জীবন যাপন এক বিচিত্র ও বিশিষ্ট পরিক্রমা। এই পরিক্রমার বাঁকে বাঁকে কতো চিহ্ন লুকিয়ে থাকে। চিহ্নগুলি আণবিক। গল্পে ঠাসা। যতটুকু লিপিবদ্ধ হয়, হয় না তার লক্ষ কোটি গুণ। প্রতি মানুষের কাঁধেই এই ঝুলি। আমরা খেয়ালও করি না। জীবনের বিভিন্ন মুহূর্তে তারা উঁকি মারে। বের করে ভাগ ক’রে নেওয়াটাই অভীষ্ট। স্মৃতির সঙ্গে কথোপোকথন। তেমন কিছু খণ্ড-চিত্রই তুলে আনার চেষ্টা করেছি। এই প্রক্রিয়াকেই তো সাহিত্যচর্চার স্বীকৃতি দিয়ে গেছেন মিলান কুন্দেরা। হয়তো সেই ভরসাতেই।
বিশ্বাস
সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অঙ্গ রাজ্য, বর্তমানের স্বাধীন রাষ্ট্র, এস্তোনিয়ার রাজধানী তালিন-এ কর্মসূত্রে ছিলাম কিছু দিন। ছোট ছিমছাম শহর। ঠাণ্ডা। বাল্টিক সমুদ্রের পারে। সেখানে এক ট্যাক্সিওয়ালার সঙ্গে বেশ ভাব হয়ে গিয়েছিল। তালিনে ট্যুরিস্টের আনাগোনা খুব। ফিনল্যান্ডের হেলসিঙ্কি থেকে দু’ আড়াই ঘন্টার ক্রুজ। ফলে ইংরেজি টা খানিক জানত। বয়স আমারই মতো। ষাটের বেশ খানিকটা উপরেই। দেখাতো বেশি। বেচারার মাথায় বলতে কি চুল একটাও আর অবশিষ্ট ছিল না। তবে প্রাণশক্তি প্রচুর। বরং আমার থেকে অনেক বেশি। শীতের দেশের খেটে খাওয়া মানুষ। বন্ধুত্ব হওয়ার কারণটা স্বাভাবিক। ওর গাড়িটা ঐ কটা দিন নিত্য ভাড়ায় নিতাম। টুকটাক গল্প হ’তে হ’তে দেখলাম ইন্ড্রেক বেশ গপ্পে আর আমুদে। ওর কল্যাণে তালিন কেন আশেপাশের জায়গাগুলোও বেশ চেনা হয়ে গেল। ওর বাড়ির পরিবারের কথা শুনতাম। বৌ আর দুই ছেলে। ছেলেরা তখন ক’রে কম্মে খাচ্ছে। ইন্ড্রেক বৌকে নিয়ে একটা ছোট অ্যাপার্টমেন্টে ভাড়া থাকে। চ’লে যায়। তবে স্বপ্ন অনেক। একটা নিজের ছোট বাড়ি আর নিজের গাড়ি। ভাড়ায় খেটে পড়তায় পোষায় না। কথাটা তো সত্যিই। কিন্তু আমার ওর স্বপ্ন যে খুব শীগগির পূরণ হবে মনে হতো না। কারণটা সোজা। দুনিয়ার যেকোন প্রান্তেই মধ্য ষাটের কোন ট্যাক্সি ড্রাইভারের পক্ষে এটা খুব সহজ মনে হয় নি। যাই হোক, চলে আসার দিন ও যখন আমাকে তালিন হারবারে ফেরি ধরার জন্যে নিয়ে এলো, একটু আবেগতাড়িত হ’য়ে পড়লাম। বিদেশবিভূঁইয়ে ওই আমার একমাত্র সহায় ছিল। গুডবাই বলার আগে আলতো জড়িয়ে ধরলাম আর তো কোনদিন দেখা হবে না। শেষে একটা চেপে রাখা প্রশ্ন করেই ফেললাম। জিজ্ঞেস করলাম, তুমি তো সোভিয়েত জমানা দেখেছ, তখন কেমন ছিলে? উত্তর দিল, খারাপ না। আমি বললাম, সোভিয়েত জমানা মানুষ বদলালো কেন? এবারের জবাবটা বেশ ইন্টারেস্টিং। To become rich! আমি একটু ঘাবড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, তা তুমি তো রিচ হওনি এখনও। এক গাল হেসে জবাব দিল, হয়ে যাব।
ওর বিশ্বাসে কোন খামতি দেখিনি। যেমন, আমাদের এই উপমহাদেশেও চির গরীব ভক্তবৃন্দকেও দেখি না।
মানুষের বিশ্বাস বড়ই আজব বস্তু।
পেশায় মার্ক্সিস্ট
বহুদিন আগের কথা। আটের দশকের মাঝামাঝি। দিল্লি থেকে ট্রেণে ফিরছি। গরমকাল। স্লিপার ক্লাস। তাও আবার একটি স্পেশাল ট্রেন। কিউবিকলের ছ’টি সীটের একটি আমার কপালে জুটেছে। পাশের সহযাত্রীও আমার বয়েসি একজন বাঙালি যুবা। হঠাৎ দেখি হৈহৈ করে একদল তরুণী, সঙ্গে একজন চল্লিশ ছুঁইছুঁই মহিলা উঠলেন। সকলেই বাঙালি। ভদ্রমহিলা সরাসরি আমাদের দুজনকে বললেন বার্থ দুটো ছেড়ে দিয়ে সাইড বার্থে যেতে। অনূরোধ। তবে সেটা যে খুব অস্বাভাবিক তা নয়। কারণ একদল তরুণীর যাত্রাধ্যক্ষা হিসেবে এটা সঙ্গত অনুরোধ ই বটে। আমরা দুজন বেচারা স্থানান্তর মেনে সরে গেলাম। দুজনেই ভীত। কারণ সামনের ছাব্বিশ ঘণ্টায় আরো কতো বিচিত্র অনুরোধ বা নির্দেশ পালতে হবে জানি না। অবশ্য এরপর তাঁর আন্তরিক ব্যবহারে যথেষ্টই ভালো লেগেছিল। উনি দিল্লি থাকেন। বাঙালি। তবে বিয়ে করেছেন এক দক্ষিণ ভারতীয়কে। মেয়েরা দমদমের। কোন প্রোগ্ৰামে এসেছিল ওঁর তত্বাবধানে ফিরছে। গাড়ি ছাড়ার আগে দেখেছিলাম একজন দক্ষিণী ভদ্রলোক ওঁকে সীঅফ করতে এসেছেন। দুজনের কথাবার্তা হচ্ছিল ইংরেজিতে। বূঝলাম ওঁর স্বামীই হবেন। গল্প যখন বেশ জমে উঠেছে এবং বেশ আলাপচারিতা চলছে দলের সকলের সঙ্গেই, আমি খুব স্বাভাবিকভাবেই জানতে চাইলাম ওঁর স্বামী ভদ্রলোক কী কপ্রেন, মানে পেশাটা। ওঁর উত্তর টা বেশ চমকে দেওয়ার মতো। বললেন উনি মার্ক্সিস্ট। মানে? ওঁর ত্বরিৎ জবাব, হ্যাঁ ওটাই ওঁর পেশা। সব গুলিয়ে গেল। কারণ তার আগে বা পরে মার্ক্সিস্ট পেশার কথাটা শুনিনি কখনো। অন্তত এদেশে। তখন কেন্দ্রে ইন্দিরা গান্ধী ও কলকাতায় জ্যোতি বসু দাপিয়ে সরকার চালাচ্ছেন। কলকাতার ছেলে। মার্ক্সবাদী শব্দ টা বিলকুল জানা ছিল। তবে ওটা নেশার জিনিস জানতাম; ঠিক পেশার নয়। আজ শুনলে খুব চমকাতাম না। তবে বলে ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বছর আগে খুব স্বাভাবিক লাগে নি। পাশের ছেলেটিরও তথইবচ অবস্থা। আজকের ভারতেও ব্যাপারটা খুব লাভজনক পেশা বলে মনে হয় না। আর ইন্দিরা গান্ধির দিল্লিতে বসে!
কথা আর বাড়ালাম না। ঐ ভদ্র মহোদয়ের পেশাটা সম্পর্কে আজো আমি রহস্য উন্মোচন করতে পারিনি।
না, এরপর সুধা বিশ্বনাথের সঙ্গে (স্বাভাবিক কারণেই নামটি পরিবর্তিত) আর কখনও মোলাকাত হয় নি।
যাপন-নামা (পর্ব ১)
মণিপদ্ম দত্ত
মণিপদ্ম দত্ত




আমাদের নিত্য নৈমিত্তিক জীবনে এমনই কিছু আজব ব্যাপার ঘটে যায় যার কোনো ব্যাখ্যা মেলে না, কিন্তু তাৎক্ষণিক আনন্দ মেলে।ঘটনাপ্রবাহে আমরা গা ভাসিয়ে দিয়ে ওই যাপনের ছন্দ বজায় রাখতে চেষ্টা করি।
উত্তরমুছুনদারুণ লাগলো দুটো গল্প পড়ে।
উত্তরমুছুন