.header-button .inner > span { font-size: 18px !important; } .header-button .inner i.fa { font-size: 40px !important; } .comment-form-message { background-color: #f4f4f4 !important; font-size: 14px !important; }

$type=ticker$count=12$cols=4$cate=0$sn=0$show=post

ঘ্রাণ ফিল্টার [ছোটোগল্প] • সাঈদ বিলাস

ঘ্রাণ ফিল্টার [ছোটোগল্প] • সাঈদ বিলাস
আমি যখন ‘অলফ্যাক্টরি ল্যাবস’-এ ইন্টারভিউ দিতে যাই, তখন আমার ধারণা ছিল এটা সাধারণ কোনো পারফিউম কোম্পানি। গুলশানের একটা কাঁচঘেরা বহুতল ভবনের ১৬ তলায় ওদের অফিস। চারপাশটা এত সাদা এবং এত নিখুঁত যে মনে হয় কোনো হাসপাতালের আইসিইউ। ইন্টারভিউ বোর্ডে বসা সায়েন্টিস্ট সুস্মিতা দেবী আমাকে প্রথম প্রশ্নটাই করেছিলেন, “সায়ান, শেষ কবে তোমার মার হাতের রান্নার গন্ধ পেয়েছ?”
আমি একটু অবাক হয়ে বলেছিলাম, “মা তো মারা গেছেন চার বছর আগে। এখন আর গন্ধ পাওয়ার সুযোগ কই?”
সুস্মিতা দেবী হাসলেন না। ওনার ল্যাপটপটা ঘুরিয়ে আমার দিকে একটা গ্রাফ দেখালেন। বললেন, “তুমি ভুল জানো। সুযোগ আছে। আমরা এখানে পারফিউম বানাই না, সায়ান। আমরা মানুষের মেমোরি হাইজ্যাক করি।”
চাকরিটা আমি পেয়েছিলাম। আমার পদের নাম ছিল 'সিনিয়র সেন্সরি আর্কিটেক্ট'। কাজটা অদ্ভুত কিন্তু মারাত্মক আকর্ষণীয়। ডেটা অ্যানালিসিস করে বের করা — কোন বয়সের, কোন ক্লাসের মানুষের মগজ কোন ঘ্রাণে সবচেয়ে বেশি দুর্বল!
আমরা যে অ্যাপ বা ডিভাইসগুলো ব্যবহার করি, সেগুলো কেবল আমাদের কথা শোনে না বা স্ক্রিন ট্র্যাক করে না। ওগুলো আমাদের শরীরের মাইক্রো-সোয়েট (সূক্ষ্ম ঘাম) এবং আশপাশের বাতাসের আর্দ্রতাও রিড করে। আমাদের মূল প্রজেক্টের নাম ছিল— “প্রজেক্ট অ্যানামনেসিস”।
সুস্মিতা আপা বললেন, সহজ ভাষায় বুঝাই। ধরো, তুমি মাঝরাতে একা বসে ল্যাপটপে কাজ করছো। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। ঠিক তখন তোমার ফোনে একটা নোটিফিকেশন এলো— সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা পুরনো ছবি স্পনসরড পোস্ট হিসেবে তোমার সামনে ভেসে উঠলো। সাথে সাথে তোমার ঘরের কোনায় রাখা স্মার্ট এয়ার-পিউরিফায়ার থেকে খুব হালকা একটা ভেজা মাটির গন্ধ বের হলো। তুমি নিজেও টের পেলে না যে গন্ধটা পিউরিফায়ার থেকে আসছে, তোমার অবচেতন মন ভাবলো এটা জানালার বাইরের বৃষ্টিতে ভেজা মাটির গন্ধ। এই দুটো জিনিস যখন একসাথে তোমার মগজে হিট করবে, তোমার ভেতর একটা তীব্র একাকীত্ব আর ফেলে আসা দিনের জন্য নস্টালজিয়া তৈরি হবে। তখন হয়তো তোমার অবচেতন মনে ছোটবেলার কোনো একটা খাবারের ক্ষুধা ট্রিগার দিয়ে উঠবে, তোমার ওই খাবারটার ক্রেভিংস উঠবে কিংবা বৃষ্টির দিনে কোথাও প্রচণ্ড বেড়াতে ইচ্ছে করবে! ঠিক তখনই স্ক্রিনের নিচে একটা অপশন আসবে— “অর্ডার ফুড নাও” কিংবা একটা ট্রাভেল এজেন্সির টিকিট বুকিংয়ের বিজ্ঞাপন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তুমি অর্ডার কিংবা বুকিং বাটনে ক্লিক করে বসবে।
বিজ্ঞান একে বলে অলফ্যাক্টরি ট্রিগার। মানুষ চোখ বন্ধ করতে পারে, কান বন্ধ করতে পারে, কিন্তু শ্বাস নেওয়া বন্ধ করতে পারে না। গন্ধ সরাসরি মানুষের মগজের 'অ্যামিগডালা' আর 'হিপোক্যাম্পাস'-এ আঘাত করে, যেখানে আমাদের আবেগ আর স্মৃতি জমা থাকে। যুক্তিবুদ্ধি খাটানোর কোনো সুযোগই মগজ পায় না।
সুস্মিতা আপা একদিন ল্যাবে কফি খেতে খেতে আমাকে বললেন, "সায়ান, আজকের দুনিয়ায় মানুষকে দিয়ে জিনিস কেনাতে হলে তাকে আগে একাকীত্বে ভোগাতে হবে। এই একাকীত্ব একা থাকা না কিন্তু, এটা হলো একজন মানুষকে ভেতর থেকে শূন্যতার ভিত্রে ফেলা, যাতে হাজার মানুষের ভিত্রে থেকেও লোকে চূড়ান্ত একাকীত্বের সাগরে হাবুডুবু খায়! যে মানুষটা মোটামুটি সুখী, ভেতরে থেকে যে যতবেশি ভরাট, প্রয়োজনের বাইরে সে তত কম কেনাকাটা করে। যে মানুষটা নিজের পরিবার, বন্ধুবান্ধব নিয়ে সুখে আছে, সে বাজারে গিয়ে স্রেফ চাল-ডাল কিনে বাসায় ফিরবে। কিন্তু যে মানুষটা একাকী, ভেতরে একটা শূন্যতা আছে, সে সেই শূন্যতা ঢাকতে দামি গ্যাজেট কিনবে, অপ্রয়োজনীয় জামাকাপড় কিনবে। আর এই একাকীত্ব বা নস্টালজিয়া কৃত্রিমভাবে তৈরি করার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো ঘ্রাণ।"
আমি টেবিলের ওপর রাখা টেস্ট টিউবগুলো দেখছিলাম। প্রতিটার গায়ে কোড লেখা।
"এগুলো কীসের কোড, আপা?"
উনি একটা টিউব তুলে নিলেন। ওটার গায়ে লেখা BD-90-R। "এটা হলো নব্বইয়ের দশকের বাংলাদেশের ডেটা। এই টিউবটা স্প্রে করলে বাতাসে একটা গন্ধ ছড়াবে—যেটা ঠিক রোদে দেওয়া লেপ-তোশক, পুরনো খাতার পাতা আর শীতের সকালের রোদের একটা কম্বিনেশন। এটা আমরা রেডি করেছি মূলত পঁয়ত্রিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সীদের জন্য।“ 
সুস্মিতা আপা আমাকে ল্যাবের কাচঘেরা একটা রুমে নিয়ে গেলেন। বাইরে থেকে মনে হচ্ছিল ছোট্ট একটা ড্রইংরুম। ভেতরে একজন মাঝবয়সী লোক সোফায় বসে মোবাইল স্ক্রল করছে। তার সামনে একটা কফির কাপ। দেওয়ালে ঝোলানো টিভিতে নিঃশব্দে একটা সমুদ্রসৈকতের ভিডিও চলছে। 
আপা কাচের ওপাশ থেকে বললেন, "Subject–42। পেশায় ব্যাংকার। গত তিন মাস ধরে প্রতিদিন অফিস আর বাসা ছাড়া কোথাও যায়নি।" আমি মনিটরের দিকে তাকালাম। স্ক্রিনে লোকটার হার্টরেট, স্কিন কন্ডাক্ট্যান্স আর চোখের মণির প্রসারণ রিয়েল-টাইমে উঠছে। আপা খুব শান্ত গলায় বললেন, "BD-90-R... মাত্র শূন্য দশমিক তিন মিলিলিটার।" কয়েক সেকেন্ড পর ভেন্টিলেশন দিয়ে অদৃশ্য একটা গন্ধ ছড়িয়ে গেল। লোকটা প্রথমে কিছুই বুঝল না। তারপর ধীরে ধীরে ফোনটা নামিয়ে রাখল। বুক ভরে একটা শ্বাস নিল। অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর নিজের অজান্তেই হাসল। আবার সেই হাসিটা মিলিয়ে গেল। ঠিক তখনই টিভির স্ক্রিনে সমুদ্রসৈকতের ভিডিওটা বদলে গিয়ে একটা রিসোর্টের বিজ্ঞাপন ভেসে উঠল। লোকটা একবারও চারপাশে তাকাল না। সরাসরি মোবাইলটা হাতে তুলে বুকিং বাটনে চাপ দিল। পুরো ঘটনাটা ঘটতে সময় লাগল মাত্র আটচল্লিশ সেকেন্ড। সুস্মিতা আপা তখন আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "এখন বুঝেছ, বিজ্ঞাপন কখনো মানুষকে রাজি করায় না। আমরা আগে স্মৃতিকে রাজি করাই। আর রিসোর্টগুলোর সাথে আমাদের টাই-আপ আছে, ওদের সেন্ট-ডিফিউজারে আমাদের এই কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়।"
আমি একটু ইতস্তত করে বললাম, "আপা... এটা কি মানুষের অনুভূতি নিয়ে খেলা না?" উনি কফির মগটা নামিয়ে রাখলেন। আশ্চর্য হয়ে বললেন, "খেলা!" তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন, "সায়ান, ফেসবুক তোমাকে কী দেখাবে, সেটা কি তুমি ঠিক করো?" আমি চুপ। "ইউটিউবের পরের ভিডিও? নেটফ্লিক্সের পরের সিনেমা? এগুলোও তো অ্যালগরিদম ঠিক করে। আমরা শুধু আরেকটা ইনপুট যোগ করেছি। গন্ধ।" আমি বললাম, "কিন্তু এতে তো মানুষ নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিচ্ছে না।" আপা মাথা নাড়লেন। "মানুষ কোনোদিনই পুরোপুরি নিজে সিদ্ধান্ত নেয় না। ক্ষুধা, ভয়, প্রেম, ধর্ম, স্মৃতি—সবই তো সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। আমরা শুধু সেই সমীকরণটা একটু ভালো বুঝি।" উনি হালকা হেসে বললেন, "এথিকস হলো এমন একটা শব্দ, যেটা বাজার সবসময় লাভের হিসাব শেষ হওয়ার পর মনে করে।"
আমি স্তব্ধ হয়ে ওনার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমরা আসলে একটা অদৃশ্য খাঁচায় বন্দী, যার দেয়ালগুলো তৈরি হয়েছে সুগন্ধি দিয়ে।
ল্যাবে আমার কাজ ছিল মূলত 'লোকাল নোটস' তৈরি করা। আমি ডাটাবেজ ঘেঁটে বের করতাম—পুরনো ঢাকার গলির ভেজা স্যাঁতসেঁতে হাওয়া, বর্ষাকালের প্রথম বৃষ্টিতে পুকুরের পানিতে ভেসে থাকার সময়ের ঘ্রাণ, মায়ের সুতি শাড়ির রোদে পোড়া গন্ধ, ছোটবেলার মায়ের কোলের ঘ্রাণ কিংবা বিকেলের মুড়ি ভাজার সুবাসের কেমিক্যাল ফর্মুলা কী। কৃত্রিমভাবে আমি এগুলো ল্যাবে তৈরি করতাম। কিন্তু কিছুদিন পর আমার নিজের ভেতরেই একটা অদ্ভুত সমস্যা শুরু হলো।
আমি খেয়াল করলাম, আমি কোনো আসল জিনিসের গন্ধ পাচ্ছি না। ল্যাবে সারাদিন সিন্থেটিক কেমিক্যালের তীব্র গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে আমার ঘ্রাণেন্দ্রিয় ক্লান্ত হয়ে গেছে। রাতে বাসায় ফিরে যখন মাটির টবের পুদিনা পাতাটা ডলি, আমার নাক কোনো সিগন্যাল দেয় না। কড়া কফি বানাই, কিন্তু মনে হয় স্রেফ গরম কালো পানি গিলছি। ডাক্তার দেখালাম। ডাক্তার বললেন, একে বলে 'অলফ্যাক্টরি ফ্যাটিগ' বা ঘ্রাণ-অবসাদ। ল্যাবের তীব্র কৃত্রিম সুগন্ধিগুলো আমার মগজের আসল রিসেপ্টরগুলোকে ব্লক করে দিয়েছে।
আমি এক কৃত্রিম কুয়াশায় হারিয়ে যাচ্ছিলাম। আমার তখন খুব ভয় হতে লাগল। মনে হলো, আমি যদি কোনোদিন আমার মায়ের গায়ের আসল গন্ধটা ভুলেও যাই, আমি আর কোনোদিন তা ল্যাবে তৈরি করতে পারব না। আমার তৈরি করা ফর্মুলাগুলো হয়তো নিখুঁত, কিন্তু সেগুলো তো ডেটা, ওটার মধ্যে কোনো প্রাণ নেই।
এরই মধ্যে কোম্পানিতে বড় একটা ঘটনা ঘটল। আমেরিকান একটা মাল্টিন্যাশনাল চেইন শপ আমাদের একটা বড় অর্ডার দিল। ওদের রিকোয়ারমেন্ট ছিল—এমন একটা ঘ্রাণ বানাতে হবে, যেটা শপিং মলে ঢুকলে মানুষের মনে হবে সে তার শৈশবের কোনো নিরাপদ আশ্রয়ে আছে, ফলে সে কোনো চিন্তা না করে ক্রেডিট কার্ড সোয়াইপ করবে।
প্রজেক্টের ডেডলাইনের আগের রাতে আমি একাই ল্যাবে কাজ করছিলাম। সুস্মিতা আপা ওনার কেবিনে ঘুমাচ্ছিলেন। রাত তখন প্রায় আড়াইটা। চারপাশ নিঝুম। আমি কম্পিউটারে Formula_Mother_Hugg_V3 মিক্স করছিলাম। হঠাৎ আমার হাতটা কাঁপল। মনে হলো, আমি কী করছি? এই যে লাখ লাখ মানুষ প্রতিদিন এক অদ্ভুত অস্থিরতা নিয়ে শপিং মলে ঘুরবে, তারা ভাববে তারা নিজেদের শৈশব খুঁজছে, আসলে তারা কিনছে ল্যাবরেটরিতে বানানো গ্লিসারিন আর আইসোপ্রোপাইল অ্যালকোহলের একটা মিশ্রণ!
আমি মিক্সিং কনসোল থেকে হাত সরিয়ে নিলাম। ল্যাবের মেইন ভেন্টিলেশন সিস্টেমের দিকে তাকালাম, যেটা দিয়ে পুরো ১৬ তলার সেন্ট্রাল এয়ারলাইনের পারফিউম কন্ট্রোল করা হয়। আমি জানি না আমার ভেতরে কী ভূত চাপল। আমি মেইন সার্ভারে ঢুকলাম। সেখানে কোম্পানির তৈরি করা সব বাণিজ্যিক 'অস্থিরতা ও নস্টালজিয়া'র ফর্মুলা লোড করা ছিল। আমি কোডিং বদলে দিলাম।
আমি আমাদের ডাটাবেজের সবচেয়ে নিচের ফাইলটা ওপেন করলাম—যেটা কেউ কখনো ব্যবহার করেনি। ফাইলটার নাম ছিল Pure_Zero_1970। এটা কোনো কেমিক্যাল ফর্মুলা ছিল না, এটা ছিল একটা 'নিউট্রালাইজার'। এই গ্যাসটা বাতাসে ছাড়লে চারপাশের সব কৃত্রিম গন্ধ, পারফিউম, ডিটারজেন্টের সুবাস বাতাসে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ভেঙে পানি হয়ে যায়। বাতাসে কোনো কৃত্রিম গন্ধ থাকে না—থাকে শুধু আদিম, নগ্ন, আসল বাতাস। যে বাতাসটা মানুষ সৃষ্টির শুরুতে কিংবা জন্মের সময় প্রথম নিয়েছিল।
আমি রিলিজ বাটনে চাপ দিলাম। লাল রঙের একটা ওয়ার্নিং লাইট জ্বলে উঠল।
Emergency Override Initiated.
স্ক্রিনে লেখা উঠল—
Authorization Required.
আমার হাত ঠাণ্ডা হয়ে গেল। আমি ভেবেছিলাম সিস্টেমটা সহজ হবে! ঠিক তখনই করিডোরে দৌড়ানোর শব্দ পেলাম। সুস্মিতা আপা পাগলের মতোন দৌঁড়াচ্ছেন। উনি দূর থেকে কনসোলের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠলেন, "সায়ান! স্টপ!" আমার আঙুল তখনো কীবোর্ডে। শেষবারের মতো Enter চাপলাম। কয়েক সেকেন্ড কিছুই হলো না। মনে হলো আমি হেরে গেছি। তারপর পুরো ফ্লোরের আলো একবার টিমটিম করে উঠল। ভেন্টিলেশনের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘ, গভীর হিসহিস শব্দ ভেসে এলো। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ১৬ তলার সেন্ট্রাল এসি থেকে একটা বর্ণহীন, গন্ধহীন গ্যাস বের হতে লাগল। সুস্মিতা আপা আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। হঠাৎ ওনার মুখের পেশিগুলো শিথিল হয়ে গেল। উনি বুক ভরে একটা লম্বা শ্বাস নিলেন। ওনার চোখ দুটো কেমন যেন বড় বড় হয়ে গেল।
"সায়ান..." সুস্মিতা আপা ফিসফিস করে উঠলেন, ওনার গলা কাঁপছে। "এই গন্ধটা... এটা কী?"
আমি বললাম, "আপা, এটা কোনো গন্ধ না। এটা আসলে কিছুই না। কোনো পারফিউম নেই এখানে।"
সুস্মিতা আপা ল্যাবের মেঝেতে বসে পড়লেন। ওনার মতো একজন কড়া, প্রফেশনাল কর্পোরেট নারী হুট করে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। উনি ওনার দুই হাত দিয়ে মুখ ঢাকলেন। "সায়ান, আমি আমার নানাবাড়ির সেই খড়ের চালের গন্ধ পাচ্ছি। মাটির চুলার ধোঁয়ার গন্ধ পাচ্ছি। অথচ এখানে তো কোনো কেমিক্যাল নেই... আমি কেন পাচ্ছি?"
আমি বুঝলাম, নিউট্রালাইজার গ্যাসটা যখন ওনার মগজের কৃত্রিম কুয়াশাটা (Olfactory Fog) এক নিমেষে পরিষ্কার করে দিয়েছে, ওনার মগজ এত বছরের জমানো আসল স্মৃতিটাকে নিজে থেকেই রিলিজ করে দিয়েছে। কোনো চাবি লাগেনি, তালাটাই ভেঙে গেছে।
পরদিন সকালে আমাকে কোম্পানি থেকে টার্মিনেট করা হয়। সিকিউরিটি গার্ড দিয়ে আমাকে গুলশানের সেই কাঁচের ভবন থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। সুস্মিতা আপা আমার দিকে তাকাননি, উনি ওনার কেবিনে চুপচাপ বসে ছিলেন। ওনার টেবিলে রাখা কফির মগ থেকে তখনো ধোঁয়া উঠছিল।
এবং হ্যাঁ, ওই দুঃসাহস দেখানোর জন্য, আমার কর্পোরেট ক্যারিয়ারে আজীবনের জন্য লাল কালির দাগ পড়েছিল, ইনফ্যাক্ট আমি আর কোনো চাকরিই করতে পারি নি, জেল হয় নি হয়তো সুস্মিতা আপার ছোটবেলার ওই ঘ্রাণ পাবার বদান্যতায়। আজ এই ঘটনার প্রায় বছর হয়ে গেছে। আমি ঢাকার অদূরে সাভারে একটা ছোট নার্সারি দিয়েছি। সারাদিন মাটি কাটি, গাছে পানি দিই।
চাকরিটা চলে যাওয়ার পর প্রথম কয়েক মাস আমি খুব ভয়ে ছিলাম, আমার নাক কি আর কোনোদিন ঠিক হবে না? কিন্তু প্রকৃতির একটা অদ্ভুত হিলিং পাওয়ার আছে। এই দুই বছর মাটির গন্ধ, ভেজা পাতার গন্ধ নিতে নিতে আমার ব্লক হয়ে যাওয়া রিসেপ্টরগুলো আবার কাজ করা শুরু করেছে। 
প্রথম প্রথম আমি নিজেই বিশ্বাস করিনি। একদিন ভোরে নার্সারিতে পানি দিচ্ছিলাম। হঠাৎ বাতাসে খুব হালকা একটা গন্ধ ভেসে এল। কোনো ফুলের না। কোনো মাটিরও না। আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। তারপর হঠাৎ মনে পড়ল — মা শীতের সকালে চুলে নারকেল তেল মেখে রান্নাঘরে ঢুকতেন। ভাতের গরম ভাপ, হলুদের গন্ধ আর সেই নারকেল তেলের একটা অদ্ভুত মিশ্রণ। চার বছর ধরে আমি ভাবছিলাম আমি সেই গন্ধ ভুলে গেছি। আসলে ভুলিনি। কৃত্রিম গন্ধের ভিড়ে চাপা পড়ে ছিল। সেদিন প্রথম বুঝলাম — স্মৃতির কোনো ল্যাব লাগে না। শুধু একটু নির্মল বাতাস লাগে। আমি এখন আসল আর নকলের তফাতটা খুব স্পষ্ট বুঝি।
গত পরশু সকাল সকাল আমার সাভারের নার্সারিতে গুলশান থেকে একটা দম্পতি এসেছিলেন। খুব অভিজাত চেহারার, গাড়ি থেকে নামলেন। ওনাদের সাথে ওনাদের সাত-আট বছরের একটা ছেলে। ছেলেটার হাত ও চোখ থেকে আইফোনের স্ক্রিন সরছেই না। ওনারা বাগান ঘুরে দেখছিলেন আর বলছিলেন, "আজকাল ঢাকার কোথাও একটু ভালো পারফিউম পাওয়া যায় না। সব ফেইক।"
আমি তখন ওনাদের বাচ্চার সামনে গিয়ে একটা তাজা কামিনী ফুলের ডাল একটু দোলালাম। ফুলটা কেবল ফুটেছে, ওটার গায়ে ভোরের শিশির লেগে ছিল।
বাচ্চাটা হঠাৎ ফোন থেকে চোখ তুলল। ও বুক ভরে একটা শ্বাস নিল। তারপর ওর মার দিকে তাকিয়ে বলল, "মা! এই ফোনটার ভেতর থেকে এত সুন্দর একটা গন্ধ আসছে কেন?"
ওর মা অবাক হয়ে বলল, "ফোনে তো কোনো গন্ধ নেই, বাবা!"
আমি আড়ালে দাঁড়িয়ে হাসলাম। বাচ্চাটা আসলে বোঝেনি গন্ধটা কোথা থেকে আসছে, কারণ ওর প্রজন্ম জন্ম থেকেই স্ক্রিনের ওপারে দুনিয়া দেখে অভ্যস্ত। ওরা ভাবে ভালো যা কিছু, তা স্ক্রিন থেকেই আসে। কিন্তু ওর মগজ ঠিকই আসল কামিনী ফুলের নিখুঁত কাঁপনটা চিনে নিয়েছে। প্রকৃতির কোডিং ভুল হয় না।
আজকাল মাঝরাতে আমি যখন বারান্দায় এসে বসি মাঝেমধ্যে, ঢাকা শহরের দিকে তাকালে আমার খুব মায়া হয়। এই যান্ত্রিক শহরটা প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার সুগন্ধি ছড়াচ্ছে নিজের ভেতরের পচন আর একাকীত্ব ঢাকার জন্য। বডি স্প্রে, গাড়ি ফ্রেশনার, শপিং মলের হিপনোটিক সেন্ট—সবাই আমাদের ভুলিয়ে রাখতে চাইছে আমরা কারা।
আমি ড্রয়ার থেকে অলফ্যাক্টরি ল্যাব থেকে চুরি করে আনা সেই 'নিউট্রালাইজার'-এর শেষ ছোট অ্যাম্পুলটা বের করে হাতের তালুতে রাখি। আমার খুব ইচ্ছা করে, কোনো এক রাতে ঢাকার আকাশসীমার মেইন ভেন্টিলেশনে এটা স্প্রে করে দিতে। পরদিন সকালে পুরো ঢাকা শহরের মানুষ যখন ঘুম থেকে উঠবে, বাতাসে কোনো দামি পারফিউমের গন্ধ থাকবে না, থাকবে না কোনো গাড়ির ধোঁয়া বা কেমিক্যালের বাষ্প। মানুষ শুধু বুক ভরে শ্বাস নেবে, আর একে অপরকে দেখে অকারণেই কেঁদে ফেলবে। কারণ কৃত্রিম কুয়াশা কেটে গেলে মানুষ আবার তার আপন মানুষকে চিনতে পারবে।

আমি জানি না সেই দিন কবে আসবে! তবে আমি অপেক্ষা করছি। যতদিন না আসছে, আমি এই সাভারের মাটিতে কামিনী আর শিউলির চারা বুনে যাচ্ছি। পৃথিবীর শেষ আসল সুবাসটুকু কোথাও না কোথাও তো বেঁচে থাকা দরকার, তাই না?

ঘ্রাণ ফিল্টার
 সাঈদ বিলাস


মন্তব্য

অনুবাদ আত্মজীবনী আর্ট-গ্যালারী আলোকচিত্র ই-বুক ইচক দুয়েন্দে ইশতেহার উৎপলকুমার বসু উপন্যাস ঋত্বিক-ঘটক কবিতা কবিতায় কুড়িগ্রাম কর্মকাণ্ড কার্ল মার্ক্স গল্প গিন্সবার্গ চার্লস বুকাওস্কি ছড়া জার্নাল জীবনী দশকথা দিনলিপি পাণ্ডুলিপি পুনঃপ্রকাশ পোয়েটিক ফিকশন প্রতিবাদ প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা প্রবন্ধ প্রিন্ট সংখ্যা বই বর্ষা সংখ্যা বসন্ত বিক্রয়বিভাগ বিবিধ বিবৃতি বিশেষ বুলেটিন বৈশাখ ভাষা-সিরিজ ভিডিও মাসুমুল আলম মুক্তগদ্য মে দিবস যুগপূর্তি রিভিউ লকডাউন শম্ভু রক্ষিত শাহেদ শাফায়েত শিশুতোষ সন্দীপ দত্ত সম্পাদকীয় সাক্ষাৎকার সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ সৈয়দ সাখাওয়াৎ স্মৃতিকথা হেমন্ত
নাম

অনুবাদ,69,আত্মজীবনী,27,আর্ট-গ্যালারী,2,আলোকচিত্র,1,ই-বুক,7,ইচক দুয়েন্দে,23,ইশতেহার,2,উৎপলকুমার বসু,26,উপন্যাস,16,ঋত্বিক-ঘটক,6,কবিতা,352,কবিতায় কুড়িগ্রাম,7,কর্মকাণ্ড,18,কার্ল মার্ক্স,1,গল্প,88,গিন্সবার্গ,2,চার্লস বুকাওস্কি,40,ছড়া,1,জার্নাল,9,জীবনী,7,দশকথা,25,দিনলিপি,1,পাণ্ডুলিপি,11,পুনঃপ্রকাশ,24,পোয়েটিক ফিকশন,1,প্রতিবাদ,1,প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা,4,প্রবন্ধ,199,প্রিন্ট সংখ্যা,5,বই,5,বর্ষা সংখ্যা,1,বসন্ত,15,বিক্রয়বিভাগ,21,বিবিধ,3,বিবৃতি,1,বিশেষ,26,বুলেটিন,4,বৈশাখ,1,ভাষা-সিরিজ,5,ভিডিও,1,মাসুমুল আলম,35,মুক্তগদ্য,47,মে দিবস,1,যুগপূর্তি,6,রিভিউ,5,লকডাউন,2,শম্ভু রক্ষিত,2,শাহেদ শাফায়েত,25,শিশুতোষ,1,সন্দীপ দত্ত,14,সম্পাদকীয়,20,সাক্ষাৎকার,26,সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ,18,সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ,55,সৈয়দ সাখাওয়াৎ,33,স্মৃতিকথা,15,হেমন্ত,1,
ltr
item
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন: ঘ্রাণ ফিল্টার [ছোটোগল্প] • সাঈদ বিলাস
ঘ্রাণ ফিল্টার [ছোটোগল্প] • সাঈদ বিলাস
ঘ্রাণের মাধ্যমে স্মৃতি ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের এক ডিস্টোপিয়ান গল্প। কৃত্রিম সুগন্ধি, ভোগবাদ, প্রযুক্তি ও প্রকৃতির টানাপোড়েনের কাহিনি।
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEgSGCTVcAnyP01-G6TszPVRLU-0gw8mfHfijET1fBPBsm7uo0at7_bhFq36VspK49X2tvBZzfE3hhAjpm0cS6NoiABde8zieQHt6lrRxFwIO3I_2-GwhBJP2hECIqVoSYVSYdTVP1J5SPudD8ezJr7u44jObqBArXi2lYk8oCQbvf-5bIBrjArMPQZV6k8/s1600/%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%AB%E0%A6%BF%E0%A6%89%E0%A6%AE%20%E0%A6%97%E0%A6%B2%E0%A7%8D%E0%A6%AA%20%E2%80%A2%20perfume%20story%20%E2%80%A2%20%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%88%E0%A6%A6%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%B8%20%E2%80%A2%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%81.png
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEgSGCTVcAnyP01-G6TszPVRLU-0gw8mfHfijET1fBPBsm7uo0at7_bhFq36VspK49X2tvBZzfE3hhAjpm0cS6NoiABde8zieQHt6lrRxFwIO3I_2-GwhBJP2hECIqVoSYVSYdTVP1J5SPudD8ezJr7u44jObqBArXi2lYk8oCQbvf-5bIBrjArMPQZV6k8/s72-c/%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%AB%E0%A6%BF%E0%A6%89%E0%A6%AE%20%E0%A6%97%E0%A6%B2%E0%A7%8D%E0%A6%AA%20%E2%80%A2%20perfume%20story%20%E2%80%A2%20%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%88%E0%A6%A6%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%B8%20%E2%80%A2%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%81.png
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন
https://www.bindumag.com/2026/09/olfactory-filter-short-story.html
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/2026/09/olfactory-filter-short-story.html
true
121332834233322352
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts আরো Readmore উত্তর Cancel reply মুছুন By নী PAGES POSTS আরো এই লেখাগুলিও পড়ুন... বিষয় ARCHIVE SEARCH সব লেখা কোন রচনায় খুঁজে পাওয়া গেল না নীড় Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share to a social network STEP 2: Click the link on your social network Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy