এক
সাধারণত বিনয় মজুমদারের বাড়ি থেকে ফেরার সময় বৃষ্টি হবেই। হতেই হবে তাকে। বৃষ্টি হবে, ঠাকুর নগর থইথই করবে,আলোয় ভরে যাবে এই পৃথিবীর নারকোল গাছের মাথাগুলো। তুমুল শূন্য থেকে নেমে আসবে কিছু কবিতা। সেকারণেই জন্মদিন তৈরি হয়। নিয়তই সতেরো সেপ্টেম্বরে জন্মান বিনয় মৃধা।
কখন কে শুরু করে, কখন শেষ করে, বুঝতে পারা না গেলেও ঠাকুর নগরের দুই নম্বর প্লাটফর্মের উঁচু থেকে তাকালে দেখা যায় একটা বিচিত্র রঙের বাবল ফুলে উঠছে। একটা স্বতন্ত্র কিমিতির সেই বাবলের গায়ে আবছা আবছা বাংলা অক্ষর ফুটে আছে...
ঠিক যে স্বতন্ত্র বিশ্বস্ফিতি টের পাই বিনয় মজুমদারের কবিতার প্রেক্ষিতে। এবং যাকে বিনয় মজুমদারের ছোটোগল্পের অনিবার্য সাবটেক্সট বলে মনে করি। কিংবা এমনও হয়, নিজেরাই বদল করে নেয় অবস্থান। কবিতা আর গল্পের মিথোষ্ক্রিয়ায় স্পষ্টতই ফুটে ওঠে বিনয়বিশ্ব।
দুই
১৯৮২ সালে রচিত একটি প্রবন্ধ ‘পঞ্চাশের কবিতা’-তে দেবীপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বলছেন,
সময় ঘূর্ণিত হয়ে উঠেছে চারপাশ যেন বিভ্রান্ত করে, যেন হঠাৎ টের পাওয়া গেছে কেউ আর খাপ খাচ্ছেন না জ্ঞানে-ধ্যানে-প্রথায়-পশ্চাৎপটে, যেন অনাদিবহতা জীবন হঠাৎ বিশ্বাসভঙ্গ করে ঠেলে দিয়েছে পদাশ্রয়টুকু—অনাচার ষড়যন্ত্রে, আর সেই ‘অনীশ তরঙ্গে’র মুখোমুখি স্রস্ত-দিশাহারা হয়ে গেছে তাঁদের জীবন, শব্দবন্ধ;ঘন হয়েছে পাপ-অবিশ্বাস—রুখে দাঁড়িয়েছেন, ভাঙতে চাইছেন সব কিছু পরিপার্শ্বের, অথবা যেভাবে বলেছেন শঙ্খ ঘোষ: এক স্পর্ধিত ভয়ঙ্করতার মধ্যে উন্মত্ত ছুটে চলেছেন..., হলোকাস্টের প্রতীচী বা মার্কিন পরিস্থিতির বর্ণনা বলে মনে হয় যেখানে কবি নিজেকে প্রবুদ্ধ করতে পারেন— what's madness but mobility of soul/at odds with circumstances?
এই আলোচকের ধারনা, যদিও সে সময় বিনয় মজুমদার প্রাবন্ধিকের কাছে সম্পূর্ণ রূপে আবিস্কৃত হননি, কেননা খুব সামান্য দুটো উল্লেখেই বিনয় প্রসঙ্গ শেষ করেছেন তিনি, কিন্তু পঞ্চাশের কবিতার স্বরবিন্যাসের একটি বৈশিষ্ট্য নিরুপণে উল্লেখটি তাৎপর্য পায়। আপনারা একটি বিষয়ে হয়তো সহমত পোষণ করবেন, পঞ্চাশের কবিতায় সবচাইতে বড়ো ভূমিকা গ্রহণ করেছে উদ্বাস্তুর মনস্তত্ত্ব। যার প্রভাবে একটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দানা বাঁধতে পেরেছিল পঞ্চাশে। বিভিন্ন প্রোপাগান্ডাজাত আন্দোলনগুলো আদালত চত্বরকে তুমুল করে তুললেও, লক্ষ করা যায়, হাংরি বলে চিহ্নিত বিনয় একটা খাপছাড়া, সময়ের অন্যান্য নিহিত স্বরগুলির সাপেক্ষে একদম ভিন্ন অভিমুখে তাঁর কবিতাকে নিয়ে চলেছেন। যে অভিমুখের কোথাও পৌঁছনোর ছিল না কোনও দিন। কিন্তু সে সচেতনভাবে একটা কালেক্টিভিটি নির্মাণ করে।একটা বৃহত্তর অদেখা বিশ্ব গড়ে ওঠে বিনয় মজুমদারের কবিতার সঙ্গে সঙ্গে তার ছোটোগল্পগুলোতেও। আপনি দুটো স্বতন্ত্র মাধ্যমকে সমান্তরালভাবে পাঠ করলে হয়তো বা সহমত হতে পারেন। আমাদের চারপাশের অসংখ্য এনিগমা যে জাদু নির্মাণ করে চলেছে অবিরত,তাদেরই ভিড় বিনয়ের পৃথিবীর কবিতায়,তাদেরই প্রোপাগান্ডা বিনয়ের ছোটোগল্প। এই ধারনার স্বপক্ষে একটি কবিতার উদাহরণ এই অবকাশে রাখাই যেতে পারে,
অনেক কিছুই তবু বিশুদ্ধ গণিত শাস্ত্র নয়লিখিত বিশ্লিষ্ট রূপ গণিতের অআকখময়হয় না, সে সব ক্ষেত্রে উপযুক্ত গণিতসূত্রেরনির্যাস দর্শনটুকু প্রয়োগ ক’রেই বিশ্লেষণকরা একমাত্র পথ, গণিতশাস্ত্রীয় দর্শনেরবহির্ভূত অতিরিক্ত দর্শন সম্ভবপর নয়।সেহেতু ঈশ্বরী, দ্যাখো গণিতের ইউনিটপাউন্ড সেকেন্ড ফুট থেমে থাকে চুপে,এদের নিয়মাবদ্ধ সততা ও অসততা মনস্তত্ত্বে বর্তমান ইউনিট রূপেআলোকিত ক’রে রাখে বিশ্বের ঘটনাবলী, চিন্তনীয় বিষয়গুলিকেসিরিজের কতিপয় টার্মের চরিত্র ফুটে চরিত্র নির্দিষ্ট করেআগামীর দিকে।(অনেক কিছুই তবু)
বিনয় মজুমদারের ছোটোগল্পের বড় বৈশিষ্ট্যই হলো এই কালেক্টিভিটি নির্মাণ এবং তা কেবলমাত্র কথোপকথনের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকে না। অজস্র ঠাকুরনগরীয় চরিত্র ভিড় করে বসে ‘বিনয়দা’-র চারপাশে। তাঁর বর্ণিত ভাষ্যগুলি প্রকৃতিতে ঘটমান। এবং লক্ষণীয়, কথায় কথায় গল্পের শেষে তিনি নিজেকে ‘ভাঁড়’ বলে চিহ্নিত করেন। আসলে বিনয় জীবনকে চিনেছেন হাতের তালুর মতো। শেক্সপিয়র তাঁর ‘Fool’-দের ‘ভাঁড়’ বলতেন না ‘Full’ অর্থাৎ সর্বজ্ঞ বলতেন। এই সর্বজ্ঞের ভারটাই বহন করেছেন ‘ভাঁড়’ বিনয় মজুমদার। নিজেকে লুকিয়ে রেখে একটা সামগ্রিক তৈরি। শেক্সপিয়ারের fool-এর মতোই ‘কালেক্টিভিটি’ বিনয় মজুমদারের স্ফিয়ারোলজির-ই আরেকটি অংশ। যাকে চলতি কথায় ‘ককনি’ বলা হয় সেগুলিই বিশেষ বিশেষ উপপাদ্যের প্রশ্ন হয়ে ওঠে এবং গল্প জুড়ে থাকে সেই উপপাদ্যের পারফর্মেটিভিটি। গল্পকারের কালেক্টিভিটি বা সামগ্রিকতা তৈরির অন্যতম নিদর্শন হল ‘আমার চাষিভাইয়েরা’, ‘পৃথিবী বিখ্যাত', ‘বই রহস্য’, ‘শ্রেষ্ঠগল্প’, ‘এখন রাত— আসলে দিন’ প্রভৃতি গল্পগুলি। রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার দিক থেকে যথেষ্ট পোড়খাওয়া হওয়ায় জনসমীক্ষায় বিশ্বাস রাখতেন বিনয়। যখনই অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের ফলিত রূপ নির্মাণ প্রয়াস করেছেন— স্রেফ ব্রাত্য করে নিয়েছেন নিজেকে। ‘Rage’ এবং ‘Resentment’ এর তফাৎ চিনতে পেরেছিলেন। Rage হল জ্বালানি, কিন্তু তাতে কোনো কালেক্টিভিটি তৈরি হয় না। তাই নেতারা নেতা-ই রয়ে যায়, চাষারা চাষা। তাঁর কাছে Resentment অনেকটা সঙষ্কৃতির ভার্টিক্যাল রূপ নির্মাণের মতো। তৈরি করে কালেক্টিভিটি। আনে বিপ্লব। তাঁর রিসেন্টমেন্ট নিঃশব্দ বিপ্লব হয়ে থেকে যায়, বিরল সৃষ্টি ‘আমার চাষিভাইয়েরা’ গল্পের মধ্যে। এখানে চাষিদের ধানের দাম বাড়ানো এবং পাট ইত্যাদির জন্য বিনয়বাবুকে একটি বক্তৃতা দিতে বলা হয়। কোনও মার্কসিয় তত্ত্ব কিংবা অন্য কোনও তাত্ত্বিক চিন্তা টেনে আনেননি। বরং সম্পূর্ণ একটি লজিক খাড়া করেন সমাজে চাষিদের গুরুত্ব বোঝাতে —
চাল, ডাল, গম, শিম, বেগুন... ইত্যাদি আপনারা নবজাতককে খাইয়েছেন একটানা ২৯ বছর।ফলে তিরিশ বছর বয়সে দেখা গেল এই নতন মানষটির ওজন বেড়ে গেছে সাড়ে আটান্নকেজি।... মনে রাখবেন আমার হিসাব তেরোশো কোটি টন রক্তমাংস আপনারা বানিয়েছেনগত ৩৫ বছরে, সারা পথিবীতে।(আমার চাষী ভাইয়েরা)
কালেক্টিভ রিসেন্টমেন্ট গড়ে তোলার জন্য এরকম অকল্পনীয় অথচ অতি সরল বক্তৃতা তাঁর গাণিতিক সূত্রে বাঁধা জীবনের সাপেক্ষে বিস্ময়কর নয়। ‘পৃথিবী বিখ্যাত’ গল্পে আবার এক ধরনের সিন্থেটিক ফেনোমেনোলজির কথা বলেন যা দিয়ে পরিসরকে বিনির্মাণের দিকে কিংবা প্রতি নির্মাণের দিকে নিয়ে গিয়ে তৈরি করেন সামগ্রিকতা বা কালেক্টিভিটি। ‘বই রহস্য’ গল্পে বিনয় দেখাচ্ছেন ‘ট্যাক্স’ নামক ব্যাপারটি কীভাবে একটি নেটওয়ার্ক হিসেবে কাজ করে। বিনয় মজুমদার ভেবেছিলেন পরিসরের বিনির্মাণ ঘটা সম্ভব শুধুমাত্র কালেক্টিভিটি তৈরির মাধ্যমে। কিংবা প্রচলিত বস্তু ধারনা সমূহের প্রতিনির্মাণ। কার্ল মার্কস নেশন স্টেটকে ভেঙে দেওয়ার কথা ভেবেছিলেন পুঁজিবাদকে রুখতে। আর পুঁজিবাদ তাঁরই দেখানো উপায়ে তাঁকেই প্রত্যাঘাত করে। একারণেই বিনয় মজুমদারের রিয়ালিজম ক্রমশ মানুষের গণ্ডি ছাড়িয়ে অ-মানবকেন্দ্রিক হয়ে উঠতে থাকে। যার উদাহরণ ‘ভূমিকম্প বানানো’ গল্পটির মেটামরফোসিস। এভাবে এযাবৎ বাংলা সাহিত্যকে মেটিরিয়ালিস্টিকভাবে খুব বেশি ভাবা গিয়েছে,তা কিন্তু নয় । অ-মানবকেন্দ্রিক অবস্থানও লেখক হিসেবে বিনয়ের একটি বৈশিষ্ট্য—
পৃথিবীতে কোনও প্রাকতিক পরিবর্তন হলেই তৎক্ষনাৎ সেটা এইসব প্রাণীদের মনের চিন্তাকেও পরিবর্তন করে।(ভূমিকম্প বানানো)
তিন
আবার ফিরে আসা যাক দেবীপ্রসাদের ঐ প্রবন্ধের প্রসঙ্গে। সন্দর্ভে তিনি যে সামান্য দুই এক উল্লেখ রেখেছেন, তার মধ্যেই একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা লিখেছেন প্রাবন্ধিক
প্রকৃতি আর মানুষের অদ্বয়ে দিনানুদিনের ফুটে ফুটে -ওঠা ঝরে যাওয়ার...
এই ‘দিনানুদিনের’ শব্দবন্ধটি জরুরি এখানে। প্রতিটি আশ্চর্য এবং ঘটে যাওয়াকে, প্রতিটা গতির পরিসরকে, শব্দ এবং নৈঃশব্দ্যের পর্যায়ক্রমে ধরেছেন নিখুঁত মেটিরিয়ালিস্টিক ভঙ্গিতে, আবার তাকে সংকেতবদ্ধ ছবির কোলাজে পরিণত করেছেন। একই বস্তকে, একই অবসরে, প্রায়োগিক সত্য-দার্শনিক সত্য এবং বৈজ্ঞানিক সত্য হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এর জন্য অনিবার্যভাবে কালেক্টিভিটির তুমুল চেতনা এবং জনচেতনা সমৃদ্ধ বিশ্ববিক্ষা একান্তভাবে দায়ি বলেই বিশ্বাসবাসী।বিনয় মজুমদারের কবিতা আর ছোটোগল্প নিপুণ টোপোগ্রাফি নির্মাণ করে। যার মাধ্যমে পাঠক ধীরে ধীরে বুঝতে পারেন বিনয় মজুমদারের স্ফিয়ারোলজির ভৌগলিক রূপ, বিস্তার আর জাদুপ্রবণতাকে। একজন রূপদক্ষ এবং চাক্ষিকের কাছে এটাই তো পাওয়ার, এবং এই জাদু কালেক্টিভিটির বিরল প্রবক্তা বিনয় মজুমদার ব্যাতিত আর কে আমাদের বাংলা কবিতায়!
বর্ষাকালে আমাদের পুকুরে শাপলা হয়, শীত গ্রীষ্মে এই
পুকুর সম্পূর্ণ শুশক হয়ে যায় পুকুরের নিচে ঘাস গিজায়, তখন–
পুকুরে শাপলা আর থাকে না, আবার সেই বর্ষাকাল আসেতখন পুকুরটিতে জল জমে পুনরায় শাপলা গজায়।এই হলো শাপলার কাহিনী, শাপলা ফুল শাপলার পাতাছন্দে ছন্দে দুলে যায়, অনুপ্রাস, চিত্রকল্প ইত্যাদি সমেত।এবং পুকুরটিও চিন্তাশীল, সৃষ্টিশীল, পুকুরের আনন্দ বেদনাপাতা হয়ে ফুল হয়ে ফুটে ওঠে পৃথিবীতে, এই বিশ্বলোকে।শাপলার ফুলে ফুলে পাতায় কখনো মিল থাকে, মিল কখনো থাকে না।(বর্ষাকালে)
সূত্র:
১. বিনয় মজুমদারের কবিতা সমগ্র:বিনয় মজুমদার
২. বিনয় মজুমদারের ছোটোগল্প: বিনয় মজুমদার
৩. বিনয় মজুমদার সংখ্যা, কবিতীর্থ, সম্পাদক: উৎপল ভট্টাচার্য
৪. মুহূর্তের ভাষ্য: দেবীপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়
বিনয় মজুমদার: এক সামগ্রিক আলো
▮ সব্যসাচী মজুমদার
▮ সব্যসাচী মজুমদার




মন্তব্য