চার্লস বুকাওস্কি (১৯২০–১৯৯৪) ছিলেন আমেরিকান সাহিত্যের ব্যতিক্রমধর্মী ‘আউটসাইডার’ হিসেবে পরিচিত কবি ও ঔপন্যাসিক। বাস্তবতা, হতাশা, মদ্যপান ও জীবনের নিষ্ঠুর সত্যগুলো নিঃসংকোচে লেখার কারণে তিনি বিখ্যাত। বুকাওস্কি তথাকথিত সাহিত্যিক মার্কা আদিখ্যেতা করার লোক নন। কোন সভারই সদস্য ছিলেন না। পোস্ট অফিসে কাজ করেছেন, পথে পথে ঘুরেছেন, দেদারসে মদ গিলে একের পর এক নারীসঙ্গ উপভোগ করেছেন, রেসের মাঠে দিনের পর দিন জুয়ার নেশায় মেতে থেকেছেন। কিন্তু তারপর সব হল্লা শেষে লিখতে বসেছেন টাইপরাইটারে। কাগজের মুখোমুখি, মহাকালের মুখোমুখি, হোটেল কিংবা মেসবাড়ির ঘরে। একা। বিস্তর লিখেছেন।
বুকাওস্কির কাছে সাহিত্য ছিল আত্মরক্ষার অস্ত্র। তিনি লিখতেন কারণ না লিখে উপায় ছিল না তার। লিখতেন নিজেকে টিকিয়ে রাখার জন্য। নিজের ক্লান্তি, ক্ষুধা আর জীবন-যন্ত্রণাকে তাড়ানোর জন্য। কিন্তু নিজে লেখার পাশাপাশি চার্লস বুকাওস্কি ছিলেন এক নিবিষ্ট পাঠকও। পড়েছেন প্রচুর। বুকাওস্কিকে পড়তে পড়তে পাঠক আর অনুবাদক হিসেবে মনে কৌতূহল জাগে তার পাঠাভ্যাস নিয়ে। নানান লেখায় এসেছে তার পড়ার কথা, প্রিয় লেখকদের কথা। বহু লেখককে উড়িয়েও দিয়েছেন এক তুড়িতে।
পড়তে ভালোবাসতেন বুকো। বলতেন, “জীবন ছিল নরক। বইগুলো ছিল জানালার মতো।” নিজের পাঠাভ্যাস নিয়ে বলেছেন, “সবসময় পড়ি। বেশিরভাগ মৃত লেখকদের লেখা পড়ি। অধিকাংশ সময় যারা সোজাসাপ্টা কথা বলেছেন। দাড়িকমা কিংবা ঈশ্বরের ধার ধারেনি।” আরো বলেছেন, “আমি বরং সেই মানুষটার লেখা পড়তে চাই, যে সেমিনারে বক্তৃতা না ঝেড়ে ট্রেঞ্চে লড়েছে।”
প্রিয় লেখকেরা ছিল তার বন্ধুর মত। জন ফান্টের ভক্ত ছিলেন। "আস্ক দ্য ডাস্ট" পড়ে তার মনে হয়েছিল ফান্টে সত্যিই জানতেন ক্ষুধা কী কিংবা হোটেল রুমের নিঃসঙ্গ জীবন কেমন। ফান্টে এতোটাই মুগ্ধ করেছিল তাকে যে তার হেনরি চিনাস্কি চরিত্রটি ফান্টের আর্তুরো ব্যান্ডিনি চরিত্রের মত নিজের অলটার ইগো হিসেবেই সৃষ্টি করেছিলেন। হেনরি চিনাস্কি ছিল তার নিজেরই চাছাছোলা খোলামেলা সংস্করণ। "আস্ক দ্য ডাস্ট”-এর পরবর্তী কোন সংস্করণের ভূমিকা লিখতে গিয়েও মুগ্ধ হয়ে বুকাওস্কি বলেছেন, “ফান্টে আমার ঈশ্বর।”
বুকাওস্কির সবচেয়ে প্রিয় বইগুলোর একটি ছিল লুই ফার্দিনান্দ সেলিনের “জার্নি টু দ্য এন্ড অফ দ্য নাইট”। জীবনের সব কুৎসিত দিক, রোগ, ক্ষুধা, যুদ্ধ, অন্ধকার এগুলোই ছিল যার উপজীব্য। ফরাসি এই লেখকের লেখনি বুকাওস্কির ভাষাশৈলী ও দৃষ্টিভঙ্গির উপর ফেলেছে গভীর প্রভাব। তার মতে আর সবাই যা কেবল কোনমতে ভাবনায় আনার সাহস পেয়েছে তা লিখে দেখানোর সাহস ছিল কেবল সেলিনের।
রুশ সাহিত্যের মহান লেখক ফিওদর দস্তইয়েভস্কি বুকাওস্কিকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছেন। দস্তইয়েভস্কি তাঁর চরিত্রদের নিঃসঙ্গতা, অপরাধবোধ ও অস্তিত্ববাদ দিয়ে বুকাওস্কির চিন্তাকে অনুপ্রাণিত করেছেন। রাশিয়ান ভদ্রলোক তাই বুকাওস্কির একেবারেই মনের মতো। নিজের লেখার জার্মান অনুবাদক কার্ল ওয়েইজনারকে লেখা চিঠিতে বুকাওস্কি বলেছে, "দস্তইয়েভস্কি উন্মাদ, মাতাল আর উদ্ভ্রান্ত মানুষের কথা লিখেছেন। রাতের আঁধারকে তিনি আসলেই উপলব্ধি করেছেন। ”
নিজের লেখা "দস্তইয়েভস্কি" কবিতায় তিনি ভেবে দেখতে চেয়েছেন ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড থেকে দস্তইয়েভস্কি খালাস না পেলে কী হ'তো। স্বভাবজাত ভঙ্গিতে বলেছেন লক্ষকোটি মানুষ দস্তইয়েভস্কি পড়েনি তাতে কীই বা হয়েছে। কিন্তু তারপরেই স্মরণ করেছেন কীভাবে এই রুশ লেখকের লেখনী তাকে জীবনের সকল অন্ধকার সময়কে পেরিয়ে আসতে ভরসা দিয়েছে। তাই দস্তইয়েভস্কি ফিরে এসেছেন বারবার বুকো’র লেখায়। যেমনঃ 'দ্য লাস্ট নাইট অফ দ্য আর্থ পোয়েমস' বইয়ের 'অপরাধ ও শাস্তি' কবিতায় দেখি-
অপরাধ ও শাস্তিরেসের মাঠে একটা বাজে দিনের পরবিথোফেন শোনাতারপর একটা স্টেক খেয়েকিছু সৃষ্টির চেষ্টায় ফেরাঅনেকটা যেন প্রেয়সীর কাছেফিরে যাওয়ার চেষ্টা, ঝগড়াঝাটির পরআমি সৃষ্টিকে ছেড়ে যাইনি,শুধু কিছু সময় দূরে ছিলাম।কিন্তু সে কি আমাকে ফিরিয়ে নেবে?দস্তইয়েভস্কি রুলেতের চাকায়নরকের দেখা পেতেন।কিন্তু তাও তো জুয়াড়ি লিখে ফেললেন,সেইসাথে লিখলেন হয়তআরও কয়েকটা উপন্যাস।কিন্তু আমি কখনোই বলব নাজুয়া বা কষ্ট ভোগ করাশিল্প তৈরি পথ হতে পারে।শিল্প সৃষ্টির কোনও নির্দিষ্ট পদ্ধতি নেই।আজকে ঘোড়দৌড়ে না গেলেই ভালো হ'তএরকম জীবনের আরও অনেক কিছু না করলেই ভালো হ'ত।কিন্তু এসব তো পুরোটাইফিরে চাওয়ার ফালতু বকবকানি, তাই না?সবসময় সামনে আরেকটা পাহাড় থাকে উঠবার জন্যতারপর আরেকটা পতন।আবার পা শক্ত করে দাঁড়াই চলো,চলো এগিয়ে যাই!দস্তইয়েভস্কি আসলেই ছিল দারুণ জেদি এক হারামজাদা।
বলা যায় বুকো সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছিলেন ফান্টে, সেলিন আর দস্তইয়েভস্কির দ্বারা।
হেমিংওয়েকে ভালোবাসতেন তিনি। সংক্ষিপ্ত, মাপা ভাষা ও সংযত বর্ণনার জন্য বুকাওস্কি হেমিংওয়েকে সম্মান করতেন। একটি সাক্ষাতকারে দেখা যায় তিনি বলছেন, “হেমিংওয়ে লিখেছে ষাঁড়ের লড়াই, যুদ্ধ কিংবা মাছ ধরা নিয়ে। আমি লিখেছি বেশ্যা, শূঁড়িখানা আর পাগলামি নিয়ে। কিন্তু আমার মনে হয় আমরা দু'জন দু'জনকে ঠিক বুঝে নিয়েছি। ”
দ্য রুমিংহাউস ম্যাড্রিগ্যালস সংকলনের ‘স্বপ্নের দহন’ (দ্য বার্নিং অফ দ্য ড্রিম ) কবিতায় এসেছে অনেকগুলো নাম। তরুণ বয়সে বুকোর আশ্রয় ছিল লস এঞ্জেলেস পাবলিক লাইব্রেরি। লাইব্রেরিটি যখন আগুনে পুড়ে যায় বুকো এই কবিতাটি লিখেছিলেন। এতে উঠে এসেছে অনেকের কথা। সেইসাথে কিছু পাঠপ্রতিক্রিয়ার ইশারা। এসেছে অলডাস হাক্সলি, ডি. এইচ. লরেন্স, ই. ই. কামিংস, কনরাড আইকেন, ফিওদর দস্তয়েভস্কি, ডস পাসোস, তুর্গেনেভ, গোর্কি, ফ্রেডরিখ নিটশে, শোপেনহাওয়ার, স্টেইনবেক, হেমিংওয়ে প্রমুখের নাম। জানা যায় তিনি পড়েছেন প্রাচীন চীনা কবিদের কবিতাও। তু ফু এবং লি পো এই দু’জন কবির নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করে বলেছেন প্রাচীন এই কবিরা এক লাইনে যা বলতে পারতেন অন্যরা তা তিরিশ কিংবা একশো লাইনেও পারতো না। এজরা পাউণ্ড সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন, “এজরা পাউন্ড আমার হাতকে পরিণত করে তুলেছিল, মনকে না হ’লেও।” উন্নাসিক কণ্ঠে বলেছেন, শেক্সপীয়ার, জিবি শ, টলস্টয়, রবার্ট ফ্রস্ট, এফ. স্কট ফিটজেরাল্ড কেউই তাকে আলোড়িত করেনি। একইভাবে উড়িয়ে দিয়েছে গোগোল আর ড্রেইজারকে।
বিট জেনারেশনের লেখক যেমন কেরুয়াক কিংবা গিন্সবার্গকে পড়েছেন বুকো। তাকে যে অনেকসময় বিটের কবিদের (কেরুয়াক, গিন্সবার্গ, বারোজ) কাতারে ফেলা হ’ত সেটা পছন্দ ছিল না তার। সমকালীন এই কবিদের সমালোচনা করতেন বিস্তর। মূলত তাদের রোমান্টিসিজম কিংবা আধ্যাত্মিকতা পছন্দ ছিল না তার। যেমন সাধারণভাবে বিটের কবিদের নিয়ে তার মতামত ছিল, “এরা আলোকিত হওয়া নিয়ে বকবক করে, আবার টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদেও জায়গা চায়।” এলেন গিন্সবার্গকে নিয়ে একবার বলেছিলেন, “ব্যাটা একই কবিতা কুড়ি বছর ধরে বেচে খেয়েছে। ” তবে কেরুয়াকের প্রতি কিছু দয়া ছিল মনে হয় বুকোর। বলেছেন, “কেরুয়াকের মাঝে কিছু ছিল… যতদিন না সে কেরুয়াকের মত লেখার চেষ্টা শুরু করল।”
কোন একটি কবিতায় তিনি কল্পনা করেছিলেন তার বাড়িতে এসে বারান্দায় বসে আড্ডা দিচ্ছেন হেমিংওয়ে, ফকনার, টি এস এলিয়ট, এজরা পাউন্ড, হ্যামসুন, ওয়ালি স্টিভেন্স, ই ই কামিংস এবং অন্য আরো ক'জন। ফকনার সেখানে মাতাল, হেমিংওয়ে পেশী ফোলাচ্ছেন। আড্ডা হুল্লোড় আর মদ্যপান চলছে। এদিকে বাড়ির ভিতরে তার বাবা তাকে বকছেন ঐসব লোকদের মত হ'তে চাওয়ার কারণে। হেমিংওয়ে হঠাত যখন আড্ডার মাঝে নিজেকে গুলি করে বসলেন, বুকোর বাবা তখন তাকে বলছেন, দেখেছো এদের পরিণতি কেমন হয়? কবিতাটির নাম “দেম এন্ড আস”। সেটির একটি নড়বড়ে অনুবাদ পড়তে চাইলে অনেকটা এমন:
ওরা আর আমরাওরা সবাই তখন সামনের বারান্দায়আলাপে মশগুল।হেমিংওয়ে, ফকনার, টি এস এলিয়ট,এজরা পাউন্ড, হ্যামসুন, ওয়ালি স্টিভেন্স,ই ই কামিংস এবং অন্য আরো ক'জন।"শোন," আমার মা বলল " ওদেরকে একটুচুপচাপ থাকতে বলতে পারিস না?""না।" আমি বললাম।"সবক'টা ফালতু আলাপ করছে।" আমার বাবাবলল, "ওদের আসলে কাজকর্ম দরকার।""ওদের কাজ আছে," আমি বললাম।"কতই না কাজ!" আমার বাবা বলল।"অবশ্যই," আমি বললামঠিক তখনি ফকনার এলোটলতে টলতে ।আলমারি থেকে হুইস্কির বোতলটাখুঁজে পেতে সেটা নিয়ে বেরিয়ে গেলো।"ভয়ানক লোক তো ,"আমার মা বলল।তারপর উঠে গিয়ে উঁকি দিলবারান্দায়।"একটা মেয়েলোক আছে ওদের সাথে,"বলল মা, "শুধু দেখতে ব্যাটাছেলের মত।""ওটা গার্ট্রুড," আমি বললাম।"আরেক ব্যাটাকে দেখছি শরীরেরপেশী ফোলাচ্ছে," সে বলল, "বলছে নাকিযে কোন তিনজনকে একসাথে চাবকাতে পারে সে।""ওটা আর্নি," আমি বললাম।"আর ও কিনা " বাবা আমার দিকে আঙ্গুল তুলে বলল,"এদের মত হতে চায়!""সত্যি নাকি?" আমার মা প্রশ্ন করল।"ওদের মত নয়," আমি বললাম, "ওদেরইএকজন।""তারচে একটা বালের চাকরি জুটিয়ে নাও।" আমার বাবা বলল।"চুপ কর, " আমি বললাম।"কী?""বলেছি 'চুপ কর,' আমি লোকগুলোরকথা শুনছি।"আমার বাবা তার স্ত্রীর দিকে তাকালোঃ"ও আমার ছেলেহতেই পারে না।""আমিও সে আশা করি না।"ফকনার আবারো টলতে টলতে ঘরেঢুকল।"টেলিফোন কোথায়?" জিজ্ঞেস করল সে।"কিসের জন্য হে?" আমার বাবার জিজ্ঞাসা।"আর্নি গুলি করে নিজের ঘিলু উড়িয়েদিয়েছে," সে বলে।"দেখেছো এসব লোকের পরিণতিকেমন?" আমার বাবা চিৎকার করে বলল।আমি উঠে দাঁড়াইধীরেসুস্থেআর বিলকে সাহায্য করিটেলিফোন খুঁজে পেতে।
বলা বাহুল্য, ঐ আড্ডা তো আসলে ছিল তার নিজের ভিতরে প্রিয় লেখকদের জাগিয়ে তোলা কোলাহল। প্রতিনিয়ত তাকে যে কোলাহল অনুপ্রাণিত করেছে জীবনকে লেখায় তুলে আনতে।
বুকাওস্কি কী পড়তেন?
আহসানুল করিম
আহসানুল করিম




মন্তব্য