সবার আগে কিন্তু এখানে ওই জেলেদেরই বাস ছিল। মাউন্টব্যাটেনের সেই ঘড়ির টিকটিক শুরু হওয়ার আগে, সেইসব রাক্ষস-খোক্কস আর সরকারি ঘোষণারও আগে; যখন পাতালপুরীর বিয়ের কথা কারও মাথাতেই আসেনি, আর পিকদানি জিনিসটা কেমন, তা-ও কেউ জানত না; মারকিউরোক্রোম আসারও আগে; ফুটো-করা চাদর তুলে ধরে রাখা সেই মহিলা কুস্তিগিরদের আমলের চেয়েও অনেক আগে; পিছোতে পিছোতে আরও অনেক অনেক আগে, ডালহৌসি-এলফিনস্টোনের আমল টপকে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের সেই দুর্গ বানানোর আগে, প্রথম উইলিয়াম মেথওল্ডের আসারও আগে; একেবারে প্রাচীন কালে, বম্বে যখন ছিল ডাম্বেলের মতো দেখতে একটা দ্বীপ, যার মাঝখানটা ক্রমশ সরু হয়ে গিয়ে মিশেছিল একফালি চকচকে সৈকতে, যার ওপারেই চোখে পড়ত এশিয়ার সবচেয়ে সুন্দর আর সবচেয়ে বড়ো প্রাকৃতিক বন্দর, যখন মাজগাঁও আর ওরলি, মাটুঙ্গা আর মাহিম, সলসেট আর কোলাবা—এগুলোও সব এক-একটা দ্বীপ ছিল—এককথায় বলতে গেলে, সমুদ্র বুজিয়ে জমি উদ্ধারের আগে, টেট্রাপড আর জলের তলায় বসানো ভিতগুলো ওই সাত-সাতটা দ্বীপকে জুড়ে, আরব সাগরের দিকে পশ্চিম-মুখো হয়ে থাকা এক প্রসারিত, আঁকড়ে-ধরতে-চাওয়া হাতের মতো লম্বা উপদ্বীপে পালটে দেওয়ার আগে; ঘড়িঘর গজিয়ে ওঠার আগের সেই আদিম পৃথিবীতে, জেলের দল—যাদের কোলি বলা হতো—ডুবন্ত সূর্যের পটভূমিতে লাল পাল খাটিয়ে আরবদের ধাউ নৌকোয় ভেসে বেড়াত। তারা পমফ্রেট আর কাঁকড়া ধরত, আর আমাদের সব্বাইকে আদ্যোপান্ত মাছ-পাগল বানিয়ে ছেড়েছিল। (বা বলা ভালো আমাদের বেশিরভাগকেই। পদ্মা তো ওদের ওই মৎস-মন্ত্রে একেবারে ধরাশায়ী; কিন্তু আমাদের বাড়িতে, কাশ্মিরি রক্তের সেই ভিনদেশি ছোঁয়া আর কাশ্মিরি আকাশের হিমশীতল গাম্ভীর্যে আমরা এমনই কাবু ছিলাম যে, বাড়ির প্রতিটি লোক আমরা আদ্যোপান্ত মাংসখেকোই রয়ে গিয়েছিলাম।)
সেখানে আরও ছিল অজস্র নারকেল আর ধান। আর এ-সবকিছুর ওপর বিরাজ করত দেবী মুম্বাদেবীর এক স্নেহময় আর মঙ্গলময় ছায়া, যাঁর নাম থেকেই—মুম্বাদেবী, মুম্বাবাঈ, মুম্বাই—হয়তো এই শহরের নামটা এসে থাকবে। কিন্তু তারপর পর্তুগিজরা এর চমৎকার বন্দরটার কথা মাথায় রেখে জায়গাটার নাম রাখল ‘বম বাহিয়া’, পমফ্রেট-মৎস্যজীবীদের ওই দেবীর নামে নয়... পর্তুগিজরাই ছিল এখানকার প্রথম বহিরাগত, যারা নিজেদের বাণিজ্যতরী আর রণতরীগুলোকে নিরাপদে রাখার জন্য এই বন্দরটাকে ব্যবহার করেছিল; কিন্তু তারপর ১৬৩৩ সালের একদিন, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মেথওয়াল্ড নামের এক অফিসার যেন এক ভবিষ্যৎ দেখতে পেলেন। তাঁর এই স্বপ্ন—দুর্গে ঘেরা এক ব্রিটিশ বম্বের স্বপ্ন, যা যেকোনো বহিরাগতের হাত থেকে ভারতের পশ্চিম দিকটাকে পাহারা দেবে—এমনই এক জোরালো ভাবনা ছিল যা আক্ষরিক অর্থেই সময়কে যেন এক ধাক্কায় সচল করে দিয়েছিল। ইতিহাস আপন গতিতে এগিয়ে চলল; মেথওয়াল্ড মারা গেলেন; আর ১৬৬০ সালে ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় চার্লসের সঙ্গে পর্তুগালের ব্রাগাঞ্জা রাজবংশের ক্যাথারিনের বিয়ে ঠিক হলো—সেই একই ক্যাথারিন, যাঁকে সারাটা জীবন ধরে কমলালেবু-বিক্রেতা নেলের ছায়াতেই ঢাকা পড়ে থাকতে হয়েছিল। তবে তাঁর জন্য একটা সান্ত্বনা ঠিকই ছিল—আর তা হলো, তাঁর বিয়ের যৌতুক হিসেবেই বম্বে ব্রিটিশদের হাতে এসে পৌঁছেছিল, হয়তো-বা কোনো এক সবুজ রঙের টিনের তোরঙ্গের ভেতর করেই, আর সেটা মেথওয়াল্ডের সেই স্বপ্নকে বাস্তবের আরও এক ধাপ কাছে নিয়ে এসেছিল। তারপর ১৬৬৮ সালের ২১শে সেপ্টেম্বর দিনটা আসতে আর খুব বেশি দেরি হলো না, যেদিন কোম্পানি শেষমেশ এই দ্বীপটার দখল পেয়ে গেল... আর তারপরই তারা তোড়জোড় করে কাজে নেমে পড়ল, শুরু হলো দুর্গ বানানো আর সমুদ্র বুজিয়ে জমি উদ্ধারের পালা, আর চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই সেখানে দাঁড়িয়ে গেল এক আস্ত শহর, বম্বে, যার সম্পর্কে সেই পুরনো গানে বলা হতো:
প্রিমা ইন ইন্ডিস,
ভারতের প্রবেশদ্বার,
প্রাচ্যের ধ্রুবতারা
পশ্চিমের পানে যার মুখ ফেরা।
শোন পদ্মা! আমাদের সেই বম্বে, তখনকার বম্বে ছিল অন্যরকম এক জগত, কোনো নাইট-ক্লাব বা আচারের কারখানা বা ওবেরয়-শেরাটন হোটেল কিংবা সিনেমার স্টুডিয়ো—এসব তখন কিছুই ছিল না; কিন্তু শহরটা একেবারে ঝড়ের গতিতে বেড়ে উঠছিল। তৈরি হলো একটা ক্যাথিড্রাল, আর মারাঠা বীর শিবাজী মহারাজের একটা ঘোড়সওয়ার মূর্তি, (যেটার ব্যাপারে আমরা অন্তত ভাবতাম) যে মূর্তিটা রাতের বেলা জ্যান্ত হয়ে ওঠে, আর শহরের রাস্তাগুলো দিয়ে দুর্দান্ত দাপটে ঘোড়া ছুটিয়ে চলে—একেবারে মেরিন ড্রাইভ ধরে সিধা! চৌপাট্টির বালুতটে! মালাবার হিলের পেল্লায় সব বাড়িগুলো পেছনে ফেলে, কেম্পস কর্নার ঘুরে, সমুদ্রের ধার ঘেঁষে পাগলের মতো ছুটত একেবারে সোজা স্ক্যান্ডাল পয়েন্টের দিকে! আর শুধু কি তাই? ছুটতে ছুটতে একেবারে আমার সেই চেনা ওয়ার্ডেন রোড ধরে, ব্রিচ ক্যান্ডির সেই সাহেব-মেমদের জন্য আলাদা-আলাদা করে রাখা সুইমিং পুলগুলোর ঠিক পাশ দিয়ে, একেবারে সেই বিশাল মহালক্ষ্মী মন্দির আর পুরোনো উইলিংডন ক্লাব অবধি… আমার সারা ছোটোবেলা জুড়ে, যখনই বম্বের ওপর কোনো দুঃসময় ঘনিয়ে আসত, ঠিক তখনই রাতের বেলা পথে পথে ঘুরে বেড়ানো ঘুম-না-আসা কোনো এক মানুষ খবর দিত যে সে ওই মূর্তিটাকে নড়াচড়া করতে দেখেছে; আমার সেই ফেলে-আসা কৈশোরের শহরে, যেকোনো দুর্যোগ আর বিপর্যয় যেন এক ঘোড়ার ধূসর, পাথুরে ক্ষুরের কোনো এক অলৌকিক ছন্দে নেচে উঠত।
কিন্তু সেই আদি বাসিন্দারা এখন কোথায়? সবদিক থেকে বিচার করলে নারকেলদের অবস্থাই এখন সবচেয়ে রমরমা। চৌপাট্টির বালুতটে এখনও রোজ নারকেলের মাথা কাটা পড়ে; ওদিকে জুহু বিচে, সান অ্যান্ড স্যান্ড হোটেলের বারান্দায় বসে থাকা সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের অলস চোখের সামনে দিয়েই ছোটো ছোটো ছেলেরা তরতর করে নারকেল গাছে উঠে যায়, আর পেড়ে আনে সেই দাড়িওয়ালা ফল। নারকেলদের তো রীতিমতো নিজেদের একটা আলাদা উৎসবও আছে, ‘কোকোনাট ডে’ বা ‘নারকেল-দিবস’, যেটা কিনা আমার সেই সমাপতন-মিশ্রিত জন্ম-ক্ষণের ঠিক কয়েকদিন আগেই পালিত হয়েছিল। কাজেই, নারকেলের ব্যাপারে আপনারা একেবারে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। ধানের কপালটা অবশ্য অতটা ভালো নয়; ধানখেতগুলো এখন সব কংক্রিটের নিচে চাপা পড়ে গেছে; এককালে সমুদ্রের কাছাকাছি যেখানটায় হাওয়ায় ধানগাছেরা মাথা দোলাত, সেখানে এখন মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে আকাশছোঁয়া সব ইমারত। তা হলেও এই শহরের মানুষজন হিসেবে আমরা কিন্তু সাংঘাতিক ভেতো, ভাত-পাগল। পাটনা চাল, বাসমতী, কাশ্মীরি চাল রোজই তো চালান হয়ে এসে ঢুকছে এই মহানগরে; তাই সেই একেবারে প্রথম দিককার আদি-অকৃত্রিম ধান, ধানের স্মৃতি আমাদের সবার ওপর তার একটা ছাপ ঠিকই রেখে গেছে, একেবারে বিফলে যায়নি তাদের জীবন। আর মুম্বাদেবী—তাঁর দিনকাল এখন আর তেমন রমরমা নেই, মানুষের মনের সিংহাসনে তাঁর জায়গাটা এখন দখল করে নিয়েছেন ওই হাতির-মাথাওয়ালা গণেশ ঠাকুর। উৎসবের ক্যালেন্ডারটা ঘাঁটলেই তাঁর এই পতনটা বেশ মালুম হয়: গণেশ— ‘গণপতি বাপ্পা’—তাঁর জন্য বরাদ্দ আছে গণেশ চতুর্থীর দিনটা, যেদিন বিশাল সব শোভাযাত্রা ‘বের করা হয়’ আর প্লাস্টার অফ প্যারিসের তৈরি ঠাকুরের মূর্তি কাঁধে করে তারা সোজা চৌপাট্টিতে গিয়ে হাজির হয়, আর তারপর সেই মূর্তিগুলোকে ছুঁড়ে ফেলে দেয় একেবারে সমুদ্রের জলে। গণেশের ওই দিনটা হলো বৃষ্টি নামানোর একটা উৎসব, ওর জন্যেই বর্ষা আসাটা সম্ভব হয়, আর সেই টিকটক করে সময়-গোনার একেবারে শেষলগ্নে, আমার এই পৃথিবীতে এসে পড়ার ঠিক আগের দিনগুলোতে সেই উৎসবও পালিত হয়েছিল—কিন্তু মুম্বাদেবীর জন্য বরাদ্দ দিনটা গেল কোথায়? ক্যালেন্ডারের পাতায় তো তার কোনো খোঁজই নেই। কোথায় গেল সেই পমফ্রেট-ধরা জেলেদের প্রার্থনা, কোথায়-বা সেই কাঁকড়া-শিকারিদের ভক্তি? … ওই আদি বাসিন্দাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুরবস্থায় পড়েছে কোলি জেলেরাই। হাতের মতো দেখতে এই উপদ্বীপটার একেবারে বুড়ো আঙুলের জায়গায় ছোট্ট একটা গ্রামের মধ্যে তাদের এখন ঠেসেঠুসে একাকার করে দেওয়া হয়েছে, যদিও এ-কথা ঠিক যে তারা নিজেদের নামেই একটা পুরো এলাকার নাম দিয়ে গেছে—কোলাবা। তবে কোলাবা কজওয়ে ধরে যদি একেবারে শেষ মাথা অবধি চলে যান—সস্তার জামাকাপড়ের দোকান, ইরানি রেস্তোরাঁ আর মাস্টারমশাই, সাংবাদিক ও কেরানিবাবুদের সেই সাদামাটা ফ্ল্যাটবাড়িগুলো পেছনে ফেলে—তা হলে ঠিক দেখতে পাবেন, নৌবাহিনীর ঘাঁটি আর সমুদ্রের মাঝখানটায় তারা কেমন কোণঠাসা হয়ে পড়ে আছে। আর মাঝেমধ্যেই ওই কোলি মেয়েগুলো, পমফ্রেট মাছের নাড়িভুঁড়ি আর কাঁকড়ার আঁশটে গন্ধে যাদের হাত ম ম করে, তারা বেজায় দাপট দেখিয়ে ভিড় ঠেলে একেবারে কোলাবা বাসের লাইনের মাথায় গিয়ে দাঁড়ায়, টকটকে লাল (কিংবা বেগুনি) রঙের শাড়িটা তাদের দুই পায়ের মাঝখান দিয়ে নির্লজ্জের মতো গুঁজে পরা, আর তাদের সেই কুতকুতে, কেমন-যেন-মাছের-মতো চোখদুটোতে লুকিয়ে থাকে পুরোনো দিনের সেই হেরে-যাওয়া আর সবকিছু খুইয়ে বসার এক জ্বালা-ধরানো ঝিলিক। প্রথমে একটা দুর্গ, আর তারপর একটা আস্ত শহর মিলে তাদের জমিজমা সব কেড়ে নিয়েছে; বড়ো বড়ো খুঁটি-পোঁতার যন্ত্রগুলো চুরি করেছে (ভবিষ্যতে টেট্রাপডগুলোও চুরি করে নেবে) তাদের সমুদ্রের একেকটা টুকরো। কিন্তু তা সত্ত্বেও রোজ সন্ধেবেলায়, ডুবন্ত সূর্যের পটভূমিতে পাল তুলে দেওয়া আরবের সেই ধোউ নৌকোগুলো আজও ঠিকই রয়ে গেছে... ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে, মাছ-ধরা জাল, নারকেল, ধান আর খোদ মুম্বাদেবীর রাজত্বের একেবারে বারোটা বাজিয়ে ছেড়ে, ব্রিটিশরা নিজেরাই তখন পাততাড়ি গোটানোর তোড়জোড় করছে; আসলে পৃথিবীতে কোনো রাজত্বই তো আর চিরস্থায়ী হয় না।
আর ১৯শে জুন, ফ্রন্টিয়ার মেলে চেপে এখানে এসে পৌঁছোনোর ঠিক দু-সপ্তাহের মাথায়, দেশ-ছাড়তে-বসা এমনই এক ইংরেজের সঙ্গে আমার বাবা-মা এক ভারী অদ্ভুত চুক্তিতে জড়িয়ে পড়ল। মানুষটার নাম উইলিয়াম মেথওল্ড।
মেথওল্ডস এস্টেটে যাওয়ার যে রাস্তাটা (আমরা এবার আমার খাস রাজত্বে পা রাখছি, এসে পড়ছি আমার ছোটোবেলার একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে; গলাটা কেমন যেন ধরে আসছে আমার) একটা বাসস্টপ আর ছোটো একসারি দোকানের মাঝখান দিয়ে ওয়ার্ডেন রোড থেকে এঁকেবেঁকে ভেতরে ঢুকে গেছে। চিমলকারের খেলনার দোকান; রিডার্স প্যারাডাইস; চিমনভয় ফাতভয়ের গয়নার দোকান; আর সবার ওপরে ছিল বোম্বেলির মিষ্টির দোকান, তাদের সেই মার্কুইস কেক আর ওয়ান ইয়ার্ড অফ চকোলেটস নিয়ে! তাক-লাগিয়ে দেওয়ার মতো সব নাম; কিন্তু এখন আর সে-সব নিয়ে পড়ে থাকার সময় নেই। ব্যান্ড বক্স লন্ড্রির সেই স্যালুট-ঠুকে-দাঁড়ানো কার্ডবোর্ডের বেলবয়টাকে পেছনে ফেলে রাস্তাটা সোজা নিয়ে যায় আমাদের বাড়ি। সে-আমলে নার্লিকার-বাড়ির মেয়েদের সেই গোলাপি রঙের গগনচুম্বী ইমারতটার (শ্রীনগরের রেডিয়ো টাওয়ারের সেই বিশ্রী প্রতিরূপ!) কথা কেউ ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেনি; রাস্তাটা একটা নিচু টিলার গা বেয়ে উঠে গিয়েছিল, যেটা একটা দোতলা বাড়ির চেয়ে কোনোমতেই উঁচু হবে না; তারপর সেটা সাগরপানে মুখ করে খানিকটা বেঁকে গিয়েছিল, যেখান থেকে নিচে তাকালেই চোখে পড়ত ব্রিচ ক্যান্ডি সুইমিং ক্লাব—যেখানে ব্রিটিশ ভারতের ম্যাপের আদলে বানানো একটা পুলে দিব্যি সাঁতার কাটতে পারত গোলাপি চামড়ার মানুষেরা, কোনো কালো চামড়ার নেটিভদের ছোঁয়া লাগার ভয় ছিল না; আর ঠিক সেখানেই, ছোট্ট একটা গোলচক্করকে ঘিরে দারুণ রাজকীয় ভঙ্গিতে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে ছিল উইলিয়াম মেথওল্ডের প্রাসাদগুলো, যেগুলোর গায়ে ঝোলানো ছিল এমন সব সাইনবোর্ড—যেগুলো কিনা আমারই দৌলতে—বহু বছর পর আবারও ফিরে আসবে, যে সাইনবোর্ডগুলোতে লেখা ছিল মোটে দুটো শব্দ; শুধু দুটোই, কিন্তু সেগুলোই আমার অবুঝ বাবা-মাকে টেনে নামিয়েছিল মেথওল্ডের সেই অদ্ভুত খেলায়: ‘বিক্রয় হইবে’ – ‘FOR SALE’.
মেথওয়াল্ডস এস্টেট: এক ছাঁচে ঢালা চারটে বাড়ি, এখানকার আদি বাসিন্দাদের আদবকায়দার সঙ্গে একেবারে মানানসই করে যাদের বানানো হয়েছিল (বিজেতাদের বাড়ি বলে কথা! রোমান সব প্রাসাদ-অট্টালিকা; যেন দোতলা-সমান উঁচু এক অলিম্পাস, কিংবা খর্বকায় কৈলাসের পর্বতের ওপর মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা দেবতাদের তিনতলা বাড়ি!)—বিশাল, মজবুত সব ইমারত, মাথায় তাদের লাল রঙের ত্রিকোণ ঢালু ছাদ, আর প্রতিটা কোণে একটা করে মিনার, হাতির দাঁতের মতো সাদা সেই মিনারগুলোর মাথায় আবার লাল টালির ছুঁচোলো টোপর পরানো (রাজকন্যেদের বন্দি করে রাখার জন্য একেবারে জুতসই!)—বারান্দা-ঘেরা বাড়ি, বাড়ির পেছনের দিকে লুকিয়ে থাকা প্যাঁচানো লোহার সিঁড়ি বেয়ে চাকর-বাকরদের কোয়ার্টারে পৌঁছোনো যায়—সেইসব বাড়ি, মালিক উইলিয়াম মেথওল্ড ইউরোপের তাবড় রাজপ্রাসাদের আদলে ভারী রাজকীয় চালে যাদের নাম রেখেছিলেন: ভার্সাই ভিলা, বাকিংহাম ভিলা, এসকোরিয়াল ভিলা আর সঁ সুসি। বাড়িগুলোর গা বেয়ে বাগানবিলাস লতিয়ে উঠেছে; হালকা নীল জলের পুলে গোল্ডফিশেরা সাঁতার কাটছে; রক-গার্ডেনে ক্যাকটাস মাথা তুলেছে; তেঁতুল গাছের ছায়ায় ছোটো ছোটো লজ্জাবতী গাছেরা জবুথবু হয়ে আছে; আর লনের ওপর ছড়ানো প্রজাপতি, গোলাপ আর বেতের চেয়ার। জুনের মাঝামাঝি সেই দিনটাতে মিস্টার মেথওল্ড তাঁর ওই ফাঁকা প্রাসাদগুলো একেবারে জলের দরে বেচে দিলেন—তবে তার সঙ্গে জুড়ে দিলেন বেশ কিছু শর্ত। কাজেই, আর কোনো ভণিতা না করে এবার আমি তাঁকে আপনাদের সামনে হাজির করছি, ঠিক তাঁর মাথার ওই মাঝখান-চেরা সিঁথিটা সমেতই... ছ-ফুট লম্বা দৈত্যাকার এক মানুষ, এই মেথওল্ড, গায়ের রঙ গোলাপি, চিরযৌবনের মতো গোলাপি। মাথাভর্তি ঘন কালো চুল, ব্রিলিয়ান্টিন তেল দিয়ে চকচকে করা, আর ঠিক মাঝখানে নিখুঁত সিঁথি। ওই মাঝখান-চেরা সিঁথির কথা আমরা পরে আবারও বলব, যার নিখুঁত আর পরিপাটি টানটান ভাবটা মেথওল্ডকে মেয়েদের কাছে এমনই আকর্ষণীয় করে তুলত যে, ওই চুলটা ঘেঁটে দেওয়ার লোভ তারা কিছুতেই সামলে উঠতে পারত না… মাঝখানে-সিঁথি-কাটা মেথওল্ডের ওই চুলের সঙ্গে আমার জীবনের শুরুর দিনগুলোর বেশ একটা গভীর যোগসাজশ আছে। ওটা ছিল এমন এক সিঁথি, যাকে ভর করে ইতিহাস আর যৌনতা যেন পাশাপাশি হেঁটে চলেছিল। ঠিক দড়ির ওপর দিয়ে হেঁটে চলা কোনো মাদারির মতো। (তবে এত কিছুর পরেও, এমনকী আমি নিজে, যে কিনা তাঁকে কখনো চোখেই দেখিনি, তাঁর ওই অলস চকচকে দাঁত কিংবা সাঙ্ঘাতিক কায়দায় আঁচড়ানো চুলের ওপর যার নজর কোনোদিন পড়েইনি, সে-ও তাঁর ওপর এতটুকুও রাগ বা ক্ষোভ পুষে রাখতে সক্ষম নই।)
আর নাকখানা? সেটা দেখতে কেমন ছিল বলুন তো? বেশ খাড়া আর লম্বা? হ্যাঁ, তেমনটাই তো হওয়ার কথা—একেবারে বার্জেরাক থেকে আসা সেই অভিজাত ফরাসি ঠাকুমার বংশধারা বলে কথা! যাঁর শরীরের সেই নীলচে রক্তের স্রোত মেথওল্ডের শিরায় শিরায় বইত, আর তার সেই সাহেবি চালচলনের আড়ালে মিশিয়ে দিত নিষ্ঠুরতার এক আবছা ছায়া—ঠিক যেন অ্যাবসিন্থের সেই মিষ্টি অথচ সর্বনাশা নেশার মতো।
মেথওল্ডস এস্টেট মোটে দুটো শর্তে বিক্রি করা হয়েছিল: এক, বাড়িগুলো যেমন সাজানো আছে, ঠিক তেমন ভাবেই কিনতে হবে—ভেতরের একটা জিনিসও সরানো যাবে না, সব কিছু অবিকল রেখে দেখভাল করতে হবে নতুন মালিকদের; এবং দুই, মালিকানার আসল হাতবদলটা হবে ঠিক ১৫ই আগস্ট মধ্যরাতে।
‘সবকিছু?’ আমিনা সিনাই জিজ্ঞেস করেছিল। ‘আমি একটা চামচও ফেলে দিতে পারব না? ইয়া আল্লাহ্, ওই ল্যাম্পশেডটা... এমনকী একটা চিরুনিও কি ফেলার জো নেই?’
‘সবসুদ্ধু, একেবারে যা আছে সব,’ মেথওয়াল্ড বলেছিলেন, ‘এটাই আমার শর্ত। স্রেফ একটা খেয়াল বলতে পারেন, মিস্টার সিনাই... পাট চুকিয়ে তো চলেই যাচ্ছি, যাওয়ার আগে এই ইংরেজকে না হয় তার এই ছোট্ট খেলাটা খেলতে দিলেন? ওই খেলাধুলো ছাড়া আমাদের, মানে এই ব্রিটিশদের হাতে তো আর বিশেষ কাজকম্ম নেই এখন’
‘আরে শোনোই না আমিনা,’ পরে আহমেদ বোঝাচ্ছে তাকে, ‘চিরকাল কি এই হোটেলের ঘরেই পচে মরবে নাকি? দামটা শুনলে তো? একেবারে জলের দর গো, জলের দর। আর একবার দলিলটা হাতে পেয়ে গেলে ও তখন কী করবে শুনি? তখন তোমার যে ল্যাম্পশেড খুশিমনে ছুড়ে ফেলে দিও। আর তো মোটে দু’মাসের মামলা…’
ওদিকে মেথওল্ড বলছেন, ‘বাগানে একটু ককটেল চলবে নাকি? রোজ সন্ধে ছ’টা। ককটেলের সময়। গত কুড়ি বছরে এর কোনো নড়চড় হয়নি মশাই।’
‘কিন্তু… ওরে বাপরে, ওই রংচটা দেওয়াল... আর আলমারিগুলো তো সব পুরোনো জামাকাপড়ে ঠাসা, জানুম... আমাদের তো সুটকেস থেকেই সব বের করে করে দিন কাটাতে হবে, একটা সুট রাখারও তো জায়গা নেই!’
‘বড্ড বিশ্রী কারবার, মিস্টার সিনাই,’ ক্যাকটাস আর গোলাপের মাঝে বসে নিজের স্কচ-এ চুমুক দিতে দিতে মেথওল্ড বললেন, ‘এমনটা তো কখনও দেখিনি। শত শত বছর ধরে দিব্যি একখানা ভদ্রস্থ সরকার চলল, তারপর আচমকাই, পাততাড়ি গুটিয়ে বিদায়! আপনাদের কিন্তু মানতেই হবে যে আমরা একেবারে খারাপ ছিলাম না: আপনাদের রাস্তাঘাট বানিয়েছি। স্কুল, রেলগাড়ি, সংসদীয় ব্যবস্থা, সবই তো কাজের জিনিস। ওই তাজমহল তো ধসে পড়ছিল প্রায়, শেষমেশ এক ইংরেজ সাহেবের নজরে পড়ল বলেই না রক্ষে পেল। আর এখন দেখুন, হঠাৎ করে স্বাধীনতার শখ। বাক্সপ্যাঁটরা গুটিয়ে বেরিয়ে পড়ার জন্য হাতে মোটে সত্তর দিন। আমি নিজেই অবশ্য এর ঘোরতর বিরোধী, কিন্তু কী আর করা যাবে বলুন?’
‘... আর কার্পেটের ওপর দাগগুলো একবার দ্যাখো, জানুম; এই দুটো মাস আমাদের ওই সাহেবদের মতো করে বাঁচতে হবে? তুমি বাথরুমগুলো দেখেছ? পটের ধারেকাছে একটুও জল নেই। আমি কোনোদিন বিশ্বাস করিনি, কিন্তু কথাটা সত্যিই, হায় ঈশ্বর, ওরা শুধু কাগজ দিয়ে পেছন মোছে! …’
‘বলুন তো, মিস্টার মেথওল্ড,’ আহমেদ সিনাইয়ের গলার সুরটা এখন বদলে গেছে, সামনে খোদ ইংরেজ সাহেব বসে, তাই তাঁর গলায় তখন অক্সফোর্ডি কায়দার এক বিচ্ছিরি মেকি টান। ‘অযথা এই দেরি করার জিদ কেন ধরছেন বলুন তো? চটপট কেনাবেচা সেরে ফেলাই তো বুদ্ধিমানের কাজ। ব্যাপারটা চটজলদি পাকা করে ফেলুন না মশাই।’
‘... আর চারদিকে সব বুড়ি বুড়ি মেমসাহেবদের ছবি, বাবা রে! দেয়ালে আমার নিজের বাবার ছবিটা টাঙানোর মতো একটুও জায়গা নেই! …’
‘আমার তো মনে হচ্ছে, মিস্টার সিনাই,’ সূর্য তখন ব্রিচ ক্যান্ডি পুলের পিছনে আরব সাগরে ডুব দিচ্ছে। গেলাসে আবার পানীয় ঢালতে ঢালতে মিস্টার মেথওল্ড বললেন, ‘আমার এই কাঠখোট্টা সাহেব-আদলের আড়ালে একটা মন লুকিয়ে আছে, রূপকের প্রতি যার একটা ঘোরতর ভারতীয় মোহ আছে।’
‘আর এত বেশি মদ খাওয়া, জানুম... ওটা কিন্তু মোটেই ভালো হচ্ছে না।’
‘ঠিক বুঝলাম না—মিস্টার মেথওল্ড, অ্যাঁ—মানে ঠিক কী বলতে চাইছেন…’
‘...আরে বুঝলেন না: এক হিসেবে আমিও তো ক্ষমতা হস্তান্তর করছি। ব্রিটিশ রাজের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ওই একই সময়ে কাজটা সারার একটা বাতিক জেগেছে আমার। আগেই তো বললাম: এ একরকম খেলা। আমার এই খেয়ালটুকু মেনে নিন না, সিনাই? তাছাড়া, আপনি নিজেই তো মানছেন, দামটা কিন্তু মন্দ হাঁকিনি।’
‘লোকটার মাথা খারাপ হয়ে যায়নি তো, জানুম? তোমার কী মনে হয়: লোকটা যদি পাগল হয়, তা হলে ওর সঙ্গে চুক্তি করাটা কি নিরাপদ হবে?’
‘এবার একটু থামো তো গিন্নি,’ আহমেদ সিনাই বলল, ‘অনেক হয়েছে। মিস্টার মেথওল্ড অতি সজ্জন ব্যক্তি; খানদানি বংশের লোক, এককথার মানুষ; তাঁর নামে আমি কোনো... আর তাছাড়া, অন্য খদ্দেররা নিশ্চয়ই এত ঘ্যানঘ্যান করছে না... মোদ্দা কথা, আমি তাঁকে হ্যাঁ বলে দিয়েছি, ব্যস, ওখানেই ল্যাঠা চুকে গেছে।’
‘নিন, বিস্কুট খান’ একটা প্লেট এগিয়ে দিয়ে মিস্টার মেথওল্ড বললেন, ‘নিন না মিস্টার এস., সঙ্কোচ করবেন না। হ্যাঁ, বড়ো অদ্ভুত এক ব্যাপার। এমনটা তো কখনও দেখিনি। আমার পুরোনো ভাড়াটেরা—দীর্ঘ দিন কাটিয়েছে এদেশে, সবাই একেবারে ঘাগু ভারত-বিশেষজ্ঞ—আচমকাই, পাততাড়ি গুটিয়ে ভো-কাট্টা। বড্ড দৃষ্টিকটু ব্যাপার। ভারতের প্রতি ওদের আর কোনো টানই রইল না। রাতারাতি। আমার মতো এক সাদাসিধে লোকের কাছে ব্যাপারটা বেশ ধোঁয়াটে। মনে হলো ওরা যেন একেবারে হাত ধুয়ে ফেলল—এক টুকরো জিনিসও সঙ্গে নিয়ে যেতে চাইল না। “যাক গে, ওসব থাক পড়ে,” ওরা বলল। দেশে ফিরে গিয়ে আবার নতুন করে শুরু করা যাবে। ওদের কারোরই যে পয়সার কোনো অভাব আছে এমন নয়, বুঝলেন তো, কিন্তু তবু… ব্যাপারটা অদ্ভুত। সব ঝক্কি আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে সটকে পড়ল। আর ঠিক তখনই আমার মাথায় এই ফন্দিটা এল।’
‘‘...হ্যাঁ গো হ্যাঁ, তুমিই যা করার করো,’ আমিনা বেশ ঝাঁঝের সঙ্গেই বলল, ‘পেটে এই বাচ্চা নিয়ে মাটির ঢিবির মতো আমি বসেই আছি, আমার আর কী-ই বা করার আছে বলো? পেটের বাচ্চা বাড়ছে, আর আমাকে গিয়ে উঠতে হবে এক অচেনা লোকের সাজানো বাসায়, তাতে কার কী এসে যায়? ...উফ, তুমি আমাকে দিয়ে আর কী কী যে করাবে…’
‘আহা! কেঁদো না,’ হোটেলের ঘরের ভেতর অস্থির পায়চারি করতে করতে আহমেদ এবার বলছে, ‘বাড়িটা তো খাসা। ঠিক কিনা বলো? বাড়িটা তো তোমারও মনে ধরেছে। আর মাত্র দুটো-মাস... দু-মাসেরও কম... আরেহ! কী হলো, লাথি মারছে নাকি? কই দেখি, দেখি… কোথায়? এইখানটায়?’
‘ওই যে ওখানটায়,’ নাক মুছতে মুছতে আমিনা বলে, ‘বেশ জোরে একটা লাথি মারল কিন্তু।’
‘আমার একান্ত ইচ্ছে,’ অস্তগামী সূর্যের দিকে তাকিয়ে মেথওল্ড তাঁর মনের কথাটা খোলসা করলেন, ‘আমার সম্পত্তির হস্তান্তর করবার পালাটা আমি নিজের মতো করে সাজাব। যা-কিছু দেখতে পাচ্ছেন, সব এখানে রেখে যাব। যোগ্য মানুষদের বেছে নেব,—এই যেমন ধরুন আপনি, মিস্টার সিনাই!—একেবারে যেমনটি দেখছেন, ঠিক তেমনি অক্ষত অবস্থায় তাদের হাতে তুলে দেব: একদম ঝকঝকে চালু অবস্থায়। চারপাশে তাকিয়ে দেখুন: সবকিছুর একেবারে নিখুঁত হাল, আপনি মানেন কি না? আমরা যেমনটা বলতাম, টিকিটি-বু। কিংবা হিন্দুস্তানি ভাষায় আপনারা যেমন বলেন: সবকুছ টিকটক হ্যায়। একেবারে সব ঠিকঠাক।’
পূর্ববর্তী পর্ব পড়ুন এখানে: [মধ্যরাতের সন্তানেরা]
মধ্যরাতের সন্তানেরা
সালমান রুশদি
▋অনুবাদ: দীপ মন্ডল
সালমান রুশদি
▋অনুবাদ: দীপ মন্ডল




মন্তব্য