সেই সন্ধ্যার কথা মনে পড়লে এখনো শরীর শিউরে ওঠে। সন্ধ্যা কী! রীতিমতো রাতই তো বলা যায়। গ্রামের সব শিশু এবং সদ্য কিশোর-কিশোরীরা যখন মোল্লা বাড়ির উঠানে ফুল টোক্কা খেলছিল ঠিক তখনই মিজান মোল্লার ঘরের পেছনে পুকুর পাড়ে ঘটেছিল সেই ঘটনা। জাবেদ দাঁড়িয়ে ছিল সাকিবের গা ঘেঁষে আর সাকিব ছিল মিমির ওপরে শুয়ে। সাকিব মিমিকে এলোপাথাড়ি চুমু খাচ্ছিলো আর মিমি সকাতরে অনুরোধ জানাচ্ছিল ‘এমনে না, এমনে না। এমন কইরেন না।’ সাকিবের একবারেও মনে হয়নি মিমি তাকে বাধা দিচ্ছে, বরং মনে হয়েছিল গ্রামের মেয়ে বলে সংকোচ কাঁটিয়ে উঠতে পারছে না। মনে মনে হয়তো সেও চায় এবং আজ অবধি কোনো মেয়েকে এভাবে কাছে না পাওয়া, চুমু না খাওয়া এবং একটু পর যা প্রায় ঘটতে যাচ্ছিল সেটি এতদিন করতে না পারা সাকিব যেন একটি গাঢ় অন্ধকার সুড়ঙ্গে দৌঁড়ে যাচ্ছিলো শেষ মাথায় আলোর খোঁজে কিংবা আকণ্ঠ জল পানে।
ধস্তাধস্তির সময়ে সাকিবের মনে হচ্ছিল ‘আহা গ্রামের এই মেয়েটার এত সংকোচ কেন। কেনইবা তাকে এভাবে বাধা দিচ্ছে। এইতো আরেকটু।’ কিন্তু সমস্যা হয়ে গেল সাকিব যখন আনাড়ি হাতে মেয়েটার পায়জামার দড়ি খুলতে যাবে উল্টো সে দ্বিগুণ গিট্টু পাকিয়ে ফেললো। যে সরল অঙ্ক শেষে এসে মিলে যাবার কথা ছিল সেটি শেষে এসে আর মিলছে না দেখে এবার ক্যালকুলেটর রেখে হাতের কড়া গুণে অঙ্ক মিলাতে হচ্ছে সাকিবকে। এতে করে চুমু খাওয়া থামিয়ে সাকিব পায়জামার দড়ি ধীরে ধীরে খোলার সর্বাত্মক চেষ্টা নিচ্ছিলো এবং বুঝতে পারছিল পায়জামার দড়ির মতো এমন কুয়াশাচ্ছন্ন রাতে তার আঙুলও গিট্টু পাকিয়ে যাচ্ছে। দুই হাত দূরে দাড়ানো জাবেদ ওদিকে ক্ষীণকণ্ঠে, অনুনয়ের স্বরে বলে যাচ্ছে, ‘এইবার ছাইড়্যা দে। মানষে চইলা আসবে। ছাইড়্যা দে কাকা।’
এতক্ষণ জাবেদের কথা কানে না আসলেও এবার সাকিব স্পষ্টত জাবেদের অনুনয় শুনতে পাচ্ছিলো এবং সাকিবের মনে হচ্ছিলো মিমির ওপর থেকে সে উঠে গেলে জাবেদ এসে আরোহণ করবে এবং সেজন্যই এত অনুনয়। কিন্তু ঘটনা এমনটা হওয়ার ছিলো না। পাশের কোনো ঝোপে জাবেদের মিমিরই খালাতো বোন আসমাকে নিয়ে আসার কথা ছিল। শেষ মুহূর্তে আসমা না আসায় এবং উঠানের দক্ষিণ পাশের যে সরু রাস্তা ধরে বাগান এবং এরপর পুকুর এবং সামনে আগালে পুকুর পাড় সেই সরু রাস্তার মুখে দাঁড়িয়ে ছিল আসমা। ফুল টোক্কা খেলা দেখছিল এবং বাগান পেড়িয়ে পুকুর ঘাটে আদিম খেলার যে প্রস্তুতি চলছিল সেটি আন্দাজ করছিল সে। মিমি সাকিবের আনাড়ি আঙুলের চেষ্টা দেখে এটুকু হয়তো আস্বস্ত হলো, শহুরে ছেলে সাকিব মোটা সুতির দঁড়িতে গিট্টু পাকিয়ে যাওয়া এই পায়জামার দড়ি খুলতে পারবে না এবং সাকিব তাকে সত্যি প্রমাণ করলো ঠিকই কিন্তু দড়ি না খুলে টেনে পায়জামা নামানোর চেষ্টায় লিপ্ত হলো। এদিকে জাবেদ আবারও অনুনয় করলো, ‘কাকা ছাইড়্যা দে এখন।’ নিজেকে সংবরণ করতে না পেরে এবং ব্যর্থতার অপমান এবং আফসোসে একাকার হয়ে সাকিব চাপাস্বরে খেঁকিয়ে উঠলো, ‘কুত্তারবাচ্চা চুপ থাক। পাঁচ মিনিট টাইম দে। দূরে গিয়া দাঁড়া।’ জাবেদ চুপ করে গিয়েছিল মুহূর্তের জন্য। শহরের ক্লাস এইটে পড়া একটি ছেলে, যে কিনা জাবেদের থেকে বয়সে ছয় থেকে আট বছরের ছোট সে কোত্থেকে এই সাহস পায় সেটি জাবেদের মাথায় চিলিক মারে আর তখনি, প্রায় তখনি পুকুরের উত্তর পাশের জঙ্গলে একদল মানুষের উপস্থিতি টের পায় সাকিব, জাবেদ এবং মিমি।
পৌষের রাত, কুয়াশা ভেদ করে বেশ কয়েকটি কালো মূর্তির আবির্ভাব। যদি পুকুর না থাকতো তাহলে তাদের সঙ্গে এই তিনজনের দূরুত্ব হতো হাত দশেক। পুকুর হওয়ায় পাড় ঘুরে আসতে হয়তো মিনিট দুইয়েক সময় নিবে, হয়তো এরচেয়েও কম এবং আর কিছু ভাবতে না পেরে সাকিবের মনে হয় এরা আর কেউ নয় হয়তো ফুল টোক্কা খেলতে থাকা তার সমবয়সীদের কেউই তার সম্ভ্রান্ত বাবাকে জানিয়েছেন তারা জঙ্গলের দিকে গেছে এবং তাকে খুঁজতেই হয়তো তার বাবা লোক নিয়ে বেরিয়েছেন। এক ঝটকায় দাঁড়িয়ে সরু রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা আসমাকে ডিঙিয়ে উঠানের দিকে দৌড় দেয় সাকিব এবং উঠানে না দাঁড়িয়ে সোজা নিজেদের ঘরে প্রবেশ করে সে। শীতের রাতেও ঘামতে থাকে এবং তার মনে হয় বাগানে এখনো জাবেদ ও মিমি আছে এবং যদি তার বাবা মোসলেম মোল্লার হাতে ধরা পরে তাহলে বড় সম্ভাবনা সাকিবও যে তাদের সঙ্গে ছিল সেটি ধরা পড়ে যাবে।
পুরো ঘটনাটি এগিয়েছে পরিকল্পনামাফিক। শেষমেশ এসে কেন সবকিছু ভণ্ডুল হয়ে গেল সাকিব সেটা বুঝতে পারে না। গ্রামের ছেলে জাবেদের মা মারা যাওয়ার পর থেকেই সাকিবদের ঘরে থাকে। সাকিবের দাদিকে সে বড় আম্মা বলে ডাকে। সাকিবের বাবাকে ডাকে দাদো বলে। যদিও সম্পর্কে সাকিবের চাচা হয় কিন্তু ঘরের আশ্রিত একটি ছেলে যে কিনা সাকিবের হিসাবে প্রায় তার সমবয়সী, তাকে চাচা, কাকা এসব ডাকার মতো বিনয়ী সে না। এবার গ্রামে এসে সাকিব জাবেদকে দেখায় ক্লাস এইটে ওঠার পরে তার বাবা মোসলেম মোল্লা তাকে স্মার্টফোন কিনে দিয়েছে এবং এই মোবাইলটা আসলে একটা মাদকীয় জাদুর বাক্স। মোবাইলে কি আছে না আছে, ছবি কেমন আসে, ভিডিও কত নিখুঁত হয় তার চেয়েও বড় ব্যাপার এই ফোনে লাগানো চার গিগাবাইট মেমোরি কার্ড নীলছবি দিয়ে পরিপূর্ণ। এমন জীবন্ত মাদক জাবেদ আগে কখনো দেখেনি এবং এর আগে চটি বই এবং বাংলা ছবির নায়িকাদের দিগম্বর দুই একটা ফেইক ছবির ভিউকার্ড দেখলেও নীলছবি দেখে জাবেদের জ্ঞান হারবার দশা হয় এবং সাকিবকে অবাক করে দিয়ে জাবেদ জানায় যেসব দৃশ্য ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে তা বাস্তবে সম্ভব কিনা সে বিষয়ে যাচাই করার একটা সুযোগ আছে। সাকিব যেন আকাশ থেকে পরে। হাতের ফোনের এসব দৃশ্য বাস্তবে ঘটানো গেলে এবং আদৌ এসব হয় কিনা তা যাচাই করা গেলে এরচেয়ে বড় প্রাপ্তি কৈশরে আর কী হতে পারে। জাবেদ জানায় এই বাড়িরই পূর্ব পাশের হাশেম মোল্লার নাতনি মিমির সঙ্গে তার ভাব এবং ভরপুর যৌবনবতী প্রায় আঠারো বছর বয়সী মিমিকে যদি পটানো যায় তাহলে আর কিছু ভাবতে হবে না। সাকিবকে কেউ ফ্রিতে দশ গিগাবাইট নীলছবি দিলেও সে এতটা খুশি হতো না যেটা জাবেদের কথা এবং সম্ভাব্য পরিকল্পনা থেকে পাওয়া গেল।
‘কিন্তু আমি মিমিরে একলা খামু। তুই ব্যবস্থা কর’। সংশয়ে পরে যায় জাবেদ; এতদিন ধীরে ধীরে যে মেয়েকে বাগিয়ে আনতে চেষ্টা চালাচ্ছে জাবেদ, সেই মেয়েকেই কিনা একা পেতে চায় শহর থেকে দুই দিনের জন্য ঘুরতে আসা (যদিও ঘরের মালিকের পুত্র) সাকিব। জাবেদ তো একা চায়নি। সে তো সাকিবকে ভাগই দিতে চেয়েছিল। কিছুক্ষণ বাদে জাবেদই সমাধান বের করে; মিমির খালাতো বোন আসমা এসেছে কয়দিনের জন্য বেড়াতে। একটু চেষ্টা করলে মিমিকে দিয়েই হয়তো আসমাকে বাগে আনানো যাবে। ‘আসমারে খাবি তুই? মাইয়া কচি’ জাবেদ প্রস্তাব দেয়। ‘কচি ফচি লাগবে না। ঐ মাইয়ার দুধ ছোট। মিমিরেই দেখ। তুই এক কাম কর। তুই আসমারে খা’ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান হয় এবং প্রতিপ্রস্তাব আসে সাকিবের পক্ষ থেকে। জাবেদ বুঝতে পারে না সে আসমার সঙ্গে কীভাবে কিছু করবে এবং মিমিকেও বা কী বলবে। ‘তুই মিমিরে ক সব। আমি ওরে টাকা দিমু। এক হাজার টাকা দিমু’; সাকিবের এই বুদ্ধি যে কোনো কাজে আসবে না এবং হাশেমের নাতনিকে এক হাজার টাকার প্রস্তাব দিয়ে যে বাগানো যাবে না সেটি আগে থেকেই আন্দাজ করতে পারে জাবেদ। ‘তুই এডি লইয়া ভাবিস না। আজকে সন্ধ্যায় পোলাপান যখন ফুল টোক্কা খেলবে উডানে ঐ সময়ে ওগো দুইডারে বাগানের পিছে পুস্কনির ধারে নিয়া আমু। দুপুরেই একটা ভাও দিয়া থুমু হেনে’। টাকা লাগবে না, পয়সা লাগবে না। এমনিতেই মিমি তার শরীর সমর্পণ করবে, কিছুতেই বিশ্বাস হতে চায় না সাকিবের। গ্রামের এই সদ্য যৌবনবতী কিংবা হয়তো কিছুটা অভিজ্ঞতাও আছে, মিমির মতো এমন মেয়েদের মনস্তাত্ত্বিক বিষয় মাথায় না ঢুকলেও জাবেদের ওপর ভরসা আছে সাকিবের।
জাবেদ যে সবকিছু তাল গোল পাকিয়ে ফেলেছিল সেটির প্রমাণ মেলে সন্ধ্যায় ফুল টোক্কা খেলার মিনিট বিশেক পর। সাকিব মনের অনিচ্ছায় তার চাচাতো ভাই অনিক, যেকিনা ক্লাস সিক্সে পড়ে এবং আরেক চাচাতো ভাই অন্তর, যে কিনা ক্লাস থ্রিতে পড়ে তাদের সঙ্গে নিয়ে গ্রামের আরও ডজন খানেক শিশু, কিশোর-কিশোরীদের সঙ্গে ফুল টোক্কা খেলা শুরু করে। খেলাটি এমন: দুটি দল থাকবে। দুই দলে সমান সমান মানুষ। একদলের মধ্যে টস হবে; কোনো পয়সা না, শিম পাতা দিয়ে টস হবে। ‘আছাউল্যা’ আর ‘মিশ’ পাতার এই দুই অংশের কোনো একটির নাম ডাকা হবে। যে টসে জিতবে সে ঠিক করবে অপর দলের কে ফুল টোক্কার প্রথম টোক্কা খাবে। নিজ দলের একজন যে টোক্কা খাবে তার চোখ ধরে রাখবে দুই হাত চেপে এবং একই দলের আরেক সদস্য এসে বিপরীত দলের সদস্য যার চোখ চেপে রাখা হয়েছে তার কপালে টোকা দিয়ে চলে যাবে নিজ জায়গায়। এরপর চোখ ছেড়ে দেয়ার পর বলতে হবে কে টোকা দিয়েছে। বলতে পারলে টোকা খাওয়া খেলোয়াড় লম্বা একটি লাফ দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী দলের দিকে এগিয়ে যাবে না পারলে নিজ জায়গায়ই থাকবে। যে দলের মানুষ আগে লাফিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরে ঢুকতে পারবে তারা বিজয়ী বলে বিবেচিত হবে। অন্যান্য দিন এই খেলায় সাকিব যথেষ্ট উত্তেজনা বোধ করলেও শীতের এই রাতে সে কিছুতেই খেলায় মন দিতে পারছিল না এবং অপেক্ষা ছিল শিশুসুলভ নয় বরং পুরুষসুলভ একটি খেলার। বারবার মিমির দিকে চোখ যাচ্ছিলো এবং মিমিও বারবার তার দিকেই তাকাচ্ছিল। খেলার এক পর্যায়ে সাকিব আবিষ্কার করে মিমি ও আসমা কোনো একটি ফালতু কারণ দেখিয়ে খেলা বাদ দিয়ে নিজেদের ঘরে ফিরে গেছে। দুইজন একই দলের হওয়ায় লোকসংখ্যা সমান করতে এবং খেলতে ভালো লাগছে না এই অজুহাতে জাবেদ ও সাকিব খেলা থেকে উঠে নিজেদের ঘরের সামনে বাধানো শানের ওপরে বসে। কিছুক্ষণ পর খেলায় আবার প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসলে সঙ্গোপনে জাবেদ উঠে যায় এবং কয়েক মিনিট পরে এসে জানায়, এখনই সময়।
উঠানের দক্ষিণ পাশের সরু রাস্তা দিয়ে সামান্য হাঁটতেই যেখানে উঠানের ঠিক পেছনে দশ বা বারো ঘরের আলোকচ্ছটার কিয়দংশ পড়ে কিন্তু আলোতে থেকে বোঝার উপায় নেই স্বল্প আলোতে কি ঘটছে সেখানে মেহগনি কাছের সঙ্গে হেলান দিয়ে মিমি এবং মিমির সামনে আসমাকে দাঁড়ানো দেখে সাকিব। ওদের পাশেই ছিল জাবেদ। সাকিবকে উদ্দেশ্য করে জাবেদ বলে, ‘ওগো কি বলবি বল’। সাকিবের তো কিছু বলার ছিল না বরং করার ছিল। তাই বলার প্রস্তাবে থতমত খেয়ে যায় সাকিব এবং জাবেদ তাকে পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ করতে নিজেই বলে, ‘তুই যে ওগো পছন্দ করো ঐডা না কবি’। জাবেদের কথায় মিমি লজ্জা পায় এবং সে কিছুটা হেঁটে পুকুরঘাটের দিকে এগিয়ে যায়। জাবেদ মিমির পেছনে পেছনে যায় এবং সাকিব বুঝতে পারে না কি করা উচিত। এই দুইজনের দিকে তাকিয়ে থেকে আসমা পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল প্রায় ভুলে বসে সাকিব এবং অন্ধকারে মেহগনি গাছে হাত রাখতে গিয়ে আসমার স্তনে হাত রেখে বসে মোসলেম মোল্লার আদরের পুত্র। যদিও ব্যাপারটি একেবারেই অসাবধানতাবশত কিন্তু আসমার শিমুল তুলোর মতো স্তনে হাত রেখে সাকিব কেঁপে ওঠে এবং অপ্রত্যাশিত এই স্পর্শে আসমাও রীতিমতো চমকে ওঠে। আসমা সোজা হাঁটা দিয়ে উঠানের কাছে এসে সরু রাস্তার মুখে দাঁড়ায় কিন্তু উঠানে আর বের হয় না এবং ঘটনার আকস্মিকতার রেশ উপলব্ধি করার আগেই সাকিবের মনে হয় সময় নষ্ট করার জন্য প্রচুর সময় তার হাতে নেই এবং যেকোনো সময়ে ফুল টোক্কা খেলা শেষ হয়ে যেতে পারে আর তখনই অনিক-অন্তর তার খোঁজে নেমে পড়বে। আসমার দিকে একবার তাকিয়ে জাবেদ আর মিমির দিকে আগায় সাকিব। জাবেদ ও মিমি ইতোমধ্যে পুকুর পাড়ে মোটা এক রেইনট্রি গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল এবং সাকিব যেতে যেতে যেটুকো শুনতে পারে তার সারমর্ম দাঁড়ায় জাবেদ মিমিকে পছন্দ করলেও সাকিবও মিমিকে পছন্দ করে এবং ভালোবাসে এটাই গুরুত্বপূর্ণ। মিমি সাকিবকে দেখে ইতস্তত বোধ করে এবং জাবেদ বলে ‘কও না ক্যান কিছু। তুই যে ওরে পছন্দ করছ ক’। ‘হ্যাঁ মিমি তোমারে আমার ভালো লাগে। আই লাভ ইয়্যু’ এই কথা বলে মিমির প্রতি উত্তরের প্রত্যাশা করে না সাকিব সোজা ঠোঁটে চুমু খাওয়া শুরু করে মিমির। ঠোঁট ছাড়িয়ে সাকিবকে আলতো ধাক্কা দিয়ে শ্বাস টেনে মিমি বলে ওঠে ‘এইসব না। এইসব না। থামো। এমনে না।’ এবং সাকিবের মনে হয় মিমি যারপরনাই লজ্জা পাচ্ছে। মিমির বুকে হাত রেখে চাপ মারতেই সাকিবের মনে হয় এই বুক বড় কিন্তু শক্ত, আসমার বুকের মতো তুলতুলে না। রেইনট্রি গাছের সঙ্গে ঠেকিয়ে সাকিব মিমির বুক চাপতে চাপতে চুমু খেতে থাকে এবং মিমি তাকে নিবৃত্তের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যায়। এক পর্যায়ে মিমিকে এক রকমের ল্যাং মেরেই পুকুর পাড়ে গাছের শেকড়ের উপরে শুইয়ে ফেলে সাকিব এবং এক পর্যায়ে দেখা দেয় পায়জামার দঁড়ি নিয়ে জটিলতা। হয়তো সাকিব দঁড়ি সমস্যার সমাধান করে ফেলতে পারতো কিংবা আর কিছু না হোক পায়জামা ছিড়ে ফেলতে পারতো, অথবা টেনে সুবিধাজনক জায়গায় নামাতে পারতো, কিন্তু একদল মানুষ এসে পুরো প্রক্রিয়াকে ঘোলাটে করে ফেলে।
শীতের রাতে যেখানে ভাতের মারের মতো কুয়াশায় আবছায়া চারপাশ, বাইরে থাকলে চুলে জমে বিন্দু বিন্দু শিশির; এমন রাতেও ঘামতে থাকে সাকিব। ঘরে ঢুকে অনিক অন্তরের সঙ্গে খোশগল্পের অভিনয় করলেও সাকিবের বুকের মধ্যে হাতুড়িপেটা চলতে থাকে। যতক্ষণ না জাবেদ ফিরে আসছে ততক্ষণ নিজেকে কীভাবে সামাল দিবে এবং বাগানের সেই দলটির মধ্যমণি যদি স্বয়ং পিতা মোসলেম মোল্লা হয় তখন জাবেদ ও মিমিকে জঙ্গলে দেখে কি বলবে সেটা ভেবে আরেক প্রস্থ ঘামে সাকিব। এদিকে মিনিট দুইয়েকের মধ্যে উঠানে হট্টগোল শোনা যায় এবং দৌঁড়ে বের হয়ে দেখে জাবেদ উঠানে দাঁড়িয়ে ‘ডাকাইত পড়ছে, ডাকাইত পড়ছে’ বলে চিৎকার করছে। তখন রাত নয়টাও বাজেনি এবং এমন টাটকা রাতে, যেখানে বাড়ির মুরুব্বিরা মাত্র এশার নামাজ পরে ফিরেছে, তখন ডাকাত কেন আসবে ভেবে পায়না সাকিব যদিও জাবেদের ডাক শুনে মোসলেম মোল্লা ও তার ভাই হক মোল্লা শাবল নিয়ে কোথা থেকে উঠানে হাজির হয় এবং বাকিদের নির্দেশ দেয় দ্রুত সবদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়তে, প্রতি ঘরে নীরিক্ষা চালাতে আদৌ ডাকাত পড়েছে কিনা। ‘আমি নিজ চউক্ষে দেখছি। দশ বারোজন। এগো আমি চিনি না। এই গেরামের না। আমাগো পুষ্কনির পার দিয়া উইডা বুবুজানগো পাউছদুয়ার দিয়া এদিকে গেছে’; জাবেদের কথায় সম্বিত ফিরে পায় সাকিব এবং সে বুঝতে পারে যাদের দেখতে পেয়েছিল তারা আসলে ডাকাত ছিল বা অন্য কিছু। সাকিব এটা ভেবে শঙ্কিত হয়, এই মানুষগুলো যদি এসে দেখতো সাকিব এবং মিমি দিগম্বর হয়ে আদিম ক্রীড়ায় মেতেছে তাহলে ঘটনা যা হতো তা কল্পনাতীত। মিমির কথা মনে হতেই সাকিবের মনে পড়ে পুকুর পাড়ের ঘটনা। মিমিকে এক রকমের নাস্তানাবুদ অবস্থায় রেখে পালিয়ে এসেছে সে। মেয়েটির কি অবস্থা? তাকে কি ডাকাতরা নিয়ে গেছে নাকি? শঙ্কা জাগে। জাবেদকে একটু আলাদা নিয়ে জিজ্ঞেস করতেই জাবেদ জানায় তাৎক্ষণিক সে মিমিকে উত্তর পাশের ঘরের রান্নাঘরের পেছনে দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে এবং মিমি পালাতে না পালাতে একদল মানুষ এসে জাবেদের কলার চেপে ধরে বলেছে ‘গোলামের পুত বোনেবাদারে মাগী চোদো’। জাবেদ হ্যাচকা টানে নিজেকে ছাড়িয়ে উঠানে এসে দাঁড়ায় এবং ডাকাত ডাকাত বলে চিৎকার ছোড়ে।
যদিও বাড়ির উঠানের সবকটি ঘর, রান্নাঘর এবং জঙ্গলের একাংশ তন্নতন্ন করে খুঁজেও কিছু পাওয়া যায় না এবং পাশের পাড়ার খোকনের মা এসে জানায় তাদের রান্নাঘরের পেছন দিয়ে চার পাঁচজনের একটি দল হেঁটে গেছে। “কেডা? কেডা যায়? কোন বাড়ি যাইবেন?” খোকনের মায়ের লাগাতার প্রশ্নের তোয়াক্কা না করে তারা হেঁটে গেছে নাইয়ারভূঁইয়ের খালের দিকে এবং কিছুক্ষণ পর খোকনের মা ট্রলার ছাড়ার শব্দ শুনেছে। রাতের বেলা দূরবর্তী কোনো খালেও ট্রলারের শব্দ মানে ডাকাত আসার অশনী সংকেত। বিশেষ করে এসব শীতের রাতে মিশমিশে অন্ধকারে কিংবা পূর্ণ জ্যোৎস্নায় অন্য গ্রাম থেকে বা অন্য জেলা থেকে নদীপথ হয়ে খালে ট্রলার নিয়ে প্রবেশ করে ডাকাতরা। এই সময়ে শীতের ছুটিতে শহরে থাকা ছেলে, ছেলে বউ, নাতি-নাতনীরা ফেরে গ্রামে থাকা বাবা-মা, দাদি-নানীর কাছে। ছেলেদের পকেটে থাকে টাকা, ছেলে বউদের শরীরের গহনা আর ডাকাতদের জন্য এরচেয়ে মোক্ষম সময় আর কি হতে পারে। কিন্তু বেশিরভাগ সময় এইসব ডাকাতি হয় রাত বারোটার পর। দশটার মধ্যে সবাই যার যার বিছানায়, আর বারোটার মধ্যে বাড়ির পেছনের দরজায় ওত পেতে থাকে ডাকাত দলের সদস্যরা। রাতে কেউ না কেউ হয়তো প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারতে বের হোন এবং সঙ্গে করে ফেরেন একদল ডাকাত যারা ঘুমন্ত মানুষদের ডেকে তুলে কানের নিচে থাপ্পড় মেরে গলায় রামদা ধরে বলে “চিল্লাইলেই কল্লা কাইট্টা ফালামু গোলামের পুত”। প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারতে বের না হলে বাড়তি ঝামেলা নিতে হয় ডাকাতদের। খুঁজে বের করতে হয় এমন একটা ‘ভেড়া’ যাকে টোপ হিসাবে ব্যবহার করে বাঘ শিকার করা যাবে। রাতের বেলা খেঁজুর গাছ কাটার গাছুনিরা কিংবা গভীর রাতে জুয়া খেলে হাট থেকে ফেরা কোনো যুবককে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় পরিচিত কোনো বাড়িতে। যুবক কিংবা কিশোর যাই হোক বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে গৃহকর্তাকে কাতর স্বরে ডেকে জানায় বিপদে পড়েছে। হয় তার বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছে বা বোনের জামাই মারা গেছে। ঘুম থেকে উঠে কিছু না ভেবে দরজা খুলে গৃহকর্তা দেখে সেই যুবক কিংবা কিশোর অনেকগুলো বোনজামাই নিয়ে হাজির। কিন্তু রাত নয়টার আগে কেন পাঁচজন কিংবা ছয়জন লোক পদব্রজে গ্রামে পায়চারি করবে যারা কিনা এই গ্রামের না সেটিই হয়ে ওঠে সকলের আলোচনার মুখ্য বিষয় এবং মোসলেম মোল্লা জাবেদকে জিজ্ঞাসা করে, “ডাহাইত কয়ডা আছেলে অ্যা?” “দাদো পাঁচ-ছয়ডা তো হইবেই। মনে তো অয় দশ-বারোডাও হইতে পারে”, জবাব দেয় জাবেদ। “অস্ত্র আনে নাই কোন? দেহো নাই কিছু?” আবারও প্রশ্ন করেন মোসলেম মোল্লা এবং জাবেদ জানায় নিশ্চয়ই চাদরের নিচে অস্ত্র ছিল। হক মোল্লা সব শুনে মন্তব্য করেন, যারা এসেছিল তারা ডাকাতির উদ্দেশ্যে না ঘর যাচাই করতে এসেছিল। পরে সুযোগ বুঝে ব্যবস্থা করতো।
“তুই এত রাইতে বাগানে গ্যাছিলি ক্যা?” মোসলেম মোল্লার এমন প্রশ্নে হকচকিয়ে যায় জাবেদ। সামনের দাঁড়ানো সাকিবের পিলে চমকে উঠে। প্রশ্নের উত্তরের অপেক্ষা না করে উঠানে দাঁড়িয়ে মোসলেম মোল্লা ঘোষণা দেয়, “বেবাক মানুষ রাইতে হুঁশ কইরা ঘুমাইবা। কেউ আইসা ডাক পারলে ঠাস কইরা দরজা খুইলা দিবা না। পাউছদুয়ার, হাইতনা, খাডের তল লাইট মাইরা দেইখা ঘুমাবা। কেউ চাপ্টি মাইরা ঘরে পলাইয়া আছে কিনা দেইখা লবা।” রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সবাই ঘরে ফিরে যায় এবং বিছানায় চাচাতো ভাই অনিক অন্তরের সঙ্গে শুয়ে সাকিবের শুধু মনে হয় “কেন যে ডাকাত আসলো। কেনইবা সে এত উতালা হয়ে গিট্টু পাকিয়ে ফেললো। নাহ মাথা ঠাণ্ডা রাখা উচিত ছিল।” রাতে কোলবালিশের কভারের দড়ি গিট্টু দিয়ে এবং গিট্টু খুলে কিছুক্ষণ মনের অজান্তেই চর্চা চালায় সাকিব এবং বুঝতে পারে গিট্টু নিজে না বাধলে অন্যের বাধা গিট্টু খোলা তার পক্ষে সম্ভব না। প্রায় সারারাত সজাগ থাকে সাকিব এবং পরদিন সকালে পুকুর ঘাটে বরশি দিয়ে মাছ ধরতে ধরতে জাবেদের থেকে সাকিব জানতে পারে, মিমি তার ওপর খুবই অসন্তুষ্ট হয়েছে। “মিমির দুধ বড় কিন্তু শক্ত,” অভিযোগ করে সাকিব এবং জাবেদ তাকে বলে কুমারি মেয়েদের স্তন কিছুটা শক্তই থাকে এবং সাকিব জানায় মিমির দুধ ইটের মতো শক্ত। “কি টেপছো কেডা জানে” বিরক্তি প্রকাশ করে জাবেদ এবং সাকিব জানায় “আসমার দুধ নরম”। সেদিন দুপুরেই একদিনের জন্য পাশের গ্রাম জোয়াদ্দার বাড়ি, নিজের মা-খালাদের বাড়িতে ঘুরতে যায় সাকিব এবং ফিরে এসে শুনতে পারে মিমি ও আসমা দুজনই অন্যত্র বেড়াতে গিয়েছে। এর দুইদিনের মধ্যেই শহরে ফিরে আসে সাকিব এবং পুরো ঘটনাটি তার মনে থাকলেও মিমির প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে সে।
মাস ছয়েক পর জৈষ্ঠ্যমাসে গ্রামের ফল-ফলাদি নিয়ে শহরের বাসায় আসে জাবেদ এবং রাতে ঘুমানোর আগে আড্ডা মারতে মারতে সাকিবকে জাবের জানায়, মিমির সঙ্গে সে যা করার সব করেছে এবং তার স্তন মোটেও ইটের মতো শক্ত না। সাকিবকে এমন সর্বশক্তি দিয়ে বাধা দেয়া এবং পরে জাবেদের সঙ্গে এক বিছানায়; পুরো ব্যাপারটিতে বিবমিষা বোধ করে সাকিব কিংবা বিতৃষ্ণায় জানায়, এ ব্যাপারে তার আর কোনো আগ্রহ নেই। চাইলে জাবেদ সেই মেয়ের সঙ্গে যা ইচ্ছা করতে পারে এবং চাইলে বিয়েও করতে পারে।
যদিও জাবেদ জানায় মিমিকে সে বিয়ে করবে না এবং বছরখানেক পর জাবেদ চাঁদপুরে পালিয়ে গিয়ে এক ট্রাক চালকের মেয়েকে বিয়ে করে এবং শ্বশুরের সঙ্গে ট্রাকের হেলপার হিসেবে কাজ শুরু করে বলে জেনেছিল সাকিব এবং তারও কিছুদিন পর নিজের মায়ের মুখেই জানতে পারে মিমি মেয়েটি মাদরাসার এক ছেলের সঙ্গে, যেখানে মিমিও পড়তো, তার শিক্ষা জীবনের পাঠ চুকিয়ে পালিয়ে গেছে। সেই ছেলেটি বয়সে মিমির চেয়ে ছোট এবং সাকিবের আবারও মনে হয় বয়সে ছোট ছেলে বিয়ে করলেও বয়সে ছোট বলেই কি সাকিবকে সেদিন রাতে প্রত্যাখ্যান করেছিল মিমি নাকি অন্য কারণ ছিল, নাকি এটিই ছিল স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। বছরখানেক পর পুরো ব্যাপারটি সাকিবের কাছে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে এবং ভার্সিটিতে ওঠার পর এক পর্যায়ে সেই রাতের ঘটনা সাকিবের যতবার মনে পড়েছে তার মন অজানা শঙ্কায় ভরে গেছে। সাকিবের মনে হয়েছে, সেই রাতে যদি জোর করে মেয়েটির সঙ্গে কিছু করতে সক্ষম হতো সাকিব তাহলে হয়তো আজকে নিজেকে সভ্য সমাজের মানুষ হিসাবে পরিচয় দিতে পারতো না সে। কালের পরিক্রমায় পুরো ঘটনার স্মৃতির ওপরে কয়েক প্রস্থ ধুলো জমে এবং সাকিব চাকরিতে যোগদানের কয়েকমাসের মাথায় মোসলেম মোল্লা ধুমধাম করে এক ব্যবসায়ীর মেয়ের সঙ্গে ছেলের বিয়ে দেন।
বিয়ের প্রায় বছরখানেক পর বউ নিয়ে প্রথমবারের মতো গ্রামে যায় সাকিব। শহরের মেয়ে গ্রামে যাই দেখছে অবাক হচ্ছে। পুকুরে মাছে ঘাই দিলেও কি মাছ হতে পারে সেই প্রশ্নে জর্জরিত সাকিব এবং ছেলের বউয়ের আহ্লাদ এবং গ্রামে এসে কয়েকগুণ বাড়তি আদিখ্যেতা দেখে মনে মনে খুশিই হোন মোসলেম মোল্লা। গ্রামে এতদিন পুকুরে গোসল করলেও, গ্রামের ছেলেদের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাঁতার কাটলেও, বউ নিয়ে গ্রামে আসার পর সাকিব সদ্য নির্মিত ঘরের মধ্যে এটাচ বাথরুমে গোসল সারে এবং ভেজা কাপড় নিয়ে ছাদে উঠতেই কাপড় শুকানোর জন্য দড়ির প্রয়োজন পরে এবং নিচ থেকে দড়ি নিয়ে এসে সাকিবের আহ্লাদী বউ সাকিবকে ছাদের কয়েকপাশে লাগানো থাম এবং থামের ওপরে বের হয়ে থাকা রডের সঙ্গে দঁড়ি বাধার দায়িত্ব দেয়। শুরুতে সাকিব গুছিয়ে আনলেও, একটি দঁড়ি কারসাজি করে নানাভাবে টেনে সাজালেও শেষমেশ দড়ি গিট্টু দিতে গিয়ে বিপাকে পড়ে সে। তারচেয়েও বড় বিপদে পড়ে ভুল গিট্টু দিয়ে সেই গিট্টু আবার খোলা নিয়ে। প্রখর রোদে সাকিবের এমন বৃথা চেষ্টা এবং যারপরনাই বিরক্ত দেখে পেছন থেকে খিলখিল করে হেসে ওঠে একটি ছেলে। ছেলেটির দিকে তাকায় সাকিব এবং বয়স ঠাহর করে বুঝতে পারে ছেলেটির বয়স তিন বা সাড়ে তিনের বেশি হবে না। সাকিবের আহ্লাদী বউ ছেলেটিকে নিয়ে আহ্লাদ শুরু করে এবং জানতে চায় এটা কার ছেলে। “আমি এই প্রথম দেখলাম। কয়েক বছর গ্রামে আসিনি তো। বলতে পারবো না কার” উত্তর দিয়ে কাজে মন দেয় সাকিব এবং তার স্ত্রী জানায়, ছেলেটি হয়তো খেলতে খেলতে এদিকে চলে এসেছে এবং সে নিচে গিয়ে যার ছেলে তাকে ফিরিয়ে দিয়ে আবার আসছে জানিয়ে বিদায় নেয় সে।
ছেলেটির কথা প্রায় ভুলে বসে সাকিব এবং সন্ধ্যাবেলা বাড়ির শানে বসে মোসলেম মোল্লা ও চাচা হক মোল্লার সঙ্গে জমিজমার আলাপ দিতে দিতে দেখে সাকিবের মা এবং স্ত্রী অন্য ঘর থেকে হেঁটে ফিরছে এবং সাকিবের স্ত্রীর কোলে সেই ছেলে। “কার পোলা এডা?” হক মোল্লা জিজ্ঞাসা করে সাকিবের মাকে এবং সাকিবের মা জানায় এটা হাশেম মোল্লার পুতি। হাশেম মোল্লার তিন মেয়ের আবার কয় মেয়ে এবং তাদের আবার কয়জন ছেলে মেয়ে আছে এই নিয়ে ঠাট্টা করে হক মোল্লা এবং সবাই একমত হয় হাশেম মোল্লা সৌভাগ্যবান, সুস্থ শরীরে নাতি-পুতি সব দেখে গেছেন। রাতে ছেলেটিকে ফিরিয়ে দিতে নিজের স্ত্রীর সঙ্গে হাশেম মোল্লার ঘরে যায় সাকিব এবং সেখানে মিমিকে দেখে চমকে ওঠে যদিও সাকিবের চেহারায় তার প্রতিক্রিয়া একবিন্দু প্রকাশ পায় না। হাশেম মোল্লাকে পায়ে হাত দিয়ে কদমবুসি করে এবং তার স্ত্রী লতিফুনকেও কদমবুসি করে সাকিব। “কয় বছর পর আইছো গেরামে। আগে প্রত্যেক ঈদে আইতা। কোরবানিতে আইতা। তোমরা আইছো শুইনা আমি যে একটু তোমাগো ঘরে যামু, কিন্তু আডুর ব্যাতায় ঠিকমতো হাটতেই তো পারি না এহন। তোমার মায় আইছে, ফুলের মতো টসটসা বউডা আইছে, তুমি আইলা। তোমার বাপে তো এহনো আইলো না,” লতিফুনের অনুযোগ, অভিযোগ, আফসোস, বাতের ব্যাথা, দীর্ঘদিনের চোরা কোনো রোগের যন্ত্রণা এসবের আলাপ শুনতে শুনতে সাকিব খেয়াল করে মিমি এবং অন্য মেয়েদের সঙ্গে লুডু খেলতে বসে গেছে তার স্ত্রী। এদিকে সেই ছেলেটি এসে লতিফুনকে জড়িয়ে ধরে এবং লতিফুনের শাড়ির আচলের একাংশ নিজের মুখে পুরে চাবাতে থাকে। লতিফুন ছেলেটিকে দেখিয়ে জানায়, এটি মিমির ছেলে এবং এক সপ্তাহ হয়েছে মিমিরা এখানে বেড়াতে এসেছেন।একই রুমের আরাম কেদারায় বসা হাশেম মোল্লা মশকরা করে সাকিবকে বলেন, “তুমি মিমির পোলার কি হয় জানো?” “মামা হই?” প্রশ্ন করে সাকিব। “নারে ব্যাডা। তোমার দাদা হয় আমার চাচা। আমার বাপের চাচাতো ভাই। সেই হিসাবে তোমার বাপ-চাচারা হয় আমাগো ভাই। আমি হই তোমার চাচা। সেই হিসাবে মিমির মায় আনোয়ারা হয় তোমার বুইন। মিমি হয় ভাগনি আর মিমির পোলা হয় তোমার নাতি,” সম্পর্কের জটিল জাল শুনে হেসে ফেলে সাকিবের স্ত্রী। হেসে ফেলে মিমি নিজেও কিন্তু মুখ তুলে সাকিবের দিকে তাকায় না সে, পূর্ণ মনোযোগ থাকে লুডু খেলার প্রতি।
পিচ্চি ছেলেটিকে টেনে কোলের কাছে এনে হাশেম মোল্লা বলেন, “আঙ্কেল-আন্টি কি ডাকো তুই। বাসায় আইসা কয় ঐ ঘরে নতুন এক আঙ্কেল-আন্টি আইছে। আমি তো মিলাইয়া পাই না কারা আইছে।” লতিফুনও যোগ দেয় সম্পর্কের ঘোরপ্যাঁচের আলাপে এবং পিচ্চিকে বলে, “এইডা তোর নানা হয়। আর ঐ যে সুন্দর আন্টি আন্টি কছ ঐডা তোর নানী হয়।” “ইয়া আল্লা! আমি এত জলদি নানী হইতে পারবো না”, সাকিবের স্ত্রীর এমন আহ্লাদি অনুযোগে আরেক পশলা হাসি বয়ে যায় লুডো খেলতে থাকা মেয়েদের মধ্যে। মিমির বড় বোন সুমনা, যে কিনা সবার সঙ্গে লুডু খেলছে, যে কিনা সাকিবের চেয়ে বয়সে কম করে হলেও দশ বছরের বড় সে বলে উঠে, “মামা, আপনে দাঁড়াইয়া আছেন কেন? বয়েন। রাইতে ভাত খাইয়া তারপর যাইবেন।”
উত্তর দেয়ার আগে পিচ্চি ছেলেটি মায়ের কোলের কাছে এসে বসে এবং ওদের আলাপে শরীক হতে চায়। মেয়েদের নানা আলাপের মধ্যে হঠাৎ করে পিচ্চি ছেলেটি বলে ওঠে, “আম্মো জানো, সাকিব নানা না গিট্টু খুলতে পারে না”। এই প্রথমবারের মতো মিমি সাকিবের দিকে তাকায়, চোখাচোখি হয় এবং সাকিব চোখ সরিয়ে লুডুর গুটির দিকে তাকিয়ে দেখে একটি সঠিক চালে সাকিবের স্ত্রীর লাল গুটি মই বেয়ে বহুদূর উঠে যেতে পারে অথবা একটি ভুল চালে সাপের পেট বেয়ে নিচের ঘরে নেমে শুরু থেকে খেলা শুরু হতে পারে।
![গিট্টু [ছোটোগল্প] • মহির মারুফ গিট্টু [ছোটোগল্প] • মহির মারুফ](https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEj2pp0IdbR8Nl9N_5i6UYb9qYVzdXcZpg04mYBkEddYvqiRfs0q0qH-t_BJMDT_5UMyZQq8VxZK_IC7QMBkSWhdGQWYnXBB1na6PTZ4bOyY5LxIifhRVJdAnCNZN4CAkmeVns6HowIw3rCECxukLjGQIq4seOs9B4O0bIC9QZFyqp_R0aCNmXRlZqL7hGE/s1600-rw/%E0%A6%97%E0%A6%BF%E0%A6%9F%E0%A7%8D%E0%A6%9F%E0%A7%81%20%5B%E0%A6%9B%E0%A7%8B%E0%A6%9F%E0%A7%8B%E0%A6%97%E0%A6%B2%E0%A7%8D%E0%A6%AA%5D%20%E2%80%A2%20%E0%A6%AE%E0%A6%B9%E0%A6%BF%E0%A6%B0%20%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%81%E0%A6%AB%20%E2%80%A2%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%81%20%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%9F%E0%A6%B2%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%97.png)



মন্তব্য