.header-button .inner > span { font-size: 18px !important; } .header-button .inner i.fa { font-size: 40px !important; } .comment-form-message { background-color: #f4f4f4 !important; font-size: 14px !important; }

বিভা • প্রমিথ রায়হানের ছোটোগল্প

বিভা • প্রমিথ রায়হানের ছোটোগল্প
মেঘপুঞ্জের রাশভারী বিস্তার; অকস্মাৎ অবলোকনে কেন্দ্র থেকে প্রান্তে অবসাদ ছড়ায়, প্রান্ত থেকে কেন্দ্রে অপরীক্ষিত আবেগ- দূরবর্তী ফসলসমূহ সবুজতর হয়ে ওঠে, নিসর্গ নিজেকে শুধায়- কতোদূর মুক্ত হলে? মৃত্যুপ্রশ্নে জর্জরিত হলে জমিগুলো নিজের শাখাপ্রশাখা ছড়িয়ে দিয়ে তামাশা দেখে; সভ্যতার এ এক অনিবার্য প্রবণতা- স্বয়ম্ভূতার প্রশ্নে নিজেকে ছাড় দিতে চাইবার আকাঙ্ক্ষায় পরিপার্শ্বকে ভারবাহী করে কৌতুকের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বিচার করে; জগতকে বিপর্যস্ত করার ক্ষমতা কতোদূর প্রসারিত হলো! দুপুর প্রগাঢ় হলে স্তিমিত পায়ে গরু হাঁটে, পাতায় পাতায় তীব্রতা- ঊনতার কালে বেঁচে থাকবে আপন অতীত কীর্তির ওপরে ভর করে; যদি না ভবিতব্য কোনো কল্পনাতীত সান্ত্বনা নিয়ে হাজির হয়। জলরেখা আপন গতিতে আস্থা হারিয়ে দিশেহারা, কল্পিত প্রতিপক্ষকে পরাভূত করতে ভাসিয়ে নেওয়া ঢেউয়ের সন্ধানে, আত্মবিনাশের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে অপেক্ষমাণ, পতন যদি উন্মত্ত হয়ে নিয়তির ঘাড়ে সকল দায় চাপিয়ে তাকে দায়মুক্ত করে- ছায়া থাকবে জীবনের সহচর হয়ে, কিন্তু অগ্রবর্তী হয়ে কখনো বিব্রত করবেনা, পরস্পরবিরোধী বিশ্বস্ততায় প্রশ্নগুলো কেন্দ্রমুখী না হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকবে; বিক্ষিপ্ত ফেনাসমূহ আশঙ্কা জাগিয়ে তুলে পরমুহূর্তে নিখোঁজ। নিঃশ্বাসগুলো দম হারিয়ে যখন জিজ্ঞেস করে- এবার? সম্ভ্রম অটুট রাখতে মুহিবুল ইসলাম নিরুত্তর থাকেন। নীরবতা থেকে অনেক কিছু শিখেছেন, অনেক! যোগ-বিয়োগের অগুনতি সমীকরণ, ব্যবহারিক জীবনে ভুলে থাকার শক্তি যোগানো, উপঘটনাই যেনো সিদ্ধান্ত নিতে সহায়ক হয়- এমন সব শিক্ষা, প্রহরে প্রহরে নত থাকেন! 

উঠানের নিকটবর্তী লেবু গাছ মাত্রাতিরিক্ত শীতে ইঙ্গিতবাহী। মুহিবুল ইসলামের অন্তর্জগত বহুকৌণিক স্মৃতিসমূহে একমুখী হতে বাধা পায়। 

স্ত্রী আফরোজার মৃত্যু হয়েছে পনেরো বছর হবে। বিয়ের পরে প্রথম দুই দশক ধরে গুছিয়ে আনা সংসারের ভাঙ্গনগুলোর জলছাপ সময়ের ফেরে প্রস্ফুটিত। পত্নী-বিয়োগপরবর্তী সময়কার উপলব্ধিঃ পরিবার যদি হয় সমাজের সাপেক্ষে অন্তর্কক্ষের প্রতীক, তার মীমাংসার অযোগ্য সংকটগুলো আত্মরক্ষায় অন্যত্র মনোযোগ দাবি করে। 

যশোর থেকে কুমিল্লায় শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে বদলি হয়ে আসবার পরে প্রথম অসঙ্গতিগুলো খালি চোখে ধরা পড়লো। সে এক ঝড়ঝাপটার কাল! দেশব্যাপী জলপাই চক আর ডাস্টার! মজবুত বিশ্বাসগুলোতে একটু একটু করে সন্দেহ এলো। যদিও যাপনের ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়লোনা। কিন্তু মজবুত প্রত্যয় ধীরে ধীরে ভাঙ্গছিলো। পরিপার্শ্বের নেতির বিষয়গুলো সংসারে প্রবেশ করলো। বড়ো ছেলে সাঈদুল পাড়ার এক খ্রিষ্টান মেয়েকে ইলোপ করে পরিবারছাড়া হলো। প্রাথমিক ঝাপটা সয়ে নিতে নিতে একমাত্র মেয়ে দীপা পুকুরে ডুবে মরলো। সাঁতার জানতো। গ্রীষ্মের সনাতন দুপুর, মাঝপুকুরে ভেসে উঠবে কে ভেবেছিলো? ছাত্রদের দীক্ষিত করার বিষয়টি শুধু পেশা নয়, সাধনায় রূপ নিয়েছিলো। তা থেকে প্রথম চোখ অন্যত্র ফেরাতে বাধ্য হলেন। প্রাথমিক উপলব্ধির যোগফলটা ছিলো এমন- সংসারে অনেক রকমের নকশা থাকে, যার অবয়ব শনাক্ত করতে পারাটা সময়সাপেক্ষ। অদৃষ্টের হাতে ছেড়ে দিতে হয়। দিন যেতে থাকলো, নিত্যনতুন ব্যথার যোগে মন বিষিয়ে উঠলো। মেজো ছেলে কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফিরতে গিয়ে রোড এক্সিডেন্টে পরিবারসমেত মরে গেলো। ছোটো ছেলে জীবিকার তাগিদে শহরবাসী। রাতের পর রাত স্তিমিত স্বরে কোরআন পাঠ চলে। চশমার কাঁচ মুছতে মুছতে কখনো কখনো নিয়তিকে অভিসম্পাৎ করতে ইচ্ছা হয়েছে। কিন্তু বিরত থেকেছেন। অন্তর্গত বিশ্বাসে যদি টান পড়ে! কাঁঠাল গাছগুলো নিয়মিত ফলবতী, কিন্তু স্বস্তি কোথায়? সামাজিক সম্মানের উপযোগিতার বিষয়ে সংশয়ের সাথে কাঁটার মতো প্রশ্ন এলো। আত্মরক্ষার নামে ভেসে যাওয়ার কালকে আড়াল করতে পারার সাফল্য? পূর্ব দিকের হাওয়ার চাপ মাথার ওপরে ঘন হয়ে এলে সন্দিগ্ধ মন সম্ভাব্য ভরসার ক্ষেত্রগুলোর প্রতি অবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। 

মূল্যবোধ হিসেবে যেসকল ধারণাকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চেয়েছেন তা কি শেষমেষ আত্মপ্রবঞ্চনার নামান্তর? ধর্মবিশ্বাসে এতটুকুও চিড় ধরেনি। কিন্তু নিঃশ্বাস নেওয়ার সময়ে শ্লেষ্মাজনিত কারণে আড়ষ্টতা এলে বেদনায় মন দুর্বল হয়ে ওঠে। বার্ধক্যের লক্ষণ এ নয়। আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে অপ্রত্যাশিত সত্যগুলো অকস্মাৎ সামনে এসে হাজির হলে আপন তর্জনীর শক্তি ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়ে।

পরিবার-পরিজন বলতে যেই বিশ্বাসকে ধারণ করে এসেছেন এতোকাল, তা কি শুধুই এলাকায় সামন্ত মর্যাদা ভোগ করা ও পইপই করে প্রাপ্য হিসেব বুঝে নেওয়া জনগোষ্ঠীর চিহ্ন মাত্র; যারা একই ছাদের নিচে বসবাস করে? 

বিশেষ প্রেক্ষিতে ব্যতিক্রমী এক চরিত্র আছে, সবার অলক্ষ্যে তাকে ঘিরে বিস্তারিত প্রেক্ষাপটে একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারের উত্থান-ভাঙ্গনের ন্যারেটিভকে শনাক্ত করা যায়। 

জন্ম ১৯৮৯ সালের ৫ এপ্রিল, মাতৃজঠর থেকে উদ্ভবপরবর্তী সময়ে তার নামকরণ হয়, ফারিহা। কন্যা দীপা তখনো জীবিত, নিঃসন্তান ছিলো। তার সন্তান হিসেবে ফারিহাকে দত্তক নেওয়া হলো। 

জলের প্রতি অদম্য আগ্রহ। লোকচক্ষুকে উপেক্ষা করার সুযোগ পেলেই বাড়ির নিচের স্বল্পাকৃতির পুকুরঘাটের আশেপাশে ঘুরঘুর করতো। 

পরিবারের কোনো সদস্য দেখলে ধমকে উঠতো, সম্ভাব্য অপঘাতের আশঙ্কায়। কিন্তু ফারিহার মনোবৃত্তির গতিপথ ভিন্নখাতে প্রবাহিত হতো। 

সন্তর্পণে তাকে লোকচক্ষুর আড়ালে রাখতো। যেনো, কেউ আঁচ করতে পারলে গোপনতম কোনো পাপ ধরা পড়ে যাবে। 

জলের ছায়ায় যেই আত্মরূপ প্রস্ফুটিত হয়, তাকে আত্মস্থ করাটাও প্রাণান্তকারী এক যুদ্ধ। পরিপার্শ্ব যেই উপলব্ধির সহাবস্থান অনুমোদন করেনা।  

