বিশ শতকের উত্তরার্ধে আমেরিকান সাহিত্যে এক নতুন পরিভাষার জন্ম হয়েছিল—ডার্টি রিয়ালিজম। সাহিত্যের অলঙ্কৃত ভাষা, রোমান্টিক কল্পনা অথবা মধ্যবিত্ত জীবনের স্বপ্নময়তার প্রতিস্পর্ধী এই ধারা। মূল প্রবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন এই অপরই দেখিয়েছিল প্রান্তিক ও শ্রমজীবী মানুষের বাস্তব জীবন, যা প্রায়শই অসুন্দর, অন্ধকারময়, একঘেয়ে, হিংস্র ও যৌনতার সঙ্গে সম্পর্কিত। এ ধারার অন্যতম মুখ হলেন চার্লস বুকাওস্কি (১৯২০–১৯৯৪), যিনি তাঁর কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ ও চিঠিপত্রে পারঙ্গমতায় স্পর্শ করেছেন সমাজের প্রান্তিক চরিত্র, ব্যর্থ মানুষের ক্ষুধা–তৃষ্ণা ও নিজের মদ্যপ বোহেমিয়ান জীবনকে।
বুকাওস্কিকে প্রায়শই বলা হয় ডার্টি রিয়ালিজম ও ট্রান্সগ্রেসিভ ফিকশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক। তাঁর ভাষা নগ্ন, কাঁচা, অশ্লীল হলেও এর মধ্যেই নিহিত থাকে এক ধরনের তীব্র সত্যবোধ। তিনি যেমন বলেছেন—
An intellectual says a simple thing in a hard way. An artist says a hard thing in a simple way.
এই সরল অথচ মুখর, নির্মম ভঙ্গি -মাই তাঁকে অন্য সমসাময়িকদের থেকে একেবারে আলাদা করে দিয়েছে।
১৯২০ খ্রি. জার্মানিতে জন্ম, শৈশবে আমেরিকায় অভিবাসন, দারিদ্র্য, পারিবারিক সহিংসতা, মদ্যপান, প্রান্তিক জীবনের সংগ্রাম –সমস্ত উপাদানগুলোকেই তিনি অঙ্গীভূত করে নিতে পেরেছিলেন তাঁর সৃষ্টিতে।
আমাদের জেনে নিতে হবে—ডার্টি রিয়ালিজম কী, এর উৎস কোথায়, চার্লস বুকাওস্কি কেন এমন অভিনব এ ধারার সাহিত্যকে তাঁর রচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এলেন, এবং তাঁর কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, চিঠিপত্র ও সাক্ষাৎকারে এর প্রতিফলনই বা কেমনতর!
ডার্টি রিয়ালিজম: ইতিহাস ও প্রবক্তা
“ডার্টি রিয়ালিজম” শব্দবন্ধটি প্রথম দেখতে পাওয়া গেল ১৯৮৩ সালে, Granta নামে সাহিত্যপত্রিকায়। সম্পাদক বিল বাফোর্ড (Bill Buford) কে এর আবিষ্কর্তার মর্যাদা দেওয়া যায়। তিনি একগুচ্ছ আমেরিকান লেখককে চিহ্নিত করলেন, যাঁরা মূলত লিখতেন শ্রমজীবী বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত জীবনের অন্ধকার, একঘেয়েমি, নিষ্প্রভতা, ছোট ছোট সুখ-দুঃখ ও নগ্ন বাস্তবতার গল্প। এই লেখকরা হলেন Raymond Carver, Richard Ford, Tobias Wolff প্রমুখ।
বাফোর্ড এঁদের লেখার বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখতে পান মোটামুটি নিচে উল্লেখ করা বিষয়গুলি—
- অলঙ্কারহীন সংক্ষিপ্ত গদ্য।
- প্রাত্যহিক জীবনের ব্যর্থতা, একাকিত্ব ও স্বপ্নের ক্ষয় ও ভঙ্গুরতা।
- যৌনতা, মদ্যপান, হিংসের মতো বিবিধ অসুন্দর বাস্তবতা।
- প্রোটাগনিস্টরা স্বভাবতই প্রান্তিক, বেকার, প্রান্তবর্গীয় বা নিরাশাগ্রস্ত।
তবে এই ধারার শেকড় আরও আগে থেকে প্রস্তুত হচ্ছিল। আরও অতীতে। ১৯২০–৩০-এর দশকের “Lost Generation” সাহিত্য, বিশেষ করে আর্নেস্ট হেমিংওয়ের সংক্ষিপ্ত ও অলঙ্কারহীন গদ্য, অবশ্যই এর এক পূর্বসূত্র। কিন্তু ১৯৭০–৮০-এর দশকে সামাজিক – অর্থনৈতিক মন্দা, ভিয়েতনাম যুদ্ধ-পরবর্তী হতাশা এবং মধ্যবিত্ত জীবনের ভাঙন এই সাহিত্যের জমি প্রস্তুত করেছিল। কেননা, এসবের ফলশ্রুতিতে একাকিত্ব ও মদ, যৌনতা ও সহিংসতার বিস্তৃতিই সম্ভবত এ সাহিত্য ধারার জন্ম দিয়েছিল। বুকাওস্কির লেখায় এসব বাস্তব -তাই নগ্নভাবে উপস্থিত। তাঁর পূর্বসূরিদের মধ্যে জন ফ্যান্টে ( Ask the Dust,1939) তাঁকে ভীষণভাবে প্রভা -বিত করেছিলেন। ফ্যান্টের মতো তিনিও বোহেমিয়ান জীবনের ক্ষিধে,ব্যর্থতাবোধ ও মদ্যাসক্তিকে সাহিত্যরসে প্রতিস্থাপিত করেছিলেন।
চার্লস বুকাওস্কি: জীবন ও প্রেক্ষাপট
হেনরি চার্লস বুকাওস্কি জন্মান ১৬ আগস্ট ১৯২০তে জার্মানির আন্দেরনাখ শহরে। তাঁর বাবা, একজন আমেরিকান সেনা, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ- পরবর্তী সময়ে জার্মানিতে থাকাকালীন সময়ে বিয়ে করেছিলেন এক জার্মান মহিলাকে। ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে গোটা পরিবারটিই চলে এসেছিল আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলেসে ।
আগেই বলেছি, তাঁর শৈশব ছিল দারিদ্র্য, সহিংসতা ও অবহেলায় ভরা। বুকাওস্কির বাবা ছিলেন কঠোর ও সহিংস প্রকৃতির। প্রায় প্রতিদিনই সামান্য কারণে তিনি ছেলেকে বেত্রাঘাত করতেন। এ কারণে বুকাওস্কির ভেতরে তৈরি হতে থাকে গভীর আত্মধিক্কার ,বিরাগ ও সমাজবিবিক্ত মানসিকতা।
কৈশোরে বুকাওস্কির সারা মুখ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে তীব্র অ্যাকনে রোগ, যার ফলে তাঁর মুখাবয়ব বিকৃত হয়ে যায়। সহপাঠীদের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন হাসির পাত্র। পরে তিনি লিখেছিলেন—
I was a loser before I was even ten years old.
কিছুদিন কলেজে পড়াশোনা করলেও লেখালিখির জন্য পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয় । তবে প্রকাশকরা দীর্ঘদিন তাঁর লেখা ছাপতে অনিচ্ছুক ছিলেন। এর ফলে তিনি ভিন্নধর্মী ছোট ছোট কাজ করতে থাকেন; গুদাম, ফ্যাক্টরি, মদের দোকান আর সবচেয়ে দীর্ঘ সময় যে কাজ করেন, তা হলো পোস্ট অফিসের কাজ।
১৯৫৫ সালে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে আবার লেখালিখি শুরু করেন। এরপর ধীরে ধীরে ছোট পত্রিকায় লেখা ছাপা শুরু হয়, পরে কবিতা সংকলন ও উপন্যাস প্রকাশিত হতে থাকে।
তাঁর জীবন ছিল মদ্যপান, জুয়া, পতিতালয় ও এক বোহেমিয়ান ভঙ্গিমায় ভরা। কিন্তু এই অভিজ্ঞতাই তাঁর সাহিত্যের উপাদান হয়ে উঠেছিল। যেন বিষকেই তিনি করে তুলেছিলেন সাহিত্যের অমৃত। জীবন অভিজ্ঞতার সত্যকেই সাহিত্যের সত্য করে তুলেছিলেন তিনি।
কেন এই ডার্টি রিয়ালিজম?
বুকাওস্কির সাহিত্য জীবনের প্রায় প্রতিটি কোণেই “ডার্টি রিয়ালিজম” প্রতিফলিত হয়। কেন তিনি এ ধারাকে এতো তীব্রতায় স্পর্শ করলেন, তার সম্ভাব্য কারণগুলো এখানে আমরা একবার দেখে নিতে চাই—
দারিদ্র্য ও শ্রমজীবী অভিজ্ঞতা
মার্কিন ডাক বিভাগে প্রায় ১২ বছর চাকরি করেছেন বুকাওস্কি, নানান বিভাগে বিভিন্ন অদ্ভুত কাজ । জীবনের একটি বড়ো পরিসর তাঁকে কাটাতে হয়েছিল অপরিসীম দারিদ্র্যের মধ্যে। বিল পরিশোধ করতে না পারা, অস্বস্তিকর বসবাস, সস্তা বারে রাতজীবন–সবই তাঁর দারিদ্র্য ও প্রান্তিক জীবন-অভিজ্ঞতা। আর একেই তিনি উন্মুক্ত করে চলেছিলেন তাঁর বিভিন্ন সৃষ্টিকর্মে। “Dining with the Tight Fisted ( Love is a Dog from Hell, 1977)” কবিতায় তিনি লিখছেন –” We are paupers, drinking cheap wine, waiting for the miracle that never comes.” এক আর্ত মানুষের ভেঙে পড়া কন্ঠস্বর যেন ধারণ করেছে এ লেখা! এসব অভিজ্ঞতা তাঁর Post Office (১৯৭১) ও Factotum (১৯৭৫)-এ সরাসরি উঠে আসে। ডাকঘরের কাজ ছিল তাঁর কাছে দাসত্বের অন্য নাম। পোস্ট অফিস উপন্যাসে হেনরি চিনাস্কি ( বুকোয়োস্কির অলটার ইগো) র মুখে স্পষ্ট শুনতে পাই আমরা –”It’s not the job, it's the uniform, the cage, the repetition. It kills the soul ( Post Office, 1971, p. 73).” জীবনের একঘেয়েমি ও যান্ত্রিকতা তাঁকে এই ধারার দিকে টেনে আনে। বলে রাখা ভালো, জীবনের প্রথম উপন্যাস Post Office ই তাঁকে মূলধারার সাহিত্যে তাঁর জাত চিনিয়ে দেয়। আনন্দহীন, সন্তোষহীন, নিষ্পেষণময় বিভিন্ন কাজে বাধ্যতামূলক উপস্থিতি তাঁকে জীবনের উদ্যত বাস্তবতা ও ক্লান্তিকর অভিজ্ঞতায় নিষ্ঠুর করে তোলে।
পারিবারিক সহিংসতা
শৈশবে বাবার নির্যাতন তাঁর মনে এক গভীর ক্ষত তৈরি করে। Ham on Rye (১৯৮২)-তে শৈশবের সেই অভিজ্ঞতার রূঢ় অথচ সত্য প্রতিফলন রয়েছে। এক সাক্ষাৎকারে বুকাওস্কি তা জানিয়েওছেন অকপটভাবে। তিনি বলছেন–” My father used to beat me with a razor strap three times a week. It was like the father beating the son for the world’s sins (Sun- light Here I Am, Seamus Cooney, 1996 p.34).” শৈশব কৈশোরের সেই দিনগুলোর বীভৎসতা পিছু নিয়ে ছে তাঁর জীবনের। তাঁর সুস্থ মনের দেয়ালে চাবুকের দাগ হয়ে জেগে রয়েছে তা প্রায় আজীবন। তারই দীর্ঘ ছায়া এসে পড়েছে তাঁর সাহিত্যের পাতায় পাতায়। জীবনকেই সম্ভবত সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় ফলবান করে গেছেন তিনি।
শারীরিক অসুন্দরতা ও সামাজিক প্রত্যাখ্যান
অ্যাকনে-দাগে ভরা হতশ্রী মুখ এবং নারীদের কাছে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার তীব্র দুঃখবোধ তাঁর কবিতা ও গদ্যে আশ্চর্যভাবে প্রতিফলিত। Bluebird কবিতায় তিনি লিখেছিলেন নিজের লুকানো কোমল দিকের কথা, যা বাইরে থেকে দৃষ্টিগোচর হয় না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে যা অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো জ্বলে থাকে। তাইতো তাঁর লেখা হয়ে উঠে এক আত্মধিক্কার,এক আত্মবিরোধ এবং এক অ্যান্টিহিরোর উপাখ্যান।
আমেরিকান ড্রিমের মিথ্যাচার
বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে একটা স্বপ্ন আমেরিকান সংস্কৃতিতে মুখ্য হয়ে উঠেছিল। স্বপ্নটি হলো আমেরিকা এমন একটি দেশ যেখানে কঠোর শ্রমের বিনিময়ে প্রতি টি নাগরিক সমান সুযোগ লাভ করবে ও মধ্যবিত্তজীবন সমৃদ্ধি ও স্বাধীনতা খুঁজে পাবে। এ ধারণা আরও স্পষ্ট করেছিলেন James Truslow Adams তাঁর The Epic of America (1931) বইটি লিখে। কিন্তু প্রকৃত বাস্তব ছিল একেবারেই আলাদা। দারিদ্র্য, বর্ণবিদ্বেষ, বেকারী, শ্রমজীবীদের অমানবিক অবস্থা, ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রভাব এ স্বপ্নকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। বুকাওস্কির সাহিত্য এই ভঙ্গুর স্বপ্নের বর্ণনাকার। তিনি দেখেছেন, আমেরিকার মধ্যবিত্ত জীবনের স্বপ্ন আসলে ভাঙাচোরা বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। তাইতো তাঁর সাহিত্য মূখ্যত সেই ব্যর্থতারই দলিল।
মদ্যপ জীবনযাপন
কৈশোর যৌবনের বিচ্ছিন্নতাই হয়তো তাঁকে নিয়মিত ও অনিয়ন্ত্রিত মদ্যপানের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। তিনি নিজেই লিখছেন–” That's the problem with drinking I thought, as I poured myself a drink. If something bad happens you drink in an attempt to forget; if something good happens you drink in order to celebrate; and if nothing happens you drink to make something happen ( Women, 1978).” তিনি তো আসলে কিছু ভুলে থাকতে চাইতেন। মদ তাঁকে সমাজের ভণ্ডামি থেকে দূরবর্তী করে ও লেখার জন্য সততার দৃষ্টি তুলে দেয়। এক সাক্ষাৎকারে (BBC,Arena: Charles Bukowski, 1985) তিনি বলেন –” Alcohol is probably one of the greatest things to arrive upon the earth — alongside me.”এই নির্লজ্জ ও নিরাবরণ স্বীকারোক্তি তাঁর ডার্টি রিয়ালিজমকে দৃঢ় ও দৃপ্ত স্বর জুগিয়েছে । তাই সুরাসক্তি ছিল তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মদ্যপান তাঁকে প্রায় সমাজবিচ্ছিন্ন করে তুললেও তা অবশ্যই ছিল তাঁর সৃজনশীলতার অন্যতম অনুপ্রেরণা।
মূলধারার সাহিত্য ও বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতির প্রতি ঘৃণা
আমেরিকার মেইনস্ট্রিম লিটারেচার, বিশেষ করে, পঞ্চাশ থেকে সত্তরের দশক অব্দি ছিল অ্যাকাডেমিক মর্ডানিজম শাসিত। ইন্টেলেকচুয়ালরা অভিনব প্রতীকে, গভীরতর ব্যাখ্যায় ও অভাবিত অলঙ্কারে সাহিত্যকে শ্রী মণ্ডিত করায় ব্যস্ত ছিলেন। তা ছিল সচেতনভাবে পরি -শীলিত, উচ্চমার্গীয়, জীবনের মহত্তম দিককে প্রদর্শন ও বাস্তবতার বিপ্রতীপ। বুকাওস্কি দেখালেন সাহিত্য অবশ্যই হয়েউঠবে জীবনের তথাকথিত নোংরা,অশ্লীল ও ব্যর্থ অংশের বাস্তব অনুবাদ। যন্ত্রণা, দারিদ্র্য, যৌনতা ও ভঙ্গুর সম্পর্ককে বাদদিয়ে তিনি সাহিত্যসৃষ্টির উদ্দেশ্য কে অস্বীকার করলেন । এক সাক্ষাৎকারে ( Rolling Stone, 1982) তিনি বলছেন –”Universities, critics, editors – they all want to make literature some- thing it isn't. Real literature is in the streets, in the bars, in the whorehouses, in the alleys.” স্বাভাবিকভাবেই, তিনি ছিলেন মূলধারার সাহিত্যচর্চা ও ‘অ্যাকাডেমিক বুদ্ধিজীবী’ দের প্রতি ভীষণ বিদ্বেষী। তিনি বলতেন—“The nine-to-five is one of the greatest atrocities...” অর্থাৎ নিয়মিত চাকরি কিংবা প্রথাগত সাহিত্য তাঁর কাছে একান্তভাবে একঘেয়েমির নামান্তর। আর এই অ্যান্টি-অ্যাকাডেমিক ঘৃণাই তাঁর ডার্টি রিয়ালিজমকে একধরণের কাউন্টার কালচার তৈরি করতে প্ররোচিত করেছিল।
নিজেকে আউটসাইডার ভাবা
আউটসাইডার তো তিনি অবশ্যই। শারীরিকভাবে অন্য প্রান্তথেকে তাঁর আমেরিকায় আসা। কিন্তু মানসিকভাবে ? আমেরিকার শুধু নয়, মূলধারার যেকোনও সাহিত্য থেকে তিনি প্রান্তবাসী,বহিরাগত। আউটসাইডার বলেই বিকল্প নন্দনের খোঁজ, প্রতিষ্ঠা। আউটসাইডার বলেই চরিত্ররা সমাজের কেন্দ্র নয় -- তারা মজুর, শ্রমিক, সরকারি কর্মচারী। তারা পতিতা, ভিখিরি, মদ্যপ। তারা একলা নারীপুরুষ, চাকরিহীন, অবহেলিত বা ব্যর্থমানুষ ,তা অন্যরকম সত্যেরও। ‘পলিশড’ অবস্থান থেকে দূর- বর্তী বলেই হয়তো তিনি বলতে পেরেছিলেন–
What matters most is how well you walk through the fire ( The Roominghouse Madrigals, 1988).
বুকাওস্কির রচনায় ডার্টি রিয়ালিজম
কবিতা
বুকাওস্কির কবিতা সংক্ষিপ্ততম; কথ্যভাষা ও কঠিন বাস্তবতায় ভরা। Bluebird, The Laughing Heart, Roll the Dice সহ প্রায় সমস্ত কাব্যগ্রন্থেই ব্যক্তিক জীবনের দুঃখবোধ, ব্যর্থতা ও প্রতিস্পর্ধী মনোভাব শাখাপ্রশাখাময় হয়ে উঠেছে। তাঁর কবিতা কাব্যিক আড়ম্বরহীন। ভাষা সারল্যময় অথচ অশোভন। নস্যাৎ করেছে তিল পরিমাণ অলঙ্কারকেও। যৌনতা, নিঃসঙ্গ- তা ও আসক্তিকে কেন্দ্রভূমিতে রেখেই তাঁর কবিতা- নির্মাণ, কবিতাপ্রয়াস। জীবনের সমস্ত সৌন্দর্য ও রোমা -ন্টিকতাকে যেন প্রশ্নবিদ্ধ করেছে তাঁর কবিতা। এক আত্মজীবনীমূলক স্বীকারোক্তি অর্থাৎ দারিদ্র্য, ব্যর্থতা এবং মদ্যপজীবন বারবার ঝলসে উঠেছে তাঁর কাব্য- সৃষ্টিতে। আংশিক উদ্ধৃত করি একটি কবিতা –
It’s not the large things that/ send a man to the madhouse./ death he’s ready for, or murder,/ earthquakes, car accidents / fires, floods…/ no, it's a continuing series of small tragedies…( The Shoelace: Dangling in the Tournefortia, 1981).
ভালোবাসা যৌনতা ও ব্যর্থতা যেন একাকার হয়ে গেছে তাঁর Love is a Dog from Hell কাব্যগ্রন্থে। পরিনত বয়সে হতাশা ও মৃত্যুর চিহ্ন বহন করেছে The Last Night of the Earth Poems কবিতাগ্রন্থটি। এ নিরাশা ও মৃত্যু-অনুভব তবুও মনে হয় তাঁর এক বন্ধুরতাময় আকর্ষণও। অন্য একটি কবিতায় বুকাওস্কি লিখছেন –
There is a loneliness in these words so great/ that you can see it in the slow movement of the hands of a clock ( The Last Night of the Earth Poems, 1992, p-15).
এই লোনলিনেস কিন্তু রোমান্টিক লোনলিনেস নয়। এ যেন সময়ের নীরব, মন্থর এক মুভমেন্ট যা তাঁর কাছে উদ্দেশ্যহীন, নিষ্ফল ও দিশাহীন। পরিণতিহীন জীবনের নির্জন কুয়াশা। ভালোবাসার আবহমান চিরন্তন প্রকরণ কে ছিন্নভিন্ন করে দেন তিনি। সম্পর্ককে দেখাতে চান দেহজ, ধ্বংসময় ও অন্ধকার প্রচ্ছদের ভেতর দিয়ে। এর রূঢ় বাস্তবময়তা,যৌনতা ও আবেগের সঙ্গে সমন্বিত থাকে এক অন্তর্লীন দ্বান্দ্বিকতাও।
উপন্যাস
প্রথম উপন্যাস Post Office (১৯৭১) এ যে বাস্তবতার সন্ধান পেলাম আমরা তা কিন্তু তথাকথিত বাস্তবতা নয়, সেই বাস্তবতা শ্রমজীবীর বাস্তবতা। তাঁর নিজের যাপিত জীবনের বাস্তবায়ন। ডাককর্মী হিসেবে তাঁর চাকরির অধীনতা, একঘেয়েমি, দমন যেন এক মানবিক ক্লান্তি। এই রুক্ষতার, বন্ধুরতার অনুকূলে যে ভাষা ব্যবহৃত হতে পারলো, তার মেজাজ ও মর্জি, ওজন ও অবয়ব, অনৈ- ক্য ও ভঙ্গুরতাতো সেভাবেই হওয়া দরকার! তাই এ উপ - ন্যাসে নতুন এক নির্মাণ দেখলো আমেরিকান সাহিত্য।
ছোট ছোট ব্যর্থতা , অবক্ষয় ও জীবনে টিকে থাকার সংগ্রামের ভেতর দিয়েই ব্যক্তিমানুষের প্রকৃত স্বরূপ যে প্রকাশিত হয়ে ওঠে Factotum (১৯৭৫) উপন্যাসের মধ্য দিয়ে বুকাওস্কি তাকেই তুলে ধরলেন। লিখছেন এখানে –”How in the hell could a man enjoy being awakened at 8:30 a m. by an alarm clock ,leap out of bed, dress, force-feed, shit, piss, brush teeth and hair, and fight traffic to get to a place where essentially you made lots of money for the opportunity to do so?” গদ্যের প্রায় প্রতিটি লাইনে শ্রমিকজীবনের তীব্র ক্ষোভ, ক্রোধ এবং শ্লেষ ও ক্লান্তি উদ্যত হয়ে আছে এখানে। Women(19 78)’উপন্যাসে নারী সম্পর্কের আশ্চর্য রসায়ন–দেহজ কামনার সঙ্গে এসে মিশেছে পারস্পরিক বিতৃষ্ণাও। আছে যৌনতার খোলামেলা ও নগ্ন বর্ণনা।
Ham on Rye (১৯৮২)এ অনেকখানি আত্মজৈবনিক এ লেখা ধারণ করেছে শৈশব ও কৈশোরের অসহনীয় অভিজ্ঞতা।
ছোটগল্প
বুকাওস্কির ছোটগল্পে নেই কোনও রূপকথা। বরং উপেক্ষিত মানুষের ইস্তাহার হিসেবেই এর পাঠগ্রহণ করতে পারেন পাঠক। Notes of a Dirty Old Man, বুকাওস্কির একটি বহুআলোচিত গল্প সংকলন। এখানে শাহরিক যৌনতা, সুরাসক্ত জীবন, অপরাধ ও তির্যক শ্লেষের ভঙ্গিমা দীপ্ত হয়ে ওঠে। জীবনের অশোভন অংশে আলো ফেলেছে তাঁর তর্জনী। তাঁর লেখা ছোট গল্পও যেন বাস্তবের ডকুমেন্টারি এবং তা নগ্ন বাস্তব। রূপকের আড়াল ভেঙে তা সরাসরি দারিদ্র্য হিংসা ও যৌনতাকে অনুবাদ করে। শুধু নোটস্ অব আ ডার্টি ওল্ড ম্যান (১৯৬৯)ই নয়, Erections, Ejaculations, Exhibitions and General Tales of Ordinary Madness (1972), South of No North (1973), Hot Water Music (1983) প্রভৃতি গল্পসঙ্কলনে বড়ো কোনও ঘটনাবলীর সমারোহ নেই, পরিবর্তে আছে ছোট ছোট যন্ত্রণা, বেকারী, অসহায়তা, দারিদ্র্য, বেঁচে থাকার দুর্মর আত্মপ্রবঞ্চনা। ভগ্ন, মানসিক অবসাদগ্রস্ত, নিজের ছোটজগতে আটকেপড়া মুক্তিহীন মানুষের চাল -চিত্র। যেন, যেমনটা দেখছেন, ঠিক তেমনটাই লিখছেন তিনি। নির্লিপ্ত কথনভঙ্গী, কোনও পরিণতি বা আশাবাদ -র দিকে ঝুঁকে পড়ছেন না কখনওই। যখন কেউ লক্ষ্য করছে না তাকে, তখন মানুষ কেমনভাবে বেঁচে থাকে– এই যেন তাঁর লেখার অভিপ্রায়।
সাক্ষাৎকার ও চিঠিপত্র
আসলে, কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাসে যে বাস্তবতাকে রচনা করেছেন বুকাওস্কি, তারই উৎস ও বিশ্লেষণ যেন ছড়ানো থাকে তাঁর সাক্ষাৎকার ও চিঠিপত্রে। একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলছেন –”The problem with writers is they spend too much time in univer- sities. I learned more in a bar than they ever did in a classroom(Sunlight Here I Am).”এখানে বারবার তাঁর তথাকথিত শিক্ষার সঙ্গে বিরুদ্ধতার পাশা - পাশি অভিজ্ঞতার বাস্তব শিক্ষাগ্রহণের প্রশ্নটি মর্যাদা- বান হয়ে উঠেছে। আবার, “I don't hate people,I just feel better when they’re not around”--এর মধ্যে- কার নিঃসঙ্গতা ও সমাজদূরত্ববোধ সম্ভবত তাঁকে ডাউন -ট্রডন মানুষের নিকটবর্তী করে ডার্টি রিয়ালিজমে শ্বাস নিতে প্ররোচিত করেছিল। এমনকি যখন এক সাক্ষাৎ- কারে তিনি বলেন ওঠেন–” They wanted us to work , marry, buy a house. I wanted to drink, write, and sleep with women. I didn't fit the American Dream.”-- তখনও সরাসরি এক প্রত্যাখ্যানকে স্বাগত জানাতে দ্বিধাহীন তিনি।
বুকাওস্কির চিঠিপত্রও পরিমাণের দিক থেকে বিশাল। Reach for the Sun: Selected Letters(1978-94), Screams from the Balcony : Selected Letters (1960-70) এরকমই দুএকটি দৃষ্টান্ত। এগুলোর মধ্য দিয়ে তাঁর মানসিক গড়ন ও ডার্টি রিয়ালিজমের স্পর্শ পাবেন পাঠক। বুকাওস্কির দারিদ্র্য ও অসহনীয় যান্ত্রিক জীবনের প্রতিচ্ছবি উঠে এসেছে একটা চিঠিতে–
Eight hours at the post office, then home to drink, sometimes to write. That's the cycle. It's ugly but it's mine.
অমোঘ এক বাস্তবকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তিনি, তাঁর গোটা সাহিত্যজীবনের সারাৎসারও হয়তো সেটাই, যা তিনি এক চিঠিতে লিখে গেছেন –
Don’t try to make literature. Don't try to be a poet. Just write what’s there, raw.
তাঁর মদ্যপান, প্রেমহীনতা, সম্পর্কের দুস্থতা, জটিলতা, একাকীত্ব ও অন্তর্জগতের হাহাকার – সমস্ত কিছুকেই তিনি প্রায় নির্মোহ ও নিরবগুন্ঠিতভাবে লিখে গেছেন তাঁর চিঠিপত্রে। সেগুলোই যেন হুবহু তাঁর কবিতা, গল্প, উপন্যাস, গদ্য হয়ে উঠেছে পরবর্তীতে বা সমসময়েও।
সমসাময়িকদের থেকে বুকাওস্কির ভিন্নতা
Raymond Carver এবং Richard Ford এর মতো আরও অনেকে ডার্টি রিয়ালিজমের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তাঁদের লেখায় একধরণের সংযম, নৈর্ব্যক্তিকতা ও এক প্রচ্ছন্ন দুঃখবোধ দেখা যায়। বুকাওস্কির ক্ষেত্রে কিন্তু তা ঘটেনি। তিনি ছিলেন অনেক বেশি র, উগ্র ও নির্ভেজাল আত্মজৈবনিকতো অবশ্যই। নিজেকে, নিজের জীবন ও অভিজ্ঞতার বাইরে তিনি একটি পা-ও ফেলেন নি। আন্ডারগ্রাউন্ড সাহিত্য আমরা যে অর্থে বুঝি, প্রকৃতার্থে তা না হলেও বুকাওস্কি কিন্তু সো কল্ড অজানা নিষিদ্ধ এক পৃথিবীর (যেখানে আমরাও বাস করি,তবু জানিনা, জানতে চাইও না তা)কথা পাঠকের সামনে উন্মুক্ত করে দেন। আর তা অবশ্যই ডার্টি রিয়ালিজমের ধারক। Carver-এর গল্প সংক্ষিপ্ত ও মিনিমালিস্ট; বুকাওস্কির রচনা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিশৃঙ্খল, তীব্র, অশ্লীল, নির্দিষ্ট ও সরাসরি। Carver যেখানে নীরবতার ভেতর বেদনাবোধকে প্রকাশ করতে সমর্থ হয়েছেন, বুকাওস্কি সেখানে দ্বিধাহীন কন্ঠে ঘোষণা করেছেন জীবনের প্রখর নগ্ন সত্যকে।
সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
বুকাওস্কি যে সময় বিন্দুতে দাঁড়িয়ে লিখছিলেন সেসময়ের আমেরিকা ছিল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অস্থিরতায়, টালমাটাল অবস্থায় ভরা।
মহামন্দা (Great Depression): তাঁর শৈশব অবস্থা কে তৈরি করেছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তাঁর জীবনে সামাজিক অস্থিরতা হিংস্রতা ও বিরুদ্ধতার ছাপ ফেলে যায়।
৬০–৭০-এর counterculture আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে সুরা, সেক্স ও মুক্ত জীবনযাত্রার যেন এক সার্থক প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায় তাঁর রচনায়।
ভিয়েতনাম যুদ্ধ-পরবর্তী আমেরিকায় হতাশা ও ভোগবাদী সংস্কৃতির উত্থানকে অভিনিবেশের সঙ্গে প্রত্যক্ষ করেছিলেন তিনি।
এই বাস্তবতা বুকাওস্কির সাহিত্যকে শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং সময়ের ইস্তাহার তৈরিতে সাহায্য করেছে।
উপসংহার
চার্লস বুকাওস্কির সৃষ্টি নগ্ন বাস্তবতার দলিল। তিনি লিখেছিলেন –”I am a dirty realist because life is dirty.Somebody has to write it down. “আরও বলেছিলেন - “They talk of art . I talk of survival. My writing is survival.” এ থেকেই বোঝা যায় ডার্টি রিয়ালিজম তাঁর জীবনের কতোখানি! তিনি যে ধারাকে বেছে নিয়েছিলেন,তা তাঁর নিজের জীবনের প্রতিফলন। দারিদ্র্য, শৈশবের সহিংসতা, মদ্যপান, যৌনতা, সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নতা—সবই তাঁর লেখায় ফিরে এসেছে।
সমসাময়িকদের তুলনায় তিনি অনেক বেশি ব্যক্তিগত, অনেক বেশি কাঁচা। এজন্যই তিনি বিতর্কিত, আবার একই সঙ্গে জনপ্রিয়ও। মূলধারার সাহিত্য তাঁকে প্রথমে অবজ্ঞা করলেও পরবর্তীকালে তিনি হয়ে উঠেছিলেন আমেরিকান সাহিত্য ইতিহাসে এক অনিবার্য কন্ঠস্বর।
ডার্টি রিয়ালিজম আমাদের অবহিত করতে চায় সাহিত্য শুধু সৌন্দর্য নয়, বরং জীবনের কদর্যতা ও ব্যর্থতাকেও সমানভাবে ধারণ করতে পারে তা। বুকাওস্কি সেই অনন্যধারার অন্যতম উজ্জ্বল এক মুখ।
পাঠসূত্র:
- Post Office (1971), Black Sparrow Press
- Factotum (1975), Black Sparrow Press
- Women (1978), Black Sparrow Press
- Ham on Rye (1982), Black Sparrow Press
- Love is a Dog from Hell (1977), Black Sparrow Press
- The Last Night of the Earth Poems (1992), Black Sparrow Press
- Notes of a Dirty Old Man (1969), City Lights
- Sunlight Here I Am (1996), ed. Seamus Cooney
- On Writing (2002), ed. David Stephen Calonne
- Reach for the Sun: Selected Letters 1978–1994 (1999), ed. Seamus Cooney
ডার্টি রিয়ালিজম ও চার্লস বুকাওস্কি
সাহিত্যের প্রান্তবর্তী সত্যকথন
নিশীথ ষড়ংগী
সাহিত্যের প্রান্তবর্তী সত্যকথন
নিশীথ ষড়ংগী




মন্তব্য