মৌসুমী ভৌমিকের জন্ম ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। পৈত্রিক বাড়ি ছিল পাবনা জেলায়, মামার বাড়ি বরিশালে। ভারতভাগের আগেই মৌসুমীর বাবা চাকরি সূত্রে জলপাইগুড়িতে থাকতেন। বড় হলে সংগীত-বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠেন মৌসুমী। তিনি ‘বাঙলার লোকগান’-এর উপর গবেষণা করতে বাঙলাদেশে বহুবার যান।
সেই সময় পরিচয় হয় বাঙলাদেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে। অ্যালেন গিন্সবার্গ-এর ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতাটি বাঙলাদেশের প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘মুক্তির কথা’-য় ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। সেই উদ্দেশ্যে কবিতাটির বঙ্গানুবাদ করেন খান মোহাম্মদ ফারাবী। কিন্তু হুবহু অনুবাদ গানে সুর দিতে গিয়ে সমস্যায় পড়েন তারেক। তখন কবিতাটির ভাবানুবাদ করা ও সুর দেওয়ার দায়িত্ব পান মৌসুমী ভৌমিক। তিনিই অসাধারণ ভাবানুবাদ করেন। সেই কথায় সুর দেন ও কণ্ঠও দেন। ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৯৯ সালে। পরে ‘মুক্তির গান’ ছবিতেও তারেক মাসুদ গানটি ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন।
সেজন্যে প্রয়োজনীয় অনুমতিও সংগ্রহ করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা না করে বঙ্গবন্ধু মুজিবুর রহমানের ভাষণ সংযুক্ত করেন।
‘যশোর রোড’ গানটির জন্যে মৌসুমী আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করেন। আর তাঁর নাম জড়িয়ে যায় ঐতিহাসিক যশোর রোডের সঙ্গেও।
অ্যালেন গিন্সবার্গের ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতাটির পেছনে রয়েছে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ভারতে আশ্রয় নেওয়া বিপুলসংখ্যক শরণার্থীর মানবেতর জীবনযাপনের ইতিহাস। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে গিন্সবার্গ ভারতে আসেন এবং সীমান্তবর্তী শরণার্থী শিবিরগুলোতে মানুষের দুর্দশা প্রত্যক্ষ করেন। সেই অভিজ্ঞতা তাঁর কবিতায় গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়। তাঁর সঙ্গে ছিলেন কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং সাংবাদিক ও লেখক গীতা মেহতা। কলকাতা ও যশোর রোডের আশপাশ দিয়ে ভারতে প্রবেশ করা শরণার্থীদের দুর্দশা, ক্ষুধা, রোগ, মৃত্যু এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের অসহায়ত্ব তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রায় এক কোটি মানুষ ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাঁদের জন্য বিভিন্ন স্থানে শরণার্থী শিবির গড়ে উঠেছিল। সেই শিবিরগুলোর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, খাদ্য ও চিকিৎসার সংকট এবং সর্বস্ব হারানো মানুষের দুর্দশা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও উঠে আসে। গিন্সবার্গের কবিতাটি সেই বৃহত্তর মানবিক বিপর্যয়ের একটি শক্তিশালী কাব্যিক দলিল হয়ে ওঠে।
কবিতাটি ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরে রচিত হয় এবং একই বছরের নভেম্বরে ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এ প্রকাশিত হয়। ২০ নভেম্বর ১৯৭১ ‘বাংলাদেশের জন্য মার্কিনীরা’ শীর্ষক একটি অনুষ্ঠানে গিন্সবার্গ কবিতাটি পাঠ করেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আন্তর্জাতিক সংহতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সে সময় কবিতা, গান, চলচ্চিত্র এবং সাংস্কৃতিক আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
‘যশোর রোড’ নামটির সঙ্গেও রয়েছে দীর্ঘ এক ইতিহাস। কলকাতার শ্যামবাজার থেকে বারাসাত, বনগাঁ, পেট্রাপোল, বেনাপোল হয়ে যশোর পর্যন্ত বিস্তৃত এই সড়কটি উনিশ শতকে নির্মিত হয়। প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, জমিদার কালী পোদ্দার তাঁর মায়ের কালীঘাটে তীর্থযাত্রার কষ্ট লাঘবের উদ্দেশ্যে এই রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। রাস্তার দুই পাশে গাছ লাগানো হয়েছিল, যাতে পথিকেরা ছায়ায় বিশ্রাম নিতে পারেন। সেই রাস্তার বহু পুরোনো গাছ পরবর্তী সময়ে ১৯৭১ সালে যুদ্ধের আগুন থেকে পালিয়ে যাওয়া শরণার্থীদের পথের সঙ্গী হয়ে ওঠে। ইতিহাসের এই অদ্ভুত পরিণতিই যশোর রোডকে একটি সড়কের পরিচয়ের বাইরে নিয়ে যায়।
একদিকে উনিশ শতকের এক তীর্থযাত্রার পথ, অন্যদিকে এক শতাব্দী পর লক্ষ লক্ষ বাস্তুচ্যুত মানুষের বেঁচে থাকার পথ। আর সেই পথেই অ্যালেন গিন্সবার্গ দেখেছিলেন ইতিহাসের এক ভয়াবহ মানবিক অধ্যায়। তাঁর কবিতায় যশোর রোড হয়ে ওঠে যুদ্ধ, নির্বাসন, ক্ষুধা, মৃত্যু এবং মানুষের বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।
মৌসুমী ভৌমিকের ভাবানুবাদ সেই কবিতাকে বাঙলা ভাষাভাষী শ্রোতার কাছে নতুনভাবে পৌঁছে দেয়। অ্যালেন গিন্সবার্গের কবিতার রাজনৈতিক ও মানবিক অভিঘাত তাঁর কণ্ঠে এবং সুরে অন্য এক মাত্রা পায়।
অনুবাদটি রমা মণ্ডল সম্পাদিত ‘দিল্লী এক্সপ্রেস’ (মে, ১৯১৭) পত্রিকা থেকে পুনঃপ্রকাশ করা হলো।
–সম্পাদক
যশোর রোড
মূল: অ্যালেন গিন্সবার্গ
ভাবানুবাদ: মৌসুমী ভৌমিক
শত শত চোখ আকাশটা দেখে
শত শত শত মানুষের দল
যশোর রোডের দু-ধারে বসত
বাঁশের ছাউনি কাদা মাটি জল
কাদামাটি মাখা মানুষের দল
গাদগাদি হয়ে আকাশটা দেখে
আকাশে বসত মরা ঈশ্বর
নালিশ জানাবে ওরা বলো কাকে?
ঘরহীন ওরা ঘুমহীন চোখে
যুদ্ধে ছিন্ন ঘর-বাড়ি-দেশ
মাথার ভিতর বোমারু বিমান
এই কালো রাত কবে হবে শেষ।
শত শত মুখ হয়ে একাত্তর
যশোর রোড যে কত কথা বলে
এত মরা মুখ আধমরা পায়ে
পূর্ব বাংলা কোলকাতা চলে।
সময় চলেছে রাজপথ ধরে
যশোর রোডেতে মানুষ মিছিল
সেপ্টেম্বর হায় একাত্তর
গরুগাড়ি কাদা রাস্তা পিচ্ছিল।
লক্ষ মানুষ ভাত চেয়ে মরে
লক্ষ মানুষ শোকে ভেসে যায়
ঘরহীন ভাসে শত শত লোক
লক্ষ জননী পাগলের প্রায়।
রিফিউজি ঘরে খিদে পাওয়া শিশু
পেটগুলো সব ফুলে ফেঁপে উঠে
এইটুকু শিশু, এতবড় চোখ
দিশেহারা মা কার কাছে ছোটে।
সেপ্টেম্বর হায় একাত্তর
এত এত শুধু মানুষের মুখ
যুদ্ধ মৃত্যু তবুও স্বপ্ন
ফসলের মাঠ ফেলে আসা সুখ।
কার কাছে বলি ভাত রুটি কথা
কাকে বলি কর কর কর ত্রাণ
কাকে বলি ওগো মৃত্যু থামাও
মরে যাওয়া বুকে এনে দাও প্রাণ।
কাঁদ কাঁদ তুমি মানুষের দল
তোমার শরীর ক্ষত দিয়ে ঢাকা
জননীর কোলে আধপেটা শিশু
এ কেমন বাঁচা? বেঁচে মরে থাকা
ছোটো ছোটো তুমি মানুষের দল
তোমার ঘরেও মৃত্যুছায়া
গুলিতে ছিন্নদেহে মন মাটি
ঘর ছেড়ে ছোট, মাটি মিছে মায়া
সেপ্টেম্বর হয় একাত্তর
ঘর ভেঙে গেছে যুদ্ধের ঝড়ে
যশোর রোডে লোক দু’ধারে মানুষ
এত এত লোক শুধু কেন মরে।।
শত শত চোখ আকাশটা দেখে
শত শত শত শিশু মরে গেল
যশোর রোডের যুদ্ধক্ষেত্রে
ছেঁড়া সংসার সব এলোমেলো।
কাদামাটি মাখা মানুষের দল
গাদাগাদি হয়ে আকাশটা দেখে
আকাশে বসত মরা ঈশ্বর
নালিশ জানাবে ওরা বলো কাকে
শত শত মুখ হায় একাত্তর
যশোর রোড যে কত কথা বলে
এত মরা মুখ আধমরা পায়ে
পূর্ব বাংলা কোলকাতা চলে।।
যশোর রোড
▮ মূল: অ্যালেন গিন্সবার্গ
▮ ভাবানুবাদ: মৌসুমী ভৌমিক
▮ মূল: অ্যালেন গিন্সবার্গ
▮ ভাবানুবাদ: মৌসুমী ভৌমিক




মন্তব্য