মুহিবুল ইসলামের সাথে ফারিহার সম্পর্কের ধরণ বিচিত্র। প্রজন্মান্তরের রসবোধের বহনযোগ্যতা যেমন আছে, তেমন আছে অন্তঃকরণের পৌঁছাতে না পারার ভার। ফারিহার পুকুরঘাটে দাঁড়িয়ে নিজের ছায়া দেখার দৃশ্যটা বহুবার দেখেছেন, কিন্তু প্রশ্ন করেননি মুহিবুল ইসলাম। আপন কন্যার পালিতা কন্যা, কৃষ্ণবর্ণের ও প্রচলিত সংজ্ঞানুযায়ী কোনোভাবেই সুন্দরী বলা যায়না তাকে। তার উপস্থিতিতে তা অসম্ভব, কিন্তু নিকটজনদের কাছে বংশের প্রচলিত সংজ্ঞা ও স্বভাবজাত ‘অপরায়নের’ ঊনতার আঁচ পেতে পেতেই মেয়েটির দিনানিপাত করতে হয়; বিলক্ষণ বোঝেন। আকাশের অংশীদারিত্ব হয়না- এই প্রাথমিক শিক্ষার উপলব্ধি থেকে অনেকে সচেতন দূরত্বে বসবাস করে। আফরোজা যতোদিন জীবিত ছিলেন- গার্হস্থ্য ঊনতার বিষয়গুলোকে অনাবশ্যক ভাবার আরামটুকু পাওয়া যেতো। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে প্রবেশ করতেই- মর্মন্তুদ চেতনায় জীবন ভিন্ন রূপে আবিষ্কৃত হলো। একসময়ে ভেতরে ভেতরে তৃপ্তি ছিলো-  গ্লোব ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জীবনকে বহুরূপে দেখেছেন ভেবে। সেই ভাবনাকে এখন ঠুনকো বলে মনে হয়। রাতে ঘুমোতে যাবার আগে কোরআন পাঠ চলে, কিন্তু নিয়মতান্ত্রিকতার প্রেক্ষিতে নয়। গূঢ় অন্বেষণে। হোয়াট ওয়েন্ট রং! দেয়ালে হালকা সবুজ রঙের ডিসটেম্পার বরাবর তার পছন্দ। এ নিয়ে আফরোজার কাছ থেকে কম ঠাট্টার শিকার হননি। কিন্তু হালকা সবুজ রং প্রয়োজন থেকে আপনজনে পরিণত হয়েছে। ঘুমে চোখ জুড়িয়ে আসবার আগে মনে হয় স্বার্থহীন সঙ্গ হিসেবে কেউ তো পাশে রইলো। 

সাহচর্যের প্রশ্নে ফারিহার ভাবনাগুলো ভিন্নদিকে আবর্তিত হয়। মমতায় ও ভালোবাসায় যারা হাত বাড়িয়ে দেয়, সন্দেহপ্রবণ মন সম্ভাব্য কারণ অনুসন্ধানে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। শৈশব থেকে অনুকম্পাকে সে ঘৃণা করে, তীব্র ঘৃণা! সে সন্তান ছিলো, কিন্তু মনোবৃত্তির যেই আবেগের স্ফূরণ জৈবতার সাথে একাকার হলে মৃত্তিকায় নতুন প্রাণকে সাদরে বরণ করা হয়, তা থেকে সে সহস্ত দূরে! কার্যকারণগুলো সম্পর্কে অনবহিত ছিলো অনেককাল ধরে। ঘরে থাকা আত্মীয়স্বজনের অনাদর – অবহেলায় ভেবেছিলো নিজের ভেতরেই অমোচনীয় কোনো খুঁত আছে। ধীরে ধীরে কারণগুলো স্পষ্ট হলো। আঞ্চলিক সমাজবিজ্ঞানের কদাকার সূত্রগুলোকে যখন অনুপেক্ষণীয় বলে উপলব্ধি করলো; পুকুরে জলের ছায়াকে সহোদরা ভাবতে শিখলো। কাদের মিয়ার রিয়েল এস্টেটের কাছে বড়ো একটি পুকুরঘাট আছে। মাঝেমাঝে বিকালে সেখানে বসে কাঁদে। কিন্তু বেদনায় অসহায় হয়ে পড়েনা। নিয়তিকে অভিশাপ দিয়ে এগোনো যায়না, বুঝেছে। মানুষের কাছে নিজেকে প্রমাণ দিতে নয়, অন্তর্গত প্রেষণায় প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার প্রতি মনোযোগী। কখনো চেনাজানা পরিবেশ থেকে বেরোলে সংবেদনের অভিজ্ঞানে আত্মপরিচয় নির্মাণে দুঃখকে মেনে নিয়ে তারের মতো সোজা করবে, এই হলো লক্ষ্য। 

মেহগনী গাছের নিচে ঘূর্ণায়মান তপুকে দেখে বিরক্ত হয় ফারিহা। চিরুনীর সংস্পর্শে না আসা রুক্ষ চুল, সপ্তাহের না কামানো দাঁড়ি, নীল রঙের জিন্সের প্যান্টের সাথে ঘিয়ে রঙের ময়লা টি-শার্ট- ফারিহা ভাবলো, শারীরিক বর্ণ উজ্জ্বল বলেই কি এই সংকোচহীন উপেক্ষা? 

‘পরিপাটি হবার সাথে কি তোমার জন্ম থেকে আড়ি?’ রসিকতার সুরে ফারিহা জিজ্ঞেস করলো। 

‘আড়ি না, তবে ঘনিষ্ঠ মিতালী পাতাইনা। কেমন জানি অস্বস্তি লাগে।’ তপুর উত্তরটা সিরিয়াস হয়ে গেলো। ফারিহা কিঞ্চিত আহত হলো। 

মেহগনী গাছ থেকে সামনের লিচু গাছটার দিকে এগোলো ওরা। ক্ষণিকের বিষণ্ণতা কাটিয়ে ফারিহা হালকা হলো। 

তপু মন দিয়ে গাছের পাতাগুলো দেখছিলো। তারপরে বাকলের দিকে চোখ গেলো। মনে হলো অতীত ঐশ্বর্য ক্ষয়িষ্ণু হয়ে দিশেহারা। 

চকিতে অনেকগুলো ভাবনার বিস্তার এসে এলোমেলো করে দিলো মনটাকে। ঐতিহ্যের গতিপথের প্রশ্নগুলো এমনই এক ধাঁধার জন্ম দেয়, আত্মসন্দেহে নিজের বুদ্ধিমতার ওপরে গুরুতর আস্থাহীনতা তৈরী হয়। ঘনায়মান অন্ধকারে দূরের মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসে। ইমাম কি গোপনে গোপনে সঙ্গীতমনস্ক? এমন একটা প্রশ্ন এসে তপুকে বিব্রত করে। ফারিহার চলাফেরায় স্থিরতা আসে। ধর্মে ওর কোনোকালে মতি নেই। দৈব নিয়ে যতোবারই ভেবেছে, সমাধান হিসেবে ধর্মের কাছে সমর্পণকে যুক্তিগ্রাহ্য বলে মনে হয়নি। কিন্তু আত্মাবিযুক্ত যে আধুনিকতা; মুহিবুল ইসলামের জীবনাচরণ কাছ থেকে দেখে সেদিকে অগ্রসর হবার দিকে মন ধাবিত হয়নি। বিকেলের আলো মুছে যায়। 

বাড়ি থেকে আধা কিলোমিটার দূরত্বে এসে ফারিহাকে ড্রপ করে তপু ডিসি অফিস ঘেঁষা শুনশান রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফেরে। সন্ধ্যাবেলায় ছিনতাইয়ের ঝুঁকি আছে সত্য, কিন্তু তা কালেভদ্রে হয় বলে জানে। এলাকায় জানাজানির ভয়ে স্থানীয় তরুণরা সেই সাহস করেনা। সিএনজিতে করে দূরের এলাকার তরুণরা অস্ত্র বের করে তড়িঘড়ি করে যা যা আছে নেওয়ার মতো, নিয়ে যায়। অস্ত্র বের করে ভয় দেখাতে, কিন্তু তার প্রয়োগ করেনা। অন্তর্গত বোঝাপড়াটাই এমন যে, এককানে পৌঁছানো মানে দশকানে পৌঁছানো। দূরবর্তী এলাকায় কোনো দুঃসাহসিক কাণ্ড ঘটালেও নিজের এলাকায় সারভাইভ করাটা কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। পুলিশ দিনের পর দিন ক্লান্তিহীনভাবে বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবারের সদস্যদের হেনস্থা করে। উপযুক্ত শেল্টার খুঁজে পাওয়াটাও রাজনৈতিক হিসাবনিকাশ ও ভাগ্য সাপেক্ষ। বেশীরভাগ সময়েই ব্যাকফায়ার করে। 

বাসায় ফিরে তপু জামাকাপড় বদলে নিজেকে বিন্যস্ত করে নেয়। নিঁখুতভাবে চুল আঁচড়ায়। শুরুটা হয়েছিলো প্রয়োজন থেকে। বিষয়টা এখন খেলার পর্যায়ে চলে গেছে। 

তার ঘর সুচারুভাবে গোছানো থাকে। সে নিজেই গুছিয়ে রাখে। 

ফারিহা তো নয়ই, নিজের কোনো বন্ধুকেও কখনো বাড়িতে ডাকেনি। 

সে চায়না, তার দ্বৈত রূপ সম্পর্কে ঘনিষ্ঠজনেরা অবহিত থাকুক। 

তখন ক্লাস টেনে পড়ে- মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ক্লাসমেটরা দুই ভাগে বিভক্ত ছিলো। সন্ধ্যাবেলা টিউশন থেকে বেরিয়েছে, শত্রুপক্ষের চারজন এসে একযোগে পাকড়াও করলো। প্রথম বাক্যটিই ছিলো দশকের পর দশক ধরে স্তব্ধ করে দেওয়ার মতো- “হিরোমার্কা খোমা মাইরা ভর্তা কইরা ফালামু।” প্রতিরোধহীনভাবে দশ মিনিট এলোপাথাড়ি মার খেলো। সাইকেলে করে স্থানীয় এক প্রভাবশালী প্রবীণ ব্যক্তি বাজারের দিকে যাচ্ছিলেন। তিনি দেখে ফেলায় সে যাত্রায় বেঁচে গিয়েছিলো। সেই স্মৃতির অভিঘাত ভবিষ্যতে ভিন্নভাবে ক্রিয়াশীল হয়েছিলো। মনের কোন গলিঘুপচিতে, নিয়ন্ত্রণ নেই, এমন সব বিষয়কে আঁকড়ে ধরে একান্ত অসূয়ার বেরিয়ে আসাকে উদযাপন করে মানুষ! কলেজ জীবন কাটলো নির্বিঘ্নে। স্বাস্থ্যকর সঙ্গগুলো জানালো, নদীর অপরপাশের সবুজের প্রলোভনকে অতিক্রম করেও মানুষ সানন্দে বাঁচে! 

বাড়ি ফিরতে ফিরতে বেশ দেরি হলো ফারিহার। নিকটবর্তী আমগাছ থেকে আম পাড়তে সময় লেগেছিলো। উঠানের কাছাকাছি আসতে মুহিবুল ইসলামের মুখোমুখি হয়ে গেলো। বাম হাতে থাকা গামছা ডান কাঁধে নিয়ে ঘড়ি দেখে বললেন ‘শান্তির জন্য কারো কাছে স্থির হয়ে বসতে হয়।’

ইঙ্গিতটা বুঝলো ফারিহা। বিপরীতে প্রশ্ন করলো ‘যার কাছে দুর্ভাগ্যের মার খাওয়ার উত্তর পাইনা তাকে কী জিজ্ঞেস করবো?’ 

এ প্রশ্নের যথার্থ উত্তর খুঁজে পেলেন না মুহিবুল ইসলাম। সামনে যে নিয়তি ফনা উঁচু করে থাকে, বিশ্বাসের কোন শক্তি তার সাথে শান্তিপূর্ণ ফয়সালায় যাবে? 

ফারিহার মানসপটে হিউমিলিয়েশনের অন্ত নেই। 

স্মৃতির খাপ খুললেই দুঃস্বপ্নে কুঁকড়ে যাওয়া একেকটি চিত্র মূর্ত বাস্তব হয়ে ভাসে। 

প্রতিকূলতাকে মোকাবেলা করতে যেয়ে যখনই মানবস্বভাবের শুভবোধের উপরে আস্থা রাখতে চেয়েছে, অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো না কোনো ঘটনা তাকে বিধ্বস্ত করেছে। প্রতিক্রিয়া হিসেবে নেতিকে সমগ্র বাস্তব বলে ভেবে দার্শনিক উপসংহারে এসে উন্মূল নাগরিক হবার ইচ্ছা কখনো প্রবল হয়ে ওঠেনি, মন এতোখানি নির্লিপ্ততাও অনুমোদন করার অবস্থানে ছিলোনা। কিন্তু মনকে অনুসন্ধিৎসু রাখবার ব্যাপারে সচেষ্ট ছিলো। মানুষের দৈবে অনেক কিছু থাকেনা, অনেক কিছু! তাই কি চূড়ান্ত? কলেজের বান্ধবী কাকলীর পরিণতি নিজের চোখে দেখা। বাদানুবাদে ছেড়ে যাওয়া প্রেমিকের প্রতি ক্ষুব্ধতার প্রতিক্রিয়ায় জীবন নিয়ে কী ছেলেখেলাটাই না করলো! অর্থগত প্রেক্ষিতের উপস্থিতি না থাকলেও জৈব দিকটিকে প্রাধান্য দিয়ে দেহপসারিণী বনে গেলো। সমাজ নৈতিকতার লেন্স দিয়ে দেখে ভ্রষ্টা বলে গাল দিলো, শহরছাড়া করলো। ফারিহার বুদ্ধিদীপ্ত মন বা অবচেতন সত্যের গতিমুখ; কোনোটাই সেই দেখার সাথে একাত্ম হলোনা। কিন্তু প্রশ্নটা জাগে প্রতিক্রিয়ার উদ্দেশ্যের সাপেক্ষে। ভালোলাগা-মন্দলাগা নির্বিশেষে প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতিতে এসব চলতে পারে, চলেও। কাকলীর পরিবর্তিত পথচলার কক্ষমুখ কোন দিকে ধাবিত হয়েছিলো? যদি উত্তরটা হয় সমাজকে শত্রুভাবাপন্ন মনে করে তার ওপরে প্রতিশোধ নেওয়া, বিষটা কার গলায় ঢুকলো? নিজের আমূল পরিবর্তন যদি হয় মূল লক্ষ্য, উপলব্ধ বীক্ষণ কিসের পক্ষে সাক্ষ্য দেয়? ফারিহার বিশ্বাস মানুষের ক্রিয়ার পরিণাম ভালোমন্দ যাই হোক, স্বোপার্জিত যে উপলব্ধি; তা নিশ্চয়ই সে ঘনিষ্ঠজনদের জানিয়ে যেতে চাইবে। কাকলী এসবের কিছুই করলোনা। স্কুলে থাকতে রমেশ বাবু ইংরেজী পড়াতেন, তার মুখে প্রথম শুনেছিলো ‘মেগালোম্যানিয়াক’। নৈতিকতার আপেক্ষিকতা নিয়ে যেমন সন্দেহের অবকাশ নেই, তেমনি সেই আপেক্ষিকতার পরিমাপও তুলনাযোগ্য- ভারসাম্যপূর্ণ বিশ্লেষণে না আসলে নিকৃষ্টতম স্বৈরশাসককেও ক্লিনচিট দিতে হয়। কলাপাতার ইনোসেন্স মরে যায়। বিক্ষিপ্ত আঁকিবুকি বাকলগুলোকে শনাক্তঅযোগ্য বলে প্রতিপন্ন করে। ফারিহা ক্লাস ফাইভ থেকে টেন পর্যন্ত সানজানার পাশে বসতো। স্বচ্ছল পরিবারের মেয়ে ছিলো। ছবি আঁকতে ভালোবাসতো। নিজের যেই ছবিগুলোকে বিশেষ বলে ভাবতো, ফারিহাকে উপহার দিতো। বহুকাল পরে ফারিহা বুঝেছিলো অনুকম্পা ভেবে যেই বাৎসল্যকে গ্রহণ করেনি, দূরে ঠেলে সরিয়ে রেখেছিলো- তা ছিলো পাশে বসা এক সংবেদনশীল কিশোরীর সঙ্কেত, অল ইজ নট লস্ট! নিজেকে ঊন ভেবে বিবমিষায় ভুগেছিলো দীর্ঘকাল। সানজানা উচ্চশিক্ষার জন্য আমেরিকায় চলে যাবার আগেরদিন ফারিহা অন্তর্গত সংকোচ ঝেড়ে, গলার কাঁটা হয়ে থাকা অহমকে প্রত্যাখ্যান করে বলিষ্ঠ পদক্ষেপে তার বাসায় গিয়েছিলো। উপহার দিয়েছিলো ওয়াটারকালারে আঁকা স্কুল ছুটির পরে হেঁটে যাওয়া সানজানার একটি পেইন্টিং। ভারমুক্ত হয়ে প্রকৃতির সাথে হৃদত্যপূর্ণ সংযুক্তি ঘটেছে ভেবে বাড়ির দিকে যেতে যেতে আনন্দে কেঁদেছিলো।

তপুর কাছে এখন সক্রিয়তাই প্রধান সত্য। তার উপলব্ধিঃ অনেক সময় নষ্ট হয়েছে, অনেক! অতীতকে ভুলে যেতে চাওয়ার ব্যাপারে সংশয় আছে, কিন্তু তাতে অবগাহন করতে রাজি নয়। পিএইচডির জন্য সুইডেনের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অফার এসেছে। সেটা গ্রহণ করতে চায়। তাৎক্ষণিক প্রয়োজনের অনুভব তীব্রতর হয়ে উঠলে সত্যের ব্যবহারিক দিকটিকেই অগ্রাধিকার দিতে হয় বলে ভাবছে- কিন্তু সত্যের সমগ্র পরিধি, তার চাইতেও বড়ো কথা আকাঙ্ক্ষিত যেই নান্দনিক দিকগুলোকে ছাড় দিতে হবে, তার ভার বইতে পারবে কিনা সে বিষয়ে সন্দিহান। অকস্মাৎ উচ্চাকাঙ্ক্ষা মনোজগতকে কোনদিকে কীভাবে প্রবাহিত করে সে বিষয়টা ভাবার, অন্তত অনাগত ভবিষ্যতের সাপেক্ষে। কিন্তু সে নিয়ে বর্তমানে নিজের মুখোমুখি হতে পারার সাহস করতে পারছেনা। ঘরের বাতি জ্বালালো। মাকে খবরটা জানিয়েছে। তাকে মিষ্টি খাইয়ে বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়েছে। তপু জানে অনেকদিন পর নির্ভার হয়ে ঘুমোবে। 

সকালটা একটু থিতিয়ে আসতে পুকুরপাড়ে চলে আসলো। বাতাসের চাপ সহনীয়। ফারিহা নিবিষ্ট মনে তাকে দেখে। শুধুই কি পর্যবেক্ষণ? গোয়েন্দার মন নিয়ে সম্ভাব্য কোনো সত্য যাচাইয়ের উদ্দেশ্যও কি সেই সম্ভবপরতার অন্তর্ভূক্ত নয়? 

‘দেশ ছাড়তে না ছাড়তেই বিদেশকে ভালোবাসতে শুরু করেছো দেখছি। তোমাকে এতো পরিপাটি কখনো দেখেছি বলে মনে করতে পারিনা।’ 

‘আমি তোমার মতো সংকোচ ছাড়া সবুজ রঙের জামা পরতে পারিনা। কিন্তু… কথা শেষ না করে তপু বিব্রত হয়ে হাসলো। 

হাসিটা ফারিহার কাছে ইতিবাচক হলোনা। নিজের কাছে সৎ থাকার চেষ্টা মাঝেমাঝে এতো বিপুল পরীক্ষা দাবি করে বসে! ফারিহা বহুদূর দেখতে চেয়েছিলো। অন্তর্গত কিছু লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে এগোবে, কিন্তু উৎকেন্দ্রিকতাকে প্রত্যাখ্যান করে।  

লিচু গাছের পাতাগুলো অল্প অল্প দোলে। হয়তো বা সময়ের মন্থরতাকে অনুভব করে থাকবে প্রাতিস্বিক সংবেদনে! 

তপু ভরাট কণ্ঠস্বরে বলে, ‘আমি তোমার দাদার সাথে কথা বলতে চাই। আমাদের ব্যাপারে।’ 

ফারিহা ডেফিনিট কিছু বলেনা। প্রত্যুৎপন্নমতির প্রমাণ পাওয়া যাবে এমন কোনো কথার প্রয়োজন নেই। অন্তত এই মুহূর্তে।  

রাতেরবেলায় ডাইরীর পুরনো পাতাগুলো পড়তে পড়তে ফারিহা বাইরে এলো। দিগন্তরেখা অতিক্রম করে- উষর সীমানাগুলোকে অগ্রাহ্য করে; অবসাদের রাত্রিকালীন মুহূর্তগুলো আঁকাবাঁকা পথগুলোকেই ভবিতব্য ভেবে মর্মান্তিক সুরে কাঁদে- সে ক্রন্দনের কোনো শ্রোতা থাকেনা, প্রাণের ভেতর থেকে টান আসলেও তাকে পাওয়া যায়না। সমাধান নয়, সান্ত্বনা নয়, বিষে বিষে বিষক্ষয় নয়, বিষ টু দি পাওয়ার থ্রি হয়। মৃত্তিকা অদ্ভুত এক পরীক্ষা নেয় মানবমনের, ভেতরকার লাবণ্যকে কতোটুকু তীব্রতায় আগলে রাখবে, নাকি অবহেলায় দূরে সরিয়ে দেবে- অর্জিত অন্তর্গত দীপ্তিগুলোর প্রতি সন্দেহ জাগে, ওগুলো জননীর ছদ্মবেশে এসে অহমকে পুষ্ট করে জৈবিক সত্তাকে বাঁচিয়ে রাখার জাস্টিফিকেশন কি? সত্যের বিচিত্র ও বহুমুখী সম্ভবপরতাকে অস্বীকার করে মন শুধু নেতির দিকে ছোটে- আকাশে শুধু অন্ধকার দেখে, তার অসীমতার দিকে তখন মন ঝুঁকবে কোন শক্তি নিয়ে? খোলসগুলো গোটা শরীরকে সংজ্ঞায়িত করে ভেবে আত্মা রি-রি করে। চারিদিকে কি তবে শুধু নগ্নতার কদর্য রূপটিই থাবা গেড়ে বসে থাকে? এই অপেক্ষায় যে, কোন মোক্ষম সময়ে, প্রাণঘাতী ছোবলে ধর্ষকামী প্রবণতাকে চরিতার্থ করবে? তবে রেবতীর কেনো এতো মিছে গুণকীর্তন? পোশাকী মেজাজ শেষমেষ চোখের মণিকে ঘোলাটেই যদি করবে, কেনো তার সৌন্দর্য নিয়ে এতো গালগল্প? আলোর পথ তার নিজস্ব, শুধু অপরকে সম্মোহন করার তৃপ্তিতেই বুঁদ হয়ে থাকবে? তুফানের মতো প্রশ্নগুলো এসে ফারিহাকে নাড়িয়ে দিতে লাগলো। বায়ুর সুষমতার বিষয়টি তার চাইতে কে বেশী ভালো করে বোঝে? তবু কেনো উপগ্রহগুলো অকস্মাৎ এসে চিন্তাজগতকে নিয়ম করে বিপদমুখী করে? স্ট্রিটল্যাম্পের আলোতে লেবুপাতাগুলো চিকচিক করছে লক্ষ করলো। ভাবনার অলিগলি ভিন্নখাতে বইতে শুরু করলো। আপন শক্তির প্রতি বিশ্বাস ফিরে আসছে বলে মনে হলো। বেরিয়ে যাবে, ভেবেছিলো। কিন্তু এভাবে নয়। এভাবে নয়। তমসাচ্ছন্নতায় বিক্ষিপ্ত অনেক ভাবনাকেই রূপ দিতে ইচ্ছা করে, মানুষ বলে কথা! কিন্তু তারপরেও কথা থাকে, প্রশ্ন থাকে। প্রাণের ক্রমবিন্যাসের ধাপগুলো তার এলোমেলো হয়েছে সত্য, অনেকক্ষেত্রে তার স্পর্শই পায়নি। কিন্তু স্বোপার্জিত বোধগুলো? উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া যায়না, এও এখন বোঝে আর যাই হোক ধারাবাহিক বঞ্চনার প্রতিক্রিয়ায় গড়ে ওঠা রুগ্ন অহম দিয়ে সেগুলো ভেতরে বসে যেতে পারেনা। সমাধান হলো উপযুক্ত প্রক্রিয়াটুকু শিখে নিয়ে লড়ে যাবার সদিচ্ছা, যে বিষে আপন সত্তা নীল হয়েছে তার ব্যবহারে যেনো অপরকে ধরাশায়ী করার স্পৃহা তৈরি না হয়। তপু নিজের অজান্তেই তাকে অনেক কিছু চিনতে শিখিয়েছে। তার সবচেয়ে ভালো গুণ বলে যা মনে করতো- নিজের গুণাবলী সম্পর্কে সহজ থাকা। ব্যবহারিক জীবনে এটা নিঃসন্দেহে এক ধরণের রিস্ক, কিন্তু এতে মানুষ মানুষ হয়ে ওঠে। সেই মানুষটাই কিনা আজ…মনটা তেতো হয়ে এলো। কিন্তু সমান্তরাল বোধগুলোর প্রভাবে নিজেকে ফিরে পাচ্ছে বলে ফারিহার স্বস্তি হলো। দুর্ভাগ্যের বহুমুখী রূপ সে বহন করে গেছে, ভবিষ্যতেও নিশ্চয়ই করবে। আধ্যাত্মিকতার প্রথাগত রূপের কাছে সে সমর্পিত নয় এতো সত্যই। কিন্তু এটাই শেষ কথা নয়। হতে পারেনা। জলের ছায়ায় যদি সহোদরাকে সত্যিকার অর্থেই চিহ্নিত করতে শিখে থাকে, তবে তার কোমলতায় আগুনকে বুঁজিয়ে দেওয়াটা প্রীতিউৎসারিত করণীয়। আগামীকাল বিকালে তপুকে শান্তভাবে সত্যটা জানাবে। উত্তরটা এখানে একমাত্র মুখ্য বিষয় নয়, তার কার্যকারণের বিস্তৃত প্রেক্ষাপট ও সূত্রমুখগুলোকে ব্যাখ্যা করাটাও হবে তার জায়গা থেকে লাস্ট এক্ট অব অনেস্টি টুওয়ার্ডস হিম। 

ফারিহার কাছ থেকে তার উত্তরের বিস্তারিত বিবরণ শোনে তপু। প্রেক্ষাপটগুলোতে ব্যক্তিগতভাবে আহত হয়, কিন্তু অবচেতন মন তার অনিবার্য সত্যতা সম্পর্কে সন্দেহ করেনা। বাসায় ফিরে ভাবেঃ এ তার পরম সৌভাগ্য, ফারিহার নিজেকে মেলে ধরার সাক্ষী ছিলো একমাত্র সে নিজে। পরিপার্শ্ব ফারিহাকে আপন কদর্যতার কারণে নানা অর্থে গ্রহণ করতে চায়নি, কিন্তু ফারিহা আপনগুণে সমাজকে অতিক্রম করে সভ্যতার দিকে অগ্রসর হতে শুরু করেছে। তপুর মনোতলে সামান্য তৃপ্তি জন্মেঃ সত্যটা ফারিহা নিজেও না, শুধু সে জানে। সুইডেনে যাবার পরে কয়েকমাস এই সত্যের বিভায় নতুন পরিবেশে নিজেকে এডজাস্ট করে নেবে। 

আসরের নামাজ শেষে মুহিবুল ইসলাম জায়নামাজ গুছিয়ে উঠোনের দিকে এগোলেন। ফারিহা বাজারের সদাইপাতি কিনে ঘরে এনে রাখলো। 

মুহিবুল ইসলামের মনে চকিতে কথাটা উদ্ভাসিত হলো। সরস কণ্ঠে বললেন ‘দুর্ভাগ্যের কাছে মার খাওয়ার উত্তর নিজে খুঁজে নিজেই পেয়ে গেছিস। স্থির হয়ে কখনো বসতে চাইলে ভয়ভীতি ছাড়াই বসতে পারবি।’

ফারিহা হাসিমুখে প্রত্যুত্তর দেওয়ার আগেই বিকেলের রোদ উজ্জ্বলতর হলো। 

বিভা 
প্রমিথ রায়হান 


মন্তব্য

নাম

অনুবাদ,40,আত্মজীবনী,27,আর্ট-গ্যালারী,2,আলোকচিত্র,1,ই-বুক,7,ইচক দুয়েন্দে,23,উৎপলকুমার বসু,26,ঋত্বিক-ঘটক,4,কবিতা,346,কবিতায় কুড়িগ্রাম,7,কর্মকাণ্ড,16,কার্ল মার্ক্স,1,গল্প,82,ছড়া,1,জার্নাল,4,জীবনী,6,দশকথা,25,দিনলিপি,1,পাণ্ডুলিপি,11,পুনঃপ্রকাশ,22,পোয়েটিক ফিকশন,1,প্রতিবাদ,1,প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা,4,প্রবন্ধ,174,প্রিন্ট সংখ্যা,5,বই,4,বর্ষা সংখ্যা,1,বসন্ত,15,বিক্রয়বিভাগ,21,বিবিধ,2,বিবৃতি,1,বিশেষ,25,বুলেটিন,4,বৈশাখ,1,ভাষা-সিরিজ,5,ভিডিও,1,মাসুমুল আলম,35,মুক্তগদ্য,42,মে দিবস,1,যুগপূর্তি,6,রিভিউ,5,লকডাউন,2,শম্ভু রক্ষিত,2,শাহেদ শাফায়েত,25,শিশুতোষ,1,সন্দীপ দত্ত,14,সম্পাদকীয়,19,সাক্ষাৎকার,24,সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ,18,সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ,55,সৈয়দ সাখাওয়াৎ,33,স্মৃতিকথা,15,হেমন্ত,1,
ltr
item
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন: বিভা • প্রমিথ রায়হানের ছোটোগল্প
বিভা • প্রমিথ রায়হানের ছোটোগল্প
প্রমিথ রায়হানের গল্প৷ বিন্দু • বাঙলা ভাষা ও সাহিত্যের লিটল ম্যাগাজিন৷
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEjOPp9w01VSBP882t4cs0C8zALqL78loOBRDMxCQK_dcT9XFLGlMYHs0ETWIKYQ0szka5zqPmXig0uVAf3WrYbE2ganX-G25buIgBgVaVApQu4oChMa5sxeq3SX8w33WGejkS6T7TpvkyHSwE5tHkj-eL1gtFR88uvfoWoxtr9RHqclHhVEHpN7ToP1fxQ/s16000/%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%A5%20%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A7%9F%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%B0%20%E0%A6%97%E0%A6%B2%E0%A7%8D%E0%A6%AA%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%AD%E0%A6%BE%20%E2%80%A2%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%81%20%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%9F%E0%A6%B2%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%97.png
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEjOPp9w01VSBP882t4cs0C8zALqL78loOBRDMxCQK_dcT9XFLGlMYHs0ETWIKYQ0szka5zqPmXig0uVAf3WrYbE2ganX-G25buIgBgVaVApQu4oChMa5sxeq3SX8w33WGejkS6T7TpvkyHSwE5tHkj-eL1gtFR88uvfoWoxtr9RHqclHhVEHpN7ToP1fxQ/s72-c/%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%A5%20%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A7%9F%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%B0%20%E0%A6%97%E0%A6%B2%E0%A7%8D%E0%A6%AA%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%AD%E0%A6%BE%20%E2%80%A2%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%81%20%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%9F%E0%A6%B2%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%97.png
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন
https://www.bindumag.com/2026/06/shortstory-pramith-raihan.html
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/2026/06/shortstory-pramith-raihan.html
true
121332834233322352
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts আরো Readmore উত্তর Cancel reply মুছুন By নী PAGES POSTS আরো এই লেখাগুলিও পড়ুন... বিষয় ARCHIVE SEARCH সব লেখা কোন রচনায় খুঁজে পাওয়া গেল না নীড় Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share to a social network STEP 2: Click the link on your social network Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy