পুরোনো শহর থেকে নতুন শহরটা একেবারেই চোখে পড়ত না। ওই নতুন পত্তন করা শহরে গোলাপি চামড়ার শাসকেরা গোলাপি পাথরের সব প্রাসাদ ফেঁদে বসেছিল; কিন্তু এদিকে পুরোনো শহরের সরু গলিতে বাড়িগুলো একে অন্যের ঘাড়ে এমনভাবে হুমড়ি খেয়ে, ঠেলাঠেলি করে দাঁড়িয়ে থাকত যে, ওই ক্ষমতার গোলাপি ইমারতগুলো আর চোখে পড়ার জো ছিল না। অবশ্য ওদিকে তাকানোর গরজও কারো ছিল না। চাঁদনি চক ঘিরে থাকা ওই মুসলিম মহল্লা বা পাড়াগুলোর মানুষজন নিজেদের জীবনের ঘেরাটোপ-দেওয়া উঠোনের দিকে মুখ গুঁজে থাকতেই বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করত; নিজেদের বারান্দা আর জানলাগুলোর ওপর বেতের চিক-পর্দা নামিয়ে রাখতেই তারা ভালোবাসত। ওই সরু গলিগুলোতে বখাটে ছোকরার দল একে অন্যের হাত ধরে, হাতে হাত জড়িয়ে ঘুরে বেড়াত, দেখা হলেই গালে চুমু, আর তারপর একে অপরের দিকে মুখ করে গোল হয়ে কোমরটা একটু বেঁকিয়ে দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে আড্ডায় মশগুল থাকত। গাছপালা বা সবুজের কোনো চিহ্নমাত্র সেখানে ছিল না, আর গোরুগুলোও এ-তল্লাট থেকে দূরে দূরেই থাকত, কারণ তারা ভালো করেই জানত যে এখানে তাদের আর যাই হোক, অন্তত দেবতার সম্মান জুটবে না। সারাক্ষণ কেবল সাইকেলের ঘণ্টির একটানা টুংটাং বাজতেই থাকত। আর সেইসব কানে-তালা-লাগানো হট্টগোলের ওপর দিয়ে ভেসে আসত রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো ফলওয়ালাদের হাঁক: ও বাবুরা এসো এসো, খেয়ে দ্যাখো দুটো খেজুররর…!
জানুয়ারির সেই সকালবেলায় এই সব হট্টগোলের সঙ্গে এসে জুটল আরও কয়েকটা ব্যাপার। বাবা আর মা দুজনেই তখন একে অপরের কাছে কিছু না কিছু গোপন করে যাচ্ছে, মনে মনে চলছে লুকোছাপা। ঠিক এমন সময়েই শোনা গেল মিস্টার মুস্তাফা কামাল আর মিস্টার এস পি বাটের পায়ের আওয়াজ—তাতে কেমন যেন একটা ধড়ফড়ানি, একটা অস্থির ভাব। আর সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে একটানা বেজে চলেছে লিফাফা দাসের নাছোড়বান্দা ডুগডুগি।
মহল্লার গলিঘুঁজিতে যখন প্রথম ওই খটখট পায়ের শব্দ শোনা গেল, লিফাফা দাস এবং তার বায়োস্কোপ আর ডুগডুগি তখন বেশ খানিকটা দূরেই। খটখট-পা ট্যাক্সি থেকে নেমেই ওই সরু গলির ভেতরে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল; ওদিকে, মোড়ের মাথার বাড়িটায়, আমার মা তখন রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে সকালের নাস্তার জন্য খিচুড়ি রাঁধতে রাঁধতে আমার বাবা আর তার দূরসম্পর্কের বোন জোহরার কথাবার্তা আড়ি পেতে শুনছিল। খটখট পা-গুলো ফলওয়ালা আর হাতে-হাত-ধরে-থাকা বখাটে ছোঁড়াদের পাশ কাটিয়ে এগিয়ে চলল; আমার মা শুনতে পেল: ‘...তোমরা বাপু এমন নতুন বর-বউ, আমি তো না এসে থাকতেই পারি না, কী যে মিষ্টি, বলে বোঝাতে পারব না! চো চুইইইট!’ পা-দুটো যখন এগোচ্ছে, আমার বাবার মুখ তখন কিন্তু সত্যিই লাল হয়ে উঠল। সেই দিনগুলোয় সে ছিল তার রূপের একেবারে মধ্যগগনে; তার নিচের ঠোঁটটা তখন সত্যিই অতটা ঝুলে থাকত না, দুই ভুরুর মাঝখানের ভাঁজটাও ছিল একেবারে আবছা... আর আমিনা, খিচুড়ি নাড়তে নাড়তেই শুনতে পেল জোহরা একেবারে আহ্লাদে আটখানা হয়ে বলছে, ‘ওমা দ্যাখো, একেবারে গোলাপি! কিন্তু তুমি তো কত ফর্সা, ভাইজান!...’ আর বাবা তাকে খাওয়ার টেবিলে বসেই অল-ইন্ডিয়া রেডিয়ো শুনতে দিচ্ছিল, যেটার অনুমতি আমিনার অন্তত ছিল না; রেডিয়োতে লতা মঙ্গেশকর তখন একটা ঘ্যানঘ্যানে প্রেমের গান গাইছেন, আর জোহরা বলে চলেছে, ‘ঠিক আমারই মতো, তাই না?’ ‘আমাদের কেমন মিষ্টি গোলাপি সব খোকাখুকু হবে, একেবারে মানানসই, তাই না ভাইজান, ফুটফুটে ফর্সা জুটি?’ আর এদিকে পায়ের খটখট শব্দ আর হাঁড়ির ভেতর হাতা নাড়ার আওয়াজ, তার মাঝেই, ‘কালো হওয়াটা কী বিচ্ছিরি, তাই না ভাইজান, রোজ সকালে উঠে সেটা নিজের দিকেই তাকিয়ে থাকতে দেখা, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের হীনতার প্রমাণ পাওয়া! ওরা তো বটেই, এমনকী কালোরাও জানে যে ফর্সা হওয়াই ভালো, তুমি কী বলো?’ পা-দুটো এখন খুব কাছাকাছি, আর আমিনা হাঁড়ি হাতে সটান খাওয়ার ঘরে ঢুকে পড়ল। নিজেকে সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে ভাবতে লাগল, আজকেই কি ওর আসার দিন ছিল, যখন আমার ওকে একটা খবর দেওয়ার আছে, আর ওই মেয়েটার সামনেই আমাকে টাকার কথাটাও পাড়তে হবে। আহমেদ সিনাইয়ের ভারী পছন্দ ছিল কেউ যেন তার কাছে খুব সুন্দর করে টাকা চায়, আদর আর মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে টাকাটা আদায় করে নেয়, যতক্ষণ না তার পাজামার ভেতর কিছু একটা নড়াচড়া করায় কোলের ওপর রাখা টেবিল-ন্যাপকিনটা ফুলে ওঠে; আর এতে আমিনারও কোনো আপত্তি ছিল না, নিজের একনিষ্ঠ স্বভাবের গুণে সে এটাকেও ভালোবাসতে শিখেছিল, আর যখন তার টাকার দরকার পড়ত তখন একটু গায়ে হাত বুলিয়ে আদর আর ‘জানম, আমার জান, প্লিজ…’ আর ‘...একটুখানি দাও না যাতে ভালোমন্দ কিছু রেঁধে খাওয়াতে পারি আর বিলগুলো মেটাতে পারি…’ আর ‘তুমি কত বড়ো মনের মানুষ, তোমার যা মন চায় দাও, আমি জানি তাতেই আমার হয়ে যাবে’... রাস্তার ভিখারিদের মতো এসব কায়দাকানুন আর কি, আর এখন তাকে সেটাই করতে হবে ওই মেয়েটার সামনে, যার কিনা ডাগর ডাগর চোখ, ফিকফিক-করে-হাসা গলা আর কালো মানুষদের নিয়ে লম্বা-চওড়া ভাষণ। পা-দুটো এখন প্রায় দরজার কাছে, আর আমিনা গরম খিচুড়ি নিয়ে খাওয়ার ঘরে একেবারে তৈরি, জোহরার ওই বোকা মাথার খুব কাছাকাছি। আর ঠিক তখনই জোহরা চেঁচিয়ে ওঠে, ‘ওহ, অবশ্যই উপস্থিতদের কথা বাদ দিয়ে!’—নেহাতই সাবধানের মার নেই ভেবে, তার কথা কেউ শুনতে পেয়েছে কি না তা নিয়ে নিশ্চিত না হয়েই সে বলে, ‘ওহ, আহমেদ, ভাইজান, তুমি তো সাংঘাতিক, তুমি ভাবলে আমি আমাদের মিষ্টি আমিনার কথা বলছি, যে কিনা মোটেও অতটা কালো নয়, বরং ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকা একজন ফর্সা মেমসাহেবের মতোই!’ ওদিকে হাঁড়ি হাতে আমিনা ওই সুন্দর মাথাটার দিকে তাকিয়ে ভাবে, ঢেলে দেব নাকি? আর, আমার কি অত সাহস আছে? আর নিজেকে এই বলে শান্ত করে: ‘আজকের দিনটা আমার জন্য একটা বড়ো দিন; আর অন্তত ও তো বাচ্চাদের কথাটা তুলল; তাই এখন আমার পক্ষে বলাটা সোজা হবে…’ কিন্তু বড্ড দেরি হয়ে গেছে, রেডিয়োতে লতার সেই ঘ্যানঘ্যানে গান কলিংবেলের আওয়াজটাকে একদম ডুবিয়ে দিয়েছে, তাই বুড়ো বেয়ারা মুসা যে দরজা খুলতে গেছে, সেটা ওদের কানেই পৌঁছায়নি; সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে-আসা সেই ব্যস্তবাগীশ পায়ের খটখট শব্দটাকেও লতার গান চাপা দিয়ে দিয়েছে; কিন্তু একেবারে আচমকা ওই তো ওরা এসে হাজির, মিস্টার মুস্তাফা কেমাল আর মিস্টার এস. পি. বাট-এর পা-জোড়া ঘষটে ঘষটে এসে থামল।
‘দুর্বৃত্তরা এক ভয়ানক কাণ্ড সংঘটন করিয়াছে!’ মিস্টার কেমাল—যাঁকে দেখে আমিনার মনে হলো তার জীবনে দেখা এ-ই সবচেয়ে লিকলিকে রোগা মানুষ—তাঁর সেই অদ্ভুত সেকেলে বুলি আউড়ে (মামলা-মোকদ্দমার প্রতি তাঁর ছিল বড্ড ঝোঁক, আর সেই সুবাদেই তিনি আদালতের অমন খটমটে আইনি ভাষার ছাঁচে একেবারে মজে গিয়েছিলেন) ক্রমাগত এমন এক হাস্যকর আতঙ্কের ঢেউ তুললেন যে, তার সঙ্গে ওই বেঁটেখাটো, ক্যাঁচক্যাঁচে গলার স্বরওয়ালা মেরুদণ্ডহীন এস. পি. বাট—যার চোখের ভেতর বাঁদরের মতো বুনো একটা কিছু সারাক্ষণ নেচে বেড়ায়—তার গলা থেকে স্রেফ এই কয়েকটা শব্দ বার করে তাতে আরও বেশ খানিকটা ইন্ধন জোগাল: ‘হ্যাঁ, ওই আগুন-লাগানোর দল!’ আর ঠিক তখনই জোহরা কেমন একটা ঘোরের বশে রেডিওটাকে তার বুকের কাছে জাপটে ধরে, লতার গানটাকে নিজের দুই স্তনের মাঝে একেবারে এমন চেপে ধরল যে বাজতে থাকা লতা মঙ্গেশকরের গলা পর্যন্ত ফ্যাঁসফ্যাঁসে হয়ে গেল, আর চেঁচিয়ে উঠল: ‘হায় খোদা, ও খোদা, আগুন-লাগানোর দল মানে, কোথায়? এই বাড়িতে? হায় খোদা, আমি তো রীতিমতো আগুনের আঁচ টের পাচ্ছি গো!’ আমিনা হাতে খিচুড়ির হাঁড়ি নিয়ে একেবারে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে বিজনেস-স্যুট পরা ওই লোকদুটোর দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইল, আর ঠিক তখনই, সমস্ত লুকোছাপার তোয়াক্কা একেবারে হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে, আমিনার স্বামী—যিনি দাড়িটা সবেমাত্র কামিয়েছেন কিন্তু স্যুটটা তখনও গায়ে চড়াননি—উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘গুদামে?’
গোডাউন, গুদাম কিংবা ওয়্যারহাউস—আপনি যে নামেই ডাকুন না কেন; আহমেদ সিনাইয়ের মুখ থেকে প্রশ্নটা খসতেই সারা ঘরে একটা থমথমে নিস্তব্ধতা নেমে এল। শুধু জোহরার বুকের গভীর খাঁজ থেকে তখনও লতা মঙ্গেশকরের মিহি গলার গান বেজেই চলেছে। আসলে শহরের একপ্রান্তে, শিল্পাঞ্চলে ঠিক এরকমই একটা পেল্লায় ইমারতের মালিকানার সঙ্গে এই তিনজন মানুষ যুক্ত ছিলেন। ‘হে মাবুদ! গুদামঘরটা যেন না হয়, রক্ষে করো খোদা!’ আমিনা মনে মনে প্রার্থনা করল, কারণ রেক্সিন আর চামড়ার কাপড়ের ব্যবসাটা তখন বেশ ভালোই চলছিল—মেজর জুলফিকার, যিনি তখন দিল্লির মিলিটারি হেডকোয়ার্টার্সে এক উচ্চপদস্থ অফিসার, তাঁরই দৌলতে আহমেদ সিনাই খোদ সেনাবাহিনীর জন্য চামড়ার কাপড়ের জ্যাকেট আর জল-আটকানো টেবিল-কভার সরবরাহের একটা বিরাট বরাত পেয়েছিল—আর যে মালপত্রের ওপর তাদের গোটা জীবনটা নির্ভর করে ছিল, তার এক বিশাল মজুত ওই গুদামেই রাখা ছিল। ‘কিন্তু এমন কাণ্ড কে ঘটাতে যাবে?’ জোহরা তার গান-বাজতে-থাকা বুকের সঙ্গে গলা মিলিয়ে আর্তনাদ করে উঠল, ‘দুনিয়াটা কি সুব পাগলে ছেয়ে গেল!’ ...আর ঠিক এভাবেই আমিনা প্রথমবারের মতো সেই নামটা শুনতে পেল, যে নামটা তার স্বামী এতদিন ধরে তার কাছ থেকে সযত্নে লুকিয়ে রেখেছিল, আর যে নামটা সেই দিনগুলোতে বহু মানুষের মনে রীতিমতো ত্রাস সৃষ্টি করেছিল।
‘কাজটা ওই রাবণের,’ এস. পি. বাট বলল... কিন্তু রাবণ তো একটা বহু-মাথাওয়ালা রাক্ষসের নাম; তা হলে কি আজকাল এই মুলুকে রাক্ষসেরাও ঘুরে বেড়াচ্ছে? ‘কী সব আবোল-তাবোল বকছেন?’ নিজের বাবার মতোই কুসংস্কারের প্রতি তীব্র ঘৃণা নিয়ে আমিনা ঝাঁঝিয়ে উঠল; তখন মিস্টার কেমাল ব্যাখ্যা দিলেন: ‘ম্যাডাম, এ হলো আসলে একদল শয়তান দুর্বৃত্তের নাম; একদল আগুন-লাগানো বজ্জাত। দিনকাল বড্ড খারাপ পড়েছে; বড়োই খারাপ।’
গুদামঘরের ভেতরে থাক থাক সাজানো রয়েছে লেদারক্লথের রোলের পর রোল; আর আছে মিস্টার কেমালের কারবার—চাল, চা ও মুসুরির ডাল। সারা দেশজুড়ে তিনি বিপুল পরিমাণে এসব মজুত করে রেখেছেন। কেন? আসলে ওই যে অগণিত মাথা আর অগণিত হাঁ-করা লোলুপ রাক্ষুসে জানোয়ার ওঁৎ পেতে আছে—যাদের বলে ‘পাবলিক’, তাদের হাত থেকে এক ধরণের সুরক্ষা পেতেই এই ব্যবস্থা। ওই জনতাকে যদি একবার প্রশ্রয় দেওয়া হয়, তবে যখন বাজারে প্রাচুর্য দেখা দেবে, এরা তখন জিনিসের দাম এমন কমিয়ে দেবে যে বেচারা ধর্মভীরু ব্যবসায়ীরা না খেয়ে মরবে, আর ওদিকে ওই রাক্ষসটা খেয়েদেয়ে মোটা হবে… মিস্টার কেমাল তো বলেই দেন, ‘অর্থনীতি মানেই হলো গিয়ে অভাব। তাই আমি যে মাল ধরে রাখি, তাতে শুধু জিনিসের দামটাই ঠিকঠাক থাকে না, বরং অর্থনীতির মূল কাঠামোটাও টিকে থাকে।’ গুদামে মিস্টার ভাটেরও একটা জমানো মালের স্তূপ আছে। কার্টনে ভরা, তার গায়ে লেখা ‘আগ ব্র্যান্ড’ A A G B R A N D। ‘আগ’ মানে যে আগুন, সেটা বোধহয় আপনাদের আলাদা করে বলে দেওয়ার দরকার নেই। এস. পি. ভাট আসলে দেশলাইয়ের কারবার করতেন।
মিস্টার কেমাল বললেন, ‘আমাদের কাছে যা খবর আছে, তাতে শুধু এস্টেটে আগুন লাগার ব্যাপারটাই জানা যাচ্ছে। ঠিক কোন গুদামটায় আগুনটা লেগেছে, সেটা নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না।’
‘কিন্তু আমাদের গুদামেই-বা আগুন লাগতে যাবে কেন?’ আহমেদ সিনাই প্রশ্ন করলেন, ‘টাকা মেটানোর তো এখনও ঢের সময় বাকি, তাই না?’
আমিনা কথার মাঝখানেই বাধা দিয়ে বলে উঠল, ‘টাকা? কাকে টাকা? কীসের টাকা? ওগো শুনছ, আমার জানুম, আমার জানের জান, হচ্ছেটা কী এখানে?’. . . কিন্তু এস. পি. ভাট তাড়া দিয়ে বললেন, ‘আমাদের এখনই বেরোতে হবে’, আর আহমেদ সিনাইও তার ওই কোঁচকানো রাতের পাজামা আর চটি পরা অবস্থাতেই বেরিয়ে পড়ল। সেই লিকলিকে আর ওই মেরুদণ্ডহীন লোকদুটোর সঙ্গে ফটফট শব্দ তুলে হন্তদন্ত হয়ে সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল, আর তার পেছনে পড়ে রইল না-খাওয়া খিচুড়ি, বড়ো বড়ো চোখে তাকিয়ে থাকা দুই মহিলা, চাপা পড়ে যাওয়া লতার গান, আর বাতাসে ভাসতে থাকা সেই রাবণের নাম… ‘একদল অপদার্থ বখাটের দল, ম্যাডাম; আগাগোড়া একদল বিবেকহীন গলাকাটা গুন্ডা আর বদমাইশের দঙ্গল!’
এস. পি. ভাটের শেষ কাঁপা কাঁপা কথাগুলো ছিল: ‘যতসব আহাম্মক হিন্দুরাই আগুন লাগাচ্ছে, বেগম সাহিবা। আমরা মুসলমানরা আর কীই-বা করতে পারি বলুন?’
আচ্ছা ওই রাবণ গ্যাং সম্পর্কে ঠিক কী কী জানা যায় বলুন তো? এটুকু জানা যায় যে, এরা নিজেদের একটা উগ্র মুসলিম-বিদ্বেষী দল হিসেবে পরিচয় দিত। দেশভাগের দাঙ্গার ঠিক আগের সেই দিনগুলোতে—যখন জুম্মাবারে মসজিদ চত্বরে কেউ শুয়োরের মাথা ফেলে রাখলেও কেউ টুঁ শব্দটি করত না—তখন এমন দলের অস্তিত্ব খুব একটা অস্বাভাবিক ছিল না। আরও জানা যায় যে, গভীর রাতে নিজেদের লোকজন পাঠিয়ে এরা পুরনো আর নতুন—দুই শহরের দেওয়ালে দেওয়ালে স্লোগান লিখিয়ে বেড়াত: দেশভাগ হলে বিনাশ নিশ্চিত! মুসলমানরা হলো এশিয়ার ইহুদি!—আরও কত কী। আর তার সঙ্গে চলত মুসলমানদের কারখানা, দোকানপাট, গুদামঘরে আগুন লাগানো। তবে এর আড়ালে আরও একটা ব্যাপার ছিল, যা সচরাচর লোকে জানে না। এই সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের মুখোশটা সরিয়ে দিলে দেখা যেত, রাবণ-গোষ্ঠী আসলে এক দারুণ ফন্দি-আঁটা ব্যবসায়িক কারবার। মুসলিম ব্যবসায়ীদের কাছে বেনামী ফোন আসত, খবরের কাগজের অক্ষর কেটে জোড়া দিয়ে তৈরি চিঠি আসত। প্রস্তাবটা ছিল সাফ—হয় এককালীন কিছু টাকা দাও, নয়তো নিজের সাজানো সংসার পুড়ে ছাই হতে দ্যাখো। মজার ব্যাপার হলো, এই গ্যাং-এর লোকেরা কিন্তু একদিক দিয়ে বেশ নীতিবান ছিল। একবার টাকা পেলে দ্বিতীয়বার আর চাইত না। আর তারা যা বলত, কাজেও তাই করত। ঘুষের টাকায় ঠাসা ধূসর থলিটা না পৌঁছলে, নির্ঘাত আগুন লাগত দোকানের ঝাঁপে, কারখানায় বা গুদামে। পুলিশের ওপর ভরসা করার ঝুঁকি না নিয়ে বেশির ভাগ লোকই টাকা দিয়ে ঝামেলা মেটানো ভালো মনে করত। ১৯৪৭ সালের সেই সময়টায় পুলিশকে মুসলমানরা ঠিক বিশ্বাস করতে পারত না। আরও শোনা যায় (যদিও আমি ঠিক নিশ্চিত নই), ওই ব্ল্যাকমেলের চিঠির ভেতরে নাকি ‘সন্তুষ্ট খদ্দেরদের’ একটা তালিকাও থাকত—যাঁরা টাকা দিয়ে বহাল তবিয়তে ব্যবসা করছেন। সব পেশাদার কারবারিদের মতো রাবণ গ্যাংও রেফারেন্স দিত আর কী!
দুজন স্যুট-বুট পরা ভদ্রলোক, আর সঙ্গে একজন পাজামা-পরা—তারা ওই মুসলিম মহল্লার সরু গলিঘুঁজি পেরিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটল চাঁদনি চকে দাঁড়িয়ে থাকা ট্যাক্সিটার দিকে। লোকে যে তাদের দিকে ভারী কৌতূহল নিয়ে তাকাচ্ছিল, তার কারণ শুধু যে তাদের ওই রকমারি পোশাক-আশাক—তা নয়, আরও একটা কারণ হলো—তারা দৌড়বে না দৌড়বে না করেও দৌড়চ্ছিল। ‘খবরদার, আতঙ্কটা চোখেমুখে ফুটতে উঠতে দেবেন না,’ মিস্টার কেমাল বললেন, ‘একেবারে শান্ত ভাবে থাকুন।’ কিন্তু তাদের পা জোড়া কি আর কথা শোনে? সেগুলো যেন বশে থাকতেই চাইছিল না, কেবলই সামনের দিকে ছুট লাগাচ্ছিল। কখনও আচমকা এক চোট ভোঁ-দৌড়, আবার তার পরেই জোর করে ভদ্রস্থভাবে হাঁটার আপ্রাণ চেষ্টা—এইভাবে হেঁচকা টানে চলতে চলতে তারা মহল্লা পার হলো; আর যাওয়ার পথে তাদের পাশ কাটিয়ে গেল এক যুবক, যার সঙ্গে ছিল চাকায়-বসানো কালো রঙের একটা লোহার বায়োস্কোপের বাক্স আর হাতে একটা ডুগডুগি: সে হলো লিফাফা দাস। সে তখন সেই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণার ঘটনাস্থলের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছিল, যে-ঘোষণাটার নামেই এই অধ্যায়ের নামকরণ করা হয়েছে। লিফাফা দাস তার ডুগডুগি বাজাচ্ছিল আর হাঁক পাড়ছিল: ‘দেখো দেখো সব দেখো, আও আও! দিল্লি দেখো, দেখো হিন্দুস্তান… আরে দেখো দেখো! আও আও! সব দ্যাখো!’
কিন্তু আহমেদ সিনাইয়ের যে তখন অন্য কিছু দেখার ছিল।
মহল্লার ওই ছেলে-ছোকরাদের আবার একটা স্বভাব ছিল, পাড়াপড়শিদের প্রায় কাউকেই তারা আসল নামে ডাকত না, সবার জন্য ছিল নিজেদের দেওয়া এক-একটা জুতসই নাম। জনা-তিনেক পড়শির একটা দলকে ওরা ডাকত ‘লড়াকু মোরগের দল’ বলে, কারণ ওই দলে ছিল—একজন সিন্ধি আর একজন বাঙালি গেরস্ত, আর তাদের বাড়ি দুটোর ঠিক মাঝখানে স্যান্ডউইচ হয়ে ছিল ওই মহল্লারই হাতে-গোনা কয়েকটা হিন্দু বাড়ির মধ্যে একটা। ওই সিন্ধি আর বাঙালির মধ্যে মিলমিশ বলতে কিস্যু নেই—না মুখের ভাষা এক, না রান্নাবান্নার ধরন; কিন্তু দুজনেই তো মুসলমান, আর দুজনেই মাঝখানের ওই হিন্দু লোকটাকে একেবারে দু-চক্ষে দেখতে পারত না। নিজেদের ছাদ থেকে ওরা লোকটার বাড়ির ওপর ময়লা-আবর্জনা ফেলত। জানলা দিয়ে হরেক ভাষায় গালাগাল পাড়ত। দরজায় মাংসের হাড়গোড় উচ্ছিষ্ট ছুঁড়ে মারত… আর ওদিকে সেই হিন্দু লোকটাও কিছু কম যায় না, সে আবার পাড়ার বিচ্ছুগুলোকে পয়সা খাইয়ে ওদের জানলায় ঢিল মারাত, আর সেই ঢিলের গায়ে জড়ানো থাকত সব চিরকুট: তাতে লেখা, ‘সবুর কর,’ কিংবা ‘তোদের দিনও আসবে’... মহল্লার সেই ছেলেপুলেরা আমার বাবাকেও তার আসল নামে ডাকত না। ওরা তাকে চিনত ‘যে লোকটা নিজের নাক বরাবর চলতে জানে না’ বলে।
আহমেদ সিনাইয়ের দিক চেনার জ্ঞান এতই গোলমেলে ছিল যে, নিজের ভরসায় ছেড়ে দিলে সে নিজের পাড়ার ওই প্যাঁচালো গলিঘুঁজিতেও দিব্যি পথ হারিয়ে ফেলত। কতবার যে পাড়ার রাস্তার ওই ভবঘুরে ছোকরারা তাকে গলিগুলোর ভেতরে উদ্দেশ্যহীনভাবে অসহায় অবস্থায় ঘুরে বেড়াতে দেখেছে, আর তাকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার বকশিশ হিসেবে একটা চার আনার সিকি বা চবন্নি জুটিয়ে নিয়েছে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। এ-কথাটা আমি এইজন্যই তুলছি কারণ আমার বিশ্বাস, বাবার এই ভুল রাস্তায় পা বাড়ানোর যে অদ্ভুত প্রতিভা, তা শুধু যে তাকে সারাজীবন ভুগিয়েছে তা নয়; বরং এটা আমিনা সিনাইয়ের প্রতি তার আকর্ষণেরও একটা বড়ো কারণ ছিল (কারণ নাদির খানের দৌলতে আমিনাও ততদিনে বুঝিয়ে দিয়েছিল যে, সে-ও দিব্যি ভুল পথে পা বাড়াতে পারে); আর তার চেয়েও বড়ো কথা, নিজের নাক বরাবর চলতে না-পারার ওই অক্ষমতাটা একটু একটু করে আমার ভেতরেও চুঁইয়ে পড়েছিল, যা কিনা অন্য জায়গা থেকে পাওয়া আমার নাকের সেই বংশগত ক্ষমতাটাকে বেশ খানিকটা ঘোলাটে করে দিয়েছিল, আর বছরের পর বছর ধরে আমাকে সঠিক রাস্তার গন্ধ শুঁকে বের করার ব্যাপারে একেবারে অকর্মণ্য করে রেখেছিল… তবে সে-সব কথা এখন থাক, কারণ ওই তিনজন ব্যবসায়ীকে শিল্পাঞ্চলে পৌঁছানোর জন্য এর মধ্যেই আমি যথেষ্ট সময় দিয়ে ফেলেছি। আমি শুধু এটুকু যোগ করতে চাই যে (আমার মতে, তাঁর ওই সঠিক দিক-নিশানা না করতে পারার প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে) আমার বাবা ছিলেন এমন একজন মানুষ, যাঁর চরম সাফল্যের মুহূর্তগুলোতেও মাথার ওপর ভবিষ্যতের এক ব্যর্থতার দুর্গন্ধ পাক খেয়ে বেড়াত, খুব কাছেই ওঁত পেতে থাকা একটা ভুল রাস্তায় বাঁক নেওয়ার গন্ধ, এমন এক উৎকট গন্ধ—যা তাঁর ঘনঘন স্নান করার অভ্যেস দিয়েও কোনোদিন ধুয়ে ফেলা যেত না। মিস্টার কেমাল, যিনি কিনা ওই গন্ধটা পেতেন, তিনি আড়ালে এস. পি. বাটকে বলতেন, ‘এই কাশ্মীরি লোকগুলো, বুঝলে হে: এরা যে কখনো স্নান-টান করে না, সে তো সবারই জানা কথা।’ আর এই অপবাদটাই আমার বাবাকে সেই তাই মাঝির সঙ্গে এক সুতোয় বেঁধে দেয়... সেই তাই, যে কিনা নিজের ওপর আত্মঘাতী এক রাগের বশে নিজেকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার পাটই একেবারে চুকিয়ে দিয়েছিল।
পূর্ববর্তী পর্ব পড়ুন এখানে: [মধ্যরাতের সন্তানেরা]
মধ্যরাতের সন্তানেরা
সালমান রুশদি
▋অনুবাদ: দীপ মন্ডল
সালমান রুশদি
▋অনুবাদ: দীপ মন্ডল




মন্তব্য