বন্ধু ঘুরতে গিয়েছে, চেক রিপাবলিকের প্রাগে৷ তারপর অবাক বিস্ময়ে লিখে পাঠাচ্ছে, ‘প্রাগ শহরের ক্যাফের নামও মেটামরফোসিস।’ কে না জানে কফি আমার কতখানি প্রিয়, আর কাফকা, সেতো আমার সব প্রেমিকের প্রতিযোগী৷ বন্ধু আরও লিখে পাঠাচ্ছে দ্রুত কফি খেতে হবে, তার হাতে ছুটির টিকেট। কিন্তু আমার মন সরে যাইতে থাকে কোথায় কোথায়, তার সাথে আমি পাল্লা দিয়ে ছুটতে পারিনা। আমার মন সরে যাইতে থাকে, তীব্র রঙের ফুলের দেশে৷ বন্ধু বিষ্ণু দে র লাইন ইমিটেইট করে লিখে পাঠায়,
ঝোড়ো হাওয়া ছোঁড়ে কালো কালো বুনো মেঘ চৈতী পূর্ণিমাকেআমি যে তোমায় ভালোবাসি সে কি তাই শুধু ওফেলিয়া?
ওফেলিয়া নির্বাক। ওফেলিয়ার এখন আর কান্না পায়না। ভালোবাসার গভীরে আর কি কি থাকতে পারে সেইসব ভেবে দেখার অবকাশ তার আর নেই। সংসার, সন্তান, কিংবা প্রেমিকের বুক থেকে আসা তীব্র শষ্যের ঘ্রাণে ওফেলিয়া এখন আর ডুবে যায় না৷ কিংবা কোনদিন কি আসলেই ডুবেছিল ওফেলিয়া?
যে ওফেলিয়া ডুবেছিল, আজ নাহয় তার গল্পই বলি৷ সেই ওফেলিয়ার প্রেমিকের নাম অরিত্র নয়, হ্যামলেট৷
ওফেলিয়ার মত বিষণ্ণ বালিকা আমি কোনদিন আর দেখিনি। সে ভালবেসেছিল হ্যামলেটকে। এই ভালোবাসার যদিও কোন প্রয়োজন ছিলনা গল্পে। শেক্সপিয়র প্রাসাদ ষড়যন্ত্র আর খুনের বদলা নিতে নিতে ওফেলিয়ার দিকে ফিরে তাকানোর সুযোগ পায়নায়৷ তবুও ওফেলিয়া হৃদয় ভরা এত প্রেম নিয়ে ঠিক কোনদিকে যাবে? একদিকে বাবার মৃত্যু যন্ত্রণা বুকে, অন্যপাশে প্রেমিকের অবিশ্বাস আর প্রত্যাখানের দোলাচলে সে দুলতে থাকে ক্রমাগত। ওফেলিয়ার প্রতি শেক্সপিয়র এতই উদাসীন ছিল যে তার ট্র্যাজেডিক মৃত্যুও ঘটে মঞ্চের বাইরে। যেন সমস্ত দৃশ্যপট আড়াল করে ওফেলিয়া ডুবে যাচ্ছে গহীন থেকে গহীনে৷ এই ডুবে যাওয়া দেখে মনে পড়ে
মৃত্যু কেবল মৃত্যুই ধ্রব সখা...।
যেন মৃত্যু ব্যতীত সেইখানে আর কিছু নাই। না প্রেমিকের প্রথম স্পর্শের স্মৃতি, না প্রেমিকের ছেড়ে যাওয়া, না মৃত বাবার মুখ, না যে শিশু কখনো ভূমিষ্ঠই হয়নাই তার নাম।
রক্তপিপাসু প্রমিককে ভালবেসে নিজের ভাগ্য বরণ করে নেয় ওফেলিয়া। যে প্রেমিকের বুকে ভালবাসা আর ক্ষমার চেয়ে প্রতিশোধ বড় তার প্রেমিকা ডুবে যাবে এইতো নিয়ম৷ হ্যা, ক্রিটিক করার সময় আমরা বলতেই পারি, ওইটা একটা প্রয়োজনীয় প্রতিশোধ। শেক্সপিয়র ঠিক প্লট টাকে এমন উপায়ে ডেকোরেট করেছে যেন মনে হয়, প্রতিশোধ ব্যতীত এইখানে আর দ্বিতীয় কোন পথ নাই৷ এবং এই প্রতিশোধের জন্য যদি ওফেলিয়া মরে যায়, হু কেয়ারস? স্বয়ং যদি মরে যায় হ্যামলেটও কি যায় আসে?
হ্যামলেটের মৃত্যু আর সিদ্ধান্তহীনতা আমার আজকের ভাবনার বিষয়বস্তু না। আমি আজ কেবল ভাবতে চাই ওফেলিয়া নিয়ে। মৃত্যুর আগে সে দেখেছিল কোন ভূত?
ওফেলিয়া সম্ভবত শেক্সপিয়রের সবচে সাবমিসিভ নারী চরিত্র। ওফেলিয়ার সুস্থ অবস্থার কথোপকথনেও মেনে নেবারই আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পাই। এমনকি যেটা সে কোনদিন মেনে নেবে বলে ভাবেইনাই, সেটাও সে মেনে নেয়।
Go to thy deathbed, he will never come again.
আমরা কে কবে মৃত্যুকে এইরূপে বরণ করতে প্রস্তুত থাকি?
তারপর ওফেলিয়া ডুবে যায়, ডুবে যেতে যেতে তার চোখে চিকচিক করতে থাকে অশ্রু। সেই অশ্রু সম্ভবত দ্রোহের না ক্ষমার। ক্ষমা পেয়েও তবুও হ্যামলেট কি কেঁদেছিল? মাঝেমধ্যে আমার মনে হয় হ্যামলেটকে আশ্রয় করে আমি লিখি আরেক ট্র্যাজেডি, যেইখানে ওফেলিয়া সংসার করবে অন্যকোন রাজপুত্রের সাথে। বহুদিন, বহুমাস আর বহুবছর পেরিয়ে যাবার পর মুখোমুখি দেখা হবে দুইজনের। হ্যামলেটের বুক ভেঙে যাবে তীব্র হাহাকারে। সেই দৃশ্যপটে আমি লিখব, ‘ওফেলিয়া আজ আর তোমার কেউ না, কিন্তু ওফেলিয়া তোমার কি না হইতে পারিত?’
আমি যে তোমায় ভালবাসি সে কি তাই শুধু, ওফেলিয়া?
আদিবা নুসরাত
আদিবা নুসরাত




মন্তব্য