.header-button .inner > span { font-size: 18px !important; } .header-button .inner i.fa { font-size: 40px !important; } .comment-form-message { background-color: #f4f4f4 !important; font-size: 14px !important; }

$type=ticker$count=12$cols=4$cate=0$sn=0$show=post

সালমান রুশদির মিডনাইটস চিলড্রেন (পর্ব ৬.৩) • বাংলা অনুবাদ: দীপ মন্ডল

সালমান রুশদির মিডনাইটস চিলড্রেন (পর্ব ১) • বাংলা অনুবাদ: দীপ মন্ডল
পুস্তক ১ • অধ্যায় ৬ • পর্ব ৩

বহু-মাথাওয়ালা রাক্ষসেরা

MANY-HEADED MONSTERS

একেবারে পিনপতন নীরবতা তখন—গলায় শিকল-বাঁধা বাঁদরের দল কিচিরমিচির থামিয়ে দিয়েছে—সাপেরা সব কুণ্ডলী পাকিয়ে চুপচাপ ঝুড়ির ভেতর—আর তাদের মাঝখানে সেই জ্যোতিষী ঘুরপাক খাচ্ছে, যেন ইতিহাস স্বয়ং ভর করেছে তার জিভে। (কেমন করে হল এমনটা?) শুরুটা হলো এইভাবে, ‘পুত্র... একখানা পুত্র বটে!’ তারপরই সেই অমোঘ বাণী, ‘এমন এক পুত্র, সাহিবা, যে তার জন্মভূমির চেয়ে এক মুহূর্তের বড়ও হবে না, আবার ছোটও না।’ ততক্ষণে হাড়হিম করা ভয় নেমে এসেছে সেই আসরে—সাপুড়ে, বেজি-নাচানেওয়ালা, হাড়ভাঙা বদ্যি, এমনকী বায়োস্কোপ-ওলা—সবাই থমকে গেছে। রামরামকে তারা এমন মূর্তিতে আগে কখনও দেখেনি। তার গলার স্বর এখন চড়া, অনেকটা সুর করে ছড়া কাটার মতো বলছে: ‘তার দুটো মুন্ডু হবে—কিন্তু চোখে পড়বে কেবল একটাই—হাঁটু আর নাক থাকবে তার, নাক আর হাঁটু।’ নাক আর হাঁটু, হাঁটু আর নাক... ভালো করে শোনো পদ্মা; লোকটা কিন্তু একটা কথাও ভুল বলেনি! ‘খবরের কাগজে তার জয়জয়কার, দুই মা তাকে মানুষ করে তুলবে! সাইকেলওলার বড় পেয়ারের মানুষ হবে সে—কিন্তু ভিড়ের ধাক্কা তাকে রেহাই দেবে না! বোনেরা কাঁদবে জোরে-জোরে; কেউটে সাপ ফণা তুলবে…’ রামরাম শেঠ তখন বনবন করে ঘুরছে—আরও জোরে, আরও জোরে। চারজন কাজিন বিড়বিড় করে বলছে, ‘হচ্ছেটা কী বাবা?’ কেউ-বা বলছে, ‘হে দেবাদিদেব মহাদেব, রক্ষা করো!’ ওদিকে রামরাম থামার পাত্র নয়: ‘ধোপার কাপড় তাকে আড়াল করবে— কণ্ঠস্বর তাকে পথ দেখাবে! বন্ধুরাই তাকে খুবলে খাবে—নিজের রক্তই দেবে দাগা!’ আমিনা সিনাইয়ের তখন আকুল অবস্থা, ‘ও কী বলছে সব? লিফাফা দাস—কী হল লোকটার, বলো তো?’ কিন্তু কে শোনে কার কথা! রামরাম শেঠ যেন থামতেই ভুলে গেছে, মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকা মায়ের চারপাশে সে ঘুরেই চলেছে, চোখে সেই ডিমের মতো সাদা ভাব: ‘পিকদানির ঘায়ে মাথা ফাটবে—ডাক্তারেরা সব শুষে নেবে—জঙ্গল তাকে গিলে খাবে—আবার জাদুকরেরা তাকে ফিরিয়েও আনবে! সেপাইরা তাকে পরখ করবে—স্বৈরাচারীরা তাকে ঝলসাবে…’ আমিনা তখন হন্যে হয়ে এসবের মানে জানতে চাইছে, আর কাজিনরা ভয়ে দিশাহারা হয়ে হাত-পা ছুঁড়ছে—কারণ বোঝা যাচ্ছে কোনো এক অপার্থিব শক্তি ভর করেছে লোকটার ওপর, রামরাম শেঠ এখন ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। ঘুরতে ঘুরতে সে তার শেষ কথাগুলোর দিকে এগিয়ে গেল: ‘ছেলে না হয়েও তার ছেলেপুলে হবে! বুড়ো না হয়েও সে বুড়িয়ে যাবে! আর সে মরবে... মৃত্যু আসার আগেই।’
   ব্যাপারটা কি ঠিক এভাবেই ঘটেছিল? ঠিক ওই মুহূর্তেই কি রামরাম শেঠ, নিজের চেয়েও বিশাল এক অসীম শক্তির তীব্র ধাক্কা শরীর দিয়ে বয়ে যাওয়ার ধকল সইতে না পেরে আচমকা মেঝেতে লুটিয়ে পড়েছিল, আর তার মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা বেরোতে শুরু করেছিল কি? বেজিওয়ালার লাঠিটা কি গুঁজে দেওয়া হয়েছিল তার ওই খিঁচিয়ে-থাকা কাঁপতে-থাকা দাঁতের ফাঁকে? লিফাফা দাস কি তখন বলে উঠেছিল, ‘বেগম সাহিবা, দয়া করে আপনি এবার আসুন: দাদার শরীরটা বেজায় খারাপ হয়ে পড়েছে’?
   আর সবশেষে সেই সাপুড়ে—কিংবা বাঁদর-নাচানেওয়ালা, বা হাড়-ভাঙা বদ্যি, এমনকী চাকা-লাগানো বায়োস্কোপের মালিক সেই লিফাফা দাসই হয়তো—কেউ একজন বলে উঠল, ‘বড্ড বেশি হয়ে গেল হে, বড্ড বেশি। আমাদের রামরাম আজ রাতে একটু বেশিই ভবিষ্যৎবাণী করে ফেলেছে।’
   অনেক অনেক বছর পরের কথা। মায়ের তখন সময়ের আগেই বার্ধক্য এসে গেছে, ভীমরতি ধরেছে। অতীতের যত সব প্রেতাত্মা সব ভিড় করে এসে চোখের সামনে নাচানাচি জুড়ে দেয়। ঠিক সেই সময় মা আবারও দেখতে পেল সেই বায়োস্কোপ-ওয়ালাকে—যাকে একদিন আমার পৃথিবীতে আসার কথা ঘোষণা করে মা যমের দুয়ার থেকে ফিরিয়ে এনেছিল, আর লোকটাও যার প্রতিদান দিয়েছিল মাকে ওই হাড়হিম করা ভবিষ্যৎবাণীর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে। মা তার সঙ্গে কথা বলল একেবারে ভাবলেশহীন শান্ত গলায়, কোনো রাগ বা ঝাঁঝ না রেখে। বলল, ‘তা তুমি ফিরে এসেছ? বেশ, তোমাকে একটা কথা বলি শোনো। তোমার ওই খুড়তুতো ভাই কী সব বলে গেছিল—রক্ত, ওই নাক আর হাঁটুর ব্যাপারে—তার মানেটা যদি তখন বুঝতাম! কে জানে বাবা? হয়তো আমার কপালে অন্যরকম একটা ছেলে জুটত।’
   একেবারে শুরুর দিকে এক অন্ধ মানুষের বাড়ির মাকড়সার-জালে-ছাওয়া বারান্দায় আমার দাদুর ঠিক যেমনটা হয়েছিল, একেবারে অন্তিম সময়েও যেমনটা ঘটেছিল; নিজের জোসেফকে হারানোর পর মেরি পেরেইরার মতো, ঠিক আমারই মতো—আমার মা-ও কিন্তু ভূত দেখার ব্যাপারে বেশ ওস্তাদ ছিল।
  ...কিন্তু এখন, যেহেতু মনের ভেতর আরও হাজারটা প্রশ্ন আর ধোঁয়াশা পাক খাচ্ছে, আমি বাধ্য হচ্ছি আমার কিছু খটকাকে উসকে দিতে। সন্দেহ জিনিসটাও এক বহুমাথাওলা রাক্ষস; তা না হলে নিজের মায়ের ওপর কেনই-বা তাকে লেলিয়ে দিতে যাব আমি? ...আচ্ছা, ওই গণৎকারের পেটের বর্ণনাটা ঠিক কী রকম দেওয়া যায়? আমার স্মৃতি—সেই নতুন পাওয়া সর্বজ্ঞানী স্মৃতি, যার মণিকোঠায় মা-বাবা-দাদু-দিদিমা আর আরও কতজনের জীবন জমা আছে—সে চটপট জবাব দেয়: নরম; একেবারে যেন কর্নফ্লাওয়ারের থলথলে পুডিং। আবারও, খানিকটা অনিচ্ছাসত্ত্বেই জিজ্ঞেস করি: তার ঠোঁটদুটো কেমন ছিল? অমোঘ উত্তর আসে: বেশ ভরাট; মাংসল; ভারি কাব্যিক। তৃতীয়বার জেরা করি আমার স্মৃতিকে: আর চুল? উত্তর: পাতলা হয়ে আসা; কালো; নেতিয়ে পড়া; কানের ওপর দিয়ে কিলবিল করছে। আর এবার আমার সেই অযৌক্তিক সন্দেহবাতিক শেষ প্রশ্নটা করেই বসে... আমিনা, যিনি কিনা সতী-সাধ্বী, তিনি কি আসলে... নাদির খানের মতো দেখতে পুরুষদের প্রতি তাঁর ওই দুর্বলতার কারণে... তিনি কি অদ্ভুত মানসিক অবস্থায়, আর গণৎকারের অসুস্থতায় বিচলিত হয়ে… ‘না!’ পদ্মা একেবারে ফুঁসে ওঠে। ‘তোমার সাহস তো কম নয়? অমন একজন ভালোমানুষ—তোমার নিজের মা সম্পর্কে এমন কথা? তিনি এমনটা করবেন? কিছু জানো না বোঝো না, যা মুখে এল বলে দিলে?’ আর অবশ্যই, ও ঠিকই বলেছে, সবসময়ের মতো। ও যদি জানত, তবে বলত আমি আসলে শোধ নিচ্ছি। বহু বছর পর পাইওনিয়ার কাফের ওই কালিমালিপ্ত জানলার কাঁচ দিয়ে আমিনাকে আমি যা করতে দেখেছিলাম, আর হয়তো সেখান থেকেই আমার এই অমূলক ধারণার জন্ম, যা সময়ের উলটোপথে অযৌক্তিকভাবে বেড়ে উঠে, অনেক আগের এই—আর হ্যাঁ, বলতে গেলে একেবারে নির্দোষ—অভিযানের ওপর এসে পুরোপুরি ডালপালা মেলে বসেছে। হ্যাঁ, এমনটাই হবে হয়তো। কিন্তু রাক্ষসটা যে বাগে আসার নয়… ‘আহ,’ সে বলে ওঠে, ‘কিন্তু তার ওই মেজাজ দেখানোর ব্যাপারটা কী হবে—যেদিন আহমেদ বম্বে যাওয়ার কথা ঘোষণা করেছিল, সেদিন সে যে-রাগটা দেখিয়েছিল?’ এবার সে আমিনার গলা নকল করে: ‘তুমি—সবসময় তুমিই সিদ্ধান্ত নাও। আর আমার কী হবে? ধরো আমি যদি না চাই... এই তো সবেমাত্র আমি এই ঘরদোর গুছিয়ে ঠিকঠাক করলাম আর এরই মধ্যে...!’ কাজেই, পদ্মা: ওটা কি নিছকই একজন গৃহবধূর সংসার-গোছানোর তাগিদ ছিল—নাকি শুধুই এক ভান?
   হ্যাঁ—তবু একটা খটকা কিন্তু থেকেই যায়। সেই রাক্ষসটা এবার প্রশ্ন তোলে, ‘যে করেই হোক, সে তার স্বামীকে নিজের ওই সেখানে যাওয়ার কথাটা খুলে বলতে পারল না কেন?’ কাঠগড়ায়-দাঁড়ানো আসামির তখন যা জবাব দেওয়ার কথা (আমার মায়ের অবর্তমানে আমাদের পদ্মাই যেন তার হয়ে বলে উঠল): ‘ওরে বাবা, ভেবে দেখো তো একবার, শুনলে উনি কী ভয়ানক চটে যেতেন! খোদা! এমনিতেই ওই সব আগুন-লাগানো পার্টিদের উৎপাত নিয়ে ওঁর চিন্তার শেষ ছিল না! তার ওপর কোথাকার কোন অচেনা-অজানা পুরুষমানুষ; আর সেখানে কিনা একা একটা মেয়েমানুষ—শুনলে ওঁর মাথা খারাপ হয়ে যেত গো! একেবারে ক্ষেপে লাল হয়ে যেতেন!’
     একেবারে অমূলক সব সন্দেহ... আমাকে এগুলো মন থেকে ঝেড়ে ফেলতেই হবে; আমার এই কড়া বিচারগুলো তোলা থাক বরং সেই পরের জন্য, যখন সব ধোঁয়াশা কেটে গিয়ে, অস্পষ্টতার পর্দাটা সরে যাওয়ার পর মা নিজেই আমার হাতে তুলে দিয়েছিল একেবারে নিরেট, স্পষ্ট আর অকাট্য সব প্রমাণ।
   ...কিন্তু, তা তো হওয়ারই ছিল। সেদিন অনেক রাতে বাবা যখন বাড়ি ফিরল, তখন তার গা থেকে ভুরভুর করছে পচা নর্দমার কটু গন্ধ—আসন্ন ব্যর্থতার যে চেনা গন্ধটা বাবার গা থেকে সবসময় বেরোয়, তাকেও আজ ছাপিয়ে গেছে সেই পচা গন্ধ। চোখের জলে ছাই মিশে গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ার কালচে দাগ; নাকের পাটায় বারুদের ঝাঁঝ, আর মাথায় জমে আছে পোড়া রেক্সিনের ছাইরঙা ধুলো... কারণ যা ঘটার ছিল তা তো ঘটেইছে, ওরা গুদামে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে।
     ‘কিন্তু ওই নৈশপ্রহরীরা?’—ঘুমোচ্ছিল, পদ্মা, অঘোরে ঘুমোচ্ছিল। আগেভাগেই তাদের সাবধান করে দেওয়া হয়েছিল যাতে পরিস্থিতি বুঝলে তারা ঘুমের ওষুধ খেয়ে নেয়... সেইসব বীর লালা, লড়াকু পাঠানের দল, যারা কিনা এই শহরেই জন্মেছে আর জীবনে কোনোদিন খাইবার পাস চোখেও দেখেনি, তারা ছোটো ছোটো কাগজের মোড়ক খুলে ফুটন্ত চায়ের ডেকচিতে মরচে-রঙা গুঁড়ো ঢেলে দিল। খসে-পড়া কড়িকাঠ আর আগুনের ফুলকির হাত থেকে বাঁচতে তারা তাদের চারপাইগুলো আমার বাবার গোডাউন থেকে বেশ খানিকটা দূরে সরিয়ে নিয়ে গেল; আর দড়ির খাটিয়ায় শুয়ে শুয়ে তারা চায়ে চুমুক দিল আর ধীরে ধীরে সেই নেশার তেতো-মিঠে এক অদ্ভুত ঘোরে তলিয়ে যেতে লাগল। প্রথমটায় তারা বেশ বেপরোয়া হয়ে উঠল, পশতু ভাষায় চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে নিজেদের প্রিয় বেশ্যাদের রূপের তারিফ করতে শুরু করল; তারপর নেশার নরম, ফুরফুরে আঙুলগুলো যখন তাদের পাঁজরে সুড়সুড়ি দিতে শুরু করল, তখন তারা পাগলের মতো খিকখিক করে হাসতে লাগল... যতক্ষণ না সেই হাসির জায়গা নিল একরাশ স্বপ্ন, আর তারা সেই নেশার ঘোড়ায় চেপে নেশারই এক অজানা গিরিপথে ঘুরে বেড়াতে লাগল, আর শেষমেশ তলিয়ে গেল এক স্বপ্নহীন বিস্মৃতির অতলে, যেখান থেকে নেশার ঘোর পুরোপুরি না-কাটা পর্যন্ত দুনিয়ার কোনো শক্তিই তাদের আর জাগিয়ে তুলতে পারত না।
   ট্যাক্সিতে করে এসে পৌঁছোল আহমেদ, বাট আর কামাল। ট্যাক্সিওয়ালাটা এমনিতেই ঘাবড়ে ছিল, কারণ লোক তিনটের হাতের মুঠোয় দলা-পাকানো টাকার তাড়া, আর নর্দমার নোংরা ঘাঁটার ফলে সেই টাকা থেকে নরকের চেয়েও জঘন্য গন্ধ বেরোচ্ছে। লোকটা এক মুহূর্তও দাঁড়াত না, কিন্তু মুশকিল হলো ওরা তাকে ভাড়ার পয়সাটাই দিচ্ছিল না। ‘বাবু, আমাকে ছেড়ে দিন,’ সে কাকুতিমিনতি করতে লাগল, ‘আমি ছোটো মানুষ; আমাকে আর এখানে আটকে রাখবেন না…’ কিন্তু ততক্ষণে তাকে পেছনে ফেলে তারা আগুনের দিকে ছুট লাগিয়েছে। সে অবাক হয়ে দেখল, টম্যাটো আর কুকুরের বিষ্ঠা-মাখা টাকার তাড়া বুকে জড়িয়ে ধরে তারা দৌড়াচ্ছে। হাঁ করে সে জ্বলতে থাকা গোডাউন আর রাতের আকাশের মেঘগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। আর সেখানে জড়ো হওয়া বাকি সব মানুষের মতো তাকেও বাধ্য হয়ে সেই পোড়া রেক্সিন, দেশলাই আর চাল-পোড়া গন্ধে ভারী দমবন্ধ-করা হাওয়াটুকু বুকে টানতে হলো। চোখের ওপর হাত ঢেকে, আঙুলের ফাঁক দিয়ে তাকাতে তাকাতে ওই অগোছালো গোঁফওয়ালা বেঁটে ট্যাক্সিচালক দেখতে পেল, পাগল-পারা পেন্সিলের মতো লিকলিকে মিস্টার কামাল ঘুমন্ত দারোয়ানগুলোর গায়ে চাবুক আর লাথি কষাচ্ছে। আর ঠিক যে-মুহূর্তে আমার বাবা চেঁচিয়ে উঠল, ‘সাবধান!’... সে তো প্রায় ভাড়ার মায়া ত্যাগ করে ভয়ে গাড়ি ছুটিয়ে পালাচ্ছিলই। কিন্তু এত কিছুর পরেও সে রয়ে গেল। সে দেখল, আগুনের লকলকে লাল শিখার দাপটে গোডাউনটা কেমন ফেটে চৌচির হয়ে গেল। সে দেখল, গোডাউনের ভেতর থেকে গলানো চাল, ডাল, ছোলা, বর্ষাতি, দেশলাই আর আচারের এক অভাবনীয় লাভাস্রোত যেন হুড়মুড় করে বেরিয়ে আসছে। সে দেখল, আগুনের গনগনে লাল ফুলগুলো আকাশের দিকে ছিটকে উঠছে, আর গুদামের ভেতরের মালপত্রগুলো হতাশার এক কালো পোড়া হাতের মতো শক্ত হলুদ মাটির ওপর আছড়ে পড়ছে। হ্যাঁ, গোডাউনটা তো পুড়লই, সেটা আকাশ থেকে অঙ্গার হয়ে ওদের মাথার ওপর ঝরে পড়তে লাগল, আর সেই মার-খাওয়া অথচ তখনও নাক-ডাকতে থাকা দারোয়ানগুলোর হাঁ-করা মুখের ভেতর গিয়ে ঢুকতে লাগল… ‘খোদা আমাদের রক্ষে করো,’ মিস্টার বাট বলে উঠল। কিন্তু মুস্তাফা কামাল বেশি বাস্তববাদী, তাই সে জবাব দিল: ‘যাক বাবা, বাঁচোয়া যে আমাদের ভালোই ইনস্যুরেন্স করা আছে।’
   ‘ঠিক তখনই,’ আহমেদ সিনাই পরে তার স্ত্রীকে বলেছিল, ‘একেবারে ঠিক ওই মুহূর্তেই আমি ঠিক করে ফেললাম যে রেক্সিনের কারবারটা এবার ছেড়েই দেব। অফিস, ব্যবসার সুনাম সব বেচে দেব, আর রেক্সিনের ব্যবসা নিয়ে যা-কিছু জানি সব একেবারে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলব। আর তখনই—তার এক মুহূর্ত আগেও নয়, বা পরেও নয়—আমি এটাও পাকাপাকিভাবে ঠিক করে ফেললাম যে, তোমার এমেরাল্ডের ওই জুলফির পাকিস্তান-টাকিস্তান নিয়ে ওইসব ফালতু বুলি নিয়ে আর একটুও মাথা ঘামাব না। ওই আগুনের আঁচেই,’ আমার বাবা কথাটা ফাঁস করল—যার ফলে তার স্ত্রীর সেই তুমুল রাগ আর মেজাজ দেখানোর সূত্রপাত ঘটেছিল—‘আমি ঠিক করি যে বম্বে গিয়ে আমি জমিজমার ব্যবসায় নামব। ওখানে জায়গাজমির দাম এখন একেবারে জলের দরে,’ স্ত্রীর মুখের কথা বা প্রতিবাদ শুরু হওয়ার আগেই সে বলে উঠল, ‘নার্লিকার সব জানে।’
   (তবে হ্যাঁ, পরে একসময় সে এই নার্লিকারকেই বেইমান বলে গাল পাড়বে।)
   আমাদের বংশের একটা অলিখিত নিয়মই হলো, পেছন থেকে ধাক্কা না-খেলে আমরা কোথাও থেকে নড়ি না—আটচল্লিশ সালের সেই হাড়-কাঁপানো শীতটাই যা শুধু এই নিয়মের একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল। নৌকার মাঝি তাই আমার দাদুকে কাশ্মীর থেকে তাড়িয়ে ছেড়েছিল; অমৃতসর থেকে তাঁকে তাড়া করেছিল সেই মারকিউরোক্রোম; কার্পেটের আড়ালে নিজের জীবনটা তাসের ঘরের মতো ধসে পড়ার কারণেই আমার মাকে সোজাসুজি আগ্রা ছাড়তে হয়েছিল; আর বহু-মাথাওয়ালা রাক্ষসের দল আমার বাবাকে সোজা বম্বে পাঠিয়ে ছাড়ল, যাতে করে আমার জন্মটা ঠিক ওখানেই হতে পারে। সেই জানুয়ারি মাসের শেষদিকে, একের পর এক ধাক্কা খেতে খেতে ইতিহাস শেষমেশ নিজেকে এমন এক জায়গায় এনে দাঁড় করাল, যেখানে আমার এই পৃথিবীতে এসে পড়ার জন্য সে প্রায় পুরোপুরি তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এমন বেশ কিছু রহস্য ছিল, আমি নিজে এসে হাজির না-হওয়া পর্যন্ত যেগুলোর জট খোলা একেবারে অসম্ভব ছিল... এই যেমন ধরুন, শ্রী রামরামের সেই সবচেয়ে গোলমেলে আর রহস্যময় কথাটার রহস্য: ‘থাকবে একটা নাক আর হাঁটু: হাঁটু আর একটা নাক।’

ইনস্যুরেন্সের টাকা এসে গেল; জানুয়ারি মাসটাও ফুরোল; আর দিল্লির সমস্ত পাট চুকিয়ে সেই শহরে গিয়ে ওঠার মাঝখানের এই সময়টাতে—যে-শহরে, স্ত্রী-রোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার নার্লিকারের জানামতে, জায়গাজমির দাম সাময়িকভাবে একেবারে জলের দরে বিকোচ্ছে—আমার মা তার স্বামীকে ধাপে ধাপে ভালোবাসতে শেখার সেই ফন্দিটার ওপর পুরোপুরি মন ঢেলে দিল। মানুষটার কানের ওই প্রশ্নবোধক চিহ্নের মতো গড়নটার ওপর মায়ের এক গভীর মায়া জন্মে গেল; মায়া জন্মাল তার নাভির সেই অবাক-করা গভীরতার প্রতিও, যার ভেতর বিন্দুমাত্র জোর না-দিয়েই মায়ের আঙুল একেবারে প্রথম গাঁট অবধি দিব্যি ঢুকে যেত; তার হাঁটুর ওই উঁচু হয়ে থাকা গাঁটগুলোকেও মা ভালোবাসতে শুরু করল; কিন্তু, সে যতই চেষ্টা করুক না কেন (আর যেহেতু আমি তার দিকেই পাল্লা ভারী রাখছি, তাই সম্ভাব্য কোনো কারণ আমি আর এখানে খাড়া করছি না), মানুষটার এমন একটা অংশ ছিল যেটাকে সে কিছুতেই ভালোবেসে উঠতে পারল না, যদিও ওই একটা জিনিসই তার পুরোদস্তুর সচল আর কর্মক্ষম ছিল, নাদির খানের যেটার নিশ্চিতভাবেই ঘোর অভাব ছিল; সেইসব রাতে মানুষটা যখন নিজের ভারী শরীরটা মায়ের ওপর চাপিয়ে দিত—মায়ের পেটের বাচ্চাটা তখন একটা ব্যাঙের চেয়ে কোনো অংশেই বড়ো নয়—তখন ব্যাপারটা তার কাছে মোটেই সুবিধের লাগত না।
   ... ‘না, এত তাড়াতাড়ি নয়, জানুম, আমার জান, দয়া করে আর একটুখানি,’ সে বলছে; আর আহমেদ, সময়টাকে আরেকটু টেনে বাড়ানোর জন্য, সেই আগুনের কথা মনে করার চেষ্টা করছে, সেই দাউদাউ করে জ্বলে-ওঠা রাতের একেবারে শেষ ঘটনাটার কথা। সেবার যখন সে ফিরে যাওয়ার জন্য সবেমাত্র ঘুরে দাঁড়িয়েছে, ঠিক তখনই আকাশের বুক চিরে এক বিশ্রী তীক্ষ্ণ চিৎকার সে শুনতে পেয়েছিল। ওপরের দিকে তাকাতেই সে টের পেল যে একটা শকুন—ভাবা যায়, এত রাতে!—টাওয়ার্স অফ সাইলেন্স থেকে উড়ে আসা একটা শকুন ঠিক মাথার ওপর দিয়ে চক্কর কাটছে। আর সেটা একটা আধ-চাবানো পার্সির হাত নিচে ফেলে দিয়েছে, একটা ডান হাত, যে-হাতটা—এই রে!—নিচে পড়ার মুখে সজোরে তার গালে একখানা চড় কষিয়ে দিল; আর ঠিক সেই সময়েই বিছানায় তার নিচে শুয়ে আমিনা নিজের মনেই নিজেকে বকতে শুরু করেছে: তুই এমন আস্ত বোকা কেন রে মেয়ে, একটুও কি আনন্দ পাস না, এখন থেকে তোকে সত্যিই মন দিয়ে চেষ্টা করতে হবে।
   ৪’ঠা জুন, আমার সেই বেমানান বাবা-মা ফ্রন্টিয়ার মেলে চেপে বম্বের উদ্দেশে রওনা দিল। (ট্রেনের গায়ে তখন বাদুড়ঝোলা মানুষের ভিড়, প্রাণের মায়ায় আঁকড়ে-থাকা সব আর্তনাদ, আর মুঠি-পাকানো হাতের আকুতি ভেসে আসছিল, ‘মহারাজ! একটা সেকেন্ডের জন্য দরজাটা একটু খুলুন! ও বাবু, আপনার দয়ার শরীর, একটুখানি দয়া করুন গো!’) আর তার সঙ্গেই ছিল—একটা সবুজ রঙের টিনের তোরঙ্গের ভেতর বিয়ের যৌতুকের ঠিক নিচে লুকিয়ে রাখা—সেই নিষিদ্ধ, ল্যাপিস-ল্যাজুলি পাথর-বসানো, নিখুঁত আর সূক্ষ্ম কারুকাজে ভরা সেই রুপোর পিকদানিটা।) ঠিক ওই একই দিনে, বার্মার আর্ল মাউন্টব্যাটেন এক সাংবাদিক সম্মেলন করে ভারতবর্ষ ভাগের কথা ঘোষণা করলেন, আর দেয়ালে তাঁর সেই উলটোগুনতির ক্যালেন্ডারটা টাঙিয়ে দিলেন: ক্ষমতা হস্তান্তরের আর মোটে সত্তর দিন বাকি... ঊনসত্তর... আটষট্টি... টিক, টক।

পূর্ববর্তী পর্ব পড়ুন এখানে: [মধ্যরাতের সন্তানেরা]

মধ্যরাতের সন্তানেরা
সালমান রুশদি
অনুবাদ: দীপ মন্ডল


মন্তব্য

অনুবাদ আত্মজীবনী আর্ট-গ্যালারী আলোকচিত্র ই-বুক ইচক দুয়েন্দে ইশতেহার উৎপলকুমার বসু উপন্যাস ঋত্বিক-ঘটক কবিতা কবিতায় কুড়িগ্রাম কর্মকাণ্ড কার্ল মার্ক্স গল্প গিন্সবার্গ চার্লস বুকাওস্কি ছড়া জার্নাল জীবনী দশকথা দিনলিপি পাণ্ডুলিপি পুনঃপ্রকাশ পোয়েটিক ফিকশন প্রতিবাদ প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা প্রবন্ধ প্রিন্ট সংখ্যা বই বর্ষা সংখ্যা বসন্ত বিক্রয়বিভাগ বিবিধ বিবৃতি বিশেষ বুলেটিন বৈশাখ ভাষা-সিরিজ ভিডিও মাসুমুল আলম মুক্তগদ্য মে দিবস যুগপূর্তি রিভিউ লকডাউন শম্ভু রক্ষিত শাহেদ শাফায়েত শিশুতোষ সন্দীপ দত্ত সম্পাদকীয় সাক্ষাৎকার সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ সৈয়দ সাখাওয়াৎ স্মৃতিকথা হেমন্ত
নাম

অনুবাদ,69,আত্মজীবনী,27,আর্ট-গ্যালারী,2,আলোকচিত্র,1,ই-বুক,7,ইচক দুয়েন্দে,23,ইশতেহার,2,উৎপলকুমার বসু,26,উপন্যাস,18,ঋত্বিক-ঘটক,6,কবিতা,353,কবিতায় কুড়িগ্রাম,7,কর্মকাণ্ড,18,কার্ল মার্ক্স,1,গল্প,88,গিন্সবার্গ,3,চার্লস বুকাওস্কি,40,ছড়া,1,জার্নাল,9,জীবনী,7,দশকথা,25,দিনলিপি,1,পাণ্ডুলিপি,11,পুনঃপ্রকাশ,24,পোয়েটিক ফিকশন,1,প্রতিবাদ,1,প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা,4,প্রবন্ধ,200,প্রিন্ট সংখ্যা,5,বই,5,বর্ষা সংখ্যা,1,বসন্ত,15,বিক্রয়বিভাগ,21,বিবিধ,3,বিবৃতি,1,বিশেষ,26,বুলেটিন,4,বৈশাখ,1,ভাষা-সিরিজ,5,ভিডিও,1,মাসুমুল আলম,35,মুক্তগদ্য,47,মে দিবস,1,যুগপূর্তি,6,রিভিউ,5,লকডাউন,2,শম্ভু রক্ষিত,2,শাহেদ শাফায়েত,25,শিশুতোষ,1,সন্দীপ দত্ত,14,সম্পাদকীয়,20,সাক্ষাৎকার,26,সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ,18,সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ,55,সৈয়দ সাখাওয়াৎ,33,স্মৃতিকথা,15,হেমন্ত,1,
ltr
item
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন: সালমান রুশদির মিডনাইটস চিলড্রেন (পর্ব ৬.৩) • বাংলা অনুবাদ: দীপ মন্ডল
সালমান রুশদির মিডনাইটস চিলড্রেন (পর্ব ৬.৩) • বাংলা অনুবাদ: দীপ মন্ডল
মধ্যরাতের সন্তানেরা • সালমান রুশদির বুকারজয়ী উপন্যাস মিডনাইটস চিলড্রেন-এর বাংলা অনুবাদ করেছেন দীপ মন্ডল৷
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEgeRgp7MV3MVjqdWQPggKmrClfDaNWkTe904uIJl0sgQrdxlrfbiRislYW-ZvIBYZwiH1DRyUuKu7h9sjp1t6n5ZK7LCabxeNkcRaAu3lEsXyiE3ArUMz-1EWiStFZ4cm_O5bNsMWBk9mwLwPtNZ6aW8c0AgehsYz0lXOZ-0CG68AgShSTQkWU-wGvxrHs/s1600/%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%A1%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%9F%E0%A6%B8%20%E0%A6%9A%E0%A6%BF%E0%A6%B2%E0%A6%A1%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%A8%20%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A8%20%E0%A6%B0%E0%A7%81%E0%A6%B6%E0%A6%A6%E0%A6%BF%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%81%20%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%9F%E0%A6%B2%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%97.png
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEgeRgp7MV3MVjqdWQPggKmrClfDaNWkTe904uIJl0sgQrdxlrfbiRislYW-ZvIBYZwiH1DRyUuKu7h9sjp1t6n5ZK7LCabxeNkcRaAu3lEsXyiE3ArUMz-1EWiStFZ4cm_O5bNsMWBk9mwLwPtNZ6aW8c0AgehsYz0lXOZ-0CG68AgShSTQkWU-wGvxrHs/s72-c/%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%A1%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%9F%E0%A6%B8%20%E0%A6%9A%E0%A6%BF%E0%A6%B2%E0%A6%A1%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%A8%20%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A8%20%E0%A6%B0%E0%A7%81%E0%A6%B6%E0%A6%A6%E0%A6%BF%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%81%20%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%9F%E0%A6%B2%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%97.png
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন
https://www.bindumag.com/2026/09/midnights-children-17.html
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/2026/09/midnights-children-17.html
true
121332834233322352
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts আরো Readmore উত্তর Cancel reply মুছুন By নী PAGES POSTS আরো এই লেখাগুলিও পড়ুন... বিষয় ARCHIVE SEARCH সব লেখা কোন রচনায় খুঁজে পাওয়া গেল না নীড় Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share to a social network STEP 2: Click the link on your social network Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy