পুস্তক ১ • অধ্যায় ৩ • পর্ব ২
পিকদানিতে আঘাত কর
Hit-the-Spittonএকখানা ছাতা-পড়া পুরোনো ছবির কথা মনে পড়ে যাচ্ছে (হয়তো সেই একই গোবর-গণেশ ফোটোগ্রাফারেরই কীর্তি, ওই প্রমাণ-সাইজের ছবিগুলোর চক্করে যার জানটাই কিনা প্রায় যেতে বসেছিল): আশাবাদের জ্বরে একেবারে টগবগ করতে থাকা আদম আজিজ বছর ষাটেক বয়সি এক ভদ্রলোকের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন, লোকটা ভারী অধৈর্য, ছটফটে গোছের, আর তার কপালের ওপর দয়ামায়া-মাখানো একটা কাটা দাগের মতো একগোছা সাদা চুল এসে পড়েছে। ইনিই হলেন মিঞা আবদুল্লা, সেই হামিংবার্ড। (‘দেখছেন তো ডাক্তারসাহেব, আমি নিজেকে বেশ ফিটফাটই রাখি। আপনি আমার পেটে একটা ঘুসি কষাতে চান নাকি? মেরে দেখুন না, মেরে দেখুন। আমি একেবারে টিপটপ আছি।’ ... ছবিতে অবশ্য ঢিলেঢালা সাদা শার্টের ভাঁজ তাঁর পেটটাকে ঢেকে রেখেছে, আর আমার দাদুর মুঠিটাও ঠিক পাকানো নেই, বরং ওই সাবেক বাজিগরের হাতের মধ্যেই কেমন যেন সেঁধিয়ে গেছে।) আর তাঁদের ঠিক পেছনেই, বেশ প্রসন্ন চোখে তাকিয়ে আছেন ‘কুছ নহীনের রানি’, যাঁর গায়ে তখন একটু একটু করে সাদা ছোপ ধরতে শুরু করেছে, সে এমন এক ব্যারাম যা কিনা পরে ইতিহাসের পাতাতেও চুঁইয়ে ঢুকেছিল আর স্বাধীনতার ঠিক পরপরই রীতিমতো মহামারির আকার নিয়েছিল… ‘আমি হলাম গিয়ে একটা আস্ত শিকার,’ ছবির ওই অনড় ঠোঁটের ফাঁক দিয়েই রানি যেন ফিসফিস করে বলে ওঠেন, ‘আমার এই যে নানা-সংস্কৃতি মেলানোর বাতিক, আমি তারই এক হতভাগ্য শিকার। আমার চামড়াটা হলো আমার ভেতরের ওই আন্তর্জাতিক সত্তাটারই একটা বাইরের রূপ।’ হ্যাঁ, এই ছবিটার ভেতরেও দিব্যি কথাবার্তা চলছে, ঠিক যেমন ওস্তাদ ভেন্ট্রিলোকুইস্টদের মতো ওই আশাবাদীরা তাদের নেতার সঙ্গে এসে দেখা করছে। রানির পাশেই—এবার একটু কান খাড়া করে শুনুন; কারণ ইতিহাস আর বংশতালিকা এবার একেবারে মুখোমুখি হতে চলেছে!—দাঁড়িয়ে আছে এক অদ্ভুত গোছের লোক, পেলব আর নাদুসনুদুস চেহারা, চোখদুটো যেন মজে-যাওয়া পুকুর, আর কবিদের মতো লম্বা লম্বা চুল। নাদির খান, হামিংবার্ডের পার্সোনাল সেক্রেটারি। ক্যামেরার ক্লিকে তাঁর পা-দুটো যদি ওইভাবে জমে না যেত, তাহলে হয়তো লজ্জায়-অস্বস্তিতে তিনি ওই জায়গায় দাঁড়িয়েই একটু উসখুস করতেন। ওই বোকা-বোকা আড়ষ্ট হাসির ফাঁক দিয়েই সে বিড়বিড় করে: ‘ইয়ে, কথাটা মিথ্যে নয়; আমি কিছু পদ্য-টদ্য লিখেছি বটে…’ আর ঠিক তখনই মিঞা আবদুল্লা কথার মাঝখানে বাগড়া দিয়ে ওঠেন ও তাঁর ওই ছুঁচোলো দাঁত-বের-করা হাঁ-মুখ দিয়ে রীতিমতো বাজখাঁই গলায় বলে ওঠেন: ‘কিন্তু সে-সব কী পদ্য মশাই! পাতার পর পাতা উলটে গেলেও কোথাও একটু অন্ত্যমিলের দেখা মিলবে না!...’ অন্যদিকে রানি, ভারী মোলায়েম সুরে বলেন: ‘আধুনিক, তাই তো?’ আর নাদির, বেশ লাজুক মুখ করে বলে: ‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’ এই স্থির, নিশ্চল দৃশ্যটার ভেতর এখন কী সাঙ্ঘাতিক একটা চাপা উত্তেজনা! কী ভীষণ একটা কাঁটায়-কাঁটায়-ঠোকাঠুকি-লাগা রসিকতা, যখন হামিংবার্ড বলে ওঠেন: ‘যাক্ গে, ওসব নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই; শিল্পের কাজ হলো মানুষের মনটাকে ওপরের দিকে তুলে ধরা; আমাদের ওই মহান সাহিত্যের ঐতিহ্যের কথা মনে করিয়ে দেওয়া!’... আর ওটা কি একটা ছায়া, নাকি তাঁর সেক্রেটারির কপালের ভাঁজ?... ওই ফিকে হয়ে আসা ছবিটার ভেতর থেকে নাদিরের গলা খুব, খুব নিচু স্বরে ভেসে এল: ‘আমি ওইসব উঁচুদরের শিল্পে-টিল্পে বিশ্বাস করি না, মিঞা সাহেব। এখন শিল্পকে ওইসব ঘরানার বেড়া টপকে যেতে হবে; আমার কবিতা আর—ওই ধরুন—পিকদানিতে-পিক-ফেলার খেলা, এই দুটোই একরকম।’... তাই এবার রানি, এমনিতে তিনি বড্ড দয়াময়ী নারী, রসিকতা করে ওঠেন, ‘বেশ তো, তাহলে আমি নাহয় একটা ঘর আলাদা করেই রাখব; ওই পান-খাওয়া আর পিকদানিতে-পিক-ফেলার জন্য। আমার কাছে লাপিস লাজুলি বসানো ভারী চমৎকার একটা রুপোর পিকদানি আছে, আপনাদের সবাইকে কিন্তু ওখানে এসে হাত পাকাতে হবে। বেয়াড়া পিকের ছোপে দেওয়ালগুলো নাহয় একটু লালই হলো! অন্তত সেগুলোতে কোনো খাদ তো থাকবে না।’ ছবিটার কথা এবার ফুরিয়ে এল; এখন আমার মনের চোখ দিয়ে আমি বেশ দেখতে পাচ্ছি, এতক্ষণ ধরে হামিংবার্ড একদৃষ্টে ওই দরজার দিকেই তাকিয়ে ছিলেন, যেটা কিনা আমার দাদুর কাঁধ ছাড়িয়ে একেবারে ছবিটার কিনারায় গিয়ে পড়েছে। ওই দরজার ওপাশ থেকে ইতিহাস ডাক দিচ্ছে। হামিংবার্ড সেখান থেকে পালানোর জন্য একেবারে উসখুস করছেন... কিন্তু তিনি আমাদের সঙ্গেই ছিলেন, আর তাঁর এই থাকাটা আমাদের কাছে এমন দুটো সুতো এনে দিয়েছে যা আমার জীবনের শেষ দিন অবধি আমার পিছু ছাড়বে না: একটা সুতো গিয়ে পৌঁছোয় সেই জাদুকরদের বস্তিতে; আর অন্য সুতোটা বলে সেই অন্ত্যমিল আর ক্রিয়াপদহীন কবি নাদির আর একখানা মহামূল্যবান রুপোর পিকদানির গল্প।
‘কী সব বাজে বকছ,’ আমাদের পদ্মা বলে ওঠে। ‘ছবি আবার কথা কয় নাকি? থামো দিকি বাপু; তোমার মাথাটা বোধহয় ক্লান্তিতে আর কাজ করছে না।’ কিন্তু আমি যখন ওকে বলি যে মিঞা আবদুল্লার একটা ভারী অদ্ভুত বাতিক ছিল, একটানা গুনগুন করার বাতিক—এমন অদ্ভুত একটা গুনগুনানি, যা কিনা সুরেলাও নয় আবার বেসুরোও নয়, বরং কেমন যেন একটা যান্ত্রিক ব্যাপার, ঠিক যেন কোনো ইঞ্জিন বা ডায়নামোর আওয়াজ,—তখন সে কথাটা দিব্যি হজম করে নেয়, আর বেশ বিচক্ষণভাবে বলে ওঠে, ‘তা, উনি যদি অমন চনমনে একজন মানুষ হয়ে থাকেন, তবে ওতে আর অবাক হবার কী আছে।’ মেয়েটা আবার কান খাড়া করে বসেছে; তাই আমিও গল্পের মেজাজে ফিরে গিয়ে উত্তেজিত হয়ে ওকে বলি যে মিঞা আবদুল্লার ওই গুনগুনানিটা তাঁর কাজের তোড়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ত আর কমত। সে আওয়াজ যখন খাদে নামত, এমন খাদে নামত যে দাঁত পর্যন্ত কনকন করে উঠত, আবার সেটা যখন চড়তে চড়তে একেবারে উত্তুঙ্গ পর্দায় উঠত, তাতে আশেপাশে যে থাকত তার শরীরের… মানে… পুরুষাঙ্গে উত্তেজনা জাগিয়ে তোলার ক্ষমতা থাকত। (‘আরে বাপ রে,’ পদ্মা হেসে গড়িয়ে পড়ে, ‘তাই তো বলি মরদদের মধ্যে লোকটার এত খাতির কেন!’) সেক্রেটারি হওয়ার সুবাদে, নাদির খান তাঁর মনিবের এই কম্পন-বাতিকের চোটে সমানে নাজেহাল হতেন, আর তাঁর কান, চোয়াল, পুরুষাঙ্গ যেন চিরকাল ওই হামিংবার্ডের মর্জিমাফিক হুকুম তামিল করে করে চলত। তাহলে, অচেনা লোকজনের সামনে অমন বেমক্কা উত্তেজনায় লজ্জায় পড়তে হওয়া সত্ত্বেও, মাড়ির দাঁতের ওই কনকনে ব্যথা আর দিনের চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় বাইশ ঘণ্টাই গাধার খাটুনি খাটা সত্ত্বেও, নাদির ওখানে পড়ে ছিলেন কেন? না—আমার অন্তত মনে হয় না কোনো ঘটনার একেবারে কেন্দ্রে পৌঁছে সেগুলোকে সাহিত্যে রূপ দেওয়াকেই তিনি কবির কর্তব্য বলে মনে করেছিলেন বলে, কিংবা এমনও নয় যে তিনি নিজের কোনো নামডাক চেয়েছিলেন। না: আসল কারণটা হলো, আমার দাদুর সঙ্গে নাদিরের একটা ব্যাপারে দারুণ মিল ছিল, আর সেটুকুই ছিল যথেষ্ট। তিনিও ওই আশাবাদের ব্যামোয় ভুগতেন।
আদম আজিজ আর কুচ নেহি-র রানির মতোই, নাদির খানও মুসলিম লিগকে দু-চক্ষে দেখতে পারতেন না। (‘যতসব তোষামুদো চামচার দল!’ রানি তাঁর সেই রুপোলি গলায় বলে উঠতেন, গলাটা যেন কোনো স্কিয়ারের মতো সুরের নানা পর্দায় সাঁই সাঁই করে ওঠানামা করছিল। ‘নিজেদের কায়েমি স্বার্থটুকু বজায় রাখতেই ব্যস্ত সব জমিদার আর জোতদারের দল! মুসলমানদের সঙ্গে এদের ছাই কীসের সম্পর্ক? কংগ্রেস যেহেতু সরকার গড়তে বেঁকে বসেছে, এরা সব ব্যাঙের মতো লাফাতে লাফাতে ব্রিটিশদের কাছে গিয়ে জুটেছে, আর তাদের হয়ে সরকার গড়তে বসেছে!’ সেটা ছিল ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের সময়। ‘তাছাড়া সবচেয়ে বড়ো কথা হলো,’ রানি একেবারে শেষ রায় দেওয়ার মতো উঠলেন, ‘ওরা সব আস্ত পাগল। নইলে কেউ কি আর এই দেশটাকে ভাগ করতে চায়?’)
মিঞা আবদুল্লা, সেই হামিংবার্ড, প্রায় একার হাতেই ফ্রি ইসলাম কনভোকেশন গড়ে তুলেছিলেন। লিগের লোকেদের ওই গোঁড়ামি আর আখের গোছানোর পালটা হিসেবে একটা ঢিলেঢালা জোট বা বিকল্প গড়ার জন্য, তিনি নানা ভাগে ভাগ হয়ে-যাওয়া ডজনখানেক মুসলমান গোষ্ঠীর নেতাদের একজোট হওয়ার ডাক দিয়েছিলেন। সে একখানা জব্বর ভেলকিই বটে, কারণ তারা সবাই সে-ডাকে সাড়া দিয়ে সত্যিই ছুটে এসেছিল। লাহোরে হওয়া সেই জমায়েতটাই ছিল প্রথম কনভোকেশন; আর দ্বিতীয়টা হতে চলেছিল আগ্রায়। কৃষকদের নানা আন্দোলনের কর্মী, শহরের মজুরদের সংগঠনের লোক, ধর্মপ্রাণ মানুষজন আর নানারকম আঞ্চলিক দলের লোকেদের ভিড়ে শামিয়ানাগুলোর তলা একেবারে গিজগিজ করবে। প্রথম সভা থেকে যে-ইঙ্গিতটা পাওয়া গেছিল, এই দ্বিতীয় সভা যেন সেটাতেই পাকাপাকি সিলমোহর দেবে: ভারতবর্ষকে ভাগ করার দাবি তুলে ওই লিগ আদপে কেবল নিজেদের স্বার্থেরই কথা বলছে, সাধারণ মানুষের হয়ে তারা টুঁ-শব্দটিও করছে না। কনভোকেশনের পোস্টারগুলোয় লেখা ছিল, ‘ওরা আমাদের দিকে পিঠ ফিরিয়ে দাঁড়িয়েছে, আর এখন কিনা দাবি করছে যে আমরা তাদের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছি!’ মিঞা আবদুল্লা ওই দেশভাগের ঘোরতর বিরোধী ছিলেন।
সেই সর্বনাশা আশাবাদের ঘোরে পড়েও, হামিংবার্ডের যিনি পৃষ্ঠপোষক, সেই কুচ নেহি-র রানি, দিগন্তে ঘনিয়ে ওঠা কালো মেঘের কথাটা একবারও মুখে আনলেন না। আগ্রা যে তখন মুসলিম লিগের একটা সাঙ্ঘাতিক শক্ত ঘাঁটি, সে-কথা তিনি কোনোদিন কাউকে মনে করিয়ে দেননি, স্রেফ বলতেন, ‘আদম বাছা, হামিংবার্ড যদি এখানেই কনভোকেশন করতে চায়, তাহলে আমি তাকে এলাহাবাদে যেতে বলার কে?’ সভার কানাকড়ি খরচও তিনি একাই টানছিলেন, কোনো নালাশ নেই, নাক-গলানো নেই; তবে এ-কথাও ঠিক যে, এর জেরে শহরে তাঁর শত্রুর সংখ্যাও নেহাত কম বাড়ছিল না। রানি কিন্তু আর পাঁচজন দেশীয় রাজরাজড়াদের মতো জীবন কাটাতেন না। তিতির-পাখি শিকারের বদলে তিনি বরং ছাত্রবৃত্তির ব্যবস্থা করতেন। হোটেলের কেলেঙ্কারিতে জড়ানোর বদলে তিনি মেতে থাকতেন রাজনীতি নিয়ে। আর ঠিক এ-সবের জেরেই শহরে গুজবের ডালপালা মেলতে শুরু করল। ‘আরে মশাই, তাঁর ওই বৃত্তি-পাওয়া ছাত্ররা, সবাই জানে তাদের সব বাড়তি কাজকম্মও করতে হয়। তারা অন্ধকারে তাঁর শোবার ঘরে যায়, আর তিনি কক্ষনো তাদের ওই ছোপ-ধরা মুখখানা দেখতে দেন না, কিন্তু ওই গান-গাওয়া ডাইনির মতো গলা দিয়ে জাদুমন্ত্র করে ওদের বিছানায় টেনে নেন!’ আদম আজিজ জীবনেও ওই ডাইনি-টাইনিতে বিশ্বাস করতেন না। তিনি বরং রানির ওই দুর্দান্ত বন্ধু-বান্ধবদের আসরটা বেশ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতেন, তাঁরা ফার্সিতে যেমন সড়গড়, জার্মান ভাষাতেও সমান চোস্ত। কিন্তু নাসিম আজিজ, যিনি রানির নামে রটা ওইসব গপ্পোগাছা খানিকটা হলেও বিশ্বাস করতেন, তিনি কোনোদিন স্বামীর সঙ্গে ওই রাজকন্যার বাড়িতে পা মাড়াননি। ‘খোদাতায়ালা যদি চাইতেন যে মানুষ হরেক রকম বুলিতে কথা বলুক,’ তিনি জোর গলায় যুক্তি দিতেন, ‘তাহলে তিনি আমাদের মুখে কেবল একটাই জিভ দিলেন কেন শুনি?’
এবং হলোও তাই, হামিংবার্ডের সেইসব আশাবাদী মানুষগুলোর কেউই আসন্ন সর্বনাশটির জন্য প্রস্তুত ছিল না। ওরা তখন পিকদানিকে নিশানা করে ঢিল ছোঁড়ার ছেলেমানুষি খেলায় মেতে ছিল, অথচ পায়ের নীচের মাটি যে একটু একটু করে ফাটল ধরছে, সেদিকে কারও কোনো ভ্রূক্ষেপই ছিল না।
মাঝে মাঝে কিংবদন্তিই সত্যি হয়ে দাঁড়ায়, আর তখন আসল সত্যিটার চেয়ে সেটাই ঢের বেশি কাজের হয়ে ওঠে। তা, সেই কিংবদন্তি অনুযায়ীই—মানে পানের দোকানের ওই বুড়োগুলোর মুখে মুখে মাজাঘষা রসালো গালগল্প অনুসারে আর কি—মিঞা আবদুল্লার সর্বনাশের মূলে ছিল আগ্রা রেলওয়ে স্টেশনে কেনা একটা ময়ূরের পালকের হাতপাখা। নাদির খান অবশ্য তাঁকে বেশ সাবধান করেছিলেন, এতে অমঙ্গল হতে পারে, কিন্তু কে শোনে কার কথা। তার ওপর আবার একফালি-চাঁদ-ওঠা ওই রাতে, আবদুল্লা নাদিরের সঙ্গেই কাজ করছিলেন, তাই নতুন চাঁদটা যখন আকাশে উঠল, তখন তাঁরা দুজনেই সেটাকে দেখেছিলেন একটা কাচের জানলার ভেতর দিয়ে। ‘এ-সবের কিন্তু মস্ত ভালা-বুরা মানে আছে,’ ওই পান-চিবোনো বুড়োগুলো বলে ওঠে। ‘আমরা তো আর দুনিয়ায় কম দিন কাটাইনি, আমরা ঠিক জানি।’ (পদ্মাও এই কথায় বেশ সায় দিয়ে মাথা নাড়ছে।)
ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসের ইতিহাস বিভাগের বাড়িটার একতলায় ছিল কনভোকেশনের দপ্তর। আবদুল্লা আর নাদির তাঁদের রাতের কাজকর্ম প্রায় গুটিয়ে এনেছেন; হামিংবার্ডের গুনগুন তখন একেবারে নিচু খাদে নেমে গেছে আর তার চোটে নাদিরের দাঁতগুলো রীতিমতো শিরশির করছে। অফিসের দেওয়ালে সাঁটা ছিল একটা পোস্টার, তাতে দেশভাগের বিরুদ্ধে আবদুল্লার সেই সবচেয়ে প্রিয় কথাখানা লেখা, কবি ইকবালের একটা উদ্ধৃতি: ‘এমন মুলুক মিলবে কোথা যা খোদার কাছেই ভিনদেশ?’ আর ঠিক সেই সময়েই গুপ্তঘাতকের দল এসে ক্যাম্পাসে ঢুকল।
এমনিতে আবদুল্লার দুশমনের কোনো অভাব ছিল না। ব্রিটিশরাও যে তাঁকে ঠিক কেমন চোখে দেখত, তা বলা মুশকিল; ভাবখানা বরাবরই ছিল ভারী ধোঁয়াটে। ব্রিগেডিয়ার ডডসন তো চাননি যে লোকটা শহরে থাকুক।
দরজায় একটা টোকা পড়ল, আর নাদির গিয়ে দরজাটা খুললেন। অমনি ঘরের ভেতর এসে ঢুকল ছ-ছটা নতুন চাঁদ—আপাদমস্তক কালো পোশাকে মোড়া আর মুখ-ঢাকা লোকগুলোর হাতে ধরা একফালি চাঁদের মতো ছ-খানা বাঁকা ছুরি। দুজন লোক নাদিরকে খপ করে চেপে ধরল, আর বাকিরা হামিংবার্ডের দিকে এগিয়ে গেল।
‘ঠিক এই সময়টায়,’ পান-চিবুনো বুড়োরা বলে, ‘হামিংবার্ডের গলার সেই গুনগুনানি চড়তে চড়তে একেবারে সপ্তমে উঠল। উঁচুতে, আরও উঁচুতে হে ইয়ার! আর তা শুনে খুনিগুলোর চোখ তো ছানাবড়া, আর তাদের আলখাল্লার নিচে তখন বিশেষ অঙ্গটি তাঁবুর মতো ফুলে উঠেছে। তারপর—ইয়া আল্লা, তারপর!—ছুরিগুলো সব গান গাইতে শুরু করল, আর আবদুল্লার গলাও পাল্লা দিয়ে চড়ল, এমন চড়া গুনগুনানি সে জন্মেও শোনায়নি। তার শরীরখানা ছিল একেবারে পাথরের মতো শক্ত, তাই ওই লম্বা বাঁকানো ফলাগুলো তাকে সহজে কাবু করতে পারছিল না; একখানা তো পাঁজরে লেগেই ভেঙে গেল, কিন্তু বাকিগুলো দেখতে দেখতে লাল রক্তে মাখামাখি হয়ে উঠল। কিন্তু এবার—শুনুন দিকি কাণ্ডটা! আবদুল্লার সেই গুনগুনানি চড়তে চড়তে মানুষের কানে শোনার সীমানা ছাড়িয়ে গেল, আর সেই ডাক গিয়ে পৌঁছোল শহরের কুকুরগুলোর কানে। আগ্রায় ওই ধরো গিয়ে হাজার আটেক চারশো কুড়িটা মতো নেড়ি কুত্তা আছে। সেই রাতে, কেউ হয়তো খাচ্ছিল, কেউ-বা আবার ধুঁকতে ধুঁকতে মরছিল; কেউ কেউ ফুর্তিতে ছিল আর কেউ বা ওই ডাক শুনতে পায়নি। ওই ধরো হাজার দুয়েক বাদ দিলে, বাকি রইল গিয়ে ছ’হাজার চারশো কুড়িটা কুত্তা—আর এরা সব্বাই একযোগে ঘুরে সোজা ইউনিভার্সিটির দিকে ছুট লাগাল। অনেকেই আবার শহরের উল্টোদিক থেকে রেললাইন টপকে ধেয়ে এল। এ-কথা যে খাঁটি সত্যি, তা সকলেরই বিলকুল জানা। শহরের যারাই জেগে ছিল, সব্বাই দেখেছে, কেবল যারা অঘোরে ঘুমোচ্ছিল তারা ছাড়া। তারা এক দঙ্গল ফৌজের মতো রীতিমতো শোরগোল করতে করতে এগিয়েছিল, আর তাদের যাওয়ার পথে পড়ে রইল হাড়গোড়, বিষ্ঠা আর লোমের দলা... আর তখন সমানে আবদুল্লাজি গুনগুন করেই চলেছেন, গুনগুন-গুনগুন, ওদিকে ছুরিগুলোও গান গাইছে। আর একটা কথা জেনে রাখো: আচমকা ওই খুনিগুলোর একটার চোখ ফট করে ফেটে গিয়ে কোটর থেকে খসে পড়ল। পরে কার্পেটের ওপর কাচের টুকরো পাওয়া গেছিল, একেবারে পিষে মিশে ছিল!’
লোকে বলে, ‘কুকুরগুলো যখন এসে পড়ল, আবদুল্লা তখন প্রায় মরণাপন্ন আর ছুরিগুলো একেবারে ভোঁতা হয়ে এসেছে... ওরা এল, বুনো জন্তুর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল, জানলা টপকে হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকল, যে-জানলায় তখন আর এক টুকরো কাচও আস্ত ছিল না, কারণ আবদুল্লার ওই গুনগুনের চোটেই ওগুলো আগেই চুরমার হয়ে গেছিল... কাঠখানা মড়মড় করে ভেঙে না-পড়া পর্যন্ত তারা দরজার ওপর সপাটে ধাক্কা মারতে লাগল... আর তারপর, দেখতে না দেখতেই তারা যেন সারা ঘরময় গিজগিজ করতে লাগল, বাবা!... তাদের কারও-বা খোঁড়া পা, কারও গায়ে লোম অবধি নেই, তবে তাদের বেশিরভাগেরই মুখে অন্তত গোটাকতক দাঁত টিকে ছিল, আর সেগুলোর কয়েকটা আবার রীতিমতো সুচালো আর ধারালো...
আর এবার কাণ্ডটা একবার ভেবে দেখুন: ওই গুপ্তঘাতকের দল হয়তো স্বপ্নেও ভাবেনি যে কেউ তাদের বাগড়া দিতে পারে, তাই তারা বাইরে কোনো পাহারাদারই মোতায়েন রাখেনি; কাজেই কুকুরগুলো তাদের ওপর একেবারে আচমকাই চড়াও হলো... ওই মেরুদণ্ডহীন ভীতু লোকটা, মানে নাদির খানকে যে-দুজন লোক চেপে ধরেছিল, জানোয়ারগুলোর ভারে তারা টাল সামলাতে না পেরে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল, আর অমনি হয়তো আটষট্টিটা কুকুর তাদের ঘাড়ের ওপর সটান লাফিয়ে পড়ল... এরপর খুনিগুলোর চেহারা এমন সাঙ্ঘাতিকভাবে ফালাফালা হয়ে গেছিল যে তারা আসলে কে, তা আর কারও চেনারই জো ছিল না।’
‘কোনো এক ফাঁকে,’ ওরা বলে ওঠে, ‘নাদির জানলা গলে সটান এক লাফ মেরে দৌড় লাগাল। ওদিকে কুকুর আর গুপ্তঘাতকের দল তখন নিজেদের লড়াই নিয়ে এতটাই ব্যতিব্যস্ত যে তার পিছু নেওয়ার ফুরসতই পেল না।’
কুকুর? গুপ্তঘাতক? ... আমার কথায় বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি? বেশ তো নিজেই একবার যাচাই করে দেখুন না। মিঞা আবদুল্লা আর তাঁর ওই কনভোকেশনগুলোর ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়ে দেখুন। খুঁজে দেখুন কীভাবে আমরা তাঁর জীবনের গল্পটাকে ধামাচাপা দিয়ে কার্পেটের তলায় লুকিয়ে ফেলেছি... আর তারপর আমাকে অন্তত এই গল্পটা শোনাতে দিন, যে কীভাবে তাঁর শাগরেদ নাদির খান, আমাদের বাড়ির কার্পেটের তলায় পাক্কা তিন-তিনটে বছর ঘাপটি মেরে কাটিয়ে দিয়েছিল।
এককালে ছোকরা বয়সে নাদির খান এক চিত্রকরের সঙ্গে ঘর ভাড়া করে থাকত। সেই শিল্পীর আঁকা ক্যানভাসগুলো দিনে দিনে কেবলই পেল্লায় থেকে আরও পেল্লায় হয়ে উঠত, কারণ সে চাইত গোটা জীবনটাকেই তার ওই শিল্পের ফ্রেমে এঁটে ফেলতে। ‘আমার দিকে চেয়ে দ্যাখো একবার,’ আত্মঘাতী হওয়ার ঠিক আগে লোকটা বলেছিল, ‘আমি হতে চেয়েছিলাম মিনিয়েচার বা ওই সূক্ষ্ম ক্ষুদে ছবির শিল্পী, আর তার বদলে আমার ভাগ্যে কিনা জুটল গোদ বা হাতির-পায়ের ব্যামো!’ একফালি-চাঁদের মতো ওই বাঁকা ছুরির রাতের সেই বীভৎস, ফুলে-ফেঁপে ওঠা ঘটনাগুলো নাদির খানকে তার ওই পুরোনো রুমমেটের কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছিল, কারণ জীবন আরও একবার, ভারী বেয়াড়াভাবেই, তার নিজের স্বাভাবিক মাপে আটকে থাকতে বেঁকে বসেছিল সে। গোটা ব্যাপারটা বড্ড বেশি যাত্রাপালার মতো নাটুকে হয়ে উঠেছিল: আর তাতেই বেচারার সাঙ্ঘাতিক অস্বস্তি হচ্ছিল।
রাতের ওই শুনশান শহরের বুক চিরে নাদির খান ঠিক কীভাবে ছুটে পালাল অথচ সে কারও নজরে পড়ল না, কে জানে! আমার অন্তত মনে হয়, এর পেছনের আসল কারণটা হলো তার ওই আজেবাজে পদ্য লেখা। এমন একজন বাজে কবি হিসেবে সে তো জন্ম থেকেই ওই টিকে-থাকার-লড়াইয়ে একেবারে ওস্তাদ! দৌড়োনোর সময়টায় তাঁর ভেতরে ভেতরে একটা অদ্ভুত অস্বস্তি আর আড়ষ্টতা কাজ করছিল, তাঁর শরীরটা যেন নিজের এমন উদ্ভট আচরণের জন্য বারবার ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছিল, যেন সে রেলওয়ে স্টেশনে হকারদের বেচা কোনো সস্তা থ্রিলার উপন্যাসের পাতায় ঢুকে পড়েছে। কিংবা ওই যে, সবুজ রঙের কোনো অব্যর্থ ওষুধের বোতলের সঙ্গে যে-বইগুলো মাগনায় বিলোনো হয়, যা খেলে কিনা সর্দি-কাশি, টাইফয়েড, পুরুষত্বহীনতা, বাড়ির জন্য মন-কেমন-করা এমনকী কপালের দারিদ্র্য অবধি সেরে যায়, এ যেন ঠিক সেরকমই একটা সস্তা রোমাঞ্চ… কর্নওয়ালিস রোডে রাতটা তখন বেশ গুমোট। রিকশা-দাঁড়ানোর ফাঁকা জায়গাটার পাশেই আগুন পোহানোর একটা কয়লার মালসা একেবারে নিভে খালি পড়ে ছিল। পানের দোকানটায় তালা ঝুলছে আর সেই বুড়োগুলো সব ছাদের ওপর দিব্যি অঘোরে ঘুমোচ্ছে, আর স্বপ্নে দেখছে তাদের কালকের সেই পিক-ফেলার খেলা। ঘুম-না-আসা এক গাইগোরু, রেড অ্যান্ড হোয়াইট সিগারেটের একটা প্যাকেট আপনমনে চিবোতে চিবোতে, রাস্তার ওপর পুঁটুলি পাকিয়ে ঘুমিয়ে-থাকা এক ভিখিরির পাশ দিয়ে হেলেদুলে হেঁটে গেল। যার সোজা মানে হলো, লোকটা পরদিন সকালে দিব্যি জ্যান্তই জেগে উঠবে, কারণ কোনো মানুষ একেবারে মরতে না-বসলে একটা গোরু কখনোই ঘুমন্ত লোকের দিকে ফিরেও তাকায় না। মরণাপন্ন হলে তবেই তারা চিন্তিতভাবে লোকটার গায়ে নাক ঘষে শুঁকে দেখে। এই পবিত্র গোরুদের কাছে ফেলনা কিছু নেই, তারা সবই খায়।
অন্ধ ঘানি সাহেবের যৌতুক আর রত্নের দোকানগুলোর লাভের টাকায় কেনা আমার দাদুর সেই পেল্লায় পুরোনো পাথরের বাড়িটা, রাস্তা থেকে বেশ খানিকটা সম্ভ্রম-জাগানো দূরত্ব বজায় রেখে অন্ধকারের ভেতর চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। বাড়ির পেছনের দিকে ছিল পাঁচিল-তোলা একটা বাগান, আর বাগানের দরজার ঠিক পাশেই নিচু চালের একটা বাইরের ঘর বা আউটহাউস, যেটা নামমাত্র ভাড়ায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল বুড়ো হামদর্দ আর তার রিকশাওয়ালা ছেলে রাশিদের পরিবারকে। ওই ঘরটার সামনেই ছিল গোরুতে-টানা জল তোলার চাকা-লাগানো একটা কুয়ো, যেখান থেকে সেচের নালাগুলো সোজা নেমে গেছিল ছোট্ট একটা ভুট্টাখেতের দিকে। সেই খেতটা আবার বাড়িটার গা ঘেঁষে কর্নওয়ালিস রোডের ধারের সীমানা-পাঁচিলের সদর দরজা অবধি ছড়ানো ছিল। বাড়ি আর খেতের ঠিক মাঝখান দিয়ে পথচারী আর রিকশা চলাচলের জন্য একটা সরু গলি চলে গেছিল। আগ্রা শহরে তখন সদ্যই সাইকেল-রিকশার চল শুরু হয়েছে, আর তা ওই কাঠের জোয়াল কাঁধে মানুষের-টানা রিকশাগুলোর জায়গা একটু একটু করে দখল করে নিচ্ছে। ঘোড়ায়-টানা টাঙ্গাগাড়িগুলোর কদর তখনও একেবারে ফুরোয়নি বটে, তবে দিনে দিনে তা বেশ কমে আসছিল... নাদির খান সদর দরজা দিয়ে মাথা নিচু করে ভেতরে ঢুকলেন, সীমানার পাঁচিলে পিঠ ঠেকিয়ে এক মুহূর্তের জন্য উবু হয়ে বসলেন, আর তারপর প্রস্রাব করতে গিয়ে লজ্জায় একেবারে লাল হয়ে উঠলেন। এরপর, নিজের এমন একটা অসভ্য কাজের সিদ্ধান্তে নিজেই যেন কেমন তিতিবিরক্ত হয়ে, তিনি সোজা ভুট্টাখেতের দিকে ছুট লাগালেন আর তার ভেতর সেঁধিয়ে গেলেন। রোদে-শুকিয়ে-যাওয়া ডাঁটাগুলোর আড়ালে নিজেকে খানিকটা লুকিয়ে, তিনি একেবারে মায়ের পেটে থাকা শিশুর মতো গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়লেন।
রিকশাওয়ালা ছোকরা রাশিদের বয়স তখন সতেরো। সিনেমা দেখে বাড়ি ফিরছিল সে। সেদিন সকালেই তার চোখে পড়েছিল, দুজন লোক নিচু মতো একটা ঠেলাগাড়ি ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে, তাতে পিঠোপিঠি লাগানো দুটো হাতে-আঁকা বিশাল পোস্টার খাড়া করা। নতুন সিনেমা গাই-ওয়ালা-র বিজ্ঞাপন। রশিদের সবচেয়ে প্রিয় হিরো দেব-এর ছবি। দিল্লিতে পঞ্চাশ সপ্তাহের ফাটাফাটি সাফল্যের পর! বম্বেতে তেষট্টি সপ্তাহ ধরে বাজিমাত করে! সোজা আপনার আপনাদের শহরে! পোস্টারগুলো যেন একেবারে চেঁচিয়ে এ-কথাই বলছিল। তুমুল হইচই-ফেলা দ্বিতীয় বর্ষ! ছবিটা ছিল আসলে প্রাচ্যের পটভূমিতে বানানো একটা ওয়েস্টার্ন বা কাউবয় ছবি। হিরো দেব, এমনিতে ছিপছিপে না হলেও, একাই মাইলের পর মাইল চষে বেড়ায়। জায়গাটা দেখতে ঠিক যেন ওই সিন্ধু-গাঙ্গেয় সমভূমির মতোই। গাই-ওয়ালা মানে হলো গোরুর-রক্ষক, আর দেব এতে এমন একজনের চরিত্রে অভিনয় করেছিল যে কিনা একাই গোরুদের প্রাণ বাঁচাতে রীতিমতো পাহারাদার হয়ে ওঠে। একেবারে একা হাতে! আর দোনলা বন্দুক উঁচিয়ে!, সে মাইলের পর মাইল জুড়ে কসাইখানার দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া গোরুর পালগুলোর পিছু নিত, আর ওই গোরু-পাচারকারীদের একেবারে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে পবিত্র গবাদি পশুগুলোকে উদ্ধার করত। (ছবিটা বানানোই হয়েছিল হিন্দু দর্শকদের কথা মাথায় রেখে; দিল্লিতে এটা নিয়ে রীতিমতো দাঙ্গা বেঁধে গেছিল। মুসলিম লিগের লোকেরা ঠিক ওই সিনেমা হলগুলোর সামনে দিয়েই গোরুগুলোকে জবাই করার জন্য তাড়িয়ে নিয়ে গেছিল, আর তার জেরে ক্ষিপ্ত জনতা তাদের ওপর চড়াও হয়েছিল।) ছবির নাচ-গানগুলো খাসা ছিল, আর তাতে ভারী সুন্দর এক বাইজি ছিল, যাকে কিনা ওই দশ-গ্যালন মাপের পেল্লায় কাউবয় টুপিটা পরিয়ে নাচতে বাধ্য না করলে দেখতে আরও ঢের বেশি ভালো লাগত। সামনের দিকের একটা বেঞ্চে বসে রাশিদও সবার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শিস আর চিৎকারে গলা মিলিয়েছিল। অনেকটা টাকা খরচা করে সে দুটো সিঙাড়াও খেয়ে ফেলেছিল; এতে তার মা হয়তো একটু কষ্ট পাবে, কিন্তু তার সময়টা ভারী খাসা কেটেছিল। নিজের রিকশার প্যাডেল মেরে বাড়ি ফেরার পথে সে ছবিতে-দেখা কায়দাকানুনগুলো একটু ঝালিয়ে নিচ্ছিল, রিকশার একপাশে নিচু হয়ে ঝুলে, একটা হালকা ঢালু জায়গা দিয়ে প্যাডেল না-মেরে গড়িয়ে নেমে, আর গাই-ওয়ালা যেমন শত্রুদের হাত থেকে লুকোনোর জন্য তার ঘোড়াটাকে ব্যবহার করত, ঠিক তেমনভাবেই নিজের রিকশাটাকে আড়াল হিসেবে কাজে লাগিয়ে। শেষমেশ সে সোজা হয়ে বসে হ্যান্ডেলটা ঘোরালো, আর রিকশাটা ভারী সুন্দরভাবে সদর দরজা গলে ভুট্টাখেতের ধারের ওই গলিটায় ঢুকে পড়ায় সে রীতিমতো আহ্লাদে আটখানা হলো। ঝোপের ধারে বসে মদ আর জুয়া খেলায় মত্ত গোরু-পাচারকারীদের ওপর আচমকা হানা দেওয়ার জন্য গাই-ওয়ালা ঠিক এই কায়দাটাই নিয়েছিল। রশিদ ব্রেক কষে সটান ভুট্টাখেতের ভেতর লাফিয়ে পড়ল, আর একেবারে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুট লাগাল—ওই ঘুণাক্ষরেও-টের-না-পাওয়া গোরু-পাচারকারীদের দিকে, তার বন্দুক তখন একেবারে তাক-করা আর প্রস্তুত। ওদের ক্যাম্পফায়ারের কাছাকাছি পৌঁছোতেই সে তাদের পিলে চমকে দেওয়ার জন্য তার সেই ‘ঘৃণামাখানো চিৎকার’ জুড়ে দিল, ইয়াআআআআআ! ডাক্তারসাহেবের বাড়ির এত কাছে তো আর সে সত্যি সত্যিই অমন চেঁচায়নি, তবে ছুটতে ছুটতেই সে একেবারে হাঁ-মুখ করে, বোবা গলায় হুংকার দিয়ে উঠল, ব্ল্যাম! ব্ল্যাম! নাদির খানের এমনিতেই সহজে দু-চোখের পাতা এক হচ্ছিল না, আর ঠিক তখনই তিনি চোখ মেলে তাকালেন। তিনি দেখলেন—ইইইয়াআআহ্!—রোগাপটকা বুনো মতো একটা মূর্তি একেবারে মেল-ট্রেনের মতো তাঁর দিকেই ধেয়ে আসছে, আর গলা ফাটিয়ে চেঁচাচ্ছে—তবে হয়তো তিনি নিজেই কালা হয়ে গেছেন, কারণ কোনো আওয়াজই তো শোনা যাচ্ছে না!—আর তিনি যেই না উঠে দাঁড়িয়েছেন, একটা আর্তনাদ সবে তাঁর ওই নাদুসনুদুস ঠোঁট গলে বেরিয়ে আসতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই রাশিদ তাঁকে দেখতে পেল, আর ওর গলা দিয়েও এবার সত্যি সত্যিই আওয়াজ বেরিয়ে এল। দুজনেই একযোগে একটা আতঙ্কের চিৎকার জুড়ে দিয়ে, একেবারে লেজ গুটিয়ে উলটো দিকে ছুট লাগাল। তারপর তারা দুজনেই থমকে দাঁড়াল, একে-অপরের পালানোর ব্যাপারটা খেয়াল করে ওই শুকিয়ে-যাওয়া ভুট্টার ডাঁটার ফাঁক দিয়ে একে-অপরের দিকে উঁকি মারল। রাশিদ, নাদির খানকে চিনতে পারল আর তাঁর ওই ছেঁড়াখোঁড়া জামাকাপড় দেখে সে বেজায় ঘাবড়ে গেল।
‘আমি একজন বন্ধু মানুষ,’ নাদির কেমন বোকার মতোই বলে উঠলেন। ‘আমার এক্ষুনি একবার ডাক্তার আজিজের সঙ্গে দেখা করা চাই।’
‘কিন্তু ডাক্তারসাহেব তো এখন ঘুমোচ্ছেন, আর তিনি তো আর এই ভুট্টাখেতের ভেতর বসে নেই।’ নিজেকে একটু সামলে নে বাপু, রশিদ মনে মনে নিজেকেই ধমকে উঠল, আজেবাজে বকা এবার বন্ধ কর! ইনি তো মিঞা আবদুল্লার বন্ধু! ... কিন্তু নাদির বোধহয় সে-সব টেরই পাননি; দাঁতের ফাঁকে আটকে-থাকা মুরগির মাংসের আঁশের মতো গলায় আটকে-যাওয়া কয়েকটা কথা আপ্রাণ চেষ্টায় উগরে দেওয়ার জন্য তাঁর মুখটা তখন সাঙ্ঘাতিক কসরত করছিল... ‘আমার প্রাণ,’ শেষমেশ কোনোমতে কথাটা তাঁর মুখ দিয়ে বেরোল, ‘বড়ো বিপদে।’
আর এবার রাশিদ, যার রন্ধ্রে রন্ধ্রে তখনও গাই-ওয়ালার সেই মেজাজটা টগবগ করছে, সে একেবারে ত্রাতা হয়ে এগিয়ে এল। সে নাদিরকে নিয়ে গেল বাড়ির একপাশের একটা দরজার কাছে। দরজায় ছিটকিনি আর তালা দুটোই লাগানো ছিল; কিন্তু রাশিদ যেই না একটা টান মেরেছে, অমনি তালাটা খসে সোজা তার হাতে চলে এল। ‘একেবারে দেশি মাল,’ সে ফিসফিস করে বলে উঠল, যেন ওই এক কথাতেই সব জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল। আর, নাদির ভেতরে পা বাড়াতেই, রাশিদ হিসহিস করে বলে উঠল, ‘আমার ওপর পুরোপুরি ভরসা রাখতে পারেন, সাহেব। মুখে একেবারে কুলুপ! আমার মায়ের পাকা চুলের দিব্যি।’
সে বাইরে থেকে তালাটা আবার আগের মতো ঝুলিয়ে দিল। হামিংবার্ডের খোদ ডানহাতকে সে কি না সত্যি-সত্যিই বাঁচিয়ে ফেলল!... কিন্তু কীসের থেকে? কার হাত থেকে?... তা যাই হোক, বাস্তবের জীবনটা যে মাঝেমধ্যে সিনেমার চেয়েও ঢের বেশি জব্বর হয়।
‘ওই লোকটা?’ বেশ খানিকটা ঘাবড়ে গিয়ে পদ্মা জিজ্ঞেস করে বসে। ‘ওই নাদুসনুদুস, থলথলে, ভীতুর ডিম মার্কা লোকটা? ও-ই হবে তোমার বাবা?’
পূর্ববর্তী পর্ব পড়ুন এখানে: [মধ্যরাতের সন্তানেরা]
মধ্যরাতের সন্তানেরা
সালমান রুশদি
▋অনুবাদ: দীপ মন্ডল
সালমান রুশদি
▋অনুবাদ: দীপ মন্ডল




মন্তব্য