অবশ্য যদি এমন হয় যে, সমাপতন বা দৈবযোগ বলে দুনিয়ায় কিস্যু নেই; তাহলে আমাদের সেই মুসা—তার ওই বয়সের ভার আর খিদমতগারি স্বভাব সত্ত্বেও—আসলে ছিল একখানা টাইম-বোমার মতো; নিজের নির্দিষ্ট সময়ের অপেক্ষায় সে ধিকধিক করে জ্বলছিল। সেক্ষেত্রে, আমরা আশাবাদী হয়ে, উঠে দাঁড়িয়ে হুল্লোড় করতেই পারি, কারণ যদি সব কিছুই আগে থেকে ছক কষা থাকে, তবে তো আমাদের সবারই জীবনের একটা মানে আছে; আর আমরা ওই ভয়টা থেকে বেঁচে যাই যে আমরা নেহাতই অকারণে, খামখেয়ালি ভাবে পৃথিবীতে এসেছি, যার কোনো কার্যকারণ নেই। অথবা, উল্টোটাও হতে পারে—হয়তো নিরাশাবাদী হয়ে আমরা এখনই সব হাল ছেড়ে দিতে পারি, ভাবতে পারি চিন্তাভাবনা বা সিদ্ধান্তের কোনো দামই নেই, কারণ আমরা যা-ই ভাবি না কেন, তাতে তো কিস্যু যায় আসে না; যা হওয়ার তা হবেই। তাহলে আশাবাদটা রইল কোথায়? ভাগ্যে, নাকি বিশৃঙ্খলায়? মা যখন বাবাকে সুখবরটা দিল (ততক্ষণে অবশ্য পাড়াসুদ্ধু লোক জেনে বসে আছে), তখন বাবা কি আশাবাদী ছিল নাকি নিরাশাবাদী? সে কেবল উত্তর দিল, ‘তোমায় তো আগেই বলেছিলুম; এ তো কেবল সময়ের অপেক্ষা।’ মনে হয়, মায়ের ওই গর্ভধারণটা ছিল নিয়তি; তবে আমার জন্মের পেছনে দৈবযোগ কিংবা অ্যাক্সিডেন্টের হাত বেশ ভালোমতোই ছিল।
‘এ তো কেবল সময়ের অপেক্ষা ছিল,’ বাবা বেশ খুশির মেজাজেই কথাটা বলল; কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা বলে, সময় জিনিসটা ভারী খামখেয়ালি, এর ওপর মোটেও ভরসা করা চলে না। এমনকী একে ভাগও করে ফেলা যায়: পাকিস্তানের ঘড়িগুলো ভারতের ঘড়িগুলোর চেয়ে পুরো আধঘণ্টা এগিয়ে চলবে... মিস্টার কেমাল, দেশভাগের এই ব্যাপারটার সঙ্গে যাঁর কোনো লেনদেনই ছিল না, তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘এই দেখো কাণ্ড, পরিকল্পনাটা যে আগাগোড়া বোকামি তার প্রমাণ এইখানেই! ওই লিগ-ওয়ালারা মতলব করেছে পুরো ত্রিশটা মিনিট বগলদাবা করে পালাবে!’ মিস্টার কেমাল চেঁচিয়ে উঠতেন, ‘অখণ্ড সময়! ভাগ-বাটোয়ারা ছাড়া সময়! ওটাই হলো গিয়ে আসল কথা!’ আর এস. পি. বাট বলতেন, ‘ওরা যদি চট করে সময়টাকেই অমন বদলে দিতে পারে, তবে আর বাস্তব বলে কিছু রইল কি? আমিই তোমায় জিজ্ঞেস করছি বাপু? সত্যিটা আসলে কী?’
মনে হচ্ছে আজ বড়ো বড়ো সব প্রশ্নের দিন। দেশভাগের দাঙ্গায় যাঁর গলা কাটা পড়েছিল আর সময়ের ওপর থেকে যাঁর সব মায়া উঠে গিয়েছিল, সেই এস. পি. বাটকে এই ভরসাহীন বছরগুলোর ওপার থেকে আমি জবাব দিই: ‘যা বাস্তব আর যা সত্যি—দুটো যে সবসময় একই হবে, তার কোনো মানে নেই।’
আমার কাছে সত্যি জিনিসটা সেই এক্কেবারে ছোটোবেলা থেকেই মেরি পেরেইরার শোনানো গল্পগুলোর ভেতর কোথাও যেন লুকিয়ে থাকত: মেরি, আমার আয়া—যে ছিল আমার মায়ের চেয়েও কিছু বেশি, আবার মায়ের চেয়ে একটু কমও; মেরি, যে আমাদের সবার ব্যাপারে সবকিছু জানত। আমার ঘরের দেয়ালের ছবিটায় ছোট্ট র্যালে যখন সেই জেলের গল্প শুনত, তখন জেলের আঙুলটা দিগন্তের ঠিক ওপারে যে-জায়গাটার দিকে ইশারা করে থাকত, সত্যিটা যেন ঠিক সেখানেই কোথাও একটা লুকিয়ে ছিল। আর এখন, আমার অ্যাঙ্গেলপয়েজ বাতির ওই গোল আলোর ঘেরাটোপে বসে এসব লেখার সময় আমি সেই পুরোনো দিনের মাপকাঠিতেই সত্যিটাকে মেপে দেখি: আমি নিজেকেই জিজ্ঞেস করি, মেরি কি ঠিক এভাবেই গল্পটা শোনাত? ওই জেলেটা কি ঠিক এভাবেই কথাটা বলত?... আর সেই হিসেবে বিচার করলে এটা একেবারে নির্জলা সত্যি যে, ১৯৪৭ সালের জানুয়ারি মাসের এক দিনে, আমার পৃথিবীতে এসে পড়ার পাক্কা ছ-মাস আগেই আমার মা আমার ব্যাপারে সবকিছু জেনে গিয়েছিল, আর ওদিকে আমার বাবা গিয়ে পড়েছিল খোদ এক রাক্ষসরাজার খপ্পরে।
লিফাফা দাসের ওই প্রস্তাবে রাজি হওয়ার পর আমিনা সিনাই একটা মোক্ষম সুযোগের অপেক্ষায় ছিল; কিন্তু ইন্ডিয়াবাইক কারখানাটা পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার পর পাক্কা দু-দিন আহমেদ সিনাই ঘরেই সেঁধিয়ে রইল, কনট প্লেসে নিজের অফিসে একবারও পা মাড়াল না। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল, কোনো এক অপ্রীতিকর ঝামেলার মুখোমুখি হওয়ার জন্য সে যেন ভেতর-ভেতর নিজেকে বেশ শক্ত করে নিচ্ছিল।
পাক্কা দু-দিন ধরে ওই ছাইরঙা টাকার থলিটা তাদের বিছানার নিচে ঠিক তার দিকটায় একটা মহা-গোপন জিনিসের মতো পড়ে রইল। ওই ছাইরঙা থলিটার হঠাৎ হাজির হওয়ার কারণ নিয়ে মুখ খোলার কোনো লক্ষণই আমার বাবার মধ্যে দেখা গেল না; তাই আমিনা মনে মনে বলল, ‘ও ওরকমই থাক; কার কী এসে যায়?’ কারণ তার নিজেরও তো একটা গোপন ব্যাপার আছে, যা চাঁদনি চকের ঠিক মাথায় লালকেল্লার গেটের কাছে তার জন্য চুপচাপ অপেক্ষা করে বসে আছে। মনে মনে একটা গোপন অভিমানে মুখ ফুলিয়ে, আমার মা লিফাফা দাসের ব্যাপারটা নিজের পেটেই চেপে রাখল। সে নিজেকেই যুক্তি দিল, ‘যতক্ষণ না ও নিজে থেকে বলছে যে ও ঠিক কী ফন্দি আঁটছে, আমিই-বা কেন ওকে আমার কথা বলতে যাব?’
