মানুষের অপরাধপ্রবণতা যতই জটিল হোক না কেন, তা কখনোই সম্পূর্ণ এলোমেলো নয়—ড. আরিশা আহমেদের এই বিশ্বাস কোনো দার্শনিক মতবাদ নয়; এটি তার দীর্ঘ গবেষণা জীবনের সারাংশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যান নিয়ে পড়াশোনা শেষ করে কেমব্রিজে ফরেনসিক ডেটা সায়েন্সে পিএইচডি করে দেশে ফিরে যোগ দিয়েছেন সিআইডির বিশেষ বিশ্লেষণ শাখায়। অফিশিয়াল পদবি চিফ ফরেনসিক ডেটা অ্যানালিস্ট হলেও পুরো বিভাগ তাকে ডাকে "স্ট্যাটিসটিশিয়ান" বলে।
যখন সিসিটিভি থাকে না, ডিএনএ মেলে না, আঙুলের ছাপ মুছে ফেলা হয় এবং সাক্ষী মুখ খুলতে চায় না—তখন তদন্তকারীরা নিশ্চিত গলায় বলেন, "আরিশাকে ডাকুন।" কারণ আরিশা বিশ্বাস করেন, প্রতিটি অপরাধের আগে মানুষ সিদ্ধান্ত নেয়, আর প্রতিটি সিদ্ধান্ত ডেটায় কোনো না কোনো ছাপ রেখে যায়।
তারিখটা ছিল জুলাই মাসের এগার, শনিবার ভোর সাড়ে পাঁচটা। ড. আরিশা ও ইন্সপেক্টর সাজ্জাদ রমনা লেকের পাড়ে একটা খুনের ক্রাইম স্পট তদন্তে এসেছেন। চারপাশের কুয়াশা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। লেকের ধারে উপুড় হয়ে পড়ে আছেন দেশের সুপরিচিত রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী খন্দকার ফয়সাল। তার বুকের মাঝখানে গেঁথে আছে একটি সরু কার্বন-ফাইবারের বোল্ট—যা মূলত আধুনিক ক্রসবো থেকে ছোড়া হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আশপাশে কোনো ধস্তাধস্তির চিহ্ন কিংবা পায়ের ছাপ নেই। কোনো আঙুলের ছাপও পাওয়া যায়নি। সেখানে অন্য কারও উপস্থিতির স্পষ্ট কোনো প্রমাণ নেই, শুধু এক নিস্তব্ধতা চারপাশকে ঘিরে রেখেছে।
ইন্সপেক্টর সাজ্জাদ বিরক্ত মুখে হাতের গ্লাভস খুলে ফেললেন। "এই নিয়ে এটা তৃতীয় খুন, ম্যাডাম। তিন মাসে তিনজন। একই ধরনের অস্ত্র, একই ধরনের এক্সিকিউশন। আর আমরা এখনো জানিই না লোকটা কে! আমরা কি একজন সিরিয়াল কিলারকে ফেস করছি?"
আরিশা লাশের দিকে খুব বেশি সময় তাকালেন না। বরং চারপাশটা খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলেন: পানির কিংবা স্রোতের গতির দিক, গাছের অবস্থান, বাতাসের গতি এবং দূরের আলো। তারপর নিজের ট্যাবলেটটি খুললেন। স্ক্রিনে তিনটি লাল বিন্দু জ্বলছে—ধানমন্ডি লেক, গুলশান লেক এবং রমনা লেক।
সাজ্জাদ জিজ্ঞেস করলেন, "আপনি কী দেখছেন, ম্যাডাম?"
আরিশা শান্ত গলায় উত্তর দিলেন, "এই মুহূর্তে নিশ্চিত কিছুই না। শুধু তিনটা ঘটনা। আর এত অল্প ঘটনা দিয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো মুশকিল হলেও অসম্ভব নয়।"
সাজ্জাদ কিছুটা অবাক হয়ে বললেন, "মানে?"
"মানে n = 3। পরিসংখ্যানের ভাষায় এত কম পর্যবেক্ষণ দিয়ে কোনো গাণিতিক মডেলকে পুরোপুরি বিশ্বাস করা বিপজ্জনক। আমরা এখনো শুধু প্রাথমিক হাইপোথিসিস তৈরি করতে পারি।"
আরিশা হাতের ট্যাবলেটে তিনটি খুনের একটি সংক্ষিপ্ত টাইমলাইন খুললেন:
খুন ১: ১০ মে; রাত ২:১৫; ধানমন্ডি লেক।
খুন ২: ১১ জুন; রাত ২:২০; গুলশান লেক।
খুন ৩: ১১ জুলাই; রাত ২:১৮; রমনা লেক।
সাজ্জাদ দেখে বললেন, "তিনটাতেই তো প্রায় এক মাসের ব্যবধান দেখা যাচ্ছে।"
"হ্যাঁ। কিন্তু এটাকে পঁয়সো প্রসেসে (Poisson Process) ফেলা যাবে না।"
"কেন ফেলা যাবে না, ম্যাডাম?" সাজ্জাদ কৌতূহলী হলেন।
আরিশা মৃদু হাসলেন। "কারণ Poisson Process ধরে নেয় ঘটনাগুলো সম্পূর্ণ এলোমেলোভাবে ঘটবে, শুধু তাদের গড় হার মোটামুটি স্থির থাকবে। সেখানে দুটি ঘটনার মধ্যকার ব্যবধান সাধারণত এক্সপোনেনশিয়াল ডিস্ট্রিবিউশন (Exponential Distribution) অনুসরণ করে। কিন্তু এখানে যা দেখছি, তা অস্বাভাবিক রকম নিয়মিত। সময়ের এত কম ভ্যারিয়েশন বা বিচ্যুতি কোনোভাবেই পঁয়সো প্রসেসের সঙ্গে খাপ খায় না।"
সাজ্জাদ কিছুক্ষণ চুপ রইলেন। তারপর বললেন, "তাহলে এর পেছনে কী কারণ থাকতে পারে?"
"এখানে আসলে প্রধান দুটি সম্ভাবনা আছে। এক—খুনি ইচ্ছাকৃতভাবে নির্দিষ্ট সময়সূচি মেনে চলছে। দুই—আমরা এমন একটি লুকানো ভ্যারিয়েবল দেখছি, যা এখনো আমরা চিহ্নিত করতে পারিনি।"
এখন বাজে দুপুর ২টা। মিন্টো রোডের সিআইডি সদর দপ্তরের ফরেনসিক অ্যানালিটিক্স ল্যাবে বসে দেয়ালজুড়ে বিশাল ডিজিটাল ম্যাপের দিকে তাকিয়ে বিভিন্ন ডেটা পয়েন্ট অবজারভ করছেন ড. আরিশা ও সাজ্জাদ। ম্যাপে তাদের চেকলিস্টে আছে ঢাকার প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি লেক, প্রতিটি বড় পার্ক এবং প্রতিটি মোবাইল টাওয়ারের অবস্থান।
আরিশা তিনটি ক্রাইম সিন একটি GIS (Geographic Information System) সফটওয়্যারে বসালেন। তারপর ধীরে ধীরে তাতে নতুন লেয়ার যোগ করতে লাগলেন: রাস্তার নেটওয়ার্ক, জলাশয়, সিসিটিভি কভারেজ, জনঘনত্ব, মোবাইল নেটওয়ার্ক এবং রাত দুইটার সময় ট্রাফিক লাইটের তীব্রতা।
সাজ্জাদ কিছুটা সন্দিহান হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "তদন্তে এত কিছু লাগবে?"
"অপরাধ কখনো একক কারণে ঘটে না, সাজ্জাদ সাহেব। প্রতিটি ক্রাইম হচ্ছে বহু ভ্যারিয়েবলের যৌথ ফল।"
কম্পিউটারে প্রথম Spatial Density Map তৈরি হলো। আরিশা ম্যাপের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লেন। "না, এখনো স্পষ্ট কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।"
তারপর তিনি তিনজন ভিকটিমের ব্যক্তিগত ও পেশাগত তথ্যগুলো পরপর সাজালেন হিসাব মিলানোর জন্য: তাদের ব্যবসা, পরিবার, ব্যাংক লেনদেন, বিদেশ সফর, পুরোনো মামলা, মোবাইল কল রেকর্ড এবং কোম্পানির শেয়ার থেকে শুরু করে সব কিছু। এর মধ্যে সাজ্জাদ ব্ল্যাক কফি বানালেন কয়েকবার। দুইজনে মিলে কফি পান করতে করতে কিংবা ল্যাবের ভেতরে পায়চারি করতে করতে কম্পিউটারের স্ক্রিন মনিটর করতে থাকলেন। কম্পিউটারের প্রোগ্রামটি তার নিজস্ব গতিতে ক্যালকুলেশন ও অ্যানালিসিস ক্রমাগত করে যাচ্ছে।
আরিশার চোখ হঠাৎ একটা নির্দিষ্ট ডেটা পয়েন্টে গিয়ে আটকে গেল। এক প্রকার স্বতঃস্ফূর্তভাবেই তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসলো—"ইন্টারেস্টিং..."
সাজ্জাদ দ্রুত এগিয়ে এলেন। "কী পেলেন, ম্যাডাম?"
"মৃত তিনজন ব্যক্তি সরাসরি একই কোম্পানির পরিচালক ছিলেন না। কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে একই ছয়টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদের গভীর আর্থিক সম্পর্ক ছিল।"
"তার মানে?"
"নেটওয়ার্ক ওভারল্যাপ।" আরিশা স্ক্রিনে একটি গ্রাফ আঁকলেন যেখানে মানুষগুলো হলো একেকটি নোড (Node) এবং তাদের মধ্যকার লেনদেনগুলো হলো এজ (Edge)।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে স্ক্রিনে বিন্দু আর রেখার একটি জটিল নেটওয়ার্ক ফুটে উঠল। তারপর তিনি একটি বিশেষ অ্যালগরিদম চালালেন: কমিউনিটি ডিটেকশন। মুহূর্তে কয়েকটি ক্লাস্টার বা দল আলাদা হয়ে গেল। দেখা গেল, তিনজন ভিকটিমই হুবহু একই ক্লাস্টারের সক্রিয় সদস্য। "এটাই আমাদের প্রথম শক্তিশালী ক্লু।"
সাজ্জাদ উৎসাহিত হয়ে বললেন, "তাহলে খুনি কি তাদের কোনো ব্যবসায়িক শত্রু?"
"হতে পারে, আবার নাও হতে পারে। মনে রাখবেন সাজ্জাদ সাহেব, কোরিলেশন মানেই কজেশন না। দুটি ঘটনার মধ্যে সম্পর্ক থাকলেই যে একটি অন্যটির কারণ, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না," জবাব দিলেন আরিশা।
এখন বাজে সন্ধ্যা সাতটা। জানালার ওপারে গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে সন্ধ্যার আগুনরাঙা আকাশের রূপ দেখছিলেন আরিশা। এক হাতে কফির মগ আর অন্য হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। ঢাউস স্ক্রিনে ঢাকার মানচিত্র খেলা করছে; মানচিত্রে তিনটি লাল বিন্দু ফিউজ বাল্বের মতো একবার জ্বলছে আর একবার নিভছে। হঠাৎ তিনি আরেকটি নতুন সফটওয়্যার খুললেন, এটার নাম কারনেল ডেনসিটি এস্টিমেশন (Kernel Density Estimation) সফটওয়্যার।
সাজ্জাদ ভ্রু কুঁচকে বললেন, "এটা আবার কী জিনিস?"
"ক্রাইম হটস্পট অ্যানালিসিসের জন্য এটা ব্যবহার করা হয়। যদি ধরে নিই যে অপরাধী সম্পূর্ণ এলোমেলোভাবে চলাফেরা করে না, তাহলে অপরাধের দৃশ্যগুলোর ঘনত্ব থেকে তার সম্ভাব্য কার্যপরিসর কিংবা অপরাধের কেন্দ্রস্থল অনুমান করা যায়।" আরিশা বুঝিয়ে বললেন।
"তার মানে কি লোকটার বাড়ির ঠিকানা জানা যাবে?"
"না, ঠিক বাড়ির ঠিকানা নয়, আবার সরাসরি এক্সাক্ট লোকেশনও নয়। শুধু একটি সম্ভাব্য অপারেশনাল অঞ্চল বা সেফ জোনের আইডিয়া পাওয়া যায়।"
সফটওয়্যারে মডেলটি অটো চলতে লাগল। কয়েক সেকেন্ড পর স্ক্রিনে হলুদ থেকে লাল রঙের একটি ঘন কেন্দ্রস্থল বা অঞ্চল তৈরি হলো। আরিশা কিছুক্ষণ চুপচাপ সেদিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, "এটা অদ্ভুত..."
"কী অদ্ভুত, ম্যাডাম?"
"এই আউটপুটটি জিওগ্রাফিক প্রোফাইলিং-এর চেনা নিয়মের সঙ্গে পুরোপুরি মিলছে না।"
"তার মানে?"
"বিখ্যাত রোসমো মডেল (Rossmo's Model) অনুযায়ী, খুনি সাধারণত নিজের বাড়ির খুব কাছাকাছি অপরাধ করে না। সে নিজের নিরাপত্তার জন্য একটি নির্দিষ্ট বাফার জোন (Buffer Zone) রেখে কাজ করে। কিন্তু আমাদের এই তিনটি ক্রাইম সিন সেই প্রত্যাশিত প্যাটার্ন দেখাচ্ছে না।"
সাজ্জাদ দমে গিয়ে বললেন, "তাহলে কি আমাদের ব্যবহৃত মডেলটি ভুল?"
আরিশা মাথা নাড়লেন। "মডেল খুব কমই ভুল হয়, সাজ্জাদ সাহেব। আসলে আমাদের প্রাথমিক অনুমান ভুল হয়। অথবা..." তিনি একটু থামলেন। "...কেউ ইচ্ছা করেই আমাদের একটি ভুল মডেল বেছে নিতে বাধ্য করছে।"
ল্যাবে হঠাৎ এক ভারী নীরবতা নেমে এল। সাজ্জাদ প্রথমবারের মতো মেরুদণ্ডে একটি ঠান্ডা স্রোত অনুভব করলেন—তারা হয়তো শুধু একজন সাধারণ সিরিয়াল কিলারের পিছু নেননি। তারা এমন একজন ধূর্ত মানুষের পিছু নিয়েছেন, যে খুব ভালো করে জানে তদন্তকারীরা ঠিক কীভাবে চিন্তা করে। আর সেই প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান দিয়েই সে পুলিশকে ভুল পথে হাঁটাতে চাইছে।
আরিশা ধীরে ধীরে ট্যাবেলেটের স্ক্রিন লক করলেন। তবে তার চোখে ভয়ের কোনো ছাপ ছিল না, বরং সেখানে চকচক করছিল এক তীব্র কৌতূহল। তিনি ফিসফিস করে বললেন, "যদি খুনি সত্যিই পরিসংখ্যান বোঝে... তবে সে কোনো অসতর্ক প্যাটার্ন রেখে যায়নি। সে নিখুঁত পরিকল্পনায় এই প্যাটার্নটি তৈরি করেছে।"
সিআইডি সদর দপ্তরের ফরেনসিক অ্যানালিটিক্স ল্যাবে রাত তখন সাড়ে দশটা। ঢাকার আকাশে হালকা বৃষ্টি শুরু হয়েছে, কাঁচের দেয়ালে টুপটাপ শব্দে জলকণা আছড়ে পড়ছে। ল্যাবের ভেতরে আলো জ্বলছে শুধু তিনটি বড় মনিটরে। একটিতে ঢাকার জিআইএস মানচিত্র, একটিতে অপরাধস্থলের নিখুঁত টাইমলাইন, আর শেষটিতে মানুষের সম্পর্কের বদলে বিন্দু আর রেখায় গড়ে ওঠা একটি জটিল নেটওয়ার্ক।
আরিশা এক কাপ ঠান্ডা হয়ে যাওয়া কফির দিকে তাকিয়ে বললেন, "সবচেয়ে বিপজ্জনক তদন্ত কোনটা, সাজ্জাদ সাহেব, জানেন?"
সাজ্জাদ নিজের চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসলেন। "যেটাতে কোনো ক্লু বা সূত্র থাকে না?"
"না।" আরিশা মাথা নাড়লেন। "বিপজ্জনক হলো সেই তদন্ত, যেটাতে ক্লু বা সূত্র খুব বেশি থাকে। কারণ তখন সত্যের চেয়ে নিজের সুবিধাজনক ভুল ব্যাখ্যাকে বিশ্বাস করার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়।"
হঠাৎ মনিটরে বড় করে ভেসে উঠল একটি বিখ্যাত সমীকরণ:
P(H|D) = {P(D|H) X P(H)}/P(D)
সাজ্জাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "আবার অঙ্ক?"
আরিশা হেসে বললেন, "না, এবার শুধু অঙ্ক নয়, এটি সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিজ্ঞান। এটাকে বলে বেইজ থিওরাম (Bayes' Theorem)।"
তিনি স্ক্রিনে H - এর জায়গায় লিখলেন—H = খুনি পরবর্তী হামলার জন্য একটি নির্দিষ্ট লেক বেছে নেবে। তারপর D - এর জায়গায় পরপর ইনপুট দিলেন—আগের তিনটি অপরাধস্থল, সময়ের মিল, ভিকটিমদের আর্থিক সম্পর্ক, সম্ভাব্য যাতায়াত পথ এবং অপরাধস্থলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য।
"এই সূত্র আমাদেরকে সরাসরি বলে দেয় না খুনি ঠিক কোথায় যাবে। এটা শুধু আমাদের গাণিতিকভাবে দেখায়—নতুন কোনো অকাট্য তথ্য পাওয়ার পর আমাদের আগের অনুমান বা বিশ্বাস কতটা বদলানো উচিত।"
"তাহলে আপনি প্রথম কীভাবে শুরু করেন?" সাজ্জাদ জানতে চাইলেন।
"Prior probability বা পূর্ববর্তী সম্ভাবনা দিয়ে।"
"তার মানে?"
"ধরি, পুরো ঢাকায় এমন বারোটি বড় জলাশয় বা লেক আছে যেখানে এই ধরনের হাই-প্রোফাইল হামলা করা বাস্তবসম্মত। তাহলে শুরুতে প্রত্যেকটি লেকের অপরাধস্থল হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় সমান, অর্থাৎ ১/১২।"
স্ক্রিনে বারোটি বিন্দু উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
"তারপর প্রতিটি নতুন তথ্য সেই সম্ভাবনাগুলোকে ফিল্টার এবং আপডেট করে।" আরিশা স্ক্রিনের একটি ডিজিটাল স্লাইডার টানলেন। ভিকটিমদের ব্যবসায়িক সংযোগের ডেটা যোগ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বারোটি বিন্দুর মধ্যে মাত্র চারটি বিন্দু উজ্জ্বল হয়ে রইল। তিনি আরেকটি স্লাইডার টানলেন—রাত দুইটার সময় কম জনসমাগম ও কম সিসিটিভি থাকা অঞ্চল। দুটি বিন্দু সঙ্গে সঙ্গে ফিকে হয়ে গেল। এরপর তৃতীয় স্লাইডার—অপরাধস্থলের কাছাকাছি দ্রুত হাইওয়েতে বেরিয়ে যাওয়ার রাস্তা। এবার তিনটি সম্ভাব্য অঞ্চল মানচিত্রে টিকে রইল।
সাজ্জাদ অবাক হয়ে বললেন, "অর্থাৎ আপনি একবারে নির্দিষ্ট উত্তর খুঁজছেন না!"
"না, আমি শুধু বিজ্ঞানসম্মতভাবে ভুল উত্তরগুলো একে একে বাদ দিচ্ছি।"
আরিশা এবার আরেকটি নতুন সফটওয়্যার খুললেন। সফটওয়্যারের স্ক্রিনের ওপরে শিরোনাম লেখা—Geographic Profiling। নিচে ছোট অক্ষরে লেখা—Rossmo Distance Decay Model।
"এটা কী কাজ করে, ম্যাডাম?"
আরিশা একটি সাদা কাগজ টেনে নিলেন এবং তার মাঝখানে একটি কলমের বিন্দু আঁকলেন। "ধরুন এই বিন্দুটি খুনির নিরাপদ আশ্রয় বা আস্তানা।" তারপর তার চারপাশে তিনি ঝটপট দুটি বৃত্ত আঁকলেন।
"অধিকাংশ সিরিয়াল অপরাধী নিজের বাসস্থানের একেবারে কাছাকাছি অপরাধ করে না। কারণ সেখানে চেনা মানুষের চোখে ধরা পড়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে।" ভেতরের বৃত্তে আঙুল রাখলেন তিনি। "এই সুরক্ষিত এলাকাটিকে বলে বাফার জোন। আবার সে অপরাধ করতে নিজের চেনা এলাকা থেকে খুব বেশি দূরেও যায় না। কারণ যাতায়াত, অতিরিক্ত পরিকল্পনা ও অচেনা জায়গার ঝুঁকি—সবকিছুর পেছনে তার অপরাধের খরচ ও ধরা পড়ার ভয় বাড়ে।"
"তাহলে অপরাধটা ঘটে কোথায়?"
"অপরাধগুলো সাধারণত এই দুই সীমার মাঝামাঝি কোনো চেনা বলয়ে ছড়িয়ে থাকে।"
সাজ্জাদ ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন। "অর্থাৎ আমরা যদি সবগুলো অপরাধস্থলকে একসঙ্গে জ্যামিতিকভাবে দেখি, তবে খুনির কার্যপরিসর ও কেন্দ্রের দূরত্ব অনুমান করা সম্ভব।"
"ঠিক তাই।" আরিশা মডেলে রান কমান্ড দিলেন।
ঢাকার ডিজিটাল মানচিত্রে রঙ বদলাতে শুরু করল। নীল থেকে সবুজ, সবুজ থেকে হলুদ, তারপর নিখুঁত গণনায় একটি গাঢ় কমলা রঙের হটস্পট অঞ্চল স্ক্রিনে ভেসে উঠল। সাজ্জাদ উত্তেজিত হয়ে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। "এটা তো..."
"কারওয়ান বাজারের আশপাশ।" আরিশা বাক্যটি শেষ করলেন। ল্যাবে কয়েক সেকেন্ডের নিস্তব্ধতা। এতক্ষণে তদন্তে প্রথমবারের মতো একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক পূর্বাভাস মিলেছে।
কিন্তু আরিশা বিজয়ের হাসি হাসলেন না। বরং মনিটরের দিকে আরও ঝুঁকে এসে একে একে আরও কয়েকটি লেয়ার চালু করলেন: সিসিটিভি কভারেজ, মোবাইল টাওয়ারের অবস্থান, রাতের যানবাহনের ঘনত্ব এবং বৃষ্টিপাতের পরিমাণ। তারপর অত্যন্ত ধীরে ধীরে বললেন, "কোথাও কিছু একটা মিলছে না।"
সাজ্জাদ কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললেন, "আবার কী হলো, ম্যাডাম?"
"Rossmo Model ধরে নেয় অপরাধী তার অবচেতন মনের স্বাভাবিক আচরণ অনুসরণ করছে। কিন্তু যদি অপরাধী আগে থেকেই জানে যে পুলিশ তার পেছনে Geographic Profiling ব্যবহার করবে?" আরিশা তিনটি লাল বিন্দুর দিকে তাকালেন। "তাহলে সে ইচ্ছে করেই অপরাধস্থলগুলো জ্যামিতিকভাবে এমন দূরত্বে বেছে নিতে পারে, যাতে পুলিশ হিসেব কষে একটি সম্পূর্ণ ভুল কেন্দ্র খুঁজে পায়।"
সাজ্জাদ থমকে গেলেন। আরিশা চুপ করে রইলেন। তারপর নিজের ব্যক্তিগত নোটবুকে কলম দিয়ে লিখলেন—
Hypothesis-1: অপরাধী তার স্বাভাবিক অবচেতন আচরণ করছে।
Hypothesis-2: অপরাধী তদন্তকারীদের বিভ্রান্ত করার জন্য কৃত্রিম জ্যামিতিক প্যাটার্ন তৈরি করছে।
দুটোর পাশে তিনি এখনো কোনো টিকচিহ্ন দিলেন না।
রাত এখন প্রায় একটা। ল্যাব প্রায় ফাঁকা হয়ে এসেছে। আরিশা আবার ভিকটিমদের মূল ডেটাবেসটি খুললেন। সেখানে দুই হাজারের বেশি ডকুমেন্ট রয়েছে—ব্যাংক বিবরণী, শেয়ারহোল্ডিং, দেওয়ানি মামলার নথি, কর রিটার্ন এবং ফোন রেকর্ড। তিনি একটি Network Analysis অ্যালগরিদম চালালেন। স্ক্রিনে একের পর এক নোড ফুটে উঠতে লাগল। হঠাৎ একটি ছোট্ট লাল বিন্দু তার চোখে পড়ল। এটি অন্যদের মতো বড় বা স্পষ্ট নয়, প্রায় অদৃশ্য। একটি পুরোনো কোম্পানি, যা প্রায় দশ বছর আগে আইনি ঝামেলার কারণে বন্ধ হয়ে গেছে।
সাজ্জাদ কফির কাপ নামিয়ে বললেন, "ওটা কী, ম্যাডাম?"
আরিশা সরাসরি উত্তর না দিয়ে কোম্পানির ভেতরের নথিগুলো স্ক্রিনে খুললেন। সেখানে পাওয়া গেল কয়েকটি জমি ক্রয়ের বিতর্কিত চুক্তি, কিছু ভুয়া আর্থিক মূল্যায়ন, একটি পুরোনো দেওয়ানি মামলা এবং তার সাথে যুক্ত একটি পুরোনো সংবাদপত্রের কাটিং। কাটিংয়ের শিরোনাম: "তেজগাঁওয়ে উচ্ছেদ অভিযানে অগ্নিকাণ্ড, একই পরিবারের চারজন নিহত।"
আরিশার চোখ সেখানে স্থির হয়ে গেল। "না..."
সে ফাইলটি জুম করে বড় করলেন। জমির মালিকানা পরিবর্তনের চূড়ান্ত অনুমোদনে যে চারজন পরিচালকের স্বাক্ষর ছিল, তাদের মধ্যে তিনজনই হলেন আমাদের ইতিমধ্যে নিহত হওয়া তিন ব্যবসায়ী! চতুর্থজন এখনো বেঁচে আছেন। কিন্তু আরিশার দৃষ্টি সেখানে আটকে রইল না। সংবাদের একেবারে নিচের লাইনে লেখা ছিল: "পরিবারের এক কিশোর সদস্য গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার হয়।" তার নাম—ফাহিম রহমান।
আরিশা ভিকটিমদের ফাইল এবং ক্রাইম সিনের ডেটা আবার নতুন করে মেলালেন। প্রথমে তিনি খুনের স্থান ও সময়গুলো (২:১৫, ২:২০, ২:১৮) দেখলেন, কিন্তু সেখান থেকে সরাসরি কোনো সূত্র মিলল না। কিন্তু যখন তিনি খুনের তারিখ ও ভিকটিমদের মধ্যকার অন্য কিছু সংখ্যার দিকে তাকালেন, তখন তার চোখ আটকে গেল।
প্রথম খুনের তারিখ: ১০ মে
দ্বিতীয় খুনের তারিখ: ১১ জুন (ব্যবধান ৩২ দিন)
তৃতীয় খুনের তারিখ: ১১ জুলাই (ব্যবধান ৩০ দিন)
"অদ্ভুত..." আরিশা ফিসফিস করলেন। আপাতদৃষ্টিতে এই দিনগুলোর ব্যবধানে কোনো স্পষ্ট প্যাটার্ন নেই। কিন্তু তিনি যখন ভিকটিমদের আরেকটি ভিন্ন কলাম মেলালেন—প্রথম ভিকটিমের বয়স ৪২, দ্বিতীয় ভিকটিমের বয়স ৬৮ এবং তৃতীয় ভিকটিম ১১০ মাস আগে একই ব্যবসায়িক চুক্তিতে সই করেছিলেন—তখন সংখ্যাগুলো পাশাপাশি সাজাতেই তার শরীর শিউরে উঠল।
৪২, ৬৮, ১১০।
"না..." সে দ্রুত ক্যালকুলেটর খুললেন।
৬৮ = ৪২ + ২৬
১১০ = ৬৮ + ৪২
সাজ্জাদ ভ্রু কুঁচকে বললেন, "কী হলো, ম্যাডাম? এগুলো কি বিখ্যাত ফিবোনাচ্চি (Fibonacci) ধারা?"
"না, এগুলো সরাসরি ফিবোনাচ্চি সংখ্যা নয়, তবে ফিবোনাচ্চির মতোই একটি নির্দিষ্ট লিনিয়ার রিকারেন্স প্যাটার্ন (Linear Recurrence Pattern), যেখানে আগের দুটি পদের যোগফল দিয়ে পরের পদটি তৈরি হচ্ছে!"
তিনি অধীর আগ্রহে আরও খুঁজতে লাগলেন। এবার মানচিত্রের দূরত্বে নতুন কিছু বেরিয়ে এল। প্রথম অপরাধস্থল থেকে দ্বিতীয়টির সরলরৈখিক দূরত্ব ৫.১ কিলোমিটার। দ্বিতীয় থেকে তৃতীয়টির দূরত্ব ৮.৩ কিলোমিটার। তিনি দুটির অনুপাত বের করলেন:
৮.৩/৫.১ = ১.৬২
সাজ্জাদ এবার সম্পূর্ণ চুপ হয়ে গেলেন। কারণ এই সংখ্যাটি তিনি জেনারেলে পড়ে এসেছেন। "গোল্ডেন রেশিও (Golden Ratio)?"
"হ্যাঁ, গোল্ডেন রেশিওর মান ১.৬১৮-এর প্রায় সমান!" আরিশা মাথা নাড়লেন।
এবার তিনি তিন ভিকটিমের শরীর থেকে উদ্ধার হওয়া তীরের ফরেনসিক রিপোর্টটি খুললেন। প্রথম তীরের দৈর্ঘ্য ২১ সেন্টিমিটার, দ্বিতীয় তীরের দৈর্ঘ্য ৩৪ সেন্টিমিটার এবং তৃতীয় তীরের দৈর্ঘ্য ৫৫ সেন্টিমিটার।
সাজ্জাদ এবার বিস্মিত ও নিশ্চিত গলায় বললেন, "২১, ৩৪, ৫৫... এগুলো তো সরাসরি পিওর ফিবোনাচ্চি সংখ্যা!"
ল্যাবে এক গভীর নীরবতা নেমে এল। একটি সংখ্যা হয়তো কাকতালীয় হতে পারে, দুটি সংখ্যা সন্দেহজনক হতে পারে; কিন্তু একই তদন্তে বারবার রিকারেন্স সিকোয়েন্স, ফিবোনাচ্চি ধারা এবং গোল্ডেন রেশিওর নিখুঁত উপস্থিতি কখনোই দুর্ঘটনা নয়। এটা সম্পূর্ণ ইচ্ছাকৃতভাবে রাখা একটি গাণিতিক স্বাক্ষর।
আরিশা ধীরে ধীরে চেয়ারে হেলান দিলেন। তার মাথায় হঠাৎ দশ বছর আগের তেজগাঁও অগ্নিকাণ্ডের সেই সংবাদ প্রতিবেদনটি ভেসে উঠল। সেখানে বেঁচে যাওয়া একমাত্র কিশোর ছিল ফাহিম রহমান। ফাইল চেক করে জানা গেল, ফাহিম রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের একজন সাবেক কৃতী ছাত্র ছিলেন, যিনি সংখ্যাতত্ত্ব এবং রিকারসিভ সিস্টেমস নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কার পেয়েছিলেন।
"তাহলে কি এই ফিবোনাচ্চি সিরিজটাই খুনির আসল স্বাক্ষর?" সাজ্জাদ জিজ্ঞেস করলেন।
আরিশা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর না দিয়ে নোটবুকে লিখলেন—
Hypothesis: খুনি উচ্চতর গণিতে প্রশিক্ষিত। সে ইচ্ছাকৃতভাবে Fibonacci-based symbolic signature ব্যবহার করছে। সম্ভাব্য সন্দেহভাজন ব্যক্তি: ফাহিম রহমান।
তারপর নিচে বড় করে আরেকটি সতর্কবার্তা লিখলেন—Warning: Pattern ≠ Proof (প্যাটার্ন মানেই চূড়ান্ত প্রমাণ নয়)।
সাজ্জাদ অবাক হয়ে তাকালেন। "এর মানে কী, ম্যাডাম?"
আরিশা জানালার বাইরে তাকালেন। "যে মানুষ ফিবোনাচ্চি আর গোল্ডেন রেশিও বোঝে, সে খুব ভালো করেই জানে যে পুলিশ বিভাগে আমাদের মতো কেউ না কেউ এই চেনা ফিবোনাচ্চি ধারা ঠিকই চিনে ফেলবে। তাই এই নিখুঁত প্যাটার্ন যেমন ফাহিমকে নির্দেশ করতে পারে, তেমনি এটাও হতে পারে যে অন্য কেউ ফাহিমের এই গণিতের ইতিহাস জানত এবং সে চাইছে আমরা যেন ফাহিমের দিকেই চোখ আটকে রাখি।"
সাজ্জাদ ধীরে ধীরে বললেন, "তাহলে এটা কি ফাহিমের প্রতিশোধ নয়?"
আরিশা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়লেন। "না, এটা খুনের মোটিভ বা উদ্দেশ্য হতে পারে। কিন্তু মোটিভ কখনোই একা কোনো অপরাধীকে আইনগতভাবে প্রমাণ করে না।"
আরিশা দ্রুত কম্পিউটারে নতুন একটি Bayesian Update রান করলেন। এবার মডেলে নতুন তথ্য হিসেবে যোগ হলো—ভিকটিমদের ঐতিহাসিক ব্যবসায়িক সংযোগ, সেই পুরোনো জমি অধিগ্রহণ মামলা, জীবিত থাকা সম্ভাব্য চতুর্থ অংশীদার এবং সেই অগ্নিকাণ্ডের একমাত্র প্রত্যক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি।
কয়েক সেকেন্ড পর স্ক্রিনে সম্ভাবনার মান নাটকীয়ভাবে বদলে গেল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এতক্ষণ রোসমো মডেল যে কারওয়ান বাজার অঞ্চলকে সবচেয়ে সম্ভাব্য অপরাধীর ডেরা বলছিল, নতুন ডেটা ইনপুট করার পর Bayesian আপডেটের কারণে সেটি দ্বিতীয় স্থানে নেমে গেল! আর একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং নতুন অঞ্চলের সম্ভাবনা ধীরে ধীরে তালিকার ওপরে উঠে এল।
সাজ্জাদ বিস্মিত হয়ে বললেন, "মানে? আমাদের মডেলে সমস্যা?"
আরিশা গভীর শ্বাস নিলেন। "আমাদের গাণিতিক মডেল বদলায়নি, সাজ্জাদ সাহেব। শুধু আমাদের কাছে থাকা তথ্যের পরিধি ও জ্ঞান বদলেছে। আর কখনো কখনো... জটিল তদন্তে একটি মাত্র সঠিক ডেটা-পয়েন্ট হাজারটা গ্রাফের চেয়েও বেশি মূল্যবান হয়ে দাঁড়ায়।"
তিনি মনিটরটি বন্ধ করে দিলেন। বাইরে বৃষ্টি ততক্ষণে থেমে গেছে। ল্যাবের কাঁচে জমে থাকা পানির ফোঁটাগুলো ধীরে ধীরে নিচের দিকে নেমে আসছে। আরিশা জানালার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন, "ফাহিম... তুমি কি সত্যিই প্রতিশোধ নিচ্ছ? নাকি আসল খুনি চাইছে আমরা যেন তোমার এই প্রতিশোধের নিখুঁত গল্পটাই বিশ্বাস করি?" অন্ধকার ল্যাবে প্রশ্নটা উত্তরহীনভাবে ঝুলে রইল।
ল্যাবের কাঁচের জানালায় ভোরের প্রথম আলো পড়েছে। আরিশা সারারাত এক ফোঁটাও ঘুমাননি। মনিটরে এখনো খোলা রয়েছে Bayesian posterior distribution-এর গ্রাফ। কিন্তু তার দৃষ্টি এখন স্ক্রিনে নয়, তার সামনে টেবিলের ওপর রাখা সেই পুরোনো সংবাদপত্রের কাটিংটায়। তেজগাঁওয়ের অগ্নিকাণ্ড, একটি অসহায় পরিবার এবং একজন বেঁচে যাওয়া গণিতের প্রতিভাবান কিশোর ফাহিম রহমান—সবকিছু যেন প্রয়োজনের চেয়েও বেশি নিখুঁত। আর কোনো কিছু যখন অতিরিক্ত নিখুঁত হয়, তখন আরিশার পেশাদার সন্দেহ আরও বেড়ে যায়।
"সাজ্জাদ সাহেব।"
"জি, ম্যাডাম?" সাজ্জাদ তন্দ্রাচ্ছন্ন চোখ রগড়ে তাকালেন।
"ধরুন কেউ আপনাকে খুব চমৎকার একটি গল্প শোনাল। গল্পের প্রতিটি চরিত্রের পেছনে অকাট্য উদ্দেশ্য আছে এবং প্রতিটি ঘটনার পেছনে যৌক্তিক ব্যাখ্যা আছে।"
সাজ্জাদ মাথা নাড়লেন। "তাহলে তো সেটা খুবই ভালো ও গোছানো গল্প।"
আরিশা ধীরে ধীরে বললেন, "সমস্যাটা এখানেই। বাস্তব জীবন সাধারণত এত সুন্দর এবং নিখুঁতভাবে সাজানো থাকে না। বাস্তবে ডেটা বা ঘটনা অনেক বেশি অগোছালো হয়।"
তিনি আবার বেইজিয়ান মডেলটি খুললেন এবং সেখানে নতুন একটি বৈপ্লবিক হাইপোথিসিস যোগ করলেন—
H3: খুনি তদন্তকারীদের বিভ্রান্ত করার জন্য এবং নিজের পরিচয় লুকাতে ইচ্ছাকৃতভাবে ফাহিমের নামে একটি ভুয়া মোটিভ ও গাণিতিক প্যাটার্ন তৈরি করেছে।
মডেলটি আবার রান করা হলো। এইবার অলৌকিকভাবে ফাহিমকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া সম্ভাবনার মান উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়ে শূন্যের কাছাকাছি নেমে গেল!
সাজ্জাদ সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত হয়ে বললেন, "আরে! আপনি নিজেই তো একটু আগে ফাহিমকে প্রধান সন্দেহভাজন মনে করেছিলেন!"
"করেছিলাম।" আরিশা শান্ত গলায় বললেন। "কিন্তু একজন ভালো তদন্তকারী নতুন তথ্যের মুখে নিজের সবচেয়ে প্রিয় ও সুন্দর তত্ত্বটিকেও নির্দ্বিধায় বাতিল করতে শেখে।"
আরিশা এবার ভিকটিমদের বিগত বিশ বছরের সমস্ত আর্থিক নথি ও ফাইল আবার খুললেন। এইবার তিনি কোনো নাম বা ঘটনার দিকে তাকালেন না, শুধু সংখ্যার দিকে নজর দিলেন—হাজার হাজার সংখ্যা, জমির সরকারি-বেসরকারি মূল্য, শেয়ারের দাম, লেনদেনের পরিমাণ, টেন্ডারের অঙ্ক ও কর ফাইলের হিসাব।
সাজ্জাদ বিরক্ত হয়ে বললেন, "এসব শুকনো সংখ্যা দেখে এখন কী হবে?"
আরিশা কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি স্ক্রিনে একটি বিশেষ ফরেনসিক অ্যাকাউন্টস অ্যালগরিদম চালালেন: বেনফোর্ড অ্যানালিসিস।
মুহূর্তে সংখ্যাগুলোর প্রথম অঙ্কের ফ্রিকোয়েন্সি বা পুনরাবৃত্তির হার স্ক্রিনে একটি গ্রাফ আকারে ভেসে উঠল। বেনফোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী, স্বাভাবিক আর্থিক লেনদেনের সংখ্যার শুরুতে '১' থাকার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি (প্রায় ৩০%) এবং '৯' থাকার সম্ভাবনা সবচেয়ে কম থাকে। কিন্তু স্ক্রিনে দেখা গেল, ওই তিন ব্যবসায়ীর একটি নির্দিষ্ট যৌথ কোম্পানির হিসাবের খাতা হঠাৎ এই স্বাভাবিক গাণিতিক প্যাটার্ন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্যুত হয়ে গেছে! মানুষের তৈরি করা কৃত্রিম সংখ্যা সেখানে ধরা পড়ে গেছে।
"পেয়ে গেছি!" আরিশার চোখে আলো জ্বলে উঠল।
সাজ্জাদ দ্রুত এগিয়ে এলেন। "কী পেলেন, ম্যাডাম?"
"যে কোম্পানির উচ্ছেদ অভিযানের কারণে তেজগাঁওয়ে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছিল, সেই কোম্পানির মূল হিসাবের খাতা কেউ একজন ঘটনার বেশ কিছুদিন পরে নিখুঁতভাবে পরিবর্তন বা ম্যানিপুলেট করেছে। আর মানুষ যখন বানিয়ে বানিয়ে সংখ্যা লেখে, তখন সে বেনফোর্ডের নিয়ম ধরে রাখতে পারে না।"
"কিন্তু কেন পরিবর্তন করেছে?"
"কারণ আসল অপরাধটা কোনো সাধারণ জমি দখল বা উচ্ছেদ ছিল না। আসল অপরাধটা ছিল একটি বিশাল আন্তর্জাতিক অর্থপাচার (Money Laundering) স্কিম।" আরিশা ধীরে ধীরে বললেন।
খবর দেওয়ার দুই ঘণ্টার মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (BFIU) থেকে সিআইডি ল্যাবে গোপন ফাইল চলে এল। ফাইলের ডেটা অ্যানালিসিস করে দেখা গেল, দশ বছর আগে জমির নামে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেন দেখানো হয়েছিল, তার বেশিরভাগই কখনো জমি কেনায় খরচই হয়নি। টাকাগুলো বিভিন্ন শেল কোম্পানি বা ভুয়ো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিদেশে পাচার হয়ে গিয়েছিল। আর আশ্চর্যের বিষয় হলো—নিহত তিনজন ব্যবসায়ী সেই অর্থপাচারের গোপন তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খ জানতেন, কিন্তু কেউ কখনো তা প্রকাশ করেননি। কারণ পাচারের লভ্যাংশ থেকে তারাও বড় আর্থিক সুবিধা পেয়েছিলেন।
"তাহলে খুনি কে?" সাজ্জাদ অধীর হয়ে প্রশ্ন করলেন।
আরিশা ধীরে ধীরে বোর্ডের ওপর এতক্ষণ সন্দেহের তালিকায় থাকা চারটি নাম লিখলেন। তারপর ঠান্ডা মাথায় প্রথম তিনটি নাম মুছে দিলেন। শেষে বোর্ডে একটি মাত্র নাম অক্ষত রইল—নাজমুল কবীর।
"ইনি ওই কোম্পানির সাবেক চিফ অডিটর ছিলেন। কোনো দৃশ্যমান অংশীদার নন, কোনো আলোচিত ব্যবসায়ীও নন। কিন্তু তিনিই ছিলেন একমাত্র মানুষ, যার হাত দিয়ে কোম্পানির সমস্ত আর্থিক নথি ও আসল হিসাবের খাতা অডিট হতো।" আরিশা রহস্যের জট খুললেন।
পুলিশ নাজমুল কবীরের খোঁজে নামল, কিন্তু তাকে পাওয়া গেল না। তার বাসা ফাঁকা, মোবাইল ফোনও বন্ধ। কিন্তু এই অতি চালাক খুনিও নিজের অজান্তে একটি খুব ছোট্ট টেকনিক্যাল ভুল করে ফেলেছিলেন।
আরিশা ক্রাইম সিন থেকে পাওয়া তিনটি তীরের ফরেনসিক ও রাসায়নিক রিপোর্ট পাশাপাশি রেখে তুলনা করছিলেন। প্রথম তীরের ওজন ১৮৩.৪ গ্রাম, দ্বিতীয়টি ১৮৩.৬ গ্রাম এবং তৃতীয়টি ১৮৩.৫ গ্রাম। ওজন প্রায় হুবহু অভিন্ন। কিন্তু কার্বন ফাইবারের গায়ে ব্যবহৃত রেজিনের (Resin) রাসায়নিক উপাদানের আইসোটোপ অ্যানালিসিস করে ল্যাব রিপোর্ট জানাল—এই বিশেষ রেজিন বাংলাদেশে মাত্র একটি নির্দিষ্ট কেমিক্যাল ফ্যাক্টরিতে তৈরি হয়। আর সেই কারখানার বিগত এক বছরের বিশেষ ক্রেতাদের তালিকায় মাত্র সাতজন মানুষের নাম ছিল। তাদেরই একজন হলেন—নাজমুল কবীর।
দুই দিন পরের ঘটনা। নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে একটি পুরোনো পরিত্যক্ত গুদামঘরকে সিআইডির অনুরোধে সোয়াট (SWAT) টিম চারদিক থেকে নিঃশব্দে গুদামটি ঘিরে ফেলেছে।
সাজ্জাদ পিস্তল কক করে ফিসফিস করে বললেন, "ম্যাডাম, আপনি এবার শতভাগ নিশ্চিত তো?"
আরিশা শান্তভাবে উত্তর দিলেন, "না, সাজ্জাদ সাহেব।"
সাজ্জাদ অবাক হয়ে তার দিকে তাকালেন। "এই চূড়ান্ত মুহূর্তেও না?"
"আমি বিজ্ঞানের মানুষ, আমি কখনো কোনো কিছুতেই শতভাগ নিশ্চিত নই।" আরিশা মৃদু হাসলেন। "তবে আমাদের কাছে বর্তমান যে প্রমাণ ও ডেটা আছে, গণিত অনুযায়ী আমাদের বর্তমান সিদ্ধান্ত এই মুহূর্তে সবচেয়ে শক্তিশালী ও কম ভুল।"
সোয়াট টিমের সাথে ভেতরে ঢুকতেই দেখা গেল—ভেতরে একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ অত্যন্ত শান্তভাবে একটি ল্যাপটপের সামনে বসে আছেন। চারদিকে পুলিশ দেখেও তার মধ্যে পালানোর কোনো তাড়া বা চেষ্টা দেখা গেল না।
"আপনিই নাজমুল কবীর?" সাজ্জাদ এগিয়ে গেলেন।
লোকটি শান্ত দৃষ্টিতে তাকাল। "আপনারা যে একসময় ঠিকই আসবেন, তা আমি জানতাম।"
"তার মানে আপনিই ওই তিনজনকে ঠান্ডা মাথায় খুন করেছেন?"
লোকটি দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "হ্যাঁ, আমিই করেছি।"
"কেন?"
"কারণ তারা সবাই বড় অপরাধ করে, চারজন মানুষকে পুড়িয়ে মেরেও আইনের ফাঁক গলে বেঁচে গিয়েছিল। যে আগুনে পুরো একটি পরিবার ছাই হয়ে গিয়েছিল, সেই আগুনের দায় তারা অবৈধ টাকা আর ক্ষমতার জোরে মিটিয়ে ফেলেছিল। আমি আইনের কাছে গিয়েছিলাম, কিন্তু কোনো বিচার পাইনি।" নাজমুল কবীর ধীরে ধীরে বললেন।
আরিশা তার দিকে সোজা তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "তাহলে ফাহিম রহমান?"
লোকটি বিষণ্ণ এক মৃদু হাসি হাসল। "ফাহিম রহমান সত্যিই আমার দূর সম্পর্কের ভাগ্নে ছিল। কিন্তু সে আজ থেকে প্রায় পাঁচ বছর আগেই একটি সাধারণ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে। আমি শুধু তার জীবনের গল্পটা, তার গণিতের প্রতিভা আর ফিবোনাচ্চির প্যাটার্নটা আমার খুনের ডায়েরিতে ব্যবহার করেছি।"
সাজ্জাদ স্তব্ধ হয়ে গেলেন। "তাহলে সেই পুরোনো সংবাদপত্রের ক্লিপ আর ফিবোনাচ্চির জ্যামিতিক দূরত্ব?"
"আমি খুব ভালো করেই জানতাম আপনারা সায়েন্টিফিক্যালি তদন্ত করতে এসে ঠিক ওটাই খুঁজে পাবেন।" নাজমুল শান্ত গলায় অপরাধের মনস্তত্ত্বটা ব্যাখ্যা করলেন, "সাধারণ মানুষ হোক কিংবা বড় পুলিশ অফিসার—সবাই শুষ্ক তথ্যের চেয়ে একটি সাজানো আবেগময় গল্পকে বেশি বিশ্বাস করে। আমি আপনাদের সেই গল্পের গোলকধাঁধায় আটকে রাখতে চেয়েছিলাম।"
নাজমুল কবীরের হাতে হ্যান্ডকাফ পরানোর সময় আরিশা শেষবারের মতো লোকটির মুখোমুখি দাঁড়ালেন। "আপনি ভেবেছিলেন আমরা ওই ফাহিমের প্রতিশোধের সুন্দর গল্পটার প্রেমে পড়ব এবং ওখানেই তদন্ত থামিয়ে দেব, তাই তো?"
নাজমুল হেসে বললেন, "আপনি কি পড়েননি সেই গল্পের প্রেমে?"
আরিশা সততার সাথে মাথা নাড়লেন। "হ্যাঁ, একটু পড়েছিলাম। মানুষ হিসেবে গল্পটা আমাকেও ছুঁয়েছিল। কিন্তু তারপরই আমার মনে পড়ল পরিসংখ্যানের সেই অমোঘ নিয়ম—Bayesian Inference-এর সবচেয়ে বড় শিক্ষাই হলো, যখনই সামনে নতুন কোনো অকাট্য প্রমাণ আসবে, তখন নিজের পুরোনো বিশ্বাস ও হাইপোথিসিস বদলে ফেলতে বিন্দুমাত্র লজ্জা পাওয়া যাবে না।"
গুদামঘরের বাইরে তখন ভোরের প্রথম আলো ফুটতে শুরু করেছে। সাজ্জাদ পকেটে পিস্তলটা রাখতে রাখতে ধীরে ধীরে বললেন, "শেষ পর্যন্ত আপনাকে আর এই কেসটাকে বাঁচাল কোন সূত্রটা, ম্যাডাম?"
আরিশা কিছুক্ষণ চুপ করে ভোরের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর বললেন, "কোনো একক সূত্র বা ক্লু নয়, সাজ্জাদ সাহেব। আমাদের বাঁচিয়েছে একটি ভুল কিন্তু সুন্দর তত্ত্বকে সঠিক সময়ে বাতিল করার বৈজ্ঞানিক সাহস।"
তিনি দিগন্তের দিকে তাকালেন। "পরিসংখ্যান কখনো জাদুকরের মতো ভবিষ্যৎ বলে দেয় না। এটি আমাদের শুধু এইটুকুই বলে—আমাদের সামনে থাকা বর্তমান প্রমাণ অনুযায়ী কোন ব্যাখ্যাটি সবচেয়ে কম ভুল ও সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত।"
দূরে কুয়াশা ভেদ করে সূর্য উঠছিল। বুড়িগঙ্গা আর শীতলক্ষ্যার পাড় ঘেঁষে ঢাকার ওপর নতুন এক দিনের আলো ছড়িয়ে পড়ছিল। সিআইডির ফরেনসিক অ্যানালিটিক্স ল্যাবে আরেকটি জটিল কেসের ফাইল আজ বন্ধ হলেও, আরিশা মনে মনে খুব ভালো করেই জানতেন—পরবর্তী কোনো এক অপরাধের রহস্যও হয়তো ঠিক এভাবেই কোনো না কোনো সংখ্যার আড়ালে অপেক্ষা করছে।
![বেনফোর্ডের কাঁটা [ছোটোগল্প] • সাঈদ বিলাস বেনফোর্ডের কাঁটা [ছোটোগল্প] • সাঈদ বিলাস](https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEhysrEsFXQ1JdqTTZfNLgZAFG2idHP0kDBXHFVGiTB9kKZyY_gV6zWwY0m_44OALrO8HO9AhdihDV8p2xpVfs-mqZqDmfamP0dvp2zIvTLZohIHRkkH44rnR9TMJkCPbr_RoDJc6biEWbKCJ3QHCsTQZsb5Q2e7nXwx_Nc9maF2Cw3V5CUSQOBCvMPW4Ro/s1600-rw/%E0%A6%AC%E0%A7%87%E0%A6%A8%E0%A6%AB%E0%A7%8B%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%A1%E0%A7%87%E0%A6%B0%20%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%81%E0%A6%9F%E0%A6%BE%20%5B%E0%A6%9B%E0%A7%8B%E0%A6%9F%E0%A7%8B%E0%A6%97%E0%A6%B2%E0%A7%8D%E0%A6%AA%5D%20%E2%80%A2%20%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%88%E0%A6%A6%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%B8%20%E2%80%A2%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%81.png)



মন্তব্য