.header-button .inner > span { font-size: 18px !important; } .header-button .inner i.fa { font-size: 40px !important; } .comment-form-message { background-color: #f4f4f4 !important; font-size: 14px !important; }

মাৎস্যন্যায় [ছোটোগল্প] • নাহার তৃণা

মাৎস্যন্যায় • নাহার তৃণা
আচমকা বিকট দুম দুম শব্দে লালুর ভাতঘুম ভেঙে গেল। ধড়ফড় করে সে বিছানায় ওঠে বসে। চারদিকের যা অবস্থা, দিনে দুপুরে ডাকাতি, খুন-জখম মামুলি ঘটনা। কান খাড়া করে সে ব্যাপারটা ঠাহরের চেষ্টা করলো। পুরো বাড়ি কাঁপিয়ে কেউ সদরদরজা খোলার আবেদন জানাচ্ছে। আবেদন না বলে হুকুম বলাই সঙ্গত। লাঠি বা ভারী কিছু দিয়ে কেউ দশাসই লোহার দরজায় আওয়াজ করছে। কিন্তু এই অসময়ে কে আসতে পারে? সাহেবদের কোনো অতিথি এলো না কি? 

-শালার আপদ!

লুঙ্গিতে গিঁট দিয়ে লালু উঠে দাঁড়ায়। ওর গোটা মুখে গনগনে বিরক্তি। মালিকের আত্মীয় এলে বিদেশ থেকে ফোন আসতো তার কাছে। সেটা যেহেতু আসেনি, কাজেই অতিথি না। এবার দরজার আওয়াজ ছাপিয়ে বাজখাই একটা কণ্ঠস্বর ওর কানে ঝাপটা দিলো।

-ওই হারামজাদা লাওল্যা, তুই যদি মনে করোস ভিত্রে হান্দাইয়া থাকলে পার পাবি, তাইলে কিন্তু ভুল করবি। গেট ভাইঙ্যা ঢুকুম আমরা।  

কণ্ঠস্বর শুনে লালুর ভেতরটা গুরগুর করে উঠল। শফিখুর! কিন্তু তার তো আজ আসবার কথা নয়। মাস ফুরাতে এখনও দিন সাতেক বাকি। আবার নতুন কোন ঘাপলার মতলবে এসেছে ওপরওয়ালাই জানেন। 

গতবছর সরকার পতনের মাস দুয়েকের ভেতর ত্রিপল মার্ডারের আসামি শফির মুক্তির খবর এলাকার অনেককেই শঙ্কিত করেছিল। খুর চালিয়ে মানুষ হত্যায় ওস্তাদ শফি। বাপের দেওয়া নাম শফিকুল বদলে এখন শফিখুর হয়েছে। জেল থেকে বেরিয়ে দিন কয়েক শফি চুপচাপই ছিল। হয়তো ছক কষছিল, কাকে কোন বিপদে ফেলে পকেট ভরা যায়। 

দেশে এখন পুঁজিবিহীন এক ব্যবস্থা লাভজনক ব্যবসা হয়ে উঠেছে। পতিত সরকারের ঘনিষ্ঠ কিংবা সেই দলের সদস্য বলে যে কাউকে দিব্যি ফাঁসিয়ে দেওয়া যায়। বিপদ থেকে বাঁচতে অনেকেই টাকাপয়সা দিয়ে মধ্যস্থতার চেষ্টা করে। বিগত সরকারের কাছ থেকে সুবিধা নেওয়া দূরে থাক, কোনো রকম রাজনীতিতে জড়িত না, এরকম অনেক পরিবারকেও এমন ফাঁদে পড়ার মাশুল গুনতে হচ্ছে। প্রতিবাদে ভীত মানুষগুলো জানে বিচারের আশা বৃথা। জোর যার মুল্লুক তার, এটাই সবকালের স্বাভাবিক নিয়ম। বর্তমানে তা লাগামহীন। যাদের পকেটের জোর নেই হয় তারা জেলে যাবে, নাহলে মবের হাতে হেনস্তা হবে। কপাল খারাপ হলে জীবনও খোয়াতে হতে পারে, সহজ হিসাব। 

জেল ফেরত শফি হিসাবনিকাশ শেষ করে হঠাৎ একদিন আনারকলি ভিলায় উদয় হয়। লালু বহুদিন ধরে এ বাড়ির কেয়ারটেকার। গত বছর জুন মাসে বাড়ির মালিক খবিরউদ্দিন চৌধুরী এবং তার স্ত্রী আনোয়ারা বেগম আমেরিকায় গেছেন। চৌধুরী দম্পত্তির একমাত্র ছেলের ঘরে সন্তান এসেছে। ওদের আমেরিকা যাওয়ার প্রধান উদ্দেশ্য নাতিকে দেখা। পাশাপাশি সেখানে কিছুদিন থেকে আসার পরিকল্পনা। তার ভেতর দেশে ঘটে গেল এক মহাবিপর্যয়। ছাত্র আন্দোলনের ছুতোয় সরকারের পতন ঘটে গেল। 

খবিরউদ্দিন কট্টর ধানের শীষের সমর্থক এবং প্রাক্তন এমপি। তাসত্ত্বেও পতিত সরকার দলের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা নেহায়েত মন্দ ছিল না। উপরন্তু, ছেলের বিয়ে দিয়েছেন নৌকার এক মন্ত্রী পরিবারের মেয়ের সঙ্গে। দেশের ঘোলাটে পরিস্থিতিতে সহসাই দেশে ফেরা তার নিরাপদ মনে হয়নি। তাছাড়া বন্ধু-স্বজনেরাও আপাতত ওদের না ফেরার পরামর্শ দেন। ফলে একবছর যাবৎ তারা আমেরিকাতে অবস্থান করছেন। রাজনীতিবিদের আগে খবিরউদ্দি চৌধুরীর বড় পরিচয়, তিনি দেশের একজন প্রথম সারির ব্যবসায়ী। এককথায়, চৌকস এবং কৌশলী ব্যবসায়ী তিনি। ক্ষমতায় যে দলই থাকুক, তাকে কখনও সমস্যায় পড়তে হয়নি। বহাল তবিয়তে তিনি দেশ-বিদেশে ব্যবসার প্রসার ঘটিয়েছেন। তবে এবারের পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। অবস্থাগতিক তিনি যতটুকু বুঝেছেন, নৌকার শোচনীয় ভরাডুবি ঘটে গেছে। রাজনীতিতে তাদের সহসাই ফেরার সুযোগ অতি ক্ষীণ। ধানের শীষের অবস্থা পেন্ডুলামের মতো, একবার এদিক- একবার ওদিক। দলের হাল ধরার মতো যোগ্য এমুহূর্তে কেউ নেই। লন্ডনে বসে থাকা উচ্চাভিলাষি ছোকরা নেতার প্রতি তার বিন্দুমাত্র আস্থা নেই। যদিও নিজের এই মনোভাব তিনি কাউকে জানতে দেন না। দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আপাতত কিছুদিনের জন্য বন্ধ থাকলেও তাকে খুব একটা বিপাকে পড়তে হয় না। বিদেশে মজুদ থাকা পণ্য এবং অন্য দেশের সোর্স থেকে মালপত্র নিয়ে তার এজেন্সিগুলো দিব্যি ব্যবসা চালিয়ে নেবে। তাছাড়া তার জন্যও বিদেশে বসে ব্যবসা চালানো এখন অনেক বেশি নিরাপদ। 

