![]() |
| এজরা পাউন্ড (১৯৬৩, ভেনিস) |
পেনসিলভ্যানিয়া ইউনিভার্সিটিতে কবি হিলডা ডুলিটল এর সাথে তাঁর পরিচয় হয়। তিনি ছিলেন একজন অ্যাস্ট্রনমির অধ্যাপকের কন্যা। ডুলিটল এক জায়গায় লিখেছেন, আমার জীবন পাউন্ডের সাথে এমনভাবেই যুগলবন্দী হয়েছে যে, এ থেকে আমার মুক্তি পাওয়া অসম্ভব। ১৯০৮ সালে তিনি পরিবার বন্ধুবান্ধব দেশ
ছেড়ে পাউন্ডের সাথে ইউরোপে পাড়ি জমান এবং লন্ডনে পাউন্ডের সাথে ইমেজিস্ট আন্দোলনের বিস্তৃতির ব্যাপারে কাজ করেন। ১৯০৭ সালের গ্রীষ্মে তিনি ডুলিটলকে বিয়ের প্রস্তাব দেন, কিন্তু পিতার কোনো অনুমতি না পাওয়ায় তিনি (ডুলিটল) পাউন্ডকে বিয়ে করতে পারেননি। ১৯০৫ থেকে ১৯০৭ এর মধ্যে তিনি হিলডাকে নিয়ে বেশ কিছু কবিতাও লিখেছিলেন এবং ২৫টি কবিতার একটি সংকলনের নাম দিয়েছিলেন Hilda’s Book. এসময়ে আরো দুই রমণীর সাক্ষাৎ পান তিনি। একজন ভাইওলা বাক্সটার এবং অন্যজন মেরি মুর। মেরি মুরকে তিনি তার একটি কবিতার বই ‘পার্সোনা’(১৯০৯) উৎসর্গ করেছিলেন। সেই গ্রীষ্মে তিনি মেরি মুরকে বিয়েরও প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ১৯০৯ এর জানুয়ারিতে ইয়েটস-এর প্রাক্তন প্রেমিকা ঔপন্যাসিক অলিভার সেক্সপিয়ারের সাথে তাঁর পরিচয় হয় এবং অলিভার তাঁর মেয়ে ডরোথি সেক্সপিয়ারের সাথে পাউন্ড-এর পরিচয় করিয়ে দেন। দুজনের মধ্যে সম্পর্ক গভীরে চলে গেলে ১৯১৪ সালের এপ্রিলে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। অলিভার সেক্সপিয়ারের মাধ্যমে তিনি ইয়েটসসহ লন্ডনের লিটারেরি সার্কেলের অন্য লেখকদের সাথে পরিচিত হন।
![]() |
| হিলডা ডুলিটল, ১৯১৭ (p.c: Man Ray) |
![]() |
| ডব্লিউ বি. ইয়েটসের প্রতিকৃতি |
![]() |
| Harriet Monroe, founder of Poetry magazine |
আধুনিক কবিতার অভিযাত্রায় এজরা পাউন্ড ছিলেন ইউরোপ ও আমেরিকার সংযোগকারী কবি ব্যক্তিত্ব, যিনি হ্যারিয়েট মনরোর চিকাগো মাগ্যাজিন Poetry এর কন্ট্রিবিউটিং এডিটর হিসেবে কাজ করেছেন। হ্যারিয়েট মনরো নিজে একজন কবি ও সমালোচক ছিলেন। মনরোর ‘পোয়েট্রি’ পত্রিকাকে পাউন্ড তাঁর কবিতা আন্দোলনের একটি অন্যতম মুখপত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন এবং অনেকটা করেছিলেনও। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজ হলো ইমেজিস্ট আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সামান্য আগে কয়েকজন কবি বেশ প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠেন। এদের মধ্যে এজরা পাউন্ড, এমি লয়েল, টি.ই. হিউম, রিচার্ড অলডিংটন এবং হিলডা ডুলিটল প্রমুখ কবির নাম করা যেতে পারে। এই কবিরা বিশ্বাস করতেন যে কবিতার জন্য দরকার শক্ত ও স্বচ্ছ ইমেজ। তাঁরা আরও মনে করতেন, কবিতায় ব্যবহৃত হতে হবে প্রাত্যহিক জীবনের ভাষা এবং বিষয় নির্বাচনে থাকবে অবাধ স্বাধীনতা। এই আন্দোলনের প্রধান পুরোহিত ছিলেন কবি এজরা পাউন্ড। এই ঘরানার নতুন কবিতা আন্দোলনে তিনি কবিতা বিষয়ে নানাধরনের কথা বলেছেন। পরে তিনি ইতালিতে গেলে ফ্যাসিজম-এর খপ্পরে পড়েন এবং ইতালি রেডিও-তে ফ্যাসিস্টদের হয়ে প্রচারণা চালানোয় বিতর্কিত হন; কিন্তু কবিতার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সৎ ও সংযমী, নতুনত্বের সন্ধানী।
পাউন্ড অনেকগুলো ভাষা শিখেছিলেন নানা দেশের কবিতার মৌল কাঠামোগুলো জানা ও কবিতার ভাব ও ভাষার আন্তঃসম্পর্ক বোঝার জন্য।
কবিতার আধুনিক পর্বে ইমেজিস্ট আন্দোলনের গুরুত্বকে একটু আলাদাভাবেই দেখা প্রয়োজন। ইমেজিস্ট আন্দোলনের ক্ষেত্রটা তিনি তৈরি করেছিলেন চীনা ক্ল্যাসিক্যাল কবিতা এবং জাপানি কবিতার দ্বৈতসত্তা থেকে। পাউন্ড ইমেজিজম-এর বিষয়টি তাঁর নানা প্রবন্ধ, বক্তৃতা এবং একটি সংকলনে বিস্তৃতভাবে তুলে ধরেছেন এবং পৃথিবীব্যাপী এর প্রভাবকে বিশেষভাবে কবিতার ক্ষেত্রে অনিবার্য করে তোলেন। ১৯১৫ সালে মনরোর কাছে লেখা তাঁর এক চিঠিতে তিনি আধুনিক সময়সঞ্জাত ভিজ্যুয়াল কবিতার কথা বলেন, যেখানে থাকবে না গতানুগতিক ধারণা এবং বহুব্যবহৃত পদসমষ্টি (cliches and set pharases)। ইমেজিজম ও পাউন্ডকে আলাদা করে ভাবা মুশকিল। এই আন্দোলন ইংলিশ এবং আমেরিকান সাহিত্য বলয়ে ১৯১২ থেকে ১৯১৭ পর্যন্ত বিকাশ লাভ করেছিলো। এই আন্দোলন ছিলো, যাকে পাউন্ড বলেছেন- rather blurry, messy.... sentimentalistic mannerish-এর বিরুদ্ধে একধরনের বিদ্রোহ। কবিতার সাঙ্গীতিক দ্যোতনায় তিনি বিশ্বাসী ছিলেন এবং এব্যাপারে উদ্বিগ্নও ছিলেন, কীভাবে কবিতা কাগজের পাতায় সঙ্গীতের আবহসহ উপস্থিত হয়। musical activity of words -এর ব্যাপারটি মূলত ইমেজিস্ট আন্দোলনেরই একটি দিক। আধুনিক ফরাসি কবিতায় সংগীতের নানামুখী বৈচিত্র্যের সন্ধান মেলে। ফরাসি সিম্বোলিস্ট কবি স্তেফান মালার্মে তো জোর দিয়েই কবিতায় সংগীতের অনুষঙ্গকে আলোচনা করেছেন। তিনি অবশ্য শব্দ নিয়ে যত মাতামাতি করেছেন, পৃথিবীর আর কোনো কবিকে সেভাবে দেখা যায়নি। তাঁর কাছে শব্দই ছিল ব্রহ্ম। কবিতায় সংগীত না থাকলে কবিতার প্রাণসত্তা যে নিভে যায়, এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণের কোনো সুযোগ নেই। প্রকৃত কবিরা বিশ্বপ্রকৃতির নানা ক্ষেত্রে ভাসমান সংগীতের অদৃশ্য নোটেশনগুলো খুঁজে নিতে পারেন— কোনো শিল্পীর সৃজনশক্তির এ-ও এক লীলাখেলা। এটি কোনো মিডিওকার শিল্পীর কাজ নয়।
পাউন্ড A Few Donts by an Imagiste (1913) গ্রন্থে লিখেছেন—
An ‘Image’ is that which presents an intellectual and emotional complex in an instant of time. I use the term ‘complex’rather in the technical sense employed by the newer psychologists, such as Hart, though we might not agree absolutely in our application.
১৯১৪ সালে তিনি ইমেজিস্ট কবিতার সংকলন Des Imagistes বের করেন এবং এই সংকলনে ১০ জন কবির কবিতা স্থান পায়। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামস, হিলডা ডুলিটল, এলডিংটন, জেমস জয়েস এবং এমি লয়েল। ১৯১৫ সালে ইমেজিস্ট কবিতার শুদ্ধতা ও চারিত্র্য নিয়ে ফ্লিন্প এবং এমি লাওয়েলের সাথে এক বিরোধ সৃষ্টি হলে পাউন্ড ইমেজিস্টদের সাহচর্য ত্যাগ করে আরেকটি নতুন আন্দোলনের সূচনা করেন। বন্ধু চিত্রকর উইন্ডহ্যাম ল্যুইস এবং তিনি ‘ভর্টিসিস্ট’ (চিত্রকলার একটি বিশেষ ধরণ) আন্দোলনের গোড়াপত্তন করেন। এরা সে সময়ে ‘ব্লাস্ট’ নামে একটি কাগজ বের করেছিলেন, সেখানে তাঁর এবং এলিয়টের কবিতা ছাপা হয়েছিল। এতে এই আন্দোলনের সাথে জড়িত চিত্রশিল্পীদের ছবি ও লেখা ছাপা হয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়, ১৯১৫ সালে এই আন্দোলনের সমাপ্তি ঘটে।
![]() |
| অ্যামি লওয়েল, ১৯১৬ |
Golden peacocksUnder blossoming cherry trees,But on all the wide seaThere is no boat.
আমরা আগেই বলেছি পাউন্ড এই আন্দোলনের গোড়াতেই জাপানি কবিতার দিকে নজর দিয়েছিলেন, বিশেষ করে জাপানি হাইকুর দিকে। কবিতার ঘনত্ব ও পাউন্ড কথিত হেলেনিক হার্ডনেস-এর জন্য সেটি করার প্রয়োজন ছিল।
পাউন্ডের In a Station of the Metro একটি ইমেজিস্ট কবিতা। কবিতাটি কেন্দ্রীভূত ভাবের সাজুয্যে এবং প্রকাশের সংযমীতায় অতুলনীয়। এই কবিতাটি হ্যারিয়েট মনরোর ‘পোয়েট্রি’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল ১৯১৩ সালের এপ্রিল সংখ্যায়। এটি মাত্র দু-লাইনের কবিতা এবং একটি ইমেজিস্ট কবিতার প্রকৃষ্ট উদাহরণ—
The apparition in the faces of the crowd;Petals on a wet, black bough.
এই কবিতাটি প্রথমে লিখিত হয় ৩৬ লাইনে, পরে কমিয়ে ১৮ লাইনে এবং শেষে মাত্র দু-লাইনে লেখা হয়। কবিতাটির পটভূমি এরকম— একদিন কবি প্যারিসে মেট্রো ট্রেন থেকে নামার সময় মহিলা, শিশুসহ অনেকগুলো সুন্দর মুখ দেখলেন। এই দৃশ্য তাঁকে এতটাই অভিভূত করেছিলো যে, তিনি সারাদিন চেষ্টা চালিয়ে গেলেন তাঁর এই আকস্মিক রমণীয় আবেগের শৈল্পিক বহিঃপ্রকাশের। তাঁর মনে হলো, শব্দ তার এই অভিজ্ঞতা ধারণে অপারগ। হঠাৎ তিনি উপলব্ধি করলেন সামান্য রঙের ছোপে এটি সম্ভব এবং এভাবে তিনি পেইন্টিং-এর আদলে তাঁর সমস্ত অভিব্যক্তির প্রকাশ ঘটালেন যথাযথভাবে, স্বল্প পরিসরে এবং গড়ে উঠলো দু-লাইনের আলোচ্য কবিতাটি। এই কবিতাটির লেখনকৌশলে জাপানী হাইকু-র প্রভাব রয়েছে। গত শতাব্দীর তিরিশের দশকে পাউন্ডের অনেকগুলো বই একসাথে প্রকাশিত হয়। এগুলো হলো— ABC of Economics (1933), ABC of Reading (1934), Social Credit: An Impact (1935), Jefferson and /or Mussolini (1936), এবং A Guide to Kulchur (1938).
হেমিংওয়ে পাউন্ডকে মনে করতেন— an unofficial minister of culture who acted as mid-wife for new literary talent, যদিও হেমিংওয়ে পাউন্ড-এর চেয়ে ১৪ বছরের ছোট ছিলেন, তাঁদের মধ্যে ছিল গভীর বন্ধুত্বের সম্পর্ক। একটা বিশেষ সময়ে তাঁরা একই স্ট্রিট-এ বাস করতেন এবং ১৯২৩ সালে একই সঙ্গে ইতালি ভ্রমণ করেন। হেমিংওয়ের জীবনীকার জেফ্রি মেয়ার্স লিখেছেন—They liked each other personally, shared the same aesthetic aims, and admired each other's work. ১৯৪৫ সালে এজরা পাউন্ডকে আমেরিকান মিলিটারী পুলিশ রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগে আটক করে এবং তাঁকে জেলে ধর্ষক-খুনী-চোর-ডাকাতদের সাথে রাখা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রবাসী পাউন্ড ইতালিতে ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রোপাগান্ডা ব্যুরোর হয়ে ২২৫ টি প্রচারে অংশ নেন। আর এটি করা হয়েছিলো আমেরিকান সৈন্য এবং জনগণকে প্ররোচিত করতে, যাতে তারা প্রেসিডেন্ট রোজেনফেল্ড এবং ইহুদী ব্যাংকারদের ষড়যন্ত্রকে রুখতে পারে, যা তাদের ঠেলে দিয়েছিলো মুসোলিনীর অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী ধর্মরাজ্যের বিরুদ্ধে (পাউন্ড-এর মতে)। আর এজন্যেই, গত শতকের শ্রেষ্ঠ ইংরেজি ভাষার একজন প্রতিভাবান কবিকে কারাবরণ করতে হয়েছিলো রাষ্ট্রদ্রোহিতার দায়ভার মাথায় নিয়ে।
বিচারের জন্য যখন তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসা হয়, তখন জানা যায় যে, পাউন্ড মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন। এই অবস্থায় তাঁকে ওয়াশিংটন ডিসি-র ফেডারেল পাগলা গারদ, সেন্ট এলিজাবেথস-এ রাখা হয়। পাগলা গারদে বসে আবার শুরু করেন অসমাপ্ত ‘দ্য ক্যান্টোস’-এর পরবর্তী অংশগুলো, যা তিনি আরম্ভ করেছিলেন ১৯১৫ সালে। ১৯৪০ সাল নাগাদ তিনি লিখেছিলেন ক্যান্টোস-এর ৭১ টি অংশ। জেলে বসে ৭৪-৮৪ (ক্যান্টোস-এর ৭২-৭৩ অংশ তিনি বাদ দিয়েছিলেন) অংশ লিখে ফেলেন এবং ১৯৪৮ সালে তা প্রকাশিত হয় ‘দ্য পিসান ক্যান্টোস’ নামে যা মূলত ‘দ্য ক্যান্টোস’-এর একটি অংশ। পরবর্তী বছর ‘পোয়েট্রি অব দ্যা লাইব্রেরী অব কংগ্রেস’-এর ফেলোরা, যাঁদের মধ্যে ছিলেন টি.এস. এলিয়টও, ক্যান্টোস-এর প্রকাশিত ভল্যুম-এর জন্য তাঁকে ‘নলিংজেন প্রাইজ’-এ ভূষিত করেন। তাঁদের এই কর্মকান্ডে চারিদিকে হৈচৈ পড়ে যায় এবং পাউন্ড আবার একটি বিতর্কের মধ্যে জড়িয়ে যান। বছরের পর বছর চলে যায় তাকে মুক্তিও দেয়া হয় না, আবার বিচারের মুখোমুখিও করা হয় না। অবশেষে, ১৯৫৮ সালে আর্চিবাল্ড ম্যাকলেইশ, রবার্ট ফ্রস্ট এবং আর্নেষ্ট হোমিংয়ের হস্তক্ষেপে তাঁকে মুক্তি দেয়া হয় এই শর্তে যে, তাঁকে দেশ ত্যাগ করতে হবে। ১৯৭২ সালে, ৮৭ বছর বয়সে, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ভেনিসে তাঁর মেয়ের সাথে বসবাস করেন। ইতালির স্বেচ্ছা নির্বাসনের সময় তিনি ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র্রের সুষম অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে পশ্চিমী দুনিয়ার একটি র্যাশনাল সমাধানের গন্ধ পেয়েছিলেন। এক্ষেত্রে বলা যায়, তিনি শুধু দেখেছিলেন তাদের বাহ্যিক রূপটা, দেখেননি ফ্যাসিজম-এর অধীনে স্বাধীন শিল্পীসাহিত্যিক ও চিন্তাবিদদের ভাগ্যটা। পাউন্ড-এর ‘দ্য পিসান ক্যান্টোস’-এ বর্ণিত নরকে যাদের দেখা যায়, তারা মূলত সমসাময়িক যুদ্ধবাজ, আন্তর্জাতিক ব্যাংকারস, এবং যুদ্ধোপকরণ সরবরাহকারী— যাদের সবাই প্রায় ইহুদী। ইহুদীদের প্রতি ছিলো তাঁর প্রচণ্ড ঘৃণা। পশ্চিমী সভ্যতার অবক্ষয়টা মূলত তিনি দেখেছিলেন বস্তুতান্ত্রিকতার মধ্যে, আর এজন্যে তিনি সুদকারবারী ইহুদীদেরই দায়ী করেছিলেন। তবে তিনি কিছু কবিসহ তাঁর পরিচিত অনেক ইহুদীর প্রতিই ছিলেন সহানুভূতিশীল।
যুদ্ধোত্তর সময়ে, তাঁর ব্যক্তিগত উপস্থিতি, নিজস্ব ট্র্যাজিডি, ‘দ্য পিসান ক্যান্টোস’-এর সাফল্য এবং পরবর্তী প্রজন্মের কবিদের জন্য বেশ কিছু নির্দেশনা— সব মিলিয়ে তিনি একজন প্রাধান্যবিস্তারকারী কবি হিসেবে পরিচিতি পান। এলিয়টের impersonality of poetry মতবাদ তখন সর্বজন স্বীকৃত একটি ব্যাপার, কিন্তু ‘দ্য পিসান ক্যান্টোস’- এ দেখা গেল তিনি সে-নিয়ম সচেতনভাবেই লঙ্ঘন করেছেন এবং ‘দ্য পিসান ক্যান্টোস’-এর হিরো পাউন্ড নিজে, যাকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ, স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্ন।
পাউন্ডের ‘দ্য ক্যান্টোস’, পরবর্তীকালে কবিদের নতুন কবিতা লেখায় দারুণভাবে উৎসাহিত করেছিলো। সমালোচকরা বলেছেন— রবার্ট লাওয়েল, জন বেরিম্যান, এলেন গিনসবার্গ অথবা অন্যান্য কবিরা কী ধরণের কবিতা লিখতেন তা আজ ভাবা মুশকিল, যদি পাউন্ড সেই রাস্তাটি না তৈরী করে দিতেন। কনফেশনাল কবিরা, যাঁরা এলিয়টের নৈর্ব্যক্তিকতা মতবাদের বিপরীতে কবিতা লিখছিলেন, তাঁদের ক্ষেত্রেও বলা যায় পাউন্ডই পথ দেখিয়েছিলেন। এছাড়া, পরবর্তীকালে, আমেরিকান সাহিত্যে যতোগুলো দীর্ঘ কবিতা লেখা হয়েছে, তার প্রায় অধিকাংশ কবিতারই মডেল হিসেবে ‘দ্য ক্যান্টোস’ এর নাম করা যেতে পারে। এভাবে পাউন্ড তাঁর সময়ের প্রায় সকল কবির ওপর এক সদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিলেন। প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধের ওপর পুনঃপুন আক্রমণ এবং ইমেজিজম, ভর্টিসিজম ইত্যাদির মাধ্যমে তিনি অনেককেই আকৃষ্ট করেছিলেন, যাঁরা পরবর্তীতে আবার নতুন কোনো সাহিত্য আন্দোলনের মাধ্যমে বিশ শতকের সাহিত্য আন্দোলনকে একটি পরিণতির দিকে চালিত করেছিলেন।
যখন, ১৯৪৬ সালের দিকে, পত্র-পত্রিকায় পাউন্ড-এর আর কোনো আলোচনা সমালোচনা দেখা যাচ্ছিলো না, এলিয়ট তাঁর এক বন্ধুকে লিখেছিলেন— পাউন্ড-এর মতো মানুষ যখন কবিতা নিয়ে কোন সমালোচনা লিখে, তখন নতুন কোনো কবিতার দ্বার খুলে যায়। পাউন্ড-এর প্রতি এলিয়টের ছিলো অপরিসীম শ্রদ্ধা এবং কবিতা পাগল এই প্রতিভাধর মানুষটিকে তিনি ভালোভাবেই চিনতেন। এর কয়েক বছরের মধ্যেই একের এক তাঁর অনেকগুলো গদ্যলেখা বেরুতে থাকে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য, The letters of Ezra Pound (1907-1941) প্রকাশিত হয় ১৯৫০ সালে, Literary Essays ১৯৫৪ এবং ৭৩ সালে এবং এ সময়ে আরও প্রকাশিত হয় Selected Prose (1909-1965); কবিতা ও শিল্পসাহিত্য বিষয়ক লেখার তোড়ে সে সময়ে ক্রমাগত তার ভক্ত ও শিষ্যের সংখ্যা বাড়তে থাকে। কবিতা বিষয়ে তার বিশ্লেষণী মতামত ব্যাপকভাবে সাড়া জাগিয়েছিলো আমেরিকা ও ইউরোপে; এমনকি ‘ব্ল্যাক মাউন্টেন মুভমেন্ট’ও তাঁরই লেখা থেকে শক্তি সঞ্চয় করেছিলো বলে অনেকের ধারণা।
তার ‘দ্য পিসান ক্যান্টোস’-এ হোমারিক জগৎ থেকে সমসাময়িক যুদ্ধবাজ এবং শিল্পসাহিত্যের শত্রুদের পর্যন্ত দেখা যায়— এ যেন চির-বর্তমানতার এক শৈল্পিক দলিল। কারাবরণ, কষ্ট-দুর্ভোগ, পাগলা গারদে ক্রমাগত দিনযাপন ইত্যাদি নানান ঝুট-ঝামেলা সত্ত্বেও তিনি অদম্য ইচ্ছা শক্তিতে ‘দ্য পিসান ক্যান্টোস’-এর পরবর্তী অংশগুলো লিখে যাচ্ছিলেন। তার এই অদম্য ইচ্ছাশক্তিই তাকে দিয়েছিলো সর্বজয়ী কাব্যিক দৃষ্টি, এই একমাত্র অস্ত্র নিয়েই তিনি এগিয়ে এসেছিলেন সময়ের পাপ মোচনে একাকীই, নিবিড় ধৈর্যে, ক্রমাগত নিজেকে ক্ষয়ে ক্ষয়ে।
![]() |
| ভেনিসে এজরা পাউন্ড ও ওলগা রুজের সমাধি |
১৯৭২ সালে মৃত্যুর কিছুদিন আগে এজরা পাউন্ডকে ‘ইমারসন থরো মেডাল অব এমেরিকান অ্যাকাডেমি অব আর্টস অ্যান্ড সাইন্স’ দেবার প্রস্তাব করা হলে সেখানে বিতর্কের ঝড় ওঠে এবং অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের অধিকাংশ সদস্য বিরোধীতা করলে তা নাকোচ হয়ে যায়। হঠাৎই জন্মদিনের আলো দেখা দেবার সাথে সাথে তিনি ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছিলেন এবং নিজ বাড়িতে বিছানা থেকেও উঠতে অপারগ হয়ে পড়েন। পরদিন রাতে তাঁকে ভেনিসের সিভিল হসপিটালে ভর্তি করা হলে ১ নভেম্বর, ৮৭ বছর বয়সে পাউন্ড ঘুমের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেন। সে সময়ে তাঁর প্রেমিকা ওলগা তাঁর পাশেই ছিলেন। তাঁর স্ত্রী ডরোথি শারীরীক দুর্বলতার কারণে অন্তেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিতে পারেননি। পরবর্তী বছর ইংল্যান্ডে ডরোথির মৃত্যু হয়। পাউন্ড-এর বয়স যখন ৩৬, আমেরিকান ভায়োলিনবাদক ওলগা রুজের সাথে তাঁর প্যারিসে দেখা হয় ১৯২২ সালের শরতের কোনো এক নরম বিকেলে এবং তাঁরা একে অপরের প্রেমে পড়ে যান। সেদিন থেকে পাউন্ড-এর মৃত্যু অবধি দীর্ঘ ৫০ বছর ওলগা তার সাথে ছিলেন। জন টাইটেল লিখেছেন— Pound had always felt there was a link between his creativity and his ability to seduce women. ওলগা রুজ মারা যান ১৯৯৬ সালে এবং তাঁকে পাউন্ড-এর সমাধির পাশে সমাহিত করা হয়। ওলগা রুজের গর্ভে পাউন্ডের একটি কন্যা সন্তানের জন্ম হয়েছিল যার নাম রাখা হয়েছিল মেরি আর ডরোথির গর্ভে জন্ম নিয়েছিল ওমার নামে এক পুত্র সন্তান।
পাউন্ডের জানার আগ্রহ যেমন ছিলো অপরিসীম, তেমনি ছিলো পড়াশুনার সার্বজনীন মোহ এবং যে কারণে পৃথিবীর তাবৎ প্রান্তের সভ্যতা ও সংস্কৃতির অজস্র সম্পদের হাদিস পাওয়া যায় তাঁর কবিতায়। তাঁর সারা জীবনের এই সংকলনের (‘দ্য ক্যান্টোস’) কবিতাগুলো প্রাচীন ও বিদেশী সাহিত্যের নানা উল্লেখ-উদ্ধৃতিতে অনেকখানি জটিল হয়ে পড়েছে। তিনি ছিলেন মূলত খাঁটি কবিতার সাধক। অনেকেই তাঁকে বদমেজাজী, রাগী ও নিষ্ঠুর প্রকৃতির মানুষ হিসেবেই জানেন সেকথা যেমন সত্যি, তেমনি এ-ও সত্যি যে কবিতার জন্য, কবিতাকে শুদ্ধতার দিকে নিয়ে যাবার ক্ষেত্রে কিংবা প্রকৃত কবিদের তুলে ধরার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অকৃপণচিত্ত। তিনি জেমস জয়েস-এর কবিতাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিদের কবিতার সাথে তুলনা করেছেন। এক সময়ে ইয়েটস-এর সচিব হিসেবে কাজ করলেও ইয়েটস তাঁকে তার দুর্বিনীত ব্যবহার ও আত্মম্ভরিতার কারণে খুব বেশি পছন্দ করতেন না, তবে তার যে তীক্ষ্ণ মেধা আছে এবং কবিতা বিষয়েও ভালো পাণ্ডিত্য আছে— সে বিষযে তিনি অবগত ছিলেন। ইউরোপ-আমেরিকার আধুনিকতাবাদী কবিতা আন্দোলনে তিনিই ছিলেন সকলের শীর্ষে, আর সে-কারণেই, কবি হিসেবে তিনি যে মাপেরই হোন না কেন, তার নাম উচ্চারিত হবে আরো অনেক অনেক দূরবর্তী সময়েও, যতোদিন কবিতা লেখা হবে।










মন্তব্য