হেনরি চার্লস বুকাওস্কি স্বকীয়তায় সময়কে অতিক্রম করে যাওয়া কবি। যার কলমে উঠে এসেছে নিস্তব্ধ নগরীর নিঃসঙ্গতার বোবা চিৎকার, পিষ্ট হওয়া পথের ধুলো, বঞ্চিত জীবনের সঞ্চিত ক্লান্তি, বিয়ারের গ্লাসে বেদনার ক্রন্দন, যান্ত্রিক জীবনে যৌনতার প্রশান্তি। সাহিত্যকে সাজিয়ে-গুজিয়ে সং সাজায়নি কবি, বরং বদলে ফেলেছেন সাহিত্যের অতিরঞ্জিত খোলস। গোপনীয়তার গোড়ামী ভেঙে সত্যের স্বাদ দিয়ে মার্কিন সাহিত্যে এক নতুন দিগন্ত রচনা করেছেন চার্লস বুকাওস্কি। কবির কাছে সাহিত্য কোন সৌখিনতা কিংবা সভ্যতার সুন্দর চর্চা ছিল না, বুকাওস্কির সাহিত্য ছিল জীবন দেখার এক নির্মম এবং স্পষ্ট দর্পণ। যার স্বচ্ছতা এবং দুনির্বার শক্তি কাঁপিয়ে দেয় পাঠকের দুনিয়া।
বেঁচে থাকা এবং মরে যাওয়া যখন কবির কাছে একই মুদ্রার দুই পীঠ, তখন জঞ্জালে ভরা জীবনও হয়ে ওঠে জ্বলন্ত কবিতা। প্রতিটি শব্দ হয়ে ওঠে প্রতিবাদের ভাষা এবং প্রতিটি বাক্য বেদনার মৌচাক ফুল হয়ে ফোটে। প্রশান্তির সংলাপ ছুড়ে কবি পৌঁছে যায় পরাজিত প্রেমিকের কাছে, অর্থের দোলাচলে ছেড়ে আসে অর্থহীন অফিসের চাকরি কিংবা অনির্বচনীয় বিষন্নতা। সাহসের সোনালী সূর্যে ঝলসে দেয় সমাজের উপেক্ষা।
কবি সমাজের নিপীড়িতদের চিত্রিত করেছেন নির্মম ভাষায়। জীবনের নিষ্ঠুরতার চিত্র এঁকেছেন নিয়ম ভাঙ্গার স্বচ্ছ রঙে। শৈল্পিক ছোঁয়ায় মাদকতা কিংবা যৌনতাকে জুড়ে দিয়েছেন আত্ম-আরাধ্য জীবনের সাথে। আত্মদর্শী পর্যবেক্ষণ দিয়ে বুকাওস্কি যে পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, সেখানে ছুঁয়ে দেখা যায় নিজেকে, শত-সহস্র ব্যাকুল রাত কাটিয়ে আবিষ্কার করা যায় নির্মল সকাল। শীতের রাতে জ্বালিয়ে দেয়া যায় দু'চারটে দুঃখের দেশলাই। বারুদের স্তুপে পুঁতে রাখা যায় জীর্ণ জীবনের ক্লান্তি।
জীবন লিখতে কবিকে যেতে হয়নি জীবনের বাইরে। ঘটমান জীবনই, কবির কবিতার উৎস। জীবন জোয়ারে শূন্য নাওয়ের ছেঁড়া পালও যেন কবি উড়িয়েছেন সময়ের স্বতঃস্ফূর্ত স্রোতে। সত্যকে আলিঙ্গন করেছেন সরল উপায়ে। অভ্যন্তরীণ জীবনের অসম্পূর্ণ রূপ কবিকে দিয়েছে চিরন্তন মুক্তির স্বাদ। কবিতাই জীবন, জীবনই কবিতা এ সত্য সাজিয়ে দিয়েছেন জীবনবাজ পাঠকের হৃদয়ে। বুকাওস্কি আমাদের বুঝিয়েছেন সত্যের চেয়ে সুন্দর কোন কবিতা হয় না, সাহসের গরিমা ছাড়া কোন গল্প হয় না, উর্বর চিন্তা ছাড়া উপন্যাস হয় না।
চার্লস বুকাওস্কি জন্মগ্রহণ করেন ১৬ই আগস্ট, ১৯২০ সালে জার্মানির আন্দারনাখ শহরে। শৈশবেই পরিবারের সাথে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে এবং জীবনের অনেকটা সময় কাটান ক্যালিফোর্নিয়ায়। কবির শৈশব জুড়ে কিছু ভাঙাচোরা ক্লান্ত শব্দের সংঘাত, শাসনের তীব্রতা, উপেক্ষার যন্ত্রণা কিংবা নিঃসঙ্গতার নিরব দংশন। শৈশবের বিপ্রতীপ, বিচ্ছিন্ন জীবনই কবিকে নিয়ে যায় ভিন্ন জগতে। নগরের নিঃসঙ্গতা নিচিহ্ন হয় নিয়তির নিরহংকার কালিতে। বঞ্চিত জীবনের বাস্তবতা ফুটে ওঠে তার কলমে। যা প্রকাশিত হয় ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত তার প্রথম কাব্যগ্রন্থে (Flower,Fist and Bestial wail)
দুর্দিনে কবির দূরদর্শী চিন্তা রীতিমতো বিস্ময়কর। ‘The walls are screaming and the lights hurt my eyes’. বিষাদময় জীবনের কি বিবর্ণ রূপ দেখিয়েছেন কবি। দুর্দশা, দুর্দিনে চারদেয়ালের ঘরও আগলে রাখেনা। চৌচির হয়ে ভেঙে যায় বুকের পাঁজর। চিৎকার করে ওঠে চেনা আশ্রয়স্থল। আলোর পিছে আকুলতার আহাজারি মিশে যায় অমাবস্যার আঘাতে। ধসে যাওয়া সমাজ কিংবা শোষণের তীব্র যন্ত্রণায় কবির চোখে জেগে ওঠে পোড়া চোখের পীড়া।
আত্মশুদ্ধি না হলে প্রেমের পরিণতি হয় পদ্ম পুকুরে পাথর চাষের মত। ‘The lovers have turned into wolves, howling over the bones of hope’. আত্মিক অবক্ষয়ে প্রেম হয়ে যায় শান্তিপুরের হিংস্র দানব। প্রতারণার প্রেম দেয় যৌক্তিক যন্ত্রণা। প্রেম হেরে যায় পাষন্ডের পশুত্বের কাছে। আশাহত অবসন্ন বিকেল নেমে আসে বুকের কাছে।
১৯৫০-৬০ দশকে আমেরিকায় যখন ‘Beat Generation’ এর বেশ জনপ্রিয়তা বুকাওস্কি তখন ব্যস্ত ‘রাফ ও ডার্টি ভার্সন’ নিয়ে। ‘Underground press’ এ তখন বেশ পরিচিত মুখ বুকাওস্কি। কবির এই ‘ডার্টি রিয়ালিজম’ সাহিত্য সমুদ্রে বদলে দেয় ঢেউয়ের গতি। সাধারণ মানুষের সাবলীল জীবন, ব্যথা-বেদনা, হতাশা, ক্লান্তি, কবির কলমে ফুটে উঠে স্পষ্ট ভাবে। এখানে অতিরঞ্জিত আবেগের বাড়াবাড়ি নেই কিংবা নেই বীরত্ব স্থাপনের কাড়াকাড়ি। মেইনস্ট্রিম মিডিয়াতে কখনোই মেতে থাকতে চায়নি বুকাওস্কি। মার্কিন সাহিত্য যখন ফরমাল গদ্য, মার্জিত স্টাইল নিয়ে ব্যস্ত বুকাওস্কি তখন সামনে এনেছে জমকালো জীবনের সাদামাটা রূপ, ভদ্র জীবনের ভন্ডামি, অবহেলিত মনের মুমূর্ষ মুহূর্ত। কবি পরিত্যক্ত সময়ের মানবিক মুহূর্তগুলো বাঁচিয়ে রেখেছেন। কঠিন বাস্তবতার মানবিক সৌন্দর্য তুলে ধরেছেন। বিপ্লবী বার্তার বদলে কবি পাঠকের মনে একে দিয়েছেন জীবন দর্শনের এক স্পষ্ট চিত্র। বুকাওস্কি জীবন পাল্টে দেওয়ার কোন অবিশ্বাস্য স্বপ্ন দেখায়নি, বরং স্বপ্নভঙ্গ ক্লান্ত জীবনের, সস্তা বিয়ার খাওয়ার গল্প বলেছেন বেশ সাবলীলভাবে। জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়ার কোন উপায় নেই। জীবন যেমন তেমনভাবেই জীবনকে গ্রহণ করেছেন কবি।
ফুটন্ত জলে ধোয়া জীবনের ছটফটানি ফুটে উঠেছে কবির কঠিন ভাষায়। যা কদর্য না হলেও নির্মম। মার্কিন সাহিত্যচর্চা মর্মাহত করেছে কবিকে। সভ্যতার সৌখিন চর্চায় সস্তা কালির কদরে মুছে যায় শহরতলীর দিশেহারা দিন। ‘অদ্ভুত কেমন করে মৃত্যু বেমালুম জিতে যায়, অদ্ভুত যে জীবনের মূর্খ আদরাকে কত গুরুত্ব দেয়া হয়।’
বুকাওস্কি জীবনবোধের সরলতা কিংবা নির্মমতা দিয়ে যে চিত্রকল্প এঁকেছেন তা পাঠককে দিয়েছে জীবন উপলব্ধির উপায়। ‘Reality is like a bad meal that nobody wants to pay for’. বাস্তবতার বিমর্ষ রূপ কেউ দেখতে চায় না কিন্তু বাস্তবতা উপেক্ষা করার উপায় নেই। পচা-বাসি খাবার খেতে না চাইলেও, তীব্র ক্ষুধার যন্ত্রণায় কখনো কখনো নিরুপায় হতে হয় নিয়তির কাছে। বাস্তবতা ঠিক তেমনই নির্মম এক নিয়তি।
অসম্পূর্ণ জীবন উদযাপনের উপায় দেখিয়েছেন কবি। হতাশা, নিঃসঙ্গতা নিয়ে বিপর্যয়ের মুখে পতিত হওয়া জীবন ফিরে আসে কবির আহ্বানে। ‘Find what you love and let it kill you’. এখানে ভালোবাসা হতে পারে শিল্প , সাহিত্য, সংগীত, কবিতা, প্রকৃতি, প্রেম , বিপ্লব কিংবা একজন মানুষ। এই ভালোবাসাই খুঁজে বের করতে হবে। আবিষ্কার করতে হবে আবেগের আধিক্য কোথায়, যা শত বিপর্যয়েও বাঁচিয়ে রাখে। কবি আত্মহননের আহ্বানে আত্মার মুক্তি খুঁজেনি বরং প্রকৃত ভালোবাসার মধ্যে পুরোপুরি ডুবে যেতে বলেছেন। অর্থাৎ যা ভালোবাসো তা খুঁজে বের করো এবং তাতে নিজেকে সঁপে দাও।
‘Love is a fog that burns with the first daylight of reality’. বুকাওস্কির ‘Women’ উপন্যাসের এই লাইনটিতেও ফুটে ওঠে ভালোবাসার বাস্তবিক রূপ। যেখানে প্রেম কুয়াশার মতো ঝাপসা, অস্পষ্ট কিংবা ঘোলাটে। যা ঢেকে রাখে প্রকৃতির প্রকৃত রূপ। ঠিক যেমন প্রেমের মোহাচ্ছন্ন অনুভব ঢেকে রাখে চরম বাস্তবতা। বেলা বাড়ায় যেভাবে কুয়াশা কেটে যায়, জীবনের কঠিন সত্যের কাছে এসে প্রেমেও পুড়ে যায়।
সংকটময় অবস্থাও কবির চিন্তাকে সংকীর্ণ করতে পারেনি। জীবনের উপর জোর খাটায়নি বুকাওস্কি, তা বেশ বোঝা যায় তাঁর সমাধি ফলকে ‘চেষ্টা করোনা’ বাক্যাংশটি দেখে। কবি কাজ না করে বসে থাকতে বলেনি বরং বুঝিয়েছেন কোন কাজ নিয়ে জোরাজুরি করোনা, অর্থাৎ ‘জোর করোনা’। সৃজনশীলতা এবং প্রকৃত অভিব্যক্তি স্বতঃস্ফূর্তভাবেই আসবে। কৃত্রিমতা দূরে ঠেলে আলিঙ্গন করতে হবে জীবনের চরম সত্য।
অনুধাবনের অভাবে যারা চার্লস বুকাওস্কির জীবন দর্শন কিংবা বিভিন্ন লেখা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সমালোচনা করে গেছেন তাদের জীবনও ফুটে ওঠে বুকাওস্কির গল্প, কবিতা কিংবা উপন্যাসে। মুক্তচিন্তার ময়নাতদন্ত শেষে মর্মাহত মন নিয়ে তারাও ফিরে যায় ১৯৭৮ সালে, কবির সরাসরি কবিতা পাঠের আসরে। হাজারো ভক্তের সাথে তারাও শিউরে ওঠে মর্মাস্পর্শী সেই শিরোনামে ‘চার্লস বুকাওস্কি হ্যালো, ফিরে এসে ভালো লাগছে’।
বিংশ শতাব্দীর বিট কয়েন
ফারিহা নূর
ফারিহা নূর
আরও পড়ুন: [বুকাওস্কি সংখ্যা]




মন্তব্য