বর্তমান রাজনীতিতে দাড়িপাল্লাদের ভীষণ দাপট। কৌশলী চৌধুরী সাহেব একসময় স্ত্রীর যেসব আত্মীয়কে এড়িয়ে গেছেন; এখন তাদের সঙ্গে নৈকট্য বাড়াতে স্ত্রীকে দ্বিধাহীন উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছেন। এখনই হয়তো দেশে ফেরার পরিকল্পনা নেই। কিন্তু চিরদিন তো আর দেশটা এমন দিকভ্রান্ত থাকবে না। একদিন তাদের ফিরতে হবে। সেই কথা স্মরণে রেখে বুঝে শুনে পা ফেলতে চান খবিরউদ্দিন চৌধুরী। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠাগুলো হামলার হাত থেকে কতটা রক্ষা পাবে জানা নেই। তবে প্রতিমাসে ভাড়াটেরা বাড়িভাড়া ব্যাংকে জমা করবে, সে নিয়ে নিশ্চিন্ত। দুরসম্পর্কীয় চাচাতো ভাই লালুর বিশ্বস্ততায় কোনো সন্দেহ নাই। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে সেই বা কতদিন বাড়ি-গাড়ি সম্পত্তি নিরাপদ রাখতে সক্ষম হবে! প্রতিদিনই দেশের কোনো না কোনো অঘটনের খবর পাচ্ছেন। তাছাড়া জেলখাটা আসামি শফি যথেষ্ট মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাকে বাধা দেবার মতো লোকবল বা সাহায্য এ মুহূর্তে পাওয়ার আশা প্রায় শূন্য। চেষ্টা যে করেননি এমন নয়। আশাব্যঞ্জক সাড়া দেয়নি কেউ। হাতি পাকে পড়লে লাথি মারার আনন্দ কে আর ছাড়ে।

সেদিন শফিখুরের হঠাৎ আগমন এবং মাসিক পঞ্চাশ হাজার দাবির কথা লালু তৎক্ষণাৎ খবিরউদ্দিন চৌধুরীকে জানিয়েছিল। শফির সাফ কথা, টাকা না দিলে বাড়ির দখল নিয়ে পার্টির অফিস বানানো হবে। এমন হুমকি-ধমকির মুখে মালিকের সঙ্গে ফোনালাপের ব্যবস্থা করে লালু যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছিল। কেননা ফোনালাপের সূত্রে অর্থের বিনিময়ে বিষয়টা দ্রুত রফা হয়েছিল। 
তাসত্ত্বেও পথেঘাটে লালুর সঙ্গে হুটহাট দেখা হলে চৌধুরী সাহেবকে টাইট দেবার নানা হুমকি ধমকি দিতে কসুর করে না শফি। ষণ্ডা চেহারার শফিকে দেখলে পলকা শরীরের লালু সামান্য সিঁটকে গেলেও ওর চোখমুখ দেখে ভেতরের চিড় টের পাওয়া মুশকিল। লালুর এই ব্যাপারটা ওকে অনেক বিপদ থেকে রক্ষা করে থাকে। ওর চোখ-মুখ কখনোই পরিস্থিতির বিজ্ঞাপন হয়ে ওঠে না।

আবার কী ঝামেলা পাকাতে এলো ব্যাটা? মনের গহন ভাবনাটা নির্লিপ্ততার মোড়কে মুড়ে লালু দ্রুতপায়ে সদর গেটের তালা খুলে শফির মুখোমুখি হয়। শফি একা আসেনি। সাঙ্গপাঙ্গ জুটিয়ে এনেছে। মাসের টাকা নেবার সময় সে একাই আসে। আজ নিশ্চয়ই একটা ঘাপলা হবে। মনে মনে সে বিপদমুক্তির দোয়া পড়তে শুরু করে, ‘লাইলা-হা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতুমিনাজ্জালিমিন।’ 

-দরজা পিডাইতেছি কহনথে। ঘুমাইছিলি না কি?

হম্বিতম্বির বদলে মিহিসুরে কথা বলতে শুনে লালু কিছুটা বিস্মিত হয়। বিস্ময়টুকু আড়াল করে নির্লিপ্ত গলায় সে জানতে চায়,

-অবেলায় ইরম পিডাপিডির প্রয়োজন হইল কেন শফিভাই?

-আর কইস না। ব্যাপক পে্‌জগিতে পড়ছি। আইজ 
রাতের মইদ্যে তোরে একটা রুম খালি করতে হইবো।

-তোমার পেজগি ছুটাইতে আমারে কেন রুম খালি করা লাগবি ভাই? কিসুই বুঝলাম না…

-দেখ লাওল্যা, মুখে না কইয়া রুম এমনিই দখল নিবার পারি। জানোস তো না কি জানোস না?

-দখল নিবা মানে? মাসে মাসে অত্তগুলান টেকা কি তুমি…

লালুর মুখের ওপর ত্রস্তে উড়ে আসা একটা সবল হাত চাপা পড়ায় ওর আর কথায় সমাপ্তি টানা হয় না। মুখচাপা অবস্থায় সে অবাক চোখে তাকায়। টের পায়, শফি চায় না প্রতি মাসে ওর টাকা আদায়ের খবরটা জানাজানি হোক। সঙ্গে ছেলেছোকরা থাকায় হম্বিতম্বির দাপট দেখাচ্ছে।

একহাতে লালুর মুখ চেপে ধরেই শফি অন্য হাতে ওকে টেনে কিছুটা দূরে নিয়ে যায়। কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে,

-ভাইরে বড় বিপদে পইড়া যামু যদি রুম খালি না পাই। হোটেল মোটেল অহন নিরাপদ না। আবাসিক এলাকায় রুম দরকার। বসের হুকুম। এইসব এলাকায় কেউ কিসু সন্দেহ করবো না।

শফির কথার মাথামুণ্ডু কিছু বুঝে উঠতে পারে না লালু। বোকার মতো মাথা চুলকায়।

দ্রুত সে কিছু একটা ভেবে নেয়। যথাসম্ভব নরম গলায় জানতে চায় রুমের প্রয়োজন কেন সেটা না জানলে তার পক্ষে মালিকের অনুমতি পাওয়া সম্ভব না। খ্যাক খ্যাক করে একপশলা হেসে নেয় শফি। ওকে হাসতে দেখে সঙ্গের ছেলেগুলোও চাবি দেওয়া পুতুলের মতো হেসে ওঠে।

-আরে বেকুব তার জন্য মালিকরে জিগানির কি কাম? দুই-তিন দিনেরই তো ব্যাপার! তাছাড়া বসের বন্ধু খুবই মালদার পাট্টি। ফেসিস্ট দল করায় বিপদে পইড়া গেছে। লোক ভালা। নিরাপদ সেল্টার না পাইলে বাঁচবো কি না কে জানে। অমত করিস না। চৌধুরী সাবরে কিছু জানানির কাজ নাই। দিন তিনেক পার হইলেই তারে আমরা এহানথে সরায়া নিমু। এরজন্য কিন্তু মোটা বকশিসও পাবি ব্যাটা।
 
টাকার লোভ লালুর নেই। বিষয়টা যে সে বুঝেনি তাও নয়। তবুও সে একরোখার মতো বলে,

- না ভাই, মালিকের হুকুম বিনা ঘর দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। চাইলে তুমি আমারে পিডাইতেও পারো শফিভাই।

শফির কাছে লালুর বক্তব্য অবিশ্বাস্য মনে হলেও ওর নির্লিপ্ত এবং ঋজু ভঙ্গিতে এমন কিছু ছিল, যা তাকে বাকরহিত করে রাখলো কয়েক মুহূর্ত। শফির সঙ্গে আগত ছোকরাগুলো কিছু ঘটানোর জন্য রীতিমত উশখুশ করছিল। তারা প্রস্তুত হয়েই এসেছিল। কিন্তু শফির অদ্ভুত ব্যবহারে তারা যেন তাদের কর্তব্য স্থির করতে গিয়ে দ্বিধায় পড়ে গেছে। দেখতে অবিকল বাঁশের গায়ে পাঞ্চাবি লটকানো শুটকো মতো একজন হাতের হকিস্টিক তুলে খামোখাই পিলারে কয়েক ঘা বসিয়ে দিলো। দুজন ছোকরা তোতাপাখির মতো সুর তুলে গলার রগ ফুলিয়ে চেঁচিয়ে উঠল,
-নাই নাই ক্ষমা নাই
ফেসিস্টের ঠাঁই নাই এই বাংলায়…

সাঙ্গপাঙ্গের অযাচিত নাটকে বিরক্ত মুখে খেঁকিয়ে উঠল শফি,

-চোপ্ শালারা। পাইছে একটা স্লোগান। যেটা কস তার মানে জানোস? বানান বল দেখি?

মাস কয়েক আগে হুবহু এই কথাগুলো চুপচাপ তাকে হজম করতে হয়েছিল। সুযোগ পেয়ে আজ ওদের ওপর ঝেড়ে দিলো শফি। বসের কাছে তার কৃতজ্ঞতার শেষ নাই। সেও বসের বহু কুকর্মে সাক্ষী। হয়তো নতুন কাজে লাগানোর ধান্ধায় সরকার পতনের পর চটজলদি বস তাকে গরাদমুক্ত করেছে। এর জন্য তার কাছে সে ঋণী। তাই বলে বসের দোস্তের ফাঁপর কেন সে সহ্য করবে! কিন্তু উপায় কী। লোকটা এখন সরকারের উঁচু গদি পেয়েছে। বসও তারে তেলায়। বস ভালো করেই জানে ব্যাটা এক নম্বরের খাইষ্ট্যা। তার ওপর বাটপার এবং ছ্যাবলা। সেই লোকরে অখন ক্ষমতায় বসানো হইছে। এরাই অখন দেশের রাজাবাদশা, হুকুমদার। 

জেলমুক্তির পর কৃতজ্ঞতা জানাতে সর্বপ্রথম সে ছুটে গিয়েছিল বসের কাছে। গিয়ে দেখে বস দপ্তরে নাই। দোস্তের দপ্তরে আছেন, সেখানেই ছুটে গিয়েছিল শফি। তেলবাজির নমুনা হিসেবে স্লোগান তুলেছিল রুমে ঢোকার মুখে…

-হায় আল্লা মালেক! এই তোমার সেই মক্কেল? 
বসকে উদ্দেশ্য করে লোকটা মিটিমিটি হেসে কথাগুলো বলেছিল। তারপর ওর দিকে তাকিয়ে পিত্তিতে জ্বালা ধরিয়ে জানতে চেয়েছিল,

-এই, তুমি যে ফ্যাসিস্ট বলছো অর্থ জানো? বানান  বলো দেখি?

শফি পাকে পড়া সিংহের মতো ভেতরে গর্জালেও মুখে কিছু বলতে পারেনি। তবে ওকে ঠান্ডা চোখে স্থির তাকিয়ে থাকতে দেখে লোকটা সম্ভবত কিছুটা ঘাবড়েছিল। অসাধু মানুষের মনে সর্বদা ভয় খেলা করে। সর্বক্ষণ সে মনের বাঘের কাল্পনিক হালুমে সিঁটকে থাকে।

ছোকরাগুলো শফির ধমকে যতটা চুপসে যায় তারচে বেশি হয় বিস্মিত। হয়তো তারা ভাবতে থাকে এখানে আসার আগ পর্যন্ত বড়ভাই যে মনোভাব দেখিয়েছে এখন তার সম্পূর্ণ বিপরীত আচরণের মাজেজা কী!

দেশময় এখন সবাই যেন হুজুগে মত্ত। কোনোরকম জবাবদিহিতার বালাই নাই। ওদের জন্য এখন প্রতিদিনই হুজুগ-উৎসবের দিন। কোথায় ফ্যাসিস্টের দোসর আছে তাদের খুঁজে বের করে তুলোধুনো করতে পারা অন্য লেবেলের বিনোদন। তাছাড়া উপরি প্রাপ্তিও নেহায়েত কম হচ্ছে না। এখানে আসবার আগে, ওদের বলা হয়েছে এই আলিশান বাড়ির মালিক ফেসিস্টের ঘনিষ্ঠ লোক। কাজেই এই বাড়িতে লুটপাট করা কার্যত তাদের নৈতিক দায়িত্ব। লতপতে শরীরের ওই কেয়ারটেকারকে কয়েক ঘায়েই ধরাশায়ী করা সম্ভব। সেসব না করে বড়ভাই কী গুজুর গুজুর জুড়েছে তার সঙ্গে।

-শোন লালু, তোর উসিলায় যদি একটা মাইনষের জীবন বাঁচে কত্ত সোয়াব পাবি সেইটা একবার ভাইব্যা দেখ। দোয়া শুধু তার একারই পাবি না, তার বালবাচ্চা-বিবি, সবাই তোর জন্য দোয়া করবো। তাছাড়া তুই চাস্ না একটা লোকের সঙ্গে ইনসাফ হোক?

শফিখুরকে প্রথমবারের মতো তার নামটা শুদ্ধ করে বলতে শুনলো সে। উপরন্তু ও যে কথাগুলো বললো তাতে লালুর ভেতর একরকম দ্বন্দ্ব তৈরি হলো। তার একমন বলল, দরকার নাই ঝামেলায় যাওয়ার। অন্য মনটা বলে উঠল, আহা সত্যিই তো তার জন্য যদি নিরাপরাধ কারো জীবন বেঁচে যায় সেইটা তো সোয়াবেরই কাজ। অন্তত কারো ক্ষতি তো সে করছে না। কয়েকটা দিনের যখন ব্যাপার, তখন সাহেবকে না জানালে তিনি টেরও পাবেন না।

-তিনদিনই তো শফিভাই? মনে থাকে য্যান।

-হ একদম। তাইলে আইজ রাত আট কি নয়টায় তারে নিয়া আসবো। 

ঘুরে দাঁড়িয়ে সাঙ্গপাঙ্গদের তাড়া দেয় শফি। 

-ওই চল তোরা। আপাতত কাজ শ্যাষ। 

আগত ছোকরাগুলোর দেহভঙ্গিমায় স্পষ্টত আশাহতের লক্ষণ ফুটে উঠতে দেখা যায়। কোনোরকম হাঙ্গামা দূরের কথা, একটা কুটো পর্যন্ত হালাল না করেই বড়ভাই বিদায় নিচ্ছে, এর মানে কী! লালুকে আড়াল করে শফি ছেলেগুলোকে এমন কিছু ইঙ্গিত করে যা তাদের মনে আশার আলো ছড়ায়। হৃষ্টচিত্তে তারা শফির পিছু পিছু বিদায় নেয়।

দিন কয়েক পর সোশ্যাল মিডিয়ায় মবসন্ত্রাসের শত খবরের ভিড়ে আরেকটি টাটকা খবর ভেসে বেড়াতে দেখা যায়। অমুক এলাকায় ক্ষুব্ধ ছাত্রজনতার রোষানলে পড়ে ফ্যাসিস্টের দোসর তমুক নেতার মৃত্যু। জানা যায় আংশিক অগ্নিদগ্ধ আলিশান ধানসিঁড়ি নামের বাড়িটিতে উক্ত নেতা আত্মগোপনে ছিলেন। তাকে আশ্রয় দেবার অপরাধে বাড়ির কেয়ারটেকারও জনতার রোষ থেকে রক্ষা পায়নি। ফ্যাসিস্টের দোসর বাড়ির মালিক পালিয়ে বিদেশ চলে গেছে। তৌহিদী ছাত্রজনতা ঘোষণা দিয়েছে, বাড়িটিকে অমুক দলের দলীয় কার্যলয় হিসেবে ব্যবহার করা হবে।

ধানসিঁড়ির মূল্যবান আসবাবপত্র, গাড়ি লুটপাটের ছবি আর ভিডিওর পাশাপাশি সফল সেই অভিযানের  নায়ককে বামহাত উঁচিয়ে ভি চিহ্ন প্রদর্শন করতে দেখা যায়। হাস্যোজ্বল শফিখুরের ছবি রীতিমত বীরের মর্যাদায় সোশ্যাল মাধ্যমে ভেসে বেড়াতে থাকে।

মাৎস্যন্যায়
নাহার তৃণা


মন্তব্য

BLOGGER: 1
  1. বা! লেখিকার হাত আছে মাইরি, একথা স্বীকার করতেই হবে।

    উত্তরমুছুন
মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা পাঠ করুন।

নাম

অনুবাদ,40,আত্মজীবনী,27,আর্ট-গ্যালারী,2,আলোকচিত্র,1,ই-বুক,7,ইচক দুয়েন্দে,23,উৎপলকুমার বসু,26,ঋত্বিক-ঘটক,4,কবিতা,347,কবিতায় কুড়িগ্রাম,7,কর্মকাণ্ড,16,কার্ল মার্ক্স,1,গল্প,84,ছড়া,1,জার্নাল,4,জীবনী,6,দশকথা,25,দিনলিপি,1,পাণ্ডুলিপি,11,পুনঃপ্রকাশ,22,পোয়েটিক ফিকশন,1,প্রতিবাদ,1,প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা,4,প্রবন্ধ,174,প্রিন্ট সংখ্যা,5,বই,4,বর্ষা সংখ্যা,1,বসন্ত,15,বিক্রয়বিভাগ,21,বিবিধ,2,বিবৃতি,1,বিশেষ,25,বুলেটিন,4,বৈশাখ,1,ভাষা-সিরিজ,5,ভিডিও,1,মাসুমুল আলম,35,মুক্তগদ্য,42,মে দিবস,1,যুগপূর্তি,6,রিভিউ,5,লকডাউন,2,শম্ভু রক্ষিত,2,শাহেদ শাফায়েত,25,শিশুতোষ,1,সন্দীপ দত্ত,14,সম্পাদকীয়,19,সাক্ষাৎকার,24,সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ,18,সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ,55,সৈয়দ সাখাওয়াৎ,33,স্মৃতিকথা,15,হেমন্ত,1,
ltr
item
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন: মাৎস্যন্যায় [ছোটোগল্প] • নাহার তৃণা
মাৎস্যন্যায় [ছোটোগল্প] • নাহার তৃণা
নাহার তৃণার রাজনৈতিক গল্প ‘মাৎস্যন্যায়’৷ বাঙলা ভাষা ও সাহিত্যের লিটল ম্যাগাজিন • বিন্দু
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEhgIYet1ttgDzdEGgLoTOAJPiaeiF8ozglwSHV27RM2mNuVUcSTd-7KMJm74P5hMmhze0ZH7z8R2MKlikUlLgiAxkrGF3h_AEip6QlPdly0XHleIKJiqH4FdFZ-r5jDjzjSVsg-I9gqJs7bM9F1OCZWo09u7SrxmXXNfknVyCCYf879T1aItNWCRFUf6_o/s16000/%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A7%8E%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A7%9F%0A%E2%80%A2%20%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%B0%20%E0%A6%A4%E0%A7%83%E0%A6%A3%E0%A6%BE%20%E2%80%A2%20%E0%A6%97%E0%A6%B2%E0%A7%8D%E0%A6%AA%20%E2%80%A2%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%81%20%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%9F%E0%A6%B2%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%97.png
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEhgIYet1ttgDzdEGgLoTOAJPiaeiF8ozglwSHV27RM2mNuVUcSTd-7KMJm74P5hMmhze0ZH7z8R2MKlikUlLgiAxkrGF3h_AEip6QlPdly0XHleIKJiqH4FdFZ-r5jDjzjSVsg-I9gqJs7bM9F1OCZWo09u7SrxmXXNfknVyCCYf879T1aItNWCRFUf6_o/s72-c/%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A7%8E%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A7%9F%0A%E2%80%A2%20%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%B0%20%E0%A6%A4%E0%A7%83%E0%A6%A3%E0%A6%BE%20%E2%80%A2%20%E0%A6%97%E0%A6%B2%E0%A7%8D%E0%A6%AA%20%E2%80%A2%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%81%20%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%9F%E0%A6%B2%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%97.png
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন
https://www.bindumag.com/2026/06/nahar-trina.html
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/2026/06/nahar-trina.html
true
121332834233322352
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts আরো Readmore উত্তর Cancel reply মুছুন By নী PAGES POSTS আরো এই লেখাগুলিও পড়ুন... বিষয় ARCHIVE SEARCH সব লেখা কোন রচনায় খুঁজে পাওয়া গেল না নীড় Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share to a social network STEP 2: Click the link on your social network Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy