বাঙলাদেশের বাস্তবতায় চার্লস বুকাওস্কি পাঠ অদ্ভুত মিশ্র অভিজ্ঞতা তৈরি করে; একদিকে মুক্তির নেশা, অন্যদিকে প্রভু নষ্ট হয়ে যাই। এর কারন, তিনি মানুষকে ভালো হতে শেখান না। উন্নত হতে শেখান না। মোটিভেশনাল স্পিকারদের মতো সকালে উঠে বিছানা গুছিয়ে ফেলতেও বলেন না। বরং উল্টো। আপনি যে অলস, ঈর্ষাকাতর, কামুক, ব্যর্থ, মাঝেমধ্যে নোংরা এবং প্রায়ই ভণ্ড, সেই কথাটাই বারবার মনে করিয়ে দেন।
এই কারণেই বোধহয় তাঁকে এত লোক অপছন্দ করে।
তাঁর কবিতা পড়তে গিয়ে মাঝেমধ্যে মনে হয় তিনি পৃথিবীর ওপর ভীষণ রেগে আছেন। একটু পরে বোঝা যায়, পৃথিবীর চেয়ে নিজের ওপরই বেশি রাগ। আরও একটু পরে বোঝা যায়, রাগটাও পুরো সত্য নয়। ভিতরে গভীর দুঃখ আছে। তারপর আবার দেখা যায়, দুঃখের মধ্যেও হাসছেন। সস্তা বারে বসে। ঘোড়দৌড়ে টাকা হারিয়ে। কোনো ব্যর্থ প্রেমের কথা মনে করে। অথবা পরদিন সকালের হ্যাংওভারের মধ্যে।
এই জটিলতাটাই বড় কথা।
আমাদের শহরগুলোর দিকে তাকান। সকালবেলা অফিসগামী মানুষের মুখ দেখুন। বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন। সরকারি চাকরির কোচিং। ব্যাংকের লাইন। রাজনৈতিক পোস্টার। মাস শেষে বেতনের অপেক্ষা। রাতে ফেসবুকে বিপ্লব। সকালে আবার হাজিরা। এর মধ্যে বুকাওস্কি ঢুকে পড়লে অস্বস্তি হবেই।
তিনি যে আমেরিকান ছিলেন এই বিষয়টা পাঠে বিঘ্ন সৃষ্টি করে না, বা তাকে অপর মনে হয় না। রাত তিনটায় যে মানুষ ঢাকা, কুড়িগ্রাম, পটুয়াখালী কিংবা লস অ্যাঞ্জেলেসে একা বসে থাকে, তার নিঃসঙ্গতার ব্যাকরণ প্রায় একই।
বুকাওস্কির সবচেয়ে বড় গুণ সততা। সাহিত্যে এর বড় অভাব। সবাই নিজের একটা গ্রহণযোগ্য সংস্করণ তৈরি করে। নিজের প্রেস রিলিজ লেখে। বুকাওস্কি সেই কাজ করেননি। নিজের ব্যর্থতা, নোংরামি, ক্ষত বা হীনমন্যতাকেও বাজারে তুলে দিয়েছেন। বলেছেন, এই নাও, মানুষ দেখতে চাইলে মানুষই দেখো। মূর্তি না।
তাঁর কবিতার কদর্যতা নিয়েও অনেক কথা হয়। হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু কদর্য জিনিশকে বাদ দিলে পৃথিবীর কতটুকু অবশিষ্ট থাকে? হাসপাতাল বাদ। মর্গ বাদ। শ্রমিক কলোনি বাদ। মাতালের বমি বাদ। বৃদ্ধাশ্রম বাদ। প্রেমের প্রতারণা বাদ। তারপর যে পৃথিবী থাকে, সেটা রিয়েল এস্টেট কোম্পানির বিজ্ঞাপন হতে পারে; সাহিত্য নয়।
এইসব কারণেই বিন্দু আয়োজন চার্লস বুকাওস্কি বিশেষ সংখ্যা।
এখানে আছে তাঁর জীবন। পরাজয়। কিংবদন্তি। তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ। তাঁর সাহিত্যিক উত্তরাধিকার। অনুবাদ। এবং সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের সময়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক।
কারণ বুকাওস্কিকে পড়া মানে নিজেদের ব্যর্থতা, গোপন ক্ষত, লুকানো আকাঙ্ক্ষার মুখোমুখি হওয়া।
এই সংখ্যাটি যদি সেই কাজের সামান্য অংশও করতে পারে, তাহলেই আমাদের পরিশ্রম সার্থক।
এ সংখ্যার কাজ করতে করতে মনে পড়ছিলো অকালপ্রয়াত কবি ও সম্পাদক শুভঙ্কর দাশের কথা৷ তিনি বুকাওস্কির প্র-চু-র কবিতা, গল্প, জার্নাল, চিঠি ইত্যাদি অনুবাদ করেছিলেন৷ বাঙলা ভাষায় বুকাওস্কি পাঠে তাঁর অবদান কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করছি৷
বিন্দুর এ আয়োজনে যে লেখকগণ সাড়া দিয়েছেন, তাদের সকলের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা৷ যাদের লেখা বা অনুবাদ প্রকাশের জন্য মনোনীত করতে পারলাম না, তাদের প্রতি দুঃখ প্রকাশ করছি৷
যারা সংখ্যাটি প্রকাশে নানাভাবে ভূমিকা রেখেছেন, কাউকে আলাদা করে নাম উল্লেখ করে চিহ্নিত করিয়ে দেবার ঝুঁকি নিচ্ছি না৷ কারন বাঙলা সাহিত্যে বিন্দু একটা ঝুঁকির নাম৷ সবার প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা৷
জানিয়ে রাখি, অনলাইন সংখ্যা থেকে নির্বাচিত রচনা এবং আরো বেশ কিছু অনুবাদ ও প্রবন্ধ নিয়ে চার্লস বুকাওস্কি প্রিন্ট সংখ্যা প্রকাশিত হবে৷
বন্ধু আমার, বাইরে অনেক বৃষ্টি! চার্লস বুকাওস্কি হাতে বসে পড়ুন—চিয়ার্স!
–সম্পাদক, বিন্দু
বিন্দুস্বর
বাঙলাদেশের বাস্তবতায় বুকাওস্কি পাঠ
বাঙলাদেশের বাস্তবতায় বুকাওস্কি পাঠ
আরও পড়ুন: [বুকাওস্কি সংখ্যা]




মন্তব্য