মানব জীবন বড়ই জটিল। মানব জীবন সুখ দুঃখের সমন্বয়ে গঠিত এক বিস্ময়কর যাত্রা। আনন্দ তাতে ক্ষণস্থায়ী। জীবন বেশিরভাগই দুঃখে জর্জরিত। প্রকৃত অর্থে জীবন tragi-comic । জীবন ট্র্যাজেডি ও কমেডি এর এক মিশ্রণ। এই কমেডি আমাদের জীবনে নিয়ে আসে প্রচুর প্রাণখোলা হাসি, আনন্দ আর উচ্ছাস। সাধারণত একটি ধারণা খুবই প্রচলিত যে কমেডি হলো লঘু একটি শিল্প আর ট্র্যাজেডি একটি অতি উচ্চমানের শিল্প। কমেডি বলতে ব্যাঙ্গাত্মক শিল্পকে বোঝায় যা হাস্যরসের উদ্রেক ঘটায়। এই কমেডির একটি সুদীর্ঘ ইতিহাস আছে। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় কমেডি এর প্রকারভেদ আর কমেডি এর রূপের পরিবর্তন বা বিবর্তন। পৃথিবীর ইতিহাসে কমেডি এক অনন্য জায়গায় বিরাজমান। চার্লি চ্যাপলিন এক বিখ্যাত কমেডিয়ান যিনি 'silence' এর মাধ্যমে গোটা জগৎ কে আনন্দ প্রদান করেছেন। শব্দ ব্যবহার না করেও কিভাবে মানুষ কে হাসানো যায় তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো চার্লি চ্যাপলিন। তার এই আচরণ, ইঙ্গিত কে মূকাভিনয় ও বলা চলে। সেরকমই আরেকটি উজ্জ্বল নক্ষত্র হলো মিস্টার বিন যিনি নিজের দুর্বলতা কে সাহস ও শক্তি তে পরিণত করেছিলেন। তিনি নিজের নামের একটি শো শুরু করেন যা আট থেকে আশি সকলেই উপভোগ করেছে। মিস্টার বিন ও 'silence' এর মারফত শুধুমাত্র আচরণ এর দ্বারা নিজের মনের ভাব প্রকাশ করেছেন। 'Comedy,' 'gesture' আর 'silence' ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এনারা নাটক আর জীবন কে একসাথে মিলিয়ে দিয়েছেন। এনারা কমেডি যে শুধুমাত্র একটি নন সিরিয়াস (non-serious) শিল্প নয় বরং আরো কিছু তা প্রতিষ্ঠা করেছেন। কমেডি তে সাধারণত কোনো একটি বার্তা দেওয়া হয়ে থাকে যেখানে 'criticism' বা ব্লিশেষণের প্রভাব লক্ষ করা যায়। 'Satire' কমেডি এর একটি ভাগ যা মূলত কোনো বিশেষ দোষ এর কথা বলে ও তাকে শোধরানো কথা বলে। কমেডি অফ ম্যানার্স (comedy of manners) এমন একপ্রকার নাটক যা সমাজের দোষগুলিকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। এই নাটক কমেডি এর সাহায্য নেয়। তাই কমেডি আসলে এমন একটি 'genre' যা কিছু মন্দ তাকে সহজভাবে তুলে ধরে।
নাটক একটি শিল্প যা সাধারণত জীবন থেকে আলাদা এই সংজ্ঞায় মানুষ বিশ্বাসী। নাটক মিথ্যার আশ্রয় নেয়। মিথ্যার মাধ্যমে জীবনের ঘটনা গুলিকে সামনে তুলে ধরে। নাটক মনের ভাবের প্রকাশ ঘটায়, অনুভূতির প্রকাশ ঘটায় যা অঙ্গপ্রতঙ্গ এর সঞ্চালনের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। আমরা বাস্তবে বলি সে নাটক করছে অর্থাৎ সে মিথ্যা কথা বলছে, সে এমন কিছু করছে যা বাস্তবসম্মত নয়। তারমানে নাটক হলো এমন এক শিল্প যা চোখের সামনে একটি মিথ্যা বাস্তব তৈরি করে। যা অনেকটা জীবনের বাস্তবের সাথে, সাধারণ ঘটনার সাথে মিলে যায়। তাই নাটক সত্যি নয় আর এই মিথ্যা বাস্তব তৈরিতে একটি উপকরণ হলো কমেডি। চার্লি চ্যাপলিন কে যদি 'silent comedy' এর ক্লাসিক ফিগার হিসাবে ধরা হয় তাহলে মিস্টার বিন তার contemporary বা আধুনিক মূর্তি বলা যেতেই পারে। কারণ দুজনেই silent comedy এর সাহায্য নিয়েছেন জীবন কে দেখাতে। জীবনের মানে কি? জীবন কি শুধুই যুদ্ধ নাকি অন্য কিছু? জীবনে স্ট্রাগল আর সারভাইভাল (survival) আসলে কিভাবে এক অপরের সাথে জড়িত থাকে - সব কিছুই এনারা হাসি মুখে প্রকাশ করেছেন। প্রতিটা শিল্পই এক ধরনের প্রকাশ। কমেডি ও তাই। কমেডি একটি টুল (tool) বা মাধ্যম। যার ব্যবহার আমরা চ্যাপলিন আর মিস্টার বিন এর থেকে শিখি। দুজনের কেউ কাউকে চিনতেন না কারণ দুজনের সময়সীমা আলাদা অথচ তারা জীবনের একই বার্তা দিয়েছেন। দুজনের মধ্যে অসম্ভব মিল। কারণ তারা সত্য মিথ্যার লড়াই এর উর্দ্ধে উঠে এক ঘটনার কথা বলেন যার নাম জীবন। এই প্রতিবেদনটি চার্লি চ্যাপলিন থেকে মিস্টার বিন পর্যন্ত কমেডির কিভাবে বিবর্তন হয়েছে তাকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। এক কথায় এনাদের কমেডিয়ান বলে আখ্যায়িত করা হয় আর এনাদের শিল্পকে কৌতুক শিল্প বলে।
বর্তমান সমাজে শিল্পীদের স্থান নিয়ে অনেক প্রশ্ন, বিতর্ক, জটিলতার সৃষ্টি হয়। প্রশ্ন ওঠে - শিল্পীদের কদর নিয়ে। শিল্পীদের কি জীবনে, সমাজে আদৌ দরকার আছে? কৌতুক শিল্পীদেরই বা স্থান কোথায়? অনেক জলঘোলা করার পর এটা বলাই যায় যে শিল্পী ছাড়া জীবন অচল। শিল্পী সমাজের দর্পণ। কৌতুক শিল্পীরা তার ব্যতিক্রম নয়। তাঁরা কৌতুক এর মাধ্যমে সমাজের যা কিছু খারাপ সেগুলো কে তুলে ধরেন।
বর্তমানে stand up comedian এর আবির্ভাব দেখা যায় যারা মাইক হাতে নানাবিধ হাস্যরসের কথা বলেন আর অডিয়েন্স তাদের বাহবা দেন। কমেডি এর অনেক ধরনের মধ্যে silent comedy ছাড়াও আরো অনেক ধরনের কমেডি আছে যা মানুষের কাছে মানুষকে পৌঁছে দেয়। বিখ্যাত শিল্পী মীর মীরাক্কেল (Mirakkel) নামের একটি শো এর মাধ্যেমে শুধু পশ্চিমবঙ্গ তে নয় সারা ভারতে অনেক কমেডিয়ান এর কমেডি এর মাধ্যমে নিজেদের প্রকাশ করার সুযোগ দিয়েছেন। এই শো তে কমেডিয়ানরা বা প্রতিযোগীরা বিভিন্ন ধরনের জোকস এর দ্বারা মানুষের মনে হাসির উদ্রেক ঘটায়। এনারা ভার্বাল কমিউনিকেশন (verbal communication) এর ওপর জোর দেন। শব্দের মারপ্যাঁচই হলো এদের হাতিয়ার। কেউ কেউ স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত, কেউ বা আবার কালের নিয়মে হারিয়ে গেছেন। শুধু রেখে গেছেন তাদের শিল্পের ছোঁয়া। কমেডির ইতিহাস ঘাটলে অনেক নামকরা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে অনেক অনামী কমেডিয়ান এরও দর্শন পাওয়ায় যায়। কিন্তু সকলের জীবন এর এক মন্ত্র। সকলেই জীবনের কথা বলেন। সকলেই জীবনের গ্লানি দূর করতে কৌতুকের আশ্রয় নিয়েছেন। এ যেন মরভূমির মধ্যে মরিচিকার মতো।
চার্লি চ্যাপলিন ও মিস্টার বিন দুজনেই জন্মসূত্রে ব্রিটিশ। তাদের পেশা অভিনয়। তাঁরা শিখিয়েছেন অভিনয় কখনও জীবন্ত হয়ে উঠে আবার জীবন কখনো অভিনয় হয়ে উঠে। জীবন ও অভিনয় এর মধ্যে যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে সেটা তাঁরা অতিক্রম করেছেন। মানুষের কাছে নিয়ে এসেছেন নতুন এক ধরনের 'presentation' যা representation ও বটে। অভিনয় যে জীবনের অভিজ্ঞতার কথা বলে সেটা তাঁরা বারবার প্রকাশ করেছেন। চার্লি চ্যাপলিন এর ছোটবেলা অনেক দারিদ্র্যের মধ্যে কেটেছে। তিনি শিল্পকে হাতিয়ার বানিয়েছেন সেই সকল দুঃখের কথা বলতে। সারা পৃথিবীর মানুষ তাঁর দুঃখের সাথে নিজদের একাত্ম অনুভব করেছে। তেমনি মিস্টার বিন এর তোতলামোর (speech problem) সমস্যা ছিল তিনি সেটিকে অতিক্রম করে মানুষকে হাসিয়েছেন। এই কৌতুক অভিনয় জীবনের না পাওয়ার কথা বলে। কমেডি তাই লঘু শিল্প নয়। কমেডি নন সিরিয়াস বিষয় কে প্রকাশ করে না বরং অনেক জটিলতার কথা হাসির মারফত অবলীলায় প্রকাশ করে। তাই কমেডির জয় হউক। কমেডিয়ানদের জয় হউক।
আমাদের চারপাশে তাই কমেডিয়ানদের দেখতে পেলে তাদের সদরে আমন্ত্রণ জানানো ও তাদের প্রশংসিত করা আমাদের কর্তব্য। বর্তমান AI এর যুগে শিল্প কৃত্রিম হয়ে যাচ্ছে, হারিয়ে ফেলছে মৌলিকতা, অকৃত্রিম চেতনা ও ভাব। তাই চার্লি চ্যাপলিন, মিস্টার বিন দের বাঁচিয়ে রাখতে আমাদের অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। শিল্পীরা বাঁচলে আমরা সাধারণ মানুষরা বাঁচবো। যেমনভাবে চার্লি চ্যাপলিন, মিস্টার বিন তাঁদের শিল্পের মাধ্যমে অমরত্ব পেয়েছেন। এই প্রসঙ্গে real life comedian দের ছাড়াও 'fictional comic characters' এর প্রসঙ্গ টেনে আনা যায়। ব্রিটিশ সাহিত্যের কালজয়ী রচনা 'Waiting for Godot' তে দুই কমিক ক্যারেক্টার এর কথা জানতে পারা যায় যাদের আচরণ পাঠকদের মনে হাসির উদ্রেক ঘটায়। এরা বিশেষ কিছু করছেনা। কিন্তু অনেক কিছু করার চেষ্টা করছে। এনাদের 'action' সাইকোলজিকাল। অর্থহীন জীবনের মানে খুঁজতে এরা উদ্যত। তাদের 'absurd' কার্যকলাপ জীবনের 'existential crisis' কে তুলে ধরে। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পরবর্তী সময় কে তুলে ধরেছেন Samuel Beckett। জীবনের কথা বলে। অনেকটা চার্লি চ্যাপলিন এর মত। এটাই কমেডিয়ানদের কাজ। এরাই সমাজের দর্পণ। আজ, কাল, পরশুর গণ্ডি পেরিয়ে তারা পৌঁছে যায় এক অনন্ত সময়ে। তাঁরা চলে যান, রেখে যান তাদের কার্যকলাপ।
লেখক: অতিথি অধ্যাপক, সংস্কৃত কলেজ ও ইউনিভার্সিটি, পশ্চিম বঙ্গ৷
চার্লি চ্যাপলিন, মিস্টার বিন ও কমেডি
▮ সৃজনী দত্ত
▮ সৃজনী দত্ত




মন্তব্য