
ফাল্গুনী রায়ের কবিতায় তারুণ্যের সবগুলি লক্ষণ সুস্পষ্ট। যে-বয়সে মানুষ স্বপ্নচালিতের মতো কবিতা লেখে, কথাগুলি একটার পিঠে আর-একটা অপ্রতিরোধ্য বেগে এসে পড়ে, কলম একবার চলতে আরম্ভ করলে আর থামতে চায় না, এই কবি সে-বয়স কখনো পার হননি। যদি তিনি তিরিশ বছর পর্যন্তও বাঁচতেন, তাহ’লে হয়তো এ-সব কবিতার অধিকাংশ তাঁর নিজেরই বর্জনীয় ব’লে মনে হ’তো; কিন্তু অকালমৃত্যুর শোচনীয় যতিপাতের ফলে শুধু কয়েকটি বাল্যরচনাই বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে তাঁর পরিচয়ের চিহ্ন হ’য়ে রইলো। মৃত্যুর পরে তাঁর যে-সব কবিতা পাওয়া গিয়েছে তা থেকে বারোটি এই বইয়ের জন্য আমি নির্বাচন করেছি। এই বারোটি কবিতায় ফাল্গুনীর যে-পরিচয় পাওয়া যায় তা উপেক্ষণীয় নয়।
এই কবিতাগুলিতে একটা আনকোরা উচ্চম ছন্দের ঝংকারে, অলংকারে ও অনুপ্রাসে আপনাকে প্রকাশ করেছে। প্রকাশের ভঙ্গিতে উগ্রতা কিছু বেশি। সম্পদ আছে, পরিচ্ছন্নতা নেই। শক্তি আছে, সংযম নেই। রচনাগুলি উচ্ছৃঙ্খল, প্রগল্ভ, অনর্থক অনুপ্রাসে আবিল, অত্যধিক পুনরুক্তিতে ক্লান্তিকর। এগুলি দোষের কথা, কিন্তু ফাল্গুনীর পক্ষে দোষের কথা নয়, কেননা এগুলি সবই তারুণ্যের ধর্ম। পৃথিবীর কোনো কবিরই বাল্যরচনা এ-সব দোষ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত নয়। কলমের মুখের রাশ ধরতে জানা সাধনাসাপেক্ষ, সে-সময় এ-কবি তাঁর জীবনে পাননি। শিল্পসৃষ্টিতে শুধু শক্তিই যথেষ্ট নয়, শক্তিকে সৌন্দর্যে পরিণত করা চাই। যাকে সুষমা বলি, শ্রী বলি, সেইটেই শিল্পকলার চরম লক্ষ্য। সেটা সহজে হয় না। ফাল্গুনীর কাছে সেটা আশা করাই অন্যায়; তাঁর কবিজীবনের প্রথম পর্যায়ই তাঁর শেষ পর্যায়।
তা-ই যদি হয়, এ-সব কবিতা যদি ছেলেবয়সের অনুশীলন মাত্র, তাহ’লে তাদের সকলের সামনে টেনে বের করা কেন? শুধু কি মৃত ব্যক্তির স্মৃতি-রক্ষার গরজে? তা নয়। ফাল্গুনীর কবিতাগুলির নিজস্ব মূল্য কিছুই যদি না থাকতো তাহ’লে এ-বই প্রকাশ করতে তাঁর বন্ধুদের আমি উৎসাহিত করতুম না। ‘বারোটি কবিতা’ পড়ে বোঝা যাবে যে এগুলি মাথা ঘামিয়ে খেটে-খুটে লেখা নয়, অসংবরণীয় আবেগের ধাক্কায় ছিটকে-পড়া। জাত-কবির লক্ষণই এই যে তিনি কথার প্রেমে গভীরভাবে মগ্ন, কথাগুলি তাঁর কাছে ভাবপ্রকাশের উপায়মাত্র নয়, তাদের নিজস্ব রূপবর্ণগন্ধময় সত্তারহস্ত তাঁর কাছে, এবং শুধুই তাঁর কাছে, উদ্ঘাটিত। প্রথম বয়সে এই প্রেম একেবারেই নিষ্কাম থাকে, সব কথার জন্য সব সময়েই দরজা খোলা, কোনোখানে কোনো বাধা নেই, কখনোই কাউকে উপেক্ষা করতে প্রাণ চায় না। তার ফলে কবিতার ক্ষতি হয়; তাতে শক্তির পরিচয়মাত্র থাকে, শক্তি সৌন্দর্যরূপে প্রকাশিত হ’তে পারে না, কেননা সৌন্দর্য মানেই নির্বাচন, সামঞ্জস্য, বিভিন্ন অঙ্গের সমন্বয়। বয়স বাড়বার সঙ্গে-সঙ্গে কবির বাক্প্রেমে কামগন্ধ ঢোকে, তখন আপন রচনাকে সৌন্দর্যদানের স্বার্থই তাঁর মধ্যে প্রবল হয়, এবং সে-উদ্দেশে কথাগুলিকে সযত্নে সচেতনভাবে ব্যবহার করেন, প্রয়োজন হ’লে অত্যন্ত প্রিয় কোনো কথাকেও ঠেলে সরিয়ে দিতে কুণ্ঠিত হন না। কবিতা লেখার সময় মনের মহলে কত কথারই তো ঠেলাঠেলি ভিড়; তাদের ভিতর থেকে ঠিক জায়গায় ঠিক কথাটি তিনি বেছে নেন; এই বেছে নেয়াটাকে, এই সাজানোটাকেই আমরা আর্ট বলি। অল্প ভাবে বলতে গেলে, অল্প বয়সে কথাই কর্তা, কবি তার দ্বারা চালিত, পরিণত বয়সে কবি হন কর্তা, কথার অক্ষৌহিণী সেনানীর অধিনায়ক। প্রথম অবস্থায় কবিত্বের আভাসমাত্র পাই, দ্বিতীয় অবস্থায় কবিত্বের বিকাশ।
এই বারোটির যে-কোনো একটি কবিতা পড়লেই বোঝা যাবে যে ফাল্গুনী যথার্থ বাক্প্রেমিক। তাতে প্রমাণ হয় যে তিনি জাত-কবি। কিন্তু এই প্রেমে তিনি যে আত্মহারা, কথার তোড়ে তিনি যে গা ভাসিয়ে দেন, কোনোখানেই নিজেকে সংযত করতে পারেন না, এতে অবশ্য তাঁর তারুণ্যই সূচিত হয়। তারুণ্যের অনেক ক্ষমা আছে। বস্তুত অনেকখানি আতিশয্য ও উচ্চ শৃঙ্খলতা নিয়েই তারুণ্যকে গ্রহণ করতে হয়। ওটা জৈব লীলা, প্রকৃতির সৃষ্টিশালায় ওটা প্রয়োজন, ঐ অবস্থার ভিতর দিয়ে পার হ’য়ে তবেই মানুষ সুসম্পূর্ণ পরিণতিতে পৌছতে পারে।
এই কবিতাগুলির অগোছালো, এলোমেলো, অত্যন্ত-ঝংকৃত ভাষার উজ্জ্বলতা যে-প্রাণশক্তিকে প্রকাশ করেছে, সেই প্রাণশক্তিকে শ্রদ্ধা করবো না, এত বড়ো বিজ্ঞ এখনও আমি হইনি। ফালগুনী রায় দীর্ঘজীবী হ’লে তাঁর কবিতার পরিণতি কোন পথে সম্ভব হ’তো তা নিয়ে জল্পনা ক’রে লাভ নেই, কিন্তু এখানে, উচ্ছ্বাসের ফেনিলতা সত্ত্বেও, যে-ভাবাবেগ ধরা পড়ে সেটুকু খাঁটি; কবির অন্তরে সত্যিকার অনুভূতি ছিলো, বলবার একটা কথা ছিলো, এবং কবিত্বের এটাই মূলধন। প্রথম যৌবনে প্রচলিত সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ভাবটা তীব্র হ’য়ে ওঠে, সেই তীব্রতাই এই কবিতাগুলির স্বাদ।
ফাল্গুনীর সাহিতিক গোত্রনির্ণয় করা শক্ত কাজ নয়। সতেন্দ্র দত্ত-নজরুল ইসলামের কাব্যাদর্শে তাঁর মন অভিভূত ছিলো, ‘অমাবস্থা’ ও ‘কঙ্কাবতী’র লেখকের প্রভাবও চেষ্টা ক’রে খুঁজে বের করতে হয় না। অথচ মোটের উপর এটা মনে হয় না যে তিনি কারো অনুকরণ করেছেন। নবীন কবিদের উপর পূর্ববর্তীদের প্রভাব পড়বেই, তবু ফাল্গুনীর স্বকীয়তার এই ছোটো বইটিই যথেষ্ট প্রমাণ। তাঁর কবিতার দোষগুলি তাঁর নিজের-গুণগুলিও তা-ই। আর ভেবে দেখতে গেলে এই দোষ আর গুণ আলাদা জিনিশ নয়, একই বস্তু। কবিতাগুলি একান্তই স্বত-উৎসারিত ও স্বচ্ছন্দ, এবং সেইজন্যই উচ্ছৃঙ্খল; এদের পিছনে সচেতন গঠননৈপুণ্য নেই, আছে শুধু হ’য়ে ওঠার, ফুটে ওঠার প্রেরণা। কাঁচা বয়সের এই যে নির্লজ্জ উল্লাস, এর একটা নেশা আছে। এই নেশা মস্ত কিছু নয়, কিন্তু তুচ্ছও নয়, এর স্বাদগ্রহণ করতে সকলকে নিমন্ত্রণ করি। এ-কথা আমরা যেন না ভুলি যে ‘মাতাল বাতাসে যা-তা-কথা-বলা দিন’ আমাদের সকলের জীবনেই আসে, যদিও কারো জীবনেই স্থায়ী হয় না, কিন্তু এমন দুর্ভাগা কে আছে, জীবনের যে-কোনো অবস্থায় নবীন করিব রচনার ভিতর দিয়ে সেই দিনের স্বাদ আবার নতুন ক’রে পেতে যার ইচ্ছা না করে?
১৯৪৩
[সূত্র: কালের পুতুল, বুদ্ধদেব বসু। পৃষ্ঠা: ১২০–১২২, দু-জন তরুণ মৃত কবি: ফাল্গুনী রায় ও সুকুমার সরকার। প্রথম প্রকাশ: ১৯৪৬, নিউ এজ সংস্করণ: জানুয়ারি ১৯৫৯। প্রকাশক: জে. এন. সিংহ রায়, ২২, ক্যানিং স্ট্রীট, কলকাতা-১।]



মন্তব্য