তারপর জানুয়ারির সেই কনকনে ঠান্ডা সন্ধেটা ঘনিয়ে এল, যে-সন্ধেয় আহমেদ সিনাই বলে উঠল, ‘আজ রাতে আমাকে একটু বেরোতে হবে’; আর আমিনা তাকে বারবার করে বোঝাল, ‘বড্ড ঠান্ডা—তোমার যে আবার শরীর খারাপ করবে…’, কিন্তু সেসব কথা কানে না-তুলে সে তার সেই বিজনেস স্যুট আর কোটটা গায়ে চাপিয়ে নিল। ওই কোটের ভেতর সেই রহস্যময় ছাইরঙা টাকার থলিটা এমন বেখাপ্পাভাবে দলা পাকিয়ে ফুলে রইল যে, সেটা সহজে যে কারোর চোখে পড়বে, দেখলে কেমন হাসিও পাবে। অগত্যা আমিনা হাল ছেড়ে দিয়ে বলল, ‘বেশ, ভালো করে গরম পোশাকে মুড়ি দিয়ে যাও তবে।’ আর সে যেখানেই যাক না কেন তাকে বিদায় জানিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার ফিরতে কি দেরি হবে?’ যার জবাবে আহমেদ সিনাই বলল, ‘হ্যাঁ, তা তো বটেই।’ সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঠিক পাঁচ মিনিট বাদেই, আমিনা সিনাই লালকেল্লার দিকে রওনা দিল—পা বাড়াল তার নিজস্ব রোমাঞ্চকর অভিযানের ঠিক কেন্দ্রবিন্দুতে।
একটি সফরের শুরুটা হয়েছিল এক কেল্লা থেকে; আর অন্যটার শেষ হওয়ার কথা ছিল একটি কেল্লাতেই, যদিও শেষমেশ তা হয়নি। একটা সফরে ভবিষ্যতের কথা জানা গেল; অন্যটা পাকাপাকিভাবে ঠিক করে দিল সেই ভবিষ্যতের ভৌগোলিক ঠিকানা। এক সফরের পথে বাঁদরের দল ভারী মজাদার নাচ দেখিয়েছিল; আর অন্য জায়গাতেও একটা বাঁদর নাচছিল ঠিকই, কিন্তু তার ফল হয়েছিল রীতিমতো ভয়ংকর। এই দুটো অভিযানেই শকুনদের একটা বড়ো ভূমিকা ছিল। আর দুটো রাস্তার শেষ মাথাতেই ওঁত পেতে বসে ছিল বহু-মাথাওয়ালা সব রাক্ষস।
তা হলে এক এক করে বলা যাক... এই যে আমিনা সিনাই, সে এখন দাঁড়িয়ে আছে লালকেল্লার সেই পেল্লায় উঁচু দেওয়ালগুলোর নিচে…একসময় যেখানে মুঘলরা রাজত্ব করত, আর যেখানকার চূড়ো থেকেই একদিন এই নতুন দেশের জন্মঘোষণা করা হবে। কোনো রানি বা রাজদূত না-হলেও, আমার মাকে কিন্তু ভারী উষ্ণ অভ্যর্থনাই জানানো হলো (যদিও আবহাওয়ার যা ছিরি, তাতে উষ্ণতার লেশমাত্র ছিল না)। দিনের শেষ আলোয় লিফাফা দাস উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে উঠল, ‘বেগম সাহিবা! আঃ, আপনি যে এসেছেন, কী ভালোই না হলো!’ সাদা শাড়ি পরা শ্যামবর্ণা আমিনা ইশারায় তাকে ট্যাক্সির দিকে ডাকল; সে পিছনের দরজাটা খুলতে হাত বাড়াল; কিন্তু ট্যাক্সিচালক খেঁকিয়ে উঠল—‘কী মনে করো হে নিজেকে? লাটসাহেব নাকি? সুড়সুড় করে সামনের সিটে ওঠো দিকি, মেমসাবকে পেছনে বসতে দাও!’ অগত্যা পেছনের সিটে আমিনার সঙ্গী হলো চাকা-লাগানো সেই কালো রঙের বায়োস্কোপ বাক্সটা, আর ওদিকে লিফাফা দাস আমতা আমতা করে ক্ষমা চাইতে লাগল, ‘মাফ করবেন, বেগম সাহেবা। মতলব সাচ্চা থাকলে অপরাধ মাফ।’
কিন্তু এদিকে, নিজের পালার জন্য অপেক্ষা করতে নারাজ আরেকটা ট্যাক্সি এসে থামল অন্য আরেকটা কেল্লার বাইরে, আর মালপত্রের মতো নামিয়ে দিল বিজনেস স্যুট পরা তিনজন মানুষকে। তাদের প্রত্যেকেরই কোটের নিচে একটা করে বেশ ফোলা মতো ছাইরঙা থলি... এদের মধ্যে একজন জীবনের মতো লম্বা আর মিথ্যের মতো লিকলিকে, দ্বিতীয়জনকে দেখলে মনে হয় তার যেন মেরুদণ্ড বলে কিছুই নেই, আর তৃতীয়জন—যার নিচের ঠোঁটটা একটু সামনের দিকে ঝোলানো, পেটটা বেশ থলথলে, মাথার চুল পাতলা আর তেলতেলে হয়ে কানের ওপর দিয়ে এঁকেবেঁকে নেমেছে, তার দুই ভুরুর মাঝখানে চিন্তার সেই চেনা ভাঁজ—যা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এক তিক্ত, বদরাগী মানুষের মুখের স্থায়ী ক্ষতের মতো আরও গভীর হয়ে উঠবে। কনকনে ঠান্ডার মধ্যেও ট্যাক্সি-চালক ভারী ফুরফুরে মেজাজে আছে। সে হাঁক পাড়ল, ‘পুরানা কিল্লা! মেহেরবানি করে সবাই নেমে পড়ুন! পুরোনো কেল্লা, এই যে আমরা এসে গেছি!’... দিল্লির বুকে অনেক, অনেক শহর গড়ে উঠেছে, তারা মিশেও গেছে, কিন্তু এই পুরানা কিল্লা, এই কালচে হয়ে আসা ধ্বংসস্তূপটা হলো দিল্লির এমনই এক প্রাচীন রূপ যার পাশে আমাদের এই বর্ত্মান কালের পুরাতন দিল্লি শহরটা নেহাতই একটা কোলের শিশু। এক অসম্ভব প্রাচীন যুগের এই ধ্বংসস্তূপেই কেমাল, বাট আর আহমেদ সিনাইকে ডেকে আনা হয়েছে একটা বেনামি টেলিফোন কলের মাধ্যমে। ফোনে হুকুম দেওয়া হয়েছিল, ‘আজ রাতে। পুরানা কিল্লায়। ঠিক সূর্যাস্তের পর। তবে পুলিশ যেন না থাকে... নইলে কিন্তু গোডাউন ফান্টুশ!’ ছাইরঙা থলিগুলো শক্ত করে আঁকড়ে ধরে, তারা ওই প্রাচীন, ক্ষয়ে-যাওয়া দুনিয়াটার ভেতর পা বাড়াল।
নিজের হাতব্যাগটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে, আমার মা একটা বায়োস্কোপের বাক্সের পাশে বসে আছে, আর লিফাফা দাস সামনের সিটে সেই হতভম্ব আর খিটখিটে ট্যাক্সিচালকের পাশে বসে তাকে জেনারেল পোস্ট অফিসের উলটো দিকের রাস্তাগুলোর দিকে গাড়ি ঘোরাতে বলছে; এবং যখন সে ওই রাস্তাগুলোতে ঢুকল, যেখানে—খরা যেমন মাটি ফাটিয়ে দেয় তেমনি দারিদ্র্য রাস্তার পিচটাকে কুরে কুরে খাচ্ছে, যেখানে—মানুষজন তাদের অদৃশ্য জীবন কাটাচ্ছে (কারণ তারা লিফাফা দাসের মতোই অদৃশ্য থাকার অভিশাপ বয়ে বেড়াচ্ছে, আর তাদের সবার মুখে তো আর ওই সুন্দর হাসিটা নেই), তখন এক নতুন অনুভূতি তাকে গ্রাস করতে শুরু করল। প্রতি মিনিটে সরু হতে থাকা আর প্রতি ইঞ্চিতে ভিড় বাড়তে থাকা ওই গলিগুলোর চাপে সে তার ‘শহুরে চোখ’ হারিয়ে ফেলেছে। শহুরে চোখ থাকলে ওই অদৃশ্য মানুষগুলোকে আর চোখে পড়ে না; একশিরা হওয়া লোকগুলো আর ঠেলাগাড়িতে বসা ভিখারিরা তখন আর মনের ওপর কোনো আঁচড় কাটতে পারে না, আর রাস্তার ধারের ওই কংক্রিটের ড্রেনপাইপগুলোকে তখন আর শোওয়ার ঘর বলে মনে হয় না। আমার মা তার শহুরে চোখ হারিয়ে ফেলেছিল আর চারপাশের এই নতুন দৃশ্য দেখে তার মুখটা লজ্জায় লাল হয়ে উঠল, সেই নতুনত্ব যেন শিলাবৃষ্টির মতো তার গালে এসে বিঁধতে লাগল। দ্যাখো কাণ্ড, হায় ভগবান, ওই সুন্দর বাচ্চাগুলোর দাঁত একেবারে কুচকুচে কালো! ভাবা যায়... মেয়ে-বাচ্চারা তাদের বুক অনাবৃত করে রেখেছে! সত্যি, কী সাংঘাতিক! কী ভয়াবহ কাণ্ড! আল্লাহ তৌবা, রক্ষে করো মাবুদ! মেথরানিদের দিকে তাকানো যায় না—মেরুদণ্ড ভেঙে নুয়ে পড়েছে, হাতে ঝাঁটা, কপালে কোনো জাতে ওঠার তিলক নেই; সব অস্পৃশ্য, হায় দয়াময় আল্লাহ!...আর চারদিকে শুধুই পঙ্গু মানুষ, ভিক্ষে করে সারা জীবনের আয় নিশ্চিত করতে জন্মদাতা বাবা-মায়েরাই যাদের হাত-পা কেটে বাদ দিয়েছে... হ্যাঁ, বাক্সগাড়িতে থাকা ভিখিরিরা, বাচ্চাদের মতো ছোটো পা-ওয়ালা বয়স্ক লোকেরা, চাকায়-বসানো কাঠের বাক্সে বসে আছে, যেগুলো বাতিল রোলার-স্কেট আর পুরোনো আমের পেটি দিয়ে বানানো; আমার মা চেঁচিয়ে উঠল, ‘লিফাফা দাস, ফিরে চলো!’... কিন্তু সে তার সেই সুন্দর হাসিটা হেসে বলল, ‘এখান থেকে আমাদের হেঁটেই যেতে হবে।’ আর ফিরে যাওয়ার কোনো উপায় নেই দেখে সে ট্যাক্সিটাকে দাঁড়াতে বলল, আর ওই বদরাগী ড্রাইভারটা বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, তা তো বটেই, আপনার মতো এক মহান মহিলার জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আর কী-ই বা করার আছে, আর আপনি যখন ফিরে আসবেন তখন আমাকে পুরো রাস্তাটা রিভার্সে চালিয়ে মেইন-রোড অবধি নিয়ে যেতে হবে, কারণ এখানে তো গাড়ি ঘোরানোর কোনো জায়গাই নেই!’... বাচ্চারা তার শাড়ির আঁচল ধরে টানছে, আর চারপাশ থেকে অসংখ্য চোখ আমার মায়ের দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে। মায়ের মনে হলো, সে যেন একটা ভয়ংকর রাক্ষসের ঘেরাটোপে আটকে পড়েছে, এমন একটা জীব যার কেবল মাথাই মাথা, অজস্র মাথা; কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজেকে শুধরে নিল, না, মোটেও কোনো রাক্ষস নয়, এরা তো সব গরিব, নিঃস্ব মানুষ—তা হলে এরা কী? এক ধরনের শক্তি, এমন একটা জোর যা নিজের ক্ষমতাটা নিজেই জানে না, যাকে কখনো ব্যবহার না-করার ফলে ভেতরে ভেতরে পচে গিয়ে একেবারে নপুংসক হয়ে পড়েছে... না, সবকিছু সত্ত্বেও এরা মোটেও পচে-যাওয়া মানুষ নয়। ‘আমার ভয় করছে,’ মা যখন মনে মনে ভাবছেন, ঠিক তখনই একটা হাত তাঁর বাহু স্পর্শ করল। ঘুরে তাকাতেই তিনি যার মুখের দিকে চোখ রাখলেন—এ তো অসম্ভব! এক শ্বেতাঙ্গ! গায়ে শতছিন্ন পোশাক, হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে অদ্ভুত এক বিদেশি সুরের মতো গলায় বলে উঠল, কুছ দিজিয়ে, বেগম সাহেবা…’। ভাঙা রেকর্ডের মতো সে একই কথা আউড়ে চলল। মা ভীষণ অস্বস্তিতে পড়লেন—একে তো শ্বেতাঙ্গ, তার ওপর এমন লম্বা চোখের পাপড়ি, অভিজাত বাঁকানো নাক... শ্বেতাঙ্গরা কি কখনো ভিক্ষে করে? ‘... একেবারে কলকাতা থেকে, পায়ে হেঁটে এসেছি,’ সে বলছিল, ‘আর গায়ে ছাই মেখেছি, দেখতেই পাচ্ছেন বেগম সাহিবা, ওই গণহত্যার সময় ওখানে ছিলাম বলে লজ্জায় আমার এই অবস্থা—গত অগস্ট মাসের কথা আপনার মনে আছে তো, বেগম সাহিবা, চার দিনের ওই আর্তনাদের মধ্যে হাজার হাজার মানুষকে ছুরি মারা হয়েছিল…’ লিফাফা দাস অসহায়ভাবে পাশে দাঁড়িয়ে আছে, একজন শ্বেতাঙ্গ মানুষের সঙ্গে, সে ভিখিরি হলেও, কেমন ব্যবহার করতে হয় তা সে ভেবেই পাচ্ছে না, আর ‘... আপনি কি ওই ইউরোপিয়ানটার কথা শুনেছিলেন?’ ভিখিরিটা জিজ্ঞেস করল, ‘... হ্যাঁ, খুনিদের দলেই ছিল সে, বেগম সাহিবা, নিজের জামায় রক্ত মেখে রাতে শহরের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল, নিজের স্বজাতির আসন্ন পতন আর নিষ্ফলতায় পাগল হয়ে যাওয়া এক শ্বেতাঙ্গ মানুষ; আপনি কি শুনেছিলেন?’...আর ঠিক তখনই সেই অদ্ভুত সুরের গলাটা একটু থামল, তারপর বলে উঠল: ‘উনি আমার স্বামী ছিলেন।’ ঠিক সেই মুহূর্তে আমার মা ওই ছেঁড়াখোঁড়া ন্যাকড়ার নিচে চাপা-পড়া স্তনদুটো দেখতে পেল… মায়ের হাত ধরে টানতে টানতে সে বলল, ‘আমার এই লজ্জার জন্য কিছু দিন।’ লিফাফা দাস অন্য হাতটা ধরে টেনে ফিসফিস করে বলে উঠল, ‘হিজড়ে, মেয়ে-সাজা লোক, চলে আসুন, বেগম সাহিবা’; আর উলটো দিক থেকে টানাটানির চোটে আমিনা থমকে দাঁড়িয়ে বলতে চাইল, দাঁড়াও মেমসাহেব, আমার কাজটা শুধু মিটিয়ে নিতে দাও, আমি তোমাকে বাড়ি নিয়ে যাব, খেতে দেব, পরতে দেব, তোমার নিজের দুনিয়ায় তোমাকে ফিরিয়ে দেব; কিন্তু ঠিক তখনই ওই মেমসাহেব কাঁধ ঝাঁকিয়ে ওই সরু গলিটা ধরে খালি হাতেই হেঁটে চলে গেল, দূরে যেতে যেতে সে ক্রমশ ছোট হতে হতে একটা বিন্দুতে পরিণত হলো এবং একসময়—ব্যাস!—গলির সেই মলিন দূরত্বের মধ্যে মিলিয়ে গেল। লিফাফা দাস মুখে এক অদ্ভুত ভাব ফুটিয়ে বলল, ‘ওরা সব ফান্টুস! সব শেষ হয়ে এল বলে! ওরা সব বিদেয় হলেই আমরা একে অপরকে খুন করার জন্য আজাদ হয়ে যাব।’ নিজের স্ফীত তলপেটে আলতো করে একটা হাত রেখে, গালভরা আগুনের আভা নিয়ে আমার মা লিফাফা দাসের পেছন পেছন এক অন্ধকার দরজার ভেতরে ঢুকে পড়লেন।
... ওদিকে পুরোনো কেল্লায়, রাবণের জন্য অপেক্ষা করছে আহমেদ সিনাই। সূর্যাস্তের আলোয় আমার বাবা: কেল্লার ওই ভাঙাচোরা দেওয়ালের মাঝে—একসময় যা একটা আস্ত ঘর ছিল, তারই এক অন্ধকার দরজায় সে দাঁড়িয়ে আছে, নিচের মোটা ঠোঁটটা একটু সামনের দিকে ঝুলে আছে, হাতদুটো পিঠের পেছনে জড়ো করা, আর মাথাভর্তি কেবল টাকার চিন্তা। সে কোনোদিনই খুব একটা সুখী মানুষ ছিল না। তার গা থেকে ভবিষ্যতের ব্যর্থতার একটা হালকা গন্ধ বেরোত; চাকরবাকরদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করত; হয়তো সে মনে মনে চাইত যে, নিজের মৃত বাবার পথ ধরে রেক্সিনের ব্যবসায় না-নেমে, তার যদি নিজের আসল স্বপ্নটার পেছনে ছোটার মতো জোর থাকত—কোরানকে একেবারে নিখুঁত কালানুক্রমিক হিসেবে নতুন করে সাজানোর স্বপ্ন। (সে একবার আমাকে বলেছিল: ‘মহম্মদ যখন ভবিষ্যদ্বাণী করতেন, তখন লোকেরা তাঁর কথাগুলো তালপাতায় লিখে রাখত, আর সেগুলো যত্রতত্র একটা বাক্সে ফেলে রাখা হতো। তাঁর মৃত্যুর পর, আবুবকর আর অন্যান্যরা সেই সঠিক ক্রমটা মনে করার চেষ্টা করেছিল; কিন্তু তাদের স্মৃতিশক্তি খুব একটা ভালো ছিল না।’) জীবনের আরও একটা ভুল মোড়: পবিত্র ধর্মগ্রন্থ নতুন করে লেখার বদলে আমার বাবা এখন ঘাপটি মেরে বসে আছে এক ধ্বংসস্তূপে, ওঁত পেতে আছেন রাক্ষসদের জন্য। কাজেই সে যে সুখী ছিল না, তাতে আর অবাক হওয়ার কী আছে; আর আমি তো তার কোনো কাজেই আসতাম না। জন্মানোর সময় আমি তার পায়ের বুড়ো আঙুলটা ভেঙে দিয়েছিলাম।... আমার সেই অসুখী বাবা, আমি আবারও বলছি, দারুণ মেজাজ খারাপ করে কেবল নগদ টাকার কথাই ভেবে চলেছে। আর তার স্ত্রীর কথা ভাবছে—যে কিনা তার কাছ থেকে ফুঁসলিয়ে টাকা আদায় করে, কখনও রাতের বেলা তার পকেট মারে। আর তার প্রাক্তন স্ত্রীর কথা (যে শেষমেশ একটা দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিল, একটা উটের গাড়ির চালকের সঙ্গে ঝগড়া করার সময় উটটা তার ঘাড়ে কামড়ে দিয়েছিল), যে কিনা বিবাহবিচ্ছেদের সময় মোটা টাকা পাওয়া সত্ত্বেও, তাকে ভিক্ষে চেয়ে অন্তহীন চিঠি লিখেই চলত। আর তার দূরসম্পর্কের বোন জোহরার কথা, তার কাছ থেকে যৌতুকের টাকা চাই যার, যাতে সে তার ছেলেমেয়েদের বড়ো করে বাবার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বিয়ে দিতে পারে, আর সেই ছুতোয় বাবার আরও বেশি টাকার ওপর নিজের থাবা বসাতে পারে। আর তার ওপর আছে মেজর জুলফিকারের টাকার প্রতিশ্রুতি (এই সময়টায়, মেজর জুলফি আর আমার বাবার বেশ গলায় গলায় ভাব ছিল)। মেজর তাকে চিঠিতে লিখছিল, ‘পাকিস্তান যখন তৈরি হবে, যা হওয়াটা একেবারে নিশ্চিত, তখন তোমাকে পাকিস্তানের পক্ষেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমাদের মতো মানুষদের কাছে সেটা যে একটা সোনার খনি হতে চলেছে, তা একেবারে ধরাবাঁধা। এম. এ. জিন্নাহ সাহেবের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই চলো…’ কিন্তু আহমেদ সিনাই মহম্মদ আলি জিন্নাকে বিশ্বাস করত না, আর জুলফির ওই প্রস্তাবে সে কোনোদিন রাজিও হয়নি; তাই জিন্না যখন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হলেন, তখন ভেবে দেখার মতো বাবার ঝুলিতে ওই আরও একটা ভুল সিদ্ধান্ত জমা হয়েছিল। আর, সবশেষে ছিল বম্বেতে থাকা বাবার পুরোনো বন্ধু, স্ত্রীরোগ-বিশেষজ্ঞ ডাক্তার নার্লিকারের চিঠি। ‘ইংরেজরা দলে দলে পাততাড়ি গোটাচ্ছে, সিনাই ভাই। জায়গাজমির দাম এখন একেবারে জলের দরে নেমেছে! সব বেচে দিয়ে চলে এসো, বাকি জীবনটা রাজার হালে কাটবে!’ নগদ টাকায় এমন টইটুম্বুর একটা মাথায় কোরানের আয়াতের কোনো জায়গাই ছিল না... আর, এরই মধ্যে, সে এখন এখানে এসে দাঁড়িয়েছে, এস. পি. বাটের পাশে যে কিনা পাকিস্তানে যাওয়ার ট্রেনে মারা পড়বে, আর মুস্তাফা কেমালের পাশে যাকে ফ্ল্যাগস্টাফ রোডের পেল্লায় বাড়িতে গুণ্ডারা খুন করবে আর তার নিজের রক্ত দিয়েই বুকের ওপর লিখে রেখে যাবে ‘মাদারচোদ মজুতদার’... এই দুজন হতভাগ্য মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে, আহমেদ সিনাই একটা ধ্বংসস্তূপের গোপন ছায়ায় অপেক্ষা করছে, নিজের টাকার জন্য আসা এক ব্ল্যাকমেইলারের ওপর নজরদারি করবে বলে। ফোন কলের গলাটা বলেছিল ‘দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ। বুরুজ। ভেতরে পাথরের সিঁড়ি আছে। ওপরে উঠবে। একেবারে সবচেয়ে ওপরের চাতালটায়। টাকাটা ওখানে রেখে দেবে। চলে যাবে। বুঝেছ?’ হুকুম অমান্য করে, তারা ওই ভাঙাচোরা ঘরের ভেতর ঘাপটি মেরে লুকিয়ে আছে; তাদের ওপরে কোথাও একটা, ওই বুরুজ-চূড়ার একেবারে ওপরের চাতালে, ঘনিয়ে-আসা অন্ধকারের ভেতর তিনটে ছাইরঙা টাকার থলি চুপচাপ অপেক্ষা করছে।
পূর্ববর্তী পর্ব পড়ুন এখানে: [মধ্যরাতের সন্তানেরা]
মধ্যরাতের সন্তানেরা
সালমান রুশদি
▋অনুবাদ: দীপ মন্ডল
সালমান রুশদি
▋অনুবাদ: দীপ মন্ডল




মন্তব্য