চার্লস বুকাওস্কি একজন আন্ডারগ্রাউন্ড লেখক। কবি, ঔপন্যাসিক ও ছোটগল্পকার। লেখালেখি করতেন যেমন ছোটকাগজে তেমনি তার প্রকাশকও ছিলো ছোট ছোট ছাপাখানাই। কাউন্টার কালচার আন্দোলনের এক কাল্ট হিরো। কিন্তু আমেরিকার একাডেমিয়া জগতে একজন পারসনা নন গ্রাটা। জন্ম জার্মানির আর্দেনাখে, ১৯২০ সালের ১৬ আগস্টে। বড়ো হন আমেরিকায়।
হয়তোবা খুব ভালো করেই বুকাওস্কি জানতেন মানব জীবনের সেই প্রথম মহাসত্য যে প্রতিটি জীবনই কষ্টে ভুগছে। বিভিন্ন সময়ে তার কথাবার্তায় বারংবার বুদ্ধের প্রসঙ্গ টানা এই আভাসই দেয়। তো সমাজের নষ্ট নিয়মনীতি, প্রচলিত বুর্জোয়া বিশ্বাস, মধ্যবিত্ত ধ্যান ধারণা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রেখে খ্যাতি-অখ্যাতির ধার না ধরে বুকাওস্কি আমৃত্যু লিখে গেছেন। নিজেকে উপস্থাপন করেছেন এক বিধ্বস্ত সংগ্রামী মানুষ হিসেবে। জীবনকে উদযাপন করেছেন নিজের মতো করে। তার বেশিরভাগ কবিতাই মুক্তছন্দে লেখা। তাঁর লেখালেখি মূলত মার্কিন শহর লস অ্যাঞ্জেলেসের জনজীবনকে কেন্দ্র করেই। ‘ভিলেজ ভয়েস’ ম্যগাজিনে তার লেখালেখি নিয়ে মাইকেল ল্যালি বলেন, ‘বুকাওস্কি... একটি ঘটনা। তিনি জেদী লোক হিসেবে যাই লিখতে চেয়েছেন সবসময় নিজস্ব শৈলীতে লিখে গেছেন, যা তার ‘ব্যক্তিত্ব’ হয়ে ওঠে, যা কঠোর, একইসাথে তীব্র জীবনযাত্রার ফল।’
বুকাওস্কি আগেই বলেছি একজন পারসনা নন গ্রাটা অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের একাডেমিক সমালোচকদের কাছ থেকে তাঁর জীবদ্দশায় খুব কমই মনোযোগ পেয়েছেন। তবে গত শতকের ৮০ দশক থেকে পশ্চিম ইউরোপে, বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে এবং জার্মানিতে তিনি বেশ সমাদৃত হন। ভ্যালুজ কাম ফ্রম ডিফারেন্স- এ প্রবাদ অনুয়ায়ী স্বাভাবিকভাবে তিনিও দেশ কাল ছাড়িয়ে বর্তমান বিশে^ পাঠ-আবশ্যক লেখক হয়ে ওঠেছেন। ১৯৯৪ সালের মার্চ মাসে বুকাওস্কির মৃত্যুর পর থেকে এ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি সমালোচনামূলক নিবন্ধ এবং বইয়ের বিষয় হয়ে উঠেছে তার জেদী লেখালেখি ও ক্ষেপাটে জীবন। মৃত্যুর পর একই বছরেই তার সাহিত্য নিয়ে ‘অ্যাগেইনস্ট দ্য আমেরিকান ড্রিম: এসেইস অন চার্লস বুকাওস্কি’ নামে রাসেল হ্যারিসনের একটা সমালোচনামূলক বই প্রকাশ হয়েছে।
বুকাওস্কির সমাধিফলকে খোদিত রয়েছে ‘চেষ্টা করো না’। তার কবিতার একটা পংক্তি এটা। লেখালেখির ক্ষেত্রে তিনি একে মূলতরিকা মনে করেন। অনুপ্রেরণা এবং সৃজনশীলতা সম্পর্কে উচ্চাকাঙ্ক্ষী লেখক এবং কবিদেরও তিনি এ পরামর্শই দিয়েছেন। বুকাওস্কির দৃঢ় বিশ^াস ছিলো একটি লেখা জোরজবরদস্তি বা বাণিজ্যিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে কখনও প্রকাশিত হওয়া উচিত নয়। সৃষ্টি বা অমরত্বের জন্য চেষ্টা নয়, তুমি অপেক্ষা করো। আর যদি কিছুই না ঘটে, তাহলে আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করো। তার এ কথা প্রসঙ্গক্রমে দার্শনিক নিটশে ও সোপেনহওয়ারের কথা মনে করিয়ে দেয়। স্মৃতিতে ফিরিয়ে আনে সাহিত্যিক জগতের আরেক দিকপাল ফ্রাঞ্জ কাফকার কথা। মনে পড়ায় চীনের দার্শনিক লাউৎসেকেও। ‘চেষ্টা করো না’ বুকাওস্কি এ কথার মধ্য দিয়ে হোর্হে লুই বোর্হেসের এই অনুভূতিরও প্রতিধ্বনি করেন যে লেখালেখি হলো একধরনের মনোরম অলসতা, এবং আরেক খ্যতিমান আমেরিকান লেখক রে ব্র্যাডবেরির সেই কথাটিরও যে, একজনকে আনন্দের সাথে সৃষ্টি করতে হবে অথবা একেবারেই সৃষ্টি করতে হবে না। বুকাওস্কি মনে করেন, লেখাকে ঢালাইয়ের চেষ্টা চিন্তার বৈধতা এবং সৃষ্টির বিশুদ্ধতাকেই কলঙ্কিত করে। জীবন ও লেখালেখি সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, তুমি আগুনের মধ্য দিয়ে কতটা দক্ষতার সাথে হেঁটে যাও তাই হচ্ছে সবচেয়ে জরুরি বিষয়। এ ক্ষেত্রে তার পরামর্শ হলো, ‘তুমি যা ভালোবাসো তা খুঁজে বের করো এবং তা তোমাকে মেরে ফেলতে দাও।’ ১৯৬১ সালে জানুয়ারির শেষদিকে জন ওয়েবকে লেখা এক চিঠিতে বুকাওস্কি জানান যে, ‘ভালো শিল্পের একমাত্র বুদ্ধিমত্তা হলো যদি এটি তোমাকে প্রাণবন্ত করে তোলে, অন্যথায় এটি হুকুম।’ তার এ কথা আমেরিকার আরেক সুপ্রসিদ্ধ লেখক সমালোচক ও বুদ্ধিজীবী সোসান সনটাগকেও প্রতিধ্বনিত করে যে, শিল্প মানুষকে বিচলিত করে থাকে।
বুকাওস্কি চব্বিশ বছর বয়সে তার প্রথম গল্প প্রকাশ করেন এবং পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে কবিতা লেখা শুরু করেন। ১৯৪০-এর দশকের গোড়ার দিক থেকে বিভিন্ন ছোটকাগজে তার প্রকাশ ঘটতে থাকে। জীবনযাপনের মতই আড়ম্বরহীন কবিতা এবং গদ্যে তিনি শহুরে জীবনের নিকৃষ্টতা, বিকৃত পরিবেশ, এবং আমেরিকান সমাজের নিপীড়িতদের চিত্রিত করেন। রচনায় জীবনের বাস্তববাদী নিষ্ঠুরতা ও বিদ্রূপের উপর জোর দেন। তিনি এ কাজ করতে গিয়ে অভিজ্ঞতা, আবেগ এবং কল্পনার হাত ধরেন, সরাসরি ভাষা এবং হিংসাত্মক ও যৌন চিত্রকল্প ব্যবহার করেন। লেখায় অতি নান্দনিকতা ফলাতে চাননি, শালীনতার ধারও ধারেননি। তিনি বুকাওস্কি বাদে অন্যকিছু হতে চাননি, রঙ মাখতে চাননি। জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে নিজের মেকি চেহারাও আঁকেননি। শিল্প সম্পর্কে বুকাওস্কির ধারণা ফুটে ওঠে এ কবিতাংশটি থেকেও-
মহান লেখকরা অশালীন মানুষতারা অন্যায্যভাবে বেঁচে থাকেকাগজের জন্য বাঁচিয়ে রাখে তাদের সেরা অংশ।ভালো মানুষরা পৃথিবীকে বাঁচায়যাতে আমার মতো জারজরা তৈরি করতে পারে শিল্প,এবং অমর হয়ে ওঠে।আমার মৃত্যুর পরে যদি তুমি এটি পড়োএর অর্থ আমি এটি তৈরি করেছিলাম।
বুকাওস্কির সাহিত্যে স্বপ্নের চরিত্রায়নে বিচ্ছিন্নতার যোগ রয়েছে, যা চরিত্রের বিদ্রোহ, পারিবারিক পরিম-ল এবং সামাজিক মূলধারার মধ্যে তার ব্যক্তিগত নির্যাতন এবং শ্রমিক শ্রেণীর নিপীড়নকে বোঝায়। আবার চরিত্রের স্বপ্নের বাস্তবতাকে আলিঙ্গন করা, যা মদ্যপান এবং আত্মহত্যার মতো স্বয়ংক্রিয় ধ্বংসাত্মক প্রবণতার দিকে ছুটাতে থাকে। তার অল্টার ইগোর মাধ্যমে, বুকাওস্কি আমেরিকান স্বপ্ন যে সমৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দেয় তার বিপরীতে এর বাস্তবতাকে হতাশার উৎস হিসেবে এবং শ্রমিক শ্রেণীর ক্ষেত্রে সামাজিক পতনকে এর অমানবিকতাসহ তুলে ধরেন। এছাড়াও, স্বপ্নের বিরুদ্ধে চরিত্রের প্রতিরোধ কীভাবে তাকে কেবল অস্তিত্বগত সংকটের দিকেই ঠেলে দেয় তাও দেখিয়ে দেন, যা মূলধারার আমেরিকান মূল্যবোধের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার ইচ্ছা এবং বিংশ শতাব্দীর আমেরিকান সমাজে টিকে থাকার জন্য সেগুলি আকড়ে থাকার ইচ্ছোর মধ্যে সারাক্ষণই চরম দ্বন্দ্বময়। রিচার্ড গ্রে তার ‘আ হিস্ট্রি অফ আমেরিকান লিটারেচার’ বইয়ে বুকাওস্কির সাহিত্যিক জ্যোর্তিময়তাকে এভাবে সারসংক্ষেপ করেছেন:
‘বুকোস্কির কাজে কোনও বড় অঙ্গভঙ্গি বা ইঙ্গিত নেই। একটি অবাধ, মুক্ত-প্রবাহিত পংক্তি বা বাক্য এবং একটি অবাধ, নৈমিত্তিক বাগধারা ব্যবহার করে তিনি কেবল জিনিসগুলি যখন চলে যায় তখন এক রহস্যময়, এমনকি ব্যঙ্গাত্মক উপায়ে লিখে থাকেন। এবং তার সামনে যা আসে, বেশিরভাগ সময়, তা হল ভিন্ন আমেরিকা: নি¤œশ্রেণীর জীবন, বোকা, ঝরে পড়া, বঞ্চিতদের মধ্যে যারা সাফল্যের জাতীয় স্বপ্নের উপর ছায়া ফেলে।’
আমেরিকান ড্রিমের বিপরীত পরিস্থিতি বুকাউস্কির কবিতায়ও ফুটে উঠেছে ভীষণভাবে। যেমন:
এর মাঝে জন্ম নিয়েছিহাসপাতালগুলোর মাঝে যা অতি ব্যয়বহুল বরং সস্তা মরে যাওয়াআইনজীবীদের মাঝে যারা এত বেশি টাকা চায় দোষ স্বীকারই বরং সস্তাএমন দেশে যেখানে জেলখানা ভরে গেছে আর বন্ধ হয়ে গেছে পাগলাগারদএমন জায়গায় যেখানে জনগণ বোকাদের পরিণত করে ধনাঢ্য বীরেএভাবে জন্ম নিয়েছিএর মধ্য দিয়ে হেঁটে যাওয়া এবং এর মধ্যেই বেঁচে থাকাএ কারণে মারা যাওয়াএ কারণেই নিঃশব্দ থাকানপুংসকঅপরাধীবঞ্চিত...
