গরু এক ধরনের চতুষ্কোণ প্রাণী যারা চোখের পাতায় মহাজাগতিক রশ্মি লুকিয়ে রাখে। গরুর মাথায় টুকরো টুকরো অনেক কোষ আছে যা দিয়ে এরা পৃথিবীর তাবৎ বিষয়ে জাবর কাটে। হন্ডুরাস থেকে একবার বাবা একটা গরু এনেছিলেন যে তার পূর্বপুরুষের কাজকে হুবহু বাস্তবে রূপ দিয়েছিল এবং ভেঙে ফেলেছিল বছরে-৩০-য়েক ধরে তৈরি করা একটা প্লাইউডের রঙিন খোলস যাকে লোকে কথায় কথায় গণতন্ত্র বলে। আর সেই থেকে গরু বিষয়ে আমরা ক্রমশ অভিজ্ঞ হয়ে উঠলাম, বাবা আমাদের বুঝিয়ে দিলেন গরুর পা সম্বন্ধে আমরা যতটা নিশ্চিন্ত হয়ে থাকি তা ঠিক নয় কেননা গরুর ২টি ৩টি ৪টি বা ৫টি পা-ও থাকতে পারে- তার কিচ্ছুটি ঠিক নেই। গরুরা অবশ্যই জরুরি অবস্থা জারি করতে পারে অথবা ইচ্ছে করলে যখন তখন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানোর সামর্থ রাখে। লুকিয়ে লুকিয়ে এরা খবরের কাগজ বা সংবিধানের দুমড়ানো পাতা চিবোতে ভালোবাসে। মাটির নিচে সেঁধিয়ে যাওয়া শেকড় বাকড়, সিনট্যাক্স- অক্ষর-ব্যবস্থা- নিজেদের লেজ, কাঁটাগাছ, অব্যবহৃত কার্তুজ- এই সব, সবকিছুই, এদের খাদ্য এবং এসব খেয়ে এরা খুব আনন্দ পায়। কিন্তু একথা মনে করলে চলবে না যে গরুদের কোন সৌন্দর্যজ্ঞান নেই বা গরুরা স্বশ্রেণীর স্বার্থ বোঝেনা। গরুরা ফাগুন লেগেছে বনে বনে গাইতে খুব ভালোবাসে। যখন দেশে ওষুধের কারখানা দরকার তখন সেখানে বেশি বেশি কসমেটিকস তৈরির জন্য মন্ত্রীদের গরুরাই উদ্বুদ্ধ করে, মানুষকে অভুক্ত রেখে মারণাস্ত্র বানাবার পরামর্শ গরুরাই দিয়ে থাকে। গরুর লেজ দেখে তার উপকারিতা সম্বন্ধে তেমন কিছুই মনে হয় না কিন্তু সেটি পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের কাজে লাগে বলে অনেকের বিশ্বাস। গরুরা সাধারণত নিরীহ নিরীহ ভাব দেখালেও অভ্যাসে তারা মোক্ষম রক্তপায়ী হয়ে উঠতে পারে। সুযোগ সুবিধে পেলে আর্কিমিডিসের মত নিঃঝঞ্ঝাটকেও হত্যা করে। গরু পরমত আদৌ সহ্য করেনা। কিছু কিছু লোক নিচু গলায় এক বিশেষ ধরনের গরুর কথা বলে। এইসব গরুরা তাদের মাথার শিঙকে ব্যবহার করে এ্যানটেনার মত এবং সব-রকম-চিন্তাশীলতার প্রতি এরা পোষণ করে বৈরী খুন ক ভাব। এরা বলে 'যা আমি বলছি তাই ঠিক এবং তাই তোমাকে করতে হবে।' গরুর জগতে প্রশ্নকরা সবসময়ই বারণ। সারা পৃথিবী জুড়ে গরুদের মধ্যে রেভোলিউসন চলেছে। চলেছে ক্রমঃঅভ্যুত্থান। তাদের পোষাক আষাক চিন্তা ভাবনা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এসব ব্যাপারে যারা তাল রেখে চলতে পারেনা তারা বাতিল হয়ে যায়। ব্যাকডেটেড। গরুর পেটে শুধু নাড়িভুঁড়ি থাকেনা, থাকে সব রকমের খচড়ামি বুদ্ধি, মানুষকে মানুষ করে রাখার সব রকম বদ মতলব। নিজেদের মধ্যে খেয়োখেয়ি করতে না পারলে গরুদের ইতিহর্ষ লাভ হয় না। গরুদের মধ্যে অনেক মর্ষকামী আছে। অধিকাংশ গরুই স্টেনগান চেনে এবং বোমা ও বাতাবিলেবুর মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারে। গরুদের সবরকমের মানসিক উৎকর্ষ একধরনের মহাজাগতিক রশ্মির ওপর নির্ভর করে। গরুরা কালিঘাটে পুজো দেয় আবার সুযোগ পেলে এ্যাডালটারিও করে। শিশুইস্কুলের ওপর বোমা ফেলে খুশি হয়। ডায়াফ্রাম ব্যবহার করতে ভালোবাসে। বাবা তাঁর জীবনে ১২নং যে গরুটি পুষেছিলেন সে বিটোভন শুনতে ভালোবাসত আর মাঝে মাজে মর্ষকাম করত। একদিন সে তার অকুস্থল দেখিয়েছিল যেখান থেকে সুরু হয়েছে সভ্যতা এবং অন্য সবকিছু। কিন্তু শেষমেষ সে যে কাজটি করল তা ভাবা যায় না। একদিন রাত্তিরে সুযোগ পেয়ে সে বাবার ওপর বলাৎকার করে এবং সেই ঘরে মাকে আসতে বাধ্য করায়। দেখতে সাধারণ হলেও গরুরা খুব অদ্ভুত জীব। এরা জলকে জলের মত এবং পিস্তলকে পিস্তলের মতই দ্যাখে কিন্তু মেয়েদের শরীরকে কখনোই মেয়েদের শরীর বলে ভাবে না। শোনা যায় কোথাও কোথাও গরুদের আত্মানুসন্ধিৎসা এত প্রগাঢ় হয় যে তারা মেইন-ক্যামফ লিখে ফ্যালে অথবা গোয়ের্নিকার ভেতরে পোকা হয়ে ঢুকে পড়ে তা কাটতে থাকে, চুরি করে নেয় তার রঙ ও রেখার বক্রতা। রাত্তির বেলায় গরুর ঘাড়ে বসে ভ্যামপায়ারের রক্ত শুষে নেওয়ার কথা সবাই জানে কিন্তু যেটা লোকে জানেনা তা হচ্ছে এই যে গরুও কখনো কখনো ভ্যামপায়ারের রক্ত শুষে নিতে নিতে তাদের শিরদাঁড়াগুলো কাগজের মত সাদা করে দ্যায়। গরু সম্বন্ধে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ আছে একথা বললে কিছুই বলা হয় না, আসলে প্রতি ২জন পণ্ডিত গরু সম্বন্ধে কখনো একমত হতে পারেনা। কিছু কিছু গরু বেশি খেয়ে ফেলার বদহজমে ভোগে, কিছু কিছু গরু চিরকাল আধপেটা খেয়ে কাটায় এবং নিজেদের মধ্যে মারামারি করে। গরুদের মধ্যে দেশ-কাল-পাত্র ভাগ আছে। ৭৭ সালের গরু কখনো ৪৭ সালের গরুর মত শুকনো খড় চিবোবে না। গরুদের চোখের তারার রঙ চট করে বোঝা যায়না কিন্তু দু-পায়ের ওপর ভর রেখে তারা মুখ বাড়িয়ে জানালা দিয়ে জ্যোৎস্না দ্যাখে। গরুরা ন্যূড গরু দেখতে খুব ভালোবাসে এবং তাকে তারা শিল্প বলে। কোন কোন জাতের গরুদের মধ্যে অন্তর্বাস পরারও চল আছে। আপ-টু-ডেট গরুরা যৌনতা নিয়ে ভাবে, ভাবে বিপ্লব নিয়েও, বারান্দায় ক্যাকটাস সাজিয়ে রাখা তাদের কারো-কারোর একটা নিত্য-নৈমিত্তিক অভ্যাস। গরুরা যখন ঘাস খায় তখন তাদের ওপর প্রায়ই টাটা-বিলডিঙের ছায়া পড়ে। গরুরা একটা বিষয়ে খুব সজাগ। তাদের মধ্যে কেউ বই পড়লে বা অন্যরকম ভাবনাচিন্তা করলে তাদের বিপজ্জনক বলে ঘোষণা করা হয়। আর খুব বেয়াড়া রকমের হলে ফায়ারিং-স্কোয়াডের সামনে দাঁড় করায়। এ বিষয়ে গরুদের সভ্যতার কোন তুলনা হয়না। তবে একথা ঠিক যে গরুদের মুক্তির উপায় একদিন গরুরা নিজেরাই ঠিক করবে।
[১৯৭৭]
সুবিমল মিশ্রের অ্যান্টি-গল্পের বই দু-তিনটে উদোম বাচ্চা ছুটোছুটি করছে লেবেল-ক্রসিং বরাবর থেকে পুনঃপ্রকাশ করা হলো। –সম্পাদক
গরু এক ধরনের চতুষ্কোণ প্রাণী
সুবিমল মিশ্র
সুবিমল মিশ্র




মন্তব্য