.header-button .inner > span { font-size: 18px !important; } .header-button .inner i.fa { font-size: 40px !important; } .comment-form-message { background-color: #f4f4f4 !important; font-size: 14px !important; }

$type=ticker$count=12$cols=4$cate=0$sn=0$show=post

বুকাওস্কি ও সর্বহারার ভবিষ্যৎ • তামিম রেজা

বুকাওস্কি ও সর্বহারার ভবিষ্যৎ • তামিম রেজা
the cockroach crouched 
against the title 
while i was passing and as
i turned my head
he hauled his butt 
into a crack.
I got the can and sprayed 
and sprayed and sprayed 
and finally the roach came out 
and give me a very dirty look. 
then he fell down into
the bathtub and I watched
him dying
with a subtle pleasure
because I paid the rent
and he didn’t.
I picked him up with
some greenblue toilet
paper and flushed him
away. that’s all there
was to that, except
around Hollywood and
Western we have to
keep doing it.
they say some day that
tribe is going to
inherit the earth
but we’re going to
make them wait a
few months.
                   (cockroach) 

এ কবিতায় হেনরি চার্লস বুকাওস্কি (১৬ আগস্ট, ১৯২০ - ৯ মার্চ, ১৯৯৪) নিজেই হয়ে উঠেছেন গভীর রূপক। কেবল কোনো বস্তু কিংবা ব্যক্তির নয়; বরং সম্পুর্ন এক শ্রেণীর। বুকাওস্কি যেন এখানে ঈশ্বর ও প্রাণী, দুই রূপেই নিজেকে নির্মাণ করেছেন। ঈশ্বর রূপে নিজেকে আবিষ্কার করে সম্পুর্ন পৃথিবীটাকেই তিনি যেন এই কবিতায় প্রতিফলিত করেছেন। বুকাওস্কি নিজে ও তেলাপোকা হয়ে উঠেছেন পৃথিবীর সৃষ্টি থেকে হয়ে আসা লড়াইয়ের প্রতীক। যে লড়াই চলছে এখনো। পৃথিবীর সবচেয়ে নির্মম নিয়মকে বুকাওস্কি এ কবিতায় রূপকের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। এ এমনই এক কবিতা, যে কবিতায় জগতের সকল প্রাণী নিজেকে আবিষ্কার করতে পারবে। 

বুকাওস্কি সবসময়ই নিম্নবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষের জীবনকে তাঁর কবিতায় তুলে আনতেন নানাভাবে। বাস্তব অভিজ্ঞতাগুলোকে তিনি নির্দ্বিধায় বলে ফেলতেন, সংকোচহীন। কবিতাকে অলংকারিক করতে যেয়ে কোনো দৃশ্য ও চিন্তাকেই তিনি আড়াল করতেন না। করতে চাইতেন না। বরং ঘটনাগুলোকে বলতেন অতিরঞ্জিত না করেই। এবং সেই ঘটনাকেই তিনি কবিতায় উন্নিত করতেন। আর এই কারণেই বুকাওস্কি বেঁচে আছেন নিজের মতো করে, নিজের সিংহাসনে। আর দৈনন্দিন সব ঘটনাগুলোকে কবিতায় রুপান্তরিত করতে প্রয়োজন প্রখর দেখার দৃষ্টি। আর সেটাই ছিলো বুকাওস্কির তুমুল পর্যায়ের। আর বুকাওস্কি যখন এই পৃথিবীকে দেখেন, তার বাসিন্দাদের দেখেন, তখনই চিন্তা ফেটে বেরিয়ে আসে ‘cockroach’ এর মতো কবিতা।

বুকাওস্কি এখানে ‘হলিউড’ ও ‘ওয়েস্টার্ন’ এর নোংরা, একঘেয়ে ও অস্বস্তিকর দৈনন্দিন জীবনের কথা বলার পাশাপাশি বলেছেন, পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও নিষ্ঠুর নিয়মের কথা। যেটা প্রাণের উৎপত্তি থেকে চলমান। পৃথিবীতে সাধারণত দুই শ্রেণীর প্রানী আছে। হয় শোষক, নয় শোষিত। আর ‘cockroach’ কবিতায় বুকাওস্কি ও তেলাপোকা যেন এই দুই শ্রেণীকেই প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ফলেই এখানে মনে পড়ে যায় কার্ল মার্ক্সের নাম। বুকাওস্কি ও তেলাপোকা যেন এখানে হয়ে উঠেছেন যথাক্রমে মার্ক্সের বলা বুর্জোয়া ও সর্বহারাদের প্রতিনিধি। বুকাওস্কি যখন ঈশ্বর, যখন তিনি এ কবিতা লিখছেন, তখন কি তিনি কার্ল মার্ক্সকে স্মরণ করছিলেন!

‘হলিউড’ ও ‘ওয়েস্টার্ন’ কি এখানে শুধুই দুটো শহর? সম্ভবত না; এ দুটো শহরের মাধ্যমে বুকাওস্কি যেন এখানে গোটা পৃথিবীটাকেই বুঝাতে চাইছেন। আর এ পৃথিবীতে নিম্নবিত্ত কিংবা সর্বহারা প্রাণীরা নিজেদের মতো করে বাস করলেও, বসে থাকলেও, লুকিয়ে থাকলেও, বুর্জোয়াদের তা কখনোই সহ্য হয় না। যেনো আধিপত্য হারানোর ভয়! আর তখনই তাঁরা নিজেদের ক্ষমতা প্রয়োগ করে। অমানবিক আচরণ করে। শ্রমিকদের খাটিয়ে তাঁরা হয়ে উঠে সমাজের নিয়ন্ত্রক। বুকাওস্কির স্প্রে করাটা যেন এখানে এরই প্রতীক হয়ে উঠে। আর কার্যসিদ্ধি হয়ে গেলেই তাঁরা নিজেদের মনে করে সমাজের একমাত্র অধিকারী! তখনই তাঁরা চায় সর্বহারা শ্রেনীর মালিকানা, নিয়ন্ত্রণ। আর যাঁরাই তাঁদের বিরুদ্ধে যাবে, তাঁদের উপরেই চলবে অমানবিক অত্যাচার। “because I paid the rent/ and he didn’t.” এ দুটো লাইন যেন সমাজে কেবল তাঁদের আধিপত্য বিস্তার করতে চাওয়ার কথাই বলে। আর তারপরই বুকাওস্কি তেলাপোকাটিকে ফ্ল্যাশ করে দেয়। এখানে এটি বুর্জোয়াদের দ্বারা সর্বহারা শ্রেনীর প্রতি অবহেলার প্রতীক হয়ে উঠে। যেন তাঁরা সমাজে অপ্রয়োজনীয়!

around Hollywood and
Western we have to 
keep doing it

‘হলিউড’ ও ‘ওয়েস্টার্ন’ শহরে বাস করাকালীন বুকাওস্কির বারবার তেলাপোকাদের সাথে এ কাজ কিংবা আচরণ করাটা কি পৃথিবীতে বারবার বুর্জোয়াদের দ্বারা হওয়া সর্বহারাদের প্রতি অত্যাচার ও অন্যায়ের প্রতীক হয়ে উঠে না? সেই শুরু থেকেই তো বুর্জোয়ারা শোষণ করে আসছে সর্বহারাদের। কিন্তু এখানে এসে প্রশ্ন জাগে, বুকাওস্কি কেনো তাঁর কবিতার জন্য কিংবা সর্বহারা শ্রেনীর রূপক হিসেবে তেলাপোকাকে বেছে নিলেন?
they say some day that
tribe is going to
inherit the earth
but we’re going to
make them wait a
few months.

আমরা জানি, আজ থেকে প্রায় ৬ কোটি ৬০ লক্ষ বছর আগে ডাইনাসোররা বিলুপ্ত হয়ে গেলেও তেলাপোকারা বেঁচে ছিলো। এবং আজও বেঁচে আছে। ধারণা করা হয়, পারমানবিক যুদ্ধের পরও তাঁরা টিকে থাকবে। এমনকি মানুষের চেয়েও তাঁদের টিকে থাকার সম্ভাবনা বেশি। একইভাবে নিম্নবিত্ত সর্বহারারাও সেই আদিম থেকে নির্যাতিত হয়ে, শোষিত হয়ে, লড়াই করে বেঁচে আছে। এবং এ লড়াই চলতেই থাকবে। আর তাই বুর্জোয়াদের থেকে সর্বহারাদের টিকে থাকার সম্ভাবনাই কি বেশি? আর এ কারণেই কি বুকাওস্কি তেলাপোকাকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে বলেছেন যে, তাঁরাই একদিন এ পৃথিবীর উত্তরাধিকারী হবে? পৃথিবীতে আগমন ঘটবে শ্রেণীবিহীন সমাজের। প্রতিষ্ঠা হবে সাম্যবাদ। আর সাথে কার্ল মার্ক্সের ভবিষ্যতবাণীও সত্য হয়ে উঠবে! কিন্তু বুকাওস্কিরা কেনো আরও কিছু মাস তাঁদের অপেক্ষা করাবেন? বুকাওস্কির এ কণ্ঠে কি ক্ষমতার চাইতে অসহায়ত্ব-ই বেশি ফুটে উঠছে না? বুকাওস্কির মতো সব বুর্জোয়ারাই কি জানেন যে কিছু মাস পরেই তাঁদের পতন হবে! আর পৃথিবীটা হবে সর্বহারাদের। এ জন্যই কি তাঁরা মার্ক্সকে ভয় পায়? আড়াল করতে চায়? কিন্তু মার্ক্স তো বাংলার রবীন্দ্রনাথের মতো, যতই মুছে ফেলতে যাবে, আড়াল করতে যাবে, ততই প্রকাশিত হয়ে উঠবে ভোরের রোদের মতো, বুকাওস্কির এ কবিতার মতো। তবে বলতেই হয়, বুকাওস্কি নিজে ও তেলাপোকা, সত্যিই উজ্জ্বল ও সফল রূপক হয়ে উঠেছেন যথাক্রমে বুর্জোয়া ও সর্বহারাদের। আর এ কবিতাও যেন হয়ে উঠেছে আমাদের এ পৃথিবী, এবং বুকাওস্কি হয়ে উঠেছেন বার্তাবাহক। দূত হয়ে সবার কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন ঈশ্বর মার্ক্সের বাণী। 

তবে এ কবিতায় শ্রেনীবিভাজনের পাশাপাশি গভীরভাবে ফুটে উঠেছে নগরজীবনের ক্লান্তি, একাকিত্ব ও হতাশা। তবে বুকাওস্কি কি এখানে শুধুই মানুষের শ্রেণীবিভাজনের কথাই বলেছেন? জগতের সকল প্রজাতির প্রাণীর কথাই কি বলছেন না? কেননা প্রতিটি প্রজাতির প্রাণীদের মধ্যেও তো যেকোনো একটি শ্রেনীকে সর্বদা লড়াই করেই বেঁচে থাকতে হয়। আর আরেকটি শ্রেনী থাকে, যাঁরা শোষণ করে, রাজত্ব করে, আধিপত্য বিস্তার করে থাকতে চায়। আর এ কারণেই এ কবিতা হয়ে উঠে পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণের।

এছাড়াও বুকাওস্কি তাঁর বিভিন্ন কবিতায় নিম্নবিত্ত ও শ্রমিকদের জীবনযাপন সম্পর্কে বলেছেন। 

if I suffer at this
typewriter
think how I’d feel
among the lettuce-pickers
of Salinas?
I think of the men
I’ve known in
factories
with no way to
get out—
choking while living
choking while laughing
at Bob Hope or Lucille
Ball while
2 or 3 children beat
tennis balls against
the walls.
some suicides are never
recorded.
             (the meek have inherited) 

শুরুতেই কবিতাটির শিরোনাম “the meek have inherited” এর মাধ্যমে বাইবেলের একটি উক্তি “The meek shall inherit the earth” কে তীব্র ব্যঙ্গ ও বিদ্রুপ করা হয়েছে। এর কারণ হতে পারে যে, বুকাওস্কি হয়তো দেখেছেন, নম্ররা পৃথিবীর অধিকার কী পাবে, জীবনে তীব্র কষ্ট, যন্ত্রণা ও অবহেলা ব্যতীত তাঁরা আর কিছুই পায় না। সমস্তজীবন শোষিত হয়েই থেকে যেতে হয়।

এ কবিতায় বুকাওস্কি শ্রমিকদের কষ্ট, ক্লান্তিকর ও একঘেয়ে জীবনের কথা বলেছেন, অনুভব করেছেন। আমাদেরকেও অনুভব করিয়েছেন। এখানে তিনি শ্রমিকদের অত্যাধিক পরিশ্রমের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। সাথে তিনি তাঁর পরিচিতদের কথাও মনে করছেন, যাঁরা কিনা কারখানায় কাজ করতো, খেটে মরতো। তারপরই তিনি শ্রমিকদের নিয়ে সবচেয়ে নির্মম কথাটি বলেন, “with no way to/ get out”. যেন কারখানায় শ্রমিকরা বন্দী হয়ে রয়েছে, বন্দী হয়ে রয়েছে তাঁদের জীবন! কিন্তু কেনো? কেননা কারখানা মালিকেরা শ্রমিকদের খাটিয়ে শরীরের মাংস ক্ষয় করে ফেলে, তবুও ন্যায্য পারিশ্রমিক দেয় না! যেন শ্রমিকেরা কারখানায় ঢুকেই ফেঁসে যায় পুঁজিবাদের ফাদে৷ তারপরই বুকাওস্কি বলেন, তাঁদের জীবন এতোটাই যন্ত্রণাদায়ক যে, জীবন চলাকালীন সময়ে এমনকি হাসার সময়েও দম বন্ধ হয়ে আসে! যেন পুঁজিবাদ তাঁদের জীবনকে খেয়ে ফেলেছে! এখানে কবি সাম্য রাইয়ানের মেশিন কবিতার কথা মনে পড়ে যায়।

আদিম শ্রমিক আমি; মেশিন চালাই।
মেশিনে লুকানো আছে পুঁজির জিন
চালাতে চালাতে দেখি আমিই মেশিন! 
                                        (মেশিন) 

আসলেই তো! “মেশিনে লুকানো আছে পুঁজির জিন”। আর শ্রমিকেরা সর্বদা সেই মেশিন চালাতে চালাতে একটাসময় যেন নিজেদেরকেই মেশিনরূপে আবিষ্কার করে ফেলেন। যেন তাঁরা মানুষ না; যন্ত্র! নিজেদের জন্য সামান্য কিছু সময়ও তাঁদের নেই! অথচ যাপনের মানের কোনো উন্নতি হয় না! এভাবেই চলতে থাকে তাদের জীবন। আর কারখানা মালিকেরা গড়ে ফেলে পুঁজির পাহাড়। 

বুকাওস্কি এখানে শুধু শ্রমিকদের নয়, এমনকি শ্রমিকদের সন্তানদের ক্লান্তিকর জীবনের কথাও বলেছেন। সম্ভবত বুকাওস্কি ভয় পাচ্ছেন, যদি তাঁদের অবস্থাও তাঁদের মা-বাবার মতোই হয়! আর শেষে এসে বুকাওস্কি বলেন, “some suicides are never/ recorded”. শ্রমিকদের এই বন্দী জীবনের খবর কে রাখে? এই অসহনীয় পরিশ্রমের জীবন কে রেকর্ড করে? এই যে শ্রমিকদের প্রতিদিন একটু একটু করে মরে যাওয়া শারীরিক ও মানসিক ভাবে, বুকাওস্কি এটাকে আত্মহত্যা বলছেন। এবং এইসব আত্মহত্যা কখনো রেকর্ড হয় না!

কিন্তু এই অন্যায়ের প্রতিবাদ কে করবে? কবে শেষ হবে এই অত্যাচার, অবিচার? বুকাওস্কি তার “cockroach” কবিতার মাধ্যমে আমাদের বলেন যে, ভবিষ্যতে এই পৃথিবীটা তেলাপোকাদের হবে। মূলত বলেছেন পৃথিবীটা শ্রমিকদের হবে। আর এঁরাই হলো সেই সর্বহারা শ্রেনী। আর এর প্রতিবাদ অন্য কেউ করবে না। তাঁদেরই করতে হবে। এবং তাঁরা এটা করবেই। আর বের হয়ে আসবে এই বন্দীত্ব থেকে। ভেঙে গুড়িয়ে দেবে সমস্ত পুঁজিবাদ। বুকাওস্কি-ও কি বিশ্বাস করতেন, কার্ল মার্ক্স কখনো মিথ্যা বলেন না?

এছাড়াও “Spark” কবিতায় বুকাওস্কি তাঁর কারখানায় কাজ করা অবস্থার ব্যথা, যন্ত্রণা ও বিরক্তির কথা তুলে ধরেছেন। কিন্তু তাঁর অনেক সহকর্মীরাই কারখানার সে কাজে সন্তুষ্ট ছিলো! আর এটাই বুকাওস্কিকে পাগল করে তুলত। সাথে শ্রমিকদের কষ্ট এবং তাঁদের প্রতি অবহেলা ও তাচ্ছিল্যের বিষয়টিকেও বুকাওস্কি তুলে এনেছেন এ কবিতায়। 
 
Some people never go crazy. What truly horrible lives they must lead.
বুকাওস্কি যেন এখানে বলতে চাইছেন, পাগল হলেই মুক্তি। পাগল হলেই পাওয়া যায় জীবনের প্রকৃত স্বাদ। আর যারা কখনো পাগল হতে পারে না, তাদের জীবন কাটাতে হয় তীব্র ভয়াবহতায়।

টাইম ম্যাগাজিন বুকাওস্কিকে ১৯৮৬ সালে ‘laureate of American lowlife’ বলে অভিহিত করেন। এবং এটা যথার্থই। কেননা বুকাওস্কি বিবিধ নতুন নতুন পদ্ধতিতে তুলে ধরেছেন নিম্নবিত্তদের জীবন ও যাপন। বুকাওস্কি কাজ করেছেন নিন্মবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তদের নিয়ে। তাঁদের জীবনের কঠিন ও রূঢ় বাস্তবতাগুলো নিয়ে। জীবনের বাজে ও নোংরা দিকগুলো তিনি তুলে ধরেছেন দারুণ সব উপায়ে। 

বিশ্বসাহিত্যে হেনরি চার্লস বুকাওস্কি এক অনন্য নাম। অনন্য বলতে অনন্য-ই। বুকাওস্কি এমনই একজন, যিনি কিনা নিজস্ব লিখন-ভঙ্গিমা নিয়ে নিজস্ব সিংহাসনে বসে আছেন একেবারেই নিজস্ব অস্তিত্বে। যিনি অন্য কারো মতো নন। বুকাওস্কির লেখার ধরন বাস্তবতা-নির্ভর। সমাজ, রাষ্ট্র, পৃথিবী ও মানুষের নগ্ন বাস্তবতাগুলো একেবারেই সহজ করে তিনি তুলে আনেন কবিতায়, যা অনেকের কাছেই হয়তো অসুন্দর, কিন্তু তাঁর সত্যতা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। বুকাওস্কি একবার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে, তাঁর চিন্তায় সবচেয়ে বড় গুণ হলো ‘সাহসিকতা’। বুকাওস্কি ছিলেন স্পষ্টবাদী। এবং তা চূড়ান্ত পর্যায়ের। তিনি কখনোই মুখোশের আশ্রয়ে আশ্রিত হননি। সমাজের রীতিনীতি ও নম্রতা-ভদ্রতা যেন এক ধরনের মুখোশ। আর বুকাওস্কি চেয়েছেন এই মুখোশ খুলে ফেলতে। আর তাই তিনি সরাসরি প্রকাশ করেছেন উলঙ্গ সত্যগুলো। তিনি যা দেখতেন, যা অনুভব করতেন এবং যা চিন্তা করতেন, তাঁর সবই তিনি লিখতেন একেবারেই কাঁচা ভাষায়, কোনোরকম সাজসজ্জা ও অলংকার ছাড়াই। যৌনতা, মদ্যপান, নেশা, গালাগালি, ইত্যাদি কখনো তিনি অলংকার ব্যবহার করে ঢেকে রাখেননি। বুকাওস্কির কবিতার বিরাট শক্তি ছিলো বিদ্রুপ। সমাজ ও সংস্কৃতির ভণ্ডামির বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন কড়া অবস্থানে। সবচেয়ে নির্মম ও নিষ্ঠুর সত্যগুলো তিনি তাঁর কবিতায় তুলে আনতেন সংকোচহীন। এবং তার সবই বাস্তব। আর এর জন্যে প্রয়োজন প্রবল সততা। আর এটাই ছিলো বুকাওস্কির প্রধান শক্তি। যা দেখতেন, তাই বলতেন। নিজের জায়গাতেও তিনি ছিলেন চূড়ান্ত সৎ। তিনি কখনোই প্রকৃত নিজেকে লুকাতেন না। নিজেকেও প্রকাশ করতেন নির্মমভাবে। আর পাঁচটা ভেঙে পড়া মানুষের মতোই তিনি নিজেকে আবিষ্কার করতেন। নিজের হতাশা, একাকিত্ব, ক্লান্তি, অপূর্ণতা, যৌনতা, মদ্যপান, প্রেমে ব্যর্থতা, সংকট, ইত্যাদি তিনি বলতেন নির্দ্বিধায়। এমনকি নিজের অপরাধগুলোকেও তিনি প্রকাশ করে দিতেন ভয়হীন। আর এ কারণেই বুকাওস্কি সৎ, সাহসী, ভয়ঙ্কর ও অনন্য।

সত্যি বলতে বুকাওস্কি এখন বাংলাদেশেও প্রবল প্রাসঙ্গিক। সময় যত যাবে, তিনি বাংলাদেশে আরও বেশি করে বিরাজ করতে থাকবেন। এর কারণ, তাঁর বিষয়বস্তু সমুহ ও কাজ বাংলাদেশের মানুষের জন্য আত্মার খোরাক হতে পারে। বর্তমান বাংলাদেশে যত সংকট, তার প্রায় বেশিরভাগ স্থানেই রয়েছে বুকাওস্কির আনাগোনা। আর এসব সংকটের মাঝে মানুষ যখন তাঁকে পাঠ করবে, তখন বুকাওস্কি তাঁদের নিকট হয়ে উঠবেন মনের মানুষ। যেন মনে হবে, তাঁদের জীবনের, যাপনের, হৃদয়ের, মনের, মস্তিষ্কের সমস্তকিছুই বুকাওস্কি বলে দিচ্ছেন। যেসব বিষন্ন সত্যগুলো আমরা গোপন করে যাই, সেগুলোই যেন বুকাওস্কি আমাদের প্রাণের বন্ধু হয়ে আমাদেরকে বলছেন; সঙ্গ দিচ্ছেন, আলো দেখাচ্ছেন। সাথে বর্তমান বাংলাদেশের জীবন, সমাজ, রাজনীতি ও অর্থনীতিতেও বুকাওস্কি প্রবল প্রাসঙ্গিক এবং প্রচন্ড গুরুত্বপূর্ণ। যেন তিনি বাংলাদেশের ভণ্ডামিগুলোর কথাই বলেছেন!

পরিশেষে বুকাওস্কির ভাষা সহজ ও সাবলীল। বুকাওস্কি মোটেই কেবল কোনো নির্দিষ্ট বিষয় কিংবা চিন্তার মাঝে আবদ্ধ ছিলেন না। বরং বাস্তবতা, চিন্তা ও কল্পনার প্রতিটি স্থানেই তিনি হাঁটাচলা করেছেন। আমরা যেখানেই যাই না কেনো, সেখানেই বুকাওস্কির অস্তিত্ব রয়েছে। আমাদের জীবন, সমাজ, পৃথিবী, রাজনীতি, অর্থনীতি সহ সব স্থানেই তিনি বিরাজমান। চাইলেই আমরা বুকাওস্কিকে এড়িয়ে যেতে পারি না। পারবো না। কেননা আমাদের চলার মাঝে এমন কিছু নেই, যেখানে বুকাওস্কি নিজেকে নিয়ে যাননি! বুকাওস্কি তাঁর লেখালেখি দিয়ে কিছুই অর্জন করতে না চাইলেও তিনি অর্জন করে ফেলেছেন অনেককিছুই। বুকাওস্কি বুকাওস্কির মতো। তাঁর মতো আর কেউ-ই নেই। আর তাই আগামীর পৃথিবীতেও বুকাওস্কি বেঁচে থাকবেন নিজের মতো করেই, নতুন হয়েই, মৌলিক হয়েই। সম্ভবত ধীরে ধীরে আমি বিশ্বাস করে ফেলেছি যে, কার্ল মার্ক্সের মতো বুকাওস্কিও কখনো মিথ্যা বলেন না।

বুকাওস্কি ও সর্বহারার ভবিষ্যৎ
তামিম রেজা


মন্তব্য

অনুবাদ আত্মজীবনী আর্ট-গ্যালারী আলোকচিত্র ই-বুক ইচক দুয়েন্দে ইশতেহার উৎপলকুমার বসু ঋত্বিক-ঘটক কবিতা কবিতায় কুড়িগ্রাম কর্মকাণ্ড কার্ল মার্ক্স গল্প চার্লস বুকাওস্কি ছড়া জার্নাল জীবনী দশকথা দিনলিপি পাণ্ডুলিপি পুনঃপ্রকাশ পোয়েটিক ফিকশন প্রতিবাদ প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা প্রবন্ধ প্রিন্ট সংখ্যা বই বর্ষা সংখ্যা বসন্ত বিক্রয়বিভাগ বিবিধ বিবৃতি বিশেষ বুলেটিন বৈশাখ ভাষা-সিরিজ ভিডিও মাসুমুল আলম মুক্তগদ্য মে দিবস যুগপূর্তি রিভিউ লকডাউন শম্ভু রক্ষিত শাহেদ শাফায়েত শিশুতোষ সন্দীপ দত্ত সম্পাদকীয় সাক্ষাৎকার সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ সৈয়দ সাখাওয়াৎ স্মৃতিকথা হেমন্ত
নাম

অনুবাদ,62,আত্মজীবনী,27,আর্ট-গ্যালারী,2,আলোকচিত্র,1,ই-বুক,7,ইচক দুয়েন্দে,23,ইশতেহার,2,উৎপলকুমার বসু,26,ঋত্বিক-ঘটক,4,কবিতা,348,কবিতায় কুড়িগ্রাম,7,কর্মকাণ্ড,16,কার্ল মার্ক্স,1,গল্প,84,চার্লস বুকাওস্কি,40,ছড়া,1,জার্নাল,4,জীবনী,7,দশকথা,25,দিনলিপি,1,পাণ্ডুলিপি,11,পুনঃপ্রকাশ,22,পোয়েটিক ফিকশন,1,প্রতিবাদ,1,প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা,4,প্রবন্ধ,189,প্রিন্ট সংখ্যা,5,বই,4,বর্ষা সংখ্যা,1,বসন্ত,15,বিক্রয়বিভাগ,21,বিবিধ,3,বিবৃতি,1,বিশেষ,26,বুলেটিন,4,বৈশাখ,1,ভাষা-সিরিজ,5,ভিডিও,1,মাসুমুল আলম,35,মুক্তগদ্য,45,মে দিবস,1,যুগপূর্তি,6,রিভিউ,5,লকডাউন,2,শম্ভু রক্ষিত,2,শাহেদ শাফায়েত,25,শিশুতোষ,1,সন্দীপ দত্ত,14,সম্পাদকীয়,20,সাক্ষাৎকার,25,সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ,18,সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ,55,সৈয়দ সাখাওয়াৎ,33,স্মৃতিকথা,15,হেমন্ত,1,
ltr
item
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন: বুকাওস্কি ও সর্বহারার ভবিষ্যৎ • তামিম রেজা
বুকাওস্কি ও সর্বহারার ভবিষ্যৎ • তামিম রেজা
চার্লস বুকাওস্কি প্রসঙ্গে তামিম রেজার প্রবন্ধ বুকাওস্কি ও সর্বহারার ভবিষ্যৎ। বিন্দু লিটল ম্যাগাজিনের চার্লস বুকাওস্কি সংখ্যা।
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEiRVE1TIyzB3_xjVh5wGcJrs7rJcM9KuaC3vCi26Vbzn86vECvuakhIFgPqx-UERI4XblI1UgrJbPTmjL56WlbAApoNCzGL8V7aafDud-tOtPh9sGTsS08r4XtenYbjt9WygYTEOcmThZn21CTPWJbvgeYtCSlfr1pEt2N_gj7u8DlB-FC0HcTqAwplX4A/s16000/%E0%A6%9A%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%B2%E0%A6%B8%20%E0%A6%AC%E0%A7%81%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%93%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A7%87%20%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A7%87%20%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%AE%20%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%9C%E0%A6%BE%20%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%AC%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A7%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%81.png
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEiRVE1TIyzB3_xjVh5wGcJrs7rJcM9KuaC3vCi26Vbzn86vECvuakhIFgPqx-UERI4XblI1UgrJbPTmjL56WlbAApoNCzGL8V7aafDud-tOtPh9sGTsS08r4XtenYbjt9WygYTEOcmThZn21CTPWJbvgeYtCSlfr1pEt2N_gj7u8DlB-FC0HcTqAwplX4A/s72-c/%E0%A6%9A%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%B2%E0%A6%B8%20%E0%A6%AC%E0%A7%81%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%93%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A7%87%20%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A7%87%20%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%AE%20%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%9C%E0%A6%BE%20%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%AC%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A7%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%81.png
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন
https://www.bindumag.com/2026/06/charles-bukowski-by-tamim-reza.html
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/2026/06/charles-bukowski-by-tamim-reza.html
true
121332834233322352
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts আরো Readmore উত্তর Cancel reply মুছুন By নী PAGES POSTS আরো এই লেখাগুলিও পড়ুন... বিষয় ARCHIVE SEARCH সব লেখা কোন রচনায় খুঁজে পাওয়া গেল না নীড় Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share to a social network STEP 2: Click the link on your social network Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy