Painting completed my life.–Frida
ফ্রিদা কাহলোর (১৯০৭-১৯৫৪) সঙ্গে প্রথম পরিচয় প্রায় দুই যুগ আগে, তখন আমি সম্মান শেষ বর্ষের ছাত্র। সে বছর পাক্ষিক অন্যদিন পত্রিকার ঈদ সংখ্যায় একটি অসাধারণ প্রবন্ধ চোখে পড়ে। লেখক—প্যারিস প্রবাসী জগদ্বিখ্যাত চিত্রশিল্পী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহাবুদ্দিন আহমেদের সহধর্মিণী, বিশিষ্ট কথাশিল্পী ও শিল্পসমালোচক আনা ইসলাম। প্রবন্ধটির শিরোনাম ছিল ‘ফ্রিদা কালো: কষ্টের মনীষা’ (স্পেনীয় উচ্চারণে ‘ফ্রিদা কালো’ হলেও বাংলায় ‘ফ্রিদা কাহলো’ বানানটিই বেশি প্রচলিত)। পরবর্তীতে ২০০১ সালে লেখাটি একই শিরোনামে গ্রন্থাকারেও প্রকাশিত হয়। আনা ইসলামের সেই ‘কষ্টের মনীষা’ পাঠ করে আমি একাধারে বিচলিত ও বিস্মিত হয়েছিলাম। ফ্রিদার জীবনজুড়ে ছিল বিষাদেরই একচ্ছত্র অধিপত্য, সেখানে আনন্দের উপস্থিতি ছিল যৎসামান্য। অথচ তীব্র শারীরিক অক্ষমতা আর মানসিক অস্থিরতাকে জয় করার অদম্য ইচ্ছায় তিনি নিজের ক্যানভাস ভরিয়ে তুলতেন অজস্র উজ্জ্বল রঙে। মেক্সিকোর আধুনিক চিত্রকলার ইতিহাসে সবচেয়ে মেধাবী ও প্রভাবশালী যে দুটি নাম জড়িয়ে আছে, তার একটি ফ্রিদা কাহলো; আর অন্যটি তাঁর স্বামী—বিখ্যাত ম্যুরালশিল্পী দিয়েগো রিভেরা (১৮৮৬-১৯৫৭)।
Don’t build a wall around your suffering. It may devour you from the inside.–Frida
২০০২ সালে হলিউডে মুক্তি পায় জনপ্রিয় মেক্সিকান অভিনেত্রী সালমা হায়েক অভিনীত কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘ফ্রিদা’। সেই বছর ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের পর্দা উঠেছিল এই সিনেমার প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে। ফ্রিদারূপী সালমা হায়েকের অনবদ্য অভিনয় তাঁকে এনে দিয়েছিল অস্কার, গোল্ডেন গ্লোব এবং বাফটার সেরা অভিনেত্রীর মনোনয়ন। নিঃসন্দেহে এটি তাঁর অভিনয় জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ। আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউটও সিনেমাটিকে ২০০২ সালের ‘মুভি অব দ্য ইয়ার’ সম্মানে ভূষিত করে। ‘ফ্রিদা’ শিল্প ও শিল্পীর মেলবন্ধনে গড়া এক নিটোল শৈল্পিক চলচ্চিত্র, যার ক্যামেরার কাজ চিত্রকলা ও চলচ্চিত্রের সার্থক যুগলবন্দিকে ফুটিয়ে তুলেছে অসাধারণ মুন্সিয়ানায়। সিনেমাটি দেখার পর মনজুড়ে কেবল একটা হাহাকারই জাগে—যে নারী তাঁর ক্যানভাসে রঙ, রূপ আর কম্পোজিশনের এমন বাসনাবিহ্বল ও সচেতন সংঘাতে বিক্ষত বর্ণিল রূপবন্ধ ফুটিয়ে তুলতে পারেন, তাঁর বাস্তব জীবনে দহন আর যন্ত্রণাগুলো যদি একটু কম হতো, তবে কী এমন ক্ষতি হতো?
My painting contains in it the message of pain. I think that at least a few people are interested in it.–Frida
ফ্রিদা কাহলোকে নিয়ে বিভিন্ন সময়ে পত্রপত্রিকায় টুকটাক লেখা আমার চোখে পড়েছে। তবে ২০১৪ সালে প্রকাশিত স্থপতি জাকিয়া রহমান ঋতার প্রথম বই ‘ফ্রিদা কাহলো: কিছু কথা ও ডায়েরির পাতা’ তাঁর সম্পর্কে জানার পরিধিটা বাড়িয়ে দেয়। আসলে কোনো মানুষকে চেনার শ্রেষ্ঠ মাধ্যম তো তাঁর ডায়েরি! বর্ণিল কিন্তু রহস্যে ঘেরা জীবন ফ্রিদার প্রতি শিল্পপ্রেমীদের আকর্ষণকে সব সময়ই বাড়িয়ে দিয়েছে। একের পর এক আঘাতে বিপর্যস্ত হয়েও এই মেক্সিকান নারী যেভাবে জীবনের জয়গান গেয়েছেন, তা এক কথায় বিস্ময়কর। তাঁর আত্মজীবনীমূলক চিত্রকর্মগুলো মানুষের মনে গভীর কৌতূহল জাগায়। ওলন্দাজ শিল্পী ভ্যান গঘের (১৮৫৩ – ১৮৯০) মতোই, ১৯৯৫ সালে ফ্রিদার ডায়েরি যখন প্রথম প্রকাশ্যে আসে, তখন দুনিয়া তাঁর এক অন্য রূপ দেখতে পায়। ১৯৪৪ সাল থেকে শুরু করা বিচিত্র বিষয়ভাবনার ব্যক্তিগত রোজনামচায় তিনি গেঁথেছেন তাঁর দৈনন্দিন অনুভূতিমালা। কেবল অভিজ্ঞতার গভীরতায় নয়, নান্দনিক সজ্জাতেও এই ডায়েরি অনন্য। এর বর্ণময় পৃষ্ঠাগুলো গদ্যে, পদ্যে, রেখায় ও রঙে যেন একেকটি জীবন্ত ক্যানভাস। ফ্রিদার ডায়েরিটি পড়ার সময় মনে হয়, যেন শিল্পীর ব্যক্তিগত প্রকোষ্ঠে এক নজর উঁকি দেওয়া গেল; আধো-অন্ধকার ঘরেও স্পর্শ করা গেল এক বর্ণিল ও বিচিত্র মানবাত্মাকে।
Pain, pleasure, and death are no more than a process for existence. The revolutionary struggle in this process is a doorway open to intelligence.–Frida
শিল্পকলার ইতিহাসে শিল্পী হিসেবে নারীদের পথচলা মসৃণ ছিল না। তবুও যুগে যুগে নারীরা আপন সৃষ্টিশীলতায় শিল্পচর্চা বজায় রেখেছেন। বিশেষ করে বিংশ শতাব্দীতে এসে আত্মপ্রকাশের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে নারীদের ক্যানভাস ব্যবহারের প্রবণতা বহুগুণ বেড়ে যায়। ক্রমাগত সাধনা ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে নারী শিল্পীরা বিশ্ব শিল্পমঞ্চে নিজেদের এক অনন্য অবস্থান তৈরি করে নেন। শিল্পকলার ইতিহাসের সেই বিশাল জগতে যে কজন নারী শিল্পী প্রথম সারিতে অবস্থান করছেন, তাঁদের মধ্যে মেক্সিকান চিত্রশিল্পী ফ্রিদা কাহলো অন্যতম। ফ্রিদা কাহলোকে বলা হয় বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বেদনাদীপ্ত এক শিল্পী। তিনি ক্যানভাসে বুনেছেন নিজের জীবনমথিত এক দীর্ঘ বেদনাগাঁথা। তাঁর এই শিল্পযাত্রায় বারবার ফিরে এসেছে শৈশবের চেনা ‘লা কাসা আসুল’ বা ‘নীল বাড়ি’। মাত্র ৬ বছর বয়সে পোলিওর আক্রমণ, আর ১৮ বছর বয়সে এক ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনা—তাঁর জীবনকে করে তুলেছিল ক্ষতবিক্ষত। হাসপাতাল, ডাক্তার, অস্ত্রোপচার আর পুরো শরীর জুড়ে স্থায়ী হওয়া তীব্র যন্ত্রণা যেন তাঁর যাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিল। তবে ফ্রিদার ক্যানভাস শুধু যন্ত্রণার নয়, তা ছিল এক গভীর আত্মানুসন্ধানের দলিল। মেক্সিকান বিপ্লব, মেক্সিকান লোকশিল্প, আজটেক সভ্যতা, স্বামী দিয়েগো রিভেরার সাথে সম্পর্কের জটিল টানাপোড়েন, প্রেম, একাকীত্ব, ক্যাকটাস ও শেকড়বাকড়, পোষা বানর, ঐতিহ্যবাহী রঙিন গাউন আর সন্তান ধারণের অক্ষমতার তীব্র হাহাকার—সবকিছুই মূর্ত হয়ে উঠেছে তাঁর চিত্রকর্মে। ফ্রিদা কাহলোর নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে চেনা ছকের বাইরে থাকা এক অপরূপ মুখাবয়ব। জোড়া ভুরু, পরনে উজ্জ্বল রঙের দীর্ঘ ঘাগরা, গলায় ঝোলানো রঙিন উত্তরীয় আর মাথায় সাজানো তাজা ফুলের পশরা—ফ্রিদা নিজেই যেন ছিলেন এক জীবন্ত মেক্সিকান শিল্পকর্ম।
I am in agreement with everything my father taught me and nothing my mother taught me.–Frida
ক্যানভাসের রঙে আর জীবনের গল্পে যিনি মেক্সিকোর জাতীয় প্রতীক হয়ে উঠেছেন, তিনি ফ্রিদা কাহলো। তাঁর পুরো নাম মাগদালেনা কারমেন ফ্রিদা কাহলো ই কালদেরন। শিল্পের চেয়েও যেন তাঁর বৈচিত্র্যময় জীবনকাহিনী মানুষকে বেশি টানে। ১৯০৭ সালে মেক্সিকোর কোয়োয়াকান শহরে তাঁর জন্ম হলেও, মেক্সিকান বিপ্লবের চেতনা ধারণ করতে তিনি নিজের জন্মসাল দাবি করতেন ১৯১০ বছরটিকে! ফ্রিদার বাবা গিলেরমো কাহলো ছিলেন একজন দক্ষ আলোকচিত্রী। ১৮৯১ সালে উনিশ বছরের এক তরুণ হিসেবে জার্মানি থেকে মেক্সিকোতে পাড়ি জমান তিনি। সেখানেই পরিচয় ও বিয়ে হয় ফ্রিদার মা মাতিল্ডের সাথে। মা'র চেয়ে বাবার সঙ্গে ফ্রিদার সম্পর্ক ছিল নিবিড়। মেক্সিকো শহরের বিখ্যাত ‘নীল বাড়ি’র দেয়ালগুলো ফ্রিদার জীবনের সুখ-দুঃখের সাক্ষী। এই বাড়িতেই যেমন তিনি প্রথম পৃথিবীর আলো দেখেছিলেন, ঠিক তেমনি এখানেই বিদায় নিয়েছেন পৃথিবী থেকে।
I think that little by little I’ll be able to solve my problems and survive.–Frida
ছয় বছর বয়সে ফ্রিদা পোলিওতে আক্রান্ত হন। এর ফলে তাঁর ডান পা বাঁ পায়ের চেয়ে কিছুটা সরু ও খাটো হয়ে যায়। পরবর্তী জীবনে ফ্রিদা যে দীর্ঘ, রঙিন স্কার্ট পরার জন্য সুপরিচিত হয়ে ওঠেন, তা মূলত শুরু হয়েছিল তাঁর এই পায়ের ত্রুটি আড়াল করার জন্য। এ ছাড়া ফ্রিদার ‘স্পাইনা বাইফিডা’ নামের একটি জন্মগত রোগও ছিল, যা তাঁর মেরুদণ্ড ও পায়ের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত করেছিল। এমন শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও কৈশোরে তিনি ছেলেদের মতো বক্সিংসহ বিভিন্ন খেলাধুলায় মেতে থাকতেন। নিজের শৈশব নিয়ে ফ্রিদা বলেছিলেন, “আমার খেলনাগুলো ছিল ছেলেদের মতো: স্কেট, বাইসাইকেল।” স্বভাবগতভাবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত চটপটে ও হাসিখুশি। কারণ ফ্রিদার বিশ্বাস ছিল, “হাসির চেয়ে মূল্যবান আর কিছুই নেই। হাসা এবং নিজেকে বিসর্জন দেওয়াই শক্তি, আলো হয়ে ওঠা।” বাবার ফটোগ্রাফি স্টুডিওতে কাজ করার সময় থেকেই ফ্রিদা চারুকলার প্রতি আকৃষ্ট হন। তবে সে সময় ছবি আঁকাকে পেশা হিসেবে নেওয়ার কথা তিনি ভাবেননি। বরং বিজ্ঞানের প্রতি গভীর অনুরাগ থাকায় তিনি চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। চিকিৎসাশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষার লক্ষ্যে ১৯২২ সালে মেক্সিকোর বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘ন্যাশনাল প্রিপারেটরি স্কুল’-এ ভর্তি হন ফ্রিদা। পুরো স্কুলে মাত্র ৩৫ জন নারী শিক্ষার্থীর মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম।
You too know that all my eyes see, all I touch with myself, from any distance, is Diego.–Frida
স্কুলে ভর্তির পরপরই ফ্রিদা একটি রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দলের সাথে জড়িয়ে পড়েন। সেখানে তিনি দলনেতা আলেজান্দ্রো গোমেজ আরিয়াসের প্রেমে পড়েন। ঠিক সেই সময়ে স্কুলের অডিটোরিয়ামের দেয়ালে ফ্রেস্কো আঁকতে আসেন প্রখ্যাত মেক্সিকান মুরালিস্ট দিয়েগো রিভেরা। আন্তর্জাতিক মুরাল আন্দোলনের এই পথিকৃৎকে কাজ করতে দেখে ফ্রিদার ভেতরের সুপ্ত শিল্পীসত্তা পুনরুজ্জীবিত হয়। সহপাঠীদের কাছ থেকে জানা যায়, ফ্রিদা ঘণ্টার পর ঘণ্টা মুগ্ধ হয়ে রিভেরার কাজ দেখতেন। তখনই এক বান্ধবীকে মনের সুপ্ত বাসনা জানিয়ে ফ্রিদা বলেছিলেন, একদিন তিনি এই শিল্পীর সন্তানের মা হবেন!
I am not sick. I am broken. But I am happy to be alive as long as I can paint.–Frida
কিন্তু একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনায় সবকিছু ওলটপালট হয়ে যায়। দিনটি ছিল ১৯২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর। ১৮ বছর বয়সী ফ্রিদা তাঁর প্রেমিক আলেজান্দ্রোর সাথে বাসে করে বাড়ি ফিরছিলেন। পথে তাঁদের বাসটির সাথে একটি ট্রামের মারাত্মক সংঘর্ষ হয়। এই দুর্ঘটনায় ফ্রিদার মেরুদণ্ড ভেঙে যায়, বাম কাঁধ স্থানচ্যুত হয় এবং কণ্ঠাস্থি, বক্ষপিঞ্জরের দুটি হাড় ও পেলভিস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় ছিল—একটি লোহার রড তাঁর তলপেটের বাম দিক দিয়ে ঢুকে শরীরের নিম্নাঙ্গ দিয়ে বের হয়ে যায়। এই মেরুদণ্ডের ক্ষতের কারণে পরবর্তী জীবনে ফ্রিদাকে ৩৫টি অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল এবং আমৃত্যু তিনি তীব্র দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা সহ্য করেছেন। এই দুর্ঘটনা ফ্রিদার চিকিৎসক হবার স্বপ্নকে চিরতরে ভেঙে দেয়। তাঁর জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ কেড়ে নিয়ে তাঁকে ঠেলে দেয় এক চরম অনিশ্চয়তায়। দিনের পর দিন হাসপাতালের শয্যায় কাটাতে কাটাতে তাঁর মনে হতো, মৃত্যু যেন তাঁর চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এ প্রসঙ্গে তিনি নিজেই লিখেছিলেন, “… একটি কঙ্কাল (বা মৃত্যু) আছে, যা আমার বেঁচে থাকার ইচ্ছার সামনে ভয়ে পালিয়ে যায়।” তবে জীবনের একটি পথ বন্ধ হলে, সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলে যায়। হাসপাতালের বিছানায় দীর্ঘদিনের একাকিত্ব ও শারীরিক যন্ত্রণা ভুলে থাকার জন্য ফ্রিদা হাতে তুলে নেন তুলি। আর এই তুলিই শেষ পর্যন্ত তাঁকে এনে দেয় অমরত্ব। আরোগ্য লাভের এই সময়টাতে তিনি ছবি আঁকা শুরু করেন এবং প্রাচীন চিত্রশিল্পীদের কাজ নিয়ে পড়াশোনা করেন। অসুস্থ অবস্থায় বিছানায় একটি বিশেষ ইজেলের সাহায্যে শুয়ে শুয়েই তিনি ছবি আঁকতেন। আর ক্যানভাসে নিজেকে ফুটিয়ে তুলতে শয্যার ওপর ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল একটি আয়না। দীর্ঘ অসুস্থতার কারণে তৈরি হওয়া নিঃসঙ্গতা তাঁর শিল্পকর্মে স্পষ্ট প্রভাব ফেলেছিল। এই অচলাবস্থায় আঁকা নিজের প্রতিকৃতিগুলোই একসময় তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। ক্যানভাসে তুলির অনবদ্য আঁচড়ে ফ্রিদা নিজেকে যেভাবে মেলে ধরেছেন, তা এককথায় অনন্য। ঐতিহ্যবাহী ফুলেল পোশাকে সজ্জিত, কালো চুল, জোড়া ভ্রু আর কিছুটা পুরুষালি গোঁফ—সব মিলিয়ে তাঁর প্রতিটি অবয়ব আজও দর্শককে এক রহস্যময় গভীরতায় আচ্ছন্ন করে।
Nothing is absolute. Everything changes, everything moves, everything revolves, everything flies and goes away.–Frida
দীর্ঘদিন চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে থাকার পর ১৯২৭ সালে তিনি কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং স্কুলের পুরোনো বন্ধুদের সাথে জড়িয়ে পড়েন ছাত্র রাজনীতিতে। ফ্রিদার মনে গভীর রেখাপাত করেছিল তৎকালীন সামাজিক বৈষম্য; তিনি ভাবতেন, “এটা দেখা ভয়াবহ যে ধনীরা দিনরাত পার্টি করছে, আর হাজার হাজার মানুষ ক্ষুধায় মারা যাচ্ছে।” এই তীব্র সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি মেক্সিকান কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন এবং সক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করেন। সেখানেই তাঁর পুনরায় সাক্ষাৎ ঘটে দিয়েগো রিভেরার সাথে। নিজের আঁকা ছবিগুলো নিয়ে ফ্রিদা যখন রিভেরার দ্বারস্থ হন, রিভেরা তখন জহুরির চোখে তাঁর প্রতিভা চিনে নিতে ভুল করেননি; তিনি ফ্রিদাকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেন। এই শিল্পভাবনার আদান-প্রদান এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া খুব দ্রুতই রূপ নেয় গভীর ভালোবাসায়। দিয়েগোর প্রতি নিজের সেই তীব্র অনুভূতি ফ্রিদা প্রকাশ করেছিলেন এভাবে— “দিয়েগো আমার সবকিছু ছিল; আমার সন্তান, আমার প্রেমিক, আমার বিশ্ব।” অবশেষে ১৯২৯ সালে, মায়ের প্রবল আপত্তি উপেক্ষা করেই নিজের চেয়ে প্রায় একুশ বছরের বড় দিয়েগো রিভেরার তৃতীয় স্ত্রী হিসেবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন ফ্রিদা। অসম এই দম্পতির বিয়েকে তৎকালীন সমাজ কটাক্ষ করে উপমা দিয়েছিল ‘হাতি ও পায়রার বিয়ে’ বলে!
I paint my own reality. The only thing I know is that I paint because I need to, and I paint whatever passes through my head without any other consideration.–Frida
বিয়ের পর ফ্রিদার ছবি আঁকার ধরনে বড় রকমের বদল আসে। আজটেক ঐতিহ্যের ‘তিহুয়ানা’ পোশাক হয়ে ওঠে তাঁর সিগনেচার স্টাইল। ফুলেল ঢোলা ব্লাউজ, গয়না আর ঘের ছড়ানো স্কার্টের এই সাজে মেক্সিকান লোকশিল্পের প্রতি তাঁর ভালোবাসা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৯৩০ থেকে ১৯৩৩ সালের দিকে রিভেরার সাথে যখন তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন, তখন ফ্রিদা কয়েকবার গর্ভধারণ করলেও প্রতিবারই গর্ভপাত ঘটে। মূলত বাস দুর্ঘটনার কারণে জরায়ু মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তাঁর মা হওয়ার স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়। নিজের সেই তীব্র কষ্ট প্রকাশ করে ফ্রিদা লিখেছিলেন, “আমি আমার তিন সন্তানকে হারিয়েছি এবং আরও এমন অনেক কিছু হারিয়েছি যা আমার এই ভয়াবহ জীবনকে পরিপূর্ণ করতে পারত। আমার চিত্রকর্ম এই সবকিছুর জায়গা নিয়েছে।” গর্ভপাতের এই নিষ্ঠুর অভিজ্ঞতা আর একই সময়ে মাকে হারানোর গভীর শোক ফ্রিদা তাঁর তুলির আঁচড়ে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলেছেন।
Surrealism is the magical surprise of finding a lion in a wardrobe, where you were ‘sure’ of finding shirts.–Frida
১৯৩৩ সালে দিয়েগো রিভেরা এবং ফ্রিদা কাহলো মেক্সিকোতে ফিরে এসে একটি নতুন বাড়ি নির্মাণ করেন। দ্রুতই বাড়িটি প্রগতিশীল শিল্পী ও রাজনৈতিক কর্মীদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়। এই দম্পতি রুশ বিপ্লবের অন্যতম স্থপতি ও মার্কসবাদী তাত্ত্বিক লিওন ট্রটস্কি (১৮৭৯ – ১৯৪০) এবং ফরাসি পরাবাস্তববাদী লেখক আঁদ্রে ব্রেতঁর (১৮৯৬ – ১৯৬৬) মতো বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিত্বদের আতিথেয়তা প্রদান করেন। ১৯৩৭ সালে জোসেফ স্তালিনের (১৮৭৮ – ১৯৫৩) শাসনামলে নিজ দেশে মৃত্যুদণ্ডের পরোয়ানা মাথায় নিয়ে ট্রটস্কি সোভিয়েত রাশিয়া থেকে পালিয়ে নরওয়ে হয়ে মেক্সিকোতে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন। রিভেরা ও ফ্রিদার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হওয়ায় ট্রটস্কি প্রথমে রিভেরা এবং পরবর্তীতে ফ্রিদার বাড়িতে অবস্থান করেন। বলা হয়ে থাকে, ফ্রিদার বাড়িতে থাকাকালীন ট্রটস্কির সঙ্গে তাঁর একটি গভীর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। পরবর্তীতে ১৯৪০ সালে এক সোভিয়েতপন্থী আততায়ীর হাতে ট্রটস্কি নিহত হন। ফ্রিদার শিল্পকর্মে মুগ্ধ হয়ে আঁদ্রে ব্রেতঁ তাঁকে একজন ‘পরাবাস্তববাদী’ (Surrealist) শিল্পী হিসেবে আখ্যা দেন এবং তাঁর কাজকে “a ribbon around a bomb” হিসেবে বর্ণনা করেন। তবে ফ্রিদা নিজেকে পরাবাস্তববাদী মানতে নারাজ ছিলেন; তাঁর ভাষায়— “তারা ভাবত আমি একজন পরাবাস্তববাদী, কিন্তু আমি তা ছিলাম না। আমি কখনো স্বপ্ন আঁকিনি। আমি আমার নিজের বাস্তবতা এঁকেছি।” ব্রেতঁ কেবল ফ্রিদার চিত্রকর্ম প্যারিসে প্রদর্শনের ব্যবস্থাই করেননি, বরং তাঁর বন্ধু ও শিল্প-ব্যবসায়ী জুলিয়েন লেভিকে চিঠি লিখে ১৯৩৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানহাটনের একটি গ্যালারিতে ফ্রিদার প্রথম একক প্রদর্শনীর আয়োজনও করিয়েছিলেন। অত্যন্ত সফল সেই প্রদর্শনীর পরের বছরই (১৯৩৯ সালে) ফ্রিদা নিজের কাজ নিয়ে প্যারিস সফর করেন। সেখানে বিশ্বখ্যাত ল্যুভর মিউজিয়াম তাঁর 'দ্য ফ্রেম' (১৯৩৮) নামক পেইন্টিংটি কিনে নেয়। এর মাধ্যমে ফ্রিদা বিংশ শতাব্দীর প্রথম মেক্সিকান শিল্পী হিসেবে ল্যুভর মিউজিয়ামে স্থান পাওয়ার গৌরব অর্জন করেন। এই সময়েই বিখ্যাত ফ্যাশন ম্যাগাজিন 'ভোগ' (Vogue)-এর প্রচ্ছদে ফ্রিদা কাহলোর প্রতিকৃতি স্থান পায়। তবে ইউরোপ সফর করলেও মহাদেশটি নিয়ে ফ্রিদার অভিজ্ঞতা মোটেও সুখকর ছিল না। ইউরোপের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেছিলেন- “ইউরোপ কেন পচে যাচ্ছে, আর কেন এই সব অকর্মণ্য লোকেরাই সব হিটলার ও মুসোলিনির উত্থানের কারণ, শুধু এটা দেখার জন্যই এখানে আসা সার্থক হলো।”
I have suffered two grave accidents in my life, one in which a streetcar knocked me down… The other accident is Diego.–Frida
দিয়েগো রিভেরা ও ফ্রিদা কাহলোর দাম্পত্য জীবন ছিল প্রেম, ঘৃণা, চরম উন্মাদনা আর তীব্র মানসিক যন্ত্রণার এক জটিল কোলাজ। একে অপরকে যেমন গভীরভাবে ভালোবাসতেন, তেমনই জড়িয়ে ছিলেন পারস্পরিক অবহেলা আর তিক্ততার এক অন্তহীন আবর্তে। ঘনঘন বিচ্ছেদ আর পুনরায় এক হওয়া ছিল তাঁদের সম্পর্কের নিয়মিত চিত্র। রিভেরার প্রতি নিজের এই ক্ষোভ ও তিক্ততা প্রকাশ করে ফ্রিদা একবার বলেছিলেন, “আমি দিয়েগোকে আমার স্বামী হিসেবে উল্লেখ করতে পারি না, কারণ এই শব্দটি তার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করাটা একটা অযৌক্তিক ব্যাপার। সে কখনো কারো স্বামী ছিল না, আর কখনো হবেও না।” উভয়েরই অনিয়ন্ত্রিত বহুগামিতা এই সম্পর্ককে আরও বিষাক্ত করে তুলেছিল। বিশেষ করে ফ্রিদার ছোট বোন ক্রিস্টিনার সাথে দিয়েগোর বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক এবং এর বিপরীতে লিয়ন ট্রটস্কিসহ একাধিক শিল্পীর সাথে ফ্রিদার ঘনিষ্ঠতা তাঁদের দূরত্বকে চূড়ান্ত রূপ দেয়। ফলস্বরূপ, ১৯৩৯ সালে ফ্রিদা ও রিভেরার বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। দাম্পত্যের এই চরম ভাঙন ও মানসিক ক্ষতকে ক্যানভাসে রূপ দিয়ে ফ্রিদা সেই বছরই এঁকেছিলেন তাঁর বিশ্ববিখ্যাত আত্মপ্রতিকৃতি ‘The Two Fridas’। তবে এই বিচ্ছেদের স্থায়ীত্ব ছিল মাত্র এক বছর। রিভেরার প্রতি ফ্রিদার ভালোবাসার এক অদ্ভুত ও অন্ধ বৈপরীত্যের কারণে ১৯৪০ সালে তাঁরা আবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ফ্রিদা সবসময় এক অবাস্তব আশায় বুক বাঁধতেন যে দিয়েগো হয়তো একদিন শুধরে যাবেন। তাঁর সেই আকুলতা প্রকাশ পায় এই উক্তিতে— “আমি তোমাকে আমার নিজের শরীরের চেয়েও বেশি ভালোবাসি, যদিও তুমি আমাকে সেভাবে ভালোবাসো না। আর যদি না-ও বাসো, আমার মনে সবসময় এই আশা থাকবে যে তুমি আমাকে ভালোবাসো, এবং তাতেই আমি সন্তুষ্ট।” কিন্তু তাঁদের দ্বিতীয় অধ্যায়টিও প্রথমটির মতোই অশান্ত ছিল। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ফ্রিদা তীব্র মানসিক যন্ত্রণায় দগ্ধ হয়েছেন। একদিকে দিয়েগোকে সম্পূর্ণ নিজের করে না পাওয়ার হাহাকার, তাঁর ক্রমাগত বিশ্বাসঘাতকতা ও অবহেলা; অন্যদিকে শারীরিক অসুস্থতার কারণে কোনোদিন মা হতে না পারার ক্ষত ফ্রিদাকে ভেতর থেকে তিলে তিলে নিঃশেষ করে দিয়েছিল। রিভেরার মনোযোগ আকর্ষণের তাড়নায় ফ্রিদা কখনো ক্রোধে ফেটে পড়েছেন, রিভেরার মুখের ওপর দরজা বন্ধ করেছেন, গৃহত্যাগ করেছেন, আবার কখনো নিজেও জড়িয়েছেন বহুগামিতায়। ভালোবাসার এই তীব্র আগুনে পুড়তে পুড়তেই ফ্রিদা মনে মনে প্রার্থনা করতেন, “প্রভু, ফিরে এসো।” ডায়েরিতে ফ্রিদা দিয়েগোকে নিয়ে লিখেছেন,
দিয়েগো উৎসদিয়েগো স্থপতিদিয়েগো আমার শিশুদিয়েগো আমার পুরুষ বন্ধুদিয়েগো চিত্রশিল্পীদিয়েগো আমার প্রেমিকদিয়েগো আমার স্বামীদিয়েগো আমার বন্ধুদিয়েগো আমার মাদিয়েগো আমার বাবাদিয়েগো আমার ছেলেডিয়েগো = আমি =দিয়েগো বিশ্বএককত্বে বিচিত্রতাকেন আমি তাঁকে ডাকিআমার দিয়েগো বলে?সে কোনোদিনই ছিল নাআমার কিংবা হবেও নাসে শুধু তাঁর নিজের।
I drank because I wanted to drown my sorrows, but now the damned things have learned to swim.–Frida
আবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর ফ্রিদা এবং রিভেরা ফ্রিদার ছোটবেলার বাড়ি ‘দ্য ব্লু হাউস’-এ থাকতে শুরু করেন। ১৯৪৩ সালে ফ্রিদা চারুকলা বিদ্যালয় ‘লা এসমেরালদা’-তে চিত্রকলার অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন।
এদিকে দিনে দিনে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবণতি ঘটছিল। শারীরিক কষ্ট ভুলতে তিনি একসময় মাদক ও মদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। ১৯৪০ থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যে তাঁর শরীরে বেশ কয়েকটি বড় অস্ত্রোপচার করা হয়। ফলে চলাফেরার জন্য তাঁকে হুইলচেয়ার ব্যবহার করতে হতো। এ সময় নিজের আঁকা ছবিগুলোতেও তিনি নিজেকে হুইলচেয়ারেই ফুটিয়ে তুলেছেন। ১৯৫৩ সালে, মৃত্যুর মাত্র কিছুদিন আগে, মেক্সিকোতে ফ্রিদার প্রথম একক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। তখন তিনি এতটাই অসুস্থ ছিলেন যে চিকিৎসকের নির্দেশে বিছানায় শয্যাশায়ী ছিলেন। ফলে প্রদর্শনীতে তাঁর আসার আশা কেউই করেননি। কিন্তু প্রবল ইচ্ছাশক্তির জোরে শেষ পর্যন্ত একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে সরাসরি বিছানাসহ গ্যালারিতে হাজির হয়ে তিনি সবাইকে অবাক করে দেন।
Feet, what do I need you for when I have wings to fly?–Frida
প্রদর্শনীর মাত্র কয়েক মাস পর ফ্রিদার স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে এবং গ্যাংগ্রিনের কারণে তাঁর ডান পায়ের হাঁটুর নিচের অংশ কেটে ফেলতে হয়। এরপর তিনি গভীর বিষণ্নতা ও উদ্বেগে আক্রান্ত হন এবং অতিরিক্ত ব্যথানাশক সেবনের কারণে নিস্তেজ হয়ে পড়েন। এই অবস্থায়ও তিনি গুয়াতেমালায় মার্কিন আক্রমণের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদ সমাবেশে অংশ নিয়ে বক্তব্য দেন। এর পরপরই তাঁর অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে। ১৯৫৪ সালের ১৩ জুলাই ভোর আনুমানিক ছয়টায় নার্স তাঁকে বিছানায় মৃত আবিষ্কার করেন। ওষুধের হিসাব মিলিয়ে নার্স জানান, ফ্রিদা মৃত্যুর রাতে অতিরিক্ত ওষুধ নিয়েছিলেন—চিকিৎসকের নির্দেশিত সর্বোচ্চ সাতটি বড়ির জায়গায় তিনি এগারোটি খেয়েছিলেন। অবশ্য চিকিৎসকের প্রতিবেদনে মৃত্যুর কারণ হিসেবে ফুসফুসে রক্ত জমাট বাঁধা বা ‘পালমোনারি এমবোলিজম’-এর কথা বলা হয়। মারা যাওয়ার আগের সন্ধ্যায় ফ্রিদা তাঁদের বিবাহবার্ষিকীর এক মাস বাকি থাকতেই রিভেরাকে একটি আংটি উপহার দিয়েছিলেন।
I paint flowers so they will not die.–Frida
জীবনের শেষলগ্নে এসে ফ্রিদা কাহলোর ক্যানভাস জুড়ে ঠাঁই পেয়েছিল কেবলই জড়জীবন। পার্থিব জীবনের সমস্ত রঙ, রূপ, রস আর প্রাণপ্রাচুর্য বোঝাতে তিনি বেছে নিয়েছিলেন বর্ণিল সব গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ফল ও সবজি। অথচ, জীবনের এই উৎসবের ঠিক পাশেই আলতো করে বসিয়ে দিতেন একটি ছোট্ট খেলনা কঙ্কাল; যেন এক নিভৃত সংকেতে মনে করিয়ে দেওয়া—দিনশেষে মৃত্যুই চরম গন্তব্য। মেক্সিকানদের বিশ্বাসে মৃত্যু তো আসলে এক নতুন জন্মের সূচনা। কিন্তু ফ্রিদা তাঁর এক জীবনে চড়াই-উতরাই দেখেছেন এতো যে, জীবনের ওপারে গিয়ে আর নতুন কোনো জন্মে ফেরার বিন্দুমাত্র আকুতি তাঁর ছিল না। ডায়েরির শেষাংশে ফ্রিদার প্রকাশ,
আমি আশা করিআমার বিদায়হবে আনন্দের, আর আমি আশা করিকখনো ফিরে না আসবার।
I have never expected anything from my work but the satisfaction I could get from it by the very fact of painting and saying what I couldn’t say otherwise.–Frida
জীবদ্দশায় ফ্রিদা কাহলোর কাজের মূল্যায়ন প্রায়ই থমকে যেত ‘দিয়েগো রিভেরার স্ত্রী’ পরিচয়ের কাছে। তবে মৃত্যুর পর চিত্রটা বদলে যায়।
১৯৭০-এর দশকে নারীবাদের উত্থানের সাথে সাথে ফ্রিদা হয়ে ওঠেন এক কালজয়ী নারীবাদী আইকন। ১৯৮৩ সালে হাইডেন হেরেরার লেখা ‘এ বায়োগ্রাফি অব ফ্রিদা কাহলো’ বইটি তাঁর এই আইকন হয়ে ওঠার পথকে আরও সুগম করে। ফ্রিদার চুল বাঁধার স্টাইল ও পোশাকের ফ্যাশন আজও ডিজাইনারদের অনুপ্রেরণা। বাংলাদেশেও এর প্রভাব দারুণভাবে লক্ষণীয়। বর্ষবরণ কিংবা বসন্তের উৎসবে শহুরে নারীদের খোঁপা আর ফুলের সাজে যেন ফুটে ওঠে ফ্রিদারই অবয়ব। একবিংশ শতাব্দীর সমালোচকদের চোখে ফ্রিদাকে নিয়ে এই বিশ্বব্যাপী ক্রেজই হলো Fridamania।
I used to think I was the strangest person in the world but then I thought there are so many people in the world, there must be someone just like me who feels bizarre and flawed in the same ways I do. I would imagine her, and imagine that she must be out there thinking of me, too.–Frida
ফ্রিদার কাজ ভীষণ ব্যক্তিগত এবং নারীর জীবনের ভেতরের গল্পগুলো ফুটিয়ে তোলার জন্য অনন্য। নিজের শেকড়ের প্রতি তাঁর টান এতটাই তীব্র ছিল যে, তা আজও অনুগামী পরিমন্ডলে গর্বের জন্ম দেয়। ফ্যাশন ডিজাইনার, নারীবাদী কিংবা শিল্পী—সব শ্রেণির মানুষই ফ্রিদাকে নিজের ভাবেন। ফ্রিদা ছিলেন আপাদমস্তক খাঁটি এক মানুষ, যিনি সাজতে ভালোবাসতেন। এক সময়ে সবাই যখন হলিউডি ফ্যাশনের পেছনে ছুটছে, ফ্রিদা তখন দেশীয় পোশাককে নিজের সিগনেচার স্টাইল বানিয়ে নিলেন। প্রতিদিন তিনি এমন নিখুঁতভাবে সাজতেন, যেন কোনো জমকালো দাওয়াতে যাচ্ছেন। তাঁর জোড়া ভুরু আর হালকা গোঁফের রেখা ছিল মূলত তথাকথিত সুন্দরের সংজ্ঞার বিরুদ্ধে এক নান্দনিক প্রতিবাদ। তাঁর কৃত্রিম পা-টিও ছিল দেখার মতো সুন্দর। চামড়ার তৈরি সেই লাল বুটের ওপর তিনি নিজেই জুড়ে দিয়েছিলেন লেইস আর ঘণ্টি। নিজের শারীরিক ক্ষতগুলো আড়াল করতে ফ্রিদা বেছে নিয়েছিলেন লম্বা স্কার্ট, করসেট ধাঁচের টপ ও ব্লাউজ। সচেতনভাবেই তিনি পরতেন ঢেউ খেলানো কুঁচির ব্লাউজ আর এমব্রয়ডারি করা স্কার্ফ। এই বিশেষ পোশাকের আড়ালে যেমন ঢাকা পড়ত তাঁর শারীরিক অপূর্ণতা, তেমনই তা হয়ে উঠেছিল তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস ও নারীর নিজস্ব শক্তির এক অনন্য প্রতীক।
You didn’t understand what I am. I am love. I am pleasure. I am essence. I am an idiot. I am tenacious. I am. I simply am.–Frida
ফ্রিদা কাহলোর ক্যানভাসে আঁকা ১৪৩টি সৃষ্টির ৫৫টি জুড়েই রয়েছে তাঁর নিজের অবয়ব। এই আত্মপ্রতিকৃতিগুলোর আধিক্যের কারণেই তিনি পরিচিত ‘আত্মজৈবনিক শিল্পী’ হিসেবে। নিজের এই প্রবণতা ব্যাখ্যা করে ফ্রিদা বলেছিলেন, “আমি নিজের ছবি আঁকি, কারণ আমি প্রায়শই একা থাকি এবং আমিই সেই বিষয় যাকে আমি সবচেয়ে ভালোভাবে চিনি।” তাঁর ক্যানভাস যেন ছিল তাঁর জীবনেরই এক একটি জীবন্ত খতিয়ান। ব্যক্তিজীবনের তীব্র দহন, একাকীত্ব আর আজীবন বয়ে বেড়ানো শারীরিক অসুস্থতা ফ্রিদার শরীর থেকে সরাসরি সঞ্চারিত হয়েছিল তাঁর তুলির আঁচড়ে। তাই তাঁর আঁকা ছবিগুলো এত যন্ত্রণাবিদ্ধ, নির্মম ও রক্তাক্ত। তৎকালীন রক্ষণশীল সময়ে দাঁড়িয়ে নিজের ব্যক্তিগত জীবনকে এভাবে জনসমক্ষে প্রকাশ করার সাহস কোনো নারী দেখাতেন না। কিন্তু ফ্রিদা ছিলেন ব্যতিক্রম; সমস্ত সামাজিক শিকল ভেঙে তিনি ক্যানভাসে উদযাপন করেছেন তাঁর অবরুদ্ধ নারীত্বকে। নিজের ভাঙা শরীরকে তিনি ক্যানভাসে মেলে ধরেছেন বারবার, যা প্রথম দর্শনে হয়তো দর্শককে চমকে দিত, কিন্তু পরে ঠিকই বাধ্য করত থমকে দাঁড়াতে। আর এই অদম্য সাহসের জোরেই তিনি হয়ে উঠেছেন তাঁর সময়ের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও আলোচিত নারী চিত্রশিল্পী।
Love me a little. I adore you.–Frida
ফ্রিদার মৃত্যুর পর, তাঁর স্বামী দিয়েগো রিভেরার নির্দেশেই ফ্রিদার ব্যবহৃত সবকিছু একটি ঘরে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়। শর্ত ছিল—দিয়েগোর মৃত্যুর ১৫ বছর পর সেই ঘর খোলা যাবে। দিয়েগো রিভেরা ১৯৫৭ সালে মারা গেলেও, তাঁর মৃত্যুর ১৫ বছর পর নয়, বরং দীর্ঘ ৪৭ বছর পর ২০০৪ সালে প্রথমবারের মতো মেক্সিকোর সেই ‘নীল বাড়ি'র দরজা খোলা হয়। পরবর্তীতে ২০১২ সালে বাড়িটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ জাদুঘরে রূপান্তর করে ফ্রিদার আঁকা ছবি, পোশাক, গয়না ও নানা অনুষঙ্গসহ তাঁর ব্যবহৃত বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। এরও পরে, ফ্রিদার পোশাক ও ব্যক্তিগত ব্যবহার্য জিনিসপত্রসহ প্রায় ২০০টি অনন্য নিদর্শন মেক্সিকোর বাইরে ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে প্রদর্শনীর জন্য পাঠানো হয়। অনবরত শারীরিক আঘাত আর অন্তহীন সংকটের মুখেও মানুষ কীভাবে অদম্য মানসিক শক্তিতে অনন্য হয়ে ওঠে, তা শিখিয়ে গেছেন ফ্রিদা কাহলো। জীবনের শেষ ক্যানভাসেও নিজের ক্ষতবিক্ষত ও রক্তাক্ত জীবনের তীব্রতাকে জয় করে তিনি লিখেছিলেন— ‘ভিভা লা ভিদা’ বা জীবনের জয় হোক!
[ভেতরের ছবি: লেখকের সংগ্রহ থেকে]
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, রাজশাহী সরকারি সিটি কলেজ৷
বেদনার নীলপদ্ম ফ্রিদা কাহলো
▮ তানভীর হক
▮ তানভীর হক






















কৃতজ্ঞতা
উত্তরমুছুন