আমি আর কোনো কথা বাড়াচ্ছি না; তাড়াহুড়ো আর আবেগের বশে আমার মুখ থেকে যেমন-তেমন করে বেরিয়ে-আসা এই ঘটনাগুলোর বিচার অন্যরাই করুক। আমি বরং সোজা কথায় আসি, বলি যে, ১৯১৮-১৯ সালের সেই হাড়কাঁপানো দীর্ঘ শীতের সময়টায় তাইয়ের শরীরে দেখা দিল এক সাঙ্ঘাতিক চর্মরোগ, ইউরোপের ওই ‘কিংস ইভিল’ নামের অভিশাপটার মতোই একটা ব্যামো; কিন্তু সে তো ডাক্তার আজিজকে তার ছায়া মাড়াতে দেবে না, শেষমেশ এক পাতি হোমিওপ্যাথের কাছেই তার চিকিৎসা করাতে লাগল। অন্যদিকে মার্চ মাসে, হ্রদের বরফ গলতে শুরু করলে, জমিদার ঘানির বাড়ির চত্বরে এক মস্ত শামিয়ানার তলায় এক বিয়ের আসর বসল। বিয়ের কাবিননামায় আদম আজিজ বেশ মোটা অঙ্কের টাকাই পেলেন, যাতে অন্তত আগ্রায় একটা বাড়ি কেনার ভালোমতো সুরাহা হয়, আর যৌতুকের সঙ্গে, খোদ ডাক্তার আজিজের বিশেষ অনুরোধে, সেই ফুটোওয়ালা চাদরখানাও দিয়ে দেওয়া হলো। নতুন বরবউ একটা উঁচু বেদিতে বসে রইল… গলায় মালা…শীতে একেবারে জবুথবু, অতিথিরা সার বেঁধে তাদের কোলের ওপর আশীর্বাদের টাকা-পয়সা ফেলতে লাগল। সেই রাতে আমার দাদু তাঁর নতুন বউ আর নিজের নিচে ওই ফুটোওয়ালা চাদরখানা পেতে দিলেন, এবং সকালে দেখা গেল সেটা তিন ফোঁটা রক্তে সেজে উঠেছে, যা একটা ছোট্ট ত্রিভুজের আকার ধারণ করেছে। সকালে সেই চাদরখানা সবাইকে দেখানো হলো, আর ফুলশয্যার আচার-অনুষ্ঠান চুকিয়ে ফেলার পর জমিদারের ভাড়া-করা একটা লিমুজিন এসে হাজির হলো আমার দাদু-দিদাকে সোজা অমৃতসরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য, যেখান থেকে তাঁরা ফ্রন্টিয়ার মেল ধরবেন। আমার দাদু যখন পাকাপাকিভাবে নিজের ভিটে ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, তখন চারপাশের পাহাড়গুলো যেন ভিড় করে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। (তিনি অবশ্য আরও একবার ফিরে আসবেন, তবে সে ফেরা আর চলে যাওয়ার জন্য নয়।) আজিজের কেমন যেন একবার মনে হলো, এক প্রাচীন মাঝি ডাঙায় দাঁড়িয়ে তাদের চলে যাওয়া দেখছে—সেটা তাঁর চোখের ভুলও হতে পারে, কারণ তাই তো তখন বেশ অসুস্থ। শঙ্করাচার্য পাহাড়ের চূড়ায় ফোস্কার মতো ফুটে-ওঠা যে মন্দিরটাকে মুসলমানরা আজকাল ‘তখত-ই-সুলেমান’ বা ‘সলোমনের সিংহাসন’ বলে ডাকতে শুরু করেছিল, সেটা অবশ্য তাঁদের দিকে একটুও ফিরে তাকাল না। একটা পুরোনো চামড়ার ব্যাগ—যার ভেতরে অন্যান্য আরও অনেক কিছুর সঙ্গে একটা স্টেথোস্কোপ আর একটা বিছানার চাদর পোরা—গাড়ির ডিকিতে চাপিয়ে গাড়িটা যখন দক্ষিণের দিকে ছুটতে শুরু করল, তখন শীতের পাতা-ঝরা ন্যাড়া পপলার গাছ আর বরফে-ঢাকা জাফরান খেতগুলো তাদের চারপাশ দিয়ে ঢেউয়ের মতো পেরিয়ে যেতে লাগল। ডাক্তার আজিজ তাঁর পেটের ঠিক মাঝখানটায় যেন এক অদ্ভুত শূন্যতা টের পাচ্ছিলেন, ঠিক যেন ভেসে থাকার মতো নির্ভার একটা অনুভূতি।
অথবা, যেন তলিয়ে যাওয়ার…।
(...আর এবার আমাকে একটা ভূতের পার্ট দেওয়া হলো। আমার বয়স তখন নয়, সেসময় আমরা সপরিবারে—মানে আমার বাবা, মা, ব্রাস মাঙ্কি আর আমি—আগ্রায় দাদু-দিদার বাড়িতে গিয়ে উঠেছি। আর নাতি-নাতনিরা—যাদের মধ্যে আমিও আছি—সবাই মিলে রীতি মেনে নববর্ষের একটা নাটক মঞ্চস্থ করতে নেমে পড়েছি; আর তাতেই আমার ঘাড়ে এসে পড়েছে ভূতের পার্টটা। সেইমতো—আসন্ন নাটকের চমকটা গোপন রাখার জন্য বেশ চুপিচুপি—আমি ভূত সাজার জুতসই একটা পোশাকের খোঁজে সারা বাড়ি তোলপাড় করে খুঁজছি। দাদু তখন রোগীদের দেখতে তাঁর রাউন্ডে বেরিয়েছেন। আর আমি তখন ঢুকে পড়েছি তাঁর ঘরে। আর এইখানে, এই আলমারিটার মাথায়…একখানা পুরনো ট্রাঙ্ক, ধুলো-ময়লা-মাকড়সার জালে ভর্তি, কিন্তু তালা-টালা দেওয়া নেই। আর এর ভেতরেই তো আমার যাবতীয় প্রার্থনার জবাব লুকিয়ে আছে। স্রেফ একটা চাদরই নয়, আগে থেকেই মাঝখানে গোল করে ফুটো-কাটা একখানা আস্ত চাদর! এই তো, ট্রাঙ্কটার ভেতর একটা চামড়ার ব্যাগের মধ্যে, একটা পুরোনো স্টেথোস্কোপ আর ছাতা-পড়া এক টিউব ভিক্স ইনহেলারের ঠিক নিচেই সেটা রাখা... আমাদের সেই নাটকে চাদরটার এই আবির্ভাব রীতিমতো হইচই ফেলে দিল। চাদরটার দিকে একবার চোখ পড়তেই আমার দাদু একেবারে গর্জে উঠে দাঁড়ালেন। তিনি লম্বা লম্বা পা ফেলে সোজা মঞ্চের ওপর উঠে এলেন, আর সবার চোখের সামনে আমার ভূতগিরি ঘুচিয়ে দিলেন। আমার দিদা নিজের ঠোঁটদুটো এমন শক্ত করে চেপে রেখেছিলেন যে মনে হচ্ছিল সেগুলো যেন একেবারে উধাও হয়ে গেছে। তাঁদের দুজনের মধ্যে—একজন কোনো এক ভুলে-যাওয়া মাঝির গলায় আমার ওপর হুংকার ছাড়ছিলেন, আর অন্যজন তাঁর ওই উধাও হয়ে-যাওয়া ঠোঁটের আড়াল থেকে নিজের রাগটা উগরে দিচ্ছিলেন,—এই দুইয়ে মিলে সেই জাঁদরেল ভূতটাকে একেবারে এক চোখের জলে নাকের জলে চুবানো ন্যাতানো একটা জিনিসে পরিণত করে ক্ষান্ত দিলেন। আমি পালালাম, সটান দৌড় লাগালাম, আর কেন কী ঘটেছে তার মাথামুণ্ডু কিছুই না বুঝে সোজা গিয়ে পড়লাম ওই ছোট্ট ভুট্টার খেতটায়। আমি সেখানে বসে রইলাম—কে জানে, হয়তো ঠিক যে-জায়গাটায় একদিন নাদির খান এসে বসেছিল, ঠিক সেখানেই!—টানা কয়েক ঘণ্টা ধরে, মনে মনে বারবার এই বলে দিব্যি কাটতে লাগলাম যে জীবনে আর কোনোদিন আমি অমন নিষেধের চাবিওলা ট্রাঙ্ক খুলব না, সেইসঙ্গে ট্রাঙ্কটায় কেন আগে থেকে তালা মারা ছিল না, তা নিয়েও একটা চাপা ক্ষোভ আমার মনের ভেতর বারবার ফুঁসে উঠতে লাগল। কিন্তু ওদের ওই ভয়ানক রাগ দেখেই আমি বিলক্ষণ বুঝে গিয়েছিলাম, এই চাদরটা নিশ্চয়ই কোনো না কোনোভাবে বড্ড দামি একটা জিনিস।)
রাতের খাবার নিয়ে এসেও আমাকে খেতে দিল না পদ্মা, মাঝখান থেকে আমার লেখায় বাগড়া দিয়ে রীতিমতো ব্ল্যাকমেল করতে শুরু করল: ‘তা সারাদিন ধরে ওইসব ছাইপাঁশ লেখালেখি করে যদি নিজের চোখদুটোর একেবারে বারোটা বাজিয়েই ছাড়বে বলে ঠিক করেছ, তবে আমাকে অন্তত ওইসব পড়ে শোনাতেই হবে তোমাকে—এই আমি বলে রাখলুম।’ অগত্যা দু-মুঠো খাবারের তাগিদে আমাকে ওর দাবি মেনে নিতেই হলো—তবে কে জানে, আমাদের এই পদ্মা হয়তো কোনো এক কাজেও লেগে যেতে পারে শেষমেশ, কারণ সমালোচক হিসেবে ওর মুখ বন্ধ রাখা তো আর চাট্টিখানি কথা নয়। ওর নাম নিয়ে আমি যা সব মন্তব্য করেছি, তাতেই ও সবথেকে বেশি চটেছে। ‘তুমি তার ছাই জানো, শহুরে বাবু কোথাকার?’—বাতাসে ওপর-নিচ করে কাটার মতো হাতটাত নেড়ে সে চেঁচিয়ে উঠল। ‘আমাদের গাঁয়ে গোবর-দেবীর নামে নাম রাখলে কেউ তো সেটা লজ্জার ব্যাপার বলে মনে করে না। তুমি এক্ষুনি লেখো যে তুমি যা বলেছ সব ভুল, একেবারে ডাহা ভুল।’
অগত্যা আমার এই পদ্মদেবীর ইচ্ছেটাকে শিরোধার্য করে, আমি আর কালবিলম্ব না করে এই গোবরের মাহাত্ম্য-কীর্তন করে একখানা ছোট্ট একটা প্রশস্তিগাথা জুড়ে দিচ্ছি।
আহা গোবর! এই সেই গোবর, যা মাটিকে উর্বর করে আর ফলায় খেতের ফসল! গোবর, যাকে কিনা টাটকা আর নরম থাকতে থাকতেই হাতে থুপে থুপে রুটির মতো পাতলা ঘুঁটে পাকানো হয়, আর তারপর বেচে দেওয়া হয় গাঁয়ের ঘরামিদের কাছে; যারা কিনা সেই গোবর দিয়েই মাটির কাঁচা বাড়ির দেওয়াল শক্তপোক্ত আর মজবুত করার কাজ সারে! এই সেই গোবর, যা কিনা গরুর ওই পেছন দিক থেকে নির্গত হয় বলেই না লোকে ওই গরুগুলোকে এমন দেবতা বলে মানে, এমন পুজো-আচ্চা করে! ওহ্, হ্যাঁ হ্যাঁ, আমিই ভুল ছিলাম, আমি কবুল করছি যে আমার মনে আগে থেকেই একটা গোঁড়া ধারণা বাসা বেঁধেছিল, আর তার কারণটা নিঃসন্দেহে এটাই যে এর হতচ্ছাড়া গন্ধটা আমার এই বড্ড-বেশি-গন্ধ-পাওয়া নাকের পাটায় সাঙ্ঘাতিক অস্বস্তি তৈরি করে—তা সে যাই হোক, আহা, কী কপাল! সে যে কী অপরূপ সৌভাগ্যের কথা, ভাবা যায়! যখন কারো নাম রাখা হয় কিনা খোদ সেই গোবুর-ধারিণীর নামে!
...১৯১৯ সালের ৬ এপ্রিল, পবিত্র শহর অমৃতসরের বাতাসে কেবলই বিষ্ঠার গন্ধ (কী চমৎকার গন্ধ গো পদ্মা, একেবারে স্বর্গীয়!) ভুরভুর করছিল। আর হয়তো এই (কী অপরূপ!) কটু গন্ধটা আমার দাদুর মুখের ওই পেল্লায় নাকটায় খুব একটা অস্বস্তিও ধরিয়ে দেয়নি—কারণ ওই যে একটু আগেই বললাম, কাশ্মীরের চাষিরা তো এটাকে একধরনের পলেস্তারা হিসেবেই কাজে লাগাত। এমনকী শ্রীনগরেও ঠেলাগাড়িতে করে গোল গোল ঘুঁটে বেচতে-আসা ফেরিওয়ালাদের দেখা পাওয়াটা খুব একটা বিরল কোনো দৃশ্য ছিল না। কিন্তু সে-জিনিস তো তখন বেশ শুকনো, গন্ধহীন, আর কাজের জিনিস। কিন্তু অমৃতসরের গোবর ছিল একেবারে টাটকা আর (তার চেয়েও সাঙ্ঘাতিক কথা হলো) একেবারে অদরকারি। আর এর সবটাই যে স্রেফ গরুর, তা-ও নয়। শহরের ওই একগাদা টাঙ্গা, এক্কা আর ঘোড়ার গাড়ির জোয়ালে-জোতা ঘোড়াগুলোর পেছন থেকে তো বটেই; সেইসঙ্গে খচ্চর, মানুষ আর কুকুর—সবাই মিলে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়ে বিষ্ঠার এক অদ্ভুত ভ্রাতৃত্ববোধে একেবারে মিলেমিশে একাকার হয়ে যেত। তবে হ্যাঁ, গরুরাও ছিল বৈকি: ধুলোভরা রাস্তাঘাট দিয়ে ওইসব পবিত্র গবাদি পশুর দল দিব্যি চরে বেড়াত, প্রত্যেকেই নিজের নিজের এলাকায় টহল দিত, আর ওই গোবর ত্যাগ করেই যেন তারা নিজেদের সীমানার দখলদারি কায়েম করত। আর মাছির তো কথাই নেই! একেবারে এক নম্বর পয়লা সারির জনশত্রু যাকে বলে, এক বিষ্ঠা থেকে আরেক ভাপ-ওঠা তাজা বিষ্ঠায় কেমন ফুর্তিতে ভনভন করে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর ওই হেলাফেলায় ছড়িয়ে-থাকা নৈবিদ্যিগুলোকে নিয়ে যেন মহা আনন্দে মেতে আছে আর সেগুলোর বিতরণ করে চলেছে এদিক-ওদিক। ঠিক ওই মাছিগুলোর মতোই, পুরো শহরটাও যেন গিজগিজ করে চারদিকে ব্যস্ত ছুটোছুটি করছিল। ডাক্তার আজিজ হোটেলের জানালা থেকে মুখ বাড়িয়ে নিচের এই দৃশ্যটা দেখছিলেন; আর ঠিক তখনই মুখে কাপড়-বাঁধা এক জৈন সাধু নিজের সামনের ফুটপাতটা ডালপালার তৈরি একটা ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করতে করতে হেঁটে গেলেন, পাছে ভুল করেও কোনো পিঁপড়ে, কি একটা মাছিও না মাড়িয়ে ফেলেন। রাস্তার ধারের এক খাবারের ঠেলাগাড়ি থেকে মশলা মেশানো মিষ্টি ধোঁয়া ওপরে উঠছিল। ‘গরম পকোড়া, পকোড়া গরম!’ রাস্তার ঠিক ওপাশের একটা দোকান থেকে এক মেমসাহেব রেশমের কাপড় কিনছিল, আর পাগড়ি-পরা কিছু লোক বেশ ড্যাবড্যাব করে তাকেই গিলছিল। নাসিমের—মানে এখনকার নাসিম আজিজের—সাঙ্ঘাতিক মাথা ধরেছিল; এই প্রথমবার ওর কোনো এক ব্যামো, দু-বার ফিরে এল। আসলে, তার সেই শান্ত উপত্যকার বাইরের দুনিয়ার এই যে জীবন, ওর কাছে বোধহয় একটু বড়োসড়ো ধাক্কার মতোই এসে লেগেছিল। ওর বিছানার পাশেই এক জগ তাজা লেবুর পানি রাখা ছিল, আর সেটা বেশ দ্রুতই খালি হয়ে আসছিল। আজিজ জানালার কাছে দাঁড়িয়ে বুক ভরে যেন শহরটার ঘ্রাণ নিচ্ছিলেন। স্বর্ণমন্দিরের চূড়াটা রোদের আলোয় ঝকমক করছে। কিন্তু তাঁর নাকটা… কেমন যেন সুড়সুড় করে উঠল: এখানকার কোনো একটা ব্যাপার যেন ঠিক সুবিধের ঠেকছে না।
আমার দাদুর ডান হাতের এক্কেবারে কাছ থেকে নেওয়া ছবি (ক্লোজ-আপ): নখ, আঙুলের গাঁট, আঙুল—কেমন যেন ধারণার চেয়ে একটু বেশিই বড়োসড়ো। আঙুলের বাইরের দিকের কিনারে লালচে চুলের গুচ্ছ। বুড়ো আঙুল আর তর্জনীটা একে অপরের সঙ্গে চেপে ধরা, মাঝখানে শুধু একখানা কাগজের যা বেধ। সোজা কথায়: আমার দাদু একখানা ইস্তেহার হাতে ধরেছিলেন। ঠিক যখন তিনি হোটেলের হলঘরটায় ঢুকছিলেন কেউ একজন ওটা তাঁর হাতে গুঁজে দিয়েছিল। (আমরা বরং এবার একটা লং-শট নিই—বম্বের লোক হয়ে এইটুকু ফিল্মি ভাষা না জানলে চলে?) একটা বিচ্ছু ছোকরা ঘুরন্ত দরজার মধ্যে দিয়ে সড়সড়িয়ে ঢুকে পড়ল, তার পেছন পেছন ইস্তেহার ঝরে পড়ছে, আর এক চাপরাশি তার পেছনে তাড়া করেছে। দরজাটা বনবন করে ঘুরপাক খাচ্ছে; যতক্ষণ না চাপরাশিটার হাতটাও একটা ক্লোজ-আপ দাবি করে বসল, কারণ সেটার বুড়ো আঙুল আর তর্জনী তখন চেপে ধরেছে, মাঝখানে শুধু ওই বিচ্ছুটার কানের লতি। রাস্তার ওই ইস্তেহার-বিলোনো ছোকরাটাকে কান ধরে সটান বাইরে ছুঁড়ে ফেলা হলো; কিন্তু খবরটা আমার দাদুর কাছে ঠিকই পৌঁছে গেল। এখন, জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে তিনি দেখছেন…সেই একই কথা ওপাশের দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে; ওই দেখুন, মসজিদের মিনারে; আর এক হকারের বগলে খবরের কাগজের কালো মোটা হরফে। ইস্তেহার, খবরের কাগজ, মসজিদ আর চারিদিকের যত দেওয়াল—সব্বাই চেঁচিয়ে বলছে: হরতাল! আক্ষরিক অর্থে যার মানে হলো, শোকের একটা দিন, নিথর হয়ে থাকার দিন, চুপ করে থাকার দিন। কিন্তু এ হলো সেই ভারত, যখন মহাত্মার রমরমা, যখন ভাষাও কিনা গান্ধীজির ইশারায় চলে, আর এই শব্দটাও তাঁর প্রভাবে এক নতুন মানে পেয়ে গেছে। হরতাল—এপ্রিলের ৭ তারিখ, মসজিদ, খবরের কাগজ, দেওয়াল আর ইস্তেহার—সব্বাই একমত, কারণ গান্ধীজি হুকুম দিয়েছেন, গোটা ভারতবর্ষ সেদিন থেমে থাকবে। শান্তিতে শোক পালন করতে হবে, ইংরেজরা যে এখনও জাঁকিয়ে বসে আছে, তারই জন্য।
‘কেউ তো মারা-টারা যায়নি, তবু এই হরতালের মাথামুণ্ডু আমি কিছুই বুঝতে পারছি না,’ নাসিম ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ‘ট্রেন কেন চলবে না? আমাদের আর কতক্ষণ এভাবে আটকে থাকতে হবে কে জানে!’
রাস্তায় সেপাই-গোছের এক জোয়ান ছোকরাকে দেখে ডাক্তার আজিজের মনে হলো—এই যে দেশি লোকগুলো, ইংরেজদের হয়ে লড়ে এল; এদের মধ্যে কতজনই তো এতদিনে দুনিয়াটা দেখে ফেলেছে, গায়ে বিলিতি হাওয়া লেগেছে। এরা আর অত সহজে সেই পুরনো জগতে ফিরে যাবে না। ইংরেজরা যে ঘড়ির কাঁটা উল্টোদিকে ঘোরানোর চেষ্টা করছে, এটা তারা ঠিক করছে না। ‘রাওলাট আইনটা এনে ওরা মস্ত এক ভুল করে ফেলল,’ তিনি আপনমনে বিড়বিড় করে বললেন।
‘কীসের রাওলাট?’ নাসিম একেবারে ঘ্যানঘ্যান করে উঠল। ‘রাওলাট-ফাওলাট! আমার কাছে এসব বাজে বকওয়াস!’
‘রাজনৈতিক হাঙ্গামার বিরুদ্ধে,’ আজিজ খোলসা করে বললেন, আর তারপর আবার নিজের ভাবনাচিন্তায় ডুব দিলেন। তাই একবার তাঁকে বলেছিল: ‘কাশ্মীরিরা একটু অন্য ধাতের মানুষ হয়। এই ধরো, একেবারে ভিতুর ডিম। কোনো কাশ্মীরির হাতে একটা বন্দুক ধরিয়ে দিলে সেটা যদি নিজে থেকে না চলে তো রইল পড়ে,—সে ব্যাটার ওই ট্রিগার টেপার সাহসটুকু কোনোদিন হবে না। আমরা বাপু ওইসব হিন্দুস্তানিদের মতো নই যে কথায় কথায় খালি লড়ালড়ি আর হাঙ্গামা মারামারি।’ মনের ভেতর তাইয়ের ওই কথাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছিল বলে আজিজ নিজেকে ঠিক ‘হিন্দুস্তানি’ বলে ভাবতে পারছিলেন না। তা ছাড়া সত্যি কথা বলতে কী, কাশ্মীর তো আর পুরোপুরিভাবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কোনো খাস তালুক নয়, বরং দিব্যি একটা স্বাধীন দেশীয় রাজ্য। তাই তিনি এখন একটা পরাধীন মুলুকে এসে পড়লেও, ওই ইস্তাহার-মসজিদ-দেওয়াল-খবরের কাগজের ডাকা হরতালটা আদৌ তাঁর নিজের লড়াই কি না, সে-ব্যাপারে তিনি ঠিক মনস্থির করে উঠতে পারলেন না। তিনি জানালা থেকে মুখ ফেরালেন…
... দেখলেন নাসিম বালিশে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। বিয়ের পর দ্বিতীয় রাতে তিনি যখন ওকে একটুখানি নড়াচড়া করতে বলেছিলেন, ঠিক তখন থেকেই ওর এই কান্নাকাটির সূত্রপাত।
‘কোথায় নড়ব?’ সে জিজ্ঞেস করেছিল। ‘কীভাবে নড়ব?’ তিনি একটু অপ্রস্তুত হয়েই বলেছিলেন, ‘এমনিই একটু নড়াচড়া, মানে…, একটা মেয়ের মতো আরকী…’ আতঙ্কে সে একেবারে চেঁচিয়ে উঠেছিল। ‘ও মা গো, এ আমি কাকে বিয়ে করলাম গো! আমি আপনাদের মতো ওই বিলেতফেরত মদ্দগুলোকে খুব ভালো করে চিনি। আপনারা কোত্থেকে সব উটকো আজেবাজে মেয়েছেলেদের জুটিয়ে আনবেন, আর তারপর আমাদের মতো ভালো ঘোরের মেয়েদেরকেও ঠিক ওদের মতো বানাতে চাইবেন! শুনুন, ডাক্তার সাহেব, সোয়ামি-টোয়ামি যা-ই হোন, আমি অমন কোনো... ছ্যা-ছ্যা গোছের মেয়েমানুষ নই।’ এই একটা লড়াই আমার দাদু কোনোদিনও জিতে উঠতে পারেননি; আর এটাই তাঁদের দাম্পত্য জীবনের মেজাজটাকে একেবারে বেঁধে দিয়েছিল। তাদের সেই বিয়েটা খুব শিগগিরই ঘনঘন আর সাঙ্ঘাতিক সব কুরুক্ষেত্রের এক আখড়া হয়ে দাঁড়াল, আর সেই যুদ্ধের ধকল সইতে সইতে ওই চাদরের আড়ালের কচি মেয়েটা আর ওই আনাড়ি ছোকরা ডাক্তার—দুজনেই খুব দ্রুত একেবারে অন্যরকম, অচেনা দুটো মানুষ হয়ে উঠল... ‘আবার কী হলো গিন্নি?’ আজিজ জিজ্ঞেস করলেন। নাসিম বালিশের ভেতর মুখ গুঁজে রাখল। ‘কী হবে আবার?’ মুখ-গোঁজা চাপা গলায় সে বলল। ‘আপনি, নয়তো আর কী? আপনিই তো চান… আমি যেন অচেনা ব্যাটাছেলেদের সামনে একেবারে উলঙ্গ হয়ে হেঁটে বেড়াই।’ (তিনি আসলে ওঁকে পরদা প্রথা ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে বলেছিলেন।)
তিনি বলেন, ‘তোমার জামা তো গলা থেকে কবজি হয়ে একেবারে হাঁটু অবধি তোমাকে ঢেকে রাখে। তোমার ওই ঢিলেঢালা পাজামা তো গোড়ালি-সুদ্ধু নিচের দিকটা পুরোই আড়াল করে দেয়। তাহলে বাকি পড়ে রইল কেবল তোমার মুখখানা আর পা-দুটো। তা গিন্নি, তোমার মুখ আর পা কি খুব অশ্লীল কোনো জিনিস?’ কিন্তু সে একেবারে কেঁদে ককিয়ে ওঠে, ‘ওরা যে তার চেয়েও বেশি কিছু দেখে ফেলবে! ওরা যে আমার একেবারে বুকের ভেতরের লজ্জাটা দেখে ফেলবে!’
আর এবার এমন এক দুর্ঘটনা ঘটল, যা আমাদের সোজা মার্কিউরোক্রমের দুনিয়ায় ছুঁড়ে ফেলল... নিজের রাগের ওপর আর কোনো রাশ টানতে না পেরে আজিজ তাঁর স্ত্রীর সুটকেস থেকে তার পরদার সমস্ত বোরখা আর নেকাবগুলো টেনে বার করলেন, তারপর সেগুলোকে ছুঁড়ে ফেললেন টিনের তৈরি একটা বাতিল কাগজের ঝুড়িতে—যার একপাশে আঁকা ছিল গুরু নানকের ছবি—আর তাতে সটান আগুন ধরিয়ে দিলেন। দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠল, আর তাঁকে একেবারে চমকে দিয়ে সেই আগুনের লেলিহান জ্বিহ্বা স্পর্শ করল জানালার পরদাগুলোকে। সস্তার পরদাগুলো দাউদাউ করে জ্বলে উঠতে দেখে আদম ছুট লাগালেন দরজার দিকে, আর সাহায্যের জন্য চেঁচাতে শুরু করলেন... অমনি বেয়ারা, অতিথি, ধোপানিরা সব হুড়মুড় করে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ল এবং হাতের কাছে যে যা পেল—ঝাড়ন, তোয়ালে, অন্য লোকেদের কাচা জামাকাপড়—তা দিয়েই জ্বলন্ত কাপড়ের ওপর আছড়ে আছড়ে আগুন নেভানোর কসরত করতে লাগল। বালতি বালতি পানি আনা হলো; আগুন নিভল; প্রায় পঁয়ত্রিশজন শিখ, হিন্দু আর অচ্ছুত মানুষ ধোঁয়ায়-ভরা ঘরটায় যতক্ষণ ভিড় করে দাঁড়িয়ে রইল, নাসিম একেবারে বিছানায় সেঁধিয়ে গুটিসুটি মেরে বসে রইল। শেষমেষ লকগুলো সব বিদায় হলো, আর নাসিম স্রেফ দুটো বাক্যবাণ ছুঁড়ে দিয়ে একগুঁয়ের মতো নিজের ঠোঁটদুটো একেবারে শক্ত করে চেপে রইল।
‘আপনি একটা বদ্ধ পাগল বটে। আমার আরও লেবুর শরবত চাই।’
আমার দাদু জানলাগুলো সব খুলে দিয়ে তাঁর নতুন বউয়ের দিকে ফিরলেন। ‘এই ধোঁয়া বেরোতে এখনও বেশ খানিকটা সময় লাগবে; আমি বরং একটু হেঁটে আসি। তুমি আসবে নাকি?’ ঠোঁটদুটো একেবারে শক্ত করে চাপা; চোখদুটো খিঁচিয়ে বন্ধ, স্রেফ মাথা নেড়ে সপাটে একটা ‘না’ জানিয়ে দেওয়া হলো; আর অগত্যা আমার দাদু একাই রাস্তায় বেরিয়ে পড়লেন। যাওয়ার বেলায় তাঁর শেষ কথাটা ছিল: ‘ওই সুবোধ কাশ্মীরি মেয়ে হয়ে থাকার কথা এবার মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো। বরং এখন থেকে কীভাবে একজন আধুনিকা ভারতীয় নারী হওয়া যায়, সেই কথা ভাবতে শুরু করো।’
...আর ঠিক সেই সময়েই ওদিকে ক্যান্টনমেন্ট এলাকায়, ব্রিটিশ সেনার সদর দপ্তরে বসে, জনৈক ব্রিগেডিয়ার আর. ই. ডায়ার নিজের গোঁফে তা দিচ্ছিলেন।
৭ এপ্রিল, ১৯১৯। অমৃতসরে মহাত্মার সেই মহান পরিকল্পনাটা ক্রমশ কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। দোকানপাট সব বন্ধ; রেলস্টেশনও স্তব্ধ; কিন্তু তা সত্ত্বেও একদল ক্ষ্যাপাটে দাঙ্গাবাজ লোক সবকিছু ভাঙচুর করে বেড়াচ্ছে। ডাক্তার আজিজ তাঁর সেই চামড়ার ব্যাগখানা হাতে ঝুলিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছেন, যেখানে যেমন প্রয়োজন সাধ্যমতো সাহায্য করে চলেছেন। পায়ের তলায় পিষে-যাওয়া মানুষগুলো যে যেখানে ছিল, সেখানেই পড়ে আছে। তিনি ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ বাঁধছেন, আর তাতে দেদারসে মার্কিউরোক্রম মাখিয়ে দিচ্ছেন, এতে অবশ্য সেগুলো আগের চেয়ে আরও বেশি রক্তারক্তি দেখাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ঘা-গুলো তো বিষিয়ে যাওয়া থেকে বাঁচছে। শেষমেশ লাল দাগে মাখামাখি জামাকাপড় নিয়ে তিনি যখন হোটেলের ঘরে ফিরলেন, তখন নাসিম তো আতঙ্কে একেবারে দিশেহারা। ‘দেখি দেখি, আমায় দেখতে দিন, ইয়া আল্লাহ, কী মানুষকেই যে বিয়ে করেছি আমি, যে কিনা গলিতে গলিতে গুন্ডাদের সঙ্গে লড়তে যায়!’ জলে ভেজানো তুলোর ডেলা নিয়ে সে একেবারে তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ‘আমি তো ছাই বুঝতেই পারি না, আপনি আর পাঁচজন ভালোমানুষ ডাক্তারদের মতো থাকতে পারেন না কেন? তারা কেমন-সব মস্ত মস্ত ব্যারাম-ট্যারাম সারায়? ও মা গো, এ যে দেখি সর্ব্বাঙ্গে রক্ত! বসুন, একটু স্থির হয়ে বসুন তো, আগে আপনাকে ধুইয়ে-মুছিয়ে দিই ভালো করে!’
‘এগুলো রক্ত নয় গিন্নি।’
‘আপনি কি ভেবেছেন আমি নিজের চোখে কিছুই দেখতে পাচ্ছি না? চোট পেয়েছেন তো পেয়েছেন, তা বলে আমাকে এমন বোকা বানানোর কী দরকার? নিজের বউ কি একটু দেখাশোনাও করতে পারবে না?’
‘এগুলো মার্কিউরোক্রম, নাসিম। লাল ওষুধ।’
নাসিম—যে কিনা ততক্ষণে একেবারে ঝড়ের মতো জামাকাপড় টেনেটুনে, কলের পানি খুলে দিয়ে হুলুস্থুলু কাণ্ড বাঁধিয়ে ফেলেছিল—সে একেবারে জমে পাথর হয়ে গেল। ‘আপনি ইচ্ছে করেই এসব করেন,’ সে বলল, ‘যাতে আমাকে একটা আস্ত বোকা বলে মনে হয়। আমি মোটেই বোকা নই। আমিও ঢের বইপত্তর পড়েছি।’
এসে গেল এপ্রিলের ১৩ তারিখ, অন্যদিকে তাঁরা এখনও অমৃতসরেই আটকে আছেন। ‘এসব হাঙ্গামা এখনও মেটেনি,’ আদম আজিজ নাসিমকে বললেন। ‘বুঝতেই তো পারছ, আমরা এখন এখান থেকে যেতে পারি না: আবার কখন ডাক্তার-ফাক্তারের দরকার পড়ে যায়, কে জানে।’
‘তাহলে আমাদের এখানেই বসে বসে দুনিয়া ধ্বংস হওয়া অবধি অপেক্ষা করতে হবে?’
তিনি নিজের নাকটা একটু ঘষলেন। ‘না, আমার তো মনে হয় না ততটা সময় লাগবে।’
সেদিন বিকেলে, ডায়ারের নতুন জারি-করা সামরিক আইনের তোয়াক্কা না করে, আচমকাই রাস্তাঘাটে লোকে লোকারণ্য হয়ে গেল, সবাই একই দিকে চলেছে। আদম, নাসিমকে বললেন: ‘নিশ্চয়ই কোনো সভার জোগাড়যন্তর হয়েছে—এবার ফৌজ-টৌজ এসে ঠিক ঝামেলা বাঁধাবে। ওরা তো সবরকম সভা-সমিতি নিষিদ্ধ করে দিয়েছে।’
‘তা আপনাকে সেখানে কেন যেতে হবে শুনি? ডাক আসা অবধি সবুর করতে কী দোষ?’
...একটা কম্পাউন্ড, মানে সে পোড়োজমি থেকে শুরু করে আস্ত একটা পার্ক—যেকোনো কিছুই হতে পারে। অমৃতসরের সবচেয়ে বড়ো কম্পাউন্ডটার নাম হলো জাল্লিয়ানওয়ালা বাগ। সেখানে অবশ্য ঘাসের ছিটেফোঁটাও নেই। চারদিকে কেবল পাথর, টিনের কৌটো, কাচের টুকরো আর এইরকম সব হাবিজাবি জিনিসপত্র ছড়ানো। তার ভেতরে ঢোকার রাস্তা বলতে দুটো বাড়ির মাঝখান দিয়ে যাওয়া একটা বড্ড সরু গলি। ১৩ই এপ্রিল, হাজার হাজার ভারতীয় ওই সরু গলিটা দিয়ে হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকছে।
‘এটা একটা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ,’ কেউ একজন ডাক্তার আজিজকে জানাল। ভিড়ের তোড়ে ভাসতে ভাসতে তিনি ওই গলির মুখে এসে পৌঁছলেন। তাঁর ডান হাতে হাইডেলবার্গ থেকে আনা সেই ব্যাগটা। (এক্ষেত্রে কোনো ক্লোজ-আপের দরকার নেই।) আমি জানি, তিনি তখন বেজায় ভয় পাচ্ছিলেন, কারণ তাঁর নাকের সুড়সুড়িটা ততক্ষণে অতীতের সব রেকর্ড ছাপিয়ে সাঙ্ঘাতিক আকার নিয়েছে; কিন্তু তিনি তো একজন পোড়খাওয়া ডাক্তার, তাই ওসব ভাবনা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে তিনি সটান কম্পাউন্ডের ভেতর ঢুকে পড়লেন। কেউ একজন বড্ড আবেগ ঢেলে বক্তৃতা দিচ্ছে। ফেরিওয়ালারা ভিড়ের ভেতর দিয়ে ছোলা আর মিষ্টি বিক্রি করে বেড়াচ্ছে। বাতাসে ধুলো উড়ছে। আমার দাদুর চোখ যতদূর গেল, তাতে অন্তত কোনো গুন্ডা বা হাঙ্গামা-বাঁধানো লোকের দেখা মিলল না। একদল শিখ মাটিতে একটা কাপড় বিছিয়ে গোল হয়ে বসে খাওয়াদাওয়া করছে। বাতাসে তখনও সেই বিষ্ঠার গন্ধটা ম’ ম’ করছে।
আজিজ ভিড়ের একেবারে মাঝখানটায় সেঁধিয়ে গেলেন, আর ঠিক সেই সময়েই পঞ্চাশজন দুঁদে সৈন্য নিয়ে গলির মুখে এসে হাজির হলেন স্বয়ং ব্রিগেডিয়ার আর. ই. ডায়ার। তিনি হলেন অমৃতসরের সামরিক আইনের খোদ কম্যান্ডার—আদপে একজন রীতিমতো হোমরাচোমরা মানুষ; তাঁর সযত্নে তা-দেওয়া গোঁফের ডগা দুটোও যেন সেই গুরুত্বের বহরে একেবারে টানটান হয়ে আছে। ওই একান্নজন মানুষ লম্বা লম্বা পায়ে গলি দিয়ে এগোতেই আমার দাদুর নাকের সেই সুড়সুড়িটা ক্রমশ এমন একটা অস্বস্তিকর শিরশিরানিতে গিয়ে ঠেকল। একান্নজন মানুষ প্রাঙ্গণে ঢুকে নিজেদের জায়গা নিল, ডায়ারের ডানদিকে পঁচিশজন আর বাঁ-দিকে পঁচিশজন; ওদিকে আদম আজিজের নাকের শিরশিরানিটা এমন অসহ্য হয়ে উঠল যে তাঁর আশেপাশে কী হচ্ছে না হচ্ছে, সেদিকে কোনো হুঁশ রইল না। ব্রিগেডিয়ার ডায়ার যেই না হাঁক পেড়ে হুকুম দিয়েছেন, অমনি সাঙ্ঘাতিক এক হাঁচি এসে আমার দাদুকে একেবারে কাবু করে ফেলল।
‘ইয়াআআখ-থুউউউ!’ সশব্দে একটা হাঁচি দিয়ে টাল সামলাতে না পেরে, নিজের নাকের ঝোঁকেই তিনি হুমড়ি খেয়ে সামনের দিকে পড়ে গেলেন, আর সেই দৌলতেই তাঁর প্রাণটা সে-যাত্রায় বেঁচে গেল। তাঁর সেই ‘ডাক্তারি-ব্যাগ’ ছিটকে খুলে গেল; আর শিশিবোতল, মলম, সিরিঞ্জ সব ধুলোয় গড়াগড়ি খেতে লাগল। পায়ের তলায় পিষে যাওয়ার আগেই নিজের জিনিসপত্রগুলো বাঁচানোর জন্য তিনি একেবারে মরিয়া হয়ে লোকজনের পায়ের ফাঁকে হাতড়ে বেড়াতে লাগলেন। শীতে দাঁতে দাঁত ঠকঠক করার মতো একটা আওয়াজ হলো, আর কেউ একজন তাঁর গায়ের ওপর এসে পড়ল। কী একটা লাল জিনিসে তাঁর জামাটা মাখামাখি হয়ে গেল। এবার চারদিক থেকে কেবল চিৎকার আর ফুঁপিয়ে কাঁদার শব্দ, আর তার সঙ্গে ওই খটখট অদ্ভুত শব্দটা সমানে বেজেই চলেছে। মনে হলো, আরও অনেক মানুষ যেন হুড়মুড় করে এসে আমার দাদুর গায়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। নিজের পিঠটার কথা ভেবে তাঁর এবার বেশ ভয় হতে লাগল। তাঁর ব্যাগের বকলসটা তাঁর বুকের ভেতর এমনভাবে বিঁধে যাচ্ছিল যে সেখানে সাঙ্ঘাতিক রহস্যময় একটা কালশিটে পড়ে গেল, যে-দাগটা কিনা বছরের পর বছর পেরিয়ে রয়ে গেছিল, শঙ্করাচার্য বা তখত-ই-সুলেমানের পাহাড়ের চূড়ায় তাঁর মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তা আর মিলিয়ে যায়নি। লাল বড়ি-ভরা একটা শিশির গায়ে তাঁর নাকটা একেবারে থেঁতলে লেপটে ছিল। ওই খটখট শব্দটা একসময় থামল, আর তার জায়গা নিল কেবল মানুষ আর পাখিদের আওয়াজ। যানবাহনের কোনো শব্দ যেন আর কান অবধি পৌঁছোচ্ছিল না। ব্রিগেডিয়ার ডায়ারের সেই পঞ্চাশজন সৈন্য নিজেদের মেশিনগান নামিয়ে রেখে চলে গেল। তারা ওই নিরস্ত্র ভিড়টার ওপর সব মিলিয়ে এক হাজার ছ-শো পঞ্চাশ রাউন্ড গুলি চালিয়েছে। এর মধ্যে এক হাজার পাঁচশো ষোলোটা গুলি একেবারে ঠিকঠাক নিশানায় গিয়ে লেগেছে, সেগুলো কাউকে না কাউকে হয় মেরেছে নয় জখম করেছে। ‘চমৎকার গুলি চালিয়েছ,’ ডায়ার তাঁর লোকদের বললেন, ‘আমরা আজ একখানা জব্বর কাজ করে ফেলেছি।’
সেদিন রাতে দাদু যখন বাড়ি ফিরলেন, দিদিমা তখন তাঁকে খুশি করার তাগিদে একজন ‘আধুনিকা নারী’ হয়ে ওঠার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন; আর তাই দাদুর ওরকম চেহারা দেখেও তিনি এতটুকু বিচলিত হলেন না। ‘বুঝতেই পারছি, আপনি আবার ওই লাল ওষুধটা (মার্কিউরোক্রম) উলটে ফেলেছেন, কী যে অগোছালো আপনি,’ বেশ একটু মানিয়ে নেওয়ার সুরেই তিনি বললেন।
‘এগুলো রক্ত,’ দাদু জবাব দিলেন, আর কথাটা শুনেই দিদিমা অজ্ঞান হয়ে গেলেন। একটুখানি স্যাল ভোলাটাইলের সাহায্যে দাদু যখন তাঁর জ্ঞান ফেরালেন, তখন দিদিমা বলে উঠলেন, ‘আপনার কি চোট লেগেছে?’
‘না,’ দাদু বললেন।
‘কিন্তু আপনি গিয়েছিলেন কোথায়, হে ভগবান?’
‘এই পৃথিবীর কোথাও নয়,’ দাদু বললেন, আর তারপরেই দিদিমার দু-হাতের মধ্যে থরথর করে কাঁপতে লাগলেন।
সত্যি বলতে কী, আমার নিজের হাতটাই এখন কাঁপতে শুরু করেছে; কেবল যে লেখার বিষয়বস্তুর জন্যই এমনটা হচ্ছে তা নয়, বরং আমি খেয়াল করলাম, আমার কবজির চামড়ার ঠিক নিচে কেমন চুলের মতো সরু একটা ফাটল দেখা দিয়েছে... তাতে অবশ্য কিছু যায় আসে না। মৃত্যুর কাছে তো আমাদের সবারই একটা জীবন ধার মেটানোর থাকে। তাই একটা প্রমাণ-না-থাকা গুজব দিয়েই বরং এই প্রসঙ্গের ইতি টানি। দাদু কাশ্মীর ছাড়ার পরপরই সেই মাঝি তাই তার ওই সাঙ্ঘাতিক চর্মরোগ থেকে সেরে উঠেছিল ঠিকই, কিন্তু ১৯৪৭ সালের আগে তার মৃত্যু হয়নি। লোকমুখে শোনা যায়, তার নিজের ওই উপত্যকা নিয়ে ভারত আর পাকিস্তানের হানাহানি দেখে সে নাকি একেবারে খেপে আগুন হয়ে গিয়েছিল, আর তারপর স্রেফ ওই দুই পক্ষের সেনাদলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তাদের দু-কথা শুনিয়ে দেওয়ার জন্যই সে সটান হেঁটে ছাম্ব-এ গিয়ে হাজির হয়েছিল। কাশ্মীর কেবল কাশ্মীরিদের: এই ছিল তার মোদ্দা কথা। তো যা হওয়ার তাই হলো, ওরা স্বাভাবিকভাবেই তাকে গুলি করে দিল। অস্কার লুবিন হয়তো তার এই নাটকীয় হাবভাবের বেশ তারিফই করত; আর আর. ই. ডায়ার নির্ঘাত তার ওই খুনিদের হাতের নিশানার সাবাশি দিত।
এবার আমাকে শুতে যেতেই হবে। পদ্মা অপেক্ষা করছে; আর এখন আমারও যে একটুখানি ওমের বড্ড দরকার।
মধ্যরাতের সন্তানেরা
সালমান রুশদি
▋অনুবাদ: দীপ মন্ডল
সালমান রুশদি
▋অনুবাদ: দীপ মন্ডল




মন্তব্য