বয়স: বিস-পচাস
অধ্যাপনায় আসার আগে, প্রায় চার বছর অন্য চাকরি করেছি। মূল কারণ অর্থনৈতিক। সাতের দশকে এক স্কুল শিক্ষকের সন্তানের সামনে খুব বেশি বিকল্প ছিল না। বরং নিজেকে সৌভাগ্যবানই মনে করতাম ঐ সময়ে অমন একটি চাকরি পেয়ে গেছি বলে। দ্বিতীয় কারণ, তখনও আমার মাস্টারস শেষ হতে দেরি ছিল। সুতরাং…
আমার অফিসে একজন দারওয়ান ছিল। বেশ বড়সড় চেহারা। ছোট করে ছাঁটা চুল। তবে পেছনের শিখাটা প্রমাণ সাইজের। বেশ বয়স্ক। সম্ভবত বিহার সংলগ্ন উত্তর প্রদেশের মানুষ। অফিসেই থাকতো। নামটা জবরদস্ত- দীপনারায়ন সিং। কিন্তু লোকটি ছিল ভীষণই মিষ্টভাষী। স্বভাবটাও। তবে দারোয়ানের কাজ করলেও দীপনারায়ণকে কখনোই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখিনি। সবসময়ই একটা স্টীলের স্টুলে বসে থাকতো। অফিসে ঢোকার সময়ে সব্বাইকেই একই ভাবে রাম রাম বাবুজি বলে মিষ্টি হাসত। আমার কেমন সন্দেহ হতো যে ওর তাকৎ আর বিশেষ অবশিষ্ট ছিলনা। ভারি কাজগুলো দেখতাম অন্য দুজন করতো। তাই একদিন অফিসের স্যালারি ডিপার্টমেন্টের সিনিওর সুরজিৎ বাবুকে এ কথা সে কথার মাঝে জিজ্ঞেসই করে ফেললাম, দাদা, আমাদের দারোয়ান দীপনারায়াণ সিংজির বয়েস ঠিক কতো? সুরজিতদা আমুদে লোক। চোখের তারা একটু নাচিয়ে বললেন, তুমিই ওকে জিজ্ঞেস করো না। আমি জবাব দিলাম, বাহ রে; আপনি ওর স্যালারি শীট বানাচ্ছেন প্রতি মাসে, আপনিই তো জানবেন। উনি একটু রহস্য করেই বললেন, সে তো জানিই। তবে নিজের কৌতূহল নিজেই মেটাও না কেন!
এরপর বেশ কিছুদিন কেটে গেছে। আমিও ব্যাপারটা ভুলে গেছি; ইচ্ছে করেই। এতো বয়স্ক মানুষ টিকে অমন বেয়াড়া প্রশ্ন করতে তো দ্বিধা হয়ই। তাছাড়া এটা ভয়ঙ্কর ব্যক্তিগত প্রশ্ন তো বটে। উপরন্তু, যখন বুঝতেই পারছি ওর বয়েস নিয়ে একটা দুর্বলতা রয়েছে।
কিন্তু একদিন লাঞ্চ আওয়ারে সুরজিতদা নিজেই জিজ্ঞেস করলেন, কী হে দীপনারায়ণকে জিজ্ঞেস করে কী শুনলে? আমি ভীষণ সঙ্কুচিত হয়ে জবাব দিলাম, না না; এভাবে জিজ্ঞেস করাটা সম্ভব নয়! আমার ভুল হয়েছিল এমন কৌতূহল দেখানোয়। সত্যিই লজ্জা লাগছে দাদা! ও আমি জিজ্ঞেস করতে পারব না।
আরে, এতো ভয় পাচ্ছ কেন? আর ঐ ভাবেই বা নিচ্ছ কেন? একটা রহস্য তো আছেই। জিজ্ঞেস করো একদিন। লোকটা ভাল। ও কিছুই মনে করবে না!
অগত্যা একদিন বিকেলে ছুটির পরে বেরনোর সময় দেখলাম দীপনারায়ণ ঐ একই ভাবে বসে আছে। মুখে যথারীতি স্মিতহাস্য। আমি ভাবলাম ধারে কাছে আর কেউ নেই। সুতরাং আজই জিজ্ঞাসাটা সেরে ফেলি। শুরু করলাম, তো দীপনারায়ণজি , আপ ক্যায়সে হ্যাঁয়? ‘ বঢ়িয়া হুঁ সাব, আপ বাতাইয়ে!’ এরকম একটা দুটো কথার পরে আসল প্রশ্নে এলাম, ‘দীপনারায়ণজি, আপ তো বহোৎ দিন সে ইয়ে অফিস মে হ্যাঁয়! কিৎনা উমর হুয়া আপকো?’
দীপনারায়ণ একটা অদ্ভুত উত্তর দিলো, ‘কিৎনা হোগা সাব, জাদা নহি, বিশ-পঁচাশ’।
আমার তো আক্কেল গুড়ুম। বলে কী? বিশ বা পঞ্চাশ ! ৩০ বছরের ব্যবধান! ওর দিকে তাকিয়ে দেখলাম, একই রকম নিঃস্পৃহ স্মিত মুখ। বাড়ির পথ ধরলাম।
তারপরদিন সুরজিতদাকে ঘটনাটা বলতেই উনিও হেসে বললেন, ঐ তো মজা! বয়সের হিসেব ওর নেই! আমাদেরও না। জিজ্ঞেস করলে এটাই উত্তর। তবে অফিস পত্তনের সময় থেকে আছে। আমাদের সকলেরই একটা মায়া পড়ে গেছে। আর বড় কর্তাদের স্পষ্ট হুকুম আছে ওকে না ঘাঁটানর। যতদিন আছে মাইনে পাবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ওর রিটায়ারমেন্ট?’
সুরজিতের উত্তর, যতো দিন ততো দিন!
আমার আশ্চর্য লাগলেও কোথাও একটু ভালও লাগলো!
চাকরি ছাড়ার কয়েক বছর পর পুরনো অফিসে একবার যেতে হয়েছিল। গেটে দেখলাম অন্য লোক। বছর চল্লিশের এক প্রায়-যুবক। নাম, মালখান সিং।
দীপনারায়ণের কথা জিজ্ঞেস করতেই জানাল, বাবুজি তো গুজর গয়ে!
সেটাই স্বাভাবিক! তবু একটু মনটা কেমন করে উঠলো। মালখান জিজ্ঞেস করলো, সাব, আপ ইধার কাম করতা হ্যাঁয়?
আমি, নহি, করতে থে।
মালখানের মুখেও সেই একই সরল স্মিত হাসি।
জানিনা এখনও আছে কিনা। তবে নিশ্চিত ও না থাকলেও, মালখানের ছেলে এসে গেছে। ঐ নির্লিপ্ত হাসিটুকু নিয়ে!
বয়স ও কেরিয়ার: এক না মেলা অংক
আমাদের তরুণ বয়সে একটা চালু কথা ছিলঃ মেয়েদের গান শেখা আর ছেলেদের কস্ট আকাউন্টেন্সি পড়া এক-ই ব্যাপার! কথাটার ইঙ্গিত টা হোল, মেয়েরা ঠিক ততদিনই সঙ্গীত চর্চা করে যত দিন না বিয়ের ব্যাপারটা পাকছে, আর ছেলেরা, যতদিন না চাকরি পাচ্ছে। মেয়েদের ব্যাপারে কথাটা কিছুটা হলেও প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে। এখন মেয়েরা অনেক এগিয়েছে। মনে হয়না বিয়ের বাজারে গান জানার আর সুবিধা আদৌ আছে। মেয়েরা আর সঙ্গী খোঁজার কাজে গানের উপর বিশেষ নির্ভর করেন না। আগের মতো মেয়ে দেখতে আসার প্রথারও চরিত্র বদলেছে। পাত্রীকে, মা, একটা গান শোনাও দেখি এমন ঘটনা বিরল। বরং মুরুব্বিরা বলেন যাও তোমরা দুজনে একটু আলাপ সেরে নাও। বহু ক্ষেত্রেই আরও একটু এগিয়ে গিয়ে কোনো ক্যাফেতে দুজনে প্রাথমিক সাক্ষাতকারটা সেরে বাবামাকে গ্রীন সিগন্যাল দিলে, তবে এগোনো হয়। এমন কি বিয়ের আগের দিনগুলোয় জুটি চুটিয়ে প্রেম করে; এমনকি কোন কোন উইকেন্ডে আউটিঙ্গেও যায়। এর নামই বোধ হয়, ‘অ্যারেঞ্জড লাভ ম্যারেজ’ পরিভাষাটা এই ভাবেই উঠে এসেছে। আর ছেলেরাও মেয়ের গান গাইবার ক্ষমতাকে ধর্তব্যের মধ্যে আনে বলে মনে হয় না। এ’রকম অবস্থায় মেয়ের থেকে মেয়ের বাপের জাগতিক সাফল্যের বিষয়টা হয়তো বা বেশি গুরুত্ব পায়। তবে আজকাল ছেলেমেয়েরা লিভ-ইন-এ বেশি স্বচ্ছন্দ।
যা হোক আসল কথায় ফেরা যাক।
সেই সময়ে কস্টিং (cost accounting) পড়াটা ছেলেমেয়েদের একটা ভাল কেরীয়ার অপশন ছিল। যদিও পরীক্ষা বৈতরিণী পার হওয়াটা খুব সহজ ছিলনা। এই সংস্থটির হেডকোয়ার্টার কলকাতাতেই ছিল। আর লোকের বিশ্বাস ছিল এটি চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্সির থেকে সহজ। কাজ করতে করতেও পড়া যেত, যেটা অন্য অ্যাকাউনটেন্সি প্রোগ্রামের মতো কোন ফার্মে শিক্ষানবিশি করতে হতো না। আরও একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, এম বি এ নামক সর্বগ্রাসী ডিগ্রি তখনও এ দেশে আসে নি। কস্ট অ্যাকাউন্টিং পড়াটা লো-হ্যাঙ্গিং ফ্রুট বলে মান্যতা পেয়েছিল। যদিও কোয়ালিফাই করাটা মোটেই সহজসাধ্য ছিল না। বহু বহু মানুষকে জানি পাশ করতে না পেরে ভিন্নমুখি হয়েছেন। তবে বেকার থাকার থেকে কস্টিং পড়ছি কথাটা অধিকতর সম্মানের ছিল। যারা সফল হতো তারা জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিতই হতো। এখনও হয়।
কস্টিং পড়া নিয়ে আরও সব বিচিত্র গল্প ছিল। হয়তো কিছুটা অতিরঞ্জিত। তবে আমি কিন্তু বাস্তবে এরকম ঘটনার সাক্ষী থেকেছি। অন্তত দুজন পরিচিত বন্ধুস্থানীয়কে চিনতাম যারা যখন কস্টিং পড়ত, একই সঙ্গে কস্টিং পাঠরত ছাত্রদেরও পড়াত। অর্থাৎ নিজেরা পড়তে পড়তেই আবার প্রাইভেট ট্যুইশন দিয়ে কিছু আয়ও করে নিত। মজার ব্যাপারটা ছিল, অনেক সময়েই দেখা যেত, ছাত্র পাশ করে গেলেও মাস্টারমশাই ক্লিয়ার করতে পারল না। আবার পরীক্ষায় বসতে হতো। আবার এরকম এমন অন্তত একজনকে জানি যে শেষ পর্যন্ত আর সবটা পাশ করে উঠতে পারেনি। কিন্তু প্রাইওভেট ট্যুইশনে খুব-ই নাম করেছিল। পরের জীবনে অবশ্য অন্য পেশায় সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আবার কিছু রোমহর্ষক ঘটনাও ঘটতো। শিক্ষক ও ছাত্রের একই জায়গায় পরীক্ষার সেন্টার পড়ে গিয়ে যাকে বলে যাচ্ছেতাই রকমের ঘটনা ঘটতো।
আমি আমার তৎকালীন অফিসে একজন সহকর্মীকে নিয়মিত পরীক্ষা দিতে দেখতাম। বছরে দুবার পরীক্ষার বন্দোবস্ত ছিল। আমি খানিক আশ্চর্যই হয়েছিলাম কারণ বনমালী বাবুকে দেখলে পঞ্চাশের উপরেই মনে হতো। যে যুগে রিটায়ারমেন্টের গড় বয়স ছিল আটান্ন। ঐ বয়সে আর যাই হোক কেরিয়ার গড়ার ভাবনাটা খুব স্বাভাবিক ছিল না। অবশ্য পরে জানতে পারলাম, বনমালী বাবুর অফিসিয়াল বয়স নাকি প্রায় বার বছর কমানো! একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় ওপার থেকে এসে উনি এই কাণ্ডটা করাতে পেরেছিলেন। তা’বলে বারো বছর! ফলে সরকারিভাবে বুনমালি( উনি নিজেকে ঐ নামেই পরিচয় দিতেন; সুতরাং…) বাবুর অনেকদিন চাকরি আছে! উনিও নিজে তখনও পাশ না করেই, প্রাইভেট কোচিং দিতেন। ছাত্ররা উৎরতও। ব্যাপারটা সে অর্থে খুব গর্হিতও ছিল না তখনকার অর্থনৈতিক সমস্যাসঙ্কুল জীবনের পরিপ্রেক্ষিতে। এ’রকম মানুষেরা কিন্তু একটি সময়ের ফলক। এঁদের অধিকাংশই মূলত বিভিন্ন সময়ে ওপার বাঙলা হ’তে আগত উদ্বাস্তু পরিবারের মানুষ। দেশভাগ সাতচল্লিশে হলেও, ধর্মীয় সংখ্যালঘু মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার দায়ে এ’পার বাংলায় চলে এসে থিতু হবার সংগ্রাম ও প্রক্রিয়া আজও বহমান। এই উদ্বাস্তু মানুষের কাছে মস্তিস্ক ছাড়া তো আর বিশেষ কিছুই ছিল না। যে সময়ের কথা বলছি, তখন পশ্চিমবাংলায় এঁরা ক্রমাগত সামাজিক ভাবে মাথা তুলে দাঁড়াবার মরিয়া চেষ্টা করছে। আমিও তো সেই সময়ের যুবক। আমাদের যেমন কষ্টের সীমা ছিল না; স্বপ্নও ছিল সমান সীমাহীন। এই উদ্বাস্তু মানুষরাই ধীরে ধীরে বুদ্ধির জগত টাতেও নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিল।
একদিন অফিসের এক কোণে লাঞ্চের খানিক পরে দেখলাম বেশ একটা জটলা ও ফিসফাস। তাকিয়ে দেখি বনমালী বাবু বেশ খুশি খুশি মুখ করে দাঁড়িয়ে আছেন। সুচিত সমাদ্দার, একজন সিনিওর কলীগ, খুব হইচই করে সবাইকে ডাকছেন। ‘ আরে ভাই, সকলে এসো। দারুণ খবর! বনমালী বাবু কস্টিং ক্লিয়ার করতে পেরেছেন!’ সত্যিই আনন্দের খবর! কারণ বনমালি বাবুর পাশ না করতে পারাটাই স্বাভাবিক খবর ছিল। অতএব সব্বাই ছুটে গেলাম। অফিসের প্যান্ট্রিতে বিমল কে চায়ের ফরমাশ দেওয়া হয়ে গেছে। সাথে শিঙাড়া। সবাই বনমালীকে অভিনন্দন জানাচ্ছে। বেশ চা-টা খাওয়া হোল। এবার সুরজিত বাবু বেশ গুরুগম্ভীর চালে বলে উঠলেন, ‘তা'হলে বনমালী, এখন থেকে তুমি রিয়েল কস্ট-অ্যাকাউন্টেন্ট! কত্তো বছরের কষ্ট। তা আমরা তোমাকে কষ্টো অ্যাকাউন্টেন্টও বলতে পারি, বলো! Cost আর কষ্টের মানে তো হরেদরে একই দাঁড়ায়। কথাটায় হূল ছিল! তবুও বনমালী বাবু একটু লজ্জা-লজ্জা মুখ করে নীরবে হাসলেন। আমরাও যে যার জায়গায় ফিরে গেলাম। কদিন পরেই একটা অফিসিয়াল সারক্যুলার বেরোল। বনমালী সরকার প্রোমোটেড টু দ্য পোজিশন অফ অ্যান অ্যাসিস্ট্যান্ট ডাইরেক্টর। যাক ভদ্রলোকের বেটার কেরিয়ারের স্বপ্ন-পূরণ হোল তাহলে। আর বয়েস যখন অনেকটাই কমানো, বেশ কিছুদিন ভোগ করতে পারবেন। সবার মতো আমিও ভদ্রলোককে অভিনন্দন জানালাম।
এর কিছুদিন পর আমি অন্য চাকরিতে চলে গেলাম।
বছর দুএক বাদে পুরনো অফিসে একটা কাজে এসেছি। শুনলাম বনমালী বাবু প্রয়াত হয়েছেন। শকড হলাম। তবে বুঝলাম, অফিসিয়াল বয়েস ধর্মরাজ স্বীকার করেন নি!
যাপন-নামা (পর্ব ৫)
▮ মণিপদ্ম দত্ত
▮ মণিপদ্ম দত্ত




মন্তব্য