সে সেখান থেকে হাঁটা দেবার কিছুক্ষণেই কচরমচর চেবানোর শব্দটা আবার শুরু হল।
কদিন ধরেই শুধু ঐ একটা মুখ, তার চোখে ভাসছে, বিচলিত করছে—
দুটো চোখে ভয়, বিস্ময় - যেন চোরে ধরা পড়েছে, সাথে একটা কেমন হিংস্রতা, মুখে লেগে থাকা রক্ত, কচি পা দুটো বেরিয়ে দাঁতের ফাঁক থেকে।
একে তো একটা হাবড়াজাবড়া উদ্ভট গল্প, না তো আছে কোনো মাথা না তো মুণ্ডু, তার ওপরে গল্পটা এখান থেকে তুললে পরে বুঝতে বেশ বেগ পেতে হতে পারে। অতএব-
আরও কদিন আগে ফিরে যেতে হবে।
রাতের বেলা, তাদের পাড়াটা রাত একটু পড়তে শুরু করলেই কেমন যেন চুপচাপ নিরিবিলি হয়ে যায়, অনেকক্ষণ নাকি বিদ্যুৎ ছিল না তার মধ্যে - সে বাড়ি ফিরে ঘরে ঢোকার পর আবার তা এল। বাইরে থেকে ঝিঁঝিঁর ডাক আর পেঁচা আর বাদুড়ের ডাক ছাড়া আর কিছু তেমন কানে আসছে না, মাঝে মধ্যে পাড়ার নেড়িগুলো ডেকে উঠছে – একটাকে পাড়ার লোকে অতিষ্ট হয়ে বিষ দিয়ে মেরে ফেলল, তাও এদের বাড়বাড়ন্ত বাড়ে বই কমে না - পোকামাকড়ের মত বংশ বাড়িয়েই চলেছে। একটা মলিন ঘর, কিছু জায়গায় হাওয়ায় ঝুলগুলো দুলছে, হালকা করে পাখাটা ঘুরছে মাথার উপর, একটা চামচিকে অনেকক্ষণ ধরে তার বিছনার মাথার দিকের কাঠের বন্ধ জানলার উপর খামচাচ্ছে বাইরে থেকে, ঝড়বৃষ্টির সময় ঘুলঘুলি দিয়ে ভেতরে আসা জলের ছাটের দেয়াল বেয়ে পড়া জলের কালচে দাগে সেই ঘরের প্রায় সব দেওয়ালগুলো ভর্তি; সে রাত করে বাড়িতে ফিরে হাত মুখ ধুয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে বিছনায় শুয়ে আছে পিঠটা বালিশে হেলান দিয়ে - পরনের ছোট প্যান্টখানি টেনে নামানো পায়ের বেশ নীচ অবধি, পা গুলো বিছনায় ছড়ানো অলসভাবে - মাথায় বিন্দু বিন্দু ঘাম - হাঁপিয়ে যাচ্ছে বেচারা, মিথুনের চেষ্টা করে যাচ্ছে - ব্যর্থ সব চেষ্টা, তাও ভালো নিরন্তর চেষ্টা করে যাওয়া - কিন্তু নিজেকে উত্তেজিত করতেই পারছে না কিছুতে, শিশ্ন একটু শক্ত হয়ে উঠছে বটে কিন্তু বেশিক্ষণ সেটা দাঁড়াচ্ছে না, শুধু বসে আছে হাতে নিজেরটা ধরে - ঈষৎ শক্ত মাংসের দলাটার গায়ের সবজেটে শিরাগুলোকে নিরীক্ষণ করে দেখছে বসে বসে - সময় কাটাতে ওগুলো মাঝে মাঝে গুনেও দেখছে - মাঝপথে আবার অন্যমনস্ক হয়ে গুনতে গিয়ে ভুল করে বসে ফের গোনার চেষ্টা করছে, একটু থেমে আবার করে মিথুনের চেষ্টায় নিজের প্রেমিকার মুখ আর শরীর কল্পনা করে নিজেকে উত্তেজিত করার চেষ্টা করছে, কিন্তু কিছুতেই পারছে না, ফলে আবার থেমে যাচ্ছে - হাঁপিয়ে যাচ্ছে। গায়ে নানা জায়গায় ব্যাথা তার মধ্যে, তাকে গোপনে নিষিদ্ধ কাজ করতে দেখে ফেলে মা এমন বাজেভাবে মেরেছে যে একটু নড়লেও ব্যাথায় টনটনিয়ে উঠছে ঘা গুলো - মা খুব পেটায় এখনও। একটু আগেই তার শক্ত মাংস নরম আর গরম, ভেজা আরেক মাংসের ভেতর ঢুকিয়ে এসেছে সে, হয়ত তাই আর এখন কিছুতেই সেটাকে দাঁড় করাতে পারছে না সে, তেজ কমে এসেছে, হয়ত একটু সময় দিলে পরেই আবার সেটা দাঁড়াবে ঠিক কখনো - এটাই ভাবল সে মনে মনে, কিন্তু এরম তো হওয়ার কথা নয়, আগে তো কখনো এরম হয়নি - বিশেষ করে যখনই সে তার প্রেমিকার শরীরের দিকে মন দেওয়ার চেষ্টা করছে, যতই শরীরের সেই ছবি মনে করার চেষ্টা করছে - ঠিক উত্তেজনার চরম মুহূর্তে পৌছনোর সময়ে - ঠিক তখনই তার সামনে সেই বিদঘুটে ছবিটা ভেসে উঠে তার উত্তেজনায় বাধা দিচ্ছে, শুধু সেই একই মুখ - তার সামনে বারবার ভেসে উঠে তার মনঃসংযোগ নষ্ট করে দিচ্ছে বারংবার - বারংবার - বারংবার! বিশেষ করে তার দেখা সেই মুখটার সঙ্গেও তার মায়ের রাগত ক্রুদ্ধ চেহারার এক অদ্ভুত মিল খুঁজে পাচ্ছে সে - কিছুক্ষণ আগে তার দেখা সেই দুটো চোখ - দুটোতে মূলত ছিল ভয় আর বিস্ময়, আর তার মাও যখন নিজের চোখদুটো একইরকম করে বড় বড় করে দেখায় ভয় দেখাতে, তখন সেদুটোকেও অনেকটা একইরকম লাগে দেখতে, তবে সেগুলো থেকে ভয় বা বিস্ময়ের বদলে রাগই ফুটে ওঠে বেশি- সাথে সেই হিংস্রতাও থাকে যার কিছু আভাস সেই দুটো চোখেও কিছুটা ছিল - সেই বাকি মুখটার সঙ্গেও যেন তার নিজের মায়ের মুখের অনেকটা মিল খুঁজে পাচ্ছে সে - সেটা তাকে আরও ভাবাচ্ছে, বিরক্ত করছে, বিব্রত করছে - কেনই বা সে এমন ভাবছে, তাও জানে না সে। সেদিনই বাড়ি ফেরার পথে - দুর্ভেদ্য অন্ধকারে, মোবাইলের টর্চের আলোয় ঝোঁপের গহীনে - সে সেই মুখটা দেখেছিল।
আরেকটু পিছিয়ে না গেলে এবারেও ব্যাপারটা ঠিক ধরা যাবে না। অতএব-
সেদিনের সেই মুহূর্ত থেকেও এবার আরও কিছুটা সময় পিছিয়ে যেতে হবে, বেশ কিছু ঘণ্টা - শশ্মানের নিস্তব্ধ নিশুতি রাত থেকে সোজা আলো ঝলমলে দিনে।
তখন দিনের বেলা, সে বসে ছিল একটা চেয়ারে - বসে খবর দেখছিল, আর সাথে খাচ্ছিলও, টেবিলে রাখা থালায় অল্প একটু ভাত, আর সাথে একটা ছোট্ট বাটিতে একটা ঠাণ্ডা পোঁচ - মড়া লাশের মত ঠাণ্ডা, সেটা একটু একটু করে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে সে ভাতের সাথে, গ্যালগেলে পোঁচটার চারপাশে ডিমের তরল সাদা অংশটুকু ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, কিছুটা বাইরে টেবিলের উপরেও পড়েছে সাদা সাদা ফোঁটা ফোঁটা করে - পোঁচটাকে ছিড়তে গিয়ে ছিটে গেছে, অনেকসময় তার বীর্যপাতের পর তার রোমশ দুই থাইয়ের গায়ে লোমের উপর, কিছুটা হাফপ্যান্টের উপরেও জায়গায় জায়গায় সাদা সাদা তরলের ছিটে এমনই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে সব - ব্যাপারটা দেখে অনেকটা তেমনই লাগল তার তখন, হাসিও পেল এটা মনে করে; মাঝে মধ্যে পাশেই বাথরুম থেকে এসে নাকে লাগছিল পেচ্ছাপের তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধটা - মা বোধহয় আবার কিছুক্ষণেই তার ওপরে তেড়ে আসবে এটার জন্য - এই গন্ধে তার মায়ের নাকি মাথা ধরে যায়; ওদিকে খবরে চারদিকে তোলপাড় এক সাংঘাতিক খবর নিয়ে, কোথায় এক পাগল মহিলা নিজের সদ্যজাতকে মেরে রান্না করে খেয়েছে, তাকে পুলিশ আটক করেছে, সে স্বীকারও করেছে নিজের অপরাধ হাসি মুখে, তার স্বামীই তাকে ধরেছিল বাড়ি ফিরে, কখনো ভাবতেই পারেনি তার স্ত্রী হঠাৎ এরম একটা কাজ করে ফেলবে, অনেকে আবার পাগল সেই মহিলার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছে, অনেকে তার স্বামীর প্রতিও, অনেকে আবার খবরটা শুনে বেশ আতঙ্কিত এবং হতবাক - সেও এটা শুনে এবং দেখে বেশ অবাক, কোনও মা কখনো নিজের সন্তানকে খেতে পারে? টিভিতে সেই মহিলাকে যখন খবরের লোকেরা জিজ্ঞেস করছিল নিজের সদ্যজাতের ব্যাপারে তখন তার মুখের মধ্যে কেমন একটা অদ্ভূত হিংস্র ভাব ফুটে উঠছিল মাঝে মাঝেই, চেহারা কেমন যেন বিকৃত আর ভয়াল হয়ে উঠছিল, অনেক সময় তার মা রাগ করলে পরে বা তার উপর চড়াও হলে পরে তার মুখখানিও এই পাগল মহিলার মতই হিংস্র হয়ে ওঠে - এটাও তখন খেয়াল করে দেখল সে, যাক, তাও না হয় এই মহিলা যাকে নিয়ে খবরে এখন এত মাতামাতি চলছে সে এক বদ্ধ পাগল, কিন্তু তার নিজের মা কি কখনো সজ্ঞানে তাকে প্রাণে মারতে পারে - প্রচণ্ড রাগের মাথায় বা ভুল করেও রাগের বসে - মায়ের হাতের জোরটা একটু বেশি পড়লে তার মাথাটা যদি গিয়ে বেকায়দা কোথাও আঘাত পায়, এবং সে আর না ওঠে, তাহলে কি তার মা সেটাকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করবে? বা কখনও তার মা কি রাগের মাথায় তার গলায় ছুরি চালিয়ে দিতে পারবে? - এই কথাগুলো তখন হঠাৎ করে, কেন কে জানে, মাথায় এল তার। আর এইসব প্রশ্ন মনে উঠতেই - সে টের পেল - একটা কেমন যেন ঠাণ্ডা হিমেল স্রোত বয়ে গেল তার সুষুম্নাকাণ্ড বেয়ে। এক বার একটা বেশ বাজে স্বপ্নও দেখেছিল সে তার নিজের মাকে নিয়ে - বলা ভাল দুঃস্বপ্ন আরকি - যাকে বলে বোবায় ধরা, তখন আদতে সেটা হয়েছিল তার সাথে; বিছনায় শুয়ে সে দেখেছিল, একটা অদ্ভূত কালো দীর্ঘ ছায়া ঢুকল তার ঘরে, সে দেখছে সবই কিন্তু নিজের একটা আঙুলও নড়াতে পারছে না - একটা অদ্ভুত আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিল সে তখন কানে - একটা তীক্ষ্ণ ভৌতিক শিষের মত শোনাচ্ছিল সেটা তার কানে, আস্তে আস্তে সেই ছায়া তার শোবার ঘরের মশারি ফুঁড়ে ভেতরে ঢুকে তার দেহের উপর চেপে বসল, তার উপর একটা বালিশ নিয়ে চাপা দিল তার মুখের উপর, দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগল তার - সেই আচ্ছনের মত হালতেই গোঙাতে গোঙাতে “মা, মা” বলে ওঠার চেষ্টা করছিল সে সেই ঘোরের মধ্যে দয়া ভীক্ষা করতে যেমনটা প্রায়ই এখনো করে থাকে - অনেক ঘেমে উঠে ভয়ে সে রাতে ঘুম তার ভাঙে সেই স্বপ্ন দেখে - তখন প্রায় ভোর হয়ে এসেছে - পরে আর সেই রাতে ঘুমোয়নি সে; সবচেয়ে যেটা তার কাছে ভয়ানক ছিল সেই স্বপ্নের ব্যাপারে, তা হল - সেই ছায়ামূর্তির বিকৃত ভয়ংকর মুখটা দেখতে অনেকটা তার মায়ের মত ছিল - একটা অদ্ভুত অস্বস্তিকর সামঞ্জস্য! সেটার জন্যই সেই স্বপ্নটা তার কাছে আরও ভয়ংকর ছিল, মায়ের চেহারাটা পালটে গেছিল যেন কোনও একটা পাশবিক শয়তানের চেহারায় - রাক্ষুসে পৈশাচিক হাসি, আর কুকুরে সব তীক্ষ্ণ ফলার মত ঝুলে থাকা দাঁত আর নখ। সেদিন টিভিতে সেই খবর দেখে তখন তার মনে আবার সেই স্বপ্নের কথা এল - আর তাতে করে, কেন জানে না সে, তবে - গায়ে একবার কাঁটাও দিয়ে উঠল তার। কখনও তার নিজের মায়ের হাতে তার মৃত্যু হতে পারে কি না, এই কথাটা মাথায় আসাতে তখন তার একটা অযৌক্তিক ভয়ও হল, আবার পরমুহূর্তেই নিজেই নিজের উপর হাসিও পেল, না না, তার মা একটু রাগী গোছের - এই যা - হ্যাঁ, এটাও সত্যি যে অনেক সময় সহ্যের সব সীমা অতিক্রম করে যায, কিন্তু তাই বলে কোনো মা কখনও নিজের সন্তানকে মারতে পারে না - অন্তত তার নিজের মা এমনটা কখনোই করতে পারবে না - সে তাকে যতই মারুক না কেন আব সে যতই নিজের মাকে অপছন্দ করুক না কেন - দিনের শেষে তার মা আর যাই হোক - এটা কখনোই করতে পারবে না ; এটা মনে করে তখন নিজের মনের মধেকার সেই ভয়টাকে কিছুটা কাটিয়ে উঠতে চেষ্টা করল সে - যেন বা নিজেই নিজেকে মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করতে লাগল। আর তখনই মা সত্যিই তেড়ে এল, এসে তার মাথার পেছনে সজোরে এক থাবড়া মেরে একটা খিস্তি দিয়ে বলল উঠে বাথরুমে গিয়ে ভালো করে জল ঢেলে দিয়ে আসতে - এই গন্ধে তার নাকি মাথা ধরে যায় একেবারে, সাথে নিজের বরের নামেও কটা কাঁচা খিস্তি করল - বর মানে সেই ছেলেটির বাবা তখন পাশেই এক ঘরে জেগে শুয়ে ছিল - শুনতে নিশ্চয় পেয়েছে - লোকটা শুয়েই থাকল যদিও - কোনো টূ শব্দও করল না।
তারপর সেই নির্দিষ্ট মুহূর্ত থেকে বেশ কিছু ঘণ্টা আবার সময়ে এগিয়ে যাওয়া যাক - নইলে গল্পটা কী হল তা চট করে ধরা যাবে না - এগিয়ে যেই সময়ে যাওয়া হচ্ছে -
তখন সন্ধ্যা।
সে বেরিয়েছিল একটু বাইরে - রোজ যেমন বেরোত।
একটা ঘিঞ্জি বাজার এলাকা, চারদিকে নানা রকমারি দোকানপাট, কোথাও খাবারের দোকান থেকে সুস্বাদু ভাজাভুজির গন্ধ ভেসে আসছে, আবার কোথাও রাস্তা জুড়ে ছড়ানো মুরগির রক্তাক্ত পালক আর আঁশটে গন্ধময় ছাট, মুরগিদের শেষ কাতর আর্তি ভেসে আসছে কানে মাঝে মাঝে, কোথাও পেচ্ছাপের ঝাঁঝালো গন্ধ ভেসে নাকে আসছে, কোথাও দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে কটা মেয়ে হেঁটে যাওয়া ছেলেদের দেখে ইশারায় কিছু অশালীন ইঙ্গিত করছে আর হাসছে, কোথাও আবার কানে ভেসে আসছে নোংরা খিস্তিখেউর, কোথাও বৈদ্যুতিন খুঁটির গায়ে দুলছে লিঙ্গবর্ধক তেলের বিজ্ঞাপন আর প্রায় ন্যাংটো মেয়েদের সব পোস্টার - সেখানে সেরম এলাকায় - একটা লজে - যেখানে ঘণ্টা হিসেবে সেই একটা লজে ঘর ভাড়া দেওয়া হয় - সেখানে দুজন ঢুকল, একটি মেয়ে, তার মুখে একটা স্কার্ফ জড়ানো - মুখটা তাতেই ঢাকা, আর একটি ছেলে - দুজনে গিয়ে ঢুকল একটা ঘরে। এর পরের দৃশ্যে - ঘরের বিছনার উপর দুটো নগ্ন দেহ, একে অপরের উপর চড়ে বসছে, একে অন্যের সাথে কখনও বা জড়িয়ে যাচ্ছে, কিছুটা রক্তের রেখা দেখা দিচ্ছে নখের আঁচড়ে, মাংসের ভেতর মাংস ঢুকছে, লালাতে লালা মিশছে - জড়িয়ে যাচ্ছে - সর্বাঙ্গ লালায় ভিজছে, নাকে লাগছে ঘামের আর বীর্যের গন্ধ, দ্রুত নিশ্বাসপ্রশ্বাস; সেই লজের পাশে আবার একটা জমিতে সেই সময় কী একটা কন্সট্রাকশনের কাজ চলছিল বেশ কদিন ধরে, তখন নরম মাটির মাংস ভেদ করে একটা জান্তব যন্ত্রের গরম শক্ত লোহা ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে বিকৃত শব্দ করে - এদিকে সেই ঘরের মধ্যে তখন একে অন্যের কানের কাছে মুখ নিয়ে একে অপরের নাম চিৎকার করে জানাচ্ছে দুটি জীব একে অপরকে - ওদিকে ধাতব লোহা নরম মাটি খুঁড়ছে।
[মুলত বাড়ির বাইরে নিজের এক বাঁধা মাগীর সাথে বেরিয়ে এইসব করার জন্যই যাওয়া - সেই ছেলে বা সেই মেয়ে কারও বাড়ির লোকেরাই জানে না এইসবের ব্যাপারে - বাইরে থাকার বরাদ্দ সময় এই দামড়া বয়সে এসেও ছেলেটির কাছে কম হওয়ায় যা কাজ সব তাড়াতাড়ি সারতে হয়, সময়ে বাড়ি ফেরার একটা তাড়া তার থাকে বলে - বিছনায় তাড়াতাড়ি কাজ সেরে ফেলে বলে কদিন আগে সেই মেয়েটি তার যৌনশক্তিকে নিয়ে একটা মজা করায় সে সেদিন রাগে একটা কষে দিয়েছিল তাকে গালে, সাথে কটা পেটেও কষিয়েছিল - মেয়েটি মার খেয়ে রাগের মাথায় বাড়িতে কিছু না বললেও বেশ কদিন তার সাথে কথা বন্ধ রেখেছিল ফলত - ভেবেছিল তার দাদার বলা কথাটাই ঠিক, ঐ ছেলেটির ধর্মের সব ছেলেরাই এরকম হয়, মেয়েটির ধর্মের বাকি সব মেয়েদের সাথেও এরা এরমই করে, তাদের একতাল মাংস ছাড়া আর কিচ্ছু মনে করে না - তার পর আবার অনেক মানিয়ে দেখা করে আদর করে সেই ছেলেটি কদিন পরেই মেয়েটিকে নিজের কাছে ডেকে নিয়েছিল - এবং মেয়েটিও প্রতিবারের মত আবার করে ফিরেও গেছিল তার কাছে প্রভুভক্ত কুকুরের মত লেজ নাড়তে নাড়তে - এদিক থেকে আবার সেই মেয়েটির সাথে ছেলেটির নিজের বাবার স্বভাবের অনেক মিল তা বরাবর লক্ষ্য করে এসেছে সেই ছেলেটি নিজে - তার মা তার বাপকে যতই মুখঝামটা মারুক আর জুতোপেটা ঝাঁটাপেটা করুক না কেন, যতই খাবারের থালা নিয়ে গায়ের উপর উল্টে দিক - তার বাপ কখনও টু শব্দটি করে না, বরং নিজের বউয়ের সেই স্বভাবকে আরও প্রশয় দেয়, আরও বেশি করে আদর করে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করে যেমন রাগী বাচ্চাদের মান ভাঙানোর চেষ্টা করে বড়রা আর তাতে করে তার মা আরও মাথায় চড়ে বসে তাদের সবার, অনেক সময় আবার নিজের ছেলের দিকে অসহায়ের মত তাকিয়েই থাকে ছলছল চোখে, যদিও তাতে করে ছেলের নিজের বাবার প্রতি কোনো করুণা হয় না বরং ঘেন্নাই হয় - আর তাই মনে মনে নিজের বাপকে মাঝে মধ্যে ল্যাংটো করে জুতোপেটা করতে ইচ্ছে করে তার, মায়ের ভয়ে তো সে নিজেও এখনও তটস্থ হয়ে থাকে - ছেলে নিজেও প্রতিবাদ করতে পারে কই; ফলে তাদের দুজনেরই এই এক স্বভাবের জন্যই নিজের বাবা আর নিজের বাঁধা সেই মাগী - দুজনকেই রাস্তার কুকুরের থেকেও কম মূল্যবান মনে করে সে; তার উপর আবার সব মেয়েমানুষকেই নিজের মায়ের মত মনে করে বলে মেয়ে জাতটার উপর ছেলেটার একটা রাগও আছে, ফলে সেই মেয়েটিকে আঘাত দিয়ে কষ্ট দিয়ে মনে কোথাও একটা আনন্দও পায় সে, নিজের মায়ের উপর ঝালটা এভাবে মেটায়। অনেকসময় নিজের মায়ের মুখ দেখতে পায় মেয়েটির মুখে কল্পনায়, ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে। তখন তার ঘেন্না আরও বেড়ে যায়। আরও বিকট জানোয়ার হয়ে যায় সে বিছনায়।]
এবারে সময়টাকে আরও কিছুটা এগিয়ে দেওয়া যাক।
সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত।
ফিরতে একটু দেরিই হয়ে গেছিল তার বাড়িতে, একে তো এত ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি থেকে বাইরে প্রেম করতে বেরোনো, তার মা এখনও জানে না যে সে বাইরে কার সাথে কী করতে যায়, মা শুধু এটাই জানে যে বাইরে যায় নিজের কিছু বন্ধুদের সাথে কিছুক্ষণ আড্ডা মারতে, সত্যিটা জানলে পরে মুশকিল - যদিও রাত তখন তেমনও গভীর হয়নি - এদিকে প্রেমাভিসার সম্পন্ন করে রাত করে পাড়াতে ফিরে দেখে পাড়ায় হয়ে রয়েছে লোডশেডিং, চারদিক ঘুরঘুট্টি অন্ধকার, পা ফেলা মুশকিলই বটে, এক বার এরমই অন্ধকারে পাকামো মেরে হাঁটতে গিয়ে একটা পচা গলা ইঁদুরের গায়ে পা দিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেছিল সে নিজের পাড়াতেই এভাবে একদিন অন্ধকারে বাড়ি ফেরার সময়ে, অতএব এবারে পকেট হাতরে ফোনটা বের করে সেটার ফ্ল্যাশটা জ্বালল - যদিও তার ফোনে তখন চার্জ প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল ফলে ফোনের আলোর তীব্রতাও মরে এসেছিল কেমন যেন; খুব সাবধানে দেখেশুনে পা ফেলছে সে এবারে, এভাবে হাঁটতে গিয়েই চকিতে একটা জায়গা থেকে কিছু অদ্ভুত শব্দ তার কৌতূহল আকর্ষণ করেছিল, কীসের ওরম আওয়াজ তা দেখার ইচ্ছে তার তখন কেন যে হয়েছিল কে জানে, একটা কোণে একটা ঝোপে ঢাকা জায়গা থেকে আসা সেই আওয়াজের পিছু নিয়ে সেখানে গিয়ে আলো ফেলতেই - সেই দৃশ্য দেখেছিল সে।
একটা জংলা ঝোপেঝাড়ে ঢাকা ভূতুড়ে মত জায়গা, মাঝে মাঝে ঝিঁঝিঁদের ডাক কানে আসছিল, সেই আওয়াজটা সেখান থেকেই আসছিল - গরররর.. একটা হিংস্র.চাপা গর্জন, মচমচ করে হাড়ের মত কিছু চেবানোর ন্যায় একটা শব্দ, আর সাথে ‘কুঁই’, ‘কুঁই’ করে ক্রমে ম্লান হয়ে আসা যেন যন্ত্রণায় চিৎকারের একটা নীচু শব্দ, একেকটা পা ফেলে ফেলে সে ধীরে ধীরে সেদিকে এগোচ্ছিল - কৌতূহলী হয়ে আলোটা ধীরে একেক পায়ে গিয়ে সেখানে ফেলতেই –
একটা কুকুর -
দুটো চোখে ভয়, বিস্ময় - যেন চোরে ধরা পড়েছে, সাথে একটা কেমন হিংস্রতা, মুখে লেগে থাকা রক্ত, কচি পা দুটো বেরিয়ে দাঁতের ফাঁক থেকে।
[কোনও মা কুকুর কী কী কারনে নিজের সদ্যজাতদেরকে মেরে খেতে পারে? যদিও এই প্রশ্নটা এই গল্পের ক্ষেত্রে অবান্তর মনে হতে পারে, তবু এক বার দেখে নেওয়া যাক সকল পশু আচরণবিদেরা কী বলছেঃ
বেশ কিছু কারন থাকতে পারে –
১। যদি সেই কুকুরী নিজে অভুক্ত থাকে লম্বা সময় ধরে
২। যদি অত্যন্ত মানসিক চাপের মধ্যে সে থাকে, মানসিক অবসাদ বা হতাশা থেকেও অনেকসময় তারা এরম কাজ করে ফেলে
৩।অনেক সময় ভুল করেও তারা খিদের চোটে সদ্যজাত না বুঝে খেয়ে ফেলে দেয় মাতৃত্বের ব্যাপারে কোনও পূর্ব ধারণা বা অভিজ্ঞতা না থাকায়
৪। যদি সে কোনও বিশেষ সদ্যজাতকে অপছন্দ করে
৫। যদি সেই সদ্যজাত পঙ্গু বা বিকলাঙ্গ হয়
মোদ্দা কথা, কারন অনেক আছে, আমাদের সব না জেনে না শুনে কোনও বিরুপ মনোভাব বা মতামত মায়েদের প্রতি(জাত নির্বিশেষে) তৈরী বা পোষণ করা অনুচিত। হাজার হোক, মায়েরা কখনো নিজেদের সন্তানের ক্ষতি স্বেচ্ছায় করতে পারে কি? করলেও, তার জন্য সব মায়েদের দোষারোপ করা বা মাতৃত্বের পূন্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা কি সমীচীন হবে? - এই প্রশ্নগুলোরও এই গল্পের সাথে কোনো যোগ নাও থাকতে পারে।]
সেই কুকুরটিও তাকে দেখে থমকে গেছিল কিছুক্ষণের জন্য, তারা দুজনে চুপচাপ নিঃশব্দে একে অপরকে নিষ্পলক দেখেই যাচ্ছিল এমন সময় মিনিট পরে দুম করে ফোনের চার্জ শেষ হয়ে গেল, অগত্যা আলো নিভে যাওয়ায় সেই মিশকালো অন্ধকারের মধ্যেই নিঃশব্দে দুজনে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়েই থাকল নিজেদের জায়গায়, আঁধারে একে অন্যের ছায়ামূর্তি দেখে গেল তারা আরও কয়েক মুহূর্ত। তারপর একটা সময়ে - অন্ধকারে সয়ে আসা চোখে –
সে সেখান থেকে হাঁটা দেবার কিছুক্ষণেই কচরমচর চেবানোর শব্দটা আবার শুরু হল।
গল্পটা কি বোঝা গেল? না বোধহয় - ঠিকাছে।
মায়ের মুখ
▮রৌনিক রায়
▮রৌনিক রায়
![মায়ের মুখ [ছোটোগল্প] • রৌনিক রায় মায়ের মুখ [ছোটোগল্প] • রৌনিক রায়](https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEgXEwBFaOOSvf6sLCVnlVBs_nUT3hZD2C0urxkZOl-Abhc0Xl9ipAcMSp-7h_j_9E2sMBeRcUivw3n1kMMmI_Ag7aVakGFDX3T_UQCB-IKODfOaGfQ0vQCrKUADNrlHYWyFbibCGftmooCwmasz3PYAwYsXTBQnRkunTJqDEcWaHqn-hgrk4h0ovGIjOP4/s1600-rw/%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%AF%E0%A6%BC%E0%A7%87%E0%A6%B0%20%E0%A6%AE%E0%A7%81%E0%A6%96%20bindumag%0A%E0%A6%B0%E0%A7%8C%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A6%95%20%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A7%9F%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%81%20%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%9F%E0%A6%B2%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%97.png)



মন্তব্য