.header-button .inner > span { font-size: 18px !important; } .header-button .inner i.fa { font-size: 40px !important; } .comment-form-message { background-color: #f4f4f4 !important; font-size: 14px !important; }

মোস্তাফিজ ফরায়েজীর ছোটোগল্প

মোস্তাফিজ ফরায়েজীর ছোটোগল্প
রশিদের ষোড়শ বিবাহবার্ষিকীতেই ঘটনার শুরু।

দিনটা অনেকের কাছে বিশেষ কিছু নয়, অথচ ন্যান্সির কাছে দিনটা প্রতি বছর আলাদা গুরুত্ব নিয়ে আসে। ষোলো বছর—সংসার ধর্মের হিসেবে কম সময় নয়। অনেক দম্পতির কাছে এই সময়টা ক্লান্তির, অভ্যাসের কিংবা নীরব দূরত্বের হয়ে থাকে। কিন্তু ন্যান্সি বিশ্বাস করে, এই ষোলো বছরে তারা একে অপরকে আরও বেশি করে চিনেছে।

বিবাহবার্ষিকী উপলক্ষে ন্যান্সি রাতের খাবারের টেবিল সাজিয়ে রেখেছে। টেবিলের মাঝখানে দুটি মোমবাতি জ্বালানো। আলো নিভিয়ে দিলে মোমবাতির কাঁপা আলোয় ঘরটা অন্যরকম হয়ে ওঠে। নরম, উষ্ণ, স্মৃতিভরা এক আবহের সৃষ্টি হয় ঘরময়। টেবিলের উপর সাজানো খাবার থেকে ভেসে আসা খাবারের সুগন্ধ তার নাকের মধ্যে সুড়সুড়ি দিতে থাকে। সে অপেক্ষা করে, ঘড়ির দিকে তাকায় বারবার।

তাদের ষোলো বছরের সংসারে সন্তান না হবার যে একটা গভীর, চাপা দুঃখ ছিল তা ন্যান্সির মধ্যে সঞ্চালিত হতে থাকে। তাদের নিঃসন্তান হবার বিষয়টি তারা প্রথম প্রথম উচ্চস্বরে বলত না, পরে ধীরে ধীরে নিজেরা সেটি মানিয়ে নিয়েছে। বহু ডাক্তার, কবিরাজ, ওষুধ, পরীক্ষা—সবই হয়েছে। কোনো কিছুতেই ফল মেলেনি। তারপর একসময় তারা চেষ্টা করাও ছেড়ে দেয়। নিজেদের বোঝায়—সব কিছু জোর করে পাওয়া যায় না। প্রকৃতির নিয়ম পাল্টাতে যাওয়া সবসময় সুখকর হয় না।

সন্তান না থাকলেও তাদের জীবন থেমে থাকে না। তারা ঠিক করে, বাকি দিনগুলো তারা উপভোগ করবে। ছোট ছোট আনন্দকে বড় করে দেখবে। একসঙ্গে সিনেমা দেখা, সপ্তাহান্তে হাঁটতে যাওয়া, বিবাহবার্ষিকীতে মোমবাতি জ্বালিয়ে রাতের খাবার—এসবের মধ্যেই তারা জীবনের মানে খুঁজে নিতে শিখেছিল নতুন করে। সেদিন ন্যান্সির আয়োজনটাও আনন্দ উপভোগের একটি অংশ ছিল মাত্র।

রাত দশটার একটু পর রশিদ বাসায় ফেরে।

দরজা খুলে ন্যান্সি রশিদের দিকে তাকায় হাস্যোজ্বল মুখে। তারপর তার মাথার দিকে দৃষ্টি দিতেই মুহূর্তের মধ্যে সে থমকে যায়। তার বুকের ভেতর কেমন একটা ধাক্কা লাগে। তার পাকতে থাকা সাদা চুলগুলো—যেগুলো সে নিজ হাতে বহুবার ছুঁয়েছে—সেগুলো কালো কুচকুচে হয়ে গেছে।

ন্যান্সি বিষয়টি বিশ্বাস করতে পারে না। সে প্রথমে ভাবে মোমবাতির আলোয় সম্ভবত সে চোখে ভুল দেখছে। তিন বছর হলো রশিদের চুলে পাক ধরেছে, অথচ সে কখনো তার চুলে হেয়ার কালার ব্যবহার করেনি। এই নিয়ে ন্যান্সির সাথে মজা করে সে বলত— পাকা চুলে পুরুষকে আরও অভিজ্ঞ দেখায়।

তাহলে আজ কেন?

ন্যান্সি নিশ্চিত হতে পারে না। সে নিজেকে বোঝায়—হেয়ার কালার করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কিছু রশিদ নিশ্চয় তার কাছে লুকাবে না। হয়তো আলো-ছায়ার জন্য তার ভুল হচ্ছে। তারপর চোখ আরও কাছে নিয়ে চুলগুলো পর্যবেক্ষণ করার চেষ্ট করে সে। না, তার কোনো ভুল হয়নি। সত্যিই তো চুলগুলো কালো হয়ে উঠেছে!

ন্যান্সির মনে সন্দেহ দানা বাঁধতে থাকে। নতুন কোনো নারীর সাথে রশিদের পরিচয় হয়নি তো!

দিন যায়। রাত যায়। মাস যায়। বছর যায়। ন্যান্সির সন্দেহ আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে আসে।

সময়ের সাথে সাথে ন্যান্সির শরীরে বয়সের ছাপ স্পষ্ট হতে থাকে। চোখের কোণে ভাঁজ পড়ে, চুলে পাক ধরে। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে এক অদ্ভুত বেদনা—সন্তান না থাকার হাহাকার। সময়ের এই পর্যায়ে এসে মাতৃত্বের অনুপস্থিতি তাকে আরও গভীরভাবে আঘাত করতে শুরু করে।

অন্যদিকে রশিদ সময়ের সাথে সাথে আরও যুবক হয়ে ওঠে। তার মুখে তারুণ্যের ছাপ ফেরে, শরীর হালকা হয়, বয়স কমতে থাকে। প্রথমে ন্যান্সি বিষয়টা মানতে চায় না। আয়নার সামনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বারবার রশিদ আর তার মুখ দেখে সে।

ধীরে ধীরে তাদের বয়সের পার্থক্য চোখে পড়ার মতো হয়ে ওঠে। ন্যান্সি অস্বস্তিতে ভোগে। সমাজের চোখ, প্রতিবেশীদের ফিসফাস—সবকিছু তাকে আহত করে। কারো সময়চক্র উল্টো পথে ঘুরতে পারে—এমন ধারণা কারোরই ছিল না।

কিন্তু এই দুনিয়ায় অনেক কিছুই ঘটে, যার কোনো মানে নেই, কোনো ব্যাখ্যা নেই। মানুষ এসব দেখে প্রথমে অবাক হয়, পরে নাম দেয়—অলৌকিক।

রশিদের বয়স কমতে থাকে—৪২, ৪১, ৪০…।
সংখ্যাগুলো ক্যালেন্ডারের পাতার মতো উল্টে যেতে থাকে।
একসময় তার বয়স এসে ঠেকে ১৩ বছরে।

অদ্ভুত বিষয় হলো—রশিদ তখনও ন্যান্সিকে তার স্ত্রী বলেই জানে। তার স্মৃতিতে কোনো ছেদ পড়ে না। প্রতিরাতে সে ন্যান্সিকে জড়িয়ে ঘুমায়। ন্যান্সি তখন একদিকে লজ্জা অনুভব করে, অন্যদিকে অসহায়ত্ব অনুভব করে।

এই সময়ের মাঝখানে তাদের জীবনে অর্থসংকট নেমে আসে। রশিদের বয়স কমে যাওয়ায় অফিস থেকে তাকে বরখাস্ত করা হয়। কাগজে-কলমে সে প্রাপ্তবয়স্ক হলেও তার শারীরিক গঠনের জন্য তাকে বেকার হতে হয়।

ন্যান্সি ধীরে ধীরে সবকিছু মানিয়ে নিতে শেখে। কান্না, হতাশা—সব একপাশে সরিয়ে রেখে সে কাজে নামে। সে হয়ে ওঠে একজন নারী উদ্যোক্তা। তার অধীনে কাজ করে বিশজন নারী। তারা বিভিন্ন ডিজাইনের পোশাক বানায়। ন্যান্সি সেগুলো অনলাইন মার্কেটপ্লেসে বিক্রি করে। ধীরে ধীরে তাদের অর্থনৈতিক দৈন্য কেটে যায়।

কিন্তু সমাজ তাদের ছাড়ে না।
লোকজন ফিসফিস করে, আঙুল তোলে।
তারা বলে বেড়ায়—ন্যান্সি অপয়া নারী। তার স্পর্শেই নাকি রশিদের বয়স কমে যাচ্ছে।

একঘরে হয়ে যায় তারা।

তারপর একদিন রাতে, হুট করে ঘুম ভেঙে যায় ন্যান্সির। বুকের ভেতর অজানা আশঙ্কা। পাশে তাকিয়ে সে যা দেখে, তাতে তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত শীতল স্রোত বয়ে যায়।

রশিদ আর কিশোর নয়। সে শিশুতে পরিণত হয়েছে। তার আচরণও শিশুদের মতো হয়ে ওঠে।

আকার-আকৃতিতে বোঝা যায়—রশিদ তখন দুই বছরের শিশু। ন্যান্সি কাঁপতে কাঁপতে তাকে কোলে তোলে। বাইরে খবর ছড়িয়ে পড়ে। পাড়ার লোকজন ভিড় জমায়। সবাই দেখতে আসে—উল্টো সময়ের মানুষটিকে।

রশিদ এত লোকের ভিড় পছন্দ করে না। ভয় পেয়ে সে ন্যান্সির বুকে মুখ লুকায়। তার ছোট্ট হাত দুটো শক্ত করে ন্যান্সির আঙুল আঁকড়ে ধরে। কাঁপা কাঁপা গলায় সে ডেকে ওঠে— মা!

উল্টোক্ষণ
মোস্তাফিজ ফরায়েজী


মন্তব্য

নাম

অনুবাদ,37,আত্মজীবনী,27,আর্ট-গ্যালারী,1,আলোকচিত্র,1,ই-বুক,7,উৎপলকুমার বসু,26,ঋত্বিক-ঘটক,3,কবিতা,340,কবিতায় কুড়িগ্রাম,7,কর্মকাণ্ড,16,কার্ল মার্ক্স,1,গল্প,76,ছড়া,1,জার্নাল,4,জীবনী,6,দশকথা,25,দিনলিপি,1,পাণ্ডুলিপি,11,পুনঃপ্রকাশ,21,পোয়েটিক ফিকশন,1,প্রতিবাদ,1,প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা,4,প্রবন্ধ,167,প্রিন্ট সংখ্যা,5,বই,4,বর্ষা সংখ্যা,1,বসন্ত,15,বিক্রয়বিভাগ,21,বিবিধ,2,বিবৃতি,1,বিশেষ,24,বুলেটিন,4,বৈশাখ,1,ভাষা-সিরিজ,5,ভিডিও,1,মাসুমুল আলম,35,মুক্তগদ্য,41,মে দিবস,1,যুগপূর্তি,6,রিভিউ,5,লকডাউন,2,শম্ভু রক্ষিত,2,শাহেদ শাফায়েত,25,শিশুতোষ,1,সন্দীপ দত্ত,14,সম্পাদকীয়,18,সাক্ষাৎকার,23,সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ,18,সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ,55,সৈয়দ সাখাওয়াৎ,33,স্মৃতিকথা,14,হেমন্ত,1,
ltr
item
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন: মোস্তাফিজ ফরায়েজীর ছোটোগল্প
মোস্তাফিজ ফরায়েজীর ছোটোগল্প
ন্যান্সি ধীরে ধীরে সবকিছু মানিয়ে নিতে শেখে। কান্না, হতাশা—সব একপাশে সরিয়ে রেখে সে কাজে নামে। সে হয়ে ওঠে একজন নারী উদ্যোক্তা। তার অধীনে কাজ করে বিশজন ন
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEj6JVXQaxBUihcJxFxVB7P1LBbfSG1CE-mz7ovHeaodMG5jmH7_mVBzoYRq22N7PJW4zxis4IxwKGcxMHzH167zgfr92LtG83UXTlAF2xX9n0NzHTmVPfs_DZRWAe1JEdPmkhIiXwZHmVqKAKHFBO4MmDvO42dsa7SCExwGaBL4UAcFsFawDk0DeiRVc3s/s16000/%E0%A6%AE%E0%A7%8B%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%AB%E0%A6%BF%E0%A6%9C%20%E0%A6%AB%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A7%9F%E0%A7%87%E0%A6%9C%E0%A7%80%20%E0%A6%89%E0%A6%B2%E0%A7%8D%E0%A6%9F%E0%A7%8B%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A6%A3%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%81%20%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%9F%E0%A6%B2%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%97.png
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEj6JVXQaxBUihcJxFxVB7P1LBbfSG1CE-mz7ovHeaodMG5jmH7_mVBzoYRq22N7PJW4zxis4IxwKGcxMHzH167zgfr92LtG83UXTlAF2xX9n0NzHTmVPfs_DZRWAe1JEdPmkhIiXwZHmVqKAKHFBO4MmDvO42dsa7SCExwGaBL4UAcFsFawDk0DeiRVc3s/s72-c/%E0%A6%AE%E0%A7%8B%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%AB%E0%A6%BF%E0%A6%9C%20%E0%A6%AB%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A7%9F%E0%A7%87%E0%A6%9C%E0%A7%80%20%E0%A6%89%E0%A6%B2%E0%A7%8D%E0%A6%9F%E0%A7%8B%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A6%A3%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%81%20%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%9F%E0%A6%B2%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%97.png
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন
https://www.bindumag.com/2026/05/mustafiz-forayeji.html
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/2026/05/mustafiz-forayeji.html
true
121332834233322352
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts আরো Readmore উত্তর Cancel reply মুছুন By নী PAGES POSTS আরো এই লেখাগুলিও পড়ুন... বিষয় ARCHIVE SEARCH সব লেখা কোন রচনায় খুঁজে পাওয়া গেল না নীড় Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share to a social network STEP 2: Click the link on your social network Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy