.header-button .inner > span { font-size: 18px !important; } .header-button .inner i.fa { font-size: 40px !important; } .comment-form-message { background-color: #f4f4f4 !important; font-size: 14px !important; }

$type=ticker$count=12$cols=4$cate=0$sn=0$show=post

সালমান রুশদির মিডনাইটস চিলড্রেন (পর্ব ২) • বাংলা অনুবাদ: দীপ মন্ডল

সালমান রুশদির মিডনাইটস চিলড্রেন (পর্ব ১) • বাংলা অনুবাদ: দীপ মন্ডল
পুস্তক ১ • অধ্যায় ১ • পর্ব ২

ছিদ্রযুক্ত চাদর 

THE PERFORATED SHEET

তরুণ, সদ্য-ডাক্তারি-পাস-করা ডাক্তার আদম আজিজ বসন্তের হ্রদটার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে পরিবর্তনের গন্ধটা যেন শুঁকে বোঝার চেষ্টা করছিলেন; আর তাঁর পিঠটা (যেটা কিনা একেবারে টানটান সোজা) তখন ঘোরানো ছিল আরও অনেক বড় সব পরিবর্তনের দিকে। তিনি যখন বিদেশে, সেই সময়েই বাবার স্ট্রোক হয়েছিল, আর তাঁর মা খবরটা চেপে গিয়েছিলেন। মায়ের শান্ত, কঠিন গলাটা ফিসফিসিয়ে বলে উঠেছিল: ‘…তোর পড়াশোনাটা যে অনেক বেশি জরুরি ছিল, বাবা।’ এই মা, যিনি সারাটা জীবন বাড়ির চার দেওয়ালের ঘেরাটোপে, পর্দার আড়ালেই কাটিয়ে দিলেন, তিনি হঠাৎ করেই যেন এক অসীম মনের জোর জোগাড় করে ফেললেন আর বেরিয়ে পড়লেন রত্নের সেই ছোট্ট ব্যাবসাটা (ফিরোজা, চুনি আর হিরে) সামলাতে, যেটার দৌলতেই কিনা একটা স্কলারশিপের ভরসায় আদমের মেডিকেল কলেজের পড়ার খরচাপাতি উতরে গিয়েছিল। কাজেই দেশে ফিরে তিনি দেখলেন, পরিবারের সেই আপাত-অপরিবর্তনীয় চেনা নিয়মকানুনগুলো কেমন আমূল ওলটপালট হয়ে গেছে—তাঁর মা রোজগার করতে বাইরে বেরোচ্ছেন আর বাবা তখন স্ট্রোকের ধাক্কায় মস্তিষ্কের ওপর নেমে আসা এক অদৃশ্য পর্দার আড়ালে গা ঢাকা দিয়ে বসে আছেন। অন্ধকার ঘরে একটা কাঠের চেয়ারে বসে তিনি পাখির ডাক ডাকতেন। প্রায় তিরিশ প্রজাতির পাখি তাঁর কাছে আসত, বন্ধ জানলার বাইরের কার্নিশে বসে এটা-ওটা নিয়ে তাঁর সঙ্গে গল্প জুড়ে দিত। দেখে মনে হত, ভদ্রলোক বেশ সুখেই আছেন। 
   (...আর এর মধ্যেই আমি দেখতে পাচ্ছি, সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি কেমন করে শুরু হয়ে যায়; কারণ আমার দিদিমাও তো খুঁজে পেয়েছিলেন সেই প্রকাণ্ড... আর শুধু কি তাই, সেই স্ট্রোকের ব্যাপারটাও তো একমাত্র ছিল না... ওদিকে আবার ব্রাস মাঙ্কিরও ছিল তার সেই পাখিগুলো... অর্থাৎ, অভিশাপের চাকা গড়াতে শুরু করল বলে, অথচ দেখুন আমরা এখনো নাকের কিস্‌সায় গিয়ে পৌঁছতেই পারলাম না!)

কাশ্মীরের লেকে ঘুরে বেড়ানো কাঠের ডিঙি নৌকা শিকারা
কাশ্মীরের লেকে ঘুরে বেড়ানো কাঠের ডিঙি নৌকা: শিকারা
লেকের বুকের ওপর থেকে বরফের চাদরটা কখন যেন সরে গেছে। বরফ গলতে শুরু করেছে হু হু করে, যেমনটা প্রত্যেকবার হয়। এই আকস্মিক ওলটপালটে ছোট ছোট নৌকো, অর্থাৎ শিকারার দল, খানিক অপ্রস্তুত হয়েই ডাঙার ওপর দিবানিদ্রা দিচ্ছিল। অবশ্য, এটাও কোনো নতুন দৃশ্য নয়। কিন্তু এই কুম্ভকর্ণের দল যখন তাদের মালিকদের গা ঘেঁষে নিশ্চিন্তে ভোঁস ভোঁস করে নাক ডাকিয়ে ঘুমে মগ্ন, ঠিক তখনই, বাড়ির বুড়ো মানুষেরা যেমন ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই জেগে ওঠে, তেমনই সবচেয়ে প্রাচীন নৌকোটি ছিল সজাগ। আর সেই কারণেই বরফ-গলা হ্রদের পানিতে প্রথম ভেসে পড়ল সে-ই। তাই-এর শিকারা...। এটাও যেন এক চিরন্তন প্রথা।
   ওই দেখুন বুড়ো মাঝি তাইকে, কেমন কুঁজো হয়ে নৌকোর পেছন দিকটায় দাঁড়িয়ে কুয়াশা-মাখা পানি কেটে তরতর করে এগিয়ে চলেছে! ওর দাঁড়টা দেখুন, হলদে একটা ডান্ডার ডগায় যেন কাঠের একখানা হৃৎপিণ্ড লাগানো, কেমন হেঁচকা টানে শ্যাওলার জঙ্গল ঠেলে এগিয়ে যাচ্ছে! এ তল্লাটে লোকটা ভারী অদ্ভুত বলেই পরিচিত। কারণটা হলো, সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নৌকো বায়... এছাড়া আরও কিছু কারণ অবশ্য আছে। ডাক্তার আজিজের জন্য এক জরুরি তলব নিয়ে আসা এই তাই-ই কিন্তু ইতিহাসের চাকা ঘুরিয়ে দিতে চলেছে... আর ওদিকে আদম, পানির গভীরে চোখ রেখে, মনে করছিল বহু বছর আগে তাইয়ের শেখানো সেই কথাটা: ‘বরফ কিন্তু সব সময় তৈরি থাকে, আদম বাবা, পানির চামড়ার ঠিক নিচেই।’ আদমের চোখদুটি ছিল স্বচ্ছ নীল, পাহাড়ি আকাশের সেই আশ্চর্য নীল, যে নীল রং কাশ্মীরী পুরুষদের চোখের মণিতে চুঁইয়ে পড়ার এক আশ্চর্য অভ্যেস রাখে; ওরা দেখতে ভোলেনি। ওরা দেখতে পায়—ওই তো! যেন এক ভূতের কঙ্কাল, ডাল লেকের পানির ঠিক নিচেই! সেই সূক্ষ্ম কারুকাজ, সেই জটিল জালের মতো বর্ণহীন রেখার কাটাকুটি, ভবিষ্যতের হিমশীতল প্রতীক্ষারত শিরা-উপশিরা। জার্মানির দিনগুলো আর সব কিছু ঝাপসা করে দিলেও, দেখার এই ক্ষমতাটুকু কাড়তে পারেনি। তাইয়ের দেওয়া সেই ক্ষমতা। তিনি মুখ তুলে তাকালেন। দেখলেন, পানির বুক চিরে একটা V-আকৃতি তৈরি করে এগিয়ে আসছে তাই-এর নৌকা। দেখে হাত নাড়লেন। তাই-এরও হাত উঠল—কিন্তু সেটা সম্ভাষণের, প্রত্যুত্তরের নয়। কঠোর এক আদেশ। ‘দাঁড়াও!’ আমার দাদু অপেক্ষা করতে লাগলেন। এবং এই থমকে যাওয়া মুহূর্তটিতে, যখন তিনি তাঁর জীবনের শেষতম শান্তির স্বাদ নিচ্ছেন, বড় অদ্ভুত, ঘোলাটে আর প্রায়-অশুভ এক শান্তি, ঠিক এই ফাঁকেই তাঁর চেহারাটার একটা বর্ণনা দিয়ে রাখা ভালো।
   একজন আকর্ষণীয় চেহারার মানুষের প্রতি আমার মতো এক কুৎসিত লোকের মনের স্বাভাবিক ঈর্ষাটাকে চেপে রেখেই বলছি, ডাক্তার আজিজ বেশ লম্বা-চওড়া একজন মানুষ ছিলেন। বাড়ির দেওয়ালের সঙ্গে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়ালে তাঁর উচ্চতা হতো ঠিক পঁচিশটা ইট সমান (জীবনের প্রতি বছরের জন্য একটা করে), অর্থাৎ সোয়া ছয় ফুটের সামান্য বেশি। শুধু লম্বাই নন, বেশ শক্তসমর্থও ছিলেন। গালভরা ঘন লাল দাড়ি—যা দেখে তাঁর মা বেজায় বিরক্ত হতেন। বলতেন, একমাত্র মক্কা ফেরত হাজিদেরই অমন লাল দাড়ি রাখা সাজে। তবে মাথার চুল ছিল ঘন কালো রঙের। আর তাঁর সেই আকাশ-নীল চোখের কথা তো আগেই বলেছি। ইনগ্রিড তো বলেইছিল, ‘তোমার মুখটা যখন তৈরি হচ্ছিল, রঙ নিয়ে ওরা বোধহয় একেবারে মাতামাতি শুরু করে দিয়েছিল।’ কিন্তু আমার দাদুর চেহারার মূল আকর্ষণ তাঁর রঙ বা উচ্চতা নয়, বাহুর শক্তি বা টানটান শিরদাঁড়াও নয়। আসল জিনিসটা ছিল অন্য। ওই তো, পানির মধ্যে তার ছায়া কাঁপছে, মুখের ঠিক মাঝখানে যেন একটা পাগলাটে কলা ঢেউয়ের তালে দুলছে... তাইয়ের জন্য অপেক্ষা করতে করতে আদম আজিজ পানির ঢেউয়ে নিজের কাঁপতে থাকা নাকটার দিকেই তাকিয়ে ছিলেন। ওরকম একটা নাক সাধারণ চেহারার কাউকে তো একেবারে চাপা দিয়ে দিত; এমনকি তাঁর মতো মানুষের মুখেও সবার আগে ওই নাকটাই চোখে পড়ত, আর সেটাই মনে থেকে যেত সবচেয়ে বেশি দিন। ইলসে লুনিব ঠাট্টা করে বলত, ‘এ তো সাইরানোর নাক।’ আর অস্কার তাতে জুড়েছিল, ‘নাক নয়, যেন হাতির শুঁড়।’ ইনগ্রিড তো বলেই দিয়েছিল, ‘এই নাকের উপর দিয়ে তো দিব্যি একটা নদী পেরিয়ে যাওয়া যায়।’ (নাকের পাটাটা ছিল বেশ চওড়া।)
   আমার দাদুর নাকখানা ছিল এক দেখার মতো বস্তু: নাকের পাটা দুটো নাচিয়েদের মতো নিখুঁত ভঙ্গিমায় ফুলে উঠত। আর তাদের মাঝখান দিয়ে নাকটা যেন এক পেল্লায় বিজয়-তোরণের মতো ফুলে উঠেছে; প্রথমে খাড়া হয়ে বাইরের দিকে, তারপর তলার দিকে নেমে এসে চমৎকার একটা ঠোক্কর খেয়ে উপরের ঠোঁটের কাছে এসে থেমেছে। নাকের ডগাটা এখন দিব্যি লাল হয়ে আছে। এমন নাক নিয়ে চলতে গেলে হোঁচট খেয়ে আছাড় খাওয়ারই কথা। এই পেল্লায় অঙ্গটির কাছে আমার কৃতজ্ঞতা আমি সযত্নে নথিবদ্ধ করে রাখতে চাই। ওটি যদি না থাকত, তবে আমি যে সত্যিই আমার মায়ের পুত, আমার দাদুর নাতি, তা কে কবে বিশ্বাস করত? এই প্রকাণ্ড যন্ত্রটি, যা কিনা আমারও জন্মসূত্রে পাওয়ার কথা ছিল। ডাক্তার আজিজের নাকখানা—যার তুলনা চলে একমাত্র গণেশ ঠাকুরের শুঁড়ের সঙ্গেই— তা-ই যেন অকাট্যভাবে প্রমাণ করে দিয়েছিল যে বাড়ির কর্তা হওয়ার অধিকার আছে কেবল তাঁর। এ শিক্ষাও তিনি পেয়েছিলেন তাইয়ের কাছেই। আদম যখন সবেমাত্র কৈশোর পেরিয়েছে, সেই বুড়ো মাঝি বলেছিল, ‘এ যে বংশ পত্তন করার মতো নাক হে রাজপুত্তুর। ছেলেপুলে হলে চট করে চেনা যাবে কোন বাপের ব্যাটা। চিনতে একফোঁটাও ভুল হবে না। মোগল বাদশারাও অমন একখানা নাকের জন্য নিজেদের ডান হাতটা পর্যন্ত কেটে দিয়ে দিতে পারত হে। ওর ভেতরে যে কত রাজবংশ থিকথিক করছে…,’ — আর ঠিক এইখানটাতেই তাই একটু গ্রাম্য অশালীনতার আশ্রয় নিয়েছিল— ‘ঠিক যেন নাকের সর্দির মতো।’
   আদম আজিজের মুখে, ওই নাকখানা যেন এক আদিপুরুষের গাম্ভীর্য ফুটিয়ে তুলত। আমার মায়ের মুখে সেটাকে দেখাত বেশ অভিজাত, আর সেইসঙ্গে যেন একটু দীর্ঘকাল-ধরে-কষ্ট-সওয়া গোছের। আমার মাসি এমারেল্ডের মুখে সেটা দেখাত বেজায় দেমাকি; আর আমার আলিয়া মাসির মুখে, নাকটা রীতিমতো বুদ্ধিজীবীমার্কা; আমার হানিফ মামার মুখে ওটা যেন এক বিফল প্রতিভার অঙ্গ; মুস্তাফা মামা আবার ওটাকে এক দ্বিতীয় শ্রেণীর শুঁকবার যন্ত্র বানিয়ে ফেলেছিলেন। বাঁদরটা (ব্রাস মাঙ্কি) অবশ্য এই নাক থেকে পুরোপুরি রেহাই পেয়ে গেল; কিন্তু আমার ওপর— আমার ওপর, ওটা হয়ে দাঁড়াল সম্পূর্ণ অন্য একখানা জিনিস। থাক, আমার সব গোপন কথা তো আর একলপ্তে ফাঁস করে দিলে চলবে না।
    (তাই ক্রমশ কাছে এগিয়ে আসছে। এই সেই লোক, যে কিনা নাকের আসল ক্ষমতাটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল। আর এখন সে-ই আমার দাদুর জন্য এমন একখানা খবর বয়ে আনছে, যা তাঁকে এক ঝটকায় সোজা তাঁর ভবিষ্যতের দিকে ছুঁড়ে ফেলে দেবে। এই সাতসকালের হ্রদের বুক চিরে সে তার শিকারার দাঁড় বেয়ে চলেছে…)
   তাই-কে যে কে কবে জোয়ান অবস্থায় দেখেছিল, সে-কথা কেউ আর মনেই করতে পারত না। সে ওই একই নৌকায়, ঠিক ওই একইরকম কুঁজো ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে, ডাল আর নাগিন লেকের এপার-ওপার করে চলেছে... যেন অনন্তকাল ধরে। অন্তত লোকে তো তেমনটাই জানে। সে থাকত সেই পুরনো কাঠের বাড়ির পাড়ার পেটের ভেতরের কোনো এক নোংরা ঘুপচিতে। আর তার বউ, বসন্ত কিংবা গ্রীষ্মের পানিতে দুলে ওঠা অঢেল ‘ভাসমান বাগান’-গুলোর কোনো একটার ওপর পদ্মের মূল আর কিসব বিদঘুটে আনাজপাতি ফলাত। তাই নিজেও বেশ খোশমেজাজেই স্বীকার করত যে নিজের বয়সের কোনো হিসেব তার জানা নেই। তার বউও এ-ব্যাপারে বিন্দুবিসর্গ জানত না—তার মতে, তাদের যখন বিয়ে হয়, তখনই লোকটার শরীর নাকি এমন পাকানো চামড়ার মতো শুকনো ছিল। তার মুখখানা ছিল যেন পানির ওপর বাতাসের তৈরি এক নিখুঁত ভাস্কর্য: চামড়ার ঢেউ খেলানো সব ভাঁজ। সম্বল বলতে মুখে মাত্র দুটো সোনার দাঁত, এছাড়া আর একটা দাঁতও ছিল না তার। 
     শহরে তার বন্ধু-বান্ধব বলতে বিশেষ কেউ ছিল না। শিকারার ঘাটগুলো বা লেকের পাড়ে থাকা অগুনতি ভাঙাচোরা, নড়বড়ে মুদিখানা আর চায়ের দোকানগুলোর পাশ দিয়ে যখন সে নৌকা বেয়ে যেত, তখন খুব কম মাঝি বা ব্যাপারীই তাকে এক ছিলিম হুঁকো খাওয়ার জন্য সাধত। 
   তাইকে নিয়ে লোকজনের সাধারণ ধারণাটা অনেক কাল আগেই খোলসা করে বলেছিলেন আদম আজিজের বাবা, সেই রত্ন-ব্যাবসায়ী: ‘ওর দাঁতগুলো পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘিলুটাও খসে পড়েছে।’ (অথচ এখন সেই বুড়ো আজিজ সাহেব পাখিদের কিচিরমিচিরের দুনিয়ায় নিজেকে হারিয়ে বসে আছেন, আর ওদিকে তাই মাঝি আপন মহিমায় দিব্যি নিজের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।) তাকে নিয়ে মানুষের এই ধারণাগুলোকে মাঝি নিজেই যেন আরও উসকে দিত তার বকবকানি দিয়ে; সে বকুনি ছিল যেমন আজগুবি আর গালভরা, তেমনই অবিশ্রান্ত, আর প্রায়শই দেখা যেত সে আসলে বকে চলেছে নিজের সঙ্গেই। পানির বুক চিরে শব্দ বেশ দূর অবধি ভেসে যায়, আর হ্রদের ধারের মানুষজন ওর ওই আপনমনে বকে চলা শুনে মিটিমিটি হাসত ঠিকই; কিন্তু সেই হাসির আড়ালে কোথাও একটা সমীহ, এমনকী খানিকটা ভয়ও লুকিয়ে থাকত। সমীহ, কারণ এই আধপাগলা বুড়োটা এখানকার হ্রদ আর পাহাড়গুলোকে ওর নিন্দুকদের চেয়ে অনেক ভালো করে চিনত। আর ভয়, কারণ সে এমন এক অগাধ প্রাচীনত্বের দাবি করত যাকে কোনো সংখ্যার হিসেবে বাঁধা যায় না, আর সেই বিপুল বয়সের ভার তার ওই মুরগির মতো লিকলিকে ঘাড়ের ওপর এমন হালকাভাবে চেপে বসেছিল যে, একখানা ঈর্ষণীয় বউ জুটিয়ে তার গর্ভে চার-চারটে ছেলের জন্ম দিতেও তা কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি... লোকমুখে শোনা যেত, হ্রদের ধারের অন্য বউদের পেটেও নাকি আরও কয়েকটা বাচ্চা সে পয়দা করেছিল। শিকারার ঘাটে আড্ডা মারা ছোকরাগুলোর তো বদ্ধমূল ধারণা ছিল যে, বুড়ো নিশ্চয়ই কোথাও গাদাখানেক টাকা লুকিয়ে রেখেছে—হয়তো-বা অমূল্য সব সোনার দাঁতের একখানা গুপ্তধন, যেগুলো কোনো এক বস্তার ভেতর আখরোটের মতো ঝমঝম করে বাজে। এর বহু বছর পর, আঙ্কল পাফস যখন তাঁর মেয়ের সব দাঁত উপড়ে ফেলে সেখানে সোনার দাঁত বসিয়ে দেওয়ার টোপ দিয়ে মেয়েটাকে আমার ঘাড়ে গছানোর চেষ্টা করেছিলেন, তখন আমার ওই তাই-এর ভুলে-যাওয়া গুপ্তধনের কথাই মনে পড়ে গিয়েছিল...। ছেলেবেলায় আদম আজিজ এই লোকটাকে ভারী ভালোবাসত।
   তার ওই অগাধ ধনসম্পত্তির বিস্তর গুজব থাকা সত্ত্বেও, সে কিন্তু নেহাত এক সাদামাটা খেয়াঘাটের মাঝির মতোই রোজগারপাতি করত; নগদ পয়সার বিনিময়ে হ্রদের এপার-ওপার করে দিত খড়, ছাগল, শাকসবজি আর কাঠকুটো; এমনকি মানুষজনকেও। নৌকায় যখন সে যাত্রী বইবার কাজটা, অর্থাৎ তার ওই ট্যাক্সি-সার্ভিস চালাত, তখন শিকারার ঠিক মাঝখানটায় সে একটা ঘেরাটোপ বানিয়ে ফেলত; ফুল-ছাপ পর্দা আর চাঁদোয়া টাঙিয়ে তার সঙ্গে মানানসই কুশন দিয়ে… সে এক ঝলমলে এলাহি ব্যাপার; আর দেদার ধূপ জ্বালিয়ে নৌকার ভ্যাপসা গন্ধ দূর করে বেশ একটা সুবাস ছড়িয়ে দিত। হাওয়ায় পর্দা উড়িয়ে তাই-এর শিকারার ঘাটের দিকে ওই এগিয়ে আসার দৃশ্যটা ডাক্তার আজিজের কাছে চিরকালই ছিল বসন্তের আগমনের সবচেয়ে স্পষ্ট আর চেনা ছবিগুলোর একটা। শিগগিরই ইংরেজ সাহেবসুবোদের দল এসে পড়বে, আর তাই তার নৌকায় চাপিয়ে তাদের নিয়ে যাবে শালিমার বাগা, কিংস স্প্রিং বা রাজার ঝরনায়। লোকটা বড্ড বাচাল, ছুঁচোলো থুতনি আর কুঁজো পিঠ নিয়ে সে অনর্গল বকবক করতে করতে দাঁড় টানে। ‘পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী’—অস্কার-ইলসে-ইনগ্রিডের এই বদ্ধমূল বিশ্বাসের একেবারে এক জলজ্যান্ত উলটো পিঠ ছিল সে... যেন উপত্যকারই খামখেয়ালি, চিরস্থায়ী এক চির পরিচিত আত্মা। পানির দেশের এক ক্যালিবান সে, সস্তা কাশ্মীরি ব্র্যান্ডির প্রতি যার একটু বেশিই টান ছিল।

নীল দেওয়ালে টাঙানো ‘বয় র‍্যালে’-র ছবি।
নীল দেওয়ালে টাঙানো ‘বয় র‍্যালে’-র ছবি।

আমার শোওয়ার ঘরের নীল দেওয়ালটার কথা বেশ মনে পড়ে। সেখানে প্রধানমন্ত্রীর চিঠির ঠিক পাশেই বছরের পর বছর টাঙানো ছিল ‘বয় র‍্যালে’-র ছবিটা। ছবিতে ছোট্ট র‍্যালে যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে আছে এক বুড়ো জেলের দিকে—যার পরনে লাল ধুতি গোছের কিছু একটা, আর লোকটা বসে আছে—কিসের ওপর যেন?—পানিতে-ভেসে-আসা কোনো কাঠের টুকরো হবে কি?—আর সমুদ্রের দিকে আঙুল উঁচিয়ে সে শুনিয়ে চলেছে তার ওই জেলেজীবনের সব গপ্পো... ঠিক এভাবেই কিশোর আদম, অর্থাৎ কিনা আমার হবু দাদু, মাঝি তাই-এর প্রেমে পড়েছিল। লোকটার ওই অফুরান বকবকানির জন্যই, যা শুনে অন্যেরা তাকে আস্ত পাগল ঠাওরাত। সে এক জাদুকরী কথাবার্তার ফুলঝুরি, বোকা মানুষের পয়সাকড়ির মতো তার মুখ থেকে যেন শব্দ ঝরে পড়ত, তার ওই দুটো সোনার দাঁত গলে, হেঁচকি আর ব্র্যান্ডির গন্ধে মাখামাখি হয়ে, তা সোজা উড়ে যেত অতীতের সবচেয়ে দুর্গম হিমালয়ের চূড়ায়। তারপর সেখান থেকে ছোঁ মেরে নেমে আসত বর্তমানের কোনো খুঁটিনাটির ওপর, ধরা যাক ওই আদমের নাকের ওপরই, একটা ল্যাবরেটরির ইঁদুরের মতো সেটাকে চিরে চিরে তার নাড়িনক্ষত্র ঘাঁটত, এমনই একটা ব্যাপার। এই বন্ধুত্বের চক্করে পড়ে আদমকে নিয়মিত ঘোর বিপাকে পড়তে হতো। একেবারে ফুটন্ত পানি। আক্ষরিক অর্থেই তাই। তাঁর মা বলতেন, ‘ওই মাঝির গায়ের পোকাগুলোকে মেরেই ছাড়ব, তাতে যদি তোরও জান যায় তো যাক।’ তবু ওই একলা-বকে-চলা বুড়ো তার নৌকো নিয়ে বাগানের একেবারে পায়ের কাছে, লেকের পানিতে অলস ভাবে ভেসে বেড়াত, আর আজিজ মুগ্ধ হয়ে তার পায়ের কাছে বসে থাকত, যতক্ষণ না বাড়ির ভেতর থেকে ডাক আসত। অন্দরে গেলেই শুরু হতো তাই-এর নোংরামি নিয়ে লম্বা-চওড়া বকুনি, আর তাঁর মায়ের কল্পনায় থাকা জীবাণুদের এক বিশাল আক্রমণকারী ফৌজের ব্যাপারে সতর্কবাণী—ওই জীবাণুরা নাকি মাঝির পুরোনো শরীরটা থেকে লাফিয়ে সোজা তার ছেলের ইস্ত্রি-করা সাদা ঢিলেঢালা পাজামার ওপর এসে ঝাঁপিয়ে পড়বে। কিন্তু আদম বারবার সেই পানির ধারেই ফিরে যেত। সকালের কুয়াশা হাতড়ে তার চোখ খুঁজত—কখন ওই ছেঁড়াখোঁড়া, কুঁজো, বখাটে বুড়োটা তার জাদুনৌকো বেয়ে মায়াবী পানির বুক চিরে এগিয়ে আসবে।
   ‘আচ্ছা সত্যি করে বলো তো তাইজি, তোমার আসল বয়সটা ঠিক কত?’ (প্রাপ্তবয়স্ক, লালচে-দাড়িওয়ালা, ভবিষ্যতের দিকে ঝুঁকে-থাকা ডাক্তার আজিজের এখন মনে পড়ে গেল সেই দিনটার কথা, যেদিন তিনি এমন একখানা প্রশ্ন করে বসেছিলেন, যেটা করা তাঁর আদৌ উচিত হয়নি।) এক মুহূর্তের জন্য চারদিক যেন একেবারে নিস্তব্ধ, নীরব… যে-নীরবতা একটা জলপ্রপাতের চেয়েও ঢের বেশি শব্দময়। মাঝির সেই একতরফা বকবকানিটা হঠাৎ হোঁচট খেল। পানির বুকে কেবল দাঁড়ের ঝপাস ঝপাস শব্দ। সে তখন তাইয়ের সঙ্গে শিকারায় চেপে ঘুরছে, একগাদা খড়ের ওপর ছাগলগুলোর মাঝখানে একেবারে জবুথবু হয়ে। সে বিলক্ষণ জানে, বাড়ি ফিরলেই তার কপালে জুটবে লাঠির বাড়ি আর সেই চানঘরের বাথটাব। সে তো এসেছিল গল্প শোনার লোভে—অথচ একটা মাত্র প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে গল্পকার মানুষটাকেই সে একেবারে চুপ করিয়ে দিয়েছে।
   ‘না, বলোই না তাইজী, সত্যি তোমার বয়স কত?’ আর ঠিক তখনই কোত্থেকে যেন একটা ব্র্যান্ডির বোতল উদয় হলো: ওই জবরজং গরম চোগা-কোটের ভাঁজ থেকে বেরিয়ে আসা সস্তা মদ। তারপর একটা কাঁপুনি, একটা ঢেকুর, একটা কটমটে চাউনি। সোনার দাঁতের ঝিলিক। এবং—অবশেষে!—কথা ফুটল। 
     ‘কত বয়স? তুমি জিজ্ঞেস করছ আমার কত বয়স, ওরে আমার কচি খোকা, ওরে আমার নাক-গলা…’ আমার দেওয়ালের টাঙানো ছবির সেই জেলের মতো অবিকল একই ভঙ্গিতে তাই পাহাড়ের দিকে আঙুল তুলল সে। ‘এতটাই বয়স রে…, নাক্কু!’ নাক্কু, মানে ওই খাড়া বিশাল নাকওয়ালা আদম, তাই-এর উঁচানো আঙুলের দিকটায় তাকাল। ‘আমি নিজের চোখে ওই পাহাড়গুলোকে জন্মাতে দেখেছি; আমি কত কত রাজা বাদশাদের ভবলীলা সাঙ্গ হতে দেখেছি। শোন। শোন, নাক্কু…’ —আবার সেই ব্র্যান্ডির বোতল, আর তার পিছু পিছু সেই ব্র্যান্ডি-ভেজা গলা, আর এমন সব কথা যা ওই মদের চেয়েও বেশি নেশা ধরায়— ‘...আমি ওই ঈসাকে দেখেছি, ওই যিশুখ্রিস্টকে, সে যখন কাশ্মীরে এসেছিল। হাসছো? হাস, হাস, তোমাদের ইতিহাসটাই তো নিজের মাথার ভেতর ধরে রেখেছি আমি। এককালে এসব পুরোনো বইপত্তরে লেখাজোকা ছিল, সেসব এখন হারিয়ে গেছে। আমি এমন এক কবরের হদিস আমি জানতাম—যার পাথরে খোদাই করা ছিল ফুটো-হয়ে-যাওয়া দুটো পায়ের ছাপ, বছরে একবার সেখান থেকে ঝরত রক্ত। এখন তো আমার নিজের স্মৃতিও বেইমানি করছে; কিন্তু আমি জানি, যদিও আমি ওসব পড়তে টড়তে জানি না। তবু আমি সব জানি।’ অক্ষরজ্ঞানহীনতাকে সে যেন তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিল; তার হাতের ওই এক রাজকীয় ঝাপটায় গোটা লেখার জগতটাই যেন গুঁড়িয়ে গেল। হাতটা আবার ফিরে গেল চোগার পকেটে, সেখান থেকে ব্র্যান্ডির বোতলে, তারপর তার শীতে-ফাটা ঠোঁটে। তাইয়ের ঠোঁটজোড়া চিরকালই কেমন যেন মেয়েদের মতো। ‘নাক্কু, শোন, ভালো করে শোন। অনেক কিছু দেখেছি আমি। দোস্ত, তুমি যদি দেখতে সেই ঈসাকে! সে যখন এল, তার এক্কেবারে তলপেট অবধি দাড়ি, আর মাথাটা যেন ন্যাড়া ডিম। বুড়ো বড্ড কাহিল হয়ে পড়েছিল বটে, কিন্তু আদবকায়দাগুলো সব জানত। বলত, ‘আগে আপনি, তাইজি…’, আর বলত, ‘দয়া করে বসুন’। মুখে সবসময় একটা সম্ভ্রম, কখনও আমাকে পাগল-ছাগল বলেনি, তুইতোকারিও করেনি। সবসময় ‘আপনি’। বড্ড ভদ্রলোক, বুঝলে? আর কী রাক্ষুসে খিদে রে বাপ! অমন পেটুকপনা দেখে আমি তো ভয়ে নিজের কান পাকড়াতাম। পীর-পয়গম্বর হোক কি শয়তান, আমি হলফ করে বলতে পারি একবেলায় আস্ত একটা কচি ছাগল সাবড়ে দিতে পারত। তো কী হয়েছে? আমি তাকে বললাম, খাও, পেট ভরে খাও। মানুষ কাশ্মীরে আসে হয় জীবনটাকে ফুর্তি করে কাটাতে, নয় জীবনটা শেষ করতে—কিংবা দুটোই। তার তো সব কাজ ফুরিয়ে গিয়েছিল। সে এখানে শুধু একটু আয়েশ করতে এসেছিল।’ সেই পানাসক্ত, টাকমাথা, পেটুক ক্রাইস্টের গল্প শুনে আজিজ তখন একেবারে বুঁদ। পরে বাড়ি ফিরে সে এইসব কথা অক্ষরে অক্ষরে মা-বাবাকে শুনিয়েছিল—যাঁরা কিনা রত্ন-পাথরের কারবার নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন, আর এইসব আষাঢ়ে গপ্পো শোনার মতো বিন্দুমাত্র সময় তাঁদের হাতে ছিল না।
   ‘কী হে, বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি?’— ফাটা ঠোঁট দুটো জিভ দিয়ে চাটতে চাটতে সে একগাল হাসল। সে খুব ভালো করেই জানত যে সত্যিটা আসলে ঠিক তার উলটো; ‘মনটা এদিক-ওদিক উড়ুউড়ু করছে নাকি?’—এবারও সে জানত যে আজিজ কেমন মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার একটার পর একটা কথা গিলছে। ‘খড়গুলো বোধহয় তোমার পাছায় ফুটছে, তাই না? ওরে আমার বাবাজি, আমি বড়ই লজ্জিত যে তোমার বসার জন্য সোনার জরির কাজ করা রেশমি কুশনের ব্যবস্থা করে দিতে পারিনি—ঠিক যেমন কুশনে বসে সম্রাট জাহাঙ্গির আরাম করতেন! তুমি তো নিশ্চয়ই সম্রাট জাহাঙ্গিরকে নেহাতই এক মালি ছাড়া কিছু ভাবো না,’ তাই আমার দাদুকে রীতিমতো দুষল, ‘যেহেতু তিনি ওই শালিমার বাগ বানিয়েছিলেন। গাধা কোথাকার! তুমি আর কী ছাই জানো? তাঁর নামের মানেই হলো—যিনি গোটা পৃথিবী জয় করেছেন। এটা কোনো মালির নাম হতে পারে? খোদা জানেন আজকাল তোমাদের মতো ছোকরাদের স্কুলে কীসব ছাইপাঁশ শেখানো হয়। আর এদিকে আমি…’ ...এইখানটায় বুকটা একটু ফুলিয়ে নিয়ে... ‘আমি একেবারে তোলা-হিসেবে তাঁর নিখুঁত ওজনটা পর্যন্ত জানতাম! জিজ্ঞেস কর আমাকে, কত মণ, কত সের ওজন ছিল তাঁর! যখন তাঁর মনমেজাজ ভালো থাকত, তখন তাঁর ওজনও বেড়ে যেত, আর এই কাশ্মীরে থাকা কালে তাঁর ওজন হতো সবচেয়ে বেশি। আমি তাঁর পালকি বইতাম... না, না, এই দেখ তুমি আবার অবিশ্বাস করছ, তোমার মুখের ওই পেল্লায় শশামতো নাকটা কেমন পাজামার ভেতরের ওই ছোট্ট জিনিসটার মতো নড়ছে দ্যাখো! তো, চলো, চলো, আমাকে প্রশ্ন করো! আমার পরীক্ষা নাও দিকি! জিজ্ঞেস করো, পালকির হাতলে চামড়ার ফিতেগুলো কত পাক দিয়ে জড়ানো ছিল—উত্তর হল ঠিক একত্রিশ পাক। জিজ্ঞেস করো সম্রাটের শেষ কথাটা কী ছিল—আমি বলে দিচ্ছি, সেটা ছিল ‘কাশ্মীর’। তাঁর মুখে বড্ড দুর্গন্ধ ছিল বটে, কিন্তু মানুষটার মনটা ছিল একেবারে সোনার মতো। তুমি আমাকে কী ঠাউরেছ শুনি? রাস্তার এক মূর্খ, মিথ্যেবাদী, নেড়ি কুত্তা? যাও, এবার নৌকো থেকে নামো দিকি। তোমার ওই পেল্লায় নাকের ভারে নৌকো বাওয়াই দায় হয়ে উঠেছে; আর ওদিকে তোমার বাপও বসে আছে তোমায় পিটিয়ে আমার ওই গপ্পগুলো বার করার জন্য, আর তোমার মা বসে আছে গরম পানিতে সেদ্ধ করে তোমার চামড়া গুটিয়ে নেওয়ার তালে।’
   মাঝি তাইয়ের ওই ব্র্যান্ডির বোতলটার মধ্যেই আমি যেন আমার বাবার ওপর জিনের আছরের আগাম পূর্বাভাস দেখতে পাই... আর আরও এসে জুটবে একখানা টাকমাথা ফিরিঙ্গি... তাইয়ের এই গালগল্প যেন অন্য আরেক কিসিমের হাওয়া-র ইশারা দেয়, যা কিনা আমার দিদিমার শেষ বয়সের এক পরম সান্ত্বনা হয়ে দাঁড়াবে, আর তাঁকেও শিখিয়ে দেবে গল্প বলার ছলাকলা... এমনকি ওই হেঁজিপেঁজি নেড়ি কুত্তার দলও খুব একটা দূরে নেই...থাক আর নয়। আমি নিজেই নিজেকে কেমন ভয় পাইয়ে দিচ্ছি। 
   সেই মারধোর আর গরম পানিতে স্নান সত্ত্বেও, আদম আজিজ কিন্তু ঠিকই তাইয়ের শিকারায় গিয়ে হাজির হত। একবার নয়, বারবার। সেই ছাগল, খড়, ফুল, আসবাবপত্তর, পদ্মের ঘেঁটু—এইসবের গাদাগাদির মধ্যেই সে ভেসে বেড়াত। তবে হ্যাঁ, ইংরেজ সাহেবদের সঙ্গে কক্ষনো না। আর বারবার ধরে শুনত সেই একখানা সাংঘাতিক সব প্রশ্নের আশ্চর্যরকমের জবাবগুলো: ‘আচ্ছা তাইজী, তোমার আসল বয়সটা কত, সত্যি করে বলো তো?’
   তাইয়ের কাছ থেকেই আদম হ্রদের নানা গোপন রহস্যের হদিশ পেয়েছিল—কোথায় সাঁতার কাটলে পানির তলার আগাছারা টেনে ধরবে না; এগারো রকমের জলসাপের সুলুকসন্ধান; ব্যাঙেরা ঠিক কোথায় ডিম পাড়ে; পদ্মের ঘেঁটু কীভাবে রাঁধতে হয়; আর কয়েক বছর আগে ঠিক কোন জায়গাটায় তিনজন ইংরেজ মেম পানিতে ডুবে মারা গিয়েছিল। ‘ফিরিঙ্গি মেমদের একটা আলাদা দলই আছে যারা কেবল ডুবতে এই পানির মুলুকে আসে,’ তাই বলেছিল। ‘কখনো তারা সেটা জেনেশুনে আসে, কখনো আবার নিজেরাও জানে না, আমি কিন্তু বাপু গন্ধ শুঁকেই সেসব ঠিক মালুম করতে পারি। খোদায় মালুম কীসের বা কার ভয়ে তারা পানির তলায় লুকোতে যায়—কিন্তু আমার চোখকে ফাঁকি দিতে পারে না, বাবা!’ তাইয়ের হাসিটা, যা কিনা একসময় আদমের মধ্যেও সংক্রমিত হয়েছিল—একখানা বিশাল, গমগমে হাসি, যা ওই বুড়ো, জরাজীর্ণ শরীরটা থেকে ফেটে পড়লে কেমন যেন গা-ছমছম করত। অথচ আমার ওই পেল্লাই চেহারার দাদুর মুখে সেটাই আবার এতখানি সহজ স্বাভাবিক মানিয়ে যেত যে, পরবর্তীকালে কেউ টেরই পায়নি যে হাসিটা আসলে তাঁর নিজের নয় (আমার হানিফ মামা এই হাসিটার উত্তরাধিকার পেয়েছিলেন; তিনি মারা যাওয়ার আগে পর্যন্ত, বম্বে শহরে তাইয়ের একটা টুকরো যেন বেঁচেবর্তে ছিল)। আর হ্যাঁ, এই তাইয়ের কাছ থেকেই আমার দাদু নাক সম্পর্কেও অনেক কিছু শুনেছিলেন।
   তাই তার বাঁ দিকের নাকের পাটায় আলতো টোকা দিল। ‘এটা কী জানো, নাক্কু? এটাই হলো সেই জায়গা যেখানে বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে তোমার ভেতরের দুনিয়াটার মোলাকাত হয়। যদি তাদের মধ্যে বনিবনা না হয়, তবে তুমি ঠিক এখানটায় টের পাবে। তখন তুমি অপ্রস্তুত হয়ে নাকের সুড়সুড়িটা তাড়ানোর জন্য নাক ঘষতে থাকবে। ওইরকম একখানা নাক পাওয়াটা কিন্তু তোমার নেহাত কম সৌভাগ্যের ব্যাপার নয়, ওরে আমার বোকা ছেলে। আমি বলি কী: নিজের নাকের ওপর ভরসা করতে শেখ। ও যখন তোমাকে সাবধান করবে, তখন সামলে চলবে, হুঁশিয়ার হবে, নইলে একেবারে শেষ হয়ে যাবে। নিজের নাকের ইশারা ধরে চললে তুমি জীবনে অনেক দূর যাবে।’ সে গলা খাঁকারি দিল। তার চোখদুটো যেন প্রাচীন সেই পাহাড়গুলোর দিকে ঘুরে গেল। আজিজও খড়ের গাদার ওপর ফের জুত করে বসল। ‘একবার এক অফিসারকে চিনতাম—সেই যে মহান ইসকান্দার, তাঁর সেনাবাহিনীতে ছিল। তার নামধাম কী সেসব ছাড়ো। তোমার নাকটার মতোই একটা আস্ত সবজি যেন তারও দুই চোখের মাঝখান থেকে ঝুলত। গান্ধারের কাছে যখন ফৌজ থামল, ব্যাটা প্রেমে পড়ল এক ছেনাল ছুঁড়ির। আর সঙ্গে সঙ্গেই তার নাকে শুরু হল ভয়ংকর চুলকুনি। সে ক্রমাগত চুলকোয়, কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয় না। ইউক্যালিপটাস পাতা সেদ্ধ করে থেঁতলে তার ভাপ নিল। তাতেও কিচ্ছু হল না, বাব্বা! চুলকুনিতে সে পাগল হওয়ার জোগাড়; কিন্তু হতভাগাটা গোঁ ধরে বসে রইল। ফৌজ তার দেশে ফিরে গেল, কিন্তু সে তার ওই ছোট্ট ডাইনিটার সঙ্গেই থেকে গেল। শেষমেশ সে হয়ে দাঁড়াল—কী আর বলব?—একটা আস্ত অপদার্থ, না ঘরের না ঘাটের, একটা খিচুড়ি মার্কা জিনিস, সঙ্গে এক ঘ্যানঘেনে বউ আর নাকে সেই চুলকুনি। আর শেষে একদিন নিজের তলোয়ারটা সটান নিজের পেটেই ঢুকিয়ে দিল। বল দেখি, এই গল্প শুনে তুমি কী বুঝলে?’
   ...১৯১৫ সালের ডাক্তার আজিজ, যাঁকে কিনা এই হিরে-জহরতের কারবার একরকম না-ঘরকা-না-ঘাটকা বানিয়ে ছেড়েছে, তাইকে হাঁক-মারা দূরত্বের মধ্যে ঢুকতে দেখেই তাঁর ঠিক ওই গপ্পোটার কথা মনে পড়ে গেল। তাঁর নাকটা তখনও চুলকেই চলেছে। তিনি নাক ডললেন, কাঁধ ঝাঁকালেন, মাথাটা একবার ঝেঁকে নিলেন; আর ঠিক তখনই তাই চিৎকার করে উঠল:
    ‘ওহে! ডাক্তার সাব! জমিদার ঘানির বেটির ভারী অসুখ।’
    খবরটা ভেসে এল বড়ই রূঢ়ভাবে—হ্রদের এপার থেকে ওপারে রীতিমতো সটান হাঁক, একেবারে বেমক্কা! কোনো ভণিতা ছাড়াই কথাটা সে বলে বসল, অথচ মাঝি আর তার ওই সাগরেদের পাক্কা পাঁচ বছর পর দেখা হলো। মেয়েমানুষের মতো তার ঠোঁটজোড়া দিয়ে সে কথাটা উচ্চারণ করল বটে, কিন্তু তাতে এতদিন পর দেখা হওয়ার ‘আরে… কতদিন বাদে দেখা!’ গোছের এক চিলতে হাসিমুখের কোনো অভিবাদন লেগে ছিল না। আর এই বার্তাটাই যেন সময়কে এক দ্রুত, ঘূর্ণায়মান, অস্পষ্ট উত্তেজনার আবর্তে ছুঁড়ে দিল...

পূর্ববর্তী পর্ব পড়ুন এখানে: [মধ্যরাতের সন্তানেরা]

মধ্যরাতের সন্তানেরা
সালমান রুশদি
অনুবাদ: দীপ মন্ডল


মন্তব্য

অনুবাদ আত্মজীবনী আর্ট-গ্যালারী আলোকচিত্র ই-বুক ইচক দুয়েন্দে ইশতেহার উৎপলকুমার বসু উপন্যাস ঋত্বিক-ঘটক কবিতা কবিতায় কুড়িগ্রাম কর্মকাণ্ড কার্ল মার্ক্স গল্প গিন্সবার্গ চার্লস বুকাওস্কি ছড়া জার্নাল জীবনী দশকথা দিনলিপি পাণ্ডুলিপি পুনঃপ্রকাশ পোয়েটিক ফিকশন প্রতিবাদ প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা প্রবন্ধ প্রিন্ট সংখ্যা বই বর্ষা সংখ্যা বসন্ত বিক্রয়বিভাগ বিবিধ বিবৃতি বিশেষ বুলেটিন বৈশাখ ভাষা-সিরিজ ভিডিও মাসুমুল আলম মুক্তগদ্য মে দিবস যুগপূর্তি রিভিউ লকডাউন শম্ভু রক্ষিত শাহেদ শাফায়েত শিশুতোষ সন্দীপ দত্ত সম্পাদকীয় সাক্ষাৎকার সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ সৈয়দ সাখাওয়াৎ স্মৃতিকথা হেমন্ত
নাম

অনুবাদ,62,আত্মজীবনী,27,আর্ট-গ্যালারী,2,আলোকচিত্র,1,ই-বুক,7,ইচক দুয়েন্দে,23,ইশতেহার,2,উৎপলকুমার বসু,26,উপন্যাস,3,ঋত্বিক-ঘটক,4,কবিতা,348,কবিতায় কুড়িগ্রাম,7,কর্মকাণ্ড,17,কার্ল মার্ক্স,1,গল্প,85,গিন্সবার্গ,2,চার্লস বুকাওস্কি,40,ছড়া,1,জার্নাল,6,জীবনী,7,দশকথা,25,দিনলিপি,1,পাণ্ডুলিপি,11,পুনঃপ্রকাশ,23,পোয়েটিক ফিকশন,1,প্রতিবাদ,1,প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা,4,প্রবন্ধ,191,প্রিন্ট সংখ্যা,5,বই,4,বর্ষা সংখ্যা,1,বসন্ত,15,বিক্রয়বিভাগ,21,বিবিধ,3,বিবৃতি,1,বিশেষ,26,বুলেটিন,4,বৈশাখ,1,ভাষা-সিরিজ,5,ভিডিও,1,মাসুমুল আলম,35,মুক্তগদ্য,45,মে দিবস,1,যুগপূর্তি,6,রিভিউ,5,লকডাউন,2,শম্ভু রক্ষিত,2,শাহেদ শাফায়েত,25,শিশুতোষ,1,সন্দীপ দত্ত,14,সম্পাদকীয়,20,সাক্ষাৎকার,25,সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ,18,সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ,55,সৈয়দ সাখাওয়াৎ,33,স্মৃতিকথা,15,হেমন্ত,1,
ltr
item
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন: সালমান রুশদির মিডনাইটস চিলড্রেন (পর্ব ২) • বাংলা অনুবাদ: দীপ মন্ডল
সালমান রুশদির মিডনাইটস চিলড্রেন (পর্ব ২) • বাংলা অনুবাদ: দীপ মন্ডল
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEgeRgp7MV3MVjqdWQPggKmrClfDaNWkTe904uIJl0sgQrdxlrfbiRislYW-ZvIBYZwiH1DRyUuKu7h9sjp1t6n5ZK7LCabxeNkcRaAu3lEsXyiE3ArUMz-1EWiStFZ4cm_O5bNsMWBk9mwLwPtNZ6aW8c0AgehsYz0lXOZ-0CG68AgShSTQkWU-wGvxrHs/s1600/%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%A1%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%9F%E0%A6%B8%20%E0%A6%9A%E0%A6%BF%E0%A6%B2%E0%A6%A1%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%A8%20%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A8%20%E0%A6%B0%E0%A7%81%E0%A6%B6%E0%A6%A6%E0%A6%BF%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%81%20%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%9F%E0%A6%B2%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%97.png
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEgeRgp7MV3MVjqdWQPggKmrClfDaNWkTe904uIJl0sgQrdxlrfbiRislYW-ZvIBYZwiH1DRyUuKu7h9sjp1t6n5ZK7LCabxeNkcRaAu3lEsXyiE3ArUMz-1EWiStFZ4cm_O5bNsMWBk9mwLwPtNZ6aW8c0AgehsYz0lXOZ-0CG68AgShSTQkWU-wGvxrHs/s72-c/%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%A1%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%9F%E0%A6%B8%20%E0%A6%9A%E0%A6%BF%E0%A6%B2%E0%A6%A1%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%A8%20%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A8%20%E0%A6%B0%E0%A7%81%E0%A6%B6%E0%A6%A6%E0%A6%BF%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%81%20%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%9F%E0%A6%B2%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%97.png
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন
https://www.bindumag.com/2026/07/midnights-children-2.html
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/2026/07/midnights-children-2.html
true
121332834233322352
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts আরো Readmore উত্তর Cancel reply মুছুন By নী PAGES POSTS আরো এই লেখাগুলিও পড়ুন... বিষয় ARCHIVE SEARCH সব লেখা কোন রচনায় খুঁজে পাওয়া গেল না নীড় Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share to a social network STEP 2: Click the link on your social network Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy