বোহেমিয়ান শব্দটার সঙ্গে যেন বহমানতা জুড়ে থাকে। এঁরা নিজেদের সৃষ্টি দিয়ে যেন সমাজকেই চ্যালেঞ্জ করে বসে। এঁরা নেশার ঘোরে জীবনবোধের যে মূর্তি গড়ে তা গড়পরতা মানুষ দেখে আঁতকে ওঠে। এঁদের যদি কোন নিয়মের শৃঙ্খলে বাঁধা হয় তো আসল মানুষটাই তাঁর সৃষ্টি সহ উধাও হয়ে যাবে। যেমন গত শতাব্দীতে এই বাংলার ঝড় তোলা কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়, যেমন সদ্য প্রয়াত কবি রাহুল পুরকায়স্থ। না,জীবনানন্দকে এই দলে রাখলাম না। তিনি এক নরম রোদের আলো যিনি তাঁর সৃষ্টি সহ এক দুঃখের সাগরে ভেসে চলেছেন। অবহেলা, উপেক্ষায় যাঁর অর্ধেক সৃষ্টিই পাঠক, গবেষকদের কাছে অধরা থেকে গেছে। আমরা এমন এক সাহিত্যিকের ওপর আলোচনায় ব্রতী হয়েছি যাঁর মূল মন্ত্রই ছিল মানবতা। যাঁর লেখার পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে খেটে খাওয়া মানুষের জীবনযন্ত্রণা, প্রেম,অপ্রেম সবটাই। প্রশস্ত রাজপথ ছেড়ে জীবনের সেই কানাগলির সন্ধান করে গেছেন। নিজের নামের থেকে হেনরি শব্দটা বাদ দিয়ে তিনি হয়ে যান চার্লস বুকাওস্কি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেওয়া এক জার্মান সেনার ক্যালিফোর্নিয়ায় জন্ম নেওয়া আমেরিকান সন্তান চার্লস বুকাওস্কি নিজের ইওরোপিয়ান অস্তিত্বকেও অনুভব করেন।
প্রথাগত উচ্চশিক্ষা না থাকলেও মাত্র তেরো বছর বয়সেই উনি লিখতে শুরু করেন। বিভিন্ন পেশায় তাঁর জীবন অতিবাহিত হয়েছে। পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে ওঁর লেখা কবিতা বিভিন্ন পত্রিকায় পাঠাতে শুরু করেন। এইসময়ে প্রকাশনা জগতের এক ধনী মহিলার সঙ্গে তাঁর জীবন শুরু হয়। দু'বছরের সম্পর্কের শেষ হয় বিচ্ছেদে। এরপরেও নতুন বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হন ও ধীরে ধীরে নিজের লেখার মূল্য সম্পর্কে সচেতন হন। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'উওম্যান' সম্পর্কে সাংবাদিক লিউয়েনস্কির প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছিলেন তিনি পুরুষতান্ত্রিকতায় বিশ্বাসী নন। গ্রন্থটি রচনাকালে বাস্তবধর্মীতা আনার জন্য মহিলামহলে আনাগোনা বাড়ালেও মহিলাদের সম্পর্কে তাঁর যথেষ্ট শ্রদ্ধা আছে। তাঁর গ্রন্থ 'দ্য টেলস্ অব অর্ডিনারি ম্যাডনেস' অবলম্বনে পরিচালক মার্কো ফেরারি সিনেমা করেছেন। এই প্রাপ্তিকেও বুকাওস্কি তাঁর জীবনের আকস্মিক পাওয়া বলে মেনে নিয়েছেন। তা নিয়ে গরিমা প্রকাশ বা বাড়তি আগ্রহের ছিটেফোঁটা মাত্র নেই। তাঁর বেশী নেশাগ্রস্ত হয়ে থাকার নিজস্ব ব্যাখ্যাও একেবারে আম আদমির মতো। প্রতিদিনের জীবনযন্ত্রনা ও বেঁচে থাকার লড়াইয়ের ক্ষত ভুলে থাকার জন্যই তাঁর পানাসক্তি। লেখার যে জাল তিনি বুনে চলেন তা একেবারে অকৃত্রিম। তার জন্য কোন পূর্ব পরিকল্পনা বা বিস্তৃত পড়াশোনা কিছু থাকত না। ইউরোপকে তিনি কৃষ্টি সংস্কৃতির উর্বর ভূমি বলে মনে করেন। তাই তার লেখার কদরও সেখানে বেশী। তাঁর মত অনুযায়ী কবিতায় কিছু আবেগ মেশালেও গদ্য সাহিত্যে তিনি একেবারে সোজাসুজি নিজের চারপাশের বাস্তবতাকে মেলে ধরেন। এই সরল প্রকাশকেই নিজের স্টাইল বা ধরন বলে মনে করেন। এবার আসা যাক ওঁর কবিতা বিষয়ক আলোচনায়। ওঁর প্রথম প্রকাশক অ্যাব্রেল ডেব্রিটো কবিতাগুলো সংগ্রহ করলেও পাঠকের কাছে পৌঁছনোর ব্যবস্থা সেভাবে করেননি। প্রকাশক জন মার্টিনের সংস্পর্শে বুকাওস্কি আসার পর অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। শুধু কবিতা ছাপা নয়,বেশী করে কপি ছাপানোর জন্য বুকাওস্কিকে অনুপ্রেরণা দেন। পরবর্তী সময়ে বুকাওস্কি প্রকল্প নামে বুকাওস্কির কবিতা নিয়ে জার্মান থিয়েটারে কাজও হয়েছে। আমেরিকার অভিনেতা অ্যাড্রিয়েন ব্রুডি কবিতার বার্ষিক উৎসবে দুই ভিন্ন মেরুর কবির একটা করে মোট দুটো কবিতা পাঠ করেছেন। তাঁদের মধ্যে একজন চার্লস বুকাওস্কি ও অপরজন বিগি স্মলস্। এবার আসা যাক ওঁর কবিতার প্রসঙ্গে। "দ্য জাপানিজ ওয়াইফ" কবিতায় আমেরিকান বউ ও জাপানিজ বউয়ের মধ্যে তূলনা টেনে জাপানিজ বউদের সব দিক দিয়ে শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে। কিন্তু যখন সে অভিজ্ঞতা ব্যক্তিগত স্তরে পৌঁছেছে তখন তা ভয়ানক হয়েছে। কিন্তু মৃত্যুতে সবকিছু আবার মহান ও নান্দনিক রূপে ধরা দিয়েছে। ট্রলিয়াস অ্যান্ড ট্রেলিসেস কবিতাটা আরও ব্যঞ্জনাধর্মী যেখানে প্রকাশকের সঙ্গে লেখক ও তার সৃষ্টির সম্পর্কের কথা বিবৃত হয়েছে। যেখানে লেখক দায় এড়িয়ে মরতে পর্যন্ত পারছে না। আবার প্রকাশক লেখককে ধৈর্য্যের শিক্ষা দিচ্ছেন। একটা বাগান যেমন উর্বর মাটি পেয়ে ফলে ফুলে ভরে ওঠে সেরকম সৃজনশীলতাতেও সেই বাগান গড়ার উর্বর মাটির মতোই হতে হবে। দ্য ব্লু বার্ড কবিতায় আমরা এমন একটা হৃদয়ের সন্ধান পাই যেখানে ঐ পাখিটা ঘুমিয়ে আছে। যা কবি বাস্তব জীবনের হিসেবী মানুষজনের সামনে উন্মুক্ত করতে চান না। যাকে লুকিয়ে রাখতে চান হৃদয়ের গভীরতম অলিন্দে। ইন্টারভিউ বাই এ গুগেনহাম রিসিপিয়েন্ট কবিতায় তিনি ছকবাঁধা আমেরিকান কবি ও কবিতার ওপর তাঁর ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন। শেষপর্যন্ত যে কবিতাগুলোর সারবত্তা তাঁকে ভাবায় না। উল্টে তার পোশাকি আবরণ নিয়ে তিনি মসকরায় মেতে ওঠেন। এরকমভাবেই তিনি সাধারণের মাঝে অতিসাধারণ হতে চেয়ে তাঁর কাব্যপ্রতিভা মেলে ধরেন।
দ্য লাফিং হার্ট, দ্য সিক্রেট অব মাই এনডুরেন্স এসমস্ত কবিতা সেই সাক্ষ্য বহন করে। দ্য নাইট আই ওয়াজ গোয়িং টু বি ডাই কবিতাটা চালর্স বুকাওস্কির একটা সবচেয়ে দুঃখের আবেগময় কবিতা। যে কবিতায় তিনি বিষাদে ডুবে যেতে যেতে আত্মার পতন টের পান। বুকাওস্কির বইগুলোর মধ্যে উল্লেখ করার মতো হল: হ্যাম অন রায়ে, পোস্ট অফিস, ফ্যাকটোটাম, উমেন, লাভ ইজ আ ডগ ফ্রম হেল। ১৯৮২তে লেখা হ্যাম অন রায়ে খানিকটা আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস। যেখানে মূল চরিত্রের আড়ালে আমেরিকায় নিজের জীবনের শুরুর দিনগুলোকে মেলে ধরেছেন। 'পোস্ট অফিস' ১৯৭১ সালে লেখা বুকাওস্কির প্রথম উপন্যাস। এখানে ওঁর ডাক বিভাগে কর্মরত অবস্থার সময়ের কথা ধরা আছে। ১৯৭০ সালেই এই উপন্যাস চলচ্চিত্রায়নের জন্য প্রস্তাবিত হলেও সে চলচ্চিত্র এখনও পর্যন্ত হয়নি। 'ফ্যাকটোটাম' বুকাওস্কির দ্বিতীয় উপন্যাস যেখানে ওঁর বেকার ও নেশাগ্রস্ত জীবনের কথা ঠাঁই পেয়েছে। ১৯৭৮-এ লেখা 'উইমেন'' বুকাওস্কির এমন একটা উপন্যাস যেখানে কোন পেশাগত অভিজ্ঞতার কথা নয়,বরং একজন সেলিব্রিটি লেখক হিসেবে নিজের জীবন উদযাপনের গল্প লিখেছেন। আনুষঙ্গিকভাবেই উপন্যাসে সেসব নারীদের উল্লেখ আছে যারা সেইসময়ে বুকাওস্কির জীবনকে প্রভাবিত করেছে। লাভ ইজ আ ডগ ফ্রম হেল একটা এমন গীতিময় কাব্যগ্রন্থ যেখানে ভালোবাসার প্রয়োজনীয়তা ও হৃদয়বিদারক বিভিন্ন ঘটনার সমাবেশকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এভাবেই চার্লস বুকাওস্কি তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে নিজের জীবনের সঙ্গে প্রতিটা সাধারণ মানুষের জীবনকে জড়িয়ে নিয়েছেন। প্রেম, অপ্রেম, বেঁচে থাকার লড়াই সবেতেই তিনি অপ্রতিরোধ্য, কালোর্ত্তীণ ও আধুনিক।
তথ্য ঋণ: পোয়েট্রি ফাউন্ডেশন ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট
চার্লস বুকাওস্কি: এক পথচারী স্রষ্টা
সুতপা ব্যানার্জী
সুতপা ব্যানার্জী




মন্তব্য