তোমার শহর শরীরে
১
অনেক দিন পর আমাদের দেখা হলো বৈকুণ্ঠের শীতে তোমার হাতে আদিম গোলাপ ছিটানো জলতরঙ্গ, নিবিড় যত্নে বনপাংশুল শরীর ঘষে-মেজে রেখেছ, ঠিক আবার পুরোনো ধাঁচের রাঙা বিপন্ন ঠোঁটের দিকভ্রান্ত রেখা। দেখা হলো শহরের বহুতল-লাগোয়া ঝাপসা দিবালোকে, চৌকোনা ধারাল ব্লেডের মতো রোডম্যাপ এখন মুঠোয় রক্ত আনে, বদলে গেছে সম্পূর্ণ তোমার মতো নবোঢ়া-সাজের অসন্দিগ্ধচিত্ত শহর।
২
যেখানে বসেছি আগে, আমাদের প্রিয়তম সাধের আসন, সেখানে ছয় লেনের সড়ক, পাশে ফুটপাতে সারিবদ্ধ বিপণন, বিভিন্ন প্রযোজিত সংস্থা ও রুফটপে নরক। দেখা হলো সত্যি—তবু, না হলেও এই শহর, এই পান্থপথ ডুবে যেত নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের শব্দত্তোর জনপদের ভেতর, যেখানে পাখি ছিল নিশ্চিন্ত, বিলের নির্মলতা ও সবুজ ঘাস; সেখানে অট্টালিকার পর বীভৎস দো পেয়ে সন্ত্রাস, সব মিলিত অর্থে খেয়ে নিয়েছে আমাদের চোখ ও মগজ।
৩
অহিচ্ছত্রক গজিয়ে উঠেছে চতুর্দিক সৌষ্ঠব দেহাবরণে; নতমুখে গুচ্ছবদ্ধ ফুল ও পত্রমোচী অম্রাত বৃক্ষদেবী-
অভ্রংলিহ কংক্রিট দালান এবং লোহালক্করে মৃতপ্রায় পথের আলাপন, জ্বলজ্বলে তারাবাতির আলোকে তোমাকে দেখার ছুতোয় শুকনো অর্বুদ পাহাড় দেখি শরীরে, দুর্বিনীত প্রবহমান গন্ধবহে—অলকমেঘ থেকে ঝরে সংযতশীল অরুণিত অশ্রুপ্লাবন।
৪
দেখা হলো তবুও, অযোগবাহ বর্ণের স্বরবিচ্ছেদের সময়, দীর্ঘকালীন অরুন্তুদ উত্তরপদ নক্ষত্রপুঞ্জের গতিপথে, শৈত্য-বরফজমা ভাসমান অর্ণবতরির অলিন্দ-ব্র্যাকেটে, অনেক দিন পর, গত শতাব্দীর বা তার চেয়েও অতীত—হয়তো!
ছিল হাত-পা-মুখ, অস্খলিত সর্বাঙ্গ গোচরে এতটুকু প্রেম। এই শহরেই, এই রকম শীতের বুকে, কুয়াশায় আঙুলে চেপে মরে গেছি রোজ। এখন এই শহর, তুমি যেন পাশাপাশি হাঁটো, অভিন্ন রুক্ষ কপালে—তবুও তো দেখা হলো আজ!
আকাশের হাতে চাঁদ অথবা সমুদ্র
আকাশের একদিন হাত-পা গজাল অকস্মাৎ—
হেঁটে এসে চাঁদ দিয়ে গেল মাটির বুকের কাছে
হলুদ বাতির মতো বৈদ্যুতিক ঝলক দেখি
উলঙ্গ চোখে আমার জ্যোৎস্নাবিধৌত স্নানাগার
সেই হীরককণা জলে শিউলির বাড়িঘর-সমাজ
মৃতগামী বামন নক্ষত্র সমাপনে ভূমিতলে জন্মে
কূলবতী স্রোতধারা, বাড়তি আরও একটা দুপুর।
নাভি বেয়ে বেয়ে গঙ্গাফড়িং উঠে আসে স্তনে
এত করুণ আপন হতে দু-ফোঁটা কষ মুখে আনে—
মধুর মতো অমৃত সুখ এবং সুখের গোছানো শব্দ।
বাতাসের নুলো অঙ্গে জড়ায় নির্বোধ কামিন শ্রেণী
দীর্ঘকায় ঘাসের মায়াভরা মুখ আকাশের গৃহছবি
সময়েরও কাঁথা মুড়িয়ে জ্বর আসে পারদস্তম্ভে
খরগোশ ও কচ্ছপের মিলন দৌড়কালে বিস্ময় আরও
অমাবস্যার ছুটির সন্ধিক্ষণে উখড়ানো মূলরোম জালে
ঘন শ্বাসে উদ্বেগ বাড়ে বাস্তুহারা পাখির এবং শেয়ালের।
বীতশোক আবার বাঁচবে কোনো নিরবচ্ছিন্ন অন্ধকারে
এই চাঁদ আমাদের একান্ত অনুভবের, আকাশেরও—
মাটির উরগদেহ সমুদ্র খোঁজে, যে জানে নোঙর; আকাশগঙ্গায় ভেসে আছে চাঁদ অথবা সমুদ্রজাহাজ!
হাত
এমন করেই শীর্ণ হাত দুটি তাকিয়ে থাকবে চারদিক— মূর্ছিত ফুল বীজ হয়ে জন্মায় আবার তুলতুলে শিশু, সরু গলিটার পরিচয়ে বিস্তৃতভাবে মহাসড়কের স্বীকৃত সন্তান। রিকশা, ভ্যানগাড়ি, যানবাহন সকলেই আজ আকাশচারী। ক্লান্ত অফিসের, প্রেমের বোতাম টিপে টিপে এখন আঙুলের ডগায়, মহাবিশ্বের ঔরসে, কলমের নিবে ফোঁড়া ওঠে টনটনে ব্যথায়। হাত গোটালে পকেট হতে মাংসের গন্ধ আসে— পেঁয়াজ ফুলের আঁটির মতো নরম মাংস। সে রাষ্ট্রের দিকে ধাবিত হয় আহত চোখে মুখাপেক্ষায়, কয়েকটি প্রেমের আবেদন ঘুরে ফিরে দপ্তর থেকে দপ্তরে, অগণিত সিঁড়ি বেয়ে, অতঃপর অবসরের বেতন চেটে চেটে লাল জিহ্বা ক্ষয়ে যায়, ফরমায়েশি নাগরিক বেঁচে থাকে আধমরা সংকীর্ণ জীবন। কিন্তু কতদিন বাঁচিয়ে রাখবে প্রেম, রাষ্ট্র, লাস্যময়ী অন্ধকার! নির্বাক চোখে কোন গ্লানিমুখ ভাসে, তার কাছে আসে হাহাকারের নির্লজ্জ সহানুভূতি ও খণ্ডিত অভিমান। তাই হাত-কাটা জামা পরে বোঝাতে চায় সংক্ষুব্ধ গলগ্রহ হাত— আমার আসলে হাত নেই, চোখে গজায় শুধু নিরক্ষর বকের ঠ্যাং।




মন্তব্য