বাংলাদেশ জন্মের ক্রান্তিকালের একটি সত্যকে, বিশেষ করে ইতিহাস বিমুখ আমরা অনেকেই, মোটা দাগে বিচার করতে গিয়ে মারাত্মক ভুল করে বসি। মুক্তিযুদ্ধে যেহেতু মার্কিন প্রশাসনের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ ছিল; কাজেই ধরে নেওয়া হয় গোটা দেশটিই ছিল আমাদের বিপক্ষে। এমন ধারণা এখন পর্যন্ত অনেকেই পোষণ করেন, যা একেবারেই সঠিক নয়। নিক্সন-কিসিঞ্জার প্রশাসন বাংলাদেশের বিপক্ষে দাঁড়ালেও, দেশটির গণমাধ্যম, সাধারণ জনগণ থেকে শুরু করে বুদ্ধিজীবীদের অনেকে এমনকি সরকারি কিছু কর্মকর্তাও একাত্তরে বাংলাদেশের স্বপক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। পাকিস্তানি জান্তার অমানবিক তাণ্ডবের বিরুদ্ধে বিশ্বকে জানানোর আন্তরিক চেষ্টায় সেই সুহৃদেরা সরব হয়েছিলেন। সেসময়ে ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত কেনেথ কিটিং, সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি, ফ্রেড হ্যারিস, সাংবাদিক সিডনি এইচ. শনবার্গের মতো মানুষেরা পূর্ব পাকিস্তানে সংঘটিত ঘটনা যে মোটেও অভ্যন্তরীণ ঘটনা নয়, সে বিষয়ে বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন। দেশটির সংস্কৃতির অঙ্গনের দরদী মানুষেরাও সেসময়ে নিশ্চুপ থাকেননি।
যে মার্কিন সরকার সর্বান্তকরণে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, সেই দেশের মাটিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’। জর্জ হ্যারিসন, পণ্ডিত রবিশঙ্করের উদ্যোগে আয়োজিত ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’র ইতিবৃত্ত আজ আর কারো অজানা নেই। কনসার্টটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে অনন্য এক অধ্যায়। যে উদ্যোগটি বিশ্বব্যাপী অভূতপূর্ব আলোড়ন তুলেছিল। একই দেশের খ্যাতনামা আরেক সঙ্গীতজ্ঞ ‘দ্য স্টোরি অফ বাংলাদেশ’ নামে মর্মন্তুদ একটি গান লিখেছিলেন। শুধু লিখেই থেমে যাননি। গানটি তিনি স্বকণ্ঠে গেয়েছেন, প্রচার করেছেন সারা পৃথিবীর উদ্দেশ্যে। গানটিতে বাইশ বার উচ্চারিত ‘বাংলাদেশ’ শব্দটি দক্ষিণ এশিয়া ছাড়িয়ে পৃথিবীর নানা প্রান্তরে প্রতিধ্বনিত হয়। মর্মস্পর্শী সেই গানের ভেতর দিয়ে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের পক্ষে অকুণ্ঠ সমর্থন জানান। সিভিল রাইটসের পক্ষে সোচ্চার, যুদ্ধ বিরোধী শান্তিবাদী মানুষটির নাম জোয়ান বায়েজ। জোয়ান বায়েজের ‘স্টোরি অফ বাংলাদেশ’ যা পরে ‘সং অফ বাংলাদেশ’ নামে প্রকাশিত হয়। যেটি শুধুমাত্র একটি গান নয়– ১৯৭১-এ বাংলাদেশের জনগণের ওপর পাকবাহিনীর নৃশংসতার রক্তান্ত এক খণ্ডচিত্র।
নয় মাসব্যাপী ইতিহাসের ভয়াবহতম অত্যাচারের অধ্যায় পেরিয়ে ১৬ ডিসেম্বর পৃথিবীর মানচিত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। দেশটির জন্মের পেছনে অসামান্য ত্যাগ আর রক্তনদী সন্তরণের রয়েছে সুদীর্ঘ মমর্ন্তুদ ইতিহাস। সেই ভয়াবহ ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে আরেকটি অমর সৃষ্টি ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’। ১৫২ লাইনের দীর্ঘ এই কবিতার স্রষ্টা অ্যালেন গিন্সবার্গ। যিনি তাঁর প্রতিবাদের ভাষার জন্য ছিলেন সুপরিচিত। ১৯৫৬ সালে তাঁর রচিত ‘হাউল’ কবিতাটি শুধুমাত্র বিট জেনারেশনের মেনিফেস্টো হিসেবে নয়; সেটি আমেরিকার যুদ্ধোত্তর সমাজের ভাঙন, মানসিক অসুস্থতা, দারিদ্র্য, বর্ণবাদ, দমননীতি, আর রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বিরুদ্ধে এক ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত চিৎকার।
সে চিৎকারের তীব্রভাষা আমেরিকার দমনমূলক রাষ্ট্রযন্ত্রকে ‘Moloch’ নামের পৌরাণিক দানব হিসেবে অ্যাখায়িত করে, যে দানব মানুষের জীবন, স্বাধীনতা সৃজনশীলতা গিলে খায়। ‘হাউল’ গিন্সবার্গের শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ক্ষোভের উদগিরণ ছিল না, সেটি ছিল এক কুলষিত রাষ্ট্রের বিপক্ষে ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক প্রতিবাদের সাহসী উচ্চারণ।
এমন মানবিকতা এবং রাজনীতি সচেতনতা নিয়ে অ্যাক্টিভিস্ট–কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের পক্ষে একাত্তরে যুঝতে থাকা বাংলাদেশের পাশে না দাঁড়িয়ে উপায় ছিল না। তিনি খবর পেয়েছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ জীবন বাঁচানোর তাগিদে উদ্বাস্তু হয়ে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয়ের জন্য ভিড় জমাচ্ছে। ষাটের দশক থেকে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় তাঁর যাতায়াত ছিল; সেখানকার সাহিত্যমনা অনেকের সঙ্গে গড়ে উঠেছিল সখ্যতা। নিউইয়র্ক থেকে প্রায় ১৩ হাজার কিলোমিটার দূরে যুদ্ধরত বাংলাদেশের মানবিক সংকটের কথা শুনে গিন্সবার্গ ও তাঁর আজীবন সঙ্গী পিটার অরলোভস্কি (Peter Orlovsky) ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই গিন্সবার্গ কলকাতায় পৌঁছান। এক আকাশ অসহায় মানুষের দুর্দশা স্বচক্ষে দেখবার তাড়নায় তিনি বেরিয়ে পড়েন। ক্যালেন্ডারের পাতায় সে দিনটি ছিল ৯ সেপ্টেম্বর।
১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাস। আকাশের বুক চিরে নেমে আসা মুষলধারার বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছিল যশোর রোড। যশোর রোড, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দিকে যাওয়ার অন্যতম প্রধান সীমান্তপথ। সেই পথ জুড়ে তখন সন্তর্পণে লেখা হচ্ছে ইতিহাসের বেদনাময় উদ্বাস্তু কাফেলার আখ্যান। সে আখ্যানের অভিঘাতে আকাশ বেয়ে অঝোর ধারায় ঝরে চলেছে বৃষ্টির জল।
কিন্তু সেই বৃষ্টির চেয়েও ভারী ও বিষাদময় ছিল রাস্তার ওপর জড়ো হওয়া গৃহহীন মানুষের ঢল। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নির্মম জেনোসাইড আর নৃশংসতা থেকে প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া এক কোটি নিঃস্ব মানুষের মিছিল যেন থামছিল না। কাদা-মাখা পথ আর অন্ধকারের বুক চিরে সঙ্গী পিটার অরলোভস্কি এবং বাঙালি কবি ও বন্ধু সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে সাথে নিয়ে হেঁটে গিয়েছিলেন অ্যালেন গিন্সবার্গ। বনগাঁর শরণার্থী শিবিরের ত্রিপল ঢাকা ঘর, কলেরা, অনাহারের থাবা, আর অনাহারী শিশুদের বোধশূন্য চোখের চাউনি গিন্সবার্গকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। চোখের সামনে দেখা সেই অভাবনীয় মানবেতর যন্ত্রণা আর মহাজাগতিক শোক কবির হৃদয়ে যে ক্ষতের সৃষ্টি করেছিল, তা থেকে জন্ম নিয়েছিল ১৫২ লাইনের এক মহাকাব্যিক প্রতিবাদের— ‘September on Jessore Road’:
‘Millions of babies watching the skies
Bellies swollen, with big round eyes
On Jessore Road--long bamboo huts
No place to shit but sand channel ruts
Millions of fathers in rain
Millions of mothers in pain
Millions of brothers in woe
Millions of sisters nowhere to go …’
এটি কেবল একটি কবিতা নয়, এটি একাত্তরের রক্তাক্ত ইতিহাস, পশ্চিম পাকিস্তান এবং তার প্রশ্রয়দাতা মার্কিন প্রশাসনের নির্মম ভূ-রাজনীতি এবং আক্রান্তের ক্ষতে ভরা বিশ্ববিবেকের দরবারে পেশকৃত এক অজর দলিল।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের গোলাগুলিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; তার এক বিশাল করুণ অংশ বিস্তার লাভ করেছিল ভারতের সীমানাঘেঁষা শরণার্থী শিবিরগুলোতে। ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ মানব বাস্তুচ্যুতির সাক্ষী হয়ে উঠেছিল বর্ডার সংলগ্ন যশোর রোড। কবিতাটিতে গিন্সবার্গের লেখনশৈলীর সবচেয়ে বড় কৌশল ছিল পরিসংখ্যানের ভাষাকে এক ধরনের নৈতিক অপরাধবোধে পরিণত করা। সাধারণত লক্ষ লক্ষ মানুষের রূপক বা সংখ্যা মানুষকে দূরের বা বিমূর্ত মনে হয়। কিন্তু গিন্সবার্গ সেই সংখ্যাগুলোকে সরাসরি দৈহিক ও বাস্তব কষ্টের সাথে বেঁধে উচ্চারণ করেছিলেন—
"Millions of babies watching the skies
September on Jessore Road or tears in their eyes..."
শিবিরগুলোর মহামারী, কাদা-জল, খাদ্যাভাব আর রেশনের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ক্লান্ত শিশুদের চোখের আকুতি গিন্সবার্গকে ব্যথিত-বিচলিত করেছিল। কলকাতা থেকে নিউইর্য়ক ফিরে নভেম্বরের ১৪-১৬ তারিখের দিকে তিনি লিখে ফেলেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ঘিরে এই অমর কবিতা। এ কবিতার সবচেয়ে হৃদয়বিদারক মুহূর্তটি বুঝি রুটি বিতরণের লাইনে মূর্ত। যেখানে, দুই পুলিশ লম্বা বাঁশ নিয়ে লাইনে দাঁড়ানো মানুষদের নিয়ন্ত্রণ করছে। শিশুরা ঠেলাঠেলি করছে, কেউ কেউ হাসছে। কিন্তু মেকি সেই হাসি ক্ষুধার অস্থিরতা বৈ কিছু নয়। একটা পর্যায়ে যখন রুটি শেষ হয়ে যায়, হাজার হাজার শিশু ‘হুররে’ বলে চেঁচিয়ে ওঠে। সেই মুহূর্তটি গিন্সবার্গের কবিতায় এক ভয়াবহ সত্য উন্মোচন করে। তিনি চোখে আঙুল দিয়ে দেখান; চরম অভাব ভাষা আর আবেগকে কীভাবে বিকৃত করে দেয়। আনন্দ, হতাশা, আর ভিড়ের শব্দ কীভাবে এক হয়ে যায়। কবিতার মাঝামাঝিতে গিন্সবার্গ শরণার্থী শিবিরগুলোতে দেওয়া চিকিৎসা-ব্যবস্থার ব্যর্থতা উপস্থাপন করেন। ক্ষুধা আর রোগের নামগুলো তিনি উচ্চারণ করেন এমনভাবে, ওগুলো মোটেও কোনো দূরের দুর্যোগ নয়, সেগুলো প্রতিরোধযোগ্য বাস্তবতা। ম্যালনিউট্রিশন, ডায়রিয়া, ওষুধের অভাব—সবকিছুই তিনি এমনভাবে দেখান, যাতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে শিবিরগুলোতে হওয়া অসংখ্য মৃত্যু কোনোভাবেই রহস্যাবৃত নয়; সেটি প্রশাসনিক ব্যর্থতার ফল। শরণার্থী শিবিরে সাহায্য পৌঁছাতে দেরি হয়, ট্রাক আটকে থাকে, আর সেই দেরির মধ্যে ঝরে পড়তে থাকে অজস্র শিশু। গিন্সবার্গ কোনো রাজনীতিবিদের চশমা দিয়ে সেসব দেখেননি, দেখেছিলেন একজন সংবেদনশীল মানুষের চোখ দিয়ে। ফলে, যশোর রোড আর শুধুমাত্র একটি ভৌগোলিক পথ রইল না, তা হয়ে উঠল বিশ্বজুড়ে নিপীড়িত, বিতাড়িত মানবজাতির অন্তহীন যন্ত্রণার প্রতীক।
‘September on Jessore Road’ কবিতাটির একটি অত্যন্ত শক্তিশালী রাজনৈতিক দিক হলো রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে এক কবির সুস্পষ্ট অবস্থান। ১৯৭১ সালে তৎকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিক্সন ও কিসিঞ্জার প্রশাসন সরাসরি পাকিস্তানি সামরিক জান্তাকে অস্ত্র ও কূটনৈতিক সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছিল। অথচ, সেই আমেরিকারই এক কবি মার্কিন সরকারের ভণ্ডামি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। গিন্সবার্গ তাঁর কবিতায় তীব্র ক্ষোভের সাথে প্রশ্ন তুলেছিলেন: কোথায় ইউএস এআইডি-র সেই মার্কিন ত্রাণবাহী হেলিকপ্টারগুলো? উত্তরটাও তিনি দিয়েছিলেন তিতকুটে সত্যে: সেগুলো তখন লাওসে বোমা ফেলছে কিংবা ভিয়েতনামে নেপাম ছুঁড়ছে। একই আধুনিক শক্তি যা শিশুদের বাঁচাতে পারতো, তা বেছে নিয়েছে যুদ্ধকে। মার্কিন সাধারণ মানুষ এবং সুশীল সমাজকে তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন, তাদের ট্যাক্সের টাকায় কীভাবে অন্য একটি দেশে লাখ লাখ নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে এবং কোটি মানুষকে শরণার্থী বানানো হচ্ছে। এভাবে, ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে কবিতাটি তৎকালীন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্বব্যাপী জনমত গঠনে সুতীক্ষ্ণ এক সাংস্কৃতিক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছিল।
কবিতাটি কেবল মার্কিন নীতিকেই কাঠগড়ায় তোলে না, বরং কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাথে কথোপকথনের মাধ্যমে গিন্সবার্গ নিজেকে এবং পাঠককেও এই নৈতিক প্রশ্নে জড়িয়ে ফেলেন। তিনি নিজেকে প্রশ্ন করেন, একজন পর্যবেক্ষক হিসেবে এই দুর্দশার ছবি কেবল কবিতায় ফুটিয়ে তুলে চলে যাওয়া কি একধরনের আত্মকেন্দ্রিকতা নয়? এই অপরাধবোধ থেকে বিশ্ববিবেক ও মিডিয়াকে সতর্ক করার জন্য তিনি বুঝি কবিতার মোড়কে শব্দবোমা ফাটান। নিউইর্য়কে ফেরার পর নভেম্বরে যুগান্তকারী এই কবিতাটি লেখার পরপরই গিন্সবার্গ রুশ কবি আন্দ্রে ভোজনেসস্কির সঙ্গে শরণার্থীদের জন্য একটি দাতব্য অনুষ্ঠানে অংশ নেন। অনুষ্ঠানটি হয় নিউইয়র্কের St. Mark’s Church in-the-Bowery–এ, যেখানে ভোজনেসস্কি রুশ ভাষায় তাঁর কবিতা আবৃত্তি করেন এবং গিন্সবার্গ সেগুলোর ইংরেজি অনুবাদ পাঠ করেন। সেখানে তিনি ‘September on Jessore Road’ কবিতাটি পাঠ করেছিলেন। এছাড়াও গিন্সবার্গ শরণার্থীদের জন্য আরও কিছু মানবিক উদ্যোগে যুক্ত হন; নিজের হারমোনিয়াম ও মেলোডিকা দিয়ে কবিতাটির সুরারোপ করেন এবং কয়েকটি রেকর্ডিংয়ে ফোকশিল্পী জন শোলের সহযোগিতা পান। ‘September on Jessore Road’ কবিতাটি পরবর্তীতে The New York Times–এ প্রকাশিত হলে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং বাংলাদেশের মানবিক সংকট সম্পর্কে আন্তর্জাতিক মহলে সচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কবিতাটি আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এক প্রতিধ্বনি হয়ে বাজে। পশ্চিমা বিশ্বের তরুণ সমাজ এই একটি কবিতার মধ্য দিয়েই যেন প্রথম গভীরভাবে অনুধাবন করতে পেরেছিল—অনেক দূরে, বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা একটি জাতি তার অস্তিত্ব ও স্বাধীনতার জন্য কতটা মূল্য চুকাচ্ছে।
একটি মহৎ শিল্পসৃষ্টি সময়ের সীমান্ত অতিক্রম করে কালজয়ী হয়। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে এসেও ‘September on Jessore Road’ তার আবেদন বিন্দুমাত্র হারায়নি। আজ বিশ্বের যেখানেই যুদ্ধ, যেখানেই শরণার্থী সংকট কিংবা গৃহহীন মানুষের স্বজন হারানোর হাহাকার; সেখানে গিন্সবার্গের কবিতার পংক্তিগুলো ঘুরেফিরে সত্য হয়ে ওঠে।
এই কবিতা মুক্তিযুদ্ধের আন্তর্জাতিক ইতিহাসে একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। কারণ এটি দেখিয়েছিল—বাংলাদেশের যুদ্ধ শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়, এটি ছিল মানবতার সংকট। গিন্সবার্গ তাঁর কবিতার মাধ্যমে সেই সংকটকে বিশ্বমঞ্চে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন, যুদ্ধের পরিসংখ্যানের পেছনে থাকে অগুণতি মৃতদেহ, থাকে নামহীন মানুষের গল্প।
এই কবিতা জানান দেয় যুদ্ধের ইতিহাস শুধু বিজয় বা পরাজয়ের গল্প নয়, এটি মানুষের বেঁচে থাকার গল্প। এটি সেইসব মুহূর্তের গল্প, যখন একজন কবি নিজের দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে দাঁড়িয়ে অন্য দেশের মানুষের কষ্টকে নিজের ভাষায় বহন করে নিয়ে যান।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি আজও আমাদের জাতীয় পরিচয়ের অংশ। গিন্সবার্গের এই কবিতা সেই স্মৃতিকে একটি আন্তর্জাতিক ভাষা দিয়েছে। সেখানে যশোর রোড শুধুই একটি সড়ক নয়, এটি যেন মানবতার এক পরীক্ষাগার, যেখানে দুঃখ, ক্ষুধা, এবং আশার মধ্যে দাঁড়িয়ে একজন কবি প্রশ্ন করেছিলেন: মানুষের কষ্ট কি সত্যিই দূরের কোনো ঘটনা, নাকি আমাদের নৈতিক দায়বদ্ধতার অংশ?
বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় অ্যালেন গিন্সবার্গ কোনো ভিনদেশী কবি নন, বরং তিনি আমাদের এক পরম সুহৃদ। রক্ত, কাদা-আবর্জনা আর অশ্রুতে ভেজা ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরে যশোর রোডে দাঁড়িয়ে তিনি যে কবিতার বীজ বপন করেছিলেন, তা চিরকাল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অবিচ্ছেদ্য ইতিহাস হিসেবে বেঁচে থাকবে।
ভিনদেশি যে কবিতা বুকে বয়ে বেড়ায় একাত্তরের মর্মন্তুদ ইতিহাস
▮ নাহার তৃণা
▮ নাহার তৃণা




লেখাটার সঙ্গে শৈশবে শোনা ও পরোক্ষ ভাবে অভিজ্ঞ হওয়ার বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি মনে পড়ল। তখন সংবাদ পরিক্রমা,প্রতিদিনের খবরে সেসব মর্মন্তুদ ঘটনা বড় জীবন্ত ছিল। সেসব ঘটনা গিন্সবার্গের মতো মানবিক সত্তাকে যে নাড়া দেবে সেটাই স্বাভাবিক। কবিতার লাইনগুলো যেন অদ্ভুত সত্যদর্শন। যদিও পৃথিবীর বুকে ক্ষমতার দম্ভের এখনও পরিসমাপ্তি ঘটেনি। বরং তা বেড়েই চলেছে।
উত্তরমুছুন