.header-button .inner > span { font-size: 18px !important; } .header-button .inner i.fa { font-size: 40px !important; } .comment-form-message { background-color: #f4f4f4 !important; font-size: 14px !important; }

$type=ticker$count=12$cols=4$cate=0$sn=0$show=post

…এবং তিনি ‘ঋত্বিক’ • রাজর্ষি বিশ্বাস

…এবং তিনি ‘ঋত্বিক’ রাজর্ষি বিশ্বাস
সত্যজিৎ রায় প্রায়ই বলতেন, ঋত্বিক মনেপ্রাণে বাঙালি পরিচালক ছিল, বাঙালি শিল্পী ছিল- আমার থেকেও অনেক বেশি বাঙালি। অথচ একমাত্র বাঙালিরাই পারে এত উচ্চমার্গের ও মননের শিল্পীকে অবহেলা ও অবজ্ঞা করতে। যে মানুষটা সারাটা জীবন শিল্পের জন্য আপসহীন লড়াই করলেন, তাঁর পাশে দাঁড়ালো না কেউ- ই। কেন এমনটা হয়? বাঙালির সেই ট্র্যাডিশন কী এখনও চলছে? আত্মঘাতীর তকমা সহজে উঠবেই বা কেন? অধিকাংশ বাঙালির দুর্ভাগ্য যে জীবদ্দশায় ঋত্বিককে চিনতেই পারে নি। তিনি যদি পাশ্চাত্যের দেশে জন্মাতেন তাহলে তাঁকে মাথায় তুলে রাখা হত। কিন্তু তিনি জন্মেছেন বোধহীন এক দেশে। সারাটা জীবন তাঁকে উদ্বাস্তুই করে রাখা হল। উদ্বাস্তু বলেই কী এই বঞ্চনার শিকার? না কি সরকারের তাবেদারী করেন নি তাই? দেশভাগের খণ্ডিত ও যন্ত্রণা দগ্ধ মন নিয়ে এদেশে এসেও, দেখেননি কোন আশার আলো। কতগুলো অপগণ্ডের হাতে পড়ে রাজ্য ধুঁকছে। আর চলছে পুনর্বাসনের নামে প্রহসন। ক্যাম্প, কলোনিগুলো হয়ে উঠেছে নরক। নিজেকে তাই বারংবার আগুনে পুড়িয়েছেন। ওই পুড়ে যাওয়া সত্তাই পুনঃনির্মিত হয় তাঁর সৃষ্টিতে। অথচ চলচিত্রের প্রধান পুরোহিত ঋত্বিক-ই হয়ে ওঠেন ট্র্যাজেডির নায়ক। অর্থাভাবে বারংবার বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে তাঁর সৃজন কর্ম। তবু তিনি দমে যাওয়ার পাত্র নন। তাঁর আজন্ম এই লড়াইয়ের ফলেই বা  দৃশ্য ও অদৃশ্য হাত ধরেই এ দেশের চলচিত্র সাবালক হয়েছে। ‘রাজা হরিশ্চন্দ্র’ ঘরানা থেকে ‘নাগরিক’, ‘অযান্ত্রিক’-এ উত্তরণ নিছকই পরিবর্তন ছিল না, ছিল এক বিপ্লব।  নিছক দর্শক মনোরঞ্জনের জন্য তিনি চলচিত্র নির্মাণ করেন নি। অথচ জানতেন, বাঙালিরা কাঁদতে বড়ই ভালোবাসে; তাই কাঁদাতে পারলে দুটো পয়সা পাওয়া যায়। এই সহজ সরল সত্যটা জেনেও, ও পথে হাঁটেন নি। প্রায়শই বলতেন, আমি সস্তা আনন্দ দিতে আসি নি। সিনেমার চেয়ে অন্য কোন শক্তিশালী মাধ্যম যদি আসে, তাহলে সেই মাধ্যমই গ্রহণ করব। চলচিত্র  নিছক বিনোদনের মাধ্যম ছিল না। ছিল প্রতিবাদের, শিক্ষার ও চেতনার। তিনি হয়ত সর্বোত্তম শিল্পের স্বপ্ন দেখতে চেয়েছিলেন। ঠিক এই ভাবনাতেই  হয়ে ওঠেন একজন জাত শিল্পী ও আদর্শবান শিক্ষক। দেশভাগের যন্ত্রণা বুকে করেই সৃষ্টি কর্মে মগ্ন থেকেছেন। এক ভাঙা দেশের নাগরিক হয়ে ভাঙাচোরা ক্যামেরা কাঁধে নিয়ে ফেরি করে যান এক স্বপ্ন। পৃথিবীর সবেরই প্রেক্ষিত থাকে। শিকড় থাকে। ঋত্বিক ছিলেন সেই শিকড় সন্ধানী। শিকড়ের মধ্যেই বসবাস করেছেন আজন্ম। শিকড়ের অনুসন্ধান তাঁকে নিয়ে যায় অন্য ভুবনে। তাইতো লোক জীবন ও লোক সংস্কৃতি, এপিক ধর্মীতা থেকে বিচ্যুত হন নি। উচ্চবর্গীয়রা তাঁর ভুবনে বা সৃষ্টির কেন্দ্রভূমিতে স্থান পায় নি। বরং নিম্নবর্গীয়দের যাপিত জীবনই হয়ে ওঠে তাঁর সৃষ্টির মুখ্য প্রতিপাদ্য। নিম্নবর্ণীয় জেলেদের জীবন আখ্যান ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ চলচিত্রটির নির্মাণ সেই অন্তর্লীন ভাবনারই প্রতিফলন। এভাবেই তাঁর প্রতিটি নির্মাণ স্বতন্ত্র, স্বকীয়। মননের গভীরে জন্ম নেওয়া দানা শস্য। আসলে তাঁর সৃষ্টিই, তাঁর দর্শন। তাই  হয়ে ওঠেন বৌদ্ধিক বঙ্গের অধিনায়ক। দেশান্তরী হওয়ার যন্ত্রণা তাঁকে দগ্ধ করে। তাই দেশভাগের তীব্র বিরোধী ছিলেন। তাঁর মতে, কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ এ দেশের সর্বনাশ ঘটিয়ে দেশকে দু টুকরো করে যে স্বাধীনতা এনেছে তাতে পদ্মা ও গঙ্গার জল রক্তে লাল হয়েছে।

শিক্ষিত বাঙালি দর্শক বা চলচিত্র বোদ্ধারা আইজেনস্টাইন, বার্গম্যান, তারাকভস্কি, বুনুয়েল, কুরুসোয়া, গদারদের সৃষ্টি নিয়ে যতটা আগ্রহী ছিলেন, ততটা ঋত্বিককে নিয়ে ছিলেন না। বিশ্ব চলচিত্র নিয়ে অগাধ পাণ্ডিত্য থাকলেও, তাঁর কোন সৃষ্টিই হলিউড দ্বারা প্রভাবিত ছিল না। ঋত্বিক এই বাংলার জল, মাটি, গাছপালা, মানুষ নিয়েই ভেবেছেন সারাটা জীবন। তিনি চেতনার অতি গভীরের স্তরগুলি অতিক্রম করে এক অন্য জগতে প্রবেশ করতে পারতেন- যা অনেকেরই ইন্দ্রিয়ানুভুতির বাইরে। তাই অজস্র রূপকের মধ্য দিয়ে চালিত করতেন মস্তিস্ক খনন প্রক্রিয়া। আমাদের ছাপোষা মধ্যবিত্ত মনন তাই তাঁর ভাবনার কাছে বারংবার ধাক্কা খেত। ‘সুবর্ণরেখা’-তে আকস্মিক এক বহুরূপী কালীমূর্তি সামনে এসে দাঁড়ায়- সে নৃত্য করে নিজস্ব এক কাল্পনিক বৃত্তে। আর সকলকে হতচকিত করে বলে, ভয় দেখাই নাই...। প্রতিটি মুহূর্ত তাই হয়ে ওঠে নান্দনিক কাব্য। অথচ এরই মধ্যে লুকিয়ে থাকে এক চিরন্তন জীবন সংগ্রাম। তিনিই একমাত্র বলতে পারেন, ‘যেখানে দারিদ্র আর নীতিহীনতা আমাদের নিত্যসঙ্গী, সেখানে কালোবাজারি আর অসৎ রাজনৈতিকের রাজত্ব, সেখানে বিভীষিকা আর দুঃখ মানুষের নিয়তি।’ তাঁর এই যন্ত্রণারই প্রথম ফসল ‘নাগরিক’। ভেঙে যাওয়া একটি দেশের পঙ্গুত্ব, বেকারত্ব, খাদ্য ও বাসস্থান সংকট বাঙালি সত্তাকে খণ্ড-বিখণ্ডিত করে। ‘নাগরিক’-এ মানুষের পরাজয়ের সেই জ্বালা, যন্ত্রণা, প্রতিনিয়ত বাঁচার কঠিন লড়াই যেভাবে সেলুলয়েড বন্দী করেন, ইতিপূর্বে তা ভারতীয় চলচিত্রে কেউ কল্পনাও করেন নি। তাঁর আগে কেউ এই হাহাকারের শব্দ তরঙ্গ, বেকারত্বের তীব্র যন্ত্রণা, চটি ছেরার করুণ রাগ শোনান নি; দেশভাগের রাজনৈতিক বেসাতি ও প্রহসনের কথা বলেন নি; খরার দেশে এই চিন্তন কেউ শোনান নি বহুরূপীয় ঝংকার, আর এপিকের রূপকল্প। প্রায়ই বলতেন, আমি দর্শকদের হ্যামার করব। এ কথা বাগাড়ম্বর ছিল না মোটেই। দর্শকদের শুধু হ্যামার করেন নি, চাবুকের কঠিন শব্দে বিবেক জাগ্রত করে তুলতে চেয়েছিলেন। তাই ব্যক্তি জীবনে নিজের সঙ্গে, বিশ্বাসের সঙ্গে, সৃষ্টির সঙ্গে কখনোই আপস করেন নি। ভণ্ডামি করে নয়, আঁতলামো করে নয়, সিস্টেমের দাসত্ব করে নয়, সারাটা জীবন সত্যের অনুসন্ধানেই ক্যামেরাকে প্যান, জুম, টিল্ট করেছেন। লিখেছেন জীবনের চিত্রনাট্য। দুর্ভাগ্যের যে, তাঁর জীবদ্দশায় কেউ তাঁকে বোঝার সামান্য চেষ্টাও করেন নি। বরং তাঁকে সবাই দূরে সরিয়ে রেখেছিল।

ঋত্বিকের ‘অযান্ত্রিক’ (মূল গল্প সুবোধ ঘোষের) চলচিত্রের ইতিহাসে ছিল ভূকম্পন। এক জড় বস্তু ‘জগদ্দল’-এর মধ্যে প্রাণ আরোপণের চেষ্টা তথাকথিত উন্নত-অনুন্নত, সুন্দর-অসুন্দরের ধারণাকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। ‘জগদ্দল’-এর মধ্যে প্রাণ আরোপের চেষ্টা কী শুধু বিমলের? তাঁর নয়? এই দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে প্রাণপণ লড়াই করে যান। ঋত্বিকের চোখেও যেন ‘জগদ্দল’ হয়ে ওঠে জীবন্ত প্রতিমূর্তি। বিমলদের মত অনেকেরই সমগ্র অস্তিত্ব জড়িয়ে যায় একটি গাড়ির সঙ্গে। সময় থেমে থাকে না। গাড়িটিরও বয়স বাড়ে। সে আর চলতে পারে না। হাপিয়ে ওঠে। অনেক অর্থ খরচ করেও আর ঠিক হয় না। বৃদ্ধ ‘জগদ্দল’কে সোহাগ করেও হয় না। একদিন ক্ষেপে গিয়ে বলে, ‘আদর বোঝো না... চল নইলে মারব লাত্থি।’ ‘জগদ্দল’ হয়ত বিমলের যন্ত্রণা বোঝে। নির্জন পাহাড়ের পথে অন্তিম চেষ্টা সে-ও করেছিল। কিন্তু শরীর ছেড়ে দেয়। সে থেমে যায় চিরকালের জন্য। কাঁদতে কাঁদতে ‘লোহার বাচ্চা’...বলে বিমল এক ঘুষিতে ‘জগদ্দল’-এর উইন্ড স্ক্রিন ভেঙে ফেলে। এ সব কিছুই রূপক। অতঃপর ভাঙ্গারির কাছে দু টাকা মন দরে জগদ্দল বিক্রি হয়ে যায়। ‘জগদ্দল’-এর মৃত শরীরের অংশ নিয়ে গোরুর গাড়ি চলে যায় অনন্তের পথে। পড়ে থাকে শুধুমাত্র ভাঙা হর্ন। আর তা এক শিশুর হাতে দেখে ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়া বিমলের মুখে নিশ্চিন্তির হাসি ফোটে। এভাবেই পুনরুজ্জীবন হয় অথবা যন্ত্রের রূপান্তর। এই গভীর মনস্তাত্ত্বিক গল্পকে সেলুলয়েডে আঁকার দুঃসাহস একমাত্র তিনিই দেখাতে পারেন। সত্যজিৎ রায় প্রথম শো দেখে তাই বলেন, ঋত্বিক যে জাত শিল্পী তা প্রমাণিত। বিশেষ করে এ রকম বিষয় নির্বাচন এক দুঃসাহসিক পদক্ষেপ। 

‘পার্টিশন ফিল্ম’ ও ‘রিফিউজি ফিল্ম’- সারা বিশ্বে বহুল চর্চিত। বিংশ শতকের দুটো ভয়াবহ বিশ্বযুদ্ধের কারণে অজস্র মানুষ দেশান্তরিত হয়। ভিটে মাটি থেকে উচ্ছেদ হয় চিরতরে। বহু নারী ধর্ষিতা ও খুন হয়। স্বজনহারা  ট্রমাচ্ছন্ন জীবনের সেই করুণ আখ্যান সাহিত্য ও চলচিত্রে বারংবার প্রতিফলিত হয়েছে। চ্যাপলিনের ‘ইমিগ্রান্ট’, রেনোয়ার ‘টনি’, জর্জ স্টিফেনের ‘আই রিমেম্বার সামা’- শরণার্থীদের নিয়ে এ রকম একাধিক চলচিত্র ঋত্বিকের বহু আগেই নির্মিত হয়েছে। এ সব সৃষ্টি অসহায়দের হাহাকারকে চিত্রায়িত করে। দেশভাগের বাংলাও এর ব্যতিক্রম নয়। রিফিউজি, ট্রাকে করে অনিশ্চিত পথে যাত্রা, ডোল, কলোনি, শিয়ালদহ স্টেশন, কুপার্স ক্যাম্পের মত নরক যাপন- এ সবের মধ্যেই ফুটে ওঠে দেশান্তরের কঠোর বাস্তবতা। উদ্বাসনের ধারাবাহিকতার মধ্যেই নিমাই ঘোষ ‘ছিন্নমূল’-এ (১৯৫০) যে সাহস দেখিয়েছিলেন, তা পরবর্তীতে ঋত্বিকের হাতে পরিণতি লাভ করে। এ দেশে দেশভাগ যন্ত্রণার প্রকৃত কথক হয়ে ওঠেন ঋত্বিক। তাঁর ‘মেঘে ঢাকা তারা’ (১৯৬০), ‘কোমল গান্ধার’ (১৯৬১) ‘সুবর্ণরেখা’ (১৯৬২),- এই ট্রিলজি ভারতীয় চলচিত্রের অভিমুখ পাল্টে দেয়। খণ্ডিত দেশ, খণ্ডিত যাপিত  জীবনেও দেশভাগের বাস্তবতার প্রবেশ ঘটে। বাংলায় এই ট্রিলজি নির্মিত না হলে, পাঞ্জাব কেন্দ্রিক ট্র্যাজেডির আখ্যান কতটা সেলুলয়েড বন্দী হত তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। ঋত্বিকের আগে দেশভাগের ট্রাজিডি নিয়ে এমন কোন চলচিত্র নির্মিত হয় নি, যা তাঁকে অতিক্রম করে। এমনকি তাঁর উত্তরকালেও এই নিয়ে অজস্র চলচিত্র ওই ট্রিলজিকে ছুঁতেও পারে নি। হিন্দিতে এখনও ‘পার্টিশন ফিল্ম’ নির্মিতির ধারা অব্যাহত। দেশভাগের পর হিন্দিতে ‘লাহোর’(১৯৪৯), ‘নাস্তিক’ (১৯৫৪), ‘ছালিয়া’ (১৯৬০) নির্মিত হলেও, সে গুলি দাগ কাটে নি। বিখ্যাত পরিচালক যশ চোপড়া লাহোর থেকে উদ্বাস্তু হয়ে এসে ‘ধরমপুত্র’ (১৯৬১) করলেও, তা জনপ্রিয় হয় নি। পরবর্তীতে ‘তমস’ (১৯৮৮), ‘মাম্মো’ (১৯৯৪), ‘ট্রেন টু পাকিস্তান’ (১৯৯৮), ‘পার্টিশন’ (২০০৭) ‘টোবা টেক সিং’(২০১৮) সহ আরও বেশ কিছু চলচিত্র দর্শক মনে কিছুটা রেখাপাত করে। ঋত্বিক অনুসারী হয়েই দেশভাগ নিয়ে আরও অনেক চলচিত্র নির্মিত হবে। এই ক্ষত চিহ্ন যে সহজে মুছে  যাবে না!

সারা বিশ্বে ‘পার্টিশন ফিল্ম’ ও ‘রিফিউজি ফিল্ম’- এর ঘরানায় ঋত্বিক নতুন ডিসকোর্সের জন্ম দেন। তাঁর ‘পোস্ট পার্টিশন ট্রিলজি’ যেন সর্ব অর্থেই আত্ম খননের দলিল। সেই মহাআখ্যানে প্রতিটি নারীর ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়া জীবনের কথা বলা হয়। কতজন নিখোঁজ হয়ে যায় চিরতরে! কতজন খুন হয়! আর কত ধর্ষিতার ঠিকানা হয় হোমে- এসবের হিসেব কেউ রাখে নি। আর যারা বেঁচে ছিল তারাও কোনদিন আর মাথা তুলে দাড়াতে পারে নি। নিজেদের সমস্ত সখ আহ্লাদ চিরতরে বিসর্জন দিয়ে আজীবন সংসারের ঘানি টেনে যেতে হয়। ধারার বেড়া দিয়ে ঘেরা প্রায় আলো বিহীন কলোনির এক ঘরে আটকে যায় অসংখ্য নীতাদের ভবিষৎ। সংসারের জন্য উদয়স্ত খেটে যাওয়া, নিজের ছেঁড়া জুতো না পাল্টিয়ে ভাইয়ের দাবি পূরণ করা নীতারা এভাবেই একদিন হারিয়ে যায়। নতুন দেশের কলোনিতে আশ্রিত অসহায় বৃদ্ধ বাবা অনুশোচনায় বলে ওঠে, “সেকালে মাইনষে গঙ্গা যাত্রীর গলায় ঝুলাইয়া দিত মাইয়া, তারা ছিল বর্বর। আর একালে আমরা শিক্ষিত, সিভিলাইজড। তাই লিখাপড়া শিখাইয়া মাইয়ারে নিংড়াইয়া, ডইল্যা, পিশ্যা, মুইছা ফেলি তার ভবিষ্যৎ। ডিফারেন্সটা এই।” ইয়ুঙের আর্কিটাইপাল আদিমাতার রূপকল্প হয়ে ওঠে ঋত্বিকীয়  আঙ্গিক। তাই  মাতৃরূপী নীতারাই হয়ে ওঠে চলচিত্রের ভাষ্য। এরাই যে সমাজকে বেঁধে রাখে। সমস্ত ভাঙন রোধ করে। জীবনের এই বন্ধন ও বাস্তবতাকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা দিতে চায় না। সমাজের সঙ্কীর্ণ মননকে বারংবার হ্যামার করেছেন। তিনি দেখালেন, দেশভাগ কত অসংখ্য নারীর জীবন ছিন্নভিন্ন করেছে! তবু তারা উঠে দাড়ায়। লৌহ কঠিন বাস্তবতার মধ্যে গেয়ে ওঠে ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙল ঝড়ে...’। অবিরাম লড়াইয়ের পর যবনিকা পড়ে  শিলংয়ের নির্জন স্যানিট্রিয়মে। যক্ষ্মা রোগাক্রান্ত নীতার পাহাড় ভেদী আর্ত চিৎকার “আমি কিন্তু দাদা বাঁচতে চেয়েছিলাম... তুমি একবার বলো আমি বাঁচবো... দাদা, আমি বাঁচবো...”; হয়ত কিছুটা অন্যভাবে অনুসুয়া বলে “দাদা আমি ভৃগুকে ছাড়া বাঁচবো না...”, অথবা সীতার বঁটি হাতে আত্মহত্যার দৃশ্য– এ সবই যেন কোথাও এক সুত্রে বাঁধা হয়ে যায়। আর আঁকা হয় অসহায়দের আর্ত স্বর থেকে চরম পরিণতির দিকে অনিবার্য যাত্রার করুণ ক্যানভাস। ঋত্বিকের সৃষ্টিতে এভাবেই তাঁর ভেতরের সমস্ত যন্ত্রণা, কান্না ফুটে ওঠে।

ঋত্বিক নামক প্রকাণ্ড এক ভিসুভিয়াসের ভেতরে জমে থাকা কান্না, ক্রোধের লাভা প্রায়শই উদ্‌গিরণ হত। দেশভাগের কারিগরদের তিনি ঘৃণা করতেন। আঙ্গুল দিয়ে দেখাতে চাইলেন শুধু শুধু ‘হিন্দু’ ও ‘মুসলমান’ করার পরিণতি কত ভয়ংকর! এদের জন্যই সংকীর্ণ, যান্ত্রিক, মানবিকতাহীন রাজনীতির লাস বয়ে নিয়ে যেতে হয়েছে বছরের পর বছর ধরে। ধর্ষিতা, অভিভাবকহীন ভদ্র বাড়ির কত মেয়েদের ঠাই হয়েছিল গণিকালয়ে। দুর্ঘটনায় অভিরামের মৃত্যু হলে সীতার জীবনেও নেমে আসে চরম বিপর্যয়। শিশুপুত্রের মুখে অন্ন তুলে দিতে তাকেও  নামতে হয় দেহ ব্যবসায়। সেই কানাগলির কুঠুরিতে বোনের সম্মুখে ভাই ঈশ্বরের উপস্থিতি- এক নির্মম বাস্তবতা। বারবনিতা সীতা এই লজ্জা ও যন্ত্রণার হাত থেকে মুক্তি দিতে আত্মহননের পথ বেছে নেয়। এভাবেই করুণ বিষাদের ছবি এঁকে চলেন ঋত্বিক তাঁর সৃষ্টিতে। ‘নবজীবন কলোনি’ হয়ে ওঠে দেশভাগ বাস্তবতার প্রতীক।  জরাজীর্ণ বাংলায় মানুষ কতবার কতরকম ভাবে যে উদ্বাস্তু হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই! সীতার আত্মহননের পর তার শিশুকে নিয়ে ঈশ্বর সুবর্ণরেখার তীর ধরে পুনরায় অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে হাঁটতে শুরু করে। এও তো উদ্বাসন! অনন্তের পথে হেঁটে চলে অসংখ্য নীলকণ্ঠ বাগচী। আর সে বলে যায়,
সব পুড়ছে। ব্রহ্মাণ্ড পুড়ছে। আমি পুড়ছি।  মানিক বাবুর মদন তাঁতির কথা মনে আছে তোমার? ওই যে বলেছিল, যে ভুবন মহাজনের টাকায় সুতো কিনে আমি তাঁত চালাবো? তোদের সঙ্গে বেইমানি করব? তাঁত না চালিয়ে পায়ের গাঁটে বাত ধরে গেছে তাই খালি তাঁত চালালুম একটু। একটা কিছু করতে হবে তো? একটা কিছু করতে হবে তো...
নবারুণ ভট্টাচার্যের কাছে এ হল বোধিলাভ। ঋত্বিক ‘বুদ্ধ’ হলেন।

নীলকন্ঠ বাগচীর অন্তিম সংলাপ হয়ে ওঠে ঋত্বিকীয় এপিটাফ। এরপরেও থেকে যায় অনেক অমীমাংসিত প্রশ্ন। এই জীবন ব্যর্থতার দায় কার? বুকে চেপে রাখা সেই গভীরতর যন্ত্রণা কে লাঘব করে? কার কাছে গেলে সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়? শেষপর্যন্ত কী আদিমাতার আশ্রয়ই অনিবার্য? চুরমার হয়ে যাওয়া তাঁর সমগ্র অস্তিত্বটাই যেন কেঁদে উঠে গায়, ‘কেন চেয়ে আছো গো মা, মুখপানে...’

…এবং তিনি ‘ঋত্বিক’
▮ রাজর্ষি বিশ্বাস

মন্তব্য

অনুবাদ আত্মজীবনী আর্ট-গ্যালারী আলোকচিত্র ই-বুক ইচক দুয়েন্দে ইশতেহার উৎপলকুমার বসু উপন্যাস ঋত্বিক-ঘটক কবিতা কবিতায় কুড়িগ্রাম কর্মকাণ্ড কার্ল মার্ক্স গল্প গিন্সবার্গ চার্লস বুকাওস্কি ছড়া জার্নাল জীবনী দশকথা দিনলিপি পাণ্ডুলিপি পুনঃপ্রকাশ পোয়েটিক ফিকশন প্রতিবাদ প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা প্রবন্ধ প্রিন্ট সংখ্যা বই বর্ষা সংখ্যা বসন্ত বিক্রয়বিভাগ বিবিধ বিবৃতি বিশেষ বুলেটিন বৈশাখ ভাষা-সিরিজ ভিডিও মাসুমুল আলম মুক্তগদ্য মে দিবস যুগপূর্তি রিভিউ লকডাউন শম্ভু রক্ষিত শাহেদ শাফায়েত শিশুতোষ সন্দীপ দত্ত সম্পাদকীয় সাক্ষাৎকার সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ সৈয়দ সাখাওয়াৎ স্মৃতিকথা হেমন্ত
নাম

অনুবাদ,73,আত্মজীবনী,27,আর্ট-গ্যালারী,2,আলোকচিত্র,1,ই-বুক,7,ইচক দুয়েন্দে,23,ইশতেহার,2,উৎপলকুমার বসু,26,উপন্যাস,21,ঋত্বিক-ঘটক,17,কবিতা,357,কবিতায় কুড়িগ্রাম,7,কর্মকাণ্ড,18,কার্ল মার্ক্স,1,গল্প,92,গিন্সবার্গ,5,চার্লস বুকাওস্কি,40,ছড়া,1,জার্নাল,12,জীবনী,7,দশকথা,25,দিনলিপি,1,পাণ্ডুলিপি,11,পুনঃপ্রকাশ,26,পোয়েটিক ফিকশন,1,প্রতিবাদ,1,প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা,4,প্রবন্ধ,217,প্রিন্ট সংখ্যা,5,বই,5,বর্ষা সংখ্যা,1,বসন্ত,15,বিক্রয়বিভাগ,21,বিবিধ,3,বিবৃতি,1,বিশেষ,26,বুলেটিন,4,বৈশাখ,1,ভাষা-সিরিজ,5,ভিডিও,1,মাসুমুল আলম,35,মুক্তগদ্য,47,মে দিবস,1,যুগপূর্তি,6,রিভিউ,5,লকডাউন,2,শম্ভু রক্ষিত,2,শাহেদ শাফায়েত,25,শিশুতোষ,1,সন্দীপ দত্ত,14,সম্পাদকীয়,20,সাক্ষাৎকার,27,সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ,18,সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ,55,সৈয়দ সাখাওয়াৎ,33,স্মৃতিকথা,15,হেমন্ত,1,
ltr
item
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন: …এবং তিনি ‘ঋত্বিক’ • রাজর্ষি বিশ্বাস
…এবং তিনি ‘ঋত্বিক’ • রাজর্ষি বিশ্বাস
ঋত্বিক ঘটকের জীবন, চলচ্চিত্র দর্শন, দেশভাগের যন্ত্রণা, উদ্বাস্তু সংকট ও বাংলা সিনেমায় তাঁর বিপ্লবী অবদান নিয়ে আলোচনা।
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEirCZhzNYIdENRHTL_iGH37lUw0kVUaB62kdMrlxjXuJpqzO7CskL-_pjvune5E6WgYQX0ULtnqTnX06vHOkCPL0IHeAFM5RW6WUZUJ5s1H37fB0FTlD1MYVGLUTjRXbZKHOPzKyRq10KY3YSBwv-qYIyQuPjzB7pozO191HfeqDc1hRbhDCNQYIqOW4qc/s1600/%E0%A6%9C%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%AE%E0%A6%B6%E0%A6%A4%E0%A6%AC%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A7%87%20%E0%A6%8B%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%95%20%E0%A6%98%E0%A6%9F%E0%A6%95%20%E2%80%A2%20%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%9C%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A6%BF%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%B6%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%B8%20%E2%80%A2%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%81.png
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEirCZhzNYIdENRHTL_iGH37lUw0kVUaB62kdMrlxjXuJpqzO7CskL-_pjvune5E6WgYQX0ULtnqTnX06vHOkCPL0IHeAFM5RW6WUZUJ5s1H37fB0FTlD1MYVGLUTjRXbZKHOPzKyRq10KY3YSBwv-qYIyQuPjzB7pozO191HfeqDc1hRbhDCNQYIqOW4qc/s72-c/%E0%A6%9C%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%AE%E0%A6%B6%E0%A6%A4%E0%A6%AC%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A7%87%20%E0%A6%8B%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%95%20%E0%A6%98%E0%A6%9F%E0%A6%95%20%E2%80%A2%20%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%9C%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A6%BF%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%B6%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%B8%20%E2%80%A2%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%81.png
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন
https://www.bindumag.com/2026/11/and-he-is-ritwik-rajorshi-biswas.html
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/2026/11/and-he-is-ritwik-rajorshi-biswas.html
true
121332834233322352
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts আরো Readmore উত্তর Cancel reply মুছুন By নী PAGES POSTS আরো এই লেখাগুলিও পড়ুন... বিষয় ARCHIVE SEARCH সব লেখা কোন রচনায় খুঁজে পাওয়া গেল না নীড় Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share to a social network STEP 2: Click the link on your social network Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy