গৌরচন্দ্রিকা
তবে কোন পথে ঘটবে শাশ্বত সূর্যোদয়? মানুষের ক্রম মুক্তি ঘটবে কেমন করে? ক্রম মুক্তি যদি হয়, তবে কিসের থেকে ক্রম মুক্তি? কেন মুক্তি চাই? মুক্তি পরবর্তী চেহারাটাই বা কেমন হবে — এরকম একের পর এক বহু প্রশ্ন মানুষের ইতিহাসকে উত্তাল করেছে বিবিধ সময়ে। প্রশ্নগুলোর সঙ্গে সঙ্গে আগত উত্তরেরাও প্ররোচিত করেছে আমাদের বেঁচে থাকা — এ কথা না বললে বালখিল্যতা ঘটবে। কিন্তু, এই উত্তর গুলির ক্ষেত্রে আমরা যেটি সর্বাগ্রে দেখতে পাই, তা হল, এরা কেউ কেউ কিছুদূর গিয়ে ফুরিয়ে গিয়েছে। কেউ ধাঁধা তৈরি করে আটকে পড়েছে নিজেদের মধ্যে নিজেরাই। আবার কোনও কোনও উত্তর মানুষের সঙ্গে বহু দিন পর্যন্ত হেঁটেছে।
কিন্তু, আমরা একটি বিষয়ে সকলেই সহমত হবে যে, কোনও উত্তরই মানুষের সঙ্গে, মানুষের বিবর্তনের সঙ্গে সবসময় পথ চলতে পারে না। পারেনি। তাকে ফুরিয়ে যেতে হয়েছে। অথবা থেমে যেতে হয়েছে। এখন, যদি আপনি শিল্প বিপ্লবের অব্যবহিত পূর্বের উদাহরণ দেখিয়ে আমাদের বলছেন, হাজার হাজার বছর ধরে আমাদের সমাজ ধর্মের প্ররোচনায় পথ এগিয়েছে। বরং তুলনামূলকভাবে শিল্পবিপ্লবোত্তর চিন্তাগুলিই ফুরিয়েছে অধিক দ্রুত। বলতেই পারি।তবে যে ভুলটি হবে, অর্থনৈতিক অবস্থানের প্রসঙ্গে। শিল্প বিপ্লবের আগে আমাদের কৃষি নির্ভর অর্থনীতি আমাদের ভেতর যে প্রবণতা, যে স্বভাব নির্মাণ করেছে, তা পরিবেশ নির্ভর অনেকাংশে। কিন্তু ভারি শিল্পের যুগ আসার পর অর্থনৈতিক অবস্থানগুলো যখন বদলাতে শুরু করল, দৈব নির্ভরতা আমাদের কাছেই প্রশ্নের মুখে পড়ল। এবং পাল্টে যেতে শুরু করল তত্ত্বের শরীর। বিগত শতাব্দী অর্থাৎ বিশের শতক তো উত্তাল হয়েছে তিনটি জায়ান্ট চিন্তার পারস্পরিক দ্বন্দ্বে। এবং চিন্তা গুলির এই দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ার পেছনে আরেকটি কারণও জরুরি। সেটা হল বিবর্তনের দ্রুতি। শিল্প বিপ্লবের পর মানুষের বিবর্তনের দ্রুতি বেড়ে গেল। ভাবুন, নবম শতকে বারুদ হাতে পেয়েও হাজার বছরেও মানুষ উল্লেখযোগ্য কোনও মারণাস্ত্র নির্মাণ করতে পারল না। অথচ ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে তেজস্ক্রিয়া আবিস্কারের কুড়ি বছরের মধ্যে পরমাণু বোমা তৈরি করে নিজেকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিল মানুষ।
বলার কথা এটাই, শিল্প বিপ্লবের পর এবং তৎপরবর্তী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মানুষের বিবর্তনের দ্রুতি ও বিবর্তনগত জটিলতা এতটাই বাড়িয়ে দিল যে, আমাদের রাষ্ট্রিক এবং অর্থনৈতিক বোঝাপড়াগুলো ফুরিয়ে যেতে শুরু করল। এও তেমন ঠিক। আর এর ফলেই হয়তো কিছু কিছু তর্কের সমাধান হওয়ার আগেই প্রসঙ্গ বদলে যায়। সমাধান আর তৈরি হয় না। যেমন সাঁর্ত্র - কাম্যুর সম্পর্ক।
ছিদ্রান্বেষীরা বলে থাকেন সিমোনকে প্রত্যখ্যান করার কারণেই নাকি সাঁর্ত্র-কাম্যুর বিরোধ। কিন্তু, এই ঘটনাটিকে আমরা একটা সাংস্কৃতিক পার্থক্য হিসেবে যদি মনে করি, তবে, বিরোধের একটি অনেক বড় কারণ আমাদের শিক্ষিত করে তুলতে পারে। এখন, দুই বিপরীত সাংস্কৃতিক অবস্থানের দুই মহীরুহ সদৃশ মেধার বিরোধকে তো আমাদের সচরাচরের ঝগড়া হিসেবে দেখা যায় না। বরং এই বিরোধ আমাদের চিন্তিত করে, পথ দেখায়। এই আলোচনার শরীর গড়ে উঠতে চাইছে, এই দুই মেধাবী দৈত্যের চিন্তার দূরত্বকে অনুসরণ করে।
সাঁর্ত্র এবং কাম্যুর বন্ধুত্বের প্রবাদ আমরা সকলেই জানি। আমরা সকলেই জানি তাঁদের জীবনেতিহাস। সে দিকে যেতে বা বিরোধের ধারাভাষ্য দিতে চাইছে না এ লেখা। কেবল অনুসরণ করে পক্ষ অবলম্বন করতে চাইছে। সেটা সাঁর্ত্র কিংবা কাম্যুর পক্ষ ব্যতিরেকে তৃতীয় আরেকটি পক্ষও হতে পারে। এই আলোচনা অতি পরিচিত একটি তথ্যকে আরেকবার মনে করে নিতে চাইছে। জাঁ পল সাঁর্ত্র ছিলেন কেবল বুর্জোয়া শ্রেণিজাতক তা তো নয়, রীতিমতো আন্তর্জাতিক মেধা চর্চায় স্পৃষ্ট ছিলেন শৈশব থেকেই। আর কাম্যু বস্তুত গড়ে উঠেছেন উদ্বাস্তু ও উৎকণ্ঠিত এক পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করে, দারিদ্র্যকে পাশাপাশি রেখে।
এখন এই তথ্যটিকে ব্যবহার করার কারণ হিসেবে বলা যায়, মেধাবী এই দুই দৈত্য কোন স্তর ও মাত্রা থেকে তাঁদের চিন্তার উপাদান সংগ্রহ করেছেন — দেখে নেওয়া। দ্বিতীয়ত, এও বুঝে নেওয়ার চেষ্টা যে, এঁরা কমিউনিজমকে কিভাবে গ্রহণ করেছেন। মানে, যদি এভাবে দেখতে চাই, কমিউনিজম সাঁর্ত্র-র অর্থনৈতিক অবস্থা হীন করেছে আর কাম্যুর অবস্থানকে দিয়েছে ক্রমোন্নতির স্বস্তি।
এবারে আমরা একবার দেখে নিতে চাইছি, কমিউনিজমের সঙ্গে সাঁর্ত্রের সম্পর্কটিকে। এক্ষেত্রে আমরা একটা ধাঁধাকে ব্যবহার করতে পারি রহস্যচ্ছলে—
সাঁর্ত্র অস্তিত্ববাদী। ডস্টয়ভস্কি অন্যতম অস্তিত্ববাদী চিন্তা প্রণেতা। এবার তারকোভস্কিও অস্তিত্ববাদী, বিশুদ্ধতার দর্শনে নির্ভর করতেন।তবে স্টালিন তান্ত্রিক শাসনকেও আপোসে-বিরোধে সমর্থন করতেন। যেমন সমর্থন করতেন সাঁর্ত্র। এবার তারকোভস্কি 'ইডিয়ট'-কে নিয়ে কাজ করার কথা ভাবলেন। বিরোধীতা করল রাশিয়া। তারকোভস্কি দেশ ছাড়লেন। ইতালিতে গেলেন। সমর্থন পেলেন সাঁর্ত্রর। এখন সাঁর্ত্র = কমিউনিস্ট রাষ্ট্র — এই সমীকরণটি কি দাঁড়াল?
দেখুন, পার্টির সঙ্গে অবস্থানের প্রেক্ষিতে সাঁর্ত্র এবং কাম্যু দু'জনেই সমালোচিত হয়েছিলেন বিভিন্ন প্রসঙ্গে। দু'জনের সঙ্গেই বিরোধ তৈরি হয়েছিল কমিউনিস্ট রাষ্ট্র চিন্তার। পার্টি আসলে নির্বিকল্প সমর্থন চায়, মুক্ত চিন্তা পার্টির স্বার্থে ক্ষতিকর। সে পার্টি কমিউনিস্ট হোক বা ফ্যাসিস্ট। রাষ্ট্রিয় ক্ষমতায় থাকলে ক্ষমতার আনুপূর্বিক গঠনের সঙ্গে সে আপোস করেছে। একটি ছোট উদাহরণ আমাদের কাছে বিষয়টিকে স্পষ্ট করে দিতে পারে। তথ্যের নিয়ন্ত্রণ। অদ্ভুতভাবে দেখা যায় যে, কমিউনিস্ট এবং ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রগুলি সবসময় তথ্য সংগ্রহ করেছে রাষ্ট্রের তত্বাবধানে।তারপর সেই তথ্যের কতটা মানুষের কাছে মুক্ত হবে, সেটাও ঠিক করেছে রাষ্ট্র। ফলত একজন মুক্ত চিন্তার মানুষের সঙ্গে পার্টির, সে হোক না কমিউনিস্ট পার্টি — বিরোধ অত্যন্ত স্বাভাবিক। সেই বিরোধকে এখানে বড় করে দেখতে চাইছি না। বরং দেখতে চাইছি, কমিউনিজম সম্পর্কে দু'জনের তৎকালীন অবস্থানটিকে।
সাঁর্ত্র মনে করতেন পরিবর্তনের জন্য একটা পর্যায় অব্দি সহিংসতার প্রয়োজন। একটা পর্যায় অবধি দরকার হত্যা কিংবা আক্রমণ। অপর দিকে কাম্যু হিংসা দমন করতে হিংসার অবতারণা সম্পর্কে এটাই প্রশ্ন তুলেছেন যে, তারপর? সেই উদাহরণ যখন পরবর্তী হিংসা ডেকে আনবে? একটা সময় পর্যন্ত হিংসা আর হিংসার সার্বক্ষণিক প্রযোজনা তো এক হয়েই দেখা দিয়েছিল কাম্যুর কাছে। অনেকেই একে মধ্যপন্থা হিসেবে চিহ্নিত করলেও হত্যার স্বাধীনতা সম্পর্কে কাম্যু যে প্রশ্ন তুলেছিলেন, তা কিন্তু এখন কেবল প্রাসঙ্গিক নয়, অন্যতম বড় প্রশ্ন হিসেবে দেখা দিয়েছে। অন্তত এই অ্যাবসার্ড সমাজের ক্ষেত্রে তো বটেই।
এই প্রসঙ্গে আর একটু অভিনিবেশের আগে সাঁর্ত্রর কাম্যুকে লেখা একটি চিঠির খানিকটা অংশ মনে করতে ইচ্ছে করছে,
Our friendship was not easy, but I shall regret it. If you break it now, then no doubt it had to be broken. A lot of things united us, a few divided us. But those few were already too many.
বিদগ্ধ - বাক সাঁর্ত্রর একটি নিপুণ উদাহরণ ছাড়াও শেষ বাক্যটির ওপর যদি আমরা বিশেষভাবে অভিনিবেশ করি, তবে যে প্রসঙ্গ তৈরি হয়, সেক্ষেত্রে কি আমরা এমনভাবে বলতে পারি যে, অস্তিত্ববাদী চিন্তা এবং শ্রমজীবী, শোষিত মানুষের মুক্তির প্রশ্নে দুই জায়ান্ট একত্রিত হয়েছিলেন, কিন্তু, প্রসঙ্গোত্তর পর্বে তাঁরা নিজেদের চিন্তার স্বাতন্ত্রে আলাদা হয়ে গেছিলেন।
আলোচনার দিকে
বিষয়টা হল ডায়নাসোরসদের অবলুপ্তির পর পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে যে প্রাণীটি — হোমো সেপিয়েন্স। সমস্ত দুর্বলতা সত্বেও। কেন ? মনে করা হচ্ছে সম্মিলিতভাবে ভাবা, ভাবান এবং ভাবনার প্রকাশ ঘটান বা এ্যাপ্লিকেশন মানুষের প্রভাব বিস্তারের সবচেয়ে বড় শক্তি। এত বড় আকারে আর কোনও প্রাণী পারে না এই ভাবনার কাজটি সম্মিলিতভাবে সারতে। এখন, সম্মিলিত ভাবনার কথা এলেই চলে আসে গোষ্ঠীর কথা। আর এই গোষ্ঠীর বৃহত্তর পরিবর্ধিত রূপ রাষ্ট্র। তাহলে এ কথা অনেকাংশে জায়মান, মানুষকে তার উদবর্তনের জন্য অবশ্যই রাষ্ট্রের সাহায্য নিতে হবে। তবে, রাষ্ট্র বলতে ভারত বা আমেরিকা বুঝলে ভুল হবে। রাষ্ট্র বলতে একটা ধারণা। সম্ভাব্য বৃহত্তর গোষ্ঠী গঠনের ধারণা। ফলত তা সময়ের সাপেক্ষে বদলে যায়।
এবার একটা প্রশ্ন আসতে পারে উদবর্তনের কি প্রয়োজন? আমরা জানি, তাতে এই মহা প্রকৃতির, পরিবেশের কিছুই যায় আসে না।আমরা জানি সবটাই প্রাতিভাসিক। আমাদের সব কথা, সব চিন্তা আপেক্ষিক। আপেক্ষিক বলেই যেহেতু এই আলোচনা মানব কেন্দ্রিক তাই হিউম্যানিজমের উদবর্তনের সাপেক্ষেই স্বাভাবিকভাবেই আলোচনা এগোবে।
এখন আদর্শ রাষ্ট্রের ধারণা আমাদের সকলের নিজের মতো করে আছে। কেউ চায় হত্যার স্বাধীনতা, কেউ পাচারের, কেউ কাট মানির স্বাধীনতা। এই 'স্বাধীনতা' শব্দটাও তো অলীক কিংবা আপেক্ষিক। যে যার মতো করে আদর্শ রাষ্ট্রের আদর্শ শাসনের কথা ভাবে। নিজের স্বভাব, নিজের প্রবণতা ও ঐতিহ্যের প্ররোচনায়।আমরা অনেকে মিলে এমন একটি মানচিত্রে থাকব যেখানে আমাদের সেইসব দাবি স্বাধীনতা পাবে, যা আমার ও আমার মতো কিছু মানুষের বেঁচে থাকার ফ্যান্টাসিকে নিরাপত্তা দেবে। এখন আমার মতো কিছু মানুষের মধ্যেও প্রচুর ও প্রভুত চিন্তার উচ্চাবচতা থাকে। সঙ্গে যুক্ত হয় তার বেঁচে থাকা কালীন অর্জন কিংবা 'মুদ্রাদোষ' — এ আমাদের জানা। এই স্বতঃবিচ্ছিন্নতার ভেতর থেকেও বেঁচে থাকার অমিত প্ররোচনা, মানুষকে আপোস শেখায়। প্রত্যেকের মুদ্রা দোষের সঙ্গে প্রত্যেকের মুদ্রাদোষের আপোস কালক্রমে রাষ্ট্রের জন্ম দিল। কিন্তু রাষ্ট্র চায় স্থিরতা, স্থিতিশীলতা। আবার মানুষ, কৌতুহলী মানুষ, স্থিতিশীল হতে পারে না। সে নিজের চিন্তাকে অতিক্রম করে, ভেঙে আরেকটা চিন্তার দিকে এগিয়ে যেতে বাধ্য তার স্পন্দমানতার বৈশিষ্ট্য বজায় রাখতে।
ফলত মানুষের গোষ্ঠী ধারণা ও বৈশিষ্ট্যের মধ্যে একটা বিরোধীতা থেকেই রাষ্ট্র অনেকটা বিকশিত হল — এ কথা ভাবতে আমাদের যদি দ্বিধা না থাকে, তবে, আমরা কি এ কথাও ভাবতে পারি যে, এই আত্মবিরোধীতা বজায় থাকল রাষ্ট্র চিন্তায়। আমাদের রাষ্ট্রও জরুরি, আমাদের স্বাধীনতাও প্রয়োজন।
এবার একটি প্রশ্ন আসে। স্বাধীনতা কার ? ব্যক্তির না গোষ্ঠীর স্বাধীনতা ? কৃষি শুরুর পর থেকে, সমাজ গঠনের পর থেকে মানুষের ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠেছে একটা সম্মিলিত প্ররোচনায়। তার ভাবনা, ভাবনার পদ্ধতি ও অবস্থানকে উপাদান জুগিয়েছে ইতিহাস ও সামাজিক ঐতিহ্য। তাকে বেঁচে থাকতে সাহায্য করেছে অগণন অপরিচিত মানুষের শ্রম। ফলত একজন মানুষ আসলে বহু মানুষের ও সময় স্তরের জটিল ফসল এ কথা আমরা এড়িয়ে যেতে পারি না। ব্যক্তি খুব বেশি স্বতন্ত্র হতে চাইলে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্বীয় অস্তিত্বকে সংকটে ফেলে দেয়। একটি কালেকটিভ সচেতনতা এবং অবচেতন আমাদের নির্মাণ করে বলেই মনে হয়। মনে হয় বলেই ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য বোধের বা অস্তিত্ববাদের বিকাশ এখন কিছুটা স্তিমিত। মানুষ তার কালেকটিভনেসের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারছে যখন ডেটাইজম ব্যক্তিকে তথ্যে পরিণত করে আরও বিচ্ছিন্ন তথ্যের উৎস হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। অবশ্য এই পরিণতির জন্য অস্তিত্ববাদের দায় অনেকটাই বলে মনে হয়। অব্যবহিত অবকাশে এ সম্পর্কে আলোচনা হতে পারে।
স্বাধীনতার প্রশ্নে ফিরলে মনে হয়, প্রত্যেকটা স্বাধীনতা কামনার ভেতরে আসলে একটি গোষ্ঠীর কামনা মূর্ত হয়। এবং এই কামনার ভেতরে ধ্বনিত হয় তার বৈশিষ্ট্য— নিজেকে অতিক্রম করার জন্য চিন্তা। এখানে নিজে বলতে একটি গোষ্ঠীর মানুষকে বুঝতে হবে। এখন, স্বাধীনতাস্পৃহা যদি একটি সম্মিলিত কামনার প্রতীক হয়। তবে, স্বাধিকার আসলে কী?
বস্তুত স্বাধীনতাও একটা ধারণা বলেই কি এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমাদের মনে হয় না? একটি অলীক ধারণা! সর্বার্থেই। যদি আমরা আমাদের বৈজ্ঞানিক গবেষণাগুলিকে অনুসরণ করি, দেখতে পাব, মানুষের কেন, প্রতিটি জীবেরই সীমাবদ্ধতার ভেতরেই স্বাধীনতা কামনার জন্ম নেয় এবং সীমাবদ্ধতার ভেতরেই স্বাধীনতা সিদ্ধি পায়। কিরকম? প্রতিটি জীবকেই তথাকথিত কনশাসনেসের একটি রেখার মধ্যে বাস করতে হয়। সময়ের, উপাদানের, মাত্রার, অবস্থানের, ভূগোলের বিবিধ সীমাবদ্ধতা। এখানে একটি কূট প্রশ্ন আসতে পারে, বিজ্ঞান এখনও মনে করে এই প্রকৃতি, এই দৃশ্য, অদৃশ্য সকল কিছুই অনন্ত সম্ভাবনাময়। ব্ল্যাক হোল শেষ কথা নয়।আছে হোয়াইট হোল। রয়েছে ভিন্ন সৌর মণ্ডল, অনেক অনেক ছায়াপথ। তাদের অকল্পনীয় সংখ্যক ম্যাজিক। হ্যাঁ অনন্ত সম্ভাবনাময়। কিন্তু, তখনই সম্ভাবনা অনন্ত হচ্ছে, যখন অস্তিত্ব একটি কণা মাত্র। অজস্র কণার সংকলন হিসেবে সে নিজেকে উপস্থাপন যে মুহূর্তে করছে, তার ভেতর বিবিধ পরিস্থিতির, মাত্রার ও ক্ষমতার কণার আপোস তৈরি হচ্ছে। তৈরি হচ্ছে সীমাবদ্ধতা। মানুষ তার সীমাবদ্ধতার ভেতরেই স্বাধীনতার সিদ্ধি তৈরি করে।
অর্থাৎ এভাবে, যদি, আমরা দেখি, যখন একটি জীবের আকার তৈরি হচ্ছে, সে তার নির্মাণের কারণেই সীমাবদ্ধ। তার স্বাধীনতার ধারণাও আসলে, তার বা তার গোষ্ঠীর সীমাবদ্ধতার ওপর নির্ভর করে। পূর্ণ স্বাধীনতার ধারণা অনেকটাই অলীক। একটি সম্মিলিত চিন্তা তার ভৌগলিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান অনুযায়ী স্বাধীনতার কথা চিন্তা করে।
ঠিক এই স্বাধীনতা ও স্বাধীনতার দিকে যাত্রার প্রবণতার প্রশ্নে সাঁর্ত্র-কাম্যুর বিরোধ তৈরি হয়।
বিরোধের সন্ধান
মূলত ১৯৫৬ সালে 'দ্য রেবেল' প্রকাশের পরেই সাঁর্ত্র - কাম্যুর বিরোধ স্পষ্ট হয়। কাম্যু একধরণের মেটাফিজিক্যাল বিদ্রোহের কথা ভেবেছিলেন। স্বাধীনতার প্রশ্নে। যা সাঁর্ত্র বা কমিউনিস্ট চিন্তকদের বিদ্রোহের ধারণার প্রায় বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে। বিশেষ করে আলজেরিয়ার বিদ্রোহের প্রসঙ্গে তো বিরোধের চেহারা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যদিও বিপ্লব পরবর্তী সময়ে কাম্যুর আশংকা সত্যি হয়ে ওঠে। কাম্যু যেমন হত্যার স্বাধীনতায় বিশ্বাস করতেন না, তেমনই বিদ্রোহ সম্পর্কেও একটি তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য রেখেছিলেন,
A man who says no, but whose refusal does not imply a renunciation. He is also a man who says yes, from the moment he makes his first gesture of rebellion.
এবং
An act of rebellion is not, essentially, an egoistic act. Of course, it can have egoistic motives…The rebel…demands respect for himself, of course, but only in so far as he identifies himself with a natural community…When he rebels, a man identifies himself with other men and so surpasses himself, and from this point of view human solidarity is metaphysical.
এই প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক গৌরচন্দ্রিকা অংশের প্রসঙ্গে। মানুষের প্রবৃত্তি নিজের চিন্তাকে অতিক্রম করা। নিজের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিজেকে না বলে, নিজের চিন্তার বিনির্মাণ। এটা পারে বলেই মানুষ একটি চিন্তা অনেকে মিলে ভাবতে পারে এবং ভাবাতে পারে। এবং চিন্তার স্বাধীনতার মাধ্যমে সে একটা গোষ্ঠী, একটি রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চায়। এবং এই চিন্তার, যে চিন্তাটি গোষ্ঠী গড়ে তুলছে, মূল চাবিকাঠি থাকবে কিন্তু প্রথম ভাবতে শুরু করা মানুষগুলির কাছে। কিংবা অনুবর্তী যে সমস্ত চিন্তক চিন্তার পরিধিকে বাড়াতে পারছেন, অর্থাৎ ক্ষমতাধর হয়ে উঠছে, তার হাতে। অর্থাৎ স্বাধীনতা এক্ষেত্রে কয়েকজনের হাতে মাত্র। যাঁরা চিন্তার পরিধিকে বাড়াচ্ছেন। বাকিরা, যারা চিন্তাটির অনুগমন করলেন, তাঁরা ওই নির্মিত চিন্তার ব্যকরণের মধ্যেই তাঁদের অর্থিত স্বাধীনতা খুঁজে নেন। খুব উদার সমাজেও এর বাইরে খুব উদাহরণ আছে কি ? রাশিয়া, জার্মানি, ফ্রান্স ভারি শিল্পের যুগে দেখাতে পারেনি। ভারি শিল্পোত্তর যুগে আমেরিকাও পেরেছে বলে মনে হয় না। লিবারেলরাও এখন আত্মসমর্পণ করেছে ডেটার কাছে। কোথাও এই সময়ে এসে যেন কাম্যুর ধারণাটি আমাদের সঙ্গে পথ চলছে। ইউভেল নোয়া হারারিও কি আমাদের সেই ইঙ্গিত দিচ্ছেন না!
“Just observe the next thought that pops up in your mind. Where did it come from? Did you freely choose to think it? Obviously not. If you carefully observe your own mind, you come to realize that you have little control of what’s going on there, and you are not choosing freely what to think, what to feel, and what to want.If governments and corporations succeed in hacking the human animal, the easiest people to manipulate will be those who believe in free will. And once they can hack you, they can not only predict your choices, but also re-engineer your feelings. They will just have to know you a little better than you know yourself. Liberalism dismisses this threat because they think — “Nobody could successfully predict and manipulate my choices, because my choices reflect my free will’’.(Yuval Noha Harari : the myth of freedom — A summary)
বোধহয় কাম্যু পার্টির প্রতিষ্ঠার বাইরে গিয়ে ভাবতে চেয়েছিলেন। ভাবতে চেয়েছিলেন এমন একটি সমাজের কথা, যে মানুষকে স্থিতাবস্থা দেবে, যাতে মানুষ তার পরবর্তী চিন্তার নির্মাণ - বিনির্মাণের ফুরসৎ পায়। এখানে 'স্থবিরতা'র কথা বলা হচ্ছে না। 'স্থিতাবস্থা' বোধহয় প্রয়োজন হয় নতুন চিন্তার আঁতুড় হিসেবে। নিরন্তর দ্বন্দ্ব একটি পরিস্থিতি তৈরি করে কিন্তু সেই পরিস্থিতিকে সামাজিকভাবে প্রয়োগ ও ব্যবহারের জন্য বোধহয় কাম্যুর তথাকথিত 'মধ্যপন্থা' জরুরি হয়ে পড়ে। অনন্ত দ্বন্দ্বের ফলে যে নিহিলিজম তৈরি হয়, কাম্যু তার সঙ্গে দূরত্ব ঘনাতে চেয়েছিলেন।
অপর দিকে আমরা যদি সাঁর্ত্রের দিক থেকে বিষয়টিকে দেখতে চাই, সাঁর্ত্র চেয়েছিলেন আবিশ্বে কমিউনিজমের প্রতিষ্ঠা। অনেকটা পার্টি এবং রাষ্ট্রের সাপেক্ষে ভাবতে চেয়েছিলেন সাঁর্ত্র।সাঁর্ত্র স্টালিনকে সমর্থন করেছিলেন একটা পরিস্থিতিতে যেমন, তেমনই বিশ্বাস করতেন সহিংস বিপ্লবে। অন্তত যখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের প্রভূত দূরত্বে অবস্থান করছে, সাঁর্ত্র ক্ষমতার প্রয়োগে তার বিনির্মাণ ঘটাতে চেয়েছিলেন। এ বিষয়ে আমাদের সন্দেহের অবকাশ কম, যখন আমরা ভাবছি পার্টি এবং রাষ্ট্রের সাপেক্ষে। কিরকম?
Man is condemned to be free — এই চিন্তা সাঁর্ত্র, কাম্যু দু'জনকে মিলিয়েছিল। কিন্তু, কি করে এই স্বাধীনতা আসবে — এই চিন্তাই দু'জনকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। কাম্যু মানুষকে স্বভাব বিদ্রোহী বলেই মনে করতেন। কিন্তু, বিদ্রোহের মিতাচার ছিল তাঁর অন্বিষ্ট। অপর দিকে সাঁর্ত্র চেয়েছিলেন প্রতিষ্ঠা। মতবাদের, চিন্তার প্রতিষ্ঠা। যে প্রতিষ্ঠার পথ সবসময় পিচ্ছিল ও বিপজ্জনক। অন্তত শিল্পোবিপ্লবোত্তর পৃথিবীতে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে লড়াইটাও অনেক কঠিন হয়ে যায়। একটি চিন্তায় ধীরে জারিত হওয়ার জন্য যে সময়টি লাগে সেই সময়কে ব্যবহার করে অনায়াসে বিরোধী চিন্তা পরিস্থিতিকে গ্রাস করতে পারে। এই পরিস্থিতি হয়তো অনুভব করতে পেরেছিলেন এবসোলিউট ফ্রিডমের স্বপক্ষের সাঁর্ত্র। একটা পরিবর্তিত চিন্তায়, বিপ্লবের বাসনায় একটি জন গোষ্ঠীর বেশ কিছু সময় লাগে। যে সময়ের ব্যপন কয়েক শতাব্দী ধরেও হতে পারে। কিন্তু, তা বিদ্রোহের চাইতেও বিবর্তনকে সমর্থন করে অধিক। সাঁর্ত্র যে বিদ্রোহকে চেয়েছিলেন তার প্রত্যক্ষ এবং প্রতিষ্ঠাকামী। রাষ্ট্র, বিশেষ করে পার্টির পক্ষে যা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। যখন বিরোধ ও শোষন মাত্রাতিরিক্ত হয়ে সামাজিক মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারগুলো হরণ করে নিচ্ছে, ঠিক সে সময় অস্ত্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র কেই সঠিক উত্তর যদি ধরে নিই,তবে বিকল্প ভাবনার প্রতিষ্ঠা ও ক্ষমতা দখল দুইই সহজ হয়ে যায়। এই এনার্কিজম ক্ষমতা দখলের রাজনীতির মতো মনে হলেও প্রতিষ্ঠা নির্মাণের পর ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ কিংবা ক্ষমতার শরীরের বদলের প্রয়োজন সাঁর্ত্রর অন্বিষ্ট ছিল। কিন্তু, প্রশ্নটা ওই ক্ষমতা দখলের প্রক্রিয়ার মধ্যেই রয়ে গেল।
ধরা যাক, একজন ফ্যাসিস্টকে কানে বন্দুক রেখে কমিউনিজমের পক্ষে কথা বলতে বাধ্য করা হল। কিন্তু, বিশ্বাস করানো গেল না। যে অবিশ্বাসটুকু তার চিন্তায় রয়ে গেল, তার প্রত্যাঘাত মারাত্মক হতে পারে। কারণ বিজ্ঞানের সূত্র অনুযায়ী আঘাতের সমান শক্তিশালী প্রত্যাঘাতও স্বাভাবিক। কাম্যুও আঘাত করতে চেয়েছিলেন। চিন্তার গোড়ায়। পুরোনো বা প্রাক্তন চিন্তাকে উপড়ে ফেলতে চেয়েছিলেন। সেটাও আঘাত। কিন্তু, সে মহত্তর আঘাতের প্রত্যাঘাতও চিন্তার মাধ্যমেই আসবে — এমনটাও মানবগোষ্ঠীর ক্রমবির্তমান ওপর নির্ভর করে বলা যায় না। যাহোক, অস্ত্র প্রতিক্রিয়ায় যে পরিস্থিতি তৈরি হয়, তার জাজ্বল্যমান উদাহরণ আমরা বিবিধ ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে দেখতে পেয়েছি। আসলে পার্টি তার নিজের প্রতিষ্ঠার পর ক্ষমতায় হাত সেঁকতে পছন্দ করে, ক্ষমতার রূপ বদলে আগ্রহী হয় না। যদিও তাত্ত্বিকভাবে হওয়া উচিত। কিন্তু, প্রায়োগিক ক্ষেত্রে কাম্যু হয়তো সঠিক ভেবেছিলেন আমূল ও দীর্ঘমেয়াদি বিবর্তনই প্রকৃত বিপ্লবের পথ হতে পারে। কিন্তু, তা পার্টির সাপেক্ষে কতটা গ্রহণযোগ্য হতে পারে সেটাও ভাবনার। আবার একইসঙ্গে মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্র চিন্তার বিবর্তনকে জায়গা নাও দিতে পারে। তার ওপর আঘাত নামিয়ে আনতেই পারে। মুছে দিতে পারে চিন্তার আমূল। সাঁর্ত্র এই বাস্তবতাকে অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিকে অনুভব করতে পেরেছিলেন। এবং হয়তো একারণেই কমিউনিজমের ফলেই শোষিতের ক্রমমুক্তি হবে — অনুভব করে কমিউনিজমের এবং কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার স্বপক্ষে ভেবেছিলেন অস্ত্র বিপ্লবের কথাও। তাছাড়া যখন শাসক উদ্যত ভল্ল, আপনি নিষ্ক্রিয় বা চিন্তার ওপর নির্ভরশীল হলে, অপমৃত্যু স্বাভাবিক।
পৃথিবীতে সবসময় প্রতিটি বিষয়ের অন্তত দুটো পরিস্থিতি থাকে। এবং দুটো পরিস্থিতিই সমানভাবে জায়মানতা বজায় রাখে।
ধারণার পথে
আমরা এই এলগোরিদমের যুগে, তথ্য মুক্তির যুগে এসে স্পষ্ট বুঝতে পারছি কমিউনিস্ট পার্টি এবং ফ্যাসিস্ট পার্টির সরকার গঠনের পর স্বভাবে খুব তফাৎ থাকে না, বিরোধী স্বরের এখনও শাসকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা নেই, খুচরো ব্যবসার আন্তর্জাতিকীকরণের পর কমিউনিজমের অনেকটা বিবর্তনের প্রয়োজন। আবার আমরা এও বুঝতে পেরেছি, আমাদের অস্তিত্বের উদবর্তনের জন্য সম্মিলিত ভাবনার অত্যন্ত প্রয়োজন। সমাজের সাহায্য ব্যতিত আমাদের অস্তিত্ব রক্ষা অসম্ভব। কিন্তু, এই দুই মেধাবী দৈত্যের তর্ক আজও অনিঃশেষ। কোন পথে আমাদের চিন্তা বেশিরভাগ মানুষের অস্তিত্বকে নিরাপদ করবে ? সাঁর্ত্রের ভাবনার যে ফলাফল ভেবেছিলেন কাম্যু, তার ঐতিহাসিক রূপ আমরা দেখেছি। আবার কাম্যুর চিন্তাও যে সামাজিকভাবে খুব ফলপ্রসূ হয়েছে তাও নয়।
আসলে আমাদের সব চিন্তাই তো সীমাবদ্ধতার ভেতর জাত ও নির্মিত আখ্যান। আর দীর্ঘদিন ধরে যখন সেই নির্মিত আখ্যান বা তত্ত্ব মানুষ বিশ্বাস করে তখন তা ধর্মে, প্রশ্নাতীত ধর্মে পরিণত হয়। যেমন হয়েছে আমাদের সমকালে বহু কমিউনিস্ট পার্টিজানেদের ক্ষেত্রেই।
এ প্রসঙ্গে স্বীয় টিপ্পনী রচনার আগে একটা প্রসঙ্গ মনে করে নেওয়া ভাল। সাঁর্ত্র তাঁর অবস্থান, স্টালিনকে সমর্থনের অবস্থান থেকে অনেকটা সরে এসেছিলেন। এবং অস্তিত্ববাদের বিকাশে মানুষের স্বাধীনতার কথা যা ভেবেছিলেন, তার সঙ্গে অনেকটাই একমত কী হয়নি লিবারেলিজম ! আজকে প্রতিটি মানুষ স্বয়ং মুক্ত তথ্য ভাণ্ডার। এই পরিস্থিতি কি অস্তিত্ববাদের আদর্শকে সমর্থন করে না ? মানুষ তো সত্যিই রাষ্ট্রের কবল থেকে তথ্যের মাধ্যমে মুক্ত হতে পেরেছে।
কিন্তু একই সঙ্গে তার ওপর নজর রাখছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং আপাতত পুঁজির মালিকেরা। স্বাধীন কি আদৌ হল সে? তার নিজের ওপর নির্ভর করছে সে কতটা তথ্য কাকে দেবে। কিন্তু ,কাকে দিলে, কিভাবে দিলে নিজের নিরাপত্তা তৈরি হয়— এটাই শেখেনি এখনও।কখন তথ্যের মালিকানা নিজের অজান্তেই হারাচ্ছে তাও সে বুঝতে পারছে না। স্বাধীনতা আর এল কৈ ! এর ফলে সাযুজ্য হারাচ্ছে আমাদের লালিত অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও মানচিত্রের ধারণা। দিকে দিকে সন্ত্রাসের নতুন রূপ তৈরি হচ্ছে। অপরিচিত অপরাধগুলো আমাদের সাঁড়াশি আক্রমণ করছে। গোটা পৃথিবীতেই একটি পরিস্থিতির ক্রান্তিকাল এসে উপস্থিত হয়তো। হয়তো পৃথিবীর স্থিতাবস্থা তৈরি হবে সাইবর্গ ম্যানিফেস্টোর অভিঘাতে। কিন্তু , এই ক্রান্তি সময়ে বসে আমাদের সাঁর্ত্র - কাম্যুর তর্ক সম্পর্কে চিন্তা করতে গিয়ে মনে পড়ছে না রবীন্দ্রনাথের 'অচলায়তন' নাটকটির কথা !
অচলায়তনের গগনচুম্বী আস্ফালনকে ভাঙতে ঠাকুরদাদা কিংবা গোঁসাই কিংবা গুরু রক্তবর্ণ টুপি পরে প্রথমে ভাঙলেন অচলায়তনের প্রাচীর। অতঃপর যখন এল মহাপঞ্চকের প্রসঙ্গ, অচলায়তনিক চিন্তার নিউক্লিয়াসের প্রসঙ্গ, মনে করতে ইচ্ছে করছে নাটকের কয়েকটি কথা,
মহাপঞ্চক। পাথরের প্রাচীর তোমরা ভাঙতে পার, লোহার দরজা তোমরা খুলতে পার, কিন্তু আমি আমার ইন্দ্রিয়ের সমস্ত হার রোধ করে এই বসলুম- যদি প্রায়োপবেশনে মরি তবু তোমাদের হাওয়া তোমাদের আলো লেশমাত্র আমাকে স্পর্শ করতে দেব না।প্রথম শোণপাংশু। এ পাগলটা কোথাকার রে। এই তলোয়ারের ডগা দিয়ে ওর মাথার খুলিটা একটু ফাঁক করে দিলে ওর বুদ্ধিতে একটু হাওয়া লাগতে পারে।মহাপঞ্চক। কিসের ভয় দেখাও আমায়? তোমরা মেরে ফেলতে পার, তার বেশি ক্ষমতা তোমাদের নেই।প্রথম শোণপাংশু। ঠাকুর, এই লোকটাকে বন্দী করে নিয়ে যাই- আমাদের দেশের লোকের ভারি মজা লাগবে।দাদাঠাকুর। ওকে বন্দী করবে তোমরা? এমন কী বন্ধন তোমাদের হাতে আছে।দ্বিতীয় শোণপাংশু। ওকে কি কোনো শাস্তিই দেব না।দাদাঠাকুর। শাস্তি দেবে। ওকে স্পর্শ করতেও পারবে না। ও আজ যেখানে বসেছে সেখানেতোমাদের তলোয়ার পৌঁছয় না।(অচলায়তন : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর : রবীন্দ্র রচনাবলী: ষষ্ঠ খণ্ড: পৃঃ ৩৪৫: সুলভ সংস্করণ : পৌষ ১৪১৫)।
সাঁর্ত্রর পর যেন কাম্যু বলে উঠছেন।
সাঁর্ত্র - কাম্যুর তর্ক প্রসঙ্গে এটুকুই সাব্যস্ত করা যায় যে, এ তর্ক অনিঃশেষ। কেননা, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের প্রতিটি অবস্থানের কৌণিক ও সূক্ষ্ম ফারাক শেষ পর্যন্ত তাকে আত্মবিরোধী করে তোলে, বিদ্রোহী করে তোলে। আবার সমাজ নির্মাণ ছাড়া তার অস্তিত্বের উদবর্তন প্রায় অসম্ভব। সাঁর্ত্রর মনোভাব যেমন আজও গাজায় বিপ্লব ডেকে আনে, কাম্যুর আশংকাও শরীর পায় রাশিয়ায়, আলজেরিয়ায়। রবীন্দ্রনাথ যে আদর্শের শরীর গড়লেন, তা যেন সাঁর্ত্র - কাম্যুর আত্মবিরোধীতার ঐক্য। কিন্তু, সে আদর্শ রাষ্ট্রের সন্ধানও তো আমরা করতে পারলাম না। এই ক্রান্তিতে এসে শেষ বারের মতো এ নিয়ে একবার চিন্তা করার খুবই প্রয়োজন। কেন পারলাম না? পারা যায় কীভাবে?
তথ্যসূত্র
- Camus, Albert: The Rebel: An Essay on Man in Revolt. New York: Vintage Books, 1956.
- Jean Paul Sartre: Existentialism and Humanism. Methuen & Co LTD, London, 1970
- Yuval Noha Harari : the myth of freedom — A summary
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর : অচলায়তন : রবীন্দ্র রচনাবলী: ষষ্ঠ খণ্ড: পৃঃ ৩৪৫: সুলভ সংস্করণ : পৌষ ১৪১৫)
সাঁর্ত্র-কাম্যু ও একজন মহাপঞ্চক
সব্যসাচী মজুমদার
সব্যসাচী মজুমদার




মন্তব্য