ধরা যাক, আপনি কোনো এক পুরোনো, অন্ধকার সিনেমা হলে বসে সিনেমা দেখছেন। পর্দায় আলো-ছায়ার খেলা চলছে। হঠাৎ যদি বলা হয়, চোখটা একটু বন্ধ করুন তো! হ্যাঁ, একদম বন্ধ। এবার শুধু কান পাতুন। কী শুনতে পাচ্ছেন? সাধারণ কোনো সিনেমা হলে চোখ বন্ধ করলে আপনি হয়তো শুধু কিছু সংলাপ বা মিউজিক শুনবেন। এটাই স্বাভাবিক; কিন্তু সিনেমাটা যদি হয় ঋত্বিক ঘটকের, তবে চোখ বন্ধ করা মাত্রই আপনি এক অদ্ভুত জাদুর জগতে ছিটকে পড়বেন। দেখবেন, আপনার চোখের সামনে কোনো দৃশ্য নেই, কিন্তু একটা আস্ত দেশভাগ, একটা নদীর কান্না, আর হাজার হাজার ছিন্নমূল মানুষের দীর্ঘশ্বাস আপনার কানের ভেতর দিয়ে সোজা মগজে ঢুকে যাচ্ছে। ঋত্বিক ঘটক—যিনি শুধু ফিতাবন্দি ছবি বানাতেন না, তিনি শব্দের তুলি দিয়ে মানুষের মনের ভেতর একটা আস্ত মানচিত্র এঁকে দিতেন। বইয়ের ভাষায় একে পণ্ডিতরা বলে ‘শব্দের সাইকোজ্যোগ্রাফি’ বা মনস্তাত্ত্বিক ভূগোল। কিন্তু আমরা সহজ ভাষায় বলতে পারি—শব্দ দিয়ে তৈরি এক মায়াবী দুনিয়া, যেখানে কাঁটাতারের কোনো দাম নেই। ফরাসি দার্শনিক গি দ্যুবার (Guy Debord) ‘সাইকোজ্যোগ্রাফি’ (Psychogeography) তত্ত্বের মাধ্যমে স্থান বা ভূগোলের সাথে মানুষের আবেগের যে মানচিত্র তৈরি করেছিলেন, ঋত্বিক ঘটক তাকে অনুবাদ করেছেন শব্দের ভাষায়। তাঁর সিনেমায় শব্দ কেবল দৃশ্যের দাসত্ব করে না, বরং দৃশ্যকে অস্বীকার করে, দৃশ্যের সীমানা ভেঙে এক সমান্তরাল মনস্তাত্ত্বিক জগত বা ‘রিফিউজি ক্যাম্প’ তৈরি করে। ঋত্বিক ঘটক বলতেন, “আমি তো ফিল্মমেকার নই। চলচ্চিত্র আমার কাছে কোনো মাধ্যম নয়, বরং আমার ক্ষোভ প্রকাশের হাতিয়ার।” এই ক্ষোভ কেবল ভিজ্যুয়াল ফ্রেমে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। সের্গেই আইজেনস্টাইন এবং পুদভকিন ১৯২৮ সালে তাঁদের ‘স্টেটমেন্ট অন সাউন্ড’-এ শব্দের যে ‘কন্ট্রাপান্টাল’ (Contrapuntal) বা দ্বান্দ্বিক ব্যবহারের কথা বলেছিলেন, ঋত্বিক তাকে ভারতীয় মহাকাব্যিক ঐতিহ্য এবং দেশভাগের ট্রমার সাথে যুক্ত করেছিলেন। তাঁর কাছে শব্দ মানে কেবল সিঙ্কোনাইজড ডায়ালগ বা আবহসংগীত নয়; শব্দ হলো একটি স্বাধীন সত্তা, যা স্থান ও কালের প্রচলিত ব্যাকরণকে ধ্বংস করে দেয়। ঋত্বিকের নিজের ভাষায়, “শব্দ কখনো দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি করবে না, শব্দ দৃশ্যের সাথে দ্বন্দ্ব তৈরি করবে, তবেই নতুন কোনো অর্থের জন্ম হবে।”
‘মেঘে ঢাকা তারা’র নীতা নামের সেই মেয়েটির কথা নিশ্চয় মনে আছে? যে মেয়েটি নিজের জীবনের সবটুকু শুষে দিয়ে পরিবারকে বাঁচিয়েছিল? সিনেমার একটা দৃশ্যে নীতার বুক যখন কষ্টে ফেটে যাচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ কোথা থেকে যেন একটা সপাৎ করে চাবুক আছড়ে পড়ার শব্দ শোনা যায়! আপনি চোখ বড় বড় করে পর্দায় খুঁজবেন—কই, কেউ তো কাউকে চাবুক মারছে না! তাহলে শব্দটা এল কোথা থেকে? আসলে ওই চাবুকটা কোনো জলজ্যান্ত মানুষের হাতের চাবুক নয়। ওটা হলো ইতিহাসের চাবুক। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় যে চাবুকটা একটা আস্ত দেশের পিঠে আছড়ে পড়েছিল, ঋত্বিক সেই অদৃশ্য চাবুকের শব্দটা শুনিয়ে দিলেন নীতার যন্ত্রণার মুহূর্তে। একটা সাধারণ পারিবারিক কষ্টের গল্প ওই একটা শব্দে যেন লাখো রিফিউজি মানুষের আর্তনাদে বদলে গেল। রান্নাঘরে ভাতের হাঁড়িতে ফেনা ওঠার টগবগে শব্দটা তখন আর শুধু ভাতের শব্দ থাকে না, মনে হয় যেন নীতার বুকের ভেতরকার রাগ আর কষ্টগুলো ফুটছে। তাঁর অন্য আরেকটা সিনেমার ‘কোমল গান্ধার’। ভৃগু নামের এক যুবক নদীর এপাড়ে দাঁড়িয়ে দূরবীন দিয়ে ওপার বাংলার দিকে তাকিয়ে আছে। পর্দায় দেখা যাচ্ছে কেবল ধূসর আকাশ আর বিশাল জলরাশি। কিন্তু জাদুকর ঋত্বিক ঘটক এখানে কী করলেন জানেন? তিনি হঠাৎ অডিও ট্র্যাকে চালিয়ে দিলেন ওপার বাংলার একটা বিয়ের গান— “বিয়া দিলা বুড়ো বয়সে রে...”। ভেবে দেখুন তো কাণ্ডটা! ক্যামেরা ওপার বাংলাকে ধরতে পারছে না, মাঝখানে নিষ্ঠুর বর্ডার। কিন্তু শব্দ? শব্দের তো কোনো পাসপোর্ট-ভিসা লাগে না! শব্দ ঠিক নদী পেরিয়ে এপারে চলে এল। মুহূর্তের জন্য নদীর দুই পাড় যেন এক হয়ে গেল। যারা ওপার বাংলা ছেড়ে এপারে এসে ধুঁকছে, ওই একটা গানে তাদের মনের ভেতর তৈরি হয়ে গেল ফেলে আসা দেশের একটা আস্ত উঠোন। কিন্তু ঋত্বিক তো জানেন বাস্তবটা কতটা রূঢ়! তাই দর্শক যখন ওই সুরে ভাসছে, হঠাৎ এক বিকট ধাতব শব্দে সব ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। কীসের শব্দ? দুটো ট্রেনের বাফার বা বগির জোড়ায় জোড়ায় সজোরে ধাক্কা লাগার শব্দ। যেন একটা দেশ দু-টুকরো হয়ে ছিটকে যাওয়ার যন্ত্রণার আওয়াজ। অন্যদিকে ‘সুবর্ণরেখা’ সিনেমার একটা দৃশ্যের কথা ভাবুন। পরিত্যক্ত একটা রানওয়েতে ছোট্ট সীতা আর অভিরাম আপন মনে খেলছে। হঠাৎ শোনা গেল আকাশ কাঁপিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বোমারু বিমান উড়ে যাওয়ার গোঙানি। আকাশে কিন্তু কোনো বিমান নেই! ঋত্বিক শুধু ওই শব্দটা দিয়ে বোঝাতে চাইলেন, এই পৃথিবীর কোথাও আর কোনো শান্তি নেই, যুদ্ধের ছায়া সব জায়গায়। আবার ওই একই সিনেমায় দেখবেন কারখানার বিকট সাইরেনের শব্দ। গ্রাম-বাংলা ছেড়ে আসা উদ্বাস্তু মানুষগুলোর কাছে কারখানার এই সাইরেন যেন এক নিষ্ঠুর রাক্ষসের ডাক। ওটা বারবার মনে করিয়ে দেয়— তোমরা এখন শেকড়হীন, তোমরা এই কংক্রিটের জঙ্গলে স্রেফ মেশিনের কাঁচামাল।
‘তিতাস একটি নদীর নাম’ (১৯৭৩) চলচ্চিত্রে নদীর শুকিয়ে যাওয়ার শব্দ, বা ‘অযান্ত্রিক’ (১৯৫৮)-এ জগদ্দল গাড়ির মানবিক গোঙানি প্রমাণ করে ঋত্বিকের কাছে জড়বস্তু বা নিসর্গও শব্দের মাধ্যমে রক্তমাংসের চরিত্র হয়ে ওঠে। আধুনিক ইকো-ক্রিটিসিজম (Eco-criticism) বা অ্যাকোস্টিক ইকোলজির (Acoustic Ecology) আলোকে বিচার করলে দেখা যায়, প্রকৃতির কান্নাকে ঋত্বিক কতটা নিখুঁতভাবে শব্দের স্পেকট্রামে গেঁথেছিলেন।
এই যে ঋত্বিক ঘটকের শব্দের জাদুগিরি, এটা নিয়ে সিনেমা-পাগল মানুষ আর গবেষকদের বিস্ময়ের শেষ নেই। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার মাস্টারমশাই, প্রখ্যাত চলচ্চিত্র তাত্ত্বিক অধ্যাপক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের মতো মানুষরা যখন ঋত্বিককে নিয়ে গল্প করেন, তখন তাঁরা বলেন দারুণ এক কথা। সঞ্জয়বাবুর মতে, “ঋত্বিক ঘটক আসলে তাঁর ছবিতে শব্দের ভেতর দিয়ে এক অবিভক্ত বাংলার ভূত বা প্রেতাত্মাকে ডেকে এনেছেন। তাঁর ছবিতে শব্দ কেবল অনুষঙ্গ নয়, শব্দ এক অখণ্ড স্মৃতির প্রত্নতাত্ত্বিক খনন।” অসংখ্য বক্তৃতায় সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় আরও তীক্ষ্ণভাবে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, “ঋত্বিকের কাছে দেশভাগ কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা ছিল না, তা ছিল একটি মহাকাব্যিক স্খলন বা এপিক ট্র্যাজেডি। তাই তাঁর সিনেমায় যখন কোনো লোকজ সুর বাজে বা কোনো রবীন্দ্রসংগীতের কলি ভেসে আসে, তা নিছক নস্টালজিয়া নয়; তা হলো ছিন্নমূল মানুষের শেকড় খোঁজার মরিয়া আর্তনাদ। ‘মেঘে ঢাকা তারা’-য় নীতা যখন পাহাড়ে পাহাড়ে চিৎকার করে বলে, ‘দাদা, আমি বাঁচতে চাই’ যখন পাহাড়ে পাহাড়ে ইকো বা প্রতিধ্বনিত হয়, তখন তা কেবল এক ব্যক্তির বাঁচার আকুতি থাকে না, তা হয়ে ওঠে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত শোষিত, প্রান্তিক ও উদ্বাস্তু মানুষের সমবেত চিৎকার।”
আধুনিক তাত্ত্বিকরা, যেমন ফরাসি স্কলার রেমন্ড বেলুর (Raymond Bellour) বা যাদবপুরের শিক্ষক মৈনাক বিশ্বাস, ঋত্বিকের মেলোড্রামা এবং শব্দের ব্যবহারকে ইউরোপীয় ঘরানার রিয়েলিজমের বাইরে এক নিজস্ব 'এপিক ফর্ম' হিসেবে দেখেছেন। জ্যাক দেরিদার 'হন্টোলজি' (Hauntology) বা প্রেততত্ত্বের ধারণা আধুনিক গবেষকরা ঋত্বিকের শব্দের ওপর প্রয়োগ করেন। অতীত যা মরে গেছে, কিন্তু যায় নি—সেই অখণ্ড বাংলার ভূত (Ghost of Undivided Bengal) ঋত্বিকের অডিও ট্র্যাকে সবসময় তাড়া করে ফেরে। একুশ শতকের আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ঋত্বিকের এই শব্দের সাইকোজ্যোগ্রাফি নতুন মাত্রায় প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। বর্তমান সময়ে গ্লোবালাইজেশন এবং ডিজিটাল ক্যাপিটালিজমের যুগে মানুষ যখন ক্রমশ কর্পোরেট কাঠামোর অদৃশ্য শোষণের শিকার হয়ে শেকড়হীন বা ডিজিটাল রিফিউজিতে পরিণত হচ্ছে, তখন ঋত্বিকের যান্ত্রিক শব্দ ও সাইরেনগুলো যেন নতুন প্রজন্মের অ্যালিয়েনেশন বা বিচ্ছিন্নতাবোধেরই প্রতিনিধিত্ব করে। আধুনিক পোস্ট-কলোনিয়াল ট্রমা স্টাডিজ এবং স্পেস থিওরিতে (Space Theory) ঋত্বিক ঘটককে এখন অন্যতম প্রধান পাঠ্য হিসেবে ধরা হয়। কারণ, তিনি দেখিয়েছিলেন যে, কাঁটাতার দিয়ে মানুষের ভৌগোলিক হাঁটাচলা আটকে দেওয়া গেলেও, তার শ্রুতি-স্মৃতি কখনো ভিটেমাটি ছাড়ে না।
অন্যদিকে ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’ (১৯৭৪) চলচ্চিত্রে নকশাল বাড়ি আন্দোলনের পটভূমিতে আমরা যে শব্দের কোলাহল বা ক্যাকোফনি শুনি, তা একটি বিভ্রান্ত ও দিকভ্রান্ত জাতির শ্রুতি-দলিল। সেখানে মাতাল নীলকণ্ঠ বাগচীর প্রলাপ, পুলিশের সাইরেন আর গুলির শব্দ মিলেমিশে যে বিভীষিকাময় অডিও-ল্যান্ডস্কেপ তৈরি হয়, তা সমকালীন রাষ্ট্রযন্ত্রের এক নগ্ন রূপ। আসলে কী জানেন, আজকের দিনেও আমরা সবাই কিন্তু এক একজন রিফিউজি বা উদ্বাস্তু। আগে মানুষ ভিটেমাটি হারাতো, আর এখন আমরা এই ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া আর কর্পোরেট দুনিয়ার ভিড়ে নিজেদের আসল শেকড়টা হারিয়ে ফেলছি। সারাদিন ল্যাপটপ আর মোবাইলের স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমরা যেন ডিজিটাল দুনিয়ার রিফিউজি হয়ে গেছি। ঋত্বিকের সেই কারখানার কর্কশ সাইরেনগুলো আজ আমাদের জীবনে অ্যালার্ম ক্লক বা অফিসের ডেডলাইনের রূপ নিয়েছে। গল্পের শেষে এসে একটা কথাই মনে হয়—মানুষটাকে সবাই ‘পাগল’ বলত। কিন্তু এই পাগল মানুষটা জানতেন, সেলুলয়েডের ফিতা একদিন নষ্ট হয়ে যেতে পারে, ছবি ঝাপসা হয়ে যেতে পারে। কিন্তু মানুষের বুকের খুব গভীরে যদি একটা শব্দ একবার গেঁথে দেওয়া যায়, তবে তা আর কোনোদিন মরে না। তাই তো আজও, চোখ বন্ধ করলেই আমরা শুনতে পাই সেই চাবুকের শব্দ, ট্রেনের বগির সেই ধাক্কা, আর পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে মরা সেই একটা অবিনশ্বর আর্তনাদ— “দাদা, আমি বাঁচতে চাই!” ঋত্বিক ঘটক কোনোদিন আমাদের মন থেকে বিদায় নেবেন না, কারণ তিনি আমাদের মনের ভেতর এমন একটা ‘শব্দের রিফিউজি ক্যাম্প’ বানিয়ে দিয়ে গেছেন, যেখান থেকে আমাদের আর কোনোদিন বের হওয়ার উপায় নেই।
লেখক: শিক্ষক ও গবেষক
ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্রে শ্রুতির সাইকোজ্যোগ্রাফি ও ফ্যান্টম লিম্ব
▮ নুরুল ইসলাম বাবুল
▮ নুরুল ইসলাম বাবুল




অসাধারণ বিশ্লেষণ! ঋত্বিক ঘটকের সিনেমাকে শব্দের ভেতর দিয়ে নতুন করে আবিষ্কার করলাম। সত্যিই, তাঁর চলচ্চিত্র শুধু দেখা যায় না, অনুভব করতে হয়, চোখ বন্ধ করেও। অসাধারণ লেখনী, গভীর শ্রদ্ধা।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। 🙏
উত্তরমুছুন