বাংলাদেশের নাট্যচর্চার ইতিহাস নিয়ে দীর্ঘদিন যে ধারণাটি আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনায় প্রতিষ্ঠিত ছিল, তার কেন্দ্রে ছিল মূলত ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি। প্রচলিত ইতিহাসে মনে করা হতো, প্রথম বাংলা নাটকের রচয়িতা ও পরিচালক হেরাসিম স্তেপানোভিচ লেবেদেফ নামক একজন রুশ ভদ্রলোক। কলকাতায় ২৫ নম্বর ডোমতলায় (এজরা স্ট্রিট) একটি বাড়িতে “দ্য বেঙ্গলি থিয়েটার” নামে একটি থিয়েটার গড়ে তোলেন। সেখানে মলিয়েরের “Love Is The Best Doctor” এবং জড্রেলের “The Disguise” (কাল্পনিক সংবাদবদল) নাটক বাংলায় অনুবাদ করে ১৭৯৫ সালের ২৭ নভেম্বর মঞ্চায়ন করেন।
এভাবে বাংলা নাটকের ইতিহাসকে ইউরোপীয় নাট্যরীতির আগমন ও বিকাশের অধীন হিসেবে দেখার চর্চা শুরু হয়েছিল। কিন্তু নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন এই প্রচলিত ধারণার সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তুললেন—“বাংলার মানুষের কি তারও আগে কোনো নাট্যঐতিহ্য ছিল না? বাংলার মানুষ কি হাজার বছর ধরে গান, কাহিনি, নৃত্য, অভিনয়, আখ্যান ও পরিবেশনার মধ্য দিয়ে নিজেদের জীবনকে মঞ্চায়িত করেনি?” সেলিম আল দীনের গবেষণা ও নাট্যচর্চা সেই প্রশ্নেরই গভীর অনুসন্ধান।
তাঁর গবেষণাগ্রন্থ মধ্যযুগের বাঙলা নাটক, বাঙলা নাট্যকোষ এবং দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্ব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি শুধুমাত্র নতুন একটি নাট্যরীতি প্রবর্তন করেননি; বরং বাংলা নাটকের ইতিহাসকে তার দেশজ সাংস্কৃতিক শিকড়ের কাছে ফিরিয়ে নেওয়ার বৃহত্তর এক বুদ্ধিবৃত্তিক প্রকল্প নির্মাণ করেছিলেন।
নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের কাছে নাটক কেবল পাশ্চাত্য নাট্যসংজ্ঞায় আবদ্ধ নির্দিষ্ট কোনো সাহিত্যিক রচনা নয়। বাংলা নাটককে বুঝতে হলে তাকে তার পরিবেশনামূলক অস্তিত্বের মধ্য দিয়ে বুঝতে হবে। কাহিনি, চরিত্র, সংলাপ, অভিনয়, সংগীত, নৃত্য, বাচিকতা, দর্শক-সম্পৃক্ততা, দৃশ্যায়ন ইত্যাদি উপাদানগুলোকে পাশ্চাত্য শিল্পতত্ত্ব পৃথক পৃথক কাঠামোয় বিচার করেছে। বাংলার দেশজ পরিবেশনাগুলোতে সেগুলো বহুদিন ধরেই পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে সক্রিয় ছিল।
এই কারণেই রামায়ণ গান, কুশান গান, রয়ানীর গান, মনসার গীত, পদ্মপুরাণ গান, গাজীর গান, জারি গানসহ নানা ঐতিহ্যবাহী পরিবেশনাকে সেলিম আল দীন বাংলা নাটকের ইতিহাসের উপাদান হিসেবে পুনরাবিষ্কার করেন। যেগুলোকে সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ শাসকেরা কেবল “লোকসংস্কৃতি” বা “গ্রামীণ বিনোদন” হিসেবে কোণঠাসা করে রাখতে চেয়েছিল, সেগুলোর অন্তর্নিহিত নাট্যরূপ আবিষ্কার করেছিলেন সেলিম আল দীন।
তিনি দেখিয়েছেন—এসব পরিবেশনার মধ্যে কাহিনি আছে, চরিত্র আছে, দ্বন্দ্ব আছে, অভিনয় আছে, গান আছে, বাচিকতা আছে, দেহভঙ্গি ও নৃত্য আছে, দর্শকের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ আছে। অর্থাৎ নাট্যক্রিয়ার মৌলিক উপাদানগুলো এখানে সক্রিয়ভাবেই অবস্থান করছে।
সেলিম আল দীনের অনুসন্ধানের তাৎপর্যের গভীরে ছিল “নাটক” শব্দটির প্রচলিত সংজ্ঞাকে পুনর্বিবেচনা করার প্রয়াস। অর্থাৎ প্রশ্নটি আর শুধু “বাংলা নাটক কবে শুরু হলো?”- এখানে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং প্রশ্ন হয়ে ওঠে—“এখানকার মানুষ কবে থেকে তার জীবন, বিশ্বাস, প্রেম, ধর্ম, সংঘাত ও সামাজিক অভিজ্ঞতাকে অভিনয়-পরিবেশনার মাধ্যমে প্রকাশ করতে শুরু করেছিল?” এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বাংলা নাট্যের ইতিহাস ক্রমেই দীর্ঘতর এবং গভীরতর হয়ে ওঠে।
নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের নাট্যভাবনাকে বোঝার জন্য উপনিবেশবাদী সাংস্কৃতিক চরিত্রটি বোঝা জরুরি। উপনিবেশবাদ কোনো ভূখণ্ডকে রাজনৈতিকভাবে দখল করেই তার কাজ শেষ করে না। মানুষের ইতিহাসবোধ, সংস্কৃতিবোধ, রুচি ও আত্মপরিচয়ের ধারণাকেও সে প্রভাবিত করে।
ঔপনিবেশিক শাসনের ফলে একটি জাতি যখন নিজের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে হীন, অনুন্নত কিংবা “লোকজ” বলে দেখতে শুরু করে এবং ঔপনিবেশিক শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে উন্নত ও আদর্শ বলে গ্রহণ করে, তখন রাজনৈতিক শাসনের অবসানের পরও উপনিবেশবাদের বড় একটি অংশ মানুষের চেতনায় থেকে যায়। এটিই সাংস্কৃতিক বা মানসিক উপনিবেশবাদের দীর্ঘস্থায়ী রূপ।
এ দেশের নাট্যচর্চার ক্ষেত্রে এই প্রবণতা প্রবলভাবে লক্ষণীয়। এজন্যই পাশ্চাত্যের নাট্যরীতি এখানে“নাটক”এর আদর্শিক রূপ হয়ে ওঠে। আর আমাদের নিজস্ব পরিবেশনাগুলো ক্রমশ “লোক” “গ্রামীণ” কিংবা “অপরিশীলিত” শিল্প হিসেবে চিহ্নিত হতে থাকে।
তখন একই সঙ্গে দুটি ঘটনা ঘটে। একদিকে পাশ্চাত্য নাট্যরীতি প্রতিষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে বাঙালির দীর্ঘদিনের দেশজ নাট্যঐতিহ্য প্রান্তিক হয়ে পড়ে। সেলিম আল দীনের গবেষণা এই জায়গাতেই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যেন এখানে জোরালো প্রশ্ন ছুড়ে দেন—
যে নিজের নাট্যঐতিহ্যকেই চিনতে পারে না, সে কীভাবে নিজের নাটকের ভাষা নির্মাণ করবে?
সেলিম আল দীনের নাট্যভাবনার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি অতীতের কাছে ফিরে গিয়ে অতীতের অনুকরণ করেননি। তিনি দেশজ ঐতিহ্যকে আধুনিক শিল্পসৃজনের উপাদান হিসেবে পুনর্বিবেচনা করেছেন।
বাংলার নাট্যধারা অনুসন্ধান করতে গিয়ে তিনি দেখতে পান, আমাদের ঐতিহ্যে শিল্পমাধ্যমগুলোর মধ্যে পাশ্চাত্যধারার মতো কঠোর বিভাজন ছিল না। কাহিনির সঙ্গে গান, গানের সঙ্গে নৃত্য, নৃত্যের সঙ্গে অভিনয়, অভিনয়ের সঙ্গে বাচিকতা—সব মিলিয়ে একটি সামগ্রিক পরিবেশনামূলক শিল্প তৈরি হয়েছে।
এই বৈশিষ্ট্যই তাঁর দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্বের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়। তিনি শিল্পকে এমনভাবে ভাগ করতে চাননি যে গল্প কেবল গল্পই হবে, কবিতা কেবল কবিতাই হবে, গান কেবল গানই থাকবে এবং নাটক কেবল সংলাপ ও অভিনয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। তাঁর শিল্পভাবনায় এই প্রত্যেকটি শিল্পমাধ্যম নিজস্ব স্বতন্ত্রতা বহন করেছে, আবার একই সঙ্গে অন্য শিল্পমাধ্যমের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে বৃহত্তর এক শিল্পসত্তা নির্মাণ করেছে।
সেলিম আল দীনের দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পভাবনার পেছনে শ্রীচৈতন্যদেবের অচিন্ত্য দ্বৈতাদ্বৈতবাদী তত্ত্ব দার্শনিক প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল। চৈতন্যদর্শনে জীব ও পরমের সম্পর্ককে একদিকে ভিন্ন, অন্যদিকে অবিচ্ছিন্ন হিসেবে ভাবা হয়। সেখানে ভেদ ও অভেদ পাশাপাশি অবস্থান করে।
ভেদ (দ্বৈত): ঈশ্বর ও তাঁর সৃষ্টি ভিন্ন দুটি সত্তা। ঈশ্বর সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। তাঁর সৃষ্টি তাঁর সেই অসীম ক্ষমতার অধীন। সমুদ্র যেমন বিশাল ও অসীম শক্তিধর, তার বিশাল জলরাশির প্রতিটি ফোঁটা তার সেই বিশালতা ও শক্তির একটি ক্ষুদ্রতম একক। কিন্তু সমুদ্রের বিশাল জলরাশির একটি ফোঁটা আবার পুরো সমুদ্র নয়।
অভেদ (অদ্বৈত): ঈশ্বর ও তাঁর সৃষ্টি আবার একই সত্তার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। যেমন সমুদ্র এবং তার বিশাল জলরাশির ক্ষুদ্রতম একটি ফোঁটা। সমুদ্রের বিশাল জলরাশির একটি ক্ষুদ্রতম ফোঁটা যেমন সেই সমুদ্র থেকেই আসে এবং সেই এক ফোঁটা পানির স্বাদও সমুদ্রের জলরাশির স্বাদেরই অংশ বহন করে, তেমনি ঈশ্বরের সৃষ্টি তাঁরই একটি অংশ। ঈশ্বরের সৃষ্টির মধ্যেই ঈশ্বরকে পাওয়া যায়। এজন্য ঈশ্বরের সৃষ্টির সেবা করলে আসলে ঈশ্বরকেই সেবা করা হয়।
সেলিম আল দীন এই দর্শনকে ধর্মীয় পরিসর থেকে বের করে নন্দনতাত্ত্বিকভাবে প্রয়োগ করেছেন। শিল্পমাধ্যমগুলোর মধ্যে তিনি একই ধরনের সম্পর্ক দেখেছেন। গান গানই, কবিতা কবিতাই, নাটক নাটকই। কিন্তু সৃষ্টির বৃহত্তর পরিসরে তাদের একে অপরের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত করেছেন যে শেষ পর্যন্ত তাদের আলাদা করে দেখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এজন্যই সেলিম আল দীনের নাটককে উপন্যাসের মতো করে পাঠ করা যায়। কবিতার মতো আবৃত্তি করা যায়। আবার সুর করলে সেটা হয়ে যায় গান, আর মঞ্চায়ন করলে নাটক। এটি তাঁর নিছক তাত্ত্বিক কসরত ছিল না। তিনি কথা, কাহিনি, উপাখ্যান, কাব্যময় ভাষা, গান, নৃত্য, অভিনয়, মিথ ও কিংবদন্তি পরস্পরকে একসঙ্গে যুক্ত করে একটি স্বতন্ত্র নাট্যভাষা তৈরি করেছেন।
দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্বকে কেবল “বিভিন্ন শিল্পের মিশ্রণ” বলা হলে এর প্রকৃত তাৎপর্য ধরা পড়ে না। কারণ গান, কবিতা, নৃত্য বা দৃশ্য সংযোজন করলেই সেটি দ্বৈতাদ্বৈতবাদী হয়ে যায় না। রচনার নিজস্ব প্রয়োজনীয়তা ও ঘটনার অভ্যন্তরীণ প্রবাহ থেকেই তাদের স্বাভাবিক সম্মিলন ঘটতে হয়।
একটি গান যদি ঘটনার স্বাভাবিক প্রকাশমাধ্যম হয়ে ওঠে, কাব্যময় সংলাপ যদি চরিত্রের অনুভবের অপরিহার্য ভাষা হয়ে ওঠে, নৃত্য যদি নাট্যক্রিয়ার অংশ হয়, তখনই তাদের স্বাভাবিক সম্মিলন সম্ভব হয়। আর তখনই হয়ে ওঠে দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্প। এই বিষয়টিকে বলা হয় নৈসর্গিক সাঙ্গীকরণ (Environmental Integration)।
যদি পরিবেশবিজ্ঞানের ভাষায় বলি, তাহলে বিষয়টা এমনভাবে বলা যায়—কোনো ঘরবাড়ি বা অট্টালিকা নির্মাণ করতে হলে সেটাকে এমনভাবে তৈরি করতে হবে যেন সেটি চারপাশের প্রাণ প্রকৃতির ক্ষতি বা সৌন্দর্য নষ্ট না করে, বরং তারই সৌন্দর্যের অংশ হয়ে ওঠে।
সেলিম আল দীনের কিত্তনখোলা, বনপাংশুল, চাকা, যৈবতী কন্যার মন, নিমজ্জন ইত্যাদি নাটকগুলোতে দেখা যায় —এখানে কথন, আখ্যান, সংলাপ, কাব্যময়তা, গান, প্রবাদ, প্রবচন, মিথ, কিংবদন্তি, অভিনয় এবং পরিবেশনামূলক উপাদান পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। তিনি পাশ্চাত্য নাট্যরীতির কৃত্রিম বিভাজন কাঠামোকে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দিয়েছেন। সেই সঙ্গে বাংলা সংস্কৃতির হাজার বছরের পরিবেশনামূলক ঐতিহ্যকে তিনি ভাষা ও উপাদান হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
সেলিম আল দীনের দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্বের সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ তাঁর যৈবতী কন্যার মন নাটকটি। মূল নাট্যকাহিনিই নির্মিত হয়েছে এই তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে। এটি দুই যুগের দুই নারীর আখ্যান। একজন কালিন্দী, অন্যজন পরী। তাঁরা দুই যুগের দুই ভিন্ন নারী হলেও আদতে তারা একই সত্তা। তাঁদের জীবনসংগ্রাম এবং জীবনের অন্তিম পরিণতিও একই রকম। এখানে দুই নারী একই সঙ্গে পৃথক এবং অভিন্ন। তাঁদের সময়, সামাজিক বাস্তবতা ও জীবন-অভিজ্ঞতার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে; কিন্তু তাঁদের অস্তিত্বের গভীরে রয়েছে এক অভিন্ন মানবিক বেদনা ও নিয়তি। এই ভিন্নতার মধ্যকার ঐক্যই দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ।
সেলিম আল দীন বাংলা নাটকের ভাষা, ইতিহাস ও আত্মপরিচয়—এই তিনটি প্রশ্নকে একসূত্রে যুক্ত করেছিলেন। তিনি যখন “মধ্যযুগের বাঙলা নাটক” বইটি লিখছিলেন, তখন আসলে তিনি শুধুমাত্র ইতিহাসই লিখছিলেন না; বরং ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠছিলেন। করছিলেন বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় পুনরুদ্ধারের লড়াই।
তিনি যখন পাঁচালি, কথকতা, কীর্তন, যাত্রা, গীতিকা প্রভৃতি পরিবেশনাকে নাট্যচর্চার আলোচনায় নিয়ে আসলেন, তখন ঔপনিবেশিক দাসত্বের চেতনায় আবদ্ধ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের তথাকথিত ভদ্রজনেরা এটি মেনে নিতে পারেনি। তবে তিনি তাঁর কর্মে অটুট ছিলেন।
সেই সঙ্গে ‘উচ্চ’ ও ‘নিম্ন’, ‘শিষ্ট’ ও ‘লোকজ’, ‘আধুনিক’ ও ‘প্রাচীন’—এই প্রচলিত সাংস্কৃতিক শ্রেণিবিভাগের বিরুদ্ধেও শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন। দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্ব নির্মাণের মাধ্যমে পাশ্চাত্য-অনুগত শিল্পের কৃত্রিম বিভাজনের বিরুদ্ধে নিলেন নন্দনতাত্ত্বিক ও উপনিবেশবাদ-বিরোধী অবস্থান। ঠিক এই দিক থেকেই তিনি নাট্যকার পরিচয়কে ছাপিয়ে হয়ে উঠেছিলেন সাংস্কৃতিক চিন্তক ও উপনিবেশবাদ-বিরোধী সাংস্কৃতিক যোদ্ধা।
উপনিবেশোত্তর আত্মপরিচয়ের লড়াইয়ের জায়গা থেকে সেলিম আল দীনের শিল্পতত্ত্বকে কেবল নাট্যতত্ত্ব হিসেবে দেখলে তাঁর ব্যাপ্তি কমে যায়। এর পেছনে কাজ করেছে উপনিবেশবাদ-বিরোধী চেতনা।
এখানে তাঁর একটি বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ—
ইংরেজ লাট সাহেবদের হাতে উপনিবেশবাদের চাবুক ছিল। তাই সে যেখানে গিয়েছে সেখানেই শেক্সপীয়ার আর বাইবেলকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
এই বক্তব্যের তাৎপর্য কেবল শেক্সপিয়র বা বাইবেলের বিরোধিতা করা নয়। এ বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, ক্ষমতা কীভাবে সংস্কৃতিকে প্রতিষ্ঠা ও প্রান্তিক করার কাজ করে। ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী তার নিজস্ব শিল্পকে ‘মানদণ্ড’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে কীভাবে উপনিবেশবাদের শৃঙ্খলে আবদ্ধ একটি জাতির নিজস্ব শিল্প ও সংস্কৃতিকে ‘লোকজ’, ‘আঞ্চলিক’ কিংবা ‘অপরিণত’ বলে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে—এটা তিনি দেখিয়েছেন।
এর ফলেই এ অঞ্চলের মানুষ দীর্ঘদিন যাবৎ নিজেই নিজের সংস্কৃতিকে তার ঔপনিবেশিক প্রভুর চোখে দেখেছিল। সেলিম আল দীন সেই দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন। নিজের মাটিতে দাঁড়িয়ে নিজের শিল্পকে নতুন চোখে দেখিয়েছেন।
রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের পরও যদি একটি জাতি তার শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির মূল্যায়নে অন্যের মানদণ্ডের ওপর নির্ভরশীল থাকে, তাহলে সে জাতির স্বাধীনতা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কারণ ভূখণ্ডের স্বাধীনতার পাশাপাশি চিন্তাশক্তির স্বাধীনতাও জরুরি।
সেলিম আল দীনের নাট্যচর্চা এই জায়গায় একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে—“আমরা কি আমাদের নাটককে সবসময় পাশ্চাত্যের নাট্যসংজ্ঞা দিয়ে বিচার করব? নাকি আমাদের নিজেদের হাজার বছরের পরিবেশনামূলক ঐতিহ্য থেকেও নাট্যতত্ত্ব নির্মাণ করব?” তাঁর উত্তর ছিল দ্বিতীয়টি।
তাই তাঁর দেশজ ঐতিহ্যে প্রত্যাবর্তন কোনো পশ্চাৎমুখিতা নয়; বরং নিজস্ব শিকড়ের ওপর দাঁড়িয়ে আধুনিকতার পুনর্নির্মাণ। তিনি হাজার বছর আগে ফিরে গিয়ে আধুনিক বাংলা নাটকের জন্য নতুন সম্ভাবনা আবিষ্কার করেছিলেন।
সেলিম আল দীন উপনিবেশবাদের শিকল ভেঙে বাঙালিকে তার নাট্যঐতিহ্য নতুন করে চিনতে শিখিয়েছেন। তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, বাংলা নাটকের ইতিহাস কেবল লেবেদেফ, পাশ্চাত্য নাট্যরীতি কিংবা উনিশ শতকের মঞ্চে সীমাবদ্ধ নয়। বাঙালির রয়েছে এক দীর্ঘ পরিবেশনামূলক ঐতিহ্য।
আর সেই দেশজ নাট্যঐতিহ্যের সঙ্গে শ্রীচৈতন্যদেবের অচিন্ত্য দ্বৈতাদ্বৈতবাদী দর্শন, রবীন্দ্রনাথের বহুমাত্রিক নাট্যভাবনা এবং তাঁর নিজস্ব শিল্পসন্ধান মিলিয়ে তিনি নির্মাণ করেছেন অনন্য এক শিল্পদর্শন। পাশ্চাত্যের অনুকরণ থেকে বেরিয়ে বাঙালির নিজস্ব শিল্প-অভিজ্ঞতার ভিতর থেকে নিজস্ব নাট্যভাষা নির্মাণ করতে শিখিয়েছেন তিনি। সেই কারণেই তাঁর নাট্যভাবনা হয়ে উঠেছে আমাদের উপনিবেশোত্তর আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার লড়াইয়ের এক অবিনাশী অস্ত্র।
অন্যের চোখে নিজেকে দেখার অভ্যাস ভাঙতে না পারলে রাজনৈতিক স্বাধীনতা আসলেও মস্তিষ্কের স্বাধীনতা আসে না। নিজস্ব শিল্পের ইতিহাসকে পুনরাবিষ্কার করতে না পারলে নিজস্ব শিল্পভাষার ভিত্তি নির্মাণ করা যায় না।
তথ্যসূত্র:
১. মধ্যযুগের বাঙলা নাটক — সেলিম আল দীন
২. দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্বের পরিধি — রুবাইয়াত আহমেদ
৩. সেলিম আল দীনের নাটক: আধার ও আধেয় — ড. সাইফুল ইসলাম
৪. বাঙলা নাট্যকোষ — সেলিম আল দীন
নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের উপনিবেশবাদ বিরোধী সাংস্কৃতিক সংগ্রাম
▮ গোলাম রাসুল নাবিদ
▮ গোলাম রাসুল নাবিদ




মন্তব্য