রেমন্ড কার্ভার (Raymond Carver) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী আমেরিকান ছোটগল্পকার এবং কবি। ১৯৮০-এর দশকে আমেরিকান ছোটগল্পের পুনরুজ্জীবনে তিনি প্রধান ভূমিকা পালন করেন। অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও মাপা শব্দের জাদুকরী লেখার শৈলী (যাকে সাহিত্যে ‘Minimalism’ বা ‘Dirty Realism’ বলা হয়) তাকে বিশ্বজোড়া খ্যাতি এনে দেয়।
এই অন্ধ লোকটি, আমার স্ত্রীর এক পুরোনো বন্ধু, রাতটা কাটানোর জন্য আসছিলেন। ওর স্ত্রী মারা গিয়েছিল। তাই ও কানেকটিকাটে মৃত স্ত্রীর আত্মীয়দের সাথে দেখা করতে যাচ্ছিল। ও তাঁর শ্বশুরবাড়ি থেকে আমার স্ত্রীকে ফোন করেছিল। সব ব্যবস্থা হয়ে গেল। ও ট্রেনে করে আসবে, পাঁচ ঘণ্টার যাত্রা, আর আমার স্ত্রী স্টেশনে ওর সাথে দেখা করবে। দশ বছর আগে সিয়াটলে এক গ্রীষ্মে ওর অধীনে কাজ করার পর থেকে আমার স্ত্রী ওকে আর দেখেননি। কিন্তু শে আর সেই অন্ধ লোকটি যোগাযোগ ধরে রেখেছিল। ওরা টেপ তৈরি করে একে অপরকে ডাকে পাঠাত। ওর এই আসা নিয়ে আমি খুব একটা উৎসাহিত ছিলাম না। ও আমার পরিচিত কেউ ছিল না। আর ওর অন্ধ হওয়াটা আমাকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল। অন্ধত্ব সম্পর্কে আমার ধারণা এসেছিল সিনেমা থেকে। সিনেমায় অন্ধরা ধীরে ধীরে চলে আর কখনো হাসে না। কখনও কখনও ওদের পথপ্রদর্শক কুকুর থাকত। আমার বাড়িতে একজন অন্ধ লোকের আসাটা এমন কিছু ছিল না যা আমি সানন্দে গ্রহণ করব।
সিয়াটলে সেই গ্রীষ্মে তার একটি চাকরির প্রয়োজন ছিল। তার কাছে কোনো টাকা ছিল না। গ্রীষ্মের শেষে শে যাকে বিয়ে করতে যাচ্ছিল, সেই লোকটি অফিসারদের প্রশিক্ষণ স্কুলে ছিল। ওর কাছেও কোনো টাকা ছিল না। কিন্তু শে ছেলেটার প্রেমে পড়েছিল, আর ছেলেটাও তার প্রেমে পড়েছিল, ইত্যাদি। শে খবরের কাগজে একটা বিজ্ঞাপন দেখেছিল: সহযোগিতা আবশ্যক— অন্ধকে পড়ে শোনানো, আর সাথে একটা ফোন নম্বর। শে ফোন করে সেখানে গেল, আর সাথে সাথেই চাকরিটা পেয়ে গেল। শে পুরো গ্রীষ্মকাল ধরে এই অন্ধ লোকটার সাথে কাজ করেছিল। শে তাকে বিভিন্ন জিনিস পড়ে শোনাতো, কেস স্টাডি, রিপোর্ট, এই ধরনের জিনিস। শে তাকে কাউন্টি সমাজসেবা বিভাগে তার ছোট্ট অফিসটা গোছাতে সাহায্য করেছিল। আমার স্ত্রী আর সেই অন্ধ লোকটা খুব ভালো বন্ধু হয়ে গিয়েছিল। আমি এসব কীভাবে জানি? শে আমাকে বলেছিল। আর শে আমাকে আরও একটা কথা বলেছিল। অফিসে তার শেষ দিনে, অন্ধ লোকটা জিজ্ঞেস করেছিল শে তার মুখটা ছুঁতে পারে কিনা। শে এতে রাজি হয়ে গিয়েছিল। শে আমাকে বলেছিল যে লোকটা তার মুখের প্রতিটি অংশে, তার নাকে— এমনকি তার ঘাড়েও আঙুল ছুঁয়েছিল! শে এটা কখনও ভোলেনি। শে এটা নিয়ে একটা কবিতা লেখারও চেষ্টা করেছিল। শে সবসময়ই একটা কবিতা লেখার চেষ্টা করত। শে প্রতি বছর একটা বা দুটো কবিতা লিখত, সাধারণত তার জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটার পর।
আমরা যখন প্রথম একসাথে ঘুরতে শুরু করি, শে আমাকে কবিতাটা দেখিয়েছিল। কবিতাটিতে শে স্মরণ করেছে লোকটির আঙুলগুলো এবং যেভাবে সেগুলো তার মুখের ওপর ঘুরে বেড়িয়েছিল। কবিতাটিতে শে লিখেছে, সেই মুহূর্তে তার কেমন লেগেছিল, অন্ধ লোকটি যখন তাঁর নাক ও ঠোঁট স্পর্শ করেছিল, তখন তার মনে কী চলছিল। আমার মনে আছে, কবিতাটা নিয়ে তেমন একটা ভাবিনি। অবশ্য, আমি তাকে সেটা বলিনি। হয়তো আমি কবিতা বুঝিই না। আমি স্বীকার করি, পড়ার জন্য কিছু হাতে নিলে এটা আমার প্রথম পছন্দ নয়।
যাইহোক, যে লোকটি প্রথম তার অনুগ্রহ পেয়েছিল, সেই হবু অফিসার, সে ছিল তার ছোটবেলার প্রেমিক। তো ঠিক আছে, আমি বলছি যে গ্রীষ্মের শেষে শে অন্ধ লোকটিকে তার মুখে হাত বোলাতে দিয়েছিল, তাকে বিদায় জানিয়ে তার থেকে দূরে চলে গিয়েছিল, তার ছোটবেলার প্রেমিককে বিয়ে করেছিল, যে এখন একজন কমিশনপ্রাপ্ত অফিসার, এবং শে ও সেই অন্ধ লোকটি যোগাযোগ রেখেছিল। ও এক রাতে সিয়াটল থেকে তাকে ফোন করেছিল। কিন্তু এক বছর পর ওদের যোগাযোগ হয়। ও প্রথম ফোনটা করেছিল অ্যালাবামার একটি বিমানবাহিনীর ঘাঁটি থেকে। ও কথা বলতে চেয়েছিল। ওরা কথা বলেছিল। লোকটি তাকে একটি টেপ পাঠাতে এবং তার জীবন সম্পর্কে বলতে বলেছিল। শে তাই করেছিল। শে টেপটি পাঠিয়েছিল। টেপে শে অন্ধ লোকটিকে তার স্বামী এবং সেনাবাহিনীতে তাদের একসাথে কাটানো জীবন সম্পর্কে বলেছিল। শে অন্ধ লোকটিকে বলেছিল যে শে তার স্বামীকে ভালোবাসে, কিন্তু তারা যেখানে থাকত সেই জায়গাটা তার পছন্দ ছিল না এবং তার স্বামী যে সামরিক-শিল্প ব্যবস্থার অংশ ছিল, সেটাও শে পছন্দ করত না। শে অন্ধ লোকটিকে বলেছিল যে শে একটি কবিতা লিখেছে এবং তাতে ওও আছে। শে ওকে বলেছিল যে একজন বিমানবাহিনীর অফিসারের স্ত্রী হওয়ার অনুভূতি নিয়ে শে একটি কবিতা লিখছে। কবিতাটি তখনও শেষ হয়নি। শে তখনও লিখছিল। অন্ধ লোকটি একটি টেপ তৈরি করল। ও টেপটি তাকে পাঠাল। শেও একটি টেপ তৈরি করল। এইভাবে বছরের পর বছর চলল। আমার স্ত্রীর অফিসারকে এক ঘাঁটি থেকে আরেক ঘাঁটিতে বদলি করা হতো। শে মুডি এএফবি, ম্যাকগুইর, ম্যাককনেল এবং অবশেষে স্যাক্রামেন্টোর কাছের ট্র্যাভিস থেকে টেপ পাঠাতো, যেখানে এক রাতে শে একাকীত্ব এবং সেই বদলির জীবনে হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন বোধ করতে শুরু করে। তার মনে হতে লাগল যে শে আর এক পা-ও এগোতে পারবে না। শে ভেতরে গিয়ে ওষুধের বাক্সের সমস্ত বড়ি আর ক্যাপসুল গিলে ফেলল এবং এক বোতল জিন দিয়ে তা গিলে ফেলল। তারপর শে একটি গরম জলের বাথটাবে ঢুকে অজ্ঞান হয়ে গেল।
কিন্তু মারা যাওয়ার পরিবর্তে, শে অসুস্থ হয়ে পড়ল। বমি করল। তার অফিসার—তার আবার নাম থাকবে কেন? সে তো তার ছোটবেলার প্রেমিক, আর সে এর চেয়ে বেশি কী-ই বা চায়? কোথা থেকে যেন বাড়ি ফিরে এসে তাকে খুঁজে পেল এবং অ্যাম্বুলেন্স ডাকল। সময়মতো, শে সবকিছু একটি টেপে রেকর্ড করে সেই অন্ধ লোকটির কাছে পাঠিয়ে দিল। বছরের পর বছর ধরে, ও নানা ধরনের কথা টেপে রেকর্ড করে ঝটপট পাঠিয়ে দিত। আমার মনে হয়, প্রতি বছর একটি কবিতা লেখার পর এটাই ছিল তার বিনোদনের প্রধান মাধ্যম। একটি টেপে, শে সেই অন্ধ লোকটিকে বলেছিল যে শে কিছুদিনের জন্য তার অফিস থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অন্য একটি টেপে শে ওকে তার ডিভোর্সের কথা বলেছিল। আমি আর শে ডেটিং শুরু করলাম, এবং অবশ্যই শে তার অন্ধ লোকটিকে এ ব্যাপারে জানিয়েছিল। শে তাকে সবকিছুই বলেছিল, অন্তত আমার কাছে তাই মনে হয়েছিল। একবার শে আমাকে জিজ্ঞেস করল, আমি অন্ধ লোকটির কাছ থেকে পাওয়া নতুন টেপটা শুনতে চাই কি না। এটা এক বছর আগের কথা। শে বলল, টেপটাতে আমার কথাও আছে। তাই আমি বললাম ঠিক আছে, আমি শুনব। আমি আমাদের জন্য পানীয় আনলাম এবং আমরা বসার ঘরে গিয়ে বসলাম। আমরা শোনার জন্য প্রস্তুত হলাম। প্রথমে শে প্লেয়ারে টেপটা ঢুকিয়ে দুটো ডায়াল ঠিক করল। তারপর শে একটা লিভার চাপল। টেপটা ক্যাঁচ করে উঠল এবং কেউ একজন খুব জোরে কথা বলতে শুরু করল। শে ভলিউম কমিয়ে দিল। কয়েক মিনিটের নিরীহ কথাবার্তার পর, আমি এই অচেনা লোকটির মুখে আমার নিজের নাম শুনতে পেলাম, এই অন্ধ লোকটি যাকে আমি চিনতামও না! আর তারপর এই কথা: “তার সম্পর্কে তুৃমি যা যা বলেছো, তা থেকে আমি শুধু এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে—” কিন্তু আমাদের কথা মাঝপথে থেমে গেল, দরজায় টোকা পড়ল, বা অন্য কিছু একটা হলো, এবং আমরা আর টেপটা শুনতে ফিরে যাইনি। হয়তো সেটাই ভালো হয়েছে। আমি যা শুনতে চেয়েছিলাম, তার সবই শুনে ফেলেছিলাম।
এখন সেই একই অন্ধ লোকটি আমার বাড়িতে ঘুমাতে আসছিল।
“আমি হয়তো ওকে বোলিংয়ে নিয়ে যেতে পারি,” আমি আমার স্ত্রীকে বললাম। শে তখন জল ঝরানোর বোর্ডে স্ক্যালপড পটেটো বানাচ্ছিল। শে তার ব্যবহার করা ছুরিটা নামিয়ে রেখে ঘুরে দাঁড়াল।
“যদি তুমি আমাকে ভালোবাসো,” শে বলল, “তাহলে তুমি আমার জন্য এটা করতে পারো। যদি না-ও ভালোবাসো, ঠিক আছে। কিন্তু তোমার যদি কোনো বন্ধু থাকত, যেকোনো বন্ধু, আর সেই বন্ধু যদি দেখা করতে আসত, আমি তাকে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে দিতাম।” শে ডিশ টাওয়েল দিয়ে তার হাত মুছল।
“আমার কোনো অন্ধ বন্ধু নেই,” আমি বললাম।
“তোমার কোনো বন্ধুই নেই,” শে বলল। “একদমই নেই। তাছাড়া,” শে বলল, “ধ্যাৎ, লোকটার বউ তো এইমাত্র মারা গেল! তুমি কি এটা বোঝো না? লোকটা ওর বউকে হারিয়েছে!”
আমি কোনো উত্তর দিলাম না। শে আমাকে অন্ধ লোকটার বউয়ের ব্যাপারে কিছুটা বলেছিল। ওর নাম ছিল বিউলা। বিউলা! এটা তো একজন কৃষ্ণাঙ্গ মহিলার নাম।
“তার বউ কি নিগ্রো ছিল?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“তুমি কি পাগল হয়ে গেছ?” আমার স্ত্রী বলল। “তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি?” শে একটা আলু তুলে নিল। আমি দেখলাম ওটা মেঝেতে পড়ল, তারপর গড়িয়ে চুলার নিচে চলে গেল। “তোমার কী হয়েছে?” শে বলল। “তুমি কি মাতাল?”
“শুধু জিজ্ঞেস করছি,” আমি বললাম। ঠিক তখনই আমার স্ত্রী আমাকে এমন সব খুঁটিনাটি জানাল যা আমি জানতেও চাইনি। আমি একটা পানীয় বানিয়ে শোনার জন্য রান্নাঘরের টেবিলে বসলাম। গল্পের খণ্ডগুলো একে একে স্পষ্ট হতে লাগল।
আমার স্ত্রী অন্ধ লোকটির কাছে কাজ করা ছেড়ে দেওয়ার পরের গ্রীষ্মে বিউলা তার কাছে কাজ করতে গিয়েছিল। খুব শীঘ্রই বিউলা আর অন্ধ লোকটি গির্জায় বিয়ে করে ফেলল। বিয়েটা ছিল খুবই ছোট — প্রথমত, এমন বিয়েতে কে-ই বা যেতে চাইবে?— শুধু ওরা দুজন, সাথে যাজক আর ওর স্ত্রী। কিন্তু তা সত্ত্বেও এটা একটা গির্জার বিয়েই ছিল। লোকটি বলেছিল, বিউলা নাকি এটাই চেয়েছিল। কিন্তু তখনও নিশ্চয়ই বিউলার গ্রন্থিতে ক্যান্সার ছিল। আট বছর ধরে ওরা অবিচ্ছেদ্য থাকার পর— আমার স্ত্রীর ভাষায়, অবিচ্ছেদ্য— বিউলার স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি হতে শুরু করে। সিয়াটলের একটি হাসপাতালের কক্ষে শে মারা যায়, অন্ধ লোকটি বিছানার পাশে বসে ওর হাত ধরে ছিল। ওরা বিয়ে করেছিল, একসাথে থেকেছে ও কাজ করেছে, একসাথে ঘুমিয়েছে— অবশ্যই যৌনমিলনও করেছে— আর তারপর অন্ধ লোকটিকেই ওকে কবর দিতে হয়েছিল। এই সবকিছু ও কোনোদিন দেখেইনি যে ওই হতচ্ছাড়া নারী দেখতে কেমন ছিল। এটা আমার বোধগম্যতার বাইরে ছিল। এই কথা শুনে অন্ধ লোকটির জন্য আমার কিছুক্ষণের জন্য দুঃখ হয়েছিল। আর তখন আমি ভাবতে লাগলাম, এই নারীর জীবনটা নিশ্চয়ই কী করুণ ছিল। ভাবুন তো এমন একজন নারীর কথা, যে তার প্রিয়জনের চোখে নিজেকে কখনও সেভাবে দেখতে পায়নি। এমন একজন নারী, যে দিনের পর দিন কাটিয়ে দিয়েছে, অথচ ওর প্রিয়জনের কাছ থেকে সামান্যতম প্রশংসাও পাননি। এমন একজন নারী, যার স্বামী ওর মুখের অভিব্যক্তি কখনও পড়তে পারেনি, তা দুঃখের হোক বা তার চেয়ে ভালো কিছুর। ও সাজগোজ করুক বা না করুক— তাতে ওর স্বামীর কী আসে যায়? ও চাইলে এক চোখে সবুজ আইশ্যাডো, নাকের ছিদ্রে একটা পিন, হলুদ প্যান্ট আর বেগুনি জুতো পরতে পারতো, তাতে কিছুই যায় আসত না। আর তারপর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া, ওর হাতের ওপর অন্ধ লোকটির হাত, ওর অন্ধ চোখ থেকে ঝরে পড়া অশ্রু—আমি এখন কল্পনা করছি—ওর শেষ ভাবনা হয়তো এটাই ছিল: লোকটি তাকে দেখতে কেমন তা কখনও জানতেই পারেনি, আর ও কবরের দিকে দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। রবার্টের জন্য রইল একটি ছোট বীমা পলিসি আর কুড়ি পেসোর একটি মেক্সিকান মুদ্রার অর্ধেক। মুদ্রাটির বাকি অর্ধেক তার সাথে বাক্সে চলে গেল। করুণ।
তাই যখন সময় এলো, আমার স্ত্রী তাকে আনতে ডিপোতে গেল। অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না— হ্যাঁ, এর জন্য আমি ওকেই দোষ দিয়েছিলাম— আমি একটা ড্রিঙ্ক খাচ্ছিলাম আর টিভি দেখছিলাম, এমন সময় শুনলাম গাড়িটা ড্রাইভওয়েতে এসে থামল। আমি আমার ড্রিঙ্কটা নিয়ে সোফা থেকে উঠে জানালার কাছে গেলাম উঁকি দিয়ে দেখার জন্য।
দেখলাম আমার স্ত্রী হাসতে হাসতে গাড়িটা পার্ক করছে। দেখলাম শে গাড়ি থেকে নেমে দরজাটা বন্ধ করল। ওর মুখে তখনও হাসি লেগে ছিল। কী অসাধারণ! শে গাড়ির অন্য পাশে গেল, যেখানে অন্ধ লোকটি ইতোমধ্যেই নামতে শুরু করেছিল। এই অন্ধ লোকটি, মজার ব্যাপার হলো, ওর মুখে ছিল ঘন দাড়ি! একজন অন্ধ লোকের মুখে দাড়ি! বাড়াবাড়ি, আমি বলব। অন্ধ লোকটি পেছনের সিটে হাত ঢুকিয়ে একটা স্যুটকেস টেনে বের করল। আমার স্ত্রী ওর হাত ধরল, গাড়ির দরজা বন্ধ করল, এবং কথা বলতে বলতে তাকে ড্রাইভওয়ে দিয়ে নিচে নামিয়ে সিঁড়ি বেয়ে সামনের বারান্দায় নিয়ে গেল। আমি টিভি বন্ধ করলাম, আমার ড্রিঙ্ক শেষ করলাম, গ্লাসটা ধুয়ে নিলাম, হাত মুছলাম। তারপর আমি দরজার কাছে গেলাম।
আমার স্ত্রী বলল, “আমি চাই তুমি রবার্টের সাথে পরিচিত হও। রবার্ট, ইনি আমার স্বামী। আমি তোমাকে তার সম্পর্কে সব বলেছি।” শে হাসিমুখে ছিল। শে একজন অন্ধ লোকের কোটের হাতা ধরেছিল।
অন্ধ লোকটি তার স্যুটকেস ছেড়ে দিয়ে হাত বাড়ালো।
আমি হাতটা ধরলাম। ও জোরে চাপ দিয়ে আমার হাতটা কিছুক্ষণ রাখল, তারপর ছেড়ে দিল।
“আমার মনে হচ্ছে আমাদের আগে থেকেই দেখা হয়েছে...” ও গম্ভীর গলায় বলল।
“আমারও তাই মনে হচ্ছে,” আমি বললাম। আর কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। তারপর বললাম, “স্বাগতম। আপনার সম্পর্কে অনেক শুনেছি।”
এরপর আমরা ছোট একটা দল হয়ে বারান্দা থেকে বসার ঘরের দিকে এগোতে লাগলাম, আমার স্ত্রী ওর হাত ধরে পথ দেখাচ্ছিল। অন্ধ লোকটির অন্য হাতে ওর স্যুটকেসটা ছিল। আমার স্ত্রী বলছিল, “এই যে আপনার বাঁদিকে, রবার্ট। ঠিক তাই। এবার দেখুন, ওখানে একটা চেয়ার আছে। ওই তো। এখানেই বসুন। এটাই সোফা। আমরা এই সোফাটা মাত্র দু'সপ্তাহ আগে কিনেছি।”
আমি পুরনো সোফাটা নিয়ে কিছু বলতে শুরু করেছিলাম। পুরনো সোফাটা আমার পছন্দ ছিল। কিন্তু আমি কিছুই বললাম না। তারপর আমি অন্য কিছু বলতে চাইলাম, হালকা কথাবার্তা, হাডসন নদীর ধারের মনোরম যাত্রাপথ নিয়ে। যেমন, নিউ ইয়র্কে যাওয়ার সময় ট্রেনের ডানদিকে বসা উচিত, আর নিউ ইয়র্ক থেকে ফেরার সময় বামদিকে।
“আপনার ট্রেন যাত্রা কেমন ছিল?” আমি বললাম।
“আচ্ছা, আপনি ট্রেনের কোন দিকে বসেছিলেন?”
“কী প্রশ্ন, কোন দিকে!” আমার স্ত্রী বলল।
“কোন দিকে, তাতে কী আসে যায়?” শে বলল।
“আমি তো শুধু জিজ্ঞেস করছিলাম,” আমি বললাম।
“ডান দিকে,” অন্ধ লোকটি বলল। “আমি প্রায় চল্লিশ বছর ট্রেনে চড়িনি। ছোটবেলার পর আর না। আমার বাবা-মায়ের সাথে। অনেক দিন হয়ে গেছে। আমি প্রায় সেই অনুভূতিটাই ভুলে গিয়েছিলাম। আমার দাড়িতে এখন তুষার জমেছে,” ও বলল। “অন্তত আমাকে তাই বলা হয়েছে। আমাকে কি সম্ভ্রান্ত দেখাচ্ছে, প্রিয়তমা?” অন্ধ লোকটি আমার স্ত্রীকে বলল।
“আপনাকে সম্ভ্রান্ত দেখাচ্ছে, রবার্ট,” শে বলল। “রবার্ট,” শে বলল। “রবার্ট, আপনাকে দেখে কী যে ভালো লাগছে।” আমার স্ত্রী অবশেষে অন্ধ লোকটির দিক থেকে চোখ সরিয়ে আমার দিকে তাকাল। আমার মনে হলো, শে যা দেখল তা তার পছন্দ হয়নি। আমি কাঁধ ঝাঁকালাম। আমি কখনও এমন অন্ধ লোকের সাথে দেখা করিনি বা ব্যক্তিগতভাবে ওকে চিনিও না। এই অন্ধ লোকটির বয়স চল্লিশের কোঠার শেষের দিকে, স্থূলকায়, টাকমাথা, কুঁজো কাঁধের একজন মানুষ, যেন সেখানে তার বিশাল কোনো বোঝা রয়েছে। সে বাদামী প্যান্ট, বাদামী জুতো, হালকা-বাদামী শার্ট, একটি টাই এবং একটি স্পোর্টস কোট পরেছিল। চমৎকার। তারও ঘন দাড়ি ছিল। কিন্তু তিনি লাঠি ব্যবহার করতেন না এবং কালো চশমাও পরতেন না।
আমি সবসময় ভাবতাম অন্ধদের জন্য কালো চশমা আবশ্যক। সত্যি বলতে, আমার ইচ্ছা হচ্ছিল ওর যদি একজোড়া থাকত। প্রথম দেখায়, ওর চোখ দুটোকে আর পাঁচটা সাধারণ চোখের মতোই মনে হচ্ছিল। কিন্তু কাছ থেকে দেখলে, ওগুলোর মধ্যে কিছু একটা ভিন্নতা ছিল। প্রথমত, চোখের মণিতে সাদা অংশটা একটু বেশি, আর চোখের মণিগুলো যেন ওর অজান্তেই বা ওর অজান্তেই কোটরের মধ্যে নড়াচড়া করছিল। গা ছমছমে ব্যাপার। আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, বাঁ চোখের মণিটা নাকের দিকে বেঁকে গেল, আর অন্যটা এক জায়গায় থাকার চেষ্টা করছে। কিন্তু সেটা শুধুই একটা চেষ্টা ছিল, কারণ ওই চোখটা ওর অজান্তেই বা ওর ইচ্ছার বিরুদ্ধে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছিল। আমি বললাম, “আপনার জন্য একটা পানীয় নিয়ে আসি। কী চান? আমাদের কাছে সব ধরনের পানীয়ই অল্প অল্প আছে। এটা আমাদের একটা শখ।”
“বাব, আমি নিজেই একজন স্কচপ্রেমী,” ও ওর ভারী গলায় বেশ দ্রুতই বলে উঠল।
“ঠিক,” আমি বললাম। বাব! “নিশ্চয়ই, আমি জানতাম।” ও সোফার পাশে রাখা ওর সুটকেসটায় আঙুল রাখল। ও চারদিকটা বুঝে নিচ্ছিল। এর জন্য আমি ওকে দোষ দিইনি।
“আমি ওটা আপনার ঘরে নিয়ে যাচ্ছি...” আমার স্ত্রী বলল।
“না, ঠিক আছে,” অন্ধ লোকটি জোরে বলল। “আমি গেলে ওটা উপরে যাবে।”
“স্কচের সাথে একটু জল?” আমি বললাম।
“খুব সামান্য,” ও বলল।
“আমি জানতাম,” আমি বললাম।
ও বলল, “শুধু একটুখানি। আইরিশ অভিনেতা, ব্যারি ফিট্জেরাল্ড? আমি ঠিক ওই লোকটার মতো। ফিট্জেরাল্ড বলতেন, আমি যখন জল খাই, তখন জলই খাই। যখন হুইস্কি খাই, তখন হুইস্কিই খাই।”
আমার স্ত্রী হেসে উঠল। অন্ধ লোকটি তার দাড়ির নিচে হাত ঢোকাল। ও ধীরে ধীরে দাড়িটা তুলে আবার ছেড়ে দিল। আমি পানীয় তৈরি করলাম, তিন গ্লাস বড় স্কচ, প্রতিটিতে সামান্য জল। তারপর আমরা আরাম করে বসলাম এবং রবার্টের ভ্রমণ নিয়ে কথা বললাম।
প্রথমে পশ্চিম উপকূল থেকে কানেকটিকাট পর্যন্ত দীর্ঘ বিমানযাত্রা, সেটা আমরা সেরে নিলাম। তারপর কানেকটিকাট থেকে ট্রেনে করে এখানে এলাম। যাত্রার ঐ অংশটা নিয়ে আমরা আরেকবার পান করলাম। আমার মনে পড়ল, কোথাও পড়েছিলাম যে অন্ধরা ধূমপান করে না, কারণ, যেমনটা ধারণা করা হয়, তারা তাদের নিঃশ্বাসের ধোঁয়া দেখতে পায় না। আমি ভেবেছিলাম অন্ধ মানুষদের সম্পর্কে আমি শুধু এটুকুই জানি। কিন্তু এই অন্ধ লোকটি ওর সিগারেটটা শেষ বিন্দু পর্যন্ত টেনে নিয়ে গিয়ে আরেকটা ধরাল। এই অন্ধ লোকটি ওর ছাইদানিটা ভরে ফেলল আর আমার স্ত্রী সেটা খালি করল। যখন আমরা রাতের খাবারের জন্য টেবিলে বসলাম, আমরা আরেকবার পান করলাম। আমার স্ত্রী রবার্টের প্লেটে কিউব স্টেক, স্ক্যালপড পটেটো, গ্রিন বিনস ভরিয়ে দিল। আমি তার জন্য দুটো পাউরুটির স্লাইসে মাখন মাখিয়ে দিলাম।
আমি বললাম, “এই নিন আপনার জন্য পাউরুটি আর মাখন।” আমি আমার পানীয় থেকে কিছুটা গিলে নিলাম।
“এবার আসুন আমরা প্রার্থনা করি,” আমি বললাম, আর অন্ধ লোকটি মাথা নিচু করল। আমার স্ত্রী হাঁ করে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
“প্রার্থনা করুন যেন ফোনটা না বাজে আর খাবারটা যেন ঠান্ডা না হয়ে যায়,” আমি বললাম।
আমরা খেতে বসে গেলাম। টেবিলে যা কিছু খাবার ছিল, সব খেয়ে ফেললাম। এমনভাবে খেলাম যেন কাল বলে কিছু নেই। আমরা কোনো কথা বললাম না। শুধু খেলাম। গোগ্রাসে গিললাম। টেবিলটা চেটেপুটে খেলাম। আমরা তখন পুরোপুরি খাওয়ায় মগ্ন ছিলাম। অন্ধ লোকটি সঙ্গে সঙ্গেই ওর খাবারগুলো খুঁজে নিল, ওর প্লেটে কোনটা কোথায় আছে তা সে ঠিকঠাক জানত। আমি মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম, কীভাবে সে ছুরি-কাঁটাচামচ দিয়ে মাংসটা খাচ্ছিল।
ও মাংসের দুটো টুকরো কেটে কাঁটাচামচ দিয়ে মুখে পুরে নিল, তারপর মন ভরে স্ক্যালপড পটেটো খেল, এরপর বিনস, আর তারপর মাখন মাখানো পাউরুটির একটা বড় টুকরো ছিঁড়ে খেল। এরপর ও বড় এক ঢোক দুধ খেল। মাঝে মাঝে আঙুল ব্যবহার করতেও ওর কোনো অসুবিধা হয় বলে মনে হলো না। আমরা অর্ধেক স্ট্রবেরি পাই সহ সবকিছু শেষ করলাম। কয়েক মুহূর্তের জন্য আমরা যেন হতবাক হয়ে বসে রইলাম। আমাদের মুখে ঘামের ফোঁটা জমেছিল। অবশেষে, আমরা টেবিল থেকে উঠে নোংরা প্লেটগুলো রেখে দিলাম। আমরা আর পিছনে ফিরে তাকালাম না। আমরা বসার ঘরে গিয়ে আবার নিজেদের জায়গায় বসে পড়লাম। রবার্ট আর আমার স্ত্রী সোফায় বসল। আমি বড় চেয়ারটা নিলাম। আমরা আরও দুই-তিন গ্লাস পানীয় পান করলাম, আর সেই ফাঁকে ওরা গত দশ বছরে ওদের জীবনে ঘটে যাওয়া বড় বড় ঘটনাগুলো নিয়ে কথা বলতে লাগল। বেশিরভাগ সময় আমি শুধু শুনছিলাম। মাঝে মাঝে আমিও যোগ দিচ্ছিলাম। আমি চাইনি ও ভাবুক যে আমি ঘর থেকে বেরিয়ে গেছি, আর আমি এটাও চাইনি যে আমার স্ত্রী ভাবুক আমি নিজেকে একা বা বাদ পড়া অনুভব করছি। ওরা গত দশ বছরে ওদের সাথে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা নিয়ে কথা বলছিল। আমি আমার স্ত্রীর মিষ্টি ঠোঁটে নিজের নামটা শোনার জন্য বৃথা অপেক্ষা করছিলাম: “আর তারপর আমার প্রিয় স্বামী আমার জীবনে এলো”—এরকম কিছু একটা। কিন্তু আমি সেরকম কিছুই শুনলাম না।
রবার্টকে নিয়ে আরও কথা হলো। মনে হচ্ছিল, রবার্ট প্রায় সবকিছুই করেছে, একেবারে অন্ধের মতো সর্ববিদ্যায় পারদর্শী। তবে সম্প্রতি ও আর ওর স্ত্রী একটি অ্যামওয়ে ডিস্ট্রিবিউটরশিপ চালাত, যেখান থেকে, আমি যতদূর বুঝলাম, ওরা ওদের জীবিকা নির্বাহ করত, যা-ই হোক না কেন। অন্ধ লোকটি একজন হ্যাম রেডিও অপারেটরও ছিল। ও ওর জোরালো গলায় গুয়াম, ফিলিপাইন, আলাস্কা, এমনকি তাহিতিতে সহকর্মী অপারেটরদের সাথে ওর কথোপকথনের কথা বলছিল। ও বলল, যদি ও কখনো ওই জায়গাগুলোতে বেড়াতে যেতে চায়, তাহলে সেখানে ওর অনেক বন্ধু থাকবে। মাঝে মাঝে, ও ওর অন্ধ মুখটা আমার দিকে ফেরাত, দাড়ির নিচে হাত ঢুকিয়ে আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করত। আমি আমার বর্তমান পদে কতদিন ধরে আছি? (তিন বছর।) আমি কি আমার কাজ পছন্দ করি? (করি না।) আমি কি এটা চালিয়ে যাব? (আর কী উপায় আছে?) অবশেষে যখন আমার মনে হলো ও ক্লান্ত হয়ে পড়ছে, আমি উঠে টিভিটা চালিয়ে দিলাম। আমার স্ত্রী বিরক্তি নিয়ে আমার দিকে তাকাল। ওর মাথায় ফোঁড়া ওঠার উপক্রম হয়েছিল। তারপর ও অন্ধ লোকটির দিকে তাকিয়ে বলল, “রবার্ট, আপনার কি টিভি আছে?”
অন্ধ লোকটি বলল, “প্রিয়, আমার দুটো টিভি আছে। একটা রঙিন সেট আর একটা সাদাকালো জিনিস, একটা পুরোনো নিদর্শন। ব্যাপারটা মজার, কিন্তু আমি যখনই টিভি চালাই, আর আমি তো সবসময়ই চালাই, আমি রঙিন সেটটাই চালাই। ব্যাপারটা মজার, তাই না?”
আমি এর উত্তরে কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। আমার বলার মতো সত্যিই কিছুই ছিল না। কোনো মতামতও না। তাই আমি সংবাদ অনুষ্ঠানটি দেখতে লাগলাম এবং ঘোষক কী বলছেন তা শোনার চেষ্টা করলাম।
অন্ধ লোকটি বলল, “এটা একটা রঙিন টিভি। আমাকে জিজ্ঞেস করবেন না কীভাবে, কিন্তু আমি বলতে পারি।”
“আমরা কিছুদিন আগেই আরও ভালো একটা বাড়ি কিনেছি,” আমি বললাম।
অন্ধ লোকটি তার পানীয়তে আরেক চুমুক দিল। ও তার দাড়ি তুলে শুঁকে দেখল, তারপর আবার নামিয়ে দিল। ও সোফায় সামনের দিকে ঝুঁকে বসল। কফি টেবিলের ওপর ছাইদানিটা রেখে সিগারেট লাইটার দিয়ে ধরাল। ও সোফায় হেলান দিয়ে গোড়ালির কাছে পা দুটো আড়াআড়ি করে রাখল। আমার স্ত্রী মুখ ঢাকল, তারপর হাই তুলল। শে আড়মোড়া ভাঙল। শে বলল, “আমার মনে হয় উপরে গিয়ে আমার পোশাকটা পরে আসি। আমি অন্য কিছু একটা পরে নেব। রবার্ট, তুমি আরাম করে বসো,” শে বলল।
“আমি আরামেই আছি,” অন্ধ লোকটি বলল।
“আমি চাই তুমি এই বাড়িতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করো,” শে বলল।
“আমি আরামেই আছি,” অন্ধ লোকটি বলল।
শে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর, আমি আর ও আবহাওয়ার খবর আর খেলাধুলার সারসংক্ষেপ শুনছিলাম। ততক্ষণে শে এতক্ষণ ধরে বাইরে ছিল যে আমি বুঝতে পারছিলাম না শে ফিরবে কি না। আমার মনে হলো শে হয়তো শুতে গেছে। আমি চাইছিলাম শে নিচে ফিরে আসুক। আমি একজন অন্ধ লোকের সাথে একা থাকতে চাইনি। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম ও আরেকটা ড্রিঙ্ক খাবে কি না, আর ও বলল হ্যাঁ। তারপর আমি জিজ্ঞেস করলাম ও আমার সাথে গাঁজা টানতে চায় কি না। আমি বললাম আমি এইমাত্র একটা সিগারেট বানিয়েছি। আমি বানাইনি, কিন্তু দু'বার ঝাঁকানোর মধ্যেই বানানোর পরিকল্পনা ছিল। “আমি তোমার সাথে একটু চেষ্টা করে দেখব,” ও বলল।
“একদম ঠিক,” আমি বললাম। “এটাই তো আসল জিনিস।”
আমি আমাদের ড্রিঙ্কগুলো নিয়ে এসে ওর সাথে সোফায় বসলাম। তারপর আমি আমাদের জন্য দুটো মোটা সিগারেট বানালাম। আমি একটা ধরিয়ে ওর দিকে বাড়িয়ে দিলাম। আমি ওটা ওর আঙুলের কাছে নিয়ে গেলাম। ও ওটা নিয়ে টান দিল। “যতক্ষণ পারো ধরে রাখো,” আমি বললাম। আমি বুঝতে পারছিলাম ও কিছুই জানে না। আমার স্ত্রী ওর গোলাপী পোশাক আর গোলাপী চপ্পল পরে নিচে ফিরে এল।
শে বলল, “আমি কিসের গন্ধ পাচ্ছি?”
আমি বললাম, “আমরা ভেবেছিলাম একটু গাঁজা খাব।” আমার স্ত্রী আমার দিকে হিংস্র দৃষ্টিতে তাকাল। তারপর শে অন্ধ লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল, “রবার্ট, আমি তো জানতাম না তুমি ধূমপান করো।”
ও বলল, “এখন জানলাম, প্রিয়তমা। সবকিছুরই একটা প্রথমবার থাকে। কিন্তু আমি এখনও কিছু অনুভব করছি না।”
আমি বললাম, “এই জিনিসটা তো বেশ হালকা।”
“এই জিনিসটা হালকা। এটা এমন এক নেশা যা নিয়ে যুক্তি দিয়ে কাজ চালানো যায়,” আমি বললাম। “এটা তোমাকে এলোমেলো করে দেয় না।”
“খুব বেশি কিছু করে না, বাছা,” ও হেসে বলল।
আমার স্ত্রী অন্ধ লোকটা আর আমার মাঝখানে সোফায় বসেছিল। আমি তাকে নম্বরটা এগিয়ে দিলাম। ও নম্বরটা নিয়ে টান দিয়ে আবার আমাকে ফেরত দিল। “এটা কোন দিকে যাচ্ছে?” ও বলল। তারপর বলল, “আমার এটা খাওয়া উচিত না। এমনিতেই আমি চোখ খোলা রাখতে পারছি না। রাতের খাবারটাই আমার সর্বনাশ করেছে। আমার এত বেশি খাওয়া উচিত হয়নি।” “স্ট্রবেরি পাইয়ের জন্য,” অন্ধ লোকটা বলল। “ওটাই করেছে,” ও তার সেই অট্টহাসি হেসে বলল। তারপর মাথা নাড়ল।
“আরও স্ট্রবেরি পাই আছে,” আমি বললাম।
“তুমি কি আরও খাবে, রবার্ট?” আমার স্ত্রী বলল।
“হয়তো কিছুক্ষণ পর,” ও বলল।
আমরা টিভির দিকে মনোযোগ দিলাম। আমার স্ত্রী আবার হাই তুলল। শে বলল, “রবার্ট, তোমার যখন ঘুমাতে ইচ্ছে করবে, তখন তোমার বিছানা গোছানো থাকবে। আমি জানি তোমার দিনটা নিশ্চয়ই খুব ব্যস্ত কেটেছে। যখন ঘুমাতে যাওয়ার জন্য তৈরি হবে, তখন বলো।” ও তার হাত ধরে টানল।
“রবার্ট?”
ওর হুঁশ ফিরল এবং ও বলল, “আমার খুব ভালো সময় কাটছে। এটা টেপের চেয়ে অনেক ভালো, তাই না?” আমি বললাম।
“আসছে,” এই বলে আমি ওর আঙুলের ফাঁকে নম্বরটা রাখলাম। ও ধোঁয়াটা ভেতরে নিল, কিছুক্ষণ ধরে রাখল, এবং তারপর ছেড়ে দিল। মনে হচ্ছিল যেন ও নয় বছর বয়স থেকেই এটা করে আসছে। “ধন্যবাদ, বাব,” ও বলল। “কিন্তু আমার মনে হয় এটা পুরোটাই আমার জন্য। আমার মনে হচ্ছে আমি এখন এর প্রভাব অনুভব করতে শুরু করেছি,” ও বলল। ও জ্বলন্ত সিগারেটের শেষাংশটা আমার স্ত্রীর দিকে বাড়িয়ে দিল।
“আমারও একই অবস্থা,” শে বলল।
“একই। আমারও।”
শে তামাকটা নিয়ে আমার দিকে বাড়িয়ে দিল। “আমি হয়তো কিছুক্ষণ তোমাদের দুজনের মাঝখানে চোখ বন্ধ করে বসে থাকব। কিন্তু আমাকে নিয়ে তোমাদের বিরক্ত করো না, ঠিক আছে? তোমাদের দুজনের কাউকেই না। যদি তোমাদের বিরক্ত লাগে, তাহলে বলো। নইলে, তোমরা ঘুমাতে যাওয়ার জন্য তৈরি না হওয়া পর্যন্ত আমি হয়তো চোখ বন্ধ করেই এখানে বসে থাকব,” শে বলল। “আপনার বিছানা পাতা আছে, রবার্ট, আপনি তৈরি হলেই নিতে পারবেন। এটা সিঁড়ির উপরে আমাদের ঘরের ঠিক পাশেই। আপনি তৈরি হলে আমরা আপনাকে উপরে নিয়ে আসব। আমি যদি ঘুমিয়ে পড়ি, আপনারা আমাকে এখনই জাগিয়ে দিয়েন।” এই বলে সে চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়ল। সংবাদ অনুষ্ঠানটি শেষ হলো। আমি উঠে চ্যানেল বদলালাম। আমি আবার সোফায় বসে পড়লাম। আমার মনে হচ্ছিল, আমার স্ত্রী যদি এভাবে ক্লান্ত না হতো। তার মাথাটা সোফার পেছনে আড়াআড়িভাবে পড়ে ছিল, মুখটা খোলা। শে এমনভাবে ঘুরেছিল যে তার গাউনটা পা থেকে সরে গিয়ে একটা রসালো উরু উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। আমি তার গাউনটা আবার পরিয়ে দেওয়ার জন্য হাত বাড়ালাম, আর ঠিক তখনই আমার চোখ পড়ল অন্ধ লোকটার দিকে। কী আর বলব! আমি আবার আলখাল্লাটা খুলে ফেললাম।
“আপনিই বলেন কখন স্ট্রবেরি পাই খেতে চান,” আমি বললাম।
“বলব,” সে বলল।
আমি বললাম, “আপনার কি ঘুম পাচ্ছে? আমি কি আপনাকে আপনার বিছানায় নিয়ে যাব? আপনি কি ঘুমাতে তৈরি?”
“এখনও না,” সে বলল। “না, আমি আপনার সাথে জেগে থাকব, বাব। যদি আপনার কোনো অসুবিধা না থাকে। আপনি ঘুমাতে তৈরি না হওয়া পর্যন্ত আমি জেগে থাকব। আমাদের কথা বলার সুযোগই হয়নি। বুঝতে পারছেন আমি কী বলতে চাইছি? আমার মনে হচ্ছে আমি আর শে মিলে পুরো সন্ধ্যাটা একাই দখল করে নিয়েছি।” ও ওর দাড়িটা তুলল এবং আবার ছেড়ে দিল। ও ওর সিগারেট আর লাইটারটা তুলে নিল।
“ঠিক আছে,” আমি বললাম।
তারপর আমি বললাম, “সঙ্গ পেয়ে আমি খুশি।” আর আমার মনে হয় আমি সত্যিই খুশি ছিলাম। প্রতি রাতে আমি গাঁজা খেতাম আর ঘুমিয়ে পড়ার আগে যতক্ষণ পারতাম জেগে থাকতাম। আমি আর আমার স্ত্রী প্রায় কখনোই একসাথে শুতে যেতাম না। যখন আমি ঘুমাতাম, আমি এই স্বপ্নগুলো দেখতাম। মাঝে মাঝে সেগুলোর একটা থেকে আমার ঘুম ভেঙে যেত, আমার বুকটা ধড়ফড় করত। টিভিতে গির্জা আর মধ্যযুগ নিয়ে কিছু একটা চলছিল। গতানুগতিক কোনো অনুষ্ঠান নয়। আমি অন্য কিছু দেখতে চেয়েছিলাম। আমি অন্য চ্যানেলগুলো চালালাম। কিন্তু সেখানেও কিছু ছিল না। তাই আমি প্রথম চ্যানেলে ফিরে গিয়ে ক্ষমা চাইলাম।
“বাব, ঠিক আছে,” অন্ধ লোকটি বলল। “আমার কোনো সমস্যা নেই। আপনি যা দেখতে চান, তাই চলবে। আমি সবসময় কিছু না কিছু শিখি। শেখার কোনো শেষ নেই। আজ রাতে কিছু শিখলে আমার কোনো ক্ষতি হবে না। আমার কান আছে,” ও বলল।
আমরা কিছুক্ষণ কোনো কথা বললাম না। ও আমার দিকে মাথা ঘুরিয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে ছিল, ওর ডান কানটা টিভির দিকে তাক করা। খুবই অস্বস্তিকর। মাঝে মাঝে ওর চোখের পাতা ঝুলে পড়ছিল এবং তারপরই আবার খুলে যাচ্ছিল। মাঝে মাঝে ও ওর দাড়িতে আঙুল ঢুকিয়ে টানছিল, যেন টেলিভিশনে শোনা কোনো কিছুর কথা ভাবছিল। পর্দায়, হুড পরা একদল লোককে কঙ্কালের পোশাক পরা এবং শয়তানের পোশাক পরা লোকেরা আক্রমণ করে নির্যাতন করছিল। শয়তানের পোশাক পরা লোকগুলো শয়তানের মুখোশ, শিং এবং লম্বা লেজ পরেছিল। এই প্রদর্শনীটি একটি শোভাযাত্রার অংশ ছিল। যে ইংরেজ লোকটি বর্ণনা করছিল, সে বলল যে এটি স্পেনে বছরে একবার অনুষ্ঠিত হয়। আমি অন্ধ লোকটিকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম কী ঘটছে।
“কঙ্কাল,” ও বলল। “আমি কঙ্কাল সম্পর্কে জানি,” ও মাথা নেড়ে বলল।
সে বলল। অবশ্যই, আমি লোকটাকে এইমাত্র একথা বলতে শুনলাম। আমি জানি একই পরিবারের প্রজন্ম ধরে একটি ক্যাথেড্রালের কাজে নিয়োজিত ছিল। আমি তাকেও একথা বলতে শুনেছি। যে মানুষগুলো তাদের সারাজীবনের কাজ শুরু করেছিল, তারা তাদের কাজের সমাপ্তি দেখে যেতে পারেনি। সেই দিক থেকে, বন্ধু, তারা আমাদের বাকিদের থেকে আলাদা নয়, তাই না?
ও হাসল। তারপর ওর চোখের পাতা আবার ভারী হয়ে এল। ও মাথা নাড়ল। মনে হচ্ছিল ও তন্দ্রাচ্ছন্ন। হয়তো ও নিজেকে পর্তুগালে কল্পনা করছিল। টিভিতে এখন অন্য একটি ক্যাথেড্রাল দেখাচ্ছিল। এটি ছিল জার্মানিতে। ইংরেজ লোকটির কণ্ঠস্বর একটানা বেজে চলল।
“ক্যাথেড্রাল,” অন্ধ লোকটি বলল। ও উঠে বসে মাথাটা এদিক-ওদিক ঘোরাল। “যদি সত্যি বলতে চান, বাব, আমি শুধু এটুকুই জানি। এইমাত্র যা বললাম। তাকে যা বলতে শুনলাম। কিন্তু আপনি কি আমাকে একটা বর্ণনা করে দিতে পারেন? আমি চাই আপনি এটা করেন। আমার ভালো লাগবে। যদি জানতে চান আমার সত্যিই কোনো ভালো ধারণা নেই।”
আমি টিভিতে ক্যাথেড্রালটির দৃশ্যের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম। আমি কীভাবে এর বর্ণনা শুরু করব? কিন্তু ধরো আমার জীবন এর উপর নির্ভর করছে। ধরো আমার জীবন এক উন্মাদ লোকের দ্বারা হুমকির মুখে পড়েছে যে বলছে আমাকে এটা করতেই হবে, নইলে...। আমি ক্যাথেড্রালটির দিকে আরও কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম, তারপর ছবিটি পাল্টে গ্রামাঞ্চলের দৃশ্যে চলে গেল। কোনো লাভ ছিল না। আমি অন্ধ লোকটার দিকে ঘুরে বললাম, “প্রথমত, এগুলো অনেক লম্বা।” আমি কোনো সূত্রের খোঁজে ঘরের চারপাশে তাকাচ্ছিলাম। “এগুলো অনেক ওপরে উঠে গেছে। আরও ওপরে, আকাশের দিকে। এগুলো এত বড় যে, কোনো কোনোটার জন্য এই ঠেকনাগুলো দরকার হয়। বলতে গেলে, এগুলোকে ধরে রাখতে সাহায্য করার জন্য। এই ঠেকনাগুলোকে বাট্রেস বলা হয়। কী কারণে যেন এগুলো আমাকে ভায়াডাক্টের কথা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু হয়তো আপনিও ভায়াডাক্ট চেনেন না? কখনও কখনও ক্যাথেড্রালগুলোর সামনে শয়তান আর এই জাতীয় জিনিস খোদাই করা থাকে। কখনও লর্ড আর লেডিদের। আমাকে জিজ্ঞেস করবেন না কেন এমনটা করা হয়,” আমি বললাম।
ও মাথা নাড়াচ্ছিল। তার শরীরের পুরো উপরের অংশটাই যেন সামনে-পেছনে নড়ছিল।
“ভালো, তাই না?” আমি বললাম।
“আমি তেমনটা করছি না...” ও মাথা নাড়ানো থামিয়ে সোফার কিনারায় সামনের দিকে ঝুঁকল। আমার কথা শুনতে শুনতে ও ওর দাড়িতে আঙুল চালাচ্ছিল। আমি যে ওকে বোঝাতে পারছিলাম না, তা আমি দেখতে পাচ্ছিলাম। কিন্তু তা সত্ত্বেও ও আমার কথা চালিয়ে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করল। ও মাথা নাড়ল, যেন আমাকে উৎসাহিত করার চেষ্টা করছে। আমি আর কী বলব তা ভাবার চেষ্টা করলাম।
“ওগুলো সত্যিই বিশাল,” আমি বললাম। “ওগুলো প্রকাণ্ড। ওগুলো পাথর দিয়ে তৈরি। কখনও কখনও মার্বেল দিয়েও। সেই পুরোনো দিনে, যখন তারা ক্যাথেড্রাল তৈরি করত, তখন মানুষেরা ঈশ্বরের কাছাকাছি থাকতে চাইত। সেই পুরোনো দিনে, ঈশ্বর প্রত্যেকের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন। তাদের ক্যাথেড্রাল নির্মাণ দেখেই এটা বোঝা যেত। আমি দুঃখিত,” আমি বললাম, “কিন্তু মনে হচ্ছে আপনার জন্য এর চেয়ে ভালো কিছু আমি করতে পারব না। আমি এই কাজে একদমই ভালো নই।”
“ঠিক আছে, বন্ধু,” অন্ধ লোকটি বলল। " একটু শোনেন। আশা করি কিছু মনে করবেন না। আমি কি আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে পারি? হ্যাঁ বা না, একটা সহজ প্রশ্ন করি। আমি শুধু কৌতুহলী, কিছু মনে করবেন না। আপনিই তো আমার অতিথি। কিন্তু আমি কি জানতে পারি, আপনি কি কোনোভাবে ধার্মিক? কিছু মনে করবেন না তো?”
আমি মাথা নাড়লাম। কিন্তু ও তা দেখতে পেল না। একজন অন্ধের কাছে চোখ মারা আর মাথা নাড়ানো একই জিনিস। “আমার মনে হয় আমি এসব বিশ্বাস করি না। কোনো কিছুতেই না। মাঝে মাঝে খুব কষ্ট হয়। বুঝতে পারছেন আমি কী বলতে চাইছি?”
“অবশ্যই বুঝতে পারছি,” ও বলল।
“ঠিক,” আমি বললাম। ইংরেজ লোকটি তখনও বলেই যাচ্ছিল। আমার স্ত্রী ঘুমের মধ্যে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। শে একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ল। “আপনাকে আমাকে ক্ষমা করতে হবে,” আমি বললাম। “কিন্তু আমি আপনাকে বলতে পারব না ক্যাথেড্রাল দেখতে কেমন হয়। এটা করার মতো ক্ষমতা আমার নেই। আমি যা করেছি, তার চেয়ে বেশি কিছু করতে পারব না।”
অন্ধ লোকটি মাথা নিচু করে একদম স্থির হয়ে বসে আমার কথা শুনছিল। আমি বললাম, “সত্যি কথা হলো, ক্যাথেড্রাল আমার কাছে বিশেষ কিছু বোঝায় না। কিছুই না। ক্যাথেড্রাল। গভীর রাতে টিভিতে দেখার মতো জিনিস বটে। ব্যস, এটুকুই।”
ঠিক তখনই অন্ধ লোকটি গলা খাঁকারি দিল। ও একটা কথা তুলল। ও ওর পেছনের পকেট থেকে একটা রুমাল বের করল। তারপর ও বলল, “বুড়ো, আমি বুঝতে পারছি। ঠিক আছে। এমনটা হয়। এটা নিয়ে চিন্তা করবেন না,” ও বলল। “এই, আমার কথা শোনেন। আমার একটা উপকার করবেন? আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে। আমাদের জন্য কিছু মোটা কাগজ আর একটা কলম খুঁজে আনেন না কেন? আমরা কিছু একটা করব। আমরা একসাথে একটা আঁকব। আমাদের জন্য একটা কলম আর কিছু মোটা কাগজ নিয়ে আসেন। যান, সোনা, জিনিসগুলো নিয়ে আসেন,” ও বলল।
তাই আমি ওপরে গেলাম। আমার পায়ে যেন কোনো শক্তিই ছিল না। দৌড়ানোর পর যেমনটা হয়, ঠিক তেমন লাগছিল। আমার স্ত্রীর ঘরে আমি চারদিকে তাকালাম। তার টেবিলের ওপর একটা ছোট ঝুড়িতে আমি কিছু বলপয়েন্ট কলম খুঁজে পেলাম। তারপর আমি ভাবার চেষ্টা করলাম যে ও যে ধরনের কাগজের কথা বলছিল, তা কোথায় খোঁজা যায়। নিচে, রান্নাঘরে, আমি একটা শপিং ব্যাগ খুঁজে পেলাম যার তলায় পেঁয়াজের খোসা ছিল। আমি ব্যাগটা খালি করে ঝেড়ে নিলাম। আমি ওটা বসার ঘরে নিয়ে এসে ওর পায়ের কাছে রাখলাম। আমি কিছু জিনিস সরালাম, ব্যাগের ভাঁজগুলো মসৃণ করলাম, তারপর কফি টেবিলের ওপর ওটা মেলে ধরলাম। অন্ধ লোকটি সোফা থেকে নেমে কার্পেটের ওপর আমার পাশে বসল। ও কাগজের ওপর ওর আঙুল বোলাতে লাগল। ও কাগজটার পাশগুলো বেয়ে উপর-নিচ করতে লাগল। কিনারাগুলো, এমনকি কিনারাগুলোও। ও কোণাগুলো আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখল।
“ঠিক আছে,” ও বলল। “ঠিক আছে, চলুন এটা করি।” ও আমার হাতটা খুঁজে পেল, যে হাতে কলম ছিল। ও আমার হাতের ওপর নিজের হাতটা চেপে ধরল।
“এগিয়ে যাও, বাছা, আঁকুন,” ও বলল। “আঁকুন। আপনি দেখতে পাবেন। আমি আপনাকে অনুসরণ করব। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি যেমন বলছি, ঠিক সেভাবেই এখন শুরু করুন। আপনি দেখতে পাবেন। আঁকুন,” অন্ধ লোকটি বলল।
তাই আমি শুরু করলাম। প্রথমে আমি একটা বাক্স আঁকলাম যেটা দেখতে একটা বাড়ির মতো। এটা আমার নিজের বাড়িও হতে পারত। তারপর আমি এর ওপর একটা ছাদ দিলাম। ছাদের দুই প্রান্তে আমি চূড়া আঁকলাম।
“চমৎকার,” ও বলল। “অসাধারণ। আপনি ভালোই করছেন,” ও বলল। “কখনো ভাবেননি যে আপনার জীবনে এমন কিছু ঘটতে পারে, তাই না, বাব? যাই হোক, জীবনটা বড়ই অদ্ভুত, আমরা সবাই তা জানি। এগিয়ে যাও। চালিয়ে যাও।”
আমি খিলানযুক্ত জানালা আঁকলাম। আমি ফ্লাইং বাট্রেস আঁকলাম। আমি বিশাল দরজা লাগালাম। আমি থামতে পারছিলাম না। টিভি স্টেশনটি সম্প্রচার বন্ধ করে দিল। আমি কলমটা নামিয়ে রেখে আঙুলগুলো বন্ধ ও খোলা করতে লাগলাম। অন্ধ লোকটি কাগজের ওপর হাত বুলিয়ে দেখল। ও তার আঙুলের ডগা দিয়ে আমি যা এঁকেছিলাম তার ওপর দিয়ে সবটা ছুঁয়ে দেখল এবং মাথা নাড়ল।
“বেশ ভালোই করছেন,” অন্ধ লোকটি বলল।
আমি আবার কলমটা তুলে নিলাম, আর ও আমার হাতটা খুঁজে পেল। আমি আঁকা চালিয়ে গেলাম। আমি তো আর শিল্পী নই।
কিন্তু আমি ঠিকই এঁকে চললাম। আমার স্ত্রী চোখ খুলল এবং আমাদের দিকে তাকাল। ও সোফায় উঠে বসেছিল, ওর আলখাল্লাটা খোলা অবস্থায় ঝুলছিল। ও বলল, “তোমরা কী করছ? আমাকে বলো, আমি জানতে চাই।”
আমি তাকে কোনো উত্তর দিলাম না।
অন্ধ লোকটি বলল, “আমরা একটা ক্যাথেড্রাল আঁকছি। আমি আর ও এটা নিয়ে কাজ করছি। জোরে চাপ দাও,” ও আমাকে বলল। “ঠিক। খুব ভালো,” ও বলল। “নিশ্চয়ই। আপনি পেরে গেছেন, বন্ধু। আমি বুঝতে পারছি। আপনি ভাবেননি যে আপনি পারবেন। কিন্তু আপনি পারছেন, তাই না? আপনি এখন দারুণ কাজ করছেন। বুঝতে পারছেন আমি কী বলছি? একটু পরেই আমরা সত্যিই অসাধারণ কিছু একটা তৈরি করতে যাচ্ছি। আপনার পুরোনো হাতটা কেমন আছে?” ও বলল। “এখন ওখানে কিছু মানুষ আঁকুন। মানুষ ছাড়া ক্যাথেড্রাল আবার কী?”
আমার স্ত্রী বলল, “কী হচ্ছে? রবার্ট, আপনি কী করছেন? কী হচ্ছে?”
“সব ঠিক আছে,” ও ওকে বলল। “এখন চোখ বন্ধ করুন,” অন্ধ লোকটি আমাকে বলল। আমি এটা করলাম। ও যেমন বলেছিল ঠিক তেমন করেই আমি চোখ বন্ধ করলাম।
“চোখ বন্ধ?” ও বলল। “কোনো গড়বড় করো না।” “বন্ধই আছে,” আমি বললাম। “এভাবেই রাখুন,” ও বলল। ও বলল, “এখন থামবেন না। আঁকুন।”
তাই আমরা চালিয়ে গেলাম। আমার হাত যখন কাগজের ওপর দিয়ে যাচ্ছিল, তখন ওর আঙুলগুলো আমার আঙুলের ওপর দিয়ে চলছিল। আমার জীবনে এখন পর্যন্ত আর কিছুর সাথে এর তুলনা হয় না। তারপর ও বলল, “আমার মনে হয় এটাই হয়েছে। আমার মনে হয় আপনি পেরে গেছেন,” ও বলল। “একবার দেখুন। আপনার কী মনে হচ্ছে?”
কিন্তু আমার চোখ তো বন্ধই ছিল। আমি ভাবলাম আরও কিছুক্ষণ এভাবেই রাখি। আমার মনে হলো এটা আমার করা উচিত।
“কী?” ও বলল। “দেখছেন?”
আমার চোখ তখনও বন্ধ ছিল। আমি আমার বাড়িতেই ছিলাম। আমি তা জানতাম। কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল না যে আমি কোনো কিছুর ভেতরে আছি।
“এটা সত্যিই অসাধারণ,” আমি বললাম।
ক্যাথেড্রাল
রেইমন্ড কার্ভার
অনুবাদ: রথো রাফি
রেইমন্ড কার্ভার
অনুবাদ: রথো রাফি




মন্তব্য