.header-button .inner > span { font-size: 18px !important; } .header-button .inner i.fa { font-size: 40px !important; } .comment-form-message { background-color: #f4f4f4 !important; font-size: 14px !important; }

ফুলের বিবাহ • আদিবা নুসরাত

ফুলের বিবাহ  আদিবা নুসরাত
‘ফুলের বিবাহ’ নামটা বঙ্কিমবাবু থেকে ধার নেয়া। কোনো এক প্রজাপতি লগ্নে এক বিবাহ বাড়িতে বসে বিবাহ দেখতে দেখতে নামটা আর কিছুতেই তাড়ানো গেল না! সাদা জামদানীর নকশাকাটা আঁচল দেখে হঠাৎ ঘোমটা দেবার জন্য মন ব্যাকুল হয়ে উঠলো। ঘোমটা দিয়ে খানিকক্ষণ বউ বউ লাজুকতায় চারিপাশ দেখলাম, তারপর কখন সেই কাপড় পড়ে গেল আর মনেই রইলো না।

বিবাহ নিয়ে সকল পুরুষ এবং রমণীকুলের মধ্য খানিক ভয় আনন্দের এক মিশেল অনুভূতি কাজ করে। প্রকৃত অর্থে সেসব অনুভূতি আমাকে সম্পূর্ণ গ্রাস করিবার পূর্বেই আমার কেবল মনে হয় যে, প্রকৃতি কোন সফট রোল প্লে করতে আমারে পাঠায় নাই এই ভুবনে। প্রকৃতির যেই পরিকল্পনার অংশবিশেষ আমি, সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষা ব্যতীত আমার আর কোন কাজ নাই আপাতত। 

তারপর কোথায় গেল সেই বিয়ে বাড়ি, মল্লিকা ফুল, ইত্যাদি ইত্যাদি। সেইদিন সন্ধ্যার কিছু আগে পরিশ্রান্ত হয়ে ঘরে ফিরেছি, ভাত খেতে খেতে সন্ধ্যা। আচমকা লোডশেডিং। আমি ঝোলে মাখানো অল্প ভাত আর পাবদা মাছ নিয়ে নাড়াচাড়া করছিলাম, অস্বচ্ছ আলো, মাঝে বিদ্যুৎ চমকালো বার কতক। তারপর কোথায় গেল সেই ভাতের প্লেট, কোথায় গেল সেই মাছ। আবিষ্টের মতো তাকায়ে আছি অতীতের দিকে। 
জীবন যা যাপন করেছি, যাপনলব্ধ সেই সময়ের গল্পই যেন ঢের আনন্দের। সেইসব স্মৃতি দিন যেন আমার নয় আমি কেবল কথকের ভূমিকায়—
জীবন তখনও নয় সেই অর্থে জটিল, তবে জটিলের দিকে ধাবমান। সবে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিচ্ছি; গায়ে লাল জামা, কালো হাতের কাজ। চুলে দুই বেণী ওই কিশোরীদের যেমন থাকে আরকি। শীতের কনকন হাওয়া এসে লাগছে নরম ফোলা গালে। হেঁটে যাচ্ছি নতুন বাধানো এক কাঁচা সড়কের মাঝ বরাবর। একটা-দু’টো সাইকেলের টুংটাং আওয়াজ বাদে আর কোন শব্দ নেই। শীতের পাতারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে চারদিক, বাদামি ধূসর বর্ণ। কি জানে জীবনানন্দ হয়তো এইসব পাতা দেখে পূর্বজন্মের ইমেজ এঁকে ফেলতো। আমার পূর্বজন্ম বলে কিছু নাই। এই জন্মই নানা ভাগে বিভক্ত, কাটাছেড়া। যেখান থেকে একবার চলে এসেছি রেখে আসতে হয়েছে সমস্তকিছু। এই প্রবল ভাঙাগড়ার বহমানতায় একটা জীবনকে নানা আঙিক থেকেই মনে হয় অনেকগুলো জন্ম। যাদের নির্ভেজাল জীবনযাত্রা তারা এইসব বুঝবে না প্রকৃত অর্থে। তবে প্রায়শই ভাবি, যদি একটা নির্দিষ্ট বৃত্তেই যদি জীবনটা চলে যেত! চলে তো যেতই হেসে খেলে কিন্তু ওই যে প্রকৃতির পরিকল্পনার বাইরে যাবার আমি কে! 

একজন বন্ধুকে চিনি, চিনি বলতে বড় হয়েছি তার সাথে। ছোটবেলার খেলার সাথী যেরকম ওই আরকি। রোগা লিকলিকে শরীর, ফর্সা। ওর সাথে আমার গলায় গলায় বন্ধুত্ব ছিল। ছোটবেলায় ওর একবার নিউমোনিয়া হয়েছিল। সেই নিউমোনিয়া ভাল হলেও শরীরে তার রেশ আজো রয়ে গেছে। সেই মেয়েটা প্রেমে পড়লো তার পাশের বাড়ির পুরুষের, তারপর বিয়ে। তারপরের উত্থান-পতনের ইতিহাস আমি আর জানি না। জানতে ইচ্ছে করে তবে নিজেকে নিয়েই দেদারসে ফুরিয়ে যায় জমিয়ে রাখা অল্পস্বল্প সময়। ভাবি ওরকম একটা যাপন হলে খারাপ কী হতো, তেল মশলার সাথে সংসারের কাঁচা টাকার হিসেব। ইচ্ছে হলেই যেকোনো লেইসফিতা ডেকে কিনে রাখলাম চুড়ি, কুমকুম, চুলের কাটা। বারান্দার পাশের গাছে জল দেয়া, নিয়ম করে। হাস্নাহেনা ফুটলে বুকের গহীনে বয়ে চলা কুলকুল নদী- ধলেশ্বরী। অথবা আরেক ছোটবেলার খেলার সাথী পেয়ারা বানু। কালো, গোলগাল শরীর। সরু বেণী বলে ভীষণ দুঃখ ছিল ওর। একদিন সলজ্জ হেসে আমাদের জানালো, ওর বিয়ে ঠিক হয়েছে। বিয়ের পর ওকে দেখেছি তা আর মনে পড়ে না। শুনেছি অনেকগুলো নদী পাড় হয়ে যেতে হয় সেইখানে। দূর্গাপুর থেকে কয়েক কিলোর পথ। ওর জীবনটা জানতে ইচ্ছে করছে হঠাৎ। এরকম আজকাল হয়, রাস্তায় হেঁটে যাওয়া লোকজনকে জিজ্ঞেস করে বলতে ইচ্ছে করে ‘কী খবর, ভালো তো?’

ও যেইখানে ছিলাম সেই কাঁচামাটির সড়ক, সাইকেলের টুংটাং শব্দ। রাস্তার দু’ধারে সারি সারি খেজুর গাছ। খানিক কুয়াশা লেগে পিচ্ছিল হয়ে আছে। আমি হাঁটছি আনমনে, বেণী নাড়িয়ে। আমার সামনে একটু দূরত্বে বাবা। নীল শার্ট কালো প্যান্ট- হেঁটে যাচ্ছে এক নিপাট ভদ্রলোক।

আজ থেকে বহুবছর পর এরকম হেঁটে যাওয়া এক পুরুষের প্রেমে পড়ব আমি, যদিও সেই ফাদারফিগারের কোন ভূমিকা নাই এই গল্পে। বলছিলাম বাবা হেঁটে যাচ্ছে তার সাথে পায়ে পায়ে আরো হেঁটে যাচ্ছে একজন যুবক। সেই ছেলেকে আমি চিনি না। শান্ত নদী লুকোচুরি খেলছে ছেলেটির চোখে। মানুষের চোখ আমি তখন পড়তে পারি কেবল ততটুকুই। 

হেঁটে হেঁটে এক প্রাচীন বাড়ির সামনে এসে আমরা দাঁড়ালাম, প্রশস্ত উঠান। ঘরের মেঝেতে শীতল পাটি, কয়েক টুকরো সুপারি, আরো কিছু জিনিস হয়তো ছিল আমার সঠিক মনে নাই। বাড়ির পেছন দিক থেকে যতদূর চোখ যায় ধানী জমি—
সেইখানে তখন শীতকালীন শস্য। আমি তাকাতেই মটরশুঁটি ফুল যেন চিকচিক করে উঠলো- স্বাতী, রেবতী নক্ষত্রের মতো। সেই বাড়ি, সেই উঠান, সেই শীতকালীন একটা দিনের কথা আমি পরিণত বয়সে এসেও ভুলি নাই তার যথার্থ কারণ রয়েছে। গল্পের এই অংশে যেটা ঘটবে তার জন্য একটা মানসিক প্রস্তুতি দিতে চাই পাঠকদের। আমি বড় হয়েছি এক রহস্যময় পরিবেশে। যাদের সাথে বড় হয়েছি তাদের কাটাছেঁড়া মনস্তাত্ত্বিক দর্শন সবেগে হামলে পড়েছে আমার উপর। নানান আরোপিত সামাজিক বিধিনিষেধ দিয়ে তার সবটুকু তাড়ানো সম্ভব নয়। শৈশবের বেভুল কোন এক সময়ে ‘অ্যান্টিসোশাল পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার’ এর সাথে সাক্ষাৎ ঘটলো। সেই মানসিক ট্রমার দিনগুলোতে মধ্যরাতে কিছু একটা ভর করতো আমার উপর। আমি হাত-পা মেলে দিয়ে কাঁদতাম, ভোররাতের দিকে কান্না থামলে ঘুমাতে যাইতাম। বাড়ির কেউ কেউ ঘুম থেকে উঠে আতংকিত গলায় জিজ্ঞেস করতো নানান প্রশ্ন। কোন কোনদিন বাবা এসে ধমক দিতো কিংবা নরম গলায় ঘুমিয়ে পড়তে বলতো, আমি ঘুমাতাম দাদা আর দাদীর মাঝখানে। ঘরের পাশ দিয়ে রাতে কুকুরের দল ছুটে যেত, একটু দূরেই বাঁশবনে শেয়াল ডাকতো হুক্কা হুয়া। সেই সাথে আমার কান্নার স্বর তীব্র এক ভৌতিক জিনিস হয়েই উপস্থাপিত হবার কথা ছিল বাড়ির সবার কাছে, কোন এক বিচিত্র কারণে সেটা আর হয় নাই। আমার মাঝরাতের কান্না সকলের স্বাভাবিক কাজকর্মের অংশবিশেষ হয়ে উঠলো। ভোররাতে ঘুম ঘুম ভেজা চোখ নিয়ে শুনতাম বড় আম্মা কোরান শরীফ পড়ছেন। সেই আওয়াজ আমার হৃদয়ে কতখানি দিত শান্তি, কতখানি দিতো ব্যথা। সেই ব্যথার উৎস সম্পর্কে আমি জানতে পারি নাই আজো! 

সেই বাড়িতে ছিল নানারকম বাগানবিলাস গাছ, সুন্দর ফুলেল পাতা আর টকটকে জবা ফুল। আমাদের জন্য রান্না করা ঝাল ঝাল মাংস আর পোলাওয়ের ঘ্রাণ তখন সমস্ত বাড়িজুড়ে। আমি আর বাবা গিয়েছিলাম মূলত ছেলে দেখতে, আমার বিয়ের জন্য। জানি এই ঘটনা এই দেশের পরিপ্রেক্ষিতে বিরল আর আমি যে অজপাড়াগাঁয়ে বড় হওয়া সেইখানে স্বপ্ন। তবুও এই কথা বলতে আর দ্বিধা নাই যে, আমি আমার বিয়ের জন্য পাত্র দেখতেই গিয়েছিলাম। আসার সময় বাবা সেই পাত্রের হাতে কিছু টাকাও দিয়ে এসেছিল। সেই অপূর্ব যুবকের সাথে আমার আর দ্বিতীয়বার দেখা হয় নাই। তাকে অপূর্ব বলছি আমাকে দেয়া সম্মানের জন্য। তারপর বহুলোকের মুখে শুনেছি তিনি সুপাত্র ছিলেন, পড়াশোনা জানা, ভদ্র, সভ্য, সজ্জন, বিশাল জমিপতি বাবার একমাত্র ছেলে। এবং বাবার বিশেষ স্নেহভাজন। মেয়ে হয়ে ছেলে দেখতে যাবার ঘটনা তারা বিনাবাক্যে মেনে নেয়। মনে পড়ে সেই পাত্রের মা আমার কপালে চুমু দিয়ে কিছু একটা বলেছিল। সেইখানে ছিল অজস্র মমতার ঘ্রাণ।

রাস্তায় এসে আমি আর বাবা আরো খানিকক্ষণ ঘুরলাম। শীতের শুকনো ধূলোয় আঁকিবুকি কাটতে কাটতে নির্ভাবনায় হেঁটে চললাম আমি- এক তুমুল প্রাণবন্ত কিশোরী। সেইসব ঘটনা মিটে যাবার পর বহুবার ভেবেছি, আমার নিয়তিতে যদি লেখা থাকতো বালিকাবধূ হবার কোন ফর্দ। যদি বেনারসি পড়ে, আমি জবুথবু বউ হয়ে কোন এক তেতালায় শুয়ে কেটে যেত আমার দিন। আমি সম্ভবত বুঝতাম না পানপাতা আর হৃদয়ের ভেতর কী তফাৎ! কেউ বারণ করেনি, কেউ জোর করেনি, কেউ বাধাও দেয়নি বালিকাবধূ হতে আমাকে। কিন্তু ওই যে প্রকৃতির পরিকল্পনা ভিন্ন। সেই ভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে আমি মাথার ভেতর হিজিবিজি কাটি- মল্লিকা ফুলের বিবাহ। 

সেই বিবাহসরে আমি স্বয়ং সরস্বতী, ব্রক্ষার বরে।

ফুলের বিবাহ 
আদিবা নুসরাত


মন্তব্য

নাম

অনুবাদ,35,আত্মজীবনী,27,আর্ট-গ্যালারী,1,আলোকচিত্র,1,ই-বুক,7,উৎপলকুমার বসু,26,ঋত্বিক-ঘটক,3,কবিতা,327,কবিতায় কুড়িগ্রাম,7,কর্মকাণ্ড,16,কার্ল মার্ক্স,1,গল্প,70,ছড়া,1,জার্নাল,4,জীবনী,6,দশকথা,25,দিনলিপি,1,পাণ্ডুলিপি,11,পুনঃপ্রকাশ,17,পোয়েটিক ফিকশন,1,প্রতিবাদ,1,প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা,4,প্রবন্ধ,163,প্রিন্ট সংখ্যা,5,বই,4,বর্ষা সংখ্যা,1,বসন্ত,15,বিক্রয়বিভাগ,21,বিবিধ,2,বিবৃতি,1,বিশেষ,24,বুলেটিন,4,বৈশাখ,1,ভাষা-সিরিজ,5,ভিডিও,1,মাসুমুল আলম,35,মুক্তগদ্য,39,মে দিবস,1,যুগপূর্তি,6,রিভিউ,5,লকডাউন,2,শম্ভু রক্ষিত,2,শাহেদ শাফায়েত,25,শিশুতোষ,1,সন্দীপ দত্ত,14,সম্পাদকীয়,18,সাক্ষাৎকার,22,সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ,18,সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ,55,সৈয়দ সাখাওয়াৎ,33,স্মৃতিকথা,14,হেমন্ত,1,
ltr
item
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন: ফুলের বিবাহ • আদিবা নুসরাত
ফুলের বিবাহ • আদিবা নুসরাত
বিবাহ নিয়ে সকল পুরুষ এবং রমণীকুলের মধ্য খানিক ভয় আনন্দের এক মিশেল অনুভূতি কাজ করে। প্রকৃত অর্থে সেসব অনুভূতি আমাকে সম্পূর্ণ গ্রাস করিবার পূর্বেই আমার
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEj6oYkWFMSRQS9XXS6l458XYgVV3Gne_YYOfK9URjjHBeD40Hgw4qQSpm_g9m9lBv3zXWkAnpnSeuJldSkK2BkM8ioPCibXYsuZ30kBJmbdRyK1nCATe-SNoX7RAxwi0C-HoiisEG66CV6xYqd67B3PnVaEWNZvppmd_7N18A9k3YI3JodiSB8qc0oGrFk/s16000/adiba-nusrat-bindu-littlemag.png
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEj6oYkWFMSRQS9XXS6l458XYgVV3Gne_YYOfK9URjjHBeD40Hgw4qQSpm_g9m9lBv3zXWkAnpnSeuJldSkK2BkM8ioPCibXYsuZ30kBJmbdRyK1nCATe-SNoX7RAxwi0C-HoiisEG66CV6xYqd67B3PnVaEWNZvppmd_7N18A9k3YI3JodiSB8qc0oGrFk/s72-c/adiba-nusrat-bindu-littlemag.png
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন
https://www.bindumag.com/2026/04/adiba-nusrat.html
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/2026/04/adiba-nusrat.html
true
121332834233322352
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts আরো Readmore উত্তর Cancel reply মুছুন By নী PAGES POSTS আরো এই লেখাগুলিও পড়ুন... বিষয় ARCHIVE SEARCH সব লেখা কোন রচনায় খুঁজে পাওয়া গেল না নীড় Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share to a social network STEP 2: Click the link on your social network Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy