গুমোট, সিঁড়ির গহ্বরে ঘনিয়ে আসা আঁধারের বুক চিরে আমিনা সিনাই উঠে চলেছেন এক অমোঘ ভবিষ্যৎবাণীর দিকে। লিফাফা দাস তাকে সমানে অভয় দিয়ে চলেছে। ট্যাক্সি থেকে নেমে সরু এক গলিপথে লিফাফার দয়ার ওপর নিজেকে সঁপে দেওয়ার পর থেকেই আমিনার মনের ভেতর যে তোলপাড় চলছে, যে দ্বিধা আর অনুশোচনার ছায়া পড়েছে—তা লিফাফার নজর এড়ায়নি। তাই ওপরে উঠতে উঠতে সে আমিনাকে সান্ত্বনা জোগাচ্ছে। অন্ধকার সিঁড়িটা যেন অজস্র অশরীরী চোখে ঠাসা। বন্ধ দরজার খড়খড়ি আর ফাটল দিয়ে সেই চোখগুলো চকচক করছে, আঁধারের ভেতর দিয়ে উঠে আসা এই রমণীকে যেন তারা চেটেপুটে গিলছে, বিড়ালের খসখসে জিভ যেমন করে লেহন করে, ঠিক তেমনি সেই দৃষ্টির স্পর্শ। লিফাফা মোলায়েম গলায় কথা বলে যাচ্ছে, আর আমার মায়ের ইচ্ছাশক্তি যেন ক্রমশ তলিয়ে যাচ্ছে ভাটার টানে। ‘যা হওয়ার তা-ই হবে’—এই ভেবে মনের জোর আর পৃথিবীর ওপর তার সমস্ত অধিকারটুকু যেন শরীর চুঁইয়ে বেরিয়ে গিয়ে শুষে নিচ্ছে সিঁড়ির ওই স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার বাতাস। পায়ে পায়ে জড়তা, তবু লিফাফাকে অনুসরণ করে তিনি উঠে এলেন বিশাল এক জরাজীর্ণ পুরনো বাড়ির ওপরের মহলে, যেখানে এক চিলতে কোণে লিফাফা আর তার ভাই-বেরাদরদের বাস। প্রায় চূড়ার কাছাকাছি পৌঁছে আবছা আলোয় তিনি দেখলেন জনা কয়েক পঙ্গু মানুষের লাইন। লিফাফা দাস বলল, ‘আমার খুড়তুতো ভাই, হাড়-ভাঙা জোড়া লাগায়।’ ভগ্নদশা মানুষের ভিড় ঠেলে আমিনা এগিয়ে চললেন—কারও হাত ভাঙা, কারও বা পা দুমড়ে অদ্ভুতভাবে পিঠের দিকে ঘুরে আছে। ছাদ থেকে পড়ে যাওয়া জানলা-সাফাইওয়ালা কিংবা ইটের ঘা খাওয়া রাজমিস্ত্রিদের পাশ কাটিয়ে একজন ডাক্তারের মেয়ে প্রবেশ করলেন এমন এক জগতে, যা সিরিঞ্জ আর হাসপাতালের চেয়েও বহু প্রাচীন। শেষে লিফাফা বলল, ‘বেগম সাহেবা, আমরা এসে গেছি।’ একটা ঘর পার হতে হলো, যেখানে সেই হাড়-ভাঙা চিকিৎসক লতাপাতা আর গাছের ডাল দিয়ে ভাঙা হাড় বাঁধছে, ফাটা মাথায় জড়াচ্ছে তালপাতা। রোগীদের দেখে মনে হচ্ছে তারা যেন একেকটা কৃত্রিম গাছ, তাদের ক্ষতস্থান ফুঁড়ে গজিয়ে উঠছে জঙ্গল। ঘর পেরিয়ে সিমেন্ট বাঁধানো এক চিলতে খোলা ছাদ। লণ্ঠনের উজ্জ্বল আলোয় চোখ পিটপিট করে তাকাতেই আমিনা দেখলেন এক বিচিত্র, প্রায় উন্মাদ দৃশ্য। সেখানে বাঁদর নাচছে, লাফাচ্ছে বেজি, ঝুড়ির ভেতর দুলছে সাপ। আর ছাদের কার্নিশের ওপর বসে আছে বিশাল সব পাখি, যাদের শরীরটা তাদের ঠোঁটের মতোই নিষ্ঠুর আর বাঁকানো—একপাল শকুন।
‘আরে বাপ রে!’ সে প্রায় চেঁচিয়েই উঠল, ‘এ তুমি আমায় কোথায় নিয়ে এলে?’
‘ভয়ের কিচ্ছুটি নেই, বেগম, একদম ঘাবড়াবেন না’ লিফাফা দাস বলল। ‘এরা সব আমার ভাই-বেরাদর। আমার তিন আর চার নম্বর ভাই। ওই যে ও হলো বাঁদর-নাচিয়ে…’
‘একটু হাত মকশো করে নিচ্ছি, বেগম!’ একটা গলা হেঁকে উঠল। ‘দেখুন: বাঁদর কেমন যুদ্ধে যায় আর দেশের জন্য জান কবুল করে!’
‘...আর ওই যে ওখানে, ও সাপ আর বেজির খেলা দেখায়।’
‘দেখুন সাহিবা, বেজির লাফানি দেখুন! দেখুন গোখরোর নাচ!’
‘... কিন্তু ওই পাখিগুলো? …’
‘ও কিছু না, ম্যাডাম: ওই তো একদম কাছেই পার্সিদের টাওয়ার অফ সাইলেন্স আছে; ওখানে মড়া না জুটলে শকুনগুলো সব এই তল্লাটে এসে ভিড় জমায়। এখন সব ঘুমোচ্ছে; তবে দিনের বেলায় আমার ভাইয়েদের কসরত দেখতে বোধহয় ওদের বেশ লাগে।’
ছাদের একেবারে শেষ প্রান্তে একচিলতে ঘর। দরজা দিয়ে আলো এসে ঠিকরে পড়ছে ভিতরে। আমিনা পা বাড়াতেই চোখে পড়ল, ঠিক তার স্বামীরই বয়সী এক মানুষ। বেশ হৃষ্টপুষ্ট ভারী চেহারা, গলার কাছে চর্বি জমে থুতনিটা যেন কয়েক ভাঁজ হয়ে ঝুলে আছে। পরনে দাগ-ধরা সাদা পাজামা আর লাল চেক-কাটা শার্ট, পায়ে জুতোর বালাই নেই। দিব্যি বাবু হয়ে বসে তিনি মৌরি চিবোচ্ছেন আর ভিমটোর বোতলে চুমুক দিচ্ছেন। ঘরের চারদিকের দেওয়ালে বিষ্ণুর দশাবতারের ছবি সাঁটা, তার ফাঁকে ফাঁকে সব বিচিত্র নোটিস—কোনোটায় লেখা হস্তাক্ষর শেখানো হয়, আবার কোনোটায় সাবধানবাণী: সাক্ষাৎকারের সময় থুতু ফেলা অতি বদভ্যাস। এমনিতে ঘরে আসবাবপত্রের নামগন্ধ নেই... আর সেই শূন্য ঘরের মাঝখানে শ্রী রামরাম শেঠ বাবু হয়ে বসে আছেন, তবে মাটিতে নয়—মেঝে থেকে ঠিক ছয় ইঞ্চি ওপরে, শূন্যে ভাসমান!
আমাকে মানতেই হবে: নিজের লজ্জার মাথা খেয়ে, আমার মা চিৎকার করে উঠেছিল...
... আর ওদিকে, পুরোনো কেল্লায়, প্রাকারের খাঁজে খাঁজে বাঁদরের দল কিচিরমিচির করে তোলপাড় করে তুলেছে। মানুষের ফেলে-যাওয়া এই ধ্বংসপ্রাপ্ত শহরটা এখন হনুমানদের ডেরা। লম্বা ল্যাজ আর কালো মুখওয়ালা এই বাঁদরগুলোর হাবভাব দেখে মনে হয় যেন তারা এক বিশাল গুরুত্বপূর্ণ মিশনে নেমেছে। তারা তরতর করে ওপরে চড়ে, লাফ দিয়ে ধ্বংসস্তূপের একেবারে মগডালে পৌঁছে নিজেদের এলাকা দখল করে নেয়, আর তারপর লেগে পড়ে এক অদ্ভুত কাজে—পাথরের পর পাথর খুলে আস্ত কেল্লাটাকেই যেন ধুলোয় মিশিয়ে দেবে। পদ্মা, এটা কিন্তু একদম সত্যি: তুমি তো কোনোদিন ওখানে যাওনি, গোধূলির আলোয় দাঁড়িয়ে কখনও দেখোনি সেই লোমশ জীবগুলোর কাণ্ডকারখানা; তারা কেমন পণ করে পাথরের গায়ে শক্তি ফলায়—টানে আর দোল খায়, দোল খায় আর টানে—যতক্ষণ না পাথরটা আলগা হয়ে আসে... রোজ রোজ ওরা পাথর গড়িয়ে দেয় নিচে, দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে সেই পাথর আছড়ে পড়ে নিচের পরিখায়। একদিন হয়তো এই পুরোনো কেল্লার আর চিহ্নটুকুও অবশিষ্ট থাকবে না; শেষমেশ পড়ে থাকবে শুধু একগাদা ধংসস্তূপ আর তার ওপর বসে বিজয়ের উল্লাসে চেঁচাতে থাকা একপাল বাঁদর… আর এরই মধ্যে একটা বাঁদরকে দেখো, কেমন দেওয়াল বেয়ে তরতরিয়ে যাচ্ছে—ওকে আমি বরং হনুমানই বলি, সেই যে পবনপুত্র, রামচন্দ্রকে সাহায্য করেছিলেন রাবণবধের সময়, সেই উড়ন্ত রথের হনুমান... চেয়ে দেখো, ও এখন একটা মিনারের কাছে—এ ওর নিজের এলাকা; নিজের রাজত্বের এ-কোণ থেকে ও-কোণ লাফাচ্ছে, পাথরে শরীর ঘষছে; হঠাৎ থমকে দাঁড়াল, কী যেন একটা গন্ধ পেল—যা এখানে থাকার কথা নয়... হনুমানটা ছুটে গেল সেই ঘুলঘুলিটার কাছে, একদম ওপরের চত্বরে, যেখানে সেই লোকগুলো তিনটে নরম ধূসর রঙের বিদ্ঘুটে পুঁটলি ফেলে গেছে। ওদিকে ডাকঘরের পেছনে যখন অন্য বাঁদরেরা নাচছে, ঠিক তখন হনুমান নামের এই বাঁদরটা রাগে রীতিমতো তাণ্ডবনৃত্য শুরু করল। ঝাঁপিয়ে পড়ল সেই ধূসর পুঁটলিগুলোর ওপর। হ্যাঁ, ওগুলো বেশ আলগাই আছে, দোলাতে আর টানতে, টানতে আর দোলাতে খুব একটা বেগ পেতে হবে না... ওই দেখো, হনুমান এখন নরম ছাইরঙা পাথরগুলোকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে কেল্লার দেওয়ালের একদম কিনারে, যার নিচে অতল খাদ। দ্যাখো কেমন সেগুলোকে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলছে:—ফড়াৎ! — র্যাঁৎ! ফ্যাঁস! খচাৎ!... দ্যাখো কী নিপুণ হাতে সে ছাইরঙা জিনিসগুলোর ভেতর থেকে কাগজগুলো খামচে বের করে আনছে, আর হাওয়ায়-ভাসা বৃষ্টির মতো সেগুলো নিচে ছড়িয়ে দিচ্ছে যাতে পরিখায় পড়ে-থাকা পাথরগুলো তাতে স্নান করতে পারে! কাগজগুলো অলস ছন্দে ভেসে ভেসে নামছে, যেন অনিচ্ছুক, যেন কোনো সুন্দর স্মৃতি তলিয়ে যাচ্ছে নিকষ কালো অন্ধকারের গহ্বরে; আর তারপর—এক লাথি! ধপাস! আবার লাথি! তিনটে নরম ধূসর পাথর কিনারা টপকে তলিয়ে গেল নিচে—গভীরে—আরও গভীরে—শেষে একটা নরম, মন-খারাপ-করা টুপ আওয়াজ হলো। নিজের কাজ ফুরোতেই হনুমান আগ্রহ হারিয়ে ফেলল, সুড়ুত করে দৌড়ে তার রাজত্বের কোনো এক দূরের চূড়ায় গিয়ে বসল, এবং আবার শুরু করল দোল খাওয়া।
...আর এদিকে নিচে, আমার বাবা দেখতে পেল অন্ধকার ফুঁড়ে এক বিদঘুটে মূর্তি বেরিয়ে আসছে। ওপরে যে কী সাংঘাতিক কাণ্ড ঘটে গেছে, তার বিন্দুবিসর্গ না জেনে সেই ভগ্নপ্রায় কুঠুরির ছায়ায় দাঁড়িয়ে সে ওই রাক্ষসটাকে নজর করতে লাগল: পরনে ছেঁড়াখোঁড়া পাজামা, মাথায় রাক্ষসের এক পেল্লায় মুখোশ, কাগজের মণ্ড দিয়ে বানানো শয়তানের এক মুখাবয়ব, যার চারদিকে শুধু দাঁত-বের-করা হাসিমুখ... রাবণ-দলের সেই ঠিক-করা লোক। টাকা তুলতে এসেছে। দুরুদুরু বক্ষে ওই তিন ব্যবসায়ী দেখল সেই মূর্তি—কোনো গেঁয়ো চাষির দুঃস্বপ্ন থেকে উঠে-আসা এক প্রেতচ্ছায়া যেন সে—চাতালে ওঠার সিঁড়ির মুখে গিয়ে হঠাৎ মিলিয়ে গেল অন্ধকারে; আর খানিক পরেই, ওই খাঁ-খাঁ রাতের নিস্তব্ধতা চিরে তারা শুনতে পেল সেই শয়তানটা আস্ত মানুষের মতোই গালাগাল দিচ্ছে। ‘হারামজাদার দল! সব শালা মাদারচোদ! হিজড়া কঁহিকা!’ ... কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তারা দেখল, ওই বিদঘুটে যমদূতটা বেরিয়ে এসে অন্ধকারে চোঁ-চোঁ দৌড় লাগাল, আর একেবারে উধাও হয়ে গেল। বাতাসে তখনও ভাসছে কেবল গালাগালগুলো... ‘এই শালা শুয়োরের বাচ্চারা! গাধাচোদার দল! গু-খোর, নিজেদের গু খাওয়া জানোয়ারের দল!’ এরপর রীতিমতো হতবুদ্ধি হয়ে তারা ওপরে উঠে এল; বাট সাহেব সেখানে ছাইরঙা কাপড়ের একটা ছেঁড়া টুকরো খুঁজে পেল; মুস্তাফা কামাল নিচু হয়ে একটা দুমড়ানো টাকার নোট কুড়িয়ে নিল; আর হয়তো, হ্যাঁ, হতেই তো পারে, আমার বাবাও ঠিক ওই সময়েই চোখের কোণ দিয়ে একটা কালচে বাঁদরের সুড়ুত করে পালিয়ে যাওয়া দেখতে পেল... আর তখনই তারা আন্দাজ করে নিল ব্যাপারটা ঠিক কী ঘটেছে।
এখন দমকে দমকে বেরিয়ে এল তাদের গোঙানি আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মিস্টার বাটের চিল-চিৎকার গালিগালাজ—যা কি না ওই শয়তানটারই খিস্তিগুলোর প্রতিধ্বনি। সবার মাথার ভেতর তখন তুমুল বেগে চলছে একটা অনুক্ত, নিঃশব্দ যুদ্ধ: টাকা নাকি গোডাউন, গোডাউন নাকি টাকা? এক বোবা আতঙ্কে ওই ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বড়ো ধাঁধাটার উত্তর হাতড়ে মরছে—কিন্তু তারপর, তারা যদি ওই নগদ টাকাগুলোকে রাস্তার নেড়ি কুত্তা আর ছ্যাঁচোড় মানুষদের লুটেপুটে খাওয়ার জন্য ফেলেও রেখে যায়, তাহলেও ওই আগুন-লাগানো লোকগুলোকে তারা আটকাবে কী করে?—আর শেষমেশ, একটাও কথা খরচ না-করে, হাতের মুঠোয় থাকা নগদ টাকার সেই অমোঘ নিয়ম—‘হাতের লক্ষ্মী বড় লক্ষ্মী’, তাদের কাবু করে ফেলল; তারা পাথরের সিঁড়ি ভেঙে, ঘাসে-ঢাকা লন পেরিয়ে, ভাঙাচোরা ফটকের ভেতর দিয়ে হুড়মুড় করে দৌড়ে—একেবারে হুটোপুটি খেয়ে!—পরিখার কাছে এসে পৌঁছোল আর নিজেদের পকেটে মুঠো মুঠো টাকা ভরতে শুরু করে দিল। নোংরা পেচ্ছাপ আর পচা ফলের জঞ্জাল উপেক্ষা করে তারা কেবল টাকা খামচে ধরছে, খাবলে-খুবলে উদ্ধারের আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। সমস্ত অসম্ভবকে দূরে সরিয়ে তারা যেন এই বিশ্বাসটুকুই আঁকড়ে ধরতে চাইছে যে, হয়তো আজকের রাতে—উপরওয়ালার দয়ায়—অন্তত এই একবারের জন্য হলেও ওই দলটা তাদের প্রতিশ্রুত প্রতিহিংসা নেবে না, আগুন লাগাবে না, ঠিক ব্যর্থ হবে। কিন্তু, বলাই বাহুল্য...
... তবে হ্যাঁ, এ তো বলাই বাহুল্য, সেই ভবিষ্যৎদ্রষ্টা রামরাম সত্যি সত্যি মাটি থেকে ছ-ইঞ্চি ওপরে শূন্যে ভেসে ছিল না। আমার মায়ের চিৎকারটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল; চোখের দৃষ্টি থিতু হলো; আর ঠিক তখনই দেয়াল থেকে বেরিয়ে-থাকা ছোট্ট তাকটা তার নজরে পড়ল। ‘পাতি চালাকি,’ সে মনে মনে বলল, আর, ‘ঘুমন্ত শকুন আর বাঁদর-নাচিয়েদের এই ঈশ্বর-পরিত্যক্ত জায়গায় আমিই-বা কী করতে পড়ে আছি, আমি এমন এক গুরুর মুখ থেকে কে জানে কী-সব ছাইপাঁশ শোনার অপেক্ষায় বসে আছি, যে কিনা স্রেফ একটা তাকের ওপর বসে শূন্যে ভাসার ভেলকি দেখায়?’
আমিনা সিনাই অবশ্য ঘুণাক্ষরেও টের পাননি যে, ইতিহাসের পাতায় এই নিয়ে দ্বিতীয়বার আমি আমার উপস্থিতির জানান দিতে চলেছি। (না, না—তাঁর পেটের ভেতর বাড়তে থাকা ওই ধড়িবাজ ব্যাঙাচিটার কথা বলছি না আমি; আমি বলছি আমার নিজের কথা, আমার সেই ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা—যার বিষয়ে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীরা পর্যন্ত কলম ধরেছেন এই বলে যে, ‘...এক অর্থে এ আমাদের সকলেরই প্রতিবিম্ব।’ সেই রাতে এক বিপুল, অলৌকিক শক্তি কাজ করছিল অলক্ষে; আর সেখানে উপস্থিত প্রত্যেকেই সেই অমোঘ শক্তির আঁচ পেতে যাচ্ছিল, ভয়ে শিউরে উঠতে যাচ্ছিল সবাই।)
দরজার চৌকাঠে কাজিনেরা ভিড় জমিয়েছে—একেবারে এক থেকে চার নম্বর—সবাই হন্যে হয়ে দেখছে; খানিক আগেই ওই দরজা দিয়ে সেই শ্যামলা মেয়েটি ভেতরে ঢুকেছে। মোমবাতির শিখার টানে যেমন একঝাঁক পোকা ধেয়ে আসে, মেয়েটির ওই তীব্র আর্তচিৎকারের টানেই ওরা যেন ছুটে এসেছে... লিফাফা দাস পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছে তাকে, আর ওরা নিঃশব্দে দেখছে। হাড়-জোড়া লাগানো বদ্যি, সাপুড়ে আর বাঁদর-নাচানেওয়ালাদের পাশ কাটিয়ে মেয়েটি এগিয়ে চলেছে ওই অদ্ভুত জাদুকর গোছের গণকঠাকুরের দিকে। এখন চারদিকে ফিসফাস, উৎসাহের গুঞ্জন (আর ওই খসখসে হাতের আড়ালে কি চাপা হাসির শব্দও ছিল না?): ‘ও সাহিবা, দারুণ ভাগ্য বলে দেবে গো, মিলিয়ে নিও!’ আবার কেউ বলছে, ‘এসো কাজিনজি, মেমসাহেব দাঁড়িয়ে আছে যে!’ কিন্তু কে এই রামরাম? স্রেফ এক ধান্দাবাজ? দু’পয়সার সস্তা হাত-দেখা লোক? বোকা মেয়েমানুষদের মন-ভোলানো মিষ্টি ভবিষ্যৎবাণী শোনানোই যার কাজ—নাকি সত্যিই ও আসল লোক, ভাগ্যের সেই চাবিকাঠিটা ওর হাতেই আছে? আর লিফাফা দাস? ও কি আমার মায়ের মধ্যে এমন কাউকে দেখেছিল যে দু-টাকার ধাপ্পাবাজিতেই তুষ্ট হবে, নাকি ও আরও গভীরে তাকাতে পেরেছিল—একদম মায়ের দুর্বলতার সেই গোপন পাতালপুরী অবধি? ভবিষ্যৎবাণী যখন এল, কাজিনরা কি অবাক হয়েছিল? আর ওই মুখ দিয়ে ফেনা ওঠা? ওসবের মানে কী? সিঁড়ির অন্ধকার ওই গুমোট বাতাসে মা কি আসলেই নিজের সত্তা হারিয়ে ফেলেছিল, নিজেকে শুষে নিতে দিয়েছিল এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে—যেখানে যা খুশি তাই ঘটতে পারে আর যা খুশি তাই বিশ্বাস করা যায়? আরেকটা ভয়াবহ সম্ভাবনাও উঁকি দিচ্ছে মনে; কিন্তু আমার সন্দেহটা চেঁচিয়ে বলার আগে, সব ধোঁয়াশা সরিয়ে যতটা সম্ভব পরিষ্কার করে বলা দরকার আসলে কী ঘটেছিল। আমার মা, হাতটা মেলে ধরেছে সেই এগিয়ে আসা গণত্কারের দিকে, চোখের পলক পড়ছে না, যেন এক ভীত পমফ্রেট মাছের চোখ—আর কাজিনরা (হাসছিল কি?) বলে উঠছে, ‘কী হাত দেখাতে এসেছ সাহিবা!’ বা ‘বলো কাজিনজি, বলে দাও!’—কিন্তু আবার সেই ধোঁয়াশার পর্দাটা নেমে এল, তাই ঠিক নিশ্চিত হতে পারছি না—লোকটা কি প্রথমে ওই সস্তা তাঁবুর জাদুকরদের মতোই শুরু করেছিল? সেই একঘেয়ে বুলি—এই আয়ুরেখা, এই হৃদয়রেখা, ছেলেপুলে সব কোটিপতি হবে—আর কাজিনরা সব হাততালি দিয়ে চেঁচাচ্ছে, ‘বাঃ বাঃ! ওস্তাদ আদমি হে ইয়ার!’—তারপর? রামরাম কি হঠাৎ বদলে গেল? শরীরটা কি আড়ষ্ট হয়ে গেল তার—চোখ উল্টে একেবারে সেদ্ধ ডিমের মতো সাদা হয়ে গেল? আয়নার মতো অদ্ভুত স্বরে সে কি জিজ্ঞেস করেছিল, ‘ম্যাডাম, আপনি অনুমতি দিলে আমি ওই জায়গাটা ছুঁয়ে দেখতে পারি?’—তখন কাজিনরা সব মরা শকুনের মতো চুপ—মা-ও কি তখন ওই ঘোরের মধ্যেই অদ্ভুতভাবে উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ, অনুমতি দিলাম’? বাড়ির লোক বাদ দিলে এই গণকঠাকুর হল তৃতীয় পুরুষ যে তাকে স্পর্শ করল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে, ওই থলথলে আঙুল মায়ের চামড়া ছোঁয়ামাত্রই কি একটা ঝিলিক খেলে গেল? তীব্র বিদ্যুতের শক? মায়ের মুখটা তখন ভয় পাওয়া খরগোশের মতো, ওই চেক-কাটা জামা পরা লোকটার দিকে তাকিয়ে আছে। লোকটা গোল হয়ে ঘুরছে, চোখ দুটো তখনও ডিমের মতো সাদা; হঠাৎ তার শরীরে একটা কাঁপুনি দিয়ে উঠল, আর সেই অদ্ভুত চড়া গলায় ঠোঁট চিরে বেরিয়ে এল শব্দটা (ঠোঁটের বর্ণনা পরে দিচ্ছি, এখন থাক)— ‘পুত্র সন্তান।’
পূর্ববর্তী পর্ব পড়ুন এখানে: [মধ্যরাতের সন্তানেরা]
মধ্যরাতের সন্তানেরা
সালমান রুশদি
▋অনুবাদ: দীপ মন্ডল
সালমান রুশদি
▋অনুবাদ: দীপ মন্ডল




মন্তব্য