfbiRislYW-ZvIBYZwiH1DRyUuKu7h9sjp1t6n5ZK7LCabxeNkcRaAu3lEsXyiE3ArUMz-1EWiStFZ4cm_O5bNsMWBk9mwLwPtNZ6aW8c0AgehsYz0lXOZ-0CG68AgShSTQkWU-wGvxrHs/s72-c/%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%A1%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%9F%E0%A6%B8%20%E0%A6%9A%E0%A6%BF%E0%A6%B2%E0%A6%A1%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%A8%20%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A8%20%E0%A6%B0%E0%A7%81%E0%A6%B6%E0%A6%A6%E0%A6%BF%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%81%20%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%9F%E0%A6%B2%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%97.png
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন
https://www.bindumag.com/2026/08/midnights-children-7.html
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/2026/08/midnights-children-7.html
true
121332834233322352
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts আরো Readmore উত্তর Cancel reply মুছুন By নী PAGES POSTS আরো এই লেখাগুলিও পড়ুন... বিষয় ARCHIVE SEARCH সব লেখা কোন রচনায় খুঁজে পাওয়া গেল না নীড় Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share to a social network STEP 2: Click the link on your social network Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy