খবরটা এলো প্রায় ভোররাতে! দরমার ঘরের গায়ে, মরা মানুষের পোড়া চামড়ার মতো কোনোমতে ঝুলে থাকা টিনের দরজাটায়, দমাদম ধাক্কার আওয়াজে ঝুপড়ির দেওয়ালগুলো এমন কেঁপে উঠলো, যেন ভাদ্রের পোয়াতি মেঘের পেট চিরে বাইরে অঝোরে বৃষ্টি নেমেছে। আরবেলিয়া কলোনির নীচু ধানজমির ঝুরো মাটি বেশ খানিকটা করে বসে গিয়েছে সেই বৃষ্টির চাপে! এখন হয়ত আরো খানিকটা বসে গিয়েছে জনা দশেক ভারী বুটের ওজন সামলাতে না পেরে। আসলে অসীমার ক্লান্ত শরীর জুড়ে নেমে আসা, ঝিমঝিম নেশার মতন রাত্রিকালীন ঘুমের পেটের ভিতর দিয়ে উন্মত্তের মতো ছুটে এসেছে ওরা। ঠিক যেমনটা গভীর গাঢ় রঙের অন্ধকার পেরিয়ে শ্রাবণ আসে দিকশূন্য সংসারের মতো! পাশের জাম গাছটায় তখন ট্যাসকোনা পাখির বাচ্চাটা জেগে গিয়ে মড়া কান্না জুড়ে দিয়েছে। সে স্বর অবিকল মানুষের মতো! অসীমার ক্লান্তি ফুরিয়ে আসে। অপেক্ষা শেষ হয়। নিভে যায় মনের অগোচরে বয়ে চলা অবচেতন সংলাপ! এমনিতেই ভোর ভোর ঘুম ভাঙা অভ্যেস ওর। কাল সারারাত দুচোখের ঘুম গাঢ় হয়নি তেমন। নাকের ডগায় নাগ কেশরের গন্ধ জড়ানো এই মগ্ন নাতিশীতোষ্ণ রাতের বুকে, এমনি ভাবেই ওদের আসার অপেক্ষায় যেন ওঁৎ পেতে ছিল ও। বিছানায় শরীরটা তিন ভাঁজে ভেঙেচুরে উঠে বসে অসীমা। তেমন কোন তাড়া নেই ওর! নিজের পরনের কাপড়টা ঠিক করে নেয় ধীরে সুস্থে। পিঠের ওপর খোলা চুলটা আলগোছে বেঁধে ফেলে। বিছানায় শুয়ে থাকা আদুর গায়ের শিশুগুলির ওপর শতচ্ছিন্ন কাঁথাটাকে ভালোভাবে চাপা দিয়ে, নিঃশব্দে নেমে এসে দরজাটা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে। বাইরে তখন আস্ত একটা পুলিশের ভ্যান অপেক্ষা করছে ওর জন্য! থানার মেজবাবু নিজে এসেছেন! ওকে দেখে তিনি হাতের আধপোড়া সিগারেটটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে, ওর দিকে সরে এলেন কিছুটা। মুখটা ওর কানের ঠিক পাশটায় নিয়ে এসে হালকা চাপা স্বরে বললেন, ‘কাজ হয়ে গেছে! একবার ঘুরে আসবি চল!’ সে নিঃশ্বাসে তখন পোড়া তামাক আর শীতল কামনার গন্ধ যেন ছোঁয়াছুঁয়ি খেলছে। খাল ধারের পিচকালো রাস্তায় তখনও জমা হয়ে আছে গত জন্মের সাদা মাটা পাপ-পুণ্য, চাওয়া-পাওয়ার পুরোনো ইতিহাস! প্রাচীন পলেস্তারা! ধোঁয়া ধোঁয়া ব-দ্বীপ! ঝুপড়ির পিছনের কলাবাগানের কপাল জুড়ে খরিশ কেউটের জোর লেগেছে। বৃষ্টিফোঁটা গায়ে নিস্তব্ধ পাট ক্ষেতের উপর থেকে এক পোষ মানা ভোরের চাঁদ, তখন আবছা হতে শুরু করেছে অল্প অল্প করে!
আপাদমস্তক প্লাস্টিকে মোড়া বডিটার পাদুটো বেয়ে রক্ত চুইয়ে পড়ছে তখনও! পায়ের নীচদুটো ফ্যাটফ্যাটে রকমের সাদা! তার ঠিক পাশ দিয়ে গড়িয়ে গিয়ে, বাসি নোনতা রক্তের ফোঁটাগুলো আঁচলের নকশা তৈরী করেছে যেন! অসীমার সামনে দিয়েই বডিটা নিয়ে ওরা চলে গেল লাশকাটা ঘরে। মহকুমা হাসপাতাল চত্ত্বর তখন পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ! এই ভোররাতে ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব নিজে ছুটে এসেছেন লাশ দেখবেন বলে! এনকাউন্টার কেস বলে কথা! হাসপাতাল চত্ত্বরের ছাতিম গাছটার নীচে এতক্ষণ মুখটা দুহাতে আড়াল করে বসে ছিল অসীমা। এসময়টায় চোখে মুখে একটু ধ্বস্ত হাবভাব আনা দরকার! এখন বেশ কিছুক্ষণ ধরে পোস্টমর্টেম চলবে। লাশ কাটা ঘরে ডাক্তার আর ডোম মিলে একটা ভিডিও ক্যামেরার সামনে বডিটাকে আবক্ষ চিরে ফেলবে, চোখেমুখে তীক্ষ্ণ জিজ্ঞাসা নিয়ে। মেডিকেল রিপোর্টে লেখা হবে, "Injuries - Firearm Wounds. Wound No. 1 Entry wound: 1.2 cm x 1.0 cm, on left side chest, 8 cm below left nipple. Margins inverted.
Wound No. 2: Entry: 0.8 cm on right thigh, front side. Bullet recovered from posterior thigh muscles, sealed and handed over to IO. Marked as Article-A.” তিন নম্বর বুলেটটা হয়তো কান ঘেঁষে বেরিয়ে গেছে! গুলিটা লক্ষভ্রষ্ট হলেও তার নির্দিষ্ট চিহ্ন কিন্তু রেখে গেছে লাশের শরীরে! জখমের পাশে থেঁতলানো মাংস জমে আছে লাল চেরা দাগের মতন! আর সেই দাগ ধরেই হয়তো, অনেকগুলো পূর্ণিমা অমাবস্যা পার করে পৌঁছে যাওয়া যায়, একরাশ কামিনীর মতো ফুটে থাকা একটা পরিপূর্ণ ভাতের থালায়। প্রায় তিনদিন অনাহারের পর, পোড়া রসুন ছাঁচা খারকোল পাতা দিয়ে সে থালা থেকে লোকটা গত কাল রাতেও গোগ্রাসে বেশ অনেকটা ভাত খেয়েছিল। যার বেশ কিছুটা, প্রায় ২০০ মিলির মতো এখনো লোকটার পেটে ঠাসা হয়ে আছে। অর্ধপাচিত সে খাবারে এখন রীতিমত পচ ধরেছে! কালো হয়ে যাওয়া শরীরে রাইগর মর্টিস ফর্ম করেছে পুরো মাত্রায়! চেরা স্টমাক আর ওজন করা খাবার দেখলে আরামসে বলে দেওয়া যাবে গুলি খেয়ে মারা যাবার চার থেকে ছয় ঘন্টা আগে লোকটা শেষবারের মত রাতের খাবার খেয়েছিল। সে খাবার অসীমাই বেড়ে দিয়েছিল, বলেছিল, ‘ভাইত উদলা রাখছি, খাইয়া লও! ওবলা বিলের ধার থেইক্যা খারকোল পাতা তুলসি। তুমি বও। আমি একখান লেবু কাইট্যা দি!’ অসীমা উঠে যেতে গেলে আচমকা লোকটা ওর হাতটা চেপে ধরেছিল! বড় নিবিষ্ট সে টান! লোহার চুড়িটা প্রায় কেটে বসে যাচ্ছিল অসীমার হাতে! হ্যাঁচকা টানে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়েছিল ও। সেই অভিঘাতে লোকটার মুখ থেকে সব কটা ভাত মাটিতে পড়ে ছড়িয়ে গিয়েছিল।
একটু পরে কাটা ছেঁড়া শেষ হলে ডাক্তারের হাত দিয়ে যে রিপোর্টটা তৈরী হয়ে আসবে, তাতে পরিষ্কার লেখা থাকবে. লোকটার ডান বাম দুহাতেই GSR: NIL। মানে ডান বাম কোনো হাতেই লোকটা গুলি চালায়নি অথচ পুলিশ ততক্ষণে বেমালুম গল্প বানিয়ে দিয়েছে, অ্যারেস্ট করে থানায় আনার সময়, পুলিশের হাত থেকে নাকি বন্দুক ছিনতাই করে পালাবার চেষ্টা করেছিল লোকটা। পুলিশকে লক্ষ্য করে নাকি এক দু রাউন্ড ফায়ারও করেছিল! তাতেই পুলিশ বাধ্য হয় গুলি চালাতে এবং সেই পাল্টা গুলিতেই লোকটির মৃত্যু হয়েছে!
ঠুনকো! ঠুনকো! এই মুহূর্তে অসীমার চোখে মুখে সাজানো যে দুঃখ দুঃখ ভাব, সব আসলে ঠুনকো! হিংসা-ঘৃণা-বিরংসা পেরিয়ে এই যে ওর দৃষ্টিতে এখন এক আকাশকুসুম শূন্যতা! ভালোবাসা হারাবার এই যে একটা কৃত্রিম ব্যাথা,যন্ত্রণা ওকে গিলে ফেলছে ধীরে ধীরে, এসবই আসলে ভান! দেখার ভুল কিংবা চারপাশের মানুষকে সবটা গুলিয়ে দেবার অভিনয়! উতলা ঝিরঝির বর্ষার সাথে মিশে এতক্ষণ ধরে বাসি ছাতিম ফুলের মিষ্টি একটা সুবাস, ভেসে আসছিল মাঠের দিক থেকে ধেয়ে আসা জোলো বাতাসটায় ভর করে। এখন বিষণ্ণ সে আবহে হালকা আঁশটানি গন্ধ! আকাশে আকাশে ঘোরাফেরা করছে বিচ্ছিন্ন কিছু মেঘের ছায়াছবি। বৃষ্টিপাতের ধার ঘেঁষে লাশটার দিকে তাকায় অসীমা একবার। হয়তো এই শেষবার! কাটাকুটির পর দেহটা যেন আকারে আরও ছোট মনে হচ্ছে! গোল মুখটা চুপসে সরু মতন হয়ে গেছে মৃত্যুর কয়েক ঘন্টার মধ্যেই! গালের শুকনো চামড়ায় খোঁচা খোঁচা পাকা দাড়িগুলো জেগে আছে, যেন ঘন অন্ধকার রঙের দেওয়ালের গায়ে ফুটে উঠেছে, টুকরো টুকরো গার্হস্থ্য খিদে! একটা ব্যস্ত মাছি এসে বারবার বসছে লাশটার চোখে মুখে। এক দুবার হাত দিয়ে সরিয়ে দেয় অসীমা। চোয়ালটা ফুলে গেছে যেন! মারা যাবার আগে গভীর আঘাত পেয়েছিল লোকটা! জায়গাটায় কালশিটে পড়ে গেছে! লাশের মুখে শেষবারের মতন জল দিয়ে, প্যাকাটির ভুসভুসে আগুনটা তার ঠোঁটের কাছে চেপে ধরে অসীমা! এই দাহকার্য্যে এখন ওরই একমাত্র অধিকার! বৃষ্টিভেজা স্যাঁতস্যাঁতে হিমশীতল সে শরীরে ভাদ্রের মাপা উত্তাপ এনে দেয় অন্তিমের সেই আগুন! ইচ্ছে করেই ঠোঁটটা বেশ খানিকটা পুড়িয়ে দেয় অসীমা! এটা করতে গিয়ে গতকাল রাতে লোকটার চোখের সেই উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টিটার কথা ওর মনে পড়ে যায় বারবার! যখন লোকটার স্বভাবসিদ্ধ কামুক দু চোখে বেশ খানিকটা ইন্দ্রিয়াতীত ভয় লেগেছিল!
লোকটার নাম সুদাম মন্ডল। সম্পর্কে অসীমার তৃতীয় পক্ষের 'সোয়ামি’ ছিল সে। গেলবার যখন ওর আগের পক্ষের সওহার, খাটু মোল্লা ওকে এপারে ফেলে রেখে বেড়া টপকে, বাংলাদেশে পালালো, তখন তিনতিনটে ছেলেমেয়ে নিয়ে রীতিমতো আতান্তরে পড়েছিল অসীমা ওরফে রোকসানা বিবি! কোলেরটার বয়স তখন মোটে ছয় মাস! সারাদিন বিড়ি বাঁধা, জরি, কাঁথা সেলাইয়ের কাজ করে আবার সন্ধ্যেবেলা মাটিয়া বাজারের ভাটিখানায় যেত অসীমা। ভাটিখানার মালিক বলতো ওর পয়ে নাকি খদ্দের হয়! আসলে পয়-অপয় সব ফালতু কথা! পেট থেকে তিন তিনটে খসাবার পরও রোকসানা বিবির শরীর টস্কায়নি এতোটুকু! সেখানে নেশাড়ু মিস্ত্রি মরদের টেবিলে টেবিলে বাংলার গ্লাসগুলো পৌঁছে দিতে দিতে অসীমা নিজেও নেশায় পড়ে যেত! পুরুষ সঙ্গহীন অপ্রাণ জড়বস্তুর মত পড়ে থাকতে থাকতে, ওর নিজের জং ধরে যাওয়া শরীরটাও জেগে উঠতো সময়ে সময়ে। সেরকমই কোনো মায়াময় মুহূর্তে সুদামের চোখে পড়ে গিয়েছিল অসীমা। সুদামের লকলকে চোখের দিকে তাকিয়ে অসীমা শুধু হাসতো! বোকা বনে যাওয়া হাসি! পাল্টা মিচকে হাসতো সুদামও। শেষ পর্যন্ত্য সেই হাসিই কাল হল অসীমার! সেই যে ও সুদামের খপ্পরে পড়ল আর বেরোতে পারলো না! তাকে নিয়ে এসে তুললো ওর নিজের ঝুপড়িতে! অসীমার বড় মেয়েটার তখন বছর চোদ্দ বয়স। লোকটার সব ভালো! কিন্তু শুধু মেয়েদের দিকে চোখ! মেয়ে বউ ফারাক করতে জানে না! দুনিয়া শুদ্ধু জায়গায় কাণ্ড করে এসে সুদাম শেল্টার নিত এই ঝুপড়িতে! অসীমাই বলে কয়ে ওকে কাউন্সিলরের কাছে ঢুকিয়ে দিল একদিন। কাজে কম্মে থাকলে যদি একটু শুধরোয়! কিন্তু কোথায় কি! খুব অল্পেই কাউন্সিলর ওকে নিজের সব দুনম্বরি ধান্দায় ডান হাত করে নিল। নিপুণ হাতে সুদাম বাজার থেকে তোলা তুলতো, আড়ৎদারদের থেকে হপ্তা নিত, মাটিয়ার রেন্ডিপাড়া থেকে উসুলী করতো! আর রাত বাড়লে বর্ডার পেরিয়ে মেয়ে পাচার, গরু পাচার, ড্রাগসের চোরা কারবার সেসব তো আছেই! সব ঠিকঠাকই চলছিল, কিন্তু গোল বাঁধলো, যেদিন অসীমার বড় মেয়েটা হঠাৎ বমি করতে আরম্ভ করলো! এ লক্ষণ তো অসীমার অচেনা নয়! মেয়েকে চেপে ধরতে মায়ের কাছে ভেঙে পড়লো সে! অসীমা টের পেল সেদিন, দুধ-কলা দিয়ে এতদিন কি কালসাপটাই না পুষেছে! মাঝে বাদুড়িয়ায় এক সেলাইয়ের দোকানে কাজে লেগেছিল অসীমা। এতগুলো পেট, প্রায় একাই চালাতে হত ওকে! সুদাম তো যা কামাত, তা দিয়ে মদ খেয়ে এদিক ওদিক পড়ে থাকত সবসময়! তা সে সময়টায় প্রায় রোজ ফাঁকা দুপুরগুলোর সুযোগ নিয়েছে সুদাম! বয়ঃসন্ধির মেয়েটাকে ভোগ করেছে নিজের ইচ্ছেমতন করে! মেয়ে এখন নিজের সৎ বাপের ঔরসে গর্ভবতী! তিন মাস চলছে! এ যেন মাংসের সাথে আগুনের লৌকিক অজাচার!
ভাদ্রের গুমনামী আকাশ বড় প্রতারক! এমন রূপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সামনে আছে, কাছে আছে অথচ ধোঁয়ার কুণ্ডলীর ভেতর দিয়ে অসীমা সেদিকে তাকালেই বদলে যাচ্ছে নিমেষে নিমেষে! পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণ একবৃত্ত পূর্ণ হবার মধ্যেই স্মৃতির বহুরূপী রং এসে এখন ঘিরে ধরে অসীমাকে। এই শ্মশান যেন এখন ওর কাছে এক ফেলে আসা ইচ্ছাপুর! জীবনের যা কিছু ছেড়ে গেছে ওকে, ফেলে গেছে ওকে আরো বেশী একা করে, আসলে চলে তো যায়নি কিছুই! যেমন ওর যৌবনের প্রথম প্রেমিক! মাটিয়া বস্তির সে ক্ষেত মজুর, যে ওকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল অনেক, তারপর একদিন চোরাগলির মুখে ফেলে রেখে পালিয়ে গেছিল পাশের বাড়ির বৌদির সাথে। বাপ-মা মরা মেয়েটাকে স্রেফ ঘাড় থেকে নামাবে বলে, ওর মামা মামী জোর করে বিয়ে দিয়ে দিলো দোজবেরে এক বুড়োর সাথে! অসীমা তখন সবে ষোলো! সেই ওর প্রথম ঘর বাঁধা! কোলে প্রথম বাচ্চা এলো! ওর বড় মেয়ে! শুধু মেয়ে হয়েছে বলে সদ্য বাচ্চা বিয়ানো পেটে সজোরে শাশুড়ির লাথি খেতে হয়েছিল ওকে! এক কাপড়ে বাচ্চাকে নিয়ে বেরিয়ে আসতে হয়েছিল ও বাড়ি থেকে! নাঃ আর ফিরে যেতে পারেনি ও! শুরু হয়েছিল নীড় ভাঙা পাখির মতন নতুন স্বাধীন জীবন! কিন্তু স্বাধীনতা আর মুক্তি এই দুইয়ের মাঝে তো ফারাক আছে! এই বাঁদুড়িয়া শ্মশানে এখন যে চিতাটা জ্বলছে, যে লোকটা পুড়ছে তাতে, সে মানুষটা বদ তো ছিলই, খাটেও সমান নোংরা ছিল! ঐসব করার আগে অসীমার শরীরের আলফাল জায়গায় মুখ দিত! তবু ওকে ঘিরেই প্রতিদিন এক গল্প থেকে অন্য গল্পে ঘুরেছে অসীমা, একটা ঠিকঠাক পাকা পোক্ত ঘরের সন্ধানে! আজ কি ও একেবারে মুক্তি পেয়ে গেলো জীবনের যা কিছু তেঁতো, যা কিছু টক, পচে গিয়ে ফুলে ফেঁপে ওঠা, সেই সব কিছু থেকে? এখন কি আর ওকে আগের মতো করে ঘরের চিন্তা করা মানায়? ঘড়ির কাটা উল্টো দিকে একবার ঘোরা শুরু করলে, স্মৃতি হয়তো মানুষকে এভাবেই বিবশ করে! হাবিজাবি হাজারো ভাবনার ভিড়ে আচমকা নিজের জিভ কামড়ায় অসীমা! কাউন্সিলর ওকে বলেছিল, বাজারের রেন্ডিখানার মালকিন করে দেবে। সেখান থেকে যা ইনকাম হবে, এরপর থেকে সব ওর! কাউন্সিলরের প্রশ্রয়ে চোলাইয়ের কারবারটাও ছড়াতে পারবে ও! তাছাড়া সরকারের ঘরের এটা সেটা, এই যোজনা সেই যোজনা, এগুলো তো আছেই! সে তার জন্য ওকে যতই মাঝে মাঝে সবার চোখ এড়িয়ে রাতের অন্ধকারে পার্টি ওফিসে যেতে হোক না কেন! যতই মালিশ দেবার সময় আকণ্ঠ রতির নেশায় চুর হয়ে থাকা কাউন্সিলর, ওকে জাপ্টে পেঁচিয়ে ভোগ করুক না কেন! এই কাউন্সিলরই একদিন একথা সেকথায় ওকে জানিয়েছিল, সুদাম নাকি ওর দু-নম্বরি কারবার নিয়ে ওকে ব্ল্যাকমেল করছে! ততদিনে কাউন্সিলরের সাথে বেশ ভালো জমে গেছে অসীমার! তার ভাঁড়ার ঘরের ঠিকানা, চাবির গোছায় বেঁধে নিজের কোমরে ঠিক গিট্টি মেরে রেখে দিয়েছে ও, যোগ্য উপপত্নীর মতন! মেয়ের ব্যাপারটা জানার পর থেকেই ওর মাথায় আগুন জ্বলছিল যেন! সুদাম লোকটা যে এতটা নোংরা কোনোদিন ভাবতে পেরেছিল অসীমা? একদিন পার্টি অফিসে রাতের দিক করে একটা মেহফিল বসলো। সেখানে মাটিয়া থানার মেজবাবুকে ডেকে এনেছিল কাউন্সিলর, অসীমার স্পেশাল অনুরোধে। চাপ চাপ কামিনী তেলে চুল বেঁধে, চোখে একরাশ কুহকিনীর রাত জাগানিয়া আবেদন নিয়ে, সোজা মেজবাবুর কোলে গিয়ে বসে পড়েছিল অসীমা! কাউন্সিলর বলেছিল, ‘ওই সুদামডারে সরান লাগবো, বুঝছ ইনিস্পেক্টর! শালা চুতমারানি! বলে কিনা আমার গোপন কথা সব ফাঁস কইরা দিব! এত্ত ধক! কেষ্টনগরের যে রেপ কেসটা! ওই যে তোমরা বাকরা খুঁজতিছো! ওই কেসে ফাঁসায়ে মালডারে উড়ায়ে দাও না ক্যান! এক্কেরে মাল খালাস! পাবলিক তো এনকাউন্টার, এনকাউন্টার কইরা হাওয়া গরম কইরা ফেলাইসে এক্কেরে! তা পাবলিক ডিমান্ড মাইন্যা একটু ইন্টারটেনমেন্ট দিখায়ে দাও না ক্যান!’ ওর দোক্তা খাওয়া কালো দাঁতগুলো হঠাৎই চকচক করে উঠেছিল সেদিন, কথাগুলো বলার সময়! অসীমার ঠোঁটের কোণেও তখন মতলবী হাসি! চোখে আগুন রঙের মায়া কাজল! পেছন উঁচু করে গেলাসে মাল ঢালতে ঢালতে, মেজবাবুর দিকে তাকিয়ে সে শুধু বলেছিল, ‘খালাস কইরা দাও না বাবু! দিবা না?’ কথাগুলো বলতে বলতে মুখটা মেজবাবুর মুখের খুব কাছে নিয়ে গিয়ে, ফোঁস করে একটু গরম নিঃশ্বাস ছেড়েছিল শুধু! ব্যাস তাতেই কেল্লাফতে! কাল রাতে প্রায় তিনদিন পর কোথা থেকে যেন উস্কোখুস্কো হয়ে ঝুপড়িতে ফিরল সুদাম! অসীমাকে বলল, পুলিশ ওকে নাকি খুঁজছে! সুযোগটা আর হাতছাড়া করেনি অসীমা, সোজা গিয়ে খবরটা পৌঁছে দিল পার্টি অফিসে। তারপর মাঝরাতে পুলিশ গিয়ে, টেনে হিঁচড়ে তুলে নিয়ে গেল সুদামকে! থানায় নিয়ে যাবার পথে মাঝ রাস্তায় ভ্যান থেকে নামিয়ে হাতের হ্যান্ডকাপ খুলে, সারা শরীরে এঁকে দিল তিনটে নিখুঁত বুলেট মার্ক! পুলিশের ভাষায় যাকে বলে, ‘ক্লিন এনকাউন্টার!’
আজ দুপুরে কাউন্সিলর এসেছিল অসীমাদের ঝুপড়িতে। ওর পোয়াতি মেয়েটার স্থূল শরীরটাকে জরিপ করছিল আগা পাঁচতলা। এ দৃষ্টি অসীমার অনেক দিনের চেনা। পুরুষের লালা-বীর্য্যের নির্বোধ একটা আঁশটে গন্ধ পাওয়া যায় নারী লোলুপ এই ক্ষুধাময় দৃষ্টিতে! যাওয়ার সময় ঝুপড়ির পিছনের কলাবাগানে অসীমার খোলা পিঠে নখ দিয়ে আঁচড়াতে আঁচড়াতে, কানে কানে খুব আস্তে আস্তে বললো কাউন্সিলর, ‘মাইয়াডারে লইয়া রাতে অফিস ঘরে চইল্যা আয়। ও লোকজন, কানাকানি, ওসব আমি সামলাইয়া নিমু হনে! ও তরে ভাইবতি হইব না। আরে শন, তগো মা বেডিরে, আমি রাণী কইরা রাখুম, বুঝছস?’ মাটিয়ার স্বঘোষিত রাজা, কাউন্সিলরের কাঁটার মত লিঙ্গ তখন উপুড় হয়ে আরফার করছিল অসীমার নিখাদ কালো যোনি গহ্বর, দ্বিধাহীন ভাবে! সন্ধ্যের নেমে আসা মেঘলা অন্ধকারে ওর দাঁতগুলো আবার চকচক করে উঠলো যেন!
আজ রাতে অসীমা সত্যিই পার্টি অফিসে যাবে! একাই যাবে! চারপাশের লোকজন তখন ঘুমিয়ে পড়েছে, কলোনির পাশের পাট ক্ষেতে তখন ক্রমশ পুরু হচ্ছে, প্রাগৈতিহাসিক এক রাত! ইছামতীর ধারের ভাঁটফুলের জঙ্গলে ক্ষুধার্ত কোন সাঁপ, মাছ শিকার করেছে, রাতজাগা ধূর্ত কোন লক্ষ্মীপেঁচার চোখ আড়াল করে! পার্টি অফিসে পৌঁছে পেছনের দরজা খুলে ঢুকে আসবে সে। কাউন্সিলর মেয়ের কথা জিজ্ঞেস করলে, যা হোক কিছু একটা বলে দেবে বানিয়ে বানিয়ে। শাড়ির আড়ালে করে আনা চোলাইয়ের বোতল দুটো আস্তে করে রাখবে টেবিলের ওপর। কাউন্সিলর দরজা খুলে বাইরে মুততে গেলে, ব্লাউজের ভাঁজে লুকিয়ে রাখা ওষুধগুলো বার করবে অসীমা। গুঁড়ো গুঁড়ো সাদা রঙের দুটো পুরিয়া! 'ছেকচের ওষুধ’! বাজারের রেন্ডিখানার মেয়েরা ব্যবহার করে। পানপর্ব মিটলে কাউন্সিলরকে আছড়ে নিয়ে গিয়ে ফেলবে সে বিছানায়। সযত্ন লেহনে পুরুষের মুষল উত্থিত হলে, তার পিচ্ছিল ডগায় সদর্পে চড়ে বসবে নিজের ভারী শরীরটা নিয়ে। রমণ তার গতি বাড়াবে! পুরুষের শরীরের সব রক্ত গিয়ে জমা হবে তার মাথায়! যেন উচ্চ রক্তচাপের মাথায় উঠে ছদ্মবেশ ধরেছে নির্জিত কোন চাঁদ! তারপর ঘাড়ের শিরা ছিঁড়ে গিয়ে গলগল করে রক্ত বেরিয়ে আসবে নাক দিয়ে। ব্যাস! খতম! এই রহস্যের পৃথিবীতে যতক্ষণ নিঃশ্বাস ততক্ষণ অপেক্ষা! ততক্ষণ উল্লাস!
লাইন দেওয়া দরমার ঘরগুলোর মাঝে এই একমাত্র ইঁট, পাথর, সিমেন্টের তৈরী ঘরে দুটো বুভুক্ষু শরীর এখন উদ্দাম সঙ্গমে রত! নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা বোধহয় শুধু সময়ের অপেক্ষা! পুরুষটির শিরার ভিতর দিয়ে বয়ে যায় অসহায় কামনার বীজ! বুঝি তার হৃৎপিণ্ডের ভিতর অবাধ রক্তপাত আসন্ন! এক আশ্চর্য্য ছোয়াচে মৃত্যুর টানে সে বুঝি এখন ধরা দিয়েছে এই মহিলা শিকারির ফাঁদে! হঠাৎ বিকট একটা গুলির আওয়াজ ভেসে এল! গুলিটা ছুটে এসেছে বিবর্ণ সেই রাতের জঠর চিরে, যে রাতে উলঙ্গ চাঁদের এজলাসে ঝাঁঝরা হয়ে গেছিল সুদামের শরীর! তাজা রক্তে ভিজে গেছিল ওর বুক-পেট-পা! আবার একটা বিকট ফায়ারিং সাউন্ড! এই নিয়ে পরপর তিনবার! রাষ্ট্রের মদতে খাদ্যের সাথে খাদকের, শতাব্দীর প্রিয়তম এনকাউন্টার চলছে এখন!
এনকাউন্টার
▮ শাশ্বত বোস
▮ শাশ্বত বোস
![এনকাউন্টার [ছোটোগল্প] • শাশ্বত বোস এনকাউন্টার [ছোটোগল্প] • শাশ্বত বোস](https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEgYsLsVEVx3xMg_C8QK8iLXPmSCLDUWzAs8MuBRf4UL2AvLChsIrS4jMb6izIAay3CIx6cua_FtuqEumqpt9XSrTsfVGuTvvNKqkRNysh0h7wSemkDKOt81sOsw4_T5HXu96zzIPsHZ9wKcJ2-wopSaOScfs7QNV9w988-ACCMFqFWzQh5X7P-Qh9WSJz0/s1600-rw/%E0%A6%8F%E0%A6%A8%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%89%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%9F%E0%A6%BE%E0%A6%B0%20%5B%E0%A6%9B%E0%A7%8B%E0%A6%9F%E0%A7%8B%E0%A6%97%E0%A6%B2%E0%A7%8D%E0%A6%AA%5D%20%E2%80%A2%20bindu%E2%80%A2%20%E0%A6%B6%E0%A6%BE%E0%A6%B6%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%A4%20%E0%A6%AC%E0%A7%8B%E0%A6%B8%20%E2%80%A2%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%81.png)



মন্তব্য