গৃহনির্মাণের আগের গল্পটা
গৃহনির্মাণের আগের গল্পটা যে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প, তা
আমি টের পাই যখন বাগানে বৃষ্টি নামে সন্ধ্যায়—
ইদানীং ঘর বলতে সাহসী ঝড়ের দিকে তাকাই,
মেঘের গর্জনে বুনো পশুদের হারানো স্মৃতি ফিরে পাবার
মতো ধূসর চৈতন্য ছিঁড়ে তোমার ছবি আঁকি,
ফিরে যাই কারবালা প্রান্তরে, জঙ্গনামায় লেখা হয়—
গৃহনির্মাণের আগে প্রিয়তম রক্তজবারা নিভে গেছে
দমকা বাতাসে; নিশাচর হুতুম প্যাঁচাদের গানে
কারো ভগ্ন হৃদয়ের সলিলকি ঢুকে পড়ে—
তারপর ধুলো-মেঘ, ভাঙতে থাকা মানুষের ভিড়।
আমি জেনেছি, তোমার সিংহ রাশির পাশে আমার
মীন রাশির উপস্থাপনা কী হাস্যকর ছিল; তবু এই
আশ্চর্য উঠোনে আমাদের নিমাই আজো কণ্ঠ ছাড়ে,
সানাই বাজিয়ে রাতের জঙ্গল পেরিয়ে যায় হরিণের পাল—
ক্লান্ত সহিসের সারাবেলা
পুরনো আস্তাবল চুঁঁইয়ে ঝরে পড়ছে মগ্ন শিশির
আর তার মনে হতে থাকে—
ভেতরে কোথাও ঘুঙুর পায়ে হেঁটে যাচ্ছে
একঝাঁক বুনো ঘোড়া...
ক্লান্ত সহিসের সারাবেলা এসে বসে তার পাশে—
শ্মশানের সান্ধ্য বাতাসে, শীতবৃষ্টির ফাঁকে ফাঁকে
তিনি রোপণ করেন বাবলা ফুলের হলুদ নয়ন—
ধুলোয় মোড়ানো রূপকের লতায় ঝুলে আছে সংশয়
ঘরে ঘরে আগুনের চাকচিক্য সিঁড়ি,
সেইসব বুনো ঘোড়া সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠছে
বাতাসে ভাসছে তাদের জন্মহিঙ্কার—
ক্ষতবিক্ষত খবর ছড়িয়েছে ইথারে
গন্তব্যে যাবার জন্যে দাঁড়িয়ে আছি সীমান্তে,
তোমার আত্মার পাশে হরীতকীর জঙ্গল, দেখি—
নোম্যান্সল্যান্ডে বসে একটি দণ্ডিত পাখি
বিভঙ্গ ডানায় তুলে নিচ্ছে জঙ্গলের গুপ্ত মন্ত্র,
ক্ষতবিক্ষত খবর ছড়িয়েছে ইথারে, ফুলে উঠছে
ঝকঝকে মিথ্যেগুলো ফুল-পাখির মুক্তছন্দে—
যারা হাত বাড়িয়ে টেনে নিচ্ছে জল-হাওয়ার সন্ধি
তারা কি জেনে গেছে এই বালি-জীবনের
শাস্ত্র ও মেলোড্রামা কতটা টুকে রাখে মাটির মমতা?
গন্তব্যে যাবার জন্যে দাঁড়িয়ে আছি সীমান্তে,
তুমিও আসছো মেঘের দেয়ালে চূড়ান্ত মৃত্যু এঁকে
মুখরিত রোদের মধ্যে হেঁটে হেঁটে মর্মরিত পথিক—
তোমার উদাস চোখের নবীন বর্ষার সংগীত
বিকেলের বারান্দায় সযত্নে ছড়িয়ে দিয়ে
তুমি তোতাপাখির হৃদপিণ্ডের বিধ্বস্ত জানলায়
ঝুলিয়ে রেখে সমস্ত যৌবন, যতিহীন অধরা তুমি
শূন্যতায় উড়ে এসে পাশে রাখলে শুকনো পাতার
গুনগুন, নরকের বাতিগুলো জ্বলে ওঠেনি তখনও
সেই নিখিল কম্পনে, সেই আদিগন্ত অন্ধকারে
আমাদের সমস্ত দেহ ডুবে যেতে থাকে অকূল সীমান্তে—
গহীনে বেঁকে যাচ্ছে জগৎ
স্বপ্নের ভেতরে কাঠকয়লা পুড়ছে, আর
সেই ঐন্দ্রজালিক ধোঁয়ার ভেতরে তুমি স্মিত হাসছো,
গহীনে বেঁকে যাচ্ছে জগৎ
মুছে যাওয়া স্মৃতির পাড় ধরে গুণ টেনে চলেছে
ধোঁয়ার কু-লী, কাদায় ডুবে আছে তোমার মুখ
মধ্যরাতের ঝুম বৃষ্টির মায়ায় তোমার ছাইভষ্ম মন
সন্ধ্যা পেরিয়ে উড়ে যাচ্ছে অরণ্যে—
জীবন এক আশ্চর্য নির্জন শহর
রাত নামলে বোঝা যায় ল্যাম্পপোস্টের অতল গভীরে
অদ্ভুত সব কান্নার ধ্বনি ডানা মেলে উড়ছে
টেরাকোটার নিঃশব্দ শোক
এই খেলা, এই সরল জার্নি, জলদেবতার;
যেন মিহি আলোর ভেতরে খেলে যাচ্ছে
ড্রাগন ফলের উন্মাদ ডালপালা। অর্জুন-পাতার
মর্মর ছুঁয়ে যে পাখি অপলক চেয়ে আছে
আকাশের দিকে, তারও তো খেলা ছিল—
পাহাড়ের মতো কুয়াশায় মিলিয়ে যাচ্ছে
কড়ই ফলের বিলকুল ঝনঝন— সত্তার স্বচ্ছ আগুন।
বাতাস ভুলে গেছে শালীনতা, শঙ্খ বাজে চাঁদের গুহায়—
সেই শঙ্খ ও চাঁদের মোহনায়
তোমার মুখ যেন অন্তহীন বিষাদ কিংবা মেলোড্রামা
টেরাকোটার নিঃশব্দ শোকের মধ্যে বহমান—
ক্লান্ত সহিসের সারাবেলা ও অন্যান্য কবিতা
▮ কামরুল ইসলাম
▮ কামরুল ইসলাম




মন্তব্য