নদীর ধারে পারের নৌকার জন্যে অপেক্ষায় বসে থেকে শুভ্র সেই দিনটার কথা মনে করে, যেদিন ওরা এই গ্রামটায় প্রথম এসেছিল। তখন নদীতে হাঁটুপানি, সঙ্গে বাবা মা আর ছোটোবোন। এখন সঙ্গে কেউ নেই। নদীর পানিটাও ফেঁপে উঠেছে। কদিন আগে হলেও সে সাঁতরে পার হত। এখন সে ভয় করে। দুঃসহ স্মৃতির জ্বরে সে অবসন্ন।
সেদিন গ্রামটা ছিল চুপচাপ। সূর্য অস্ত গেছে কিছু আগে। আকাশে ফ্যাকাশে চাঁদ কেবল দেখা গিয়েছে। কয়েকটা কুকুর ঘেউ ঘেউ করে শুভ্রদের অভ্যর্থনা জানায়। গ্রামের সবচেয়ে বড়ো জোতদার তাদের অতিথি করে নেয়। জোতদার সদয় মানুষ। মুখে প্রশান্ত হাসি, চাপ চাপ দীর্ঘ দাড়ি, গোবেচারা চোখে ঈষৎ মেধার রোদ। পরনে হাতকাটা পাঞ্জাবি আর লুঙ্গি। সবসময় মুখে পান, মুহূর্তে মুহূর্তে পিক ফেলছে। সে শুভ্রদের জন্য বাড়ির একখানা ঘর ছেড়ে দেয়। প্রথম কয়েকদিন জোতদার সুযোগ পেলেই শুভ্রর বাবাকে বলতে থাকে, ‘কী সৌভাগ্য, কী সৌভাগ্য আমার, আপনার মতো মানুষ আমার বাড়িতে! কী আশ্চর্য!’ জোতদার প্রথম তিনদিন একটু অন্যরকম হয়ে যায়। তার হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায়, দাড়ি আরও শুভ্র হয়, গলার স্বর মুয়াজ্জিনের মতো মিষ্ট হয়ে যায়, কারণে-অকারণে তার মেজাজ বিনয়ে শ্রদ্ধায় বরফের মতো গলে গলে যায়।
বাড়িটাতে লোকজন বিশেষ ছিল না। জোতদার ও তার বউ। ছেলেমেয়ে কেউ এখন বাড়িতে নেই। একটা দাসী ও একটা কিষান। দিনের বেলা মুরগি ও কবুতর বাড়িটাকে সরব রাখে। রাত গোরুর জাবর-কাটা নিশ্বাস ও হাম্বা ডাকের নিচে, ছাগলের ব্যা ব্যা ডাকে, গন্ধে চাপা দমবন্ধ। প্রথম ক-রাতে শুভ্রদের ঘুম ঠিকমতো হয় না। দিনের বেলাতেও তারা ঘর থেকে বের হয় না। সবাই ঘরের মধ্যে থাকে। শুভ্রকে বের হতে দে'য়া হয় না।
চতুর্থ রাতে তাদের সবার ভালো ঘুম আসে। গাঢ় ঘুম। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়। তীব্র না না হা হা চিৎকারে। বুঝতে পারে না কার গলা থেকে প্রথম চিৎকারটা বেরিয়েছিল। ঘুমের মধ্যে সব্বার অনুভব, ওদের গলার ওপর কে যেন দীর্ঘ তরবারি চেপে ধরেছে। বিছানায় পাশাপাশি শুয়েছিল তারা, শুভ্র একপ্রান্তে। তার গলার উপর অর্ধেক তরবারির চাপ। তরবারি চেপে ধরে দাঁড়িয়ে ঘরজোড়া বিশাল বীভৎস বিকট অতিকায় লাল পশুমানব। সেই পশুমানব এসে প্রতিরাতে তাদের ঘুম ঝনঝন করে ভেঙে দেয়। তারা বিছানার মাঝখানে জড়সড় হয়ে বসে কাঁপতে থাকে, দরজা বন্ধ, জানালা বন্ধ, দম বন্ধ।
সপ্তম রাত থেকে দুঃস্বপ্ন চলে যায়।
এক সকালে ঘুম ভেঙে শুভ্র দেখে চতুর্দিকে ডিম-কুসুম আলো। জানালার নিচে বাবলাগাছের ছায়া। সে মিষ্টি রোদে বিছানায় ও ঘরে একা। কেউ নেই। বাবা-মা, ছোটোবোন কেউ নেই। হাহাকার। কেঁদে উঠতে চায়। হু হু দীর্ঘশ্বাসে বুক ফুলে ওঠে। ফুঁপিয়ে কাঁদে। অনেক। অনেকক্ষণ। কান্নায় কান্নায় ডুকরে শিউরে উঠে সে আবারও ঘুমে হারিয়ে যায়।
‘ও ভাইয়া, ওঠ। ও ভাইয়া।’
ধড়মড় ঘুমটা ভাঙে। জানালার নিচে বাবলাগাছের ছায়ায় ছোটো বোনটি একটা ছাগলের কান ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
কিষানটির সঠিক বয়স জানা যায় না। একবার ৪২ বলার পর মত বদলিয়ে বলে ৬২। কিষানটির মেরুদণ্ড বাঁকা। মুখভর্তি দাড়ি, মোচ চাঁছা, গাল বসা, ঘোলা চোখে লাল-লাল ছিটে। মুখে সবসময় বিড়ি, টেনেই চলেছে। টানবার সময় দিগ্ভ্রান্ত স্থির চোখে তার হাবভাব ভীতিকর হয়ে ওঠে।
‘বিড়ি কেন টানো?’
‘তোমরা কেন পেন্সিল কামড়াও?’
অভিযোগটি মিথ্যা। শুভ্র এখন মোটেই পেন্সিল কামড়ায় না, কখনো কামড়াতও না, সে কলমে লিখত, যার নাম উইং সং। অবশ্য এখন সে লুকিয়ে পাটশোলার আগায় আগুন লাগিয়ে বিড়ি ফোঁকার প্র্যাক্টিস করে।
বাড়িটার পিছন দিকে জঙ্গল। কয়েকটা ছোট ডোবা। আটেশ্বরী, ভূতরাজ, বেত নানা ঝোপজঙ্গলে ভরা জায়গাটায় কয়েকটা ছোট ছোট বাঁশের ঝোপ আর কড়ই, জঙ্গলি, শীতরাজ, পাঁড়া, ছাতিম, হিজল, শিমুল নানা গাছের অগোছালো সমাবেশ। শুভ্রের কাছে বন, জঙ্গলিবন। একটা লাঠি-হাতে ঝোপ ভাঙতে ভাঙতে শুভ্র এর মধ্যে ঘুরে বেড়ায় কিষানটার সঙ্গে। বেড়াতে বেড়াতে তারা পৌঁছায় একমাত্র তেঁতুলগাছটার নিচে। এই জঙ্গলিবনে সে সম্রাটের মতো। তেঁতুলের ঘনপাতার আচ্ছাদনের নিচে সবসময় অন্ধকার, ছমছম। গাছটির বয়স সবার অজানা। সেই ছায়া-অন্ধকারে একটা পরিত্যক্ত হা-খোঁড়া কবর ক্ষুধার্ত তাকিয়ে আছে লতাপাতার দিকে এবং সেই মুহূর্তে শুভ্রর চোখে। আঁৎকে সে কিষানটিকে আঁকড়ে ধরতে চায়।
জিজ্ঞাসার আগেই কিষানটি জানায়, গণ্ডগোলের কিছু আগে জোতদার মিঞার পীরসাহেব গ্রামে আসেন। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেন সামনের ১১ তারিখে জোতদার সর্পাঘাতে মরবেন। এড়ানোর উপায়, পাকপবিত্র হয়ে কাফনের কাপড় পরে কবরে শুয়ে, স্বয়ং আজরাইলের মোকাবেলা করা। সেই মোকাবেলায় জয়যুক্ত হলে তিনি বাঁচবেন আরো একশ বছর। পীরসাহেব বিদায় নিলেন ভারাক্রান্ত মনে।
কবর খোঁড়া হল। ইট সিমেন্ট কেনা হলো। খবর দেয়া হল মিস্ত্রিকে। তেঁতুলগাছের আশেপাশের ২৩ বিঘা জমি ওয়াকফ করে জোতদার সাহেব কিছু গোপন সঞ্চিত মোহর তুলে দিয়ে বললেন, সখাবাবার নামে মসজিদ বানাও। নির্দিষ্ট দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা এল। জোতদার মিঞা সবাইকে চোখের পানিতে ভাসিয়ে দুনিয়ার সব ভালোমন্দের আস্বাদন-শেষে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার উদ্দেশে, ইতোমধ্যে পাক কালামের একটি অংশ ৫ কোটিবার উচ্চারণ করে, বুকে তিনবার ফুঁ দিয়ে কবরের বিছানায় শুয়ে পড়লেন।
কিষান কাঁদে, এত ভালো মানুষ চলে যায়। তার বউ কাঁদে, এই সেদিনের জোয়ান মানুষ আজকেই কোথায় চলে যায়। তার বড় ছোওয়াল কাঁদতে গিয়েও কাঁদতে পারে না - রাজনীতি ছেড়ে গ্রামেই বুঝি থাকতে হয়। এখন তাকে শহরের রাজনীতি ছেড়ে গ্রামেই বুঝি থাকতে হয়।
এক প্রহর দুই প্রহর করে রাত যায়। তেঁতুলের পাতা ঝরে। শেয়াল বেজি সাপ কাঠবিড়াল খরগোস ছুটোছুটি করে। কীটপতঙ্গ ওড়ে, ঝিঁঝিঁ ভটভট ফকফক করে। ভূতপ্রেত খটখট হাততালি। খি খি খাখা হাসি দেয়। এই তো আজরাইল এসেই গেল। এসেই গেল। দমকা হাওয়া ফুঁসে ওঠে। পাতায় পাতায় শাখায় শাখায় ডালে ডালে ঝাঁকন ঝনৎকার ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকায়। অস্থির অন্ধকার প্রাণী অশরীরী ভূতপ্রেত কীটপতঙ্গ এবং আজরাইলের অনিবার্য আগমনধ্বনি। জোতদার কবরে উঠে বসেন বুক ধুকপুক ধুকপুক। প্রাণবায়ু গেল বলে। কোথায় আজরাইল? বনজঙ্গল পৃথিবী আলোকিত করে বৃষ্টিহীন আকাশ থেকে ধূমকেতু বজ্রপতনে তার পাকস্থলি পরিষ্কার হয়ে যায় এবং বিপরীত প্রতিক্রিয়ায় তিনি কবরের উপরে উঠে পশ্চাৎ ধাওয়া করা আজরাইলের ছায়া মাড়িয়ে, অজস্রবার আছাড় খেয়ে, খণ্ডবিখণ্ড দেহে তার বাহির-বাড়ির উঠানে লুটিয়ে পড়েন।
কিন্তু কবরটি বন্ধ করা হয়নি।
সৈন্যরা চলে এল। পালানোর সময় ছিল না। শুভ্রর বাবা শহরের পলাতক অফিসার। পনের দিন তাঁর দাড়ি শেভ করা নেই। দূরে জিপের ছায়া ও শব্দ শুনে দ্রুত শেভ সেরে ট্রাঙ্ক থেকে বের করে প্যান্ট শার্ট পরে প্রস্তুত হয়ে দাঁড়ান তিনি। চুল আঁচড়ান।
সৈন্যরা জনা আটেক। বাড়িটার পাশেই তিনখানা গম্বুজ শোভিত মসজিদ। মসজিদের গায়ে নীল ও লাল রঙের কাজ। মসজিদের ভিতর চেয়ার পেতে বসার জায়গা করা হয়। ক্যাপ্টেন সাহেব ও শুভ্রর বাবা গিয়ে সেখানে বসেন। জোতদার সাহেব পরিচয় করিয়ে দিয়েই উধাও। মসজিদের বাইরে চারকোনায় চার সৈন্য দাঁড়িয়ে। দুজন ইতিউতি সন্ধান করছে। শুভ্র আশেপাশে ঘুরে বেড়ায়। ক্যাপ্টেন সাহেব তাকে কাছে ডাকে। নাম জিজ্ঞেস করে। মাথায় হাত বোলায়। বাবা ও ক্যাপ্টেনের কথাবার্তা সে বুঝতে চেষ্টা করে। ভালো করে কান পেতে। কিন্তু দুর্বোধ্যই থেকে যায়।
একজন সন্ধানরত সৈনিক তার দিকে দুটো চকলেট এগিয়ে দেয়। সৈন্যরা কী করতে চায়? আপাত-নিরীহ, লক্ষ্যহীন তাদের আচরণ। মনে হয় বোবা। চোখগুলো তাদের দেহের মতোই, বলদাকৃতি, গোল-গোল বিশাল।
বাড়ির পিছনে জঙ্গলের মধ্যে কিষানটা একটা ডাঁট তৈরি করছে। দাও দিয়ে চেঁছে চেঁছে। কোদাল বা কুড়ালের জন্য। শুভ্র নিঃশব্দ দাঁড়িয়ে তার হাতের কাজ দেখে। কিষানটা শুভ্রকে অভয় দেয়, 'ডর পায়ো না বাজান, উনার ছেলেরা মিলিটারির লগেও আছেন, মুক্তির লগেও আছেন। ডর পায়ো না বাজান। জোতদারের বেটায় বুঝে লিবে নি।'
বাড়ির ভিতরে মোরগ মুরগি ঘুরে বেড়াচ্ছে। খুঁটিতে বাঁধা রামছাগল বোঁটকা গন্ধ ছড়াচ্ছে। উঠানে একটাও মানুষ নেই। কয়েক-জোড়া কবুতর বাকুমবুকুম ছড়া পড়ছে। একটা পোষা বেজি একটা মুরগিকে তাড়া করে ছুটছে। মুরগিটা করকর করে উড়ে সরে যাচ্ছে। ধরতে পারলেও বেজিটা বোধহয় ওকে খাবে না।
জোতদার-গৃহিণীর ঘরে তালা। জোতদার সাহেবকে দীর্ঘক্ষণ চোখে পড়ছে না। কোথায় গেলেন তিনি? কোথায়? শুভ্র নিজেদের ঘরে যায়। ছোটবোনটা জোর করে মায়ের দুধ খাওয়ার চেষ্টা করছে। মা বকছে। শুভ্র আর ঘরে ঢোকে না।
জঙ্গলের ভিতরে আবারও রওয়ানা হয় শুভ্র। ছাগলের ব্যা ব্যা শোনা যায়। মনে হয় তেঁতুল গাছের দিক থেকে আসছে। শেয়াল ধরেছে নাকি? শুভ্র দ্রুত ধ্বনি লক্ষ্য করে অগ্রসর হয়। একটু পরে সে দেখতে পায় একটি ছাগল এবং জোতদারকে। ছাগলের পিছনে-পিছনে জোতদার ছুটছেন। একবার সজোরে একটা জাম্প করে প্রায় ছাগলের গলার দড়িটি কজা করে ফেললেন। এবং ছুটন্ত ছাগলের একটা লম্ফে পপাতধরণীতল হতে হতে নিজেকে ঠেকিয়ে পুনরায় দৌড়। ছাগলটি চক্রাকারে আবর্তিত হচ্ছিল। এবারে শুভ্রর গা ঘেঁষে ছাগলটা ছুট দেয়। শুভ্র তার প্রচণ্ড গতির জন্য স্পর্শ করেও ছোট ছিন্ন দড়িটা শক্ত হাতে ধরতে পারে না। ছুটতে যাবে সে ছাগলের পিছনে সেই মুহূর্তে জোতদার তার গায়ের উপরে এসে পড়েন। তখনি চোখে পড়ে জোতদারের লুঙ্গিটি খসে পড়েছে। এবং জোতদার উল্টে পড়লেন। তার মুখ থেকে কিছু অকথ্য গালি বের হয়ে এল। এবং এই প্রথম তিনি শুভ্রকে তুই-তোকারি করলেন:
‘তোকে এখানে আসতে কে কইছে?’
এমনকি তিনি ভূতরাজের ডাল ভেঙে শুভ্রকে মারতে আসার উপক্রম করেন। শুভ্র অপমান ও উদ্দাত কান্না বুকে চেপে দৌড় দেয় বাড়ির দিকে।
তখন দেখতে পায় সড়কে জিপটা উঠছে। কোথা থেকে একটা আর্ত কান্না জিপের শব্দের সঙ্গে ভেসে আসছে। প্রথমে শুভ্র সড়ক অভিমুখে জিপটার দিকে ছুটে যাবার কথা ভেবেও, পথ বদলে বাড়িটার দরজা খুঁজতে শুরু করে। বাড়িটা সে বারবার চক্কর দেয় কিন্তু দরজা চোখেই পড়ে না। সে চোখে অন্ধকার দেখে, গায়ে ঘাম, চোখ দপদপ। জিপের শব্দটা হারিয়ে গেছে।
উঠান রক্তে ভেসে গেছে। দড়ি-ছেঁড়া ছাগলটা ভ্যাবানো ভুলে গিয়ে রক্তের কাছে দাঁড়িয়ে, ফ্যালফ্যাল বোবা চোখে। শুভ্র জ্ঞান হারায়।
নদীর ধারে শুভ্র এখন নৌকার অপেক্ষায় বসে। একজন লোক এক-দঙ্গল কুকুর পরিবৃত হয়ে এগিয়ে আসছে। জামা প্যান্ট পরে আছে, গলায় টাই, পায়ে কিছু নেই, চুলগুলো জটপাকানো, মুখভর্তি খোঁচা দাড়ি—এই সবকিছুর ওপরে তেলচিটে ময়লার পলেস্তারা। উদ্ভ্রান্ত চোখে লোকটি নিজের সঙ্গে কথা বলছে আর রুটির টুকরো ছুড়ে দিচ্ছে কুকুরদের দিকে। মাটিতে একটা টুকরোও পড়ছে না। শুভ্রর কাছে এসে থামেন।
রচনাকাল: ১৯৮৪
শুভ্র, নদীর সুদূর পারে
ইচক দুয়েন্দে
ইচক দুয়েন্দে




মন্তব্য