.header-button .inner > span { font-size: 18px !important; } .header-button .inner i.fa { font-size: 40px !important; } .comment-form-message { background-color: #f4f4f4 !important; font-size: 14px !important; }

$type=ticker$count=12$cols=4$cate=0$sn=0$show=post

সালমান রুশদির মিডনাইটস চিলড্রেন (পর্ব ১) • বাংলা অনুবাদ: দীপ মন্ডল

সালমান রুশদির মিডনাইটস চিলড্রেন (পর্ব ১) • বাংলা অনুবাদ: দীপ মন্ডল
পুস্তক ১ • অধ্যায় ১ • পর্ব ১

ছিদ্রযুক্ত চাদর 

THE PERFORATED SHEET

আমার জন্ম বম্বে শহরে... সে এক অনেক কাল আগের কথা। নাহ্, এভাবে বললে ঠিক হবে না, তারিখটাকে তো আর এড়িয়ে যাওয়ার জো নেই: ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট ডাক্তার নার্লিকারের নার্সিং হোমে আমি ভূমিষ্ঠ হলাম। আর সময়টা? সময়েরও একটা বড়সড় ভূমিকা আছে বৈকি। তাহলে খুলেই বলি: সময়টা ছিল রাত। না, আরও একটু খোলসা করে বলা দরকার... সত্যি বলতে কী, ঠিক কাঁটায় কাঁটায় মধ্যরাত। আমি যখন এলাম, ঘড়ির কাঁটা দুটো যেন সসম্ভ্রমে নমস্কার করার ভঙ্গিতে একে অপরের সঙ্গে হাত জোড় করে দাঁড়িয়েছে। হেঁয়ালি থাক, সবটা স্পষ্ট করেই বলি: ঠিক যে-মুহূর্তে ভারত স্বাধীন হলো, সেই মাহেন্দ্রক্ষণেই এই দুনিয়ায় আমি ছিটকে এসে পড়লাম। চারদিকে একটা বিস্ময়ের ফিসফাস। জানলার বাইরে তখন আতশবাজির রোশনাই, আর মানুষের উপচে-পড়া ভিড়। কয়েক সেকেন্ড পেরোতে না পেরোতেই বাবা তাঁর পায়ের বুড়ো আঙুলটা ভেঙে বসলেন; কিন্তু সেই অমোঘ মুহূর্তে আমার কপালে যা লেখা হচ্ছিল, তার তুলনায় বাবার ওই চোট পাওয়াটা ছিল নিতান্তই তুচ্ছ একটা ব্যাপার। কারণ, নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে নমস্কার করতে থাকা ওই ঘড়িগুলোর অজানা জাদুকরী ইঙ্গিতে, আমি এক রহস্যময় উপায়ে ইতিহাসের সঙ্গে হাতকড়ায় বাঁধা পড়ে গেলাম,—আমার নিয়তি এই দেশের ভাগ্যের সঙ্গে এমন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেল যা আর কখনো ছিন্ন হওয়ার নয়। এর পরের টানা তিন দশক, তা থেকে আর কোনো রেহাই ছিল না আমার। জ্যোতিষীরা আমার আসার ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল, খবরের কাগজগুলো আমার আগমন নিয়ে মাতামাতি করেছিল, এমনকি রাজনীতির চাঁইরাও আমার অস্তিত্বে সিলমোহর দিয়েছিল। অথচ এই গোটা ব্যাপারে আমার নিজের এতটুকুও কিছু বলার উপায় ছিল না। আমি, সালিম সিনাই, যাকে কিনা পরে লোকে কত নামেই না ডেকেছে—নাকু, দাগ-মুখো, টাকলু, শোঁকা-রাম, বুদ্ধ, এমনকি চাঁদের কণাও। সেই আমি এমনভাবে নিয়তির জালে জড়িয়ে গেলাম, যা কিনা ভালো সময়েও বেশ বিপজ্জনক এক গেরো। আর সত্যি বলতে কী, তখন নিজের নাকটা মোছার ক্ষমতাটুকুও আমার ছিল না।

   সময় এখন ফুরিয়ে আসছে। আমার আর কোনো প্রয়োজন নেই তার কাছে। শিগগিরই আমার বয়স হবে একত্রিশ। হয়তো হবে। আমার এই ভেঙে পড়া, বহু ব্যবহারে জীর্ণ শরীরটা যদি সেই ফুরসত দেয়। কিন্তু নিজের জীবন বাঁচাতে পারব এমন কোনো আশা আমার নেই। এমনকি সহস্র এক আরব্য রজনীর একটি রাতও যে আমার বরাতে জুটবে, সে-ভরসাও আমি করতে পারি না। আমাকে খুব দ্রুত কাজ সারতে হবে, শেহ্‌রজাদের চেয়েও দ্রুতগতিতে, যদি শেষ পর্যন্ত আমার অস্তিত্বের কোনো অর্থ—হ্যাঁ, অর্থই—আমাকে প্রতিষ্ঠা করতে হয়। আমি অকপটেই স্বীকার করছি: পৃথিবীর আর সবকিছুর চেয়ে, আমি এই অর্থহীনতাকেই সবচেয়ে বেশি ভয় পাই।

   আর কত যে গল্প বলার আছে, শেষ কোথায় তার। এত এত কাহিনি, বড়ো কম কিছু নয়! একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অজস্র জীবন, ঘটনা, অলৌকিক সব কাণ্ডকারখানা, কত জায়গার কথা আর কত কত যে গুঞ্জন—সব মিলেমিশে একাকার। অসম্ভব আর নিছক সাদামাটা আটপৌরে জীবনের এমন এক ঘন বুনন! আমি যেন অসংখ্য মানুষের জীবন গিলে খাওয়া এক সত্ত্বা। আমাকে চিনতে গেলে, নেহাতই এই একা আমাকে জানতে গেলে, আপনাদেরও ওই সবটা একইরকম ভাবে হজম করতে হবে। গিলে-খাওয়া সেই অগুনতি মানুষের ভিড় আমার ভেতরে এখন রীতিমতো ঠেলাঠেলি আর ধাক্কাধাক্কি জুড়ে দিয়েছে; তাদের মধ্যে পথ চিনে চলি কেবলমাত্র স্মৃতির সরণি বেয়ে। একটি বড়সড় সাদা বিছানার চাদর, যার ঠিক মাঝখানটায় প্রায় সাত ইঞ্চি মাপের একটা গোলমতো করে ফুটো কাটা—শুধু সেই চাদরটার স্মৃতিকে সম্বল করে, সেই ফুটোওয়ালা, ক্ষতবিক্ষত চৌকো কাপড়ের টুকরোটার স্বপ্ন বুকে আঁকড়ে ধরে আমাকে আমার জীবনটাকে নতুন করে সাজানোর কাজ শুরু করতে হবে। কারণ ওটাই আমার রক্ষাকবচ, আমার চিচিং-ফাঁক। শুরু করতে হবে ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে, যেখান থেকে আমার জীবনের আসল গল্পের শুরু; আমার এই ঘড়ির কাঁটায় বাঁধা, পাপ-কলঙ্কিত জন্মের মতো এমন জলজ্যান্ত একটা ঘটনারও ঠিক বত্রিশ বছর আগে থেকে।

   (প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি, চাদরটাতেও কিন্তু দাগ লেগে আছে—পুরোনো, ফ্যাকাসে হয়ে আসা লাল রঙের তিনটে ফোঁটার দাগ। কোরান শরিফে যেমনটা বলা হয়েছে: পাঠ করো তোমার প্রভুর নামে, যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন জমাট বাঁধা রক্ত থেকে।)

পুরোনো দিনের কাশ্মীর
পুরোনো দিনের কাশ্মীর

১৯১৫ সালের বসন্তের প্রথম দিনগুলোর এক কাশ্মীরি সকালে আমার দাদু আদম আজিজ নমাজ পড়তে গিয়ে বরফে-জমাট-বাঁধা একটা শক্ত মাটির ঢেলার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়লেন, আর তাঁর নাকে লাগল বেজায় চোট। বাঁ দিকের নাক থেকে টুপ করে ঝরে পড়ল তিন ফোঁটা রক্ত, আর সেই কনকনে হিমেল হাওয়ায় পলকের মধ্যে জমাট বেঁধে গিয়ে চোখের সামনে জায়নামাজের ওপর এমনভাবে পড়ে রইল, যেন আস্ত তিনটে চুনি পাথর। সামলাতে না পেরে পিছন দিকে একটু ঝুঁকে গিয়ে আবার মাথা তুলে হাঁটু গেড়ে সোজা হয়ে বসতেই তিনি টের পেলেন, তাঁর চোখে যে পানিটা এসে গিয়েছিল, সেটাও এর মধ্যে জমে শক্ত হয়ে গেছে; আর ঠিক সেই মুহূর্তে, চোখের পাপড়ি থেকে অবজ্ঞার ভঙ্গিতে সেই হিরের টুকরোগুলো ঝেড়ে ফেলতে ফেলতে তিনি মনে মনে স্থির করে ফেললেন, কোনো ঈশ্বর বা কোনো মানুষের জন্য তিনি আর কখনও এই মাটি চুম্বন করবেন না। কিন্তু এই প্রতিজ্ঞার ফলে তাঁর ভেতরে মস্ত একটা গর্ত তৈরি হয়ে গেল, তাঁর সত্তার ভেতরের কোনো এক জরুরি কুঠুরিতে তৈরি হলো এক বিরাট শূন্যতা। এই শূন্যতাই তাঁকে নারী ও ইতিহাসের সামনে দুর্বল করে দিল। সদ্য সদ্য ডাক্তারি পাশ করলেও প্রথমে তিনি এই ব্যাপারটা ঘুণাক্ষরে টের পাননি। তিনি উঠে দাঁড়ালেন, তারপর জায়নামাজটাকে একটা মোটা চুরুটের মতো গোল করে পাকিয়ে নিয়ে ডান বগলে চেপে ধরলেন। আর তারপর তাঁর সেই, হিরে-বিহীন স্বচ্ছ দুই চোখ দিয়ে গোটা উপত্যকার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন।

পৃথিবীটা যেন নতুন হয়ে উঠল। গোটা শীতকালটা বরফের ডিমের খোসার ভেতর কাটানোর পর, উপত্যকাটা যেন পাখির ছানার মতো ঠোঁট দিয়ে খোলস ভেঙে বাইরের এই খোলা আলো-হাওয়ায় বেরিয়ে এসেছে—ভিজে ভিজে আর হলদেটে একখানা রূপ নিয়ে। নতুন ঘাসগুলো তখনো মাটির তলায় ঘাপটি মেরে ঠিক সময়ের অপেক্ষায় দিন গুনছে; আর পাহাড়গুলোও যেন গরমের মরশুম কাটাতে যেন তাদের নিজেদের শৈল-নিবাসের দিকে ক্রমশ রওনা হয়েছে। (শীতকালে অবশ্য ছবিটা হত অন্যরকম। বরফের চাপে উপত্যকাটা যখন আড়ষ্ট হয়ে কুঁকড়ে থাকত, তখন এই পাহাড়গুলোই আরও কাছাকাছি সরে এসে হ্রদ-লাগোয়া শহরটার চারপাশে ক্রুদ্ধ চোয়ালের পাশবিক দাঁত খিঁচিয়ে ঘিরে ধরত।)

সেইসব দিনে রেডিয়োর উঁচু টাওয়ারটা বসেনি, আর খাকি পাহাড়ের গায়ে ছোট্ট একটা কালো ফোসকার মতো লেগে থাকা শঙ্করাচার্য মন্দিরটাই তখনও শ্রীনগরের রাস্তাঘাট আর হ্রদের ওপর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকত। সেই দিনগুলোতে হ্রদের ধারে ফৌজি ছাউনি ছিল না, সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলা ছদ্মবেশী ট্রাক আর জিপের অন্তহীন সারি এসে পাহাড়ি সরু রাস্তাগুলো আটকে দিত না, বারামুলা বা গুলমার্গ ছাড়িয়ে পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে সৈন্যরাও লুকিয়ে থাকত না। সেইসব দিনগুলোতে পুলের ছবি তুললে গুপ্তচর সন্দেহে কোনো পর্যটককে গুলি খেতে হতো না, আর হ্রদের পানিতে ভাসমান ইংরেজ সাহেবদের হাউসবোটগুলো ছাড়া, প্রতি বসন্তে তার নিজেকে নতুন করে সাজিয়ে তোলা সত্ত্বেও, উপত্যকাটা মোগল আমল থেকে বলতে গেলে প্রায় বদলায়ইনি; কিন্তু আমার দাদুর চোখ—তাঁর শরীরের বাকি সবকিছুর মতোই যার বয়স তখন পঁচিশ—সবকিছুকে দেখছিল অন্যভাবে... আর তাঁর নাকে তখন সুড়সুড়ি শুরু হয়েছে।

 আমার দাদুর ওই বদলে-যাওয়া দৃষ্টির পেছনের রহস্যটা এবার খোলসা করা যাক: তিনি বাড়ি থেকে দূরে পাঁচ-পাঁচটা বছর, পাঁচটা বসন্ত কাটিয়ে এসেছেন। (জায়নামাজের একটা আচমকা ভাঁজের নিচে ঘাপটি মেরে থাকা মাটির সেই ঢেলাটার উপস্থিতি যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেন, আসলে তা ছিল নেহাতই একটা অনুঘটক।) এখন দেশে ফিরে তিনি চারপাশটা দেখছেন তাঁর ওই বিদেশ-ঘোরা চোখে। দৈত্যাকার দাঁতের মতো সারি সারি পাহাড়ে-ঘেরা ছোট্ট উপত্যকাটার সৌন্দর্যের বদলে, তাঁর চোখে ধরা পড়ছিল এর সংকীর্ণতা, দিগন্তরেখার ওই প্রায়-ছুঁয়ে-থাকা নৈকট্য; আর নিজের বাড়িতে ফিরেও নিজেকে আষ্টেপৃষ্ঠে বন্দি মনে হওয়ায় তাঁর বেশ মন খারাপ হলো। কোনো এক অজানা কারণে তাঁর এ-ও মনে হচ্ছিল, যেন এই আবাল্য পরিচিত পুরোনো জায়গাটা তাঁর এমন শিক্ষিত হয়ে, গলায় স্টেথোস্কোপ ঝুলিয়ে ফিরে আসাকে মোটেই ভালো চোখে দেখছে না। রীতিমতো ক্ষুব্ধ হয়ে আছে। শীতের বরফের তলায় এই উপত্যকা এতকাল বেশ নির্লিপ্ত আর শীতল ছিল ঠিকই, কিন্তু এখন আর কোনো সন্দেহ রইল না; জার্মানিতে কাটিয়ে আসা বছরগুলো তাঁকে যেন এক চরম প্রতিকূল পরিবেশে ফিরিয়ে এনেছে। এর অনেক অনেক বছর পর, তাঁর ভেতরের সেই শূন্য গর্তটা যখন ঘৃণায় একেবারে বুজে আসবে, আর পাহাড়চূড়ার ওই মন্দিরের কালো পাথরের দেবতার থানে তিনি নিজেকে উৎসর্গ করতে আসবেন, তখন তিনি এই ভূস্বর্গে কাটানো তাঁর ছোটোবেলার বসন্তগুলোকে মনে করার চেষ্টা করবেন—সেই সময়কার কথা—যখন বিদেশযাত্রা, মাটির ঢেলা আর ফৌজি ট্যাঙ্ক এসে সবকিছু এলোমেলো করে দেয়নি।

 যে ভোরে, জায়নামাজের দস্তানা-পরা উপত্যকাটা তাঁর নাকে সপাটে এক ঘুসি কষিয়ে দিল, সেদিনও তিনি এমন একটা অদ্ভুত ভান করার চেষ্টা করছিলেন যে, আসলে কিছুই পালটায়নি। তাই ভোর সওয়া চারটের কনকনে হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডায় উঠে, নিয়মমাফিক অজু সেরে, পোশাক-আশাক পরে তিনি মাথায় চাপিয়েছিলেন তাঁর বাবার সেই আস্ত্রাখান টুপিটা; তারপর চুরুটের মতো গোল করে পাকানো জায়নামাজটা বগলদাবা করে তাঁদের পুরোনো অন্ধকার বাড়িটার সামনের হ্রদ-লাগোয়া ছোট্ট বাগানটায় গিয়ে, নরম ঘাসের চাপড়ার ভেতর লুকিয়ে থাকা মাটির সেই ঢেলাটার ওপর বিছিয়ে দিয়েছিলেন। পায়ের তলার মাটিটা কেমন যেন ছলনাময় নরম ঠেকল তাঁর কাছে, আর একইসঙ্গে সেটা তাঁকে করে তুলল সংশয়ী আর অসতর্ক। ‘পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে…’ —বইয়ের মতো বুকের সামনে দু-হাত সামনে জোড় করে বলা এই প্রারম্ভিক দোয়াটা তাঁর মনের একটা অংশকে আরাম দিলেও, অন্য আরেকটা বৃহত্তর অংশকে অস্বস্তিতে ফেলে দিল— ‘...যাবতীয় প্রশংসা সেই আল্লাহর, যিনি এই দিনদুনিয়ার প্রভু…’ —কিন্তু সেই মুহুর্তে তাঁর মাথায় জাঁকিয়ে বসল হাইডেলবার্গ; চোখের সামনে ভেসে উঠল ইনগ্রিড, একদা ক্ষণিকের জন্য তাঁর হয়ে ওঠা সেই ইনগ্রিড, মক্কার দিকে মুখ ফিরিয়ে তাঁর এই তোতাপাখির মতো বুলি আওড়ানোর দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে তার মুখে কেমন ব্যঙ্গের ছাপ; এই তো তাঁদের বন্ধু অস্কার আর ইলসে লুবিন, তাদের সবরকম নৈরাজ্যবাদী মতাদর্শ আর বিরোধিতার বুলি দিয়ে তাঁর এই প্রার্থনাকে কেমন বিদ্রুপ করছে— ‘...যিনি পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু, শেষ বিচারের দিনের মালিক!...’ —সেই হাইডেলবার্গ, যেখানে ডাক্তারি আর রাজনীতির পাশাপাশি তিনি এ-ও শিখেছিলেন যে, রেডিয়ামের মতোই ভারতবর্ষকেও নাকি ইওরোপীয়রাই ‘আবিষ্কার’ করেছিল; এমনকি ভাস্কো-ডা-গামাকে নিয়ে অস্কারের সে কী মুগ্ধতা, আর এটাই শেষমেশ আদম আজিজকে তাঁর বন্ধুদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল—তাদের ওই ধারণাটা যে, তিনি কোনো না কোনোভাবে তাদেরই পূর্বপুরুষদের একটা আবিষ্কার মাত্র— ‘...আমরা কেবল তোমারই ইবাদত করি, আর কেবল তোমার কাছেই সাহায্য চাই…’ —তাই এখন, মাথার ভেতর তাদের এই প্রবল উপস্থিতি সত্ত্বেও, তিনি চেষ্টা করছিলেন নিজের সেই পুরোনো সত্তাটার সঙ্গে নিজেকে আবার মিলিয়ে দিতে, যে-সত্তাটা এদের সমস্ত প্রভাবকে দূরে সরিয়ে রাখে ঠিকই, কিন্তু নিজের যা যা জানার কথা তার সবটাই সে জানে; যেমন ওই আত্মসমর্পণের ব্যাপারটা, যেমন এই মুহুর্তে তিনি যেটা করছেন, তার তাৎপর্য। পুরোনো স্মৃতির ওপর ভর করে তাঁর হাতদুটো কেমন শূন্যে ভেসে উঠল, কানের লতিতে চেপে-বসা বুড়ো আঙুল, বাকি আঙুলগুলো খুলে রাখা, আর সেই অবস্থাতেই তিনি কেমন করে নতজানু হলেন— ‘...আমাদের সরল পথ দেখাও, তাদের পথ, যাদের প্রতি তুমি অনুগ্রহ করেছ…’ কিন্তু লাভ হল না, তিনি আটকে পড়লেন বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের এক অদ্ভুত দোলাচলে, আর সবটা কেমন একটা প্রহসনের মতো মনে হতে লাগল— ‘...তাদের পথ নয়, যারা তোমার গজব কুড়িয়েছে, কিংবা যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে।’ আমার দাদু মাটির দিকে তাঁর কপালটা নোয়ালেন। সামনের দিকে তিনি ঝুঁকতেই, জায়নামাজে ঢাকা মাটিটাও যেন বাঁক খেয়ে তাঁর দিকে উঠে এল। এবার সেই মাটির ঢেলাটার খেল দেখানোর পালা। ইলসে-অস্কার-ইনগ্রিড-হাইডেলবার্গের পাশাপাশি উপত্যকা-আর-ঈশ্বরের দিক থেকে আসা এক সম্মিলিত তিরস্কারের মতো তা সজোরে আছড়ে পড়ল তাঁর নাকের ডগায়। তিন ফোঁটা রক্ত ঝরে পড়ল। আর সেখানে তৈরি হলো চুনি আর হিরে। আমার দাদু টলতে টলতে উঠে দাঁড়ালেন আর মনে মনে একটা সংকল্প করলেন। খানিক স্থির হলেন। চুরুটের মতো করে গোটালেন জায়নামাজ। হ্রদের ওপারে দৃষ্টি মেললেন। আর চিরকালের জন্য ছিটকে গেলেন সেই দোটানার জগতে, যেখানে এমন এক ঈশ্বরের উপাসনা করা অসম্ভব যাঁর অস্তিত্বকে পুরোপুরি অবিশ্বাসও করা যায় না। এক স্থায়ী পরিবর্তন: একটা শূন্যতা।

আরো পড়ুন: [‘মধ্যরাতের সন্তানেরা’ উপন্যাসের ভূমিকা]

মধ্যরাতের সন্তানেরা
সালমান রুশদি
অনুবাদ: দীপ মন্ডল


মন্তব্য

BLOGGER: 2
  1. পড়ে ফেললাম। পরের কিস্তির অপেক্ষায়

    উত্তরমুছুন
  2. নবীন কুমার রায়২৪ জুলাই, ২০২৬ এ ১২:০৭ AM

    সারাজীবন বইটার নাম আর সামারি পড়ে গেলাম৷ এবার পড়তে সুযোগ হলো৷ ধন্যবাদ ভাই৷
    অনুবাদও প্রাঞ্জল

    উত্তরমুছুন
মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা পাঠ করুন।

অনুবাদ আত্মজীবনী আর্ট-গ্যালারী আলোকচিত্র ই-বুক ইচক দুয়েন্দে ইশতেহার উৎপলকুমার বসু উপন্যাস ঋত্বিক-ঘটক কবিতা কবিতায় কুড়িগ্রাম কর্মকাণ্ড কার্ল মার্ক্স গল্প গিন্সবার্গ চার্লস বুকাওস্কি ছড়া জার্নাল জীবনী দশকথা দিনলিপি পাণ্ডুলিপি পুনঃপ্রকাশ পোয়েটিক ফিকশন প্রতিবাদ প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা প্রবন্ধ প্রিন্ট সংখ্যা বই বর্ষা সংখ্যা বসন্ত বিক্রয়বিভাগ বিবিধ বিবৃতি বিশেষ বুলেটিন বৈশাখ ভাষা-সিরিজ ভিডিও মাসুমুল আলম মুক্তগদ্য মে দিবস যুগপূর্তি রিভিউ লকডাউন শম্ভু রক্ষিত শাহেদ শাফায়েত শিশুতোষ সন্দীপ দত্ত সম্পাদকীয় সাক্ষাৎকার সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ সৈয়দ সাখাওয়াৎ স্মৃতিকথা হেমন্ত
নাম

অনুবাদ,62,আত্মজীবনী,27,আর্ট-গ্যালারী,2,আলোকচিত্র,1,ই-বুক,7,ইচক দুয়েন্দে,23,ইশতেহার,2,উৎপলকুমার বসু,26,উপন্যাস,2,ঋত্বিক-ঘটক,4,কবিতা,348,কবিতায় কুড়িগ্রাম,7,কর্মকাণ্ড,17,কার্ল মার্ক্স,1,গল্প,85,গিন্সবার্গ,2,চার্লস বুকাওস্কি,40,ছড়া,1,জার্নাল,6,জীবনী,7,দশকথা,25,দিনলিপি,1,পাণ্ডুলিপি,11,পুনঃপ্রকাশ,23,পোয়েটিক ফিকশন,1,প্রতিবাদ,1,প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা,4,প্রবন্ধ,190,প্রিন্ট সংখ্যা,5,বই,4,বর্ষা সংখ্যা,1,বসন্ত,15,বিক্রয়বিভাগ,21,বিবিধ,3,বিবৃতি,1,বিশেষ,26,বুলেটিন,4,বৈশাখ,1,ভাষা-সিরিজ,5,ভিডিও,1,মাসুমুল আলম,35,মুক্তগদ্য,45,মে দিবস,1,যুগপূর্তি,6,রিভিউ,5,লকডাউন,2,শম্ভু রক্ষিত,2,শাহেদ শাফায়েত,25,শিশুতোষ,1,সন্দীপ দত্ত,14,সম্পাদকীয়,20,সাক্ষাৎকার,25,সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ,18,সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ,55,সৈয়দ সাখাওয়াৎ,33,স্মৃতিকথা,15,হেমন্ত,1,
ltr
item
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন: সালমান রুশদির মিডনাইটস চিলড্রেন (পর্ব ১) • বাংলা অনুবাদ: দীপ মন্ডল
সালমান রুশদির মিডনাইটস চিলড্রেন (পর্ব ১) • বাংলা অনুবাদ: দীপ মন্ডল
আমার জন্ম বম্বে শহরে... সে এক অনেক কাল আগের কথা। নাহ্, এভাবে বললে ঠিক হবে না, তারিখটাকে তো আর এড়িয়ে যাওয়ার জো নেই: ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট ডাক্তার নার
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEgeRgp7MV3MVjqdWQPggKmrClfDaNWkTe904uIJl0sgQrdxlrfbiRislYW-ZvIBYZwiH1DRyUuKu7h9sjp1t6n5ZK7LCabxeNkcRaAu3lEsXyiE3ArUMz-1EWiStFZ4cm_O5bNsMWBk9mwLwPtNZ6aW8c0AgehsYz0lXOZ-0CG68AgShSTQkWU-wGvxrHs/s1600/%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%A1%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%9F%E0%A6%B8%20%E0%A6%9A%E0%A6%BF%E0%A6%B2%E0%A6%A1%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%A8%20%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A8%20%E0%A6%B0%E0%A7%81%E0%A6%B6%E0%A6%A6%E0%A6%BF%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%81%20%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%9F%E0%A6%B2%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%97.png
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEgeRgp7MV3MVjqdWQPggKmrClfDaNWkTe904uIJl0sgQrdxlrfbiRislYW-ZvIBYZwiH1DRyUuKu7h9sjp1t6n5ZK7LCabxeNkcRaAu3lEsXyiE3ArUMz-1EWiStFZ4cm_O5bNsMWBk9mwLwPtNZ6aW8c0AgehsYz0lXOZ-0CG68AgShSTQkWU-wGvxrHs/s72-c/%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%A1%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%9F%E0%A6%B8%20%E0%A6%9A%E0%A6%BF%E0%A6%B2%E0%A6%A1%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%A8%20%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A8%20%E0%A6%B0%E0%A7%81%E0%A6%B6%E0%A6%A6%E0%A6%BF%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%81%20%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%9F%E0%A6%B2%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%97.png
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন
https://www.bindumag.com/2026/07/midnights-children-1.html
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/2026/07/midnights-children-1.html
true
121332834233322352
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts আরো Readmore উত্তর Cancel reply মুছুন By নী PAGES POSTS আরো এই লেখাগুলিও পড়ুন... বিষয় ARCHIVE SEARCH সব লেখা কোন রচনায় খুঁজে পাওয়া গেল না নীড় Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share to a social network STEP 2: Click the link on your social network Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy