আধুনিক বাংলা কথাসাহিত্যে রাজীব সিংহ: এক নতুন দিগন্ত
চলতি শতকের বাংলা কথাসাহিত্যের বাঁকবদলের ইতিহাসে রাজীব সিংহ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যতিক্রমী সংযোজন। প্রথাগত গল্প বলার যে চেনা বাঙালি ঘরানা, তিনি সচেতনভাবেই সেই সরল রৈখিক ধারাকে বর্জন করেছেন। দীর্ঘ সাড়ে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে কবিতাচর্চার মাধ্যমে তিনি যে সূক্ষ্ম শব্দসচেতনতা অর্জন করেছেন, তারই মননশীল প্রকাশ ঘটেছে তাঁর উপন্যাসগুলিতে। তাঁর সৃষ্টির মূল বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি সমাজ বা উপরিভাগের ঘটনাকে যতটা না বড় করে দেখান, তার চেয়ে অনেক বেশি আলো ফেলেন মানুষের মস্তিষ্কের অবদমিত অন্ধকার গলিতে। ফলে তাঁর গদ্য পড়ার সময় পাঠকের মনে হয়, তাঁরা কোনো বাইরের বাস্তব নয়, বরং চরিত্রের গভীর অন্তর্জগতে ভ্রমণ করছেন। এই অন্তর্বয়ন মূলত বৈশ্বিক মননশীলতার সেই ধারাকে ছুঁয়ে যায়, যেখানে মানুষের চরম একাকীত্ব ও নিঃসঙ্গতা কেবল এক যান্ত্রিক যাপন নয়, বরং এক চিরন্তন নিয়তি হয়ে ওঠে।
তাঁর গদ্য কোনো সস্তা বিনোদন বা সরল রৈখিক গল্প বলার দায় নেয় না। তাঁর উপন্যাসগুলোর পাতা ওল্টালে মনে হয়, পাঠক কোনো সাজানো ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করছেন না, বরং সোজা ঢুকে পড়ছেন আধুনিক মানুষের মস্তিষ্কের এক জটিল গোলকধাঁধায়। বাংলাদেশের লিটলম্যাগ 'বিন্দু'র অনলাইন সংস্করণ www.bindumag.com-এর বিশেষ সাক্ষাৎকার বিভাগ 'দশকথা'-য় নিজের লিখনশৈলী ও গদ্যের নির্মাণ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে রাজীব সিংহ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাস্তব সত্য উল্লেখ করেছিলেন। তিনি প্রথাগত লেখার ছক ভেঙে ভিন্ন ধারার কথা বলতে গিয়ে স্পষ্ট জানান,
ভাবনা থেকে সৃজন পর্যায়ে যাওয়ার জন্য আমাকে অন্তত আলাদা করে কোনো রেফারেন্স বা অন্য কোনও আরোপিত অভিজ্ঞতার কাছে নতজানু হতে হয় না। কারণ আমি মনে করি সাহিত্য তথা কবিতা সত্য উচ্চারণ। সেটা হৃদয় থেকে আসে। মস্তিষ্ক থেকে নয়।
এই আত্মদর্শনই তাঁর প্রতিটি উপন্যাসে কালানুক্রমিকভাবে প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। রাজীব সিংহের উপন্যাসের মূল দর্শন দাঁড়িয়ে আছে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর এবং অস্তিত্ববাদী সংকটের ওপর। তিনি মধ্যবিত্ত জীবনের যান্ত্রিকতা, কর্পোরেট সংস্কৃতির আগ্রাসন কিংবা রাজনৈতিক আদর্শের নৈতিক স্খলনকে যেভাবে ব্যবচ্ছেদ করেন, তার পেছনে কাজ করে এক গভীর ও নিরাসক্ত সাহিত্যিক ঐতিহ্য।
অস্তিত্ববাদের বৈশ্বিক সুর
রাজীব সিংহের উপন্যাসে অলীক আকাঙ্ক্ষার পেছনে ছুটে চলা চরিত্রগুলোর মধ্যে আলবেয়ার কামু বা ফ্রান্ৎস কাফকার সেই ক্লাসিক অস্তিত্ববাদের ছায়া স্পষ্ট। কাফকার গল্পের মতো চেনা শহরটাই এখানে এক মায়াবী গোলোকধাঁধা হয়ে ওঠে, আর কামুর দর্শনের মতো চরিত্রগুলো নিজেদের একাকীত্বকে এক অনিবার্য অহংকার হিসেবে বহন করে।
নির্মোহ মনস্তত্ত্ব ও মহাকাব্যিক দূরত্ব
সম্পর্কের চোরাবালি ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে রাজীব সিংহ বাংলা সাহিত্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত ফ্রয়েডীয় নির্মোহ মনস্তত্ত্বকে ফিরিয়ে আনেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গদ্যের মতো রাজীব সিংহও তাঁর চরিত্রদের প্রতি অন্ধ আবেগে ভেসে যান না; বরং সেখানে কাজ করে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই মহাকাব্যিক দূরত্বের ভঙ্গি। স্রষ্টা এখানে তাঁর সৃষ্ট চরিত্রের সমস্ত ভালো-মন্দ, প্রেম ও সন্দেহকে এক অদ্ভুত নিরাসক্ত চোখে দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করেন।
ভাষার কারুকাজ ও জাদু-বাস্তবতা
তাঁর লিখনশৈলীর আরেকটি বড় শক্তি হলো রূপকের জাদুকরি ব্যবহার। সমসাময়িক নগর-জীবনের বাস্তব চিত্র আঁকতে আঁকতেও তিনি অনায়াসে সেখানে এমন এক জাদু-বাস্তবতার (Magic Realism) আবহ তৈরি করেন, যা পাঠককে অমিয়ভূষণ মজুমদারের সেই গহন মনন ও ভাষার জটিল কারুকাজ এবং একই সাথে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের খ্যাপাটে, ক্ষুরধার ও মাটির কাছাকাছি থাকা সমাজ-বাস্তবতার লিখনভঙ্গিকে মনে করিয়ে দেয়। এই সমস্ত ক্ল্যাসিক ঘরানার এক আধুনিক ও স্মার্ট সমন্বয় ঘটেছে রাজীব সিংহের নিজস্ব গদ্যরীতিতে।
এছাড়াও যেহেতু রাজীব সিংহের সমস্ত উপন্যাস এখনো গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়নি, তাই এখানে এখনো পর্যন্ত তাঁর লেখা যে কয়েকটি উপন্যাস সংগ্রহ করতে পেরেছি, সেভাবেই পরপর কয়েকটি উপন্যাস নিয়ে খুব সংক্ষিপ্ত আলোচনা এখানে রাখছি। এর বাইরেও রয়ে গেল তাঁর লেখা উপন্যাস 'খ্যাপার পাণ্ডুলিপি' (অজিত রায় সম্পাদিত 'শহর' পত্রিকায় প্রকাশিত) ও 'মত্তনীল অন্ধকারে'। এগুলি এখনো সংগ্রহ করতে পারিনি। ভবিষ্যতে কখনো আবার এই উপন্যাস দুটি নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।
উপন্যাস সমূহের কালানুক্রমিক ও মনস্তাত্ত্বিক পাঠ
১. অন্ত্যজ অন্ধকার (২০০৭): শিল্পীসত্তার অভ্যন্তরীণ একাকীত্ব ও পারিবারিক মনস্তত্ত্ব:
২০০৭ সালের শারদীয় সংবাদ প্রতিদিন-এ প্রকাশের পর উপন্যাসটি স্বতন্ত্র বই হিসেবে 'প্রতিভাস' প্রকাশন থেকে আত্মপ্রকাশ করে। এটি রাজীব সিংহের প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস, যার মূল শক্তি এর ভিন্নধর্মী প্লট ও মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন।
• বিষয়বস্তু ও মনস্তত্ত্ব: উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র অনিকেত সেন একজন সফল নাট্য নির্দেশক ও অভিনেতা। তাঁর সাম্প্রতিক নাট্য প্রযোজনা 'অন্ত্যজ অন্ধকার' মঞ্চে তুমুল সফল ও মানুষের মুখে মুখে ঘুরছে। কিন্তু এই বাহ্যিক সাফল্যের সমান্তরালে অনিকেতের ভেতরের জগৎটা ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। পারিবারিক জীবনে স্ত্রী আলোলিকা এবং মেয়ে বৃষ্টি—এই দুই সত্তার আগ্রাসী মানসিক প্রভাব তাঁকে ঘরের মধ্যেও চরম একাকী করে তোলে।
• দার্শনিক দিক: উপন্যাসটি কেবল একটি পারিবারিক গল্প নয়, এটি আসলে একজন শিল্পীর ভেতরের অন্ধকার, একাকীত্ব এবং শিল্পের পেছনে লুকিয়ে থাকা আত্মিক ক্ষয়ের এক নিখুঁত রূপক।
২. দ্রোহপর্ব (২০১৪): ইতিহাসের মহাকাব্যিক ক্যানভাস ও রাজনৈতিক দর্শন:
২০১৪ সালের শারদীয় 'কবিতা পাক্ষিক' পত্রিকায় প্রথম প্রকাশের পর এটি পরবর্তীতে 'উবুদশ প্রকাশনা' থেকে গ্রন্থাকারে আত্মপ্রকাশ করে। প্রথম উপন্যাসের নাগরিক মনস্তত্ত্বের পর রাজীব সিংহ এখানে তাঁর উপন্যাসের ক্যানভাসকে এক বিশাল ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পটভূমিতে বিস্তৃত করেছেন।
• বিষয়বস্তু ও ইতিহাস: লেখক এই উপন্যাসে পশ্চিমবঙ্গের মাটির ও মানুষের প্রতিবাদের ইতিহাসকে তিনটি প্রধান কালখণ্ডের মধ্য দিয়ে বুনেছেন—চল্লিশের দশকের শেষভাগে অবিভক্ত বাংলার তেভাগা আন্দোলন, ষাটের দশকের শেষের সশস্ত্র নকশালবাড়ি আন্দোলন এবং একবিংশ শতকের শুরুতে কৃষিজমি রক্ষার সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম আন্দোলন।
• দার্শনিক দিক: চেনা রাজনৈতিক বৃত্তের বাইরে গিয়ে ভিন্ন মাত্রার এক মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের কারণে এই বইটি সমাদৃত। লেখক দেখিয়েছেন কীভাবে এক প্রজন্মের দ্রোহ, আদর্শ এবং একই সাথে সেই আন্দোলনের ভেতরের চ্যুতি বা ব্যর্থতাগুলো পরবর্তী প্রজন্মের অবচেতনে প্রবাহিত হয়। আন্দোলনের জয়গানের চেয়েও এখানে গুরুত্ব পেয়েছে মানুষের ভেতরের নৈতিক দ্বন্দ্ব এবং আদর্শগত সংকট।
৩. এসেছিলে তবু আসো নাই (২০২৫): আধুনিক সম্পর্কের মনস্তাত্ত্বিক ক্যানভাস:
বাংলা সাহিত্য জগতে পরিচিত 'এবং বিকল্প'-এর পুজোবার্ষিকীতে প্রকাশিত এই উপন্যাসটির শিরোনামে রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত গানের লাইন ব্যবহৃত হয়েছে, যা আসলে এই উপন্যাসের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনকে চিহ্নিত করে।
• বিষয়বস্তু ও মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা: উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র তিস্তা ও সমুদ্র, যারা কলেজজীবন থেকে একে অপরকে ভালোবাসে। কলকাতায় একটি ফ্ল্যাট কিনে তারা বছরখানিকেরও বেশি সময় ধরে লিভ-ইন সম্পর্কে আছে। কিন্তু তাদের দুজনের কমনফ্রেন্ড শঙ্খশুভ্রর সাথে তিস্তার গভীর বন্ধুত্ব ও ঘনিষ্ঠতা সমুদ্রের মনে ক্রমশ সন্দেহের মেঘ ঘনীভূত করে। সমুদ্র অল্প বয়সে মা হারিয়ে তিস্তার মাঝে আশ্রয় খোঁজে, আর তিস্তা শঙ্খশুভ্রর মাঝে খোঁজে এক বিচিত্র মানসিক মুক্তি।
• দার্শনিক দিক: নানা মানসিক টানাপোড়েন এবং সম্পর্কের এই ভাঙা-গড়ার খেলা নিয়ে নির্মিত এই উপন্যাসের দর্শনটি হলো 'উপস্থিতি ও অনুপস্থিতির দ্বন্দ্ব'। সম্পর্কের চেনা সমীকরণে মানুষ যখন একে অপরের খুব কাছে থাকে, তখনও কীভাবে মানসিক দূরত্বের কারণে তারা আসলে একে অপরের জীবনে অনুপস্থিত থেকে যায়—তা এই উপন্যাসে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
৪. কস্তুরী আভার নীল চাঁদ (২০২৪): পরাবাস্তবতা ও অলীক আকাঙ্ক্ষার দর্শন:
প্রথম সারির রুচিশীল সাহিত্য সংকলন 'শারদীয় বোধন' পত্রিকায় প্রকাশিত এই উপন্যাসটির নাম একাধারে কাব্যিক এবং পরাবাস্তব।
• বিষয়বস্তু ও রূপক: কস্তুরী মৃগ যেমন নিজের নাভিতে থাকা সুগন্ধের উৎস না চিনে সারা বন পাগলের মতো ছুটে বেড়ায়, তেমনি এই উপন্যাসের চরিত্রগুলোও এক অলীক সুখ বা স্বপ্নের পেছনে অন্ধের মতো ছুটে চলে। সেই অধরা, মায়াবী ও বিষাদগ্রস্ত আকাঙ্ক্ষাকে লেখক 'নীল চাঁদ'-এর আলো হিসেবে রূপকায়িত করেছেন।
• মনস্তাত্ত্বিক দিক: চেনা মহানগরের চেনা কোলাহলের সমান্তরালে মধ্যবিত্ত মানুষের অবক্ষয় এবং অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই কীভাবে 'ম্যাজিক রিয়ালিজম' বা পরাবাস্তব আবহে ডানা মেলে, তার এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এখানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
৫. প্রেম মেঘ ও আলোছায়ার উপাখ্যান (২০২৪): জীবনোপন্যাস:
১৪৩১ সালের শারদীয় 'কৃত্তিবাস' পত্রিকায় প্রকাশিত এই উপন্যাসটি রাজীব সিংহের গদ্যের ক্যানভাসে একটি সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী সংযোজন, যা প্রথাগত কাল্পনিক চরিত্রদের উপন্যাস থেকে আলাদা। এটি মূলত একটি বাস্তব চরিত্রনির্ভর জীবনোপন্যাস, তাই একে আলোচনার সমাপন হিসেবে রাখা হয়েছে। পরবর্তীতে এটি বীজেশ সাহা সংকলিত রাজ কাপুরের জীবনের ওপর আধারিত 'রাজকাহিনী' নামক গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়।
• বিষয়বস্তু ও চরিত্র: ভারতীয় চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি 'শোম্যান' রাজ কাপুরের বর্ণিল সেলুলয়েড জীবনের নেপথ্যে যে অন্ধকার ও নিঃসঙ্গতা লুকিয়ে ছিল, লেখক তাকেই এই উপন্যাসের উপজীব্য করেছেন। বড় পর্দার জাঁকজমকের সমান্তরালে নার্গিস থেকে শুরু করে তাঁর জীবনের নারীদের ট্র্যাজিক উপস্থিতি, রাজ কাপুরের চিরপরিচিত 'হোয়াইট কমপ্লেক্স' (নায়িকাদের সাদা শাড়িতে দেখার মোহ) এবং তাঁর জীবনের ক্ল্যাসিক সৃষ্টি 'মেরা নাম জোকার' ছবির বক্স অফিসে চরম ব্যর্থতার পর তাঁর শিল্পীসত্তার যে ভাঙন—তাকে উপন্যাসে 'আলোছায়া' হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
• দার্শনিক দিক: লেখক এখানে একজন অতিমানবিক তারকার বাহ্যিক গ্ল্যামারকে ছাপিয়ে তাঁর ভেতরের অতি সাধারণ, রিক্ত ও নিঃসঙ্গ মানুষটাকে আবিষ্কার করেছেন। বাহ্যিক কোলাহল যে মানুষের ভেতরের শূন্যতাকে আড়াল করতে পারে না, সেই সর্বজনীন দার্শনিক সত্যই এখানে প্রধান হয়ে উঠেছে।
সামগ্রিক সাহিত্য দর্শন ও লিখনশৈলী
রাজীব সিংহের সাহিত্য মূলত এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক আত্মানুসন্ধান এবং প্রথা ভাঙার অনবদ্য প্রয়াস। কবি হিসেবে তাঁর যে দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছরের পথচলা, তারই মননশীল নির্যাস আমরা খুঁজে পাই তাঁর উপন্যাসের গদ্যে। তিনি সস্তা বিনোদন বা চটুল কাহিনীর সহজ সরল রৈখিক ধারাকে সম্পূর্ণ বর্জন করেছেন। তাঁর লিখন শৈলীর প্রধানতম বৈশিষ্ট্য হলো—শব্দের সুনিপুণ ও ক্ষুরধার বুননে চরিত্রের অবচেতন মনের জটিলতা, একাকীত্ব, অবদমন এবং অস্তিত্বের সংকটকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা।
রাজনৈতিক ইতিহাসের মহাকাব্যিক ক্যানভাস হোক কিংবা আধুনিক নাগরিক যাপনের লিভ-ইন সম্পর্কের টানাপোড়েন—তাঁর দৃষ্টি সর্বদা নিবদ্ধ থাকে মানুষের অভ্যন্তরীণ ভাঙা-গড়ার ওপর। রাজীব সিংহের দর্শন বলে, মানুষ ভিড়ের মাঝেও আদতে একাকী এবং এই মায়াবী শূন্যতাই মানুষের জীবনের আসল সত্য। তিনি পাঠককে কোনো কৃত্রিম সান্ত্বনা বা চটুল 'হ্যাপি এন্ডিং' উপহার দেন না, বরং কাহিনীর শেষে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে যান।
এই অন্তর্বয়ন মূলত বিশ্বসাহিত্যের সেই ঘরানাকে স্মরণ করায়, যেখানে আলবেয়ার কামুর 'দ্য আউটসাইডার' বা 'দ্য ফল' উপন্যাসের সেই চিলতে রোদ-পড়া অস্তিত্ববাদী একাকীত্ব এবং ফ্রান্ৎস কাফকার 'মেটামরফসিস' বা 'দ্য ট্রায়াল' এর গোলোকধাঁধাময় পরাবাস্তব মনস্তত্ত্ব যা আধুনিক মানুষকে আমূল নাড়িয়ে দিয়েছিল। রাজীব সিংহ যেন সেই বৈশ্বিক বিচ্ছিন্নতাবোধের সুরকেই বাংলা কথাসাহিত্যের নিজস্ব মাটিতে নতুন করে রোপণ করেছেন।
তাঁর উপন্যাসের মূল দর্শন দাঁড়িয়ে আছে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর এবং অস্তিত্ববাদী সংকটের ওপর। তিনি মধ্যবিত্ত জীবনের যান্ত্রিকতা, উগ্র আধুনিকতার নামে মানুষের মূল্যবোধের অভাব, কর্পোরেট সংস্কৃতির আগ্রাসন কিংবা রাজনৈতিক আদর্শের নৈতিক স্খলনকে অত্যন্ত নিরাসক্তভাবে পর্যবেক্ষণ করেন, যা বাংলা সাহিত্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'পুতুল নাচের ইতিকথা' কিংবা 'দিবারাত্রির কাব্য' -এর সেই অমোঘ ফ্রয়েডীয় ফ্রেমওয়ার্ককে ফিরিয়ে আনে। লেখকের বর্ণনাত্মক ভঙ্গিতে মিশে থাকে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই মহাকাব্যিক নির্মোহ দূরত্ব, যেখানে স্রষ্টা নিজেই তাঁর সৃষ্ট চরিত্রের নিয়তিকে দূর থেকে নিরাসক্ত চোখে দেখেন।
একই সাথে, তাঁর লিখনশৈলীর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো রূপকের জাদুকরি ব্যবহার। চেনা কলকাতার বাস্তব জীবনের চিত্র আঁকতে আঁকতেও তিনি অনায়াসে সেখানে এমন এক জাদু-বাস্তবতার (Magic Realism) আবহ তৈরি করতে পারেন, যা পাঠককে অমিয়ভূষণ মজুমদারের সেই গহন মনন ও ভাষার কারুকাজ এবং আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের খ্যাপাটে ও ক্ষুরধার সমাজ-বাস্তবতার লিখনভঙ্গিকে মনে করিয়ে দেয়। এই প্রথামুক্ত, আধুনিক এবং মননশীল গদ্যরীতির ভাষা এবং বিশ্বসাহিত্যের এই গভীর মনস্তাত্ত্বিক দর্শনের মেলবন্ধনের কারণেই রাজীব সিংহের সৃষ্টি সমকালীন ভিড়ের মাঝেও সিরিয়াস ও মনস্ক পাঠকদের চিন্তা ও মননকে নাড়া দিতে পেরেছে। এ কারণেই তিনি সমকালীন বাংলা কথাসাহিত্যে সিরিয়াস ও মনস্ক পাঠকদের কাছে স্বতন্ত্র আসন তৈরি করে নিয়েছেন।
তথ্যঋণ ও উৎস নির্দেশ:
১. কবি ও কথাসাহিত্যিক রাজীব সিংহের সাক্ষাৎকার, বিশেষ বিভাগ 'দশকথা', 'বিন্দু' (www.bindumag.com), মার্চ ২০২১।
২. গ্রন্থ ও প্রকাশনা উৎস: 'অন্ত্যজ অন্ধকার' (গ্রন্থরূপ: প্রতিভাস প্রকাশন); 'দ্রোহপর্ব' (গ্রন্থরূপ: উবুদশ প্রকাশনা)।
৩. সাময়িকী ও সংবাদপত্র: শারদীয় 'সংবাদ প্রতিদিন '(২০০৭), শারদীয় 'কবিতা পাক্ষিক' (২০১৪), শারদীয় 'কৃত্তিবাস '(১৪৩১), শারদীয় 'বোধন '(১৪৩১) এবং শারদীয় 'এবং বিকল্প '(১৪৩২)।
৪. সংকলন গ্রন্থ: বীজেশ সাহা সম্পাদিত 'রাজকাহিনী' (রাজ কাপুরের জীবনভিত্তিক আখ্যানের সংকলন)।
শব্দের চোরাবালিতে অস্তিত্বের খোঁজে: রাজীব সিংহের উপন্যাসের মনস্তত্ত্ব ও দর্শন
▮ মৌসুমী মিত্র
▮ মৌসুমী মিত্র




মন্তব্য