বুকাওস্কির রচনার এ দিকটি তার জীবিতকালে বলা যায় বরাবরই উপেক্ষিত হয়েছে। এছাড়া ‘পবিত্র মাকে ধর্ষণ’ কবিতাটি কথাও বলা যায়। এটি ‘উজ্জ্বল, জটিল বা পালিশ করা’ না হতেই পারে, হয়তো এটাই মূল বিষয়। একাডেমিক ‘কবিতা’ এবং এর সমর্থকদের উপর কবিতাটি এক আক্রমণ হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে, সেইসাথে এমন এক ধরণের শিল্পের জন্য ইশতেহার হিসেবেও দাঁড়িয়ে গেছে যা প্রান্তিক গোষ্ঠীর হাতে উৎপাদিত হয়। রূপ এবং বিষয়বস্তুতেও বুকাওস্কি এতটাই তাদের মুখপত্র যে, ডেভিড ই. জেমস ‘মিনেসোটা রিভিউ’তে বলেন, বুকাওস্কি সমসাময়িক কবিতায় ‘এক ধরনের ঘরানা’ তৈরি করেছিলেন। আর রাসেল হ্যারিসন বলেন, ‘বিষয়বস্তু হিসেবে শ্রমিক শ্রেণীই উপস্থিত বুকাওস্কির বেশিরভাগ কাজে, তথাকথিত ‘গতানুগতিকতা’ নয়, এটাই অনেক শিক্ষা সমালোচক এবং অন্যদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়’।
আরেকটি বিষয় খেয়াল করা দরকার, যখন সল বেলো, ডন ডেলিলো, ডোনাল্ড বার্থেলমে, থমাস পিনচন, উইলিয়াম এস বারোজ, জন বার্থ, ভ্লাদিমির নাবোকভ, টনি মরিসন, জোসেফ হেলারের মতো লেখকরা কেবল ঐতিহ্যবাহী লেখার পদ্ধতিকেই চ্যালেঞ্জ করছিলেন না এবং তাদের লেখায় নতুন বিষয়বস্তু সন্নিবেশ করছিলেন, তখন বুকাওস্কি তাদের সকলের সাথে নিজেকে বেশ দূরে রেখেছিলেন। তাছাড়া গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তিনি কোনও আন্দোলন বা চিন্তাধারার সাথে সরাসরি জড়িত থাকেননি। সাহিত্য শিক্ষায় তার যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাবও একরকমভাবে একাডেমিয়ার ‘উচ্চ সাহিত্য’ নীতিকে গ্রহণ না করার দিকে তাকে পরিচালিত করে। তা সত্ত্বেও আমেরিকান সাহিত্য ক্যাননে বুকাওস্কি আজ ঠিকই জায়গা করে নিয়েছেন।
কিছু সমালোচক অবশ্য বুকাওস্কির লেখন-শৈলীকে আক্রমণাত্মক বলে মনে করেন। তার কবিতা বিবৃতিমূলক, ধ্বনি-শব্দ-মাধুর্য সম্পর্কে উদাসিন, ডিটারমিনিস্টিক, অর্থের দিক থেকে নির্দিষ্ট, রাখঢাক নেই, সুসজ্জা নেই, রুপকবিহীন, সোজাসাপ্টা, এমনকি নাইভ বলেও অভিযোগ করে থাকেন তারা। এ প্রসঙ্গে বেলজিয়াম টিভির এক সাক্ষাৎকারে বুকাওস্কির কাছে জানতে চাওয়া হয় যে তার কবিতা তো খুব ন্যাড়া, কোন চিত্রকল্প, রূপক ও উপমা নেই কেন? তিনি জবাব দেন, ‘রূপক/উপমা, এতো বিলাসিতা তো আমার পোষায় না। আমার মধ্যে এতো জায়গা নেই। সময় নেই। ঐ যে বললাম বাবা ছিলেন আমার সাহিত্যিক প্রশিক্ষক। সম্পূর্ণ অযৌক্তিক কারণে আমায় মারতেন। পিটাতেন। রোজ। মারতে মারতে আমার মধ্যে থেকে ভান-ভণিতার সমস্ত রস-মেদ বের করে দিয়েছিলেন। শুধু আত্মাটা পড়ে ছিলো। তাই আমার কবিতার মধ্যে ওইসব ¯েœহবস্তু নেই। আত্মা তার কথা বলে সরাসরি। বলে যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে।’ এ দিকে ‘অন রাইটিং’ বইয়েও অনেকটা নান্দনিকতার বিপরীতে গিয়ে আইকোনোক্লাস্ট এ কবি উদাহরণ দিয়ে আরও প্রশ্ন তোলেন, ‘সেখানে আমরা ছিলাম, একজন শিপিং কেরানি এবং একজন দারোয়ান, নান্দনিকতার তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করছিলাম যখন আমাদের সম্পর্কে সব হলো আমাদের বেতনের ১০ গুণ পাচ্ছিলেন যে মানুষ, পচা ফল কিনতে থাকা সেই হাতের মাঝেই হারিয়ে গেলেন। আমেরিকান জীবনযাত্রার জন্য এ কী বলে?’ একই বইয়ে পূর্বসূরীদের সশ্রদ্ধভাবে স্মরণ করতেও ভুলেন না বুকাওস্কি। তিনি বলেন, ‘আমি সেই সময়ের কথা ভাবি যখন পাউন্ড, টি.এস. এলিয়ট, ই.ই. কামিংস, জেফার্স, অডেন, স্পেন্ডাররা এসেছিলেন। তাদের কাজ পত্রিকায় ঠিক ছড়িয়ে পড়তো, আগুন ধরিয়ে দিতো। কবিতাগুলি ছিলো ঘটনা, বিস্ফোরণে পরিণত হতো। তখন ছিল এক তীব্র উত্তেজনা।’
জন উইলিয়াম করিংটন ‘নর্থওয়েস্ট রিভিউ’তে অবশ্য বলেন, বুকাওস্কির জগত বিংশ শতাব্দির অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানে ঋদ্ধ, এ জগতে ধ্যান এবং বিশ্লেষণের ভূমিকা খুবই কম। এর বিষয়বস্তু হলো মদ্যপান, যৌনতা, জুয়া এবং সঙ্গীত। তবে বুকাওস্কির ধরন হলো এক স্পষ্ট, কঠোর কণ্ঠস্বর; পংক্তির দৈর্ঘ্য পরিমাপ করার জন্য দুর্দান্ত কান এবং চোখ; এবং রূপককে এড়িয়ে যাওয়া যেখানে প্রাণবন্ত উপাখ্যানই নাটকীয়ভাবে এ কাজ করে থকে।
আরেক দল সমালোচক মনে করেন, বুকাওস্কির কবিতাগুলো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও আত্ম-উপলব্ধির উপর ভিত্তি করে লেখা, যা অনেক পাঠককেই নিজেদের জীবনের সাথে সম্পর্কিত করে। তারা মনে করেন, যৌনতা, মদ্যপান এবং সহিংসতার নিয়মিত ব্যবহারের মাধ্যমে পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবকে তিনি ব্যঙ্গ করেছেন। স্টিফেন কেসলার ‘সান ফ্রান্সিসকো রিভিউ অফ বুকসে’ মন্তব্য করেন, ‘নিজেকে সুন্দর দেখানোর চেষ্টা না করে, অনেক কম বীরত্বপূর্ণ হিসেবে, বুকাওস্কি এমন এক সত্যবাদিতা নিয়ে লেখেন, যেনো হারানোর কিছুই নেই. যা তাকে বেশিরভাগ অন্যান্য ‘আত্মজীবনীমূলক’ ঔপন্যাসিক এবং কবিদের থেকে স্বতন্ত্র রাখে।’ স্টিফেন কেসলার আরও বলেন, ‘আমেরিকান ভবঘুরেদের ঐতিহ্যের মধ্যে দৃঢ়ভাবে অবস্থান করে, কিছুই হারাবার ভয় নেই এমনভাবে বুকাওস্কি সমাজের মূলধারা বিচ্ছিন্ন এক ক্ষয়িষ্ণু এলাকা থেকে ক্ষমাহীনভাবে লিখেছেন।’
কবিতা নিয়ে বুকাওস্কির অভিমত আমরা তার মুখ থেকেই জানতে পারি। কবিতায় সত্য সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমি একটু প্রতারণা করি; আমি এটাকে আরও উজ্জ্বল করি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটা সত্য হতে পারে, কিন্তু আমি এমন একটি জিনিস দিয়ে একে উন্নত না করে থাকতে পারি না যা একে আরও কিছুটা উজ্জ্বল করে তুলবে।’ আর যা একটা ভালো কবিতা তৈরি করে সে সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘যে কঠিন, পরিচ্ছন্ন পংক্তিটি একে বলে। এবং এতে কিছু রক্ত থাকতে হবে; এতে কিছু হাস্যরস থাকতে হবে; এতে সেই অজানা জিনিসটি থাকতে হবে যা আপনি পড়তে শুরু করার সাথে সাথেই জানেন।’
বুকাওস্কি তখন নেহাতই দুই বছরের বাচ্চা, যখন ১৯২৩ সালের ১৮ এপ্রিল, জার্মানির ব্রেমারহেভেন থেকে তার পরিবার যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড রাজ্যের বাল্টিমোরে জাহাজে করে পাড়ি জমান, যেখানে তারা স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। বুকোস্কির বাবা প্রায়শই বেকার থাকতেন। তিনি দৃঢ় শৃঙ্খলায় বিশ্বাসী ছিলেন। আত্মজীবনীমূলক ‘হ্যাম অন রাই’(১৯৮২) বইয়ে বুকোস্কি বলেন যে, তার মায়ের সম্মতিতে, তার বাবা প্রায়শই শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন, ছোটখাটো কাল্পনিক অপরাধের জন্যও তাকে মারধর করতেন। পরে তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে তার বাবা ছয় থেকে এগারো বছর বয়স পর্যন্ত সপ্তাহে তিনবার তাকে ক্ষুরের আঘাত দিয়ে মারতেন। তিনি বলেন, এটি তার লেখালেখিতে সাহায্য করেছিল, কারণ অনাকাঙ্খিত যন্ত্রণা কাকে বলে বুঝতে পেরেছিলেন। যখন বুকাওস্কির বয়স ১৩ বছর বুকোস্কির এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয় যখন তার বন্ধু উইলিয়াম বাল্ডি মুলিনাক্স তাকে মদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন, যিনি একজন মদ্যপ সার্জনের ছেলে, ‘হ্যাম অন রাই’ বইয়ে ‘এলি ল্যাক্রস’ হিসেবে তাকে চিত্রিত করা হয়। মুলিনাক্স একদিন তার বাবার ওয়াইন সেলারে বুকাওস্কিকে আমন্ত্রণ জানান এবং তাকে প্রথম মদ পান করান। এরই স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বুকাওস্কি পরে লিখেছেন ‘এটা জাদুকরী ছিল। কেন কেউ আমাকে বলেনি?’ এই মদ তাকে অনেক দিন ধরেই সাহায্য করে। বুকাওস্কি লাজুক প্রকৃতির এবং সামাজিকভাবেও সবার থেকে দূরে থাকতেন, কিশোর বয়সে ব্রণের তীব্র সমস্যা দেখা দেওয়ায় এই অবস্থা আরও বেড়ে যায়। পাড়ার বাচ্চারা তার ইংরেজি উচ্চারণ এবং তার বাবা-মা তাকে যে পোশাক পরাতেন তার জন্য উপহাস করত। সেময়ের অর্থনৈতিক মহামন্দা তার বেড়ে ওঠার সাথে সাথে তার বাবাকে সহিংস করে তুলে, তার ক্রোধকে আরও বাড়িয়ে তুলে এবং তার লেখার জন্য তার কণ্ঠস্বর খুজে পেতে এবং লেখার বিষয়ে তাকে অনেক কিছু উপহার দেয়।
১৯৩৯ সালে স্নাতক শেষ হওয়ার পর, বুকাওস্কি লস অ্যাঞ্জেলেস সিটি কলেজে দুই বছর শিল্প, সাংবাদিকতা এবং সাহিত্যের উপর কোর্সে যোগ দেন। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে তা বাদ দেন। এরপর তিনি লেখক হওয়ার আশায় আর্থিকভাবে অসচ্ছল কর্মজীবন শুরু করতে নিউ ইয়র্ক সিটিতে চলে আসেন। যুদ্ধ চলাকালীন ১৯৪৪ সালের ২২শে জুলাই বুকাওস্কিকে এফবিআই এজেন্টরা ফিলাডেলফিয়ায় গ্রেপ্তার করে, তিনি সেই সময়ে সেখানেই থাকতেন। ড্রাফট ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ তোলা হয় তার বিরুদ্ধে। কারাগারে সতেরো দিন বন্দি থাকেন।
বুকাওস্কির পরবর্তী দুই বছর লেখালেখি করেন কিন্তু ছাপার ক্ষেত্রে তাকে অসংখ্য রিজেকশন স্লিপ গ্রহণ করতে হয়। ১৯৪৬ সাল নাগাদ তিনি লেখালেখি ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন, শুরু হয় মাতাল জীবন। অন্তত দশ বছর ধরে তিনি মাতলামি করেন আর সারাদেশে ঘুরে বেড়ান। এই ‘হারানো বছরগুলি’ তার পরবর্তী আধা-আত্মজীবনীমূলক সাহিত্যের ভিত্তি গড়ে দেয়।
লস অ্যাঞ্জেলেসে মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছে বুকাওস্কি আবার লেখালেখি শুরু করেন। তবে তিনি মদ্যপান চালিয়ে যেতে থাকেন এবং কঠোর-জীবন যাপনে বাধ্য হওয়া এক কবি হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। অন্যান্য সমসাময়িকদের মতো, আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকায়, বিশেষ করে ওপেন সিটি এবং এল.এ. ফ্রি প্রেসের মতো স্থানীয় সংবাদপত্রে লেখা ছাপতে শুরু করেন।
১৯৫৬ সালের নভেম্বরে ক্যারল এলি হার্পারকে এক চিঠিতে লিখেন,
‘আমার বয়স ৩৬ বছর (৮-১৬-২০) এবং ১৯৪৪ সালে হুইট বার্নেটের স্টোরি ম্যাগাজিনে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল (ছোটগল্প)। তারপর একই সময়ে ম্যাট্রিক্সের ৩-৪টি সংখ্যায় কয়েকটি গল্প এবং কবিতা, এবং পোর্টফোলিওতে একটি গল্প। ...আর হ্যাঁ, ‘রাইট’ নামক বইয়ের একটি গল্প এবং কয়েকটি কবিতা,...প্রকাশিত হয়...। তারপর ৭-৮ বছর আমি খুব কম লিখেছিলাম। বেশ মাতাল ছিলাম। পেটে ছিদ্র নিয়ে হাসপাতালের চ্যারিটি ওয়ার্ডে গিয়েছিলাম, জলপ্রপাতের মতো রক্ত ঝরছিল। আমি ৭ পিন্টের একটানা ট্রান্সফিউশন নিয়েছিলাম এবং বেঁচে গিয়েছিলাম। আমি আগের মতো নই, কিন্তু আবার লিখছি।
গতকাল স্পেন থেকে মিসেস হিলসের কাছ থেকে একটি নোট পেয়েছি যেখানে জানানো হয়েছে যে... হার্লেকুইনের পরবর্তী সংস্করণে আমার কিছু গল্প এবং কবিতা থাকবে...। তারা আমাকে সম্পাদকীয় কর্মীদের সাথে যোগ দিতে বলেছে যা আমি করেছি। এবং এ এক দুর্দান্ত অভিজ্ঞতা; এবং আমি যা শিখেছি তা হলো: অনেক, অনেক লেখক আছেন যারা একেবারেই লিখতে পারেন না, এবং তারা সবাই ক্লিশে আর কপি-বাজ, এবং ১৮৯০ সালের প্লট, এবং বসন্ত সম্পর্কে কবিতা এবং প্রেম সম্পর্কে কবিতা লিখে চলেছেন, এবং তারা মনে করেন যে কবিতাগুলি আধুনিক কারণ সেগুলি স্ল্যাং বা স্ট্যাকাটো স্টাইলে লেখা হয়, অথবা সমস্ত ‘আমি’ ছোট, অথবা, অথবা, অথবা দিয়ে লেখা হয়!!! . . . ঠিক আছে, দেখো, আমি এক্সপেরিমেন্ট গ্রুপে যোগ দিতে পারছি না...।
আমি আমার প্রথম উপন্যাস, আ প্লেস টু স্লিপ দ্য নাইট শুরু করেছি।
১৯৬৭ সালের শুরুতে, লস অ্যাঞ্জেলেসের ওপেন সিটির জন্য বুকাওস্কি ‘নোটস অফ আ ডার্টি ওল্ড ম্যান’ কলামটি লিখতে শুরু করেন। ১৯৬৯ সালে কাগজটি বন্ধ হয়ে গেলে, লস অ্যাঞ্জেলেস ‘ফ্রি প্রেস’ এবং নিউ অরলিন্সের হিপ্পি আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকা ‘নোলা এক্সপ্রেস’ এই কলামটি ছাপতে থাকে। ১৯৬৯ সালে, বুকাওস্কি এবং নীলি চেরকোভস্কি তাদের নিজস্ব স্বল্পস্থায়ী মাইমোগ্রাফ করা সাহিত্য পত্রিকা, ‘লাফ লিটারারি’ এবং ‘ম্যান দ্য হাম্পিং গানস’ চালু করেন। পরের দুই বছরে তারা তিনটি সংখ্যা প্রকাশ করেন। একই বছরে বুকাওস্কি ব্ল্যাক স্প্যারো প্রেসের প্রকাশক জন মার্টিনের একটি প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং পূর্ণকালীন লেখালেখিতে নিজেকে উৎসর্গ করেন। তার পোস্ট অফিসের চাকরি ছেড়ে দেন। সেই সময়ে একটি চিঠিতে বুকাওস্কি নিজের পরিস্থিতি এভাবে ব্যাখ্যা করেন, ‘আমার দুটি বিকল্পের মধ্যে একটি আছে - পোস্ট অফিসে থেকে পাগল হয়ে যাওয়া... অথবা এখানেই থেকে লেখকের সাথে খেলা করা এবং ক্ষুধার্ত থাকা। আমি ক্ষুধার্ত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ প্রস্তাবের এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে তার প্রথম উপন্যাস, ‘পোস্ট অফিস’ শেষ করেন এবং মার্টিনকে দেন। এ সময় থেকে তিনি ছোট স্বাধীন প্রেসের একজন আগ্রহী সমর্থক হয়ে ওঠেন এবং তার কর্মজীবন জুড়ে অসংখ্য ছোট কাগজে কবিতা এবং ছোটগল্প জমা দিতে থাকেন। এরপর বাজে পরিস্থিতি তাকে হারাতে পারেনি কখনও। তিনি বলেন, যদি সব পরিস্থিতিতে লিখতে না পারো, তবে তুমি যথেষ্ট ভালো লেখক বা কবি নও।
বুকাওস্কি এক অর্থে, মুখের কথা ব্যবহারের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। সিওত্তি বলেন, তার কবিতা এবং ছোটগল্পের প্রধান চরিত্র, যা মূলত আত্মজীবনীমূলক, সাধারণত একজন নিচুমানের লেখক [হেনরি চিনাস্কি] যিনি তার সময় কাটান ছোটখাট চাকরি করে (এবং বরখাস্ত হন), মাতাল হন এবং একের পর এক বিম্বো এবং বারবনিতাদের সাথে প্রেম করেন। অন্যথায়, তিনি পরাজিত মানুষ যেমন বেশ্যা, দালাল, মদ্যপ, ড্রিফ্টারের মতো সহকর্মীদের সাথেই আড্ডা দেন।
বুকাওস্কি লেখালেখির জন্য বিভিন্ন ধরনের কাজ করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে ডিশওয়াশার, ট্রাক ড্রাইভার এবং লোডার, ডাক পরিবহনকারী, প্রহরী, গ্যাস স্টেশন পরিচারক, স্টক বয়, গুদাম কর্মী, শিপিং কেরানি, ডাকঘর কেরানি, পার্কিং লট পরিচারক, রেড ক্রস আর্দালি এবং লিফট অপারেটর। তিনি কুকুরের বিস্কুট কারখানা, কসাইখানা, কেক এবং কুকি কারখানায়ও কাজ করেছেন এবং নিউ ইয়র্ক সিটির সাবওয়েতে পোস্টারও টাঙিয়েছেন।
কবিতা লেখা শুরুর দিকে সম্পাদকদের ভালো লাগা পেতে থাকা শুরু হলে ছোটকাগজ ‘নোমাডে’র সম্পাদককে ১৯৫৮ সালের সেপ্টেম্বরে এক চিঠিতে বুকাওস্কি লিখেন,
‘তুমি যে ৪টি কবিতা পছন্দ করেছো, তাতে আমি খুশি। এটা বেশ ভালো সংখ্যা এবং আগামী অনেকদিনের মধ্যে একটা ভালো অভিজ্ঞতা। হয় কবিতার ক্ষেত্র খুলে যাচ্ছে, না হয় আমি, না হয় আমরা দুজনেই। যাই হোক, এটা চমৎকার, এবং মাঝে মধ্যে সুন্দর অনুভূতিকে অবশ্যই আলিঙ্গন করতে হবে। [ . . ]’‘আমার সম্পর্কে, কবিতা লেখা শুরু করার সময় আমার বয়স বেশ বেশি বলে মনে হচ্ছে: গত ১৬ আগস্ট আমার বয়স ৩৮ বছর এবং আমি অনেক বেশি বয়স্ক বোধ করছি, দেখতে পাচ্ছি এবং অভিনয় করছি। প্রায় ১০ বছর ধরে শূন্য, আত্ম-প্ররোচিত, এবং বেশ অসুখী থাকার পর আমি গত কয়েক বছর ধরে কবিতা নিয়ে কাজ করছি, কিন্তু তার মুহূর্তগুলোও বাদ দেই না। আমি এমন কেউ নই যে অযথা অপচয়কে সম্পূর্ণ ক্ষতি হিসেবে দেখব - সবকিছুতেই সঙ্গীত আছে, এমনকি পরাজয়েও - কিন্তু একটি দাতব্য ওয়ার্ডে মৃত্যুশয্যায় শুয়ে থাকা আমাকে কিছুটা ধীর করে দিয়েছে, আমাকে চিন্তা করার জন্য পূর্ণবিরতি দিয়েছে। আমি নিজেকে কবিতা লিখতে দেখেছি: এক নরক অবস্থা। আমি আমার প্রথম দিকে ছোটগল্প নিয়ে কাজ করতাম, উইলিয়াম সারোয়ানের আবিষ্কারক হুইট বার্নেট এবং অন্যদের কাছ থেকে এবং তৎকালীন বিখ্যাত স্টোরি ম্যাগাজিনের প্রতিষ্ঠাতা থেকে বেশ উৎসাহ পেতাম। হুইট অবশেষে একটি নিয়েছিলেন - আমি তাকে মাসে ১৫-২০টি গল্প পাঠাতাম এবং যখন তারা ফিরে আসত, আমি সেগুলি ছিঁড়ে ফেলতাম - ১৯৪৪ সালে যখন আমি মিষ্টি, উগ্র ছিলাম এবং ২৪ বছর বয়সী ছিলাম। আমি ম্যাট্রিক্সে ৩-৪টি গল্প এবং পোর্টফোলিও নামক সেই সময়ের একটি আন্তর্জাতিক পর্যালোচনায় একটি সুযোগ পেয়েছিলাম, এবং তারপরে আমি কমবেশি সবকিছুই উড়িয়ে দিয়েছিলাম, কয়েক বছর আগে যখন আমি একচেটিয়াভাবে কবিতা লেখা শুরু করি। প্রথম বছর কেউ সাড়া দেয়নি এবং তারপরে আমি কুইক্সোট, হারলেকুইন, এক্সিস্টারিয়া, দ্য নেকেড ইয়ার, দ্য বেলোইট পোয়েট্রি জার্নাল, হিয়ারস, অ্যাপ্রোচ, দ্য কম্পাস রিভিউ এবং কুইকসিলভারে প্রকাশিত হয়েছিলাম (এবং এটি আমাদের আপডেট করে)। আমার লেখা ভবিষ্যতের প্রকাশনার জন্য ইনসার্ট, কুইকজোট, সেমিনা, ওলিভেন্ট, এক্সপেরিমেন্ট, হেয়ার্সে, ভিউস, দ্য কোয়ের্সিওয়ান রিভিউ, কোস্টলাইন, গ্যালো, দ্য সানফ্রন্সিকো রিভিউ নামের ছোটকাগজগুলোতে গৃহীত হয়েছে। হেয়ার্সে আগামী বছরের শুরুতে আমার কবিতা ‘ফ্লাওয়ার, ফিস্ট, এন্ড বেস্টিয়াল ওয়েইল’-এর একটি চ্যাপবুক প্রকাশ করছে... ছোটবেলায় আমি এল.এ সিটি কলেজে গিয়েছিলাম এবং সাংবাদিকতার একটি কোর্স করেছিলাম কিন্তু প্রতি ২-৩ দিন পর আমি অনেক খবরের কাগজ পড়েছি, খুব বেশি আগ্রহ ছাড়াই। প্রায় এক বছর আগে সেখানে নাইট স্কুলে ফিরে গিয়েছিলাম এবং কিছু শিল্প কোর্স, বাণিজ্যিক এবং অন্যথায়, কিন্তু তারপরও, তারা আমার জন্য খুব ধীর গতিতে এগিয়েছিল এবং খুব বেশি শ্রদ্ধা জানাতে চেয়েছিল। আমার কোনও নির্দিষ্ট প্রতিভা বা বাণিজ্য নেই, এবং আমি কীভাবে বেঁচে থাকব তা মূলত জাদুর ব্যাপার। এটাই - আপনি এখান থেকে আপনার প্রয়োজনীয় কয়েকটি লাইন নিতে পারেন।’
একই বছরে অ্যান্টনি লিনিককে বুকাওস্কি তার কবিতা লেখা সম্পর্কে আরেকটি চিঠিতে লিখেন,
আর যখন আমি লিখি তখন শব্দের প্রতি ভালোবাসার জন্য, রঙের প্রতি, ক্যানভাসে রঙ ছুঁড়ে ফেলার মতো, এবং প্রচুর মনোযোগ দিয়ে এবং এখানে সেখানে কিছুটা পড়ার পরে, আমি সাধারণত ঠিক হয়ে যাই, কিন্তু টেকনিক্যালি আমি জানি না কী হচ্ছে, আর আমারও কিছু যায় আসে না। আসুন আমরা ন্যায্য হই। আসুন আমরা ন্যায্য হই। আসুন আমরা ...’বুকাওস্কি চল্লিশটিরও বেশি কবিতা বই লিখেছেন। এর সঙ্গে গদ্য এবং উপন্যাস মিলিয়ে ষাটের বেশি বইয়ের লেখক তিনি। তার প্রথম কবিতার বই ‘ফ্লাওয়ার, ফিস্ট এবং বেস্টিয়াল ওয়েল’ (১৯৫৯)। সেসময় তার অনেক রচনাই এক নির্জন, পরিত্যক্ত বিশ্বের অনুভূতির দখলে থাকতো। আর ‘ইট ক্যাচেস মাই হার্ট ইন ইটস হ্যান্ডস’ (১৯৬৩) বইটি নিয়ে জন উইলিয়াম করিংটন বলেন, ‘অতুলনীয় কাজ। বুকাওস্কি সমসাময়িকদের চেয়ে গুণমানের দিক থেকেও প্রায় অতুলনীয়।
বুকাওস্কি তার শেষ উপন্যাস ‘পাল্প’ লেখার পরপরই লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত হয়ে সান পেড্রোতে ৯ মার্চ ১৯৯৪ সালে মারা যান। তখন তার বয়স ছিলো ৭৩ বছর। বৌদ্ধ ভিক্ষুরা তার শেষকৃত্য পরিচালনা করেন। তাকে র্যাঞ্চো পালোস ভার্দেসের গ্রিন হিলস মেমোরিয়াল পার্কে সমাহিত করা হয়।
জীবনকে বুকাওস্কি এমনভাবে যাপন করতেন যেন সেটাই শিল্প, পরে সেই জীবনকেই কবিতা ও গদ্যে ধরে ফেলতেন। একবার তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, লেখক হিসেবে সাফল্যের ক্রেডিট কাকে দেবেন? তিনি জবাব দেন, নৃশংস শৈশব, মদ, অর্ধডজন বাজে চাকরি, নারীপ্রেম, প্রায় সব কিছুর প্রতি ভয়, হঠাৎ পাওয়া ভাগ্য আর ঠান্ডা মাথায় বিপদের মুখোমুখি হওয়া ও নিজের পাশে দাঁড়ানো।
বুকাওস্কির বদরাগী বাবাই পরোক্ষভাবে তার কবি জীবনটা গড়ে দিয়েছেন। সত্তর দশকের দিকে বেলজিয়াম টিভির এক সাক্ষাৎকারে তাকে প্রশ্ন করা হয়, কেন আপনার কবিতায় এক নিষ্ঠুর মনুষ্যত্ব প্রকাশ পায়? বুকাওস্কি জবাব দেন, ‘আমার বাবা আমাকে লিখতে শিখিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন অসাধারণ সাহিত্য শিক্ষক। তিনি আমায় শিখিয়েছিলেন যন্ত্রণার মানে। আমায় মারতেন। বিনা কারণে। ৬ থেকে ১১ বছর অব্দি, প্রতি সপ্তাহে বাবা আমায় মারতেন, সপ্তাহে তিনবার। একটা চমড়ার কাটা দেওয়া বেল্ট দিয়ে মারতেন। সপ্তাহে তিনবার, ৬ থেকে ১১, কতগুলো মার হয় গুণে দেখুন তো।’
আরেক সাক্ষাৎকারে জিজ্ঞেস করা হয়, কোনো অনুশোচনা আছে কি না বুকাওস্কির জীবনে। তিনি বলেন, ‘না, বিশেষ করে আমার জীবনযাপনের ধরন নিয়ে কোন অনুশোচনা আমার নাই। বরং জীবন হলো জুয়া খেলার বিশাল খোলা প্রান্তর। আমি দশ বছর লেখালেখি ছেড়ে দিয়েছিলাম, কাটিয়েছি কঠিন দশ বছর- যেখানে শুধু মদ, হাসপাতাল, জেল, নারী, বাজে চাকরি, আর পাগলামি। এখনো কোনো রাতের ঘটনা মনে পড়লেই সাথে সাথে লিখি।’ তার মতে, লেখা সহজ, জীবন যাপন করা বরং কখনও কখনও কঠিন।
বুকাওস্কির মরণোত্তর জীবন সমানভাবে সমৃদ্ধ বলেই প্রমাণ হয়েছে। তার প্রকাশক, ‘ব্ল্যাক স্প্যারো বুকসে’র সম্পাদক জন মার্টিনের সাথে অনন্য সম্পর্কের কারণে, বুকাওস্কির বিশাল রচনা বছর বছর বই আকারে প্রকাশ হতে থাকে। ‘দ্য পিপল লুক লাইক ফ্লাওয়ার্স অ্যাট লাস্ট: নিউ পোয়েমস’ (২০০৮) এর মতো মরণোত্তর রচনাগুলি তার প্রথম সংকলনের মতো বিষয়গুলিকেই সম্বোধন করে। ‘নিউ ইয়র্কারে’র জন্য মরণোত্তর প্রকাশিত ‘স্লুচিং টুওয়ার্ড নির্ভানা’ (২০০৫) পর্যালোচনা করে সমালোচক অ্যাডাম কির্শ বলেন যে ‘অহংকার এবং অভিযোগের মিশ্রণ বুকাওস্কির কবিতার লজ্জাকে ঠিক ঠিক প্রতিফলিত করে, যা একই সাথে মানবতাবিরোধী এবং বন্ধুত্বপূর্ণ, আক্রমণাত্মকভাবে অশ্লীল এবং গোপনে সংবেদনশীল। কির্শ আরও বলেন, এগুলি বলিষ্ঠভাবে বর্ণনামূলক, উপাখ্যানের এক অফুরন্ত সরবরাহ থেকে সৃষ্ট যা সাধারণত কোন বার, কোন স্কিড-রো হোটেল, ঘোড়দৌড়, কোন বান্ধবী, বা এর যেকোনো ক্রমবিন্যাসের সাথে জড়িত।’
বুকাওস্কি লস অ্যাঞ্জেলসের নোংরা আন্ডারগ্রাউন্ড বার এবং রুমিং হাউসগুলোতে বসবাস করার সময় সচেতনভাবে তার চারপাশের জগৎকে আত্মস্থ করেছিলেন। লেখক এখানেই তাঁর জীবনের বেশিরভাগ সময় ব্যয় করেন আর আমেরেকিার নীচু শ্রেণীর জীবন সম্পর্কে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন। মাতাল, জুয়াড়ি এবং হতভাগ্যদের গল্প বলেন, যার মধ্যে তিনজনই ছিলেন তিনি। এগুলো মূলত যৌনতা, সহিংসতা এবং জীবনের অযৌক্তিকতা নিয়ে কাজ করে। তার ‘ইরেকশনস, ইজাকুলেশনস, এক্সিবিশনস এবং জেনারেল টেলস অফ অর্ডিনারি ম্যাডনেস’ (১৯৭২) প্রথম ছোটগল্প সংকলন। আর ‘হট ওয়াটার মিউজিক’ (১৯৮৩) এর গল্পের নায়করা সস্তা হোটেলে থাকেন এবং বুকাওস্কির মতোই সংগ্রামরত আন্ডারগ্রাউন্ড লেখক। উপন্যাসে বুকাওস্কির প্রধান আত্মজীবনীমূলক চরিত্র হলেন হেনরি চিনাস্কি, একজন আধো-আড়ালে থাকা তারই অলটার-ইগো। এ প্রসঙ্গে বলতে হয় বুকাওস্কির পুরো নাম ছিল হেনরি চার্লস বুকাওস্কি জুনিয়র। তার বন্ধুরা তাকে হ্যাঙ্ক নামে চিনত। বুকাওস্কি ‘পোস্ট অফিস’ (১৯৭১) এবং ‘হ্যাম অন রাই’ (১৯৮২) এর মতো উপন্যাসগুলিতে ‘ভাঙা মানুষ’ নিয়ে তার পরীক্ষা চালিয়ে যান, যা উভয় উপন্যাসকেই আত্মজীবনীমূলক করে তোলে। ‘লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস বুক রিভিউ’তে বেন রিউভেন ‘হ্যাম অন রাইয়ে’র প্রথম-পুরুষের স্মৃতিচারণকে কঠোর, প্রাণবন্ত, তীব্র, কখনও কখনও মর্মস্পর্শী, এবং প্রায়ই হাস্যকর বলেছেন।
অনেকে মনে করেন, বুকাওস্কির উপন্যাসগুলি আসলে কর্পোরেট আধিপত্যের জগতে একজন লেখক তথা কবির স্থানচ্যুতি এবং বিচ্ছিন্নতার অবমূল্যায়ন করা ব্যক্তিগত ইতিহাস। এই ব্যক্তিগত উপন্যাসগুলি আসলে এমন একটি গল্প যা তার করা উচিত ছিল না এমন এক পৃথিবীতে যা তাকে তা করতে বাধ্য করেছিল। এই গল্পগুলি একজন সাধারণ মানুষ শিল্পায়ন-উত্তর আমেরিকার অর্থনৈতিক কাঠামোর অতি জটিলতার মধ্যে কীভাবে আটকা পড়ে তার নাটকীয় পুনর্বিবেচনা।
গল্প উপন্যাসের ক্ষেত্রে প্রায়ই ডার্টি রিয়ালিজম নামে এক নির্দিষ্ট লেখার ধরনের সঙ্গে চার্লস বুকাওস্কির নাম জড়ানো হয়ে থাকে। কিছু লেখকের লেখা নিয়ে নিবেদিত সাহিত্য ম্যগাজিন গ্রান্টার এক সংখ্যায় ডার্টি রিয়ালিজমকে সেই লেখাগুলির সাথে সম্পর্কিত করা হয়েছে যা ‘সমসাময়িক জীবনের পেটের দিক নিয়ে লিখে থাকে - একজন স্বামী পরিত্যক্তা, একজন অবিবাহিত মা, একজন গাড়ি চোর, একজন পকেটমার, একজন মাদকাসক্ত সম্পর্কে লিখে থাকে- বিরক্তিকর বিচ্ছিন্নতার সাথে লিখে থাকে, মাঝে মাঝে তা কমেডির দিকে ঝুঁকে পড়ে। অবমূল্যায়িত, বিদ্রূপাত্মক, কখনও কখনও বর্বর, কিন্তু জোরালোভাবেই দয়াময়...’ বাফোর্ড তার বই ‘দ্য ডার্টি রিয়ালিজম ডুও: চার্লস বুকাওস্কি এন্ড রেমন্ড কার্ভার’ গ্রন্থে এ কথা লিখেছেন। মাইকেল হেমিংসন ডার্টি রিয়ালিজমের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের কথা উল্লেখ করেছেন যার চারপাশে এই বিশেষ কথাসাহিত্য আবর্তিত হয়। তার মতে, এরা হলো- অ্যালকোহল, ক্যান্সার, কাজ, নারী এবং কুৎসিত। এই পাঁচটি উপাদান একত্রিত করে ডার্টি রিয়ালিজমের কার্যকারিতাকে কল্পকাহিনীর একটি রূপ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা সাধারণত কুৎসিতের নান্দনিকতা ধারণ করে। তবে ডার্টি রিয়ালিজম সম্পর্কে প্রথমেই মনে রাখা উচিত যে এর একমাত্র নোংরা বিষয় হলো এটি সত্যের সাথে সম্পর্কিত। চার্লস বুকাওস্কির রচনায়ও এই উপাদানগুলির উল্লেখ পাওয়া যায়। এদিকে আমেরিকান সমাজ যা অর্থ এবং কর্পোরেট ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কারণেই সমৃদ্ধ হয় বলে বিশ^াস করা হয়। অথচ তা যে একই সাথে দারিদ্র্য এবং বেকারত্বের জন্ম দেয় তা কখনও বলা হয় না। কিন্তু বুকাওস্কির সাহিত্য এ কথা নির্দ্বিধায় বলে থাকে। তবে তার এ বিষয়গুলি এখন সহজেই তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির উল্লেখ করেও আলোচনা করা যেতে পারে। বুকাওস্কি আমেরিকান প্রশাসনের সচেতনা নিয়ে সবসময় সন্দিহান। যুদ্ধ এবং এর সাথে যুক্ত জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে হ্যাম অন রাই উপন্যাসের প্রধান চরিত্রটি লেখে:
‘কোনও ভালো যুদ্ধ বা খারাপ যুদ্ধ নেই। যুদ্ধের একমাত্র খারাপ দিক হল এর কাছে হেরে যাওয়া। সমস্ত যুদ্ধ উভয় পক্ষের তথাকথিত ভালো উদ্দেশ্যের জন্যই সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু কেবল বিজয়ীর উদ্দেশ্যই ইতিহাসের মহৎ উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে। কে সঠিক বা কে ভুল তা কোন বিষয়ই নয়, কার সেরা জেনারেল এবং উন্নত সেনাবাহিনী আছে তা-ই বিষয়!’
মাত্র ২৪ বছর বয়সে ‘স্টোরি’ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হওয়া সত্ত্বেও, বুকাওস্কি একজন এজন্টেকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, এই বিশ্বাসে যে তিনি লেখক হওয়ার জন্য প্রস্তুত নন এবং এখনও যথেষ্ট অভিজ্ঞ নন। ১৯৪৬ সালে জীবনের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি প্রকাশনা সাফল্যের অভাব এবং নিজেকে প্রচারে আত্ম-সন্দেহের কারণে তিনি লেখালেখির চেষ্টা বন্ধ করার এই সচেতন সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বলেন, ‘আমি হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম। আমি নিজেকে খারাপ লেখক ভেবেছিলাম বলে নয়। আমি কেবল ভেবেছিলাম যে লেখালেখি শেষ করার কোন উপায় নইে। ঘৃণার সাথে আমি লেখা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। মদ্যপান এবং নারীদের সাথে যৌনসঙ্গম আমার শিল্পের ধরন হয়ে ওঠে...’
এরপর দশ বছর টানা তিনি নিজেকে মদ্যপান এবং নারীদের মধ্যে নিমজ্জিত করেন। এবং প্রায়শই অনাহারের দ্বারপ্রান্তে থাকতে হতো তাকে; তার খাদ্যাভ্যাস ছিল মাঝে মাঝে দিনে মাত্র এক টুকরো রুটি। এসময় চেষ্টা করা বন্ধ রাখলেও, এমন কিছু মুর্হূত ছিল যখন লেখালেখি তাকে খুঁজে বেড়াতো। টাইপরাইটার প্রায়শই বন্ধক রাখা এবং ঘরে বিদ্যুৎ না থাকায়, তিনি মাঝে মাঝে চাঁদের আলোয় লিখতেন, ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে এবং পেনসিলের টুকরো ব্যবহার করে সংবাদপত্রের মার্জিন তার কথা দিয়ে পূরণ করতে বাধ্য হতেন। আত্মহত্যা এবং তার ভয়াবহ অস্তিত্বের মধ্যে আটকে থাকা তার সবচেয়ে খারাপ সময়েও, তিনি দাবি করেছিলেন যে তার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার চেয়ে বরং তার যন্ত্রণা সর্ম্পকে লেখার আকাঙ্ক্ষা তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। তিনি মনে করতেন, ‘হাল ছেড়ে দেওয়াটা ভালো নয়, অন্ধকারতম নরকের মধ্যেও সবসময় সামান্য আলো থাকে।’
বুকাওস্কির জীবনযাত্রা অবশেষে তার সাথে তাল মিলিয়ে চলে। ১০ বছর ধরে ব্যক্তিগত ধ্বংসের পর, রক্তক্ষরণজনিত আলসারে আক্রান্ত হওয়ার পর প্রায় মারাত্মক রক্তক্ষরণের ঘা তার মাঝে আবার লেখার তীব্র ইচ্ছা জাগিয়ে তোলে। বছরের পর বছর ধরে চেষ্টা না করার কারণে তার মনে প্রচুর অনুপ্ররেণা ও চাপ সৃষ্টি হয় এবং বিস্ফোরণের পর্যায়ে পৌছে যান।
বুকাওস্কির কাজ বিভিন্ন পাঠ, সংকলন এবং নির্বাচিত রচনায় সংগ্রহ এবং পুনঃসংগ্রহ হয়েছে। ‘রান উইথ দ্য হান্টেড’ (১৯৯৩) তার গল্প এবং কবিতার এক সংকলন। যখন এগুলি লেখা হয়েছিল, তখনই প্রকাশ হয়নি। বেঞ্জামিন সেগেডিন, ‘বুকলিস্টে’ বুকাওস্কির কাজ সম্পর্কে লিখেন, সৎ আত্ম-প্রতিকৃতির চেয়ে আত্ম-ধ্বংসের উদযাপন কম, এগুলো সম্মানের দ্বারপ্রান্তে থাকা একজন বহিরাগত হিসাবে তাকে তার সমস্ত কদর্যতায় প্রকাশ করে।’ পূর্বে অপ্রকাশিত রচনা প্রকাশ হয়েছিল ব্ল্যাক স্প্যারো প্রেস হতেই, ‘বেটিং অন দ্য মিউজ: পোয়েমস অ্যান্ড স্টোরিজ’ (১৯৯৬) নামে। ‘বুকলিস্টে’ রে ওলসন লিখেছেন, ‘তার গল্প এবং কবিতাগুলি অনায়াসে, আকর্ষণীয়ভাবে পাঠযোগ্য।’
১৯৫৯ সালের ৬ মার্চ অ্যান্টনি লিনিককে বুকাওস্কি লিখেন,
‘[ . . . ] আমার মনে হয় আমাদের অনেক কবি, সৎ, স্বীকার করবেন যে তাদের কোনও ইশতেহার নেই। এটি একটি বেদনাদায়ক স্বীকারোক্তি কিন্তু কবিতার শিল্প ... তার নিজস্ব ক্ষমতা বহন করে। আমি বলতে চাইছি না যে কবিতাকে অলস এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন জোকার হওয়া উচিত যারা শূন্যে শব্দ ছুঁড়ে ফেলে। কিন্তু একটি ভালো কবিতার অনুভূতির নিজস্ব কারণ আছে।
আমি নিউ ক্রিটিসিজম এবং নিউয়ার ক্রিটিসিজম এবং ব্লু গিটার স্কুল চিন্তাধারা, প্যারিস লিয়ারির ইংলিশ স্কুল, ইপোস এবং ফ্লেইমের স্ট্রং ইমেজ স্কুল ইত্যাদি সম্পর্কে সচেতন, তবে এগুলি সবই বিষয়বস্তুর চেয়ে শৈলী, আচরণ এবং পদ্ধতির দাবি, যদিও আমাদের এখানেও কিছু বিধিনিষেধ রয়েছে। তবে প্রাথমিকভাবে শিল্পের তার নিজস্ব অজুহাত আছে, এবং এটি হয় শিল্প, নয়তো অন্য কিছু। এটি হয় একটি কবিতা, নয়তো পনিরের একটা টুকরা।’
এদিকে মিকি রুর্ক অভিনীত ‘বারফ্লাই’ সিনেমার চিত্রনাট্য লিখেছিলেন বুকাওস্কি। ছবিটি ১৯৮৭ সালে মুক্তি পায়। এটি চব্বিশ বছর বয়সে বুকাওস্কির জীবনের তিন দিনের উপর আলো ফেলে। মাইকেল উইলমিংটন ‘লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসে’ বলেছেন, যাই হোক না কেন, বারফ্লাই এমন কিছু করে যা আরও বেশি চলচ্চিত্রের করা উচিত: এটি এক রুদ্ধ অঞ্চল উন্মুক্ত করে, একজন মানুষকে উন্মুক্ত করে। এর সবচেয়ে খারাপ দিক হলো বার রুমের দাম্ভিকতার তীব্রতা। কিন্তু সেরাটির মধ্যে রয়েছে সত্যের ধাক্কা এবং স্বপ্নের কঠোর মিষ্টি চুম্বন। ‘বারফ্লাই’ তৈরির অভিজ্ঞতা বুকাওস্কির উপন্যাস ‘হলিউড’ (১৯৮৯) এর ভিত্তি হয়ে ওঠে, যা উপন্যাসের নায়ক হেনরি চিনাস্কির লেখা ‘দ্য ড্যান্স অফ জিম বিম’ নামক একটি সিনেমার চিত্রনাট্য থেকে পর্দায় পৌঁছানোর হাস্যকর, জটিল পথের সন্ধান দেয়, যিনি এখন একজন বৃদ্ধ।
বুকাওস্কির কাজ তার পুরো ক্যারিয়ার জুড়ে বিতর্কের শিকার হয়েছিল। ১৯৬৯ সালে, তার উপর প্রথম সমালোচনামূলক গবেষণা প্রকাশ করেন ফক্স হিউগ, নাম- চার্লস বুকাওস্কি: অ্যা ক্রিটিক্যাল এন্ড বিবলিওগ্রাফিক্যাল স্টাডি। তিনি ‘দ্য নর্থ আমেরিকান রিভিউ’তে নারীদের প্রতি বুকাওস্কির মনোভাবের কথা উল্লেখ করে বলেন, যখন নারীরা আশেপাশে থাকে, তখন তাকে পুরুষের ভূমিকায় অভিনয় করতে হয়। আরেক সমালোচক বুকাওস্কির কথাসাহিত্যকে ‘নির্দিষ্ট এক নিষিদ্ধ পুরুষ কল্পনার বিশদ চিত্রায়ন: অবাধ অবিবাহিত, অলস, সমাজবিরোধী এবং সম্পূর্ণ স্বাধীন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা তিনি মাঝে মাঝে দাঙ্গাবাজ জনসাধারণের মাঝে কবিতা পাঠ এবং অশ্লীল দলীয় আচরণের মাধ্যমে বাস্তবায়িত করার চেষ্টা করেন। বেশ কয়েকজন সমালোচক সমর্থন করেন যে, বুকাওস্কি একজন পুরুষ এবং লেখক হিসেবে একজন নিন্দুক ছিলেন। তবে বুকাওস্কি নিন্দুক হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, ‘আমার উপর সর্বদা নিন্দুক হওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। আমি মনে করি নিন্দুকতা টক আঙ্গুর। আমি মনে করি নিন্দুকতা একটি দুর্বলতা।’
বুকাওস্কির জীবনের কাহিনী তার চিঠিপত্রের মাধ্যমে লিপিবদ্ধ করা হয়। ‘স্ক্রিম ফ্রম দ্য ব্যালকনি: সিলেক্টেড লেটার্স ১৯৬০-১৯৭০’ (১৯৯৪) এবং ‘রিচ ফর দ্য সান: সিলেক্টেড লেটার্স, ১৯৭৮-১৯৯৪’ (২০০২)- এই দুটি বইয়ে, যা কবির জীবনের শেষ বছরগুলি জুড়ে লেখা হয়। প্রকাশক, সম্পাদক, বন্ধু এবং সহ-কবিদের কাছে লেখা চিঠিতে, বুকাওস্কি সমালোচকদের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করেন, তাকে প্রথমে অনুপ্রাণিত করা লেখকদের প্রশংসা করেন এবং তার তিনটি প্রিয় বিষয় সম্পর্কে প্রচুর লিখেন: মদ্যপান, নারী এবং ঘোড়দৌড়ের ট্র্যাক। আর লেখক জীবনের শেষদিকে যাদের প্রশংসা ও স্বীকৃতিতে খুশি হয়েছেন তিনি বলা যায়, তারা হলেন গেরি স্নাইডার, জিম হ্যারিসন, ক্যামিলে প্যাগলিয়া, হেনরি মিলার, এবং জাঁ পল সার্ত্রে।
তবে নিন্দুকতার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় স্কলাররাও দীর্ঘদিন ধরে তার সম্পর্কে বলতে গেলে নীরবতা পালন করেন। তার ১৯৬০ সালে ছোটকাগজ ‘নোমাডে’র ৫/৬ সংখ্যায় সাহিত্য সমালোচনা নিয়ে দেওয়া তার এক ইশতেহারও এ জন্য দায়ী মনে করা হয়। এর শিরোনাম ছিল: আমাদের নিজস্ব সালোচকদের জন্য আহ্বান। এতে তিনি আমেরিকার আইভি লিগ বিশ^বিদ্যালয়ের গোষ্ঠীবদ্ধতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর আহবান জানিয়ে বলেন, ‘আমাদের লেখকদের নিজেদের জানা থাকা উচিত ক্যাম্পাস গ্রুপগুলির গ-ীবদ্ধ লক্ষ্য এবং এই ভূত-তাড়ানো উচিত - এবং এখানে আমাদের ন্যায্য হতে দিন: আমাদের অনেক মুদ্রণ কেবল বেশ ভালভাবে আ-কাড়াই নয় বরং খুবই বাজেভাবে পঠিতও (পাঠক হিসাবে অতি জঘন্যভাবে এবং লেখক হিসাবে অত্যন্ত নিন্দিতভাবেই পড়া হয়ে থাকে)।’
বুকাওস্কির আবির্ভাব হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী যুগে যখন আমেরিকা ও ইউরোপে বড়সরো সামাজিক পরিবর্তন এবং কাউন্টার কালচারের উত্থান ঘটছিল। কিউবান মিসাইল সংকট, বার্থ কন্ট্রোল পিল, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, সিভিল রাইট মুভমেন্ট, জন এফ কেনেডি হত্যা, মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র, রবার্ট কেনডি, চাঁদে অবতরণ, সাইকেডেলিয়া, উডস্টক, এলএসডি, মারিজুয়ানা, সেক্সুয়াল রেভ্যুলেশন, স্টুডেন্ট রিভোল্ট, ওম্যান লিবারেশন, হেইট-অ্যাশবুরি-সানফ্রানসিস্কো-সাউদার্ন ক্যলিফোর্নিয়া হিপ্পিস, রোনাল্ড রেগান, গে লিবারেশন, পাঙ্ক রক, এইডস, স্টক মার্কেট ম্যানিয়া, টুইন পিকস, সুমি, ওয়ার্ড প্রসেসরস- আমেরিকান সমাজ সচেতনতা এইসব তরঙ্গে উত্তাল আর বুকাওস্কির পথচলাকেও আন্দোলিত করে। এই সময়কালে প্রতিষ্ঠান বিরোধী আমেরিকান লেখকরা জীবনের অন্ধকার দিকগুলি অন্বেষণ করছিলেন। এ পথে এগোনো অনুরূপ লেখকদের মধ্যে রয়েছেন জন ফ্যান্টে, চার্লস উইলফোর্ড এবং নেলসন অ্যালগ্রেন। তাদের রচনা আধুনিক লেখকদের মতোই অস্তিত্বগত উদ্বেগ এবং আধুনিক জীবনের অযৌক্তিকতার দিকে গভীরভাবে নজর রেখেছিল। তবে বুকাওস্কির সাহিত্য এবং জীবনের উপর প্রভাব বেখেছে এমন সাহিত্যিকরা হলেন জন ফ্যান্টে, নুট হ্যামসুন, লুই-ফার্ডিনান্ড সেলিন, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, রবিনসন জেফার্স, হেনরি মিলার, ডিএইচ লরেন্স, ফিওদর দস্তয়েভস্কি, ইভান তুর্গেনেভ, ম্যক্সিম গোর্কি, ডু ফো, লি পো, এবং জেমস থারবার সহ অনেকে। এদিকে কাফকা নিজেকে যৌনভাবে অযোগ্য হিসেবে দেখলেও বুকোস্কি যৌনতাকে তার সমস্যার প্রতিকার হিসেবে ব্যবহার করতেন। তাদের মধ্যে পার্থক্য বিশাল হলেও একটি মিল ছিল, তা হলো, সমাজের প্রতি তাদের একই রকম ঘৃণার অনুভূতি। আর ষাটের দশকের কাউন্টার কালচার থেকেও শক্তি সঞ্চয় করেছেন বুকাওস্কি। গ্রেগরি করসো, জ্যাক মিশেলাইন, ডি. এ, লেভি, লি রয় জোনস, রবার্ট ক্রিলিÑ বিভিন্ন লেখায় তারা বিষয় হয়ে ওঠেছে। নানা বিতৃষ্ণা সত্বেও পরোক্ষভাবে তার সাহিত্য বিট জেনারেশনের দিকে প্রবহমান। স্বতঃস্ফূর্ত গদ্য রচনায় বুকাওস্কির নিজের শৈলী অর্জনের ক্ষেত্রে বিটসাহিত্যের সঙ্গে মিল রয়েছে। বিট লেখকদের মতোই তার গদ্যে মানব শরীর সম্পর্কে বর্ণনা-চিত্রায়ন, জান্তব কল্পনা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন, যা সাধারণত উপেক্ষা, এড়ানো কিংবা প্রত্যাখ্যান করা হয়ে থাকে। তিনি তার গদ্যে অজ্ঞানের গভীর থেকে খিঁচুনি-আক্ষেপের ধাঁচে শরীরের উগ্র, হিং¯্র, উদ্দাম ছবি, আকর্ষনীয়, উদ্ভট-অযৌক্তিক যতো শরীরী ছবি আঁকার লড়াই করে থাকেন। বাদ যায় না মলমূত্র ও এ সংক্রান্ত ছবিও। তিনিও টুকরো টুকরো সময়ের চেতনাকে ধরে রাখেন। শুধু ছোট ছাঁদের অক্ষরে কিংবা বড়ো ছাঁদের অক্ষরে বাক্য সাজানো ও তালিকা দেওয়া, অদ্ভুত বানানে শব্দ লেখা, বাক্যের মাঝে ফাঁকা রাখা, টাইপ সাইজ ছোট বড় করা, যতিচিহ্নের আকার, লুপ্তিচিহ্ন ব্যবহার সবমিলিয়ে যেনো বা তিনি বাক্য আঁকতে বসেছেন কিংবা শব্দকে চিত্রিত করতে চাইছেন। এসবই বিটের প্রভাব।
আর লস অ্যাঞ্জেলসের জীবনই বুকাওস্কির লেখার প্রিয় বিষয় ছিলো। ১৯৭৪ সালের এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘তুমি সারা জীবন এক শহরে থাকো, এবং রাস্তার মোড়ের প্রতিটি কুকুরের সাথেই তোমার পরিচয় এবং তাদের অর্ধেকের সাথেই তুমি ইতিমধ্যেই ঝামেলা করেছো। তোমার কাছে পুরো জমির বিন্যাস রয়েছে। তুমি কোথায় আছো তার একটি ছবি তোমার কাছে আছে.... আমি যখন থেকে লস অ্যাঞ্জেলেস-এ বড় হয়েছি, তখন থেকেই এখানে থাকার ভৌগোলিক এবং আধ্যাত্মিক অনুভূতি আমার কাছে সবসময়ই বিদ্যমান। এই শহরটি শিখে নিতে আমার অনেক সময় ব্যয় করেছি। আমি লস অ্যাঞ্জেলেস ছাড়া আর কোনও জায়গা দেখতে পাই না।’
২০০৬ সালের জুন মাসে, বুকাওস্কির সাহিত্য সংরক্ষণাগারটি তার বিধবা স্ত্রী ক্যালিফোর্নিয়ার সান মারিনোতে অবস্থিত হান্টিংটন লাইব্রেরিকে দান করেন। ‘ব্ল্যাক স্প্যারো’ প্রেস থেকে প্রকাশিত তার কাজের সমস্ত সংস্করণের কপি ওয়েস্টার্ন মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে রাখা হয়েছে। ২০০৩ সালে প্রকাশনা সংস্থাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তারা এই সংরক্ষণাগারটি কিনে নেয়।
বুকাওস্কির অর্ধেকেরও বেশি সংগ্রহ মরণোত্তর প্রকাশিত হয়েছে। মণোত্তর এ সংগ্রহগুলিকে ‘জন মার্টিনাইজড’ অর্থাৎ যাচাই ব্যর্থ হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ ওঠেছে সম্পাদকদের হাতে তার কবিতাগুলি অতি সম্পাদিত হয়েছে, যা বুকোস্কির জীবদ্দশায় লেখাগুলোতে ছিলো না। নরক এবং মদ্যপানের মতো থিমগুলিও ফেলে দেওয়া হয়েছে।
বিট জেনারেশনের হাত ধরে কাল্ট ফিগার হয়ে ওঠা বুকাওস্কি প্রসঙ্গে বাংলা সাহিত্যের কথা বলতে গেলে, পশ্চিমবঙ্গে মলয় রায়চৌধুরী, সন্দিপন চট্টোপাধ্যায়, সুবিমল মিশ্র, ফালগুনি রায়, অরুণেশ ঘোষ, বাসুদেব দাশগুপ্ত সহ হাংরি জেনারেশন সাহিত্যের কথা ভালো করেই মনে পড়বে। এসব লেখকের ওপর অ্যলেন গিনসবার্গ, লরেন্স ফার্লেংগেটি, উইলিয়ম এস বারোজসহ বিট জেনারেশনের অনেকের কথা ও প্রভাবের কথা জানা গেলেও কখনও বুকাওস্কির কথা কেন শোনা যায়নি, তা আশ্চর্য বটে। বিট কি ভারতে তাকে প্রমোট করেনি? মলয় রায়চৌধুরী ২০১৯ সালে এসে কেবল বুকাওস্কির তিন-চারটা কবিতা অনুবাদ করেছেন। বিট জেনারেশনের লেখকদের সাথে বিভিন্ন ছোট কাগজে এ কবিও প্রচুর লিখেছেন, তাদের লেখন-কৌশল থেকে নিজেকে সমৃদ্ধও করেছিলেন। বাংলাদেশে আব্দুল মান্নান সৈয়দের কিছু গল্পে এবং কাজল শাহনেওয়াজের ‘একটি সাধারণ বিকেল’ গল্পের কথাও মনে পড়বে। তবে তারা আদৌ তাকে পড়েছেন কিনা আমার জানা নেই।
চারপাশের ভদ্র লোকদের সাথে নিজেকে তুলনা করতে গিয়ে এক সাক্ষাৎকারে বুকাওস্কি বলেন, ‘মাঝে মাঝে আমি নিজেকে কোথাও দেখতে পাই... হঠাৎ... সুপারমার্কেটের এক বিরাট আয়নায়... ছোট ছোট খারাপ পোকার মতো চোখ... মুখ ক্ষতবিক্ষত, বাঁকানো, হ্যাঁ, আমি পাগল, পাগল, কী জগাখিচুড়ি... ত্বকের ছিটানো বমি... তবুও, যখন আমি “সুদর্শন” পুরুষদের দেখি তখন আমার মনে হয়, আমার ঈশ্বর, ঈশ্বর আমার, আমি খুশি যে আমি তাদের মতো নই।’ এই হলো তার শ্রেণী অবস্থান এবং আমেরিকান ড্রিমের সাথে তার বিপরীত দশা। তিনি আরও বলেন, ‘আমি প্রতিদিন আমার চারপাশে মানুষকে আততায়ীর হাতে নিহত হতে দেখি। আমি মৃতদের ঘরে, মৃতদের রাস্তায়, মৃতদের শহর দিয়ে হাঁটাহাটি করি; চোখ ছাড়া মানুষ, কণ্ঠস্বর ছাড়া মানুষ; বানানো অনুভূতি এবং মান-প্রতিক্রিয়া সম্পন্ন মানুষ; সংবাদপত্রের মস্তিষ্ক, টেলিভিশনের আত্মা এবং হাইস্কুল-ধারণায় বেড়ে ওঠা মানুষ।’ তিনি পাল্টা প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘একজন পুরুষের হত্যার ব্যাপারে আমি কীভাবে উদ্বিগ্ন হতে পারি, যেখানে প্রায় সকল পুরুষ, এমনকি নারীদেরও, শিশু অবস্থায় খাঁচা থেকে তুলে প্রায় সাথে সাথেই ম্যাশারে ভর্তা বানাতে ফেলে দেওয়া হয়?’
যাক শেষ করি। বস্তুত কবিতা ছিলো বুকাওস্কির বিবেক, সুস্থভাবে বেচেঁ থাকার উপায়, দৈনন্দিন ঘটনাবলীর তাৎক্ষণিক পুনরুদ্ধার আর ঐহিক ও একঘেয়ে বিষয়কে অসাধারণে রূপান্তরের পাথেয়। তার কবিতা, ছোটগল্প আর উপন্যাস, মানুষটির মতোই, মনে হয়, সহজ শ্রেণীবিভাগের চরম বিরোধী।
অনুবাদকের উৎসর্গ: কামরুল কমল, বৈকুম মঞ্জু এবং অর্ক অপু
চেষ্টা করো না, অপেক্ষা করো: বুকাওস্কির সাহিত্য সংগ্রাম
রথো রাফি
রথো রাফি




মন্তব্য