.header-button .inner > span { font-size: 18px !important; } .header-button .inner i.fa { font-size: 40px !important; } .comment-form-message { background-color: #f4f4f4 !important; font-size: 14px !important; }

$type=ticker$count=12$cols=4$cate=0$sn=0$show=post

সালমান রুশদির মিডনাইটস চিলড্রেন (পর্ব ৩) • বাংলা অনুবাদ: দীপ মন্ডল

সালমান রুশদির মিডনাইটস চিলড্রেন (পর্ব ১) • বাংলা অনুবাদ: দীপ মন্ডল
পুস্তক ১ • অধ্যায় ১ • পর্ব ৩

ছিদ্রযুক্ত চাদর 

THE PERFORATED SHEET

   … ‘একবার ভেবে দ্যাখ তো বাবা,’ একটা তক্তপোশের ওপর হাল-ছেড়ে-দেওয়া এক ক্লান্ত ভঙ্গিতে হেলান দিয়ে তাজা পাতিলেবুর শরবতে চুমুক দিতে দিতে আদমের মা বলে চলেছেন, ‘জীবন কেমন কেমন বাঁক নেয় রে। এতগুলো বছর ধরে আমার পায়ের গোড়ালিদুটো অবধি বেগানা লোকের কাছে একটা গোপন ব্যাপার ছিল, আর এখন কি না এমন সব পুরুষমানুষদের চোখের সামনে আমাকে গিয়ে পড়তে হয়, যারা আমাদের বাড়ির কেউ নয়।’
   ...অন্যদিকে জমিদার ঘানি তখন আঁকাবাঁকা সোনালি ফ্রেমে বাঁধানো ডায়ানা দ্য হানট্রেস-এর এক পেল্লায় অয়েল পেন্টিং-এর ঠিক নিচে দাঁড়িয়ে আছেন। চোখে পুরু কালো চশমা আর মুখে সেই জগৎবিখ্যাত বিষাক্ত হাসিখানা ঝুলিয়ে তিনি এখন আর্ট নিয়ে গভীর আলোচনা জুড়েছেন। ‘বুঝলেন ডাক্তার সাহেব, এক ইংরেজ সাহেবের কাছ থেকে এটা কিনলাম। বেচারার তখন কপাল পুড়েছে, ভারী দুঃসময়।  স্রেফ পাঁচশো টাকায় পেলাম—তাও আমি দরাদরি করে দাম কমানোর কোনো ঝামেলায় আমি যাইনি। পাঁচশোটা টাকা আর এমন কি হাতিঘোড়া? বুঝলেন কি না, আমি হলাম গিয়ে একেবারে যাকে বলে শিল্পরসিক লোক।’
ডায়ানা দ্য হানট্রেস-এর পেইন্টিং
ডায়ানা দ্য হানট্রেস-এর একটি পেইন্টিং

   …‘দেখলি বাবা,’ আদম যেই না তাঁর মাকে পরীক্ষা করতে শুরু করছেন, মা বলে উঠলেন, ‘নিজের সন্তানের জন্য একজন মা কী না করতে পারে। দ্যাখ দেখি, আমার কী কষ্ট। 
তুই তো ডাক্তার হয়েছিস... এই র‍্যাশগুলো একটু দ্যাখ, ওই ছোপ ছোপ দাগগুলো একটু হাত বুলিয়ে দ্যাখ দিকি…, বোঝার চেষ্টা কর আমার মাথাটা সকাল-দুপুর-রাত্তির কেবল ঝিমঝিম করে। আমার গেলাসটা একটু ভরে দে তো বাবা।’
   ...কিন্তু মাঝির ওই হাঁক শুনে তরুণ ডাক্তার তখন চিকিৎসকের সমস্ত আদর্শ ভুলে এক অদ্ভুত প্রবল উত্তেজনায় মেতে উঠলেন, আর চেঁচিয়ে বললেন—‘আমি এক্ষুনি আসছি! শুধু আমার জিনিসপত্তরগুলো একটু নিয়ে নিই!’ শিকারার গলুই এসে ঠেকল বাগানের একেবারে কিনারে। আদম হুড়মুড় করে বাড়ির ভেতর ছুট লাগাল… চুরুটের মতো পাকানো জায়নামাজখানা এক বগলে চাপা, বাইরের আলো থেকে এসে ভেতরের ওই আচমকা অন্ধকারে তার নীল চোখদুটো একটু পিটপিট করে উঠল; সে ওই চুরুট-জায়নামাজখানা উঁচুতে একটা তাকের উপর চালান করে দিল, যেখানে ডাঁই রাখা আছে ভোরওয়ার্টস আর লেনিনের হোয়াট ইজ টু বি ডান?, আরও নানা রকম প্যামফ্লেটস্‌—তার সেই আধা-মুছে-আসা জার্মান জীবনের ধুলোমাখা সব প্রতিধ্বনি। সে তার বিছানার তলা থেকে টেনে বের করল একটা পুরোনো চামড়ার ব্যাগ, তার মা যেটাকে বলতেন তার ‘ডাক্তারি-অ্যাটাচি’, আর সে যখন ব্যাগটা হাতে ঝুলিয়ে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে ঘর থেকে ছুট লাগাল, তখন এক পলকের জন্য চোখে পড়ল ব্যাগের তলার চামড়ায় পুড়িয়ে-খোদাই-করা একটা শব্দ—হাইডেলবার্গ (HEIDELBERG)। সদ্য পসার জমাতে চাওয়া একজন ডাক্তারের কাছে জমিদারের মেয়ের খবর সত্যিই একখানা দারুণ সুখবর বটে, তা সে হোক না অসুস্থ। নাঃ সে অসুস্থ বলেই না…।
   ...আর এদিকে আমি, একটা টেবিল ল্যাম্পের আলোর গণ্ডির ভেতরে একটা ফাঁকা আচারের বয়ামের মতো বসে চুপচাপ আছি, আর তেষট্টি বছর আগের আমার দাদুর সেই ছবিটা চোখের সামনে এমনভাবে ভেসে উঠছে যাকে কালির আঁচড়ে ধরে রাখাটা বড্ড জরুরি। আমার নাকের ভেতরটা ভরে উঠছে তাঁর মায়ের লজ্জার সেই কটু দুর্গন্ধে, যে-লজ্জা কিনা তাঁর গায়ে ফোঁড়া হয়ে ফুটে বেরিয়েছিল; সঙ্গে মিশেছে আদম আজিজের সেই ভিনিগারের মতো কড়া, তেজালো জেদের গন্ধ—এমন জাঁকিয়ে পসার জমানোর জেদ, যাতে তাঁর মা-কে আর কক্ষনো ওই জহরতের দোকানে ফিরে বসতে না হয়; আর সেইসঙ্গে আছে এক মস্ত ছায়া-ছায়া বাড়ির বোবা, ভ্যাপসা গন্ধ, যে বাড়ির ভেতর ছোকরা ডাক্তারটি কেমন আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা ছবির সামনে। ছবিতে এক সাদামাটা চেহারার মেয়ে, কিন্তু চোখ দুটো ভারী সজীব, আর তার পেছনে, বহুদূরে, একটা হরিণ তার ছোড়া তীরে বিদ্ধ হয়ে একেবারে কাঠ হয়ে গেছে। আমাদের জীবনের সবচেয়ে জরুরি ঘটনাগুলো তো আমাদের অগোচরেই ঘটে যায়; কিন্তু আমি কোত্থেকে যেন সেই জানা না থাকার খামতিগুলো পূরণ করে নেওয়ার কায়দাটা শিখে ফেলেছি। ফলে সব কিছুই এখন আমার মাথার ভেতরে একদম হুবহু সাজানো আছে, প্রতিটি খুঁটিনাটি সমেত—এমনকি সেই কাকভোরের কুয়াশাটা যেভাবে তেরছা হয়ে বাতাসে হেলে ছিল, তাও আমার স্পষ্ট মনে পড়ছে। আমি জানি, সব জানি, স্রেফ ওইরকম কয়েকটা আলগা সূত্র নয়—যেগুলো কেউ হয়তো ভুল করে মাকড়সার জালে জড়ানো পুরনো একখানা বন্ধ টিনের বাক্স খুলে হঠাৎ আবিষ্কার করে ফেলে।
   ...আদম মায়ের জন্য গ্লাসটা আবার ভরে দিয়ে বেশ চিন্তিত মুখে তাঁকে পরীক্ষা করতে থাকল। ‘আম্মা, এই র‍্যাশ আর ছোপগুলোর ওপর একটু মলম লাগিয়ো। মাথা ধরার জন্য বড়ি দিলাম। ফোঁড়াগুলো একটু চিরে দিতে হবে। তবে তুমি যদি দোকানে বসার সময় একটু পর্দা-টর্দা করে বসতে... তাহলে বাঁকা চোখের নজর... আসলে এই ধরনের ব্যারাম-ট্যারাম তো অনেক সময় মন থেকেই দানা বাঁধে…’
   ...পানির বুকে দাঁড় ফেলার ছপাৎ শব্দ। হ্রদের পানিতে কেবল থুতু ফেলার ছ্যাঁত। তাই গলা খাঁকারি দিয়ে রীতিমতো রাগে গজগজ করতে করতে বিড়বিড় করে উঠল, ‘খাসা কারবার! একটা কাঁচা-মাথা নাক্কু ছোকরা, ছাইপাঁশ কিছু শেখার আগেই দেশ ছেড়ে চলে গেল, আর তারপর একগাদা বিলিতি যন্ত্রপাতিতে ঠাসা একখানা পেল্লায় ব্যাগ ঝুলিয়ে একেবারে বড়োসড়ো ডাক্তার সাহেব হয়ে ফিরে এল! অথচ দ্যাখো এখনও কিনা সে একটা আস্ত প্যাঁচার মতোই হাঁদারাম রয়ে গেল। কসম খেয়ে বলছি: বড্ড বাজে কারবার।’
   … জমিদারের ওই হাসিটির সামনে পড়ে ডাক্তার আজিজ ভারী অস্বস্তিতে ছটফট করছেন… একবার এ-পায়ে, একবার ও-পায়ে ভর দিচ্ছেন। লোকটার সামনে থাকলে ঠিক স্বস্তি পাওয়া যায় না। আর তিনি অপেক্ষা করছেন, তাঁর এই অদ্ভুত-দর্শন চেহারার দিকে তাকিয়ে লোকটার মুখে কোনো ভাবান্তর হয় কিনা তা দেখার। তাঁর ওই দশাসই চেহারা, ওই পাঁচমিশেলি রঙের মুখ, আর সেই নাক... এসব দেখে লোকে যে হুটহাট চমকে ওঠে, ওতে তিনি এখন বেশ সয়ে গেছেন। কিন্তু ঘানির মধ্যে কোনো হেলদোল দেখা গেল না, কোনো ভাবই দেখালেন না তিনি। পাল্টা, ছোকরা ডাক্তারও ঠিক করে ফেললেন, অপর পক্ষকে নিজের অস্বস্তিটা আর বুঝতে দেবেন না। তিনি পা দুটোকে স্থির করলেন। দু’জনে মুখোমুখি। দু’জনেই একে অপরের সম্বন্ধে কে কী ভাবছেন (অন্তত বাইরে থেকে তাই-ই মনে হচ্ছিল), তা বেমালুম চেপে গেলেন। এভাবেই বুঝি তাঁদের ভবিষ্যত সম্পর্কের ভিতটা গাঁথা হয়ে গেল। আর ঠিক তক্ষুনি ঘানি পাল্টে গেলেন। সেই শিল্পরসিক ভাবটা উবে গিয়ে তাঁর একখানা কড়া, দাঁতালো ভাব ফুটে উঠল। ‘এটা তোমার জন্য মস্ত সুযোগ হে ছোকরা,’ তিনি বললেন। আজিজের চোখ তখন ঘুরে গিয়ে ডায়ানার ছবিটার ওপর পড়েছে। মেয়েটার গায়ের দাগছোপ-ওয়ালা গোলাপি চামড়ার অনেকটাই বেশ খোলাখুলি দেখা যাচ্ছে।
   … তাঁর মা গোঙাতে গোঙাতে মাথা নাড়লেন। ‘আরে না, তুই আর কী বুঝিস বাবা! মস্ত ডাক্তার হয়েছিস বটে, কিন্তু এই জহরতের কারবারখানা যে একেবারে আলাদা জিনিস। একটা কালো বোরখার ভেতরে মুখ লুকিয়ে বসে থাকলে, তার কাছ থেকে কে-ই বা একখানা ফিরোজা কিনবে, বল্‌? আসল কথাটা হলো গিয়ে বিশ্বাস তৈরি করা। তাই ওদের আমার দিকে তাকাতেই হয়; আর আমারও কপালে জোটে এই ব্যথা-বেদনা আর ফোঁড়া। যা, যা তুই, এই বেচারি মা-কে নিয়ে আর তোকে মাথা ঘামাতে হবে না।’
   … ‘বড়ো লায়েক হয়েছে,’ হ্রদের পানিতে থুতু ফেলতে ফেলতে তাই বলে উঠল, ‘ইয়াব্বড় ব্যাগ, লাটসাহেব আমার। থুঃ! আমাদের ঘরে কি ব্যাগের অভাব পড়েছিল যে তোকে শুয়োরের চামড়া দিয়ে বানানো এমন একটা জিনিস বয়ে আনতে হবে! ওটার দিকে স্রেফ তাকালেই তো মানুষের জাত চলে যাবে। নাপাক চিজ। আর ওর ভেতরে যে কীসব ছাইপাঁশ পোরা আছে তা ভগবানই জানেন।’ ফুল-ছাপ পর্দা আর ধূপের সুবাসের মধ্যে বসে থাকা ডাক্তার আজিজের মনটা হ্রদের ওপারে অপেক্ষায় থাকা রোগীর দিক থেকে এক ঝটকায় ছিটকে সরে এল। তাইয়ের ওই তিতকুটে একতরফা বকবকানিটা তাঁর চেতনার ভেতর জোর করে ঢুকে পড়ে কেমন একটা ভোঁতা ধাক্কা দিল, চিন্তার সুতো ছিঁড়ে দিল। ধূপের গন্ধটাকে ছাপিয়ে যেন হাসপাতালের জরুরি বিভাগের একটা কটু গন্ধ চারপাশটা গ্রাস করে ফেলল... বুড়োটা যে কোনো একটা ব্যাপারে বেজায় খচে আছে তা বেশ বোঝা যাচ্ছে, কোনো এক দুর্বোধ্য রাগে সে যেন ফেটে পড়ছে, আর সেই রাগের সবটা গিয়ে পড়েছে তার এককালের সাগরেদের ওপর, বা আরও ঠিকঠাক করে বললে, তার ওই ব্যাগটার ওপর। ডাক্তার আজিজ একটু হালকা চালে কথা জমানোর চেষ্টা করলেন... ‘তোমার বউ ভালো আছে তো? লোকেরা কি এখনও তোমার ওই সোনার দাঁতের আর খাজানা ভরা গোপন থলে নিয়ে গপ্পো করে?’... পুরোনো বন্ধুত্বটা আবার ঝালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেন তিনি; কিন্তু তাই ততক্ষণে একেবারে মেজাজের তুঙ্গে, তার মুখ দিয়ে যেন গালমন্দের একটা আস্ত নদী বয়ে চলেছে। গালিগালাজের সেই প্রবল তোড়ে হাইডেলবার্গ ব্যাগটা যেন থরথর করে কাঁপতে লাগল। ‘বিলেত থেকে আমদানি করা শুয়োরের চামড়ার ওই বেহেন-চোদ ব্যাগ, যতসব ফিরিঙ্গিদের ভেলকি ওর ভেতরে পোরা। বড়োলোকি ব্যাগ। এখন যদি কারো হাত ভাঙে, ওই ব্যাগ-ব্যাটা আর কোনো কবিরাজকে লতাপাতা দিয়ে ব্যান্ডেজ বাঁধতে দেবে না। এখন লোকের বউকে ওই ব্যাগের পাশে শুয়ে শুয়ে দেখতে হবে, কেমন করে ছুরি-কাঁচি এসে তাকে চিরে ফালাফালা করে দিচ্ছে। বাঃ রে কারবার! এই বিদেশিরা আমাদের ছোকরাগুলোর মগজে কীসব যে ঢুকিয়ে দেয়। কসম খেয়ে বলছি: এ বড্ড খারাপ কারবার। ওই ব্যাগটার দোজখের আগুনে ভাজা ভাজা হওয়া উচিত, ওই বেধর্মী কাফেরগুলোর বিচিগুলোর সঙ্গে।’
   … জমিদার ঘানি তাঁর প্যান্টের ফিতেয় বুড়ো আঙুল দিয়ে একটা টান মেরে ফটাস্‌ করে শব্দ করলেন। ‘বেশ বড়োসড়ো একটা সুযোগ বটে, সে আর বলতে! শহরের লোকজন দেখছি তোমার বেশ সুখ্যাতি করছে। ডাক্তারি বিদ্যেটাও ভালোই রপ্ত করেছ। আর বংশ-পরিবারও ভালো... মানে, যথেষ্টই ভালো। এদিকে আমাদের লেডি-ডাক্তারটি এখন অসুস্থ, তাই তুমি এই সুযোগটা পেয়ে গেলে। ওই মহিলা আজকাল শুধু অসুখে ভোগে, আমার তো মনে হয় বয়সও বেশ হয়েছে তার, আর হালে চিকিৎসাশাস্ত্রে যে এতসব নতুন উন্নতি হয়েছে, সে-সবের খবরটবরও বিশেষ রাখে না, কী বলো? আমি তো বলি: ডাক্তার, আগে নিজের রোগ সারাও দিকি। আর তোমাকে একটা কথা সাফ জানিয়ে রাখি: ব্যাবসাপাতির ব্যাপারে আমি কিন্তু একেবারে হিসেবি আর পেশাদার মানুষ। ওসব আবেগ-ভালোবাসাটাসা যা কিছু, ও আমি স্রেফ নিজের পরিবারের জন্যই তুলে রাখি। কেউ যদি আমার জন্য এক্কেবারে ফার্স্ট-ক্লাস কাজ না করতে পারে, তবে সটান তাকে বিদেয় করি! আমার কথা মাথায় ঢুকল তো? তো আসল কথা হলো: আমার মেয়ে নাসিমের শরীরটা ভালো নেই। তুমি একেবারে সেরা যত্ন নিয়ে ওর চিকিৎসা করবে। আর মনে রেখো, আমার কিন্তু উপরতলায় বিস্তর জানাশোনা আছে; আর রোগব্যাধি তো ছোটো-বড়ো কাউকেই রেয়াত করে না।’
   ... ‘তাইজি, তুমি কি এখনও সেই গায়ের জোর বাড়াবে বলে ব্র্যান্ডির মধ্যে জলসাপ চুবিয়ে রাখো? এখনও কি তুমি কোনো মশলাপাতি ছাড়াই পদ্মের মৃণাল খেতে ভালোবাসো?’ বড্ড আমতা-আমতা করে করা প্রশ্নগুলো তাইয়ের রাগের প্রবল তোড়ে একেবারে খড়কুটোর মতো ভেসে গেল। ডাক্তার আজিজ এবার মনে মনে আসল রোগটা ধরতে শুরু করলেন। মাঝির কাছে ওই ব্যাগটা হলো খোদ বিদেশ; ওটা হলো এক অচেনা পরদেশি জিনিস, এক অনুপ্রবেশকারী, আর প্রগতির চিহ্ন। আর হ্যাঁ, ওটা সত্যিই তরুণ ডাক্তারের মগজখানা পুরোপুরি জবরদখল করে বসেছে; আর হ্যাঁ, ওর ভেতরে তো ছুরি-কাঁচি তো আছেই, আর আছে কলেরা, ম্যালেরিয়া আর গুটিবসন্ত সারানোর মোক্ষম সব দাওয়াই; আর হ্যাঁ, ওটা ডাক্তার আর মাঝির ঠিক মাঝখানটায় দেওয়াল তুলে দিয়ে তাদের দুজনকে রীতিমতো একে অপরের শত্রু বানিয়ে ছেড়েছে। ডাক্তার আজিজ এবার লড়তে শুরু করলেন—একদিকে নিজের বিষণ্ণতার বিরুদ্ধে, আর অন্যদিকে তাইয়ের ওই রাগের বিরুদ্ধে, যে-রাগ কিনা একটু একটু করে তাঁকেও ছুঁয়ে ফেলছে, ক্রমে যেন সেটা নিজেরই রাগ হয়ে উঠছে। তাঁর নিজের এই রাগ সচরাচর বাইরে আসে না ঠিকই, কিন্তু যখন আসে, তখন একেবারে বিনা নোটিশে তাঁর ভেতরের গভীরতম তলদেশ থেকে এক বিপুল গর্জনে ফেটে পড়ে, চোখের সামনের সবকিছু একেবারে তছনছ করে দেয়; তারপর আবার কর্পূরের মতো উবে গিয়ে তাঁকে এই ভাবনায় ফেলে দেয় যে, চারপাশের লোকজন খামোখা এমন খেপে আছে কেন… তাঁরা ঘানির বাড়ির কাছাকাছি এসে পড়েছেন। একটা ছোট্ট কাঠের জেটির ওপর হাত জোড় করে শিকারার জন্য এক বেয়ারা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। আজিজ এবার নিজের মনটাকে সামনের কাজটার ওপর পুরোপুরি সঁপে দিলেন।
   ‘আপনাদের বাঁধা ডাক্তার কি আমার এই আসায় সায় দিয়েছেন, ঘানি সাহেব?’ ... আবারও সেই আমতা-আমতা করে করা প্রশ্নটাকে আলতো করে একপাশে সরিয়ে দিলেন জমিদারমশাই। বললেন, ‘আরে, সে রাজি হয়ে যাবে ’খন। এবার আমার সঙ্গে আপনি আসুন তো দিকি।’
   ... জেটির ওপর সেই বেয়ারা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। হাতে ব্যাগ ঝুলিয়ে আদম আজিজ যাতে অনায়াসে নেমে আসতে পারেন, তার জন্য সে শিকারাটাকে শক্ত করে ধরে চেপে ধরলেন। আর এইবার, অবশেষে, তাই একেবারে সরাসরি কথা বলে উঠল আমার দাদুর সঙ্গে। চোখেমুখে একরাশ অবজ্ঞা ফুটিয়ে তাই জিজ্ঞেস করল, ‘আমাকে একটা কথা বলো তো ডাক্তারবাবু: মরা শুয়োরের চামড়া দিয়ে বানানো তোমার ওই ব্যাগের ভেতর কি এমন কোনো যন্ত্র আছে যা দিয়ে বিদেশি ডাক্তাররা গন্ধ শুঁকে বেড়ায়?’ কথাটা ঠিকঠাক বুঝতে না পেরে আদম মাথা নাড়লেন। তাইয়ের গলায় তখন যেন ঘেন্নার আরও কয়েকটা নতুন পরত এসে জড়ো হলো। ‘আহা, ওই যে গো বাবু, ওই হাতির শুঁড়ের মতো দেখতে একটা জিনিস।’ এবার ব্যাপারটা আঁচ করতে পেরে পেরে আজিজ জবাব দিলেন: ‘স্টেথোস্কোপের কথা বলছ? সে তো আছে বটেই।’ তাই জেটি থেকে ধাক্কা মেরে শিকারাটাকে আবার পানিতে ভাসিয়ে দিল। ছপ করে এক দলা থুতু ফেলল পানিতে। তারপর নৌকো বেয়ে দূরে যেতে শুরু করল। ‘আমি ঠিক জানতাম,’ সে বলে উঠল…‘নিজের ওই অত বড়ো নাকটার বদলে তুমি এখন ওইরকম একটা যন্ত্র দিয়ে শুঁকতে বসবে।’
   স্টেথোস্কোপ জিনিসটা যে নাকের চেয়ে বরং একজোড়া কানের মতোই বেশি কাজ করে, সে-কথা আর খামোখা বুঝিয়ে বলার কোনো গরজই আমার দাদু দেখালেন না। তিনি নিজের ভেতরের বিরক্তিটাকে, বলতে গেলে এক প্রত্যাখ্যাত সন্তানের যেন অভিমানী রাগটাকেই প্রাণপণে চেপে রাখছিলেন; আর তা ছাড়া, একজন রোগী তো তাঁরই অপেক্ষাতে বসে আছে। সময় যেন একেবারে থিতু হয়ে বসে এই মুহূর্তটার গুরুত্বের ওপরই তার সমস্ত মনোযোগ ঢেলে দিল। 

সালমান রুশদি
সালমান রুশদি
বাড়িটা বেশ ঠাটবাটওয়ালা হলেও ভেতরটা কেমন যেন আল-আঁধারি, অন্ধকার-অন্ধকার। ঘানি মানুষটা বিপত্নীক, আর চাকরবাকররা যে সেই সুযোগের ষোলো আনা ফয়দা লুটছে তা বেশ মালুম হচ্ছিল। কোণায়-কানচিতে ঝুল জমেছে, জানালার কার্নিশগুলোয় ধুলোর পুরু পরত জমে আছে। 
তারা একটা লম্বা দালান ধরে এগোচ্ছিল; তার মধ্যে একটা দরজা সামান্য ভেজানো ছিল, আর সেটার ফাঁক দিয়ে আজিজ দেখতে পেলেন ভেতরের ঘরটার একেবারে লঙ্কাকাণ্ড অবস্থা—সবকিছু চরম লন্ডভন্ড হয়ে পড়ে আছে। এই এক পলকের দৃশ্য, আর তার সঙ্গে ঘানির কালো চশমার কাচে ঠিকরে পড়া আলোর একটা ঝিলিক মিলিয়ে আচমকাই আজিজকে বুঝিয়ে দিল যে জমিদারমশাই আসলে চোখে দেখেন না, তিনি অন্ধ। ব্যাপারটা তাঁর অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে তুলল: এক অন্ধ মানুষ, সে কি না ইয়োরোপীয় ছবির সমঝদার হওয়ার দাবি করে! অবশ্য তিনি মনে মনে একটু তাজ্জবও বনে গেলেন, কারণ এতক্ষণ ধরে হাঁটলেও ঘানি কিন্তু একবারের জন্যেও কোনো কিছুর সঙ্গে ধাক্কা খাননি... শেষমেশ একটা ভারী সেগুন কাঠের দরজার সামনে এসে তারা থামলেন। ‘এখানে দু দণ্ড দাঁড়ান দিকি,’ বলে ঘানি সাহেব দরজার ওপাশের ঘরটায় ঢুকে গেলেন।
   পরবর্তী জীবনে ডাক্তার আদম আজিজ হলফ করে বলতেন যে, জমিদারের ওই পেল্লায় বাড়ির সেই ঝুল-কালি মাখা মনমরা দালানে একা দাঁড়িয়ে থাকা ওই দুদণ্ড মুহূর্তে, তাঁর কেবলই মনে হচ্ছিল—পায়ে যতটা জোর আছে ঠিক ততটা জোরে সেখান থেকে দুম করে ছুটে লাগাই। পালানোর এক দুর্নিবার ইচ্ছে তাঁকে আষ্টেপৃষ্ঠে জাপটে ধরেছিল। ওই অন্ধ শিল্পরসিক লোকটার ধাঁধায় পড়ে এমনিতেই তাঁর স্নায়ুগুলো তখন দুর্বল; তার ওপর তাইয়ের বিড়বিড় করে বলা কথার সেই চোরা বিষের চোটে তাঁর পেটের ভেতর যেন একগাদা ক্ষুদে পোকামাকড় কিলবিল করতে শুরু করেছিল। নাকের পাটায় এমন শিরশির করে সুড়সুড়ি শুরু হয়েছিল যে তাঁর রীতিমতো মনে হতে লাগল তিনি বুঝি কোনো যৌনরোগই না বাঁধিয়ে বসেছেন। তাঁর মনে হলো যেন সিসার বুটে আটকে থাকা পা-দুটো বড্ড ধীরেসুস্থে পিছন দিকে ঘুরতে শুরু করেছে; রগের কাছে রক্তের ধুকপুকানি টের পেলেন তিনি; যে-জায়গা থেকে আর ফেরার কোনো পথ নেই। ঠিক এমন একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকার এক তীব্র অনুভূতি তাঁকে এমনভাবে জাপটে ধরল যে, তিনি প্রায় তাঁর জার্মানিতে তৈরি পশমি প্যান্টটাই ভিজিয়ে ফেলার জোগাড় করলেন। নিজের অজান্তেই তাঁর মুখখানা লজ্জায় লাল হয়ে উঠল; আর ঠিক এমন সময় তাঁর চোখের সামনে তাঁর মা আবির্ভূত হলেন—একটা নিচু ডেস্কের সামনে মেঝেতে বসে আছেন, আলোয় তুলে ধরা হাতে একটা ফিরোজা পাথর, আর লজ্জার লাল আভার মতো একটা র‍্যাশ যেন তাঁর সারা মুখে ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁর মায়ের মুখে তখন মাঝি তাইয়ের সেই একরাশ অবজ্ঞা ফুটে উঠেছে। ‘যা, যা, পালা,’ তাইয়ের গলাতেই তাঁর মা বলে উঠলেন, ‘তোর এই গরিব বুড়ি মাকে নিয়ে তোকে আর মাথা ঘামাতে হবে না।’ ডাক্তার আজিজ নিজেকেই তোতলাতে শুনলেন, ‘কী অপদার্থ ছেলেই না তোমার হয়েছে, আম্মা; তুমি কি দেখতে পাচ্ছ না যে আমার ঠিক মাঝখানটায় একটা আস্ত তরমুজের সমান ফুটো হয়ে আছে?’ তাঁর মা এক যন্ত্রণামাখা হাসি হাসলেন। ‘তুই চিরকালই একখানা পাষাণ ছেলে,’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এই কথা বলে তিনি দালানের দেওয়ালের একটা টিকটিকিতে রূপান্তরিত হয়ে গেলেন, আর তারপর তাঁর দিকে জিভ ভ্যাংচাতে লাগলেন। ডাক্তার আজিজের মাথা ঘোরার ভাবটা কাটল, তিনি আদৌ জোরে কথাগুলো বলেছিলেন কি না, তা নিয়ে তাঁর নিজেরই সন্দেহ হলো। ওই ফুটোর ব্যাপারটা দিয়েই-বা তিনি কী বোঝাতে চেয়েছিলেন, তা-ও ভাবলেন। খেয়াল করলেন, তাঁর পা দুটো আর পালানোর কসরত করছে না। আর ঠিক তখনই অনুভব করলেন, কেউ তাঁকে দেখছে। পালোয়ানের মতো পেশিবহুল হাতের এক মহিলা তাঁর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন, আর তাঁকে ইশারা করছে ঘরের অন্দরে যেতে। তাঁর পরনের শাড়ির ছিরি দেখে বোঝাই যাচ্ছিল যে তিনি একজন পরিচারিকা; কিন্তু তাঁর হাবভাবে দাসীর মতো কোনো বশ্যতা বা জড়তা ছিল না। ‘আপনাকে তো দেখতে একেবারে ফ্যাকাসে বাসি মাছের মতো লাগছে,’ তিনি বললেন। ‘আপনাদের মতো এই অল্পবয়সি ডাক্তাররা… কোনো অচেনা বাড়িতে পা দিলেই আপনাদের কলজে যেন একেবারে পানি হয়ে যায়। আসুন, আসুন ডাক্তার সাহেব, ওঁরা আপনার জন্য বসে আছেন।’ নিজের ব্যাগটা একটু বেশিই শক্ত করে বাগিয়ে ধরে তিনি সেই অন্ধকার সেগুন কাঠের দরজা পেরিয়ে মহিলাকে অনুসরণ করলেন।
   ...পেল্লায় এক খানা শোওয়ার ঘর—যা কি না বাড়ির বাকি অংশের মতোই টিমটিমে আলোয় ঢাকা; যদিও একটা দেওয়ালের বেশ উঁচুতে থাকা ঘুলঘুলি দিয়ে ধুলোমাখা রোদের কয়েকটা ফালি চুঁইয়ে পড়ছিল এই ঘরে। গুমোট সেই আলোর রেখাগুলো এমন একটা দৃশ্যকে আলোকিত করে তুলল, ডাক্তার তাঁর জীবনে যার চেয়ে বেশি আশ্চর্য দৃশ্য আর কখনও দেখেননি: দৃশ্যটা এমন এক চরম খাপছাড়া যে তাঁর পা-দুটো আবারও দরজার দিকে পালানোর জন্য উসখুস করে উঠল। পেশাদার কুস্তিগিরদের মতো পেল্লায় চেহারার আরও দুজন মহিলা সেই আলোর মধ্যে একেবারে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল—তাদের দুজনেরই হাতে একটা বিশাল সাদা বিছানার চাদরের দুই কোণ ধরা, আর হাতদুটো মাথার ওপর এমন উঁচুতে তোলা যে চাদরটা ঠিক একটা পর্দার মতো তাদের দুজনের মাঝখানে ঝুলছিল। রোদে-ভাসা সেই চাদরটাকে ঘিরে থাকা অন্ধকার ফুঁড়ে মিস্টার ঘানি উদয় হলেন, আর হতভম্ব আদমকে প্রায় আধ মিনিট ধরে বোকার মতো ওই অদ্ভুত দৃশ্যটার দিকে তাকিয়ে থাকার ফুরসত দিলেন। ঠিক তার পরেই, মুখ ফুটে কোনো কথা উচ্চারিত হওয়ার আগেই, ডাক্তার একটা ব্যাপার আবিষ্কার করে ফেললেন: 
   চাদরটার ঠিক মাঝখানটায় গোল করে একটা ফুটো কাটা হয়েছে, আনুমানিক সাত ইঞ্চি ব্যাসের একটা এবড়োখেবড়ো গর্ত।
   ‘দরজাটা বন্ধ করে দে তো আয়া,’ পালোয়ান গোছের প্রথম মহিলাটিকে হুকুম করলেন গনি, আর তারপর আজিজের দিকে ফিরে বেশ একটা ফিসফিসানির সুরে বলে উঠলেন: ‘এই শহরটায় অপদার্থ বখাটে ছোকরার তো কোনো অভাব নেই বুঝলেন, হতচ্ছাড়ারা সুযোগ পেলেই আমার মেয়ের ঘরে সেঁধানোর তাল খোঁজে। তাই ওর জন্য…,’ পেশিবহুল তিন মহিলার দিকে ইশারায় মাথা নেড়ে বললেন—‘এমন পাহারাদারের খুব দরকার।’
   আজিজ তখনও ওই ফুটোওয়ালা চাদরটার দিকেই তাকিয়ে ছিলেন। ঘানি তাড়া দিয়ে বললেন, ‘যাক গে, আসুন দেখি, আপনি আমার নাসিমকে একবার পরীক্ষা করে দেখবেন। একেবারে চটজলদি।’
   আমার দাদু ঘাড় ঘুরিয়ে সারা ঘরটায় একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন। ‘কিন্তু তিনি কোথায়, ঘানি সাহেব?’ শেষমেশ আর থাকতে না পেরে তিনি বলেই ফেললেন। এতে পালোয়ান মহিলারা চোখেমুখে এমন একখানা তাচ্ছিল্যের ভাব ফুটিয়ে তুলল, আর দাদুর অন্তত মনে হলো, তারা যেন নিজেদের পেশিগুলো আরও একটু শক্তপোক্ত করে বাগিয়ে ধরল যে—যদি উনি খামোখা কোনো উলটোপালটা বা চালাকির কিছু করে বসার চেষ্টা করেন, এ যেন তার আগাম প্রস্তুতি।
   ‘আহা, আপনার ধন্দটা আমি বেশ বুঝতে পারছি,’ নিজের সেই কুটিল হাসিখানা আরও একটু চওড়া করে ঘানি বললেন, ‘আপনারা এই বিলেত-ফেরত ছোকরারা মাঝে মাঝে দেশের কিছু জিনিস একেবারে বেমালুম ভুলে বসেন। ডাক্তার সাহেব, আমার মেয়ে যে একটা ভদ্রঘরের মেয়ে, তা তো বলাই বাহুল্য। সে অচেনা পুরুষমানুষের চোখের সামনে নিজের শরীর দেখিয়ে বেড়ায় না। আপনি নিশ্চয়ই বুঝবেন যে তাকে নিজের চোখে দেখার অনুমতি আপনাকে দেওয়া যাবে না, হ্যাঁ, কোনো অবস্থাতেই না; আর ঠিক সেই কারণেই আমি তাকে ওই চাদরটার ওপাশে দাঁড় করিয়ে রেখেছি। সে এখন এক্কেবারে লক্ষ্মী মেয়েটির মতো ওখানেই দাঁড়িয়ে আছে।’
   ডাক্তার আজিজের গলায় এবার রীতিমতো একটা মরিয়া সুর ফুটে উঠল। ‘ঘানি সাহেব, আপনিই বলুন তো, রোগীকে না দেখেই আমি তাকে পরীক্ষা করব কী করে?’ ঘানির মুখে সেই হাসিটি লেগেই রইল।
   ‘আমার মেয়ের শরীরের ঠিক কোন জায়গাটা পরীক্ষা করা দরকার, সেটা আপনি দয়া করে বলবেন। তখন আমি তাকে নির্দেশ দেব, যাতে সে তার শরীরের সেই নির্দিষ্ট অংশটা—ওই যে ফুটোটা দেখছেন, ঠিক তার সামনে চেপে ধরে। আর এইভাবেই, বুঝলেন কি না, পুরো কাজটা হাসিল হয়ে যাবে।’
   ‘সে না হয় হলো, কিন্তু ওর ঠিক হয়েছেটা কী?’—আমার দাদুর একেবারে হাল-ছেড়ে-দেওয়ার জোগাড়। যার জবাবে মিস্টার ঘানি, চোখ দুটো পাকিয়ে কপালে তুলে, মুখের সেই হাসিটাকে মচকে একখানা গভীর দুঃখের চেহারা ফুটিয়ে তুলে বললেন: ‘আহা রে, সোনা মা আমার! ওর যে কী সাংঘাতিক, কী ভয়ানক পেটব্যথা!’
   ‘তাই যদি হয়,’ ডাক্তার আজিজ এবার নিজের বিরক্তিটাকে যথেষ্ট সংযত করে বললেন: ‘তিনি কি দয়া করে তাঁর পেটটা আমাকে একটু দেখাবেন?’

পূর্ববর্তী পর্ব পড়ুন এখানে: [মধ্যরাতের সন্তানেরা]

মধ্যরাতের সন্তানেরা
সালমান রুশদি
অনুবাদ: দীপ মন্ডল



মন্তব্য

অনুবাদ আত্মজীবনী আর্ট-গ্যালারী আলোকচিত্র ই-বুক ইচক দুয়েন্দে ইশতেহার উৎপলকুমার বসু উপন্যাস ঋত্বিক-ঘটক কবিতা কবিতায় কুড়িগ্রাম কর্মকাণ্ড কার্ল মার্ক্স গল্প গিন্সবার্গ চার্লস বুকাওস্কি ছড়া জার্নাল জীবনী দশকথা দিনলিপি পাণ্ডুলিপি পুনঃপ্রকাশ পোয়েটিক ফিকশন প্রতিবাদ প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা প্রবন্ধ প্রিন্ট সংখ্যা বই বর্ষা সংখ্যা বসন্ত বিক্রয়বিভাগ বিবিধ বিবৃতি বিশেষ বুলেটিন বৈশাখ ভাষা-সিরিজ ভিডিও মাসুমুল আলম মুক্তগদ্য মে দিবস যুগপূর্তি রিভিউ লকডাউন শম্ভু রক্ষিত শাহেদ শাফায়েত শিশুতোষ সন্দীপ দত্ত সম্পাদকীয় সাক্ষাৎকার সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ সৈয়দ সাখাওয়াৎ স্মৃতিকথা হেমন্ত
নাম

অনুবাদ,62,আত্মজীবনী,27,আর্ট-গ্যালারী,2,আলোকচিত্র,1,ই-বুক,7,ইচক দুয়েন্দে,23,ইশতেহার,2,উৎপলকুমার বসু,26,উপন্যাস,4,ঋত্বিক-ঘটক,4,কবিতা,348,কবিতায় কুড়িগ্রাম,7,কর্মকাণ্ড,17,কার্ল মার্ক্স,1,গল্প,85,গিন্সবার্গ,2,চার্লস বুকাওস্কি,40,ছড়া,1,জার্নাল,6,জীবনী,7,দশকথা,25,দিনলিপি,1,পাণ্ডুলিপি,11,পুনঃপ্রকাশ,23,পোয়েটিক ফিকশন,1,প্রতিবাদ,1,প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা,4,প্রবন্ধ,192,প্রিন্ট সংখ্যা,5,বই,4,বর্ষা সংখ্যা,1,বসন্ত,15,বিক্রয়বিভাগ,21,বিবিধ,3,বিবৃতি,1,বিশেষ,26,বুলেটিন,4,বৈশাখ,1,ভাষা-সিরিজ,5,ভিডিও,1,মাসুমুল আলম,35,মুক্তগদ্য,45,মে দিবস,1,যুগপূর্তি,6,রিভিউ,5,লকডাউন,2,শম্ভু রক্ষিত,2,শাহেদ শাফায়েত,25,শিশুতোষ,1,সন্দীপ দত্ত,14,সম্পাদকীয়,20,সাক্ষাৎকার,25,সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ,18,সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ,55,সৈয়দ সাখাওয়াৎ,33,স্মৃতিকথা,15,হেমন্ত,1,
ltr
item
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন: সালমান রুশদির মিডনাইটস চিলড্রেন (পর্ব ৩) • বাংলা অনুবাদ: দীপ মন্ডল
সালমান রুশদির মিডনাইটস চিলড্রেন (পর্ব ৩) • বাংলা অনুবাদ: দীপ মন্ডল
মধ্যরাতের সন্তানেরা • সালমান রুশদির বুকারজয়ী উপন্যাস মিডনাইটস চিলড্রেন-এর বাংলা অনুবাদ করেছেন দীপ মন্ডল৷
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEgeRgp7MV3MVjqdWQPggKmrClfDaNWkTe904uIJl0sgQrdxlrfbiRislYW-ZvIBYZwiH1DRyUuKu7h9sjp1t6n5ZK7LCabxeNkcRaAu3lEsXyiE3ArUMz-1EWiStFZ4cm_O5bNsMWBk9mwLwPtNZ6aW8c0AgehsYz0lXOZ-0CG68AgShSTQkWU-wGvxrHs/s1600/%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%A1%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%9F%E0%A6%B8%20%E0%A6%9A%E0%A6%BF%E0%A6%B2%E0%A6%A1%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%A8%20%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A8%20%E0%A6%B0%E0%A7%81%E0%A6%B6%E0%A6%A6%E0%A6%BF%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%81%20%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%9F%E0%A6%B2%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%97.png
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEgeRgp7MV3MVjqdWQPggKmrClfDaNWkTe904uIJl0sgQrdxlrfbiRislYW-ZvIBYZwiH1DRyUuKu7h9sjp1t6n5ZK7LCabxeNkcRaAu3lEsXyiE3ArUMz-1EWiStFZ4cm_O5bNsMWBk9mwLwPtNZ6aW8c0AgehsYz0lXOZ-0CG68AgShSTQkWU-wGvxrHs/s72-c/%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%A1%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%9F%E0%A6%B8%20%E0%A6%9A%E0%A6%BF%E0%A6%B2%E0%A6%A1%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%A8%20%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A8%20%E0%A6%B0%E0%A7%81%E0%A6%B6%E0%A6%A6%E0%A6%BF%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%81%20%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%9F%E0%A6%B2%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%97.png
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন
https://www.bindumag.com/2026/07/midnights-children-3.html
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/2026/07/midnights-children-3.html
true
121332834233322352
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts আরো Readmore উত্তর Cancel reply মুছুন By নী PAGES POSTS আরো এই লেখাগুলিও পড়ুন... বিষয় ARCHIVE SEARCH সব লেখা কোন রচনায় খুঁজে পাওয়া গেল না নীড় Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share to a social network STEP 2: Click the link on your social